ইরানি অভিবাসীদের মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র

কয়েকজন ইরানিসহ আরও কিছু অভিবাসীকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। সহিংসতা ও দারিদ্র্যে জর্জরিত আফ্রিকার দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন আইনজীবী ও বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, এমন একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এই তালিকায় এমন দুজন নারী রয়েছেন, যাঁরা ইরানে ফেরত গেলে নির্যাতন ও নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাঁদের আইনজীবী এমিলি ট্রোসল জানান, এই দুজনের একজন ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান, অন্যজন গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকর্মী।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে আফ্রিকার দেশটি তথাকথিত ‘তৃতীয় দেশ’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাসিতদের গ্রহণ করতে সম্প্রতি সম্মত হয়েছে।

ট্রোসল বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পরপরই এই দুই নারীকে আটক করা হয়। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন করেন এবং একটি মার্কিন অভিবাসন আদালত থেকে ‘উইথহোল্ডিং অব রিমুভাল’ নামে একধরনের সুরক্ষা পান।

এই সুরক্ষা পাওয়ার অর্থ হলো, আদালত মনে করেছেন, ইরানে ফেরত গেলে তাঁদের নিপীড়ন বা নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশের বেশি।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তির অধীনে প্রথম ফ্লাইটে প্রায় ২০ জনকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে নেওয়া হবে। তাঁদের মধ্যে সিরিয়া ও আফগানিস্তানের নাগরিকও রয়েছেন। দুই আইনজীবী জানান, ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার (গতকাল) ছাড়ার কথা ছিল।

রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসা এবং একই ধরনের সুরক্ষা পাওয়া একজন তুর্কি নাগরিকও এই ফ্লাইটে থাকতে পারেন, এমন তথ্য জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী। এই আইনজীবী নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

তৃতীয় দেশে নির্বাসন চুক্তি

ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রতিবেশী দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (যেখানে এখন ইবোলার প্রকোপ চলছে) মতো দেশগুলোর সঙ্গে ‘তৃতীয় দেশে’ নির্বাসন চুক্তি করেছে। এমন সব অভিবাসীকে এসব দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাঁদের আইনি জটিলতার কারণে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।

ওয়াশিংটন এসব চুক্তি আইনসম্মত বলে দাবি করছে। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবীরা বলছেন, চুক্তির বিস্তারিত দিক এখনো অস্পষ্ট এবং অনেক নির্বাসিত ব্যক্তিকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশেই ফেরত যেতে হতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলা শুরু করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনা চলছে।

ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ডের ভারপ্রাপ্ত আইনি পরিচালক আলী রাহনামা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানি জনগণকে স্বাধীনতা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এমন একটি সময়ে সেই একই শাসনব্যবস্থা থেকে পালিয়ে আসা ইরানি আশ্রয়প্রার্থীদের তারা মৃত্যুর মুখে ঠেলে পাঠাচ্ছে।’

চুক্তির অধীনে নির্বাসিত হতে পারেন ‘শত শত’ মানুষ

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত উল্লিখিত মার্কিন কর্মকর্তা জানান, নির্বাসিত ব্যক্তিদের মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুইয়ের বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে রাখা হবে এবং তাঁদের অবিলম্বে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে না। এই চুক্তির অধীনে পর্যায়ক্রমে শত শত অভিবাসীকে নির্বাসিত করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র সুরক্ষা (হোমল্যান্ড সিকিউরিটি) দপ্তর গত সপ্তাহে জানায়, নির্বাসিত ব্যক্তিদের পাঠানোর ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক মুখপাত্র বলেন, মধ্য আফ্রিকান সরকারের অনুরোধে বাঙ্গুইয়ে পাঠানো অভিবাসীদের সেখানে ‘পৌঁছানোর পর মানবিক সহায়তা’ দেবে সংস্থাটি। তবে নির্বাসন প্রক্রিয়ায় আইওএম জড়িত নয় এবং স্বেচ্ছাভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে এই সহায়তা দেওয়া হবে।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ বছর আইওএমকে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার বরাদ্দ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে দেশটি বারবার অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে দেশটির ৫৫ লাখ মানুষের বেশির ভাগ এখনো দরিদ্র অবস্থার মধ্যে বসবাস করছেন।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ফস্তিন-আরশঞ্জ তুয়াদেরা গত বছর কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। অন্য গোষ্ঠীগুলো রুশ ভাড়াটে সেনা, রুয়ান্ডার সেনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব বিদেশি ভাড়াটে বাহিনীকে তুয়াদেরা সরকারকে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা হয়েছিল।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুই শহরের একটি অংশের দৃশ্য। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাল
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুই শহরের একটি অংশের দৃশ্য। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাল। ছবি: রয়টার্স

No comments

Powered by Blogger.