মাস্কের ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত টাকা, চাঁদে ২০০ বার যাতায়াতসহ তাতে আর কী কী সম্ভব
মাত্র একজনের হাতে এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকতে পারে, তা একসময় ভাবাই যেত না।
গতকাল শুক্রবারের আগপর্যন্ত ‘ট্রিলিয়ন’ বা এক লাখ কোটি ডলারের এ হিসাবটি শুধু বিশ্বের গুটিকয় বড় অর্থনীতির জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) বা বিশাল ঋণের ক্ষেত্রেই শোনা যেত। এ ছাড়া গত এক দশকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কিছু কোম্পানির মোট মূল্যের ক্ষেত্রে এ সংখ্যার ব্যবহার দেখা গেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, তারই ধারাবাহিকতায় মাস্ক এ নতুন খেতাব পেলেন।
বছর বছর বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি ব্যক্তিদের ক্লাবে নতুন সদস্য যুক্ত হচ্ছেন। আবার এ শতকোটিপতিদের মধ্যে কেউ কেউ আরও ধনী হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে নামী তারকারাও রয়েছেন। অথচ ঠিক একই সময় বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রথম কোনো ব্যক্তির ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার এ ঘটনা অনেকে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
‘এক লাখ কোটি’ বা ওয়ান ট্রিলিয়ন সংখ্যাটি মানুষের পক্ষে সহজে কল্পনা করাও কঠিন। ১ লাখ কোটি ডলার হলো ১ বিলিয়নের (১০০ কোটি) ১ হাজার গুণ বেশি। আর ১ মিলিয়নের (১০ লাখ) ১ মিলিয়ন বা ১০ লাখ গুণ বেশি। ১ ট্রিলিয়ন লিখতে ১–এর পর ১২টি শূন্য (১,০০০,০০০,০০০,০০০) দিতে হয়।
প্রসঙ্গত, ইলন মাস্কের এক লাখ কোটি (এক ট্রিলিয়ন) ডলার বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করলে তা এত বিশাল একটি অঙ্কে দাঁড়াবে, যা সাধারণ হিসাবের বাইরে। বর্তমানে (২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী) এক মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ১২৩ টাকা। এ দর ধরে এক লাখ কোটি ডলার সমান ১২৩ লাখ কোটি (১২৩ ট্রিলিয়ন) টাকা! সহজ কথায় ও দেশীয় সংখ্যা গণনার পদ্ধতিতে এটি হলো—১২৩,০০০,০০০,০০০,০০০ টাকা।
মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল শেয়ারবাজারে স্পেসএক্সের দুর্দান্ত অভিষেকের পর মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ আসলে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি (১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে। তাঁর এ সম্পদের বেশির ভাগই রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বা স্টক হিসেবে।
এই এক লাখ কোটি ডলার দিয়ে কী কী করা সম্ভব, তা বোঝার জন্য কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
২০০ বারের বেশি চাঁদে যাওয়া ও ফিরে আসা
এক ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত বড় অঙ্কের টাকা, সেটা কল্পনা করা সত্যিই কঠিন। ঠিক যেমন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স মহাকাশ জয়ের এক বিশাল স্বপ্ন দেখছে, আর তা এখনো বাস্তব হওয়ার অনেক বাকি।
এক ট্রিলিয়ন ডলার কাগজের নোট যদি একটার পর একটা লম্বালম্বিভাবে সাজানো হয়, তবে তা প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ মাইল (প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ কিলোমিটার) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এটি পৃথিবী থেকে চাঁদে ২০০ বারের বেশি যাতায়াতের সমান দূরত্ব। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল (প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার)। এ ছাড়া ডলারের নোটের ওই বিস্তৃতি পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মাইলের (প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার) দূরত্বকেও ছাড়িয়ে যাবে।
পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জন্য ১২২ ডলার
ইউএস সেনসাস ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আজ পৃথিবীতে প্রায় ৮২০ কোটি (৮ দশমিক ২ বিলিয়ন) মানুষ বাস করছে। যদি এক ট্রিলিয়ন ডলার এ পুরো মানবগোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে প্রত্যেকে প্রায় ১২২ ডলার (প্রায় ১৫ হাজার টাকা) পাবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার জিডিপির দ্বিগুণ
এক ট্রিলিয়ন ডলার হলো দক্ষিণ আফ্রিকার বার্ষিক জিডিপির দ্বিগুণের বেশি, যে দেশে ইলন মাস্ক জন্মগ্রহণ করেছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য ও পরিষেবার মোট উৎপাদন মূল্য প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন (৪৮ হাজার কোটি) ডলার।
আজ বিশ্বের মাত্র ২১টি দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পার করতে পেরেছে। এ তালিকায় যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ও ২০ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সবার আগে রয়েছে, যা অন্যান্য দেশের অর্থনীতির চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ লাখ বাড়ি কেনা সম্ভব
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব সেন্ট লুইসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া একটি মাঝারি মানের বাড়ির গড় দাম প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার ২০০ ডলার। এ হিসাবে মাস্কের এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ২৫ লাখ বাড়ি একবারে কিনে নেওয়া সম্ভব।
২৪ হাজার ৩০০ কোটি গ্যালন জ্বালানি তেল
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) হিসাবমতে, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রায় ৪ দশমিক ১১ ডলার। এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে এ চড়া দামেও ২৪ হাজার ৩০০ কোটি (২৪৩ বিলিয়ন) গ্যালনের বেশি তেল কেনা সম্ভব।
সহজে বোঝার জন্য বলা যায়, পুরো গত এক বছরে সব মার্কিন মিলে যত গাড়ি চালিয়েছেন, তাতে খরচ হয়েছিল মোটে ১৩ হাজার ৭০০ কোটি গ্যালন তেল। অর্থাৎ এক ট্রিলিয়ন ডলারের তেল দিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সব গাড়ি প্রায় দুই বছর চালানো যাবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে তেলের দাম বেশ কম ছিল। কিন্তু ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িয়ে পড়ায় তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে আগুন লাগায় দীর্ঘ চার বছর পর এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন তেলের দাম চার ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনীর চেয়ে ৭০০ বিলিয়ন ডলার এগিয়ে
ফোর্বসের তালিকায় এ মুহূর্তে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হলেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। গতকাল দুপুরের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৪০০ কোটি (২৯৪ বিলিয়ন) ডলার। এ বিশাল অঙ্কও কিন্তু এক ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে পুরো ৭০ হাজার ৬০০ কোটি (৭০৬ বিলিয়ন) ডলার কম।
পরিসংখ্যানটি আরও চমকপ্রদ করতে বলা যায়, ফোর্বসের তালিকায় মাস্কের ঠিক পেছনে থাকা পরবর্তী চার ধনীর পুরো সম্পদ যদি একসঙ্গে যোগ করা হয়, তবেই শুধু তা এক ট্রিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
ল্যারি পেজ ছাড়া এ চারজনের অন্য তিনজন হলেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন (২৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার), অ্যামাজনের জেফ বেজোস (২৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার) ও ওরাকলের ল্যারি এলিসন (২৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার)। এই চারজনের সম্পত্তি যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
অবশ্য, শেয়ারবাজারের ওঠানামার কারণে ধনকুবেরদের এ সম্পত্তি প্রতিদিন, এমনকি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেও শত শত কোটি ডলার বদলে যেতে পারে, যেমন মাস্কের কথাই ধরা যাক, ২০২৪ সালে তাঁর সম্পত্তি ছিল ১৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা গত বছর বেড়ে হয়েছিল ৩৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার। আর স্পেসএক্সের আইপিও শেয়ারবাজারে আসার সুবাদে তা এখন রকেটের গতিতে বেড়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে!
![]() |
| ধনকুবের ইলন মাস্ক। ছবি: এপির ভিডিও থেকে নেওয়া ছবির স্ক্রিনশট |

No comments