ইরান ইস্যুতে নিজের সঙ্গেই প্রতারণা ট্রাম্পের

বাস্তবতার বাইরে ভিন্ন বয়ান তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত আড়াই মাস ধরে ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যা মূলত বাস্তবতাকে আড়াল করে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়ার শামিল।

ট্রাম্প প্রতিনিয়ত দাবি করছেন, ইরান চুক্তি করার জন্য মরিয়া হয়ে আছে এবং সে চুক্তি খুব দ্রুত সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। এ আলোচনার অজুহাতে তিনি তেহরানকে বারবার ছাড় দিয়েছেন, নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শিথিল করেছেন এবং ইরানের বিভিন্ন উসকানি ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাকে হালকা করে দেখিয়েছেন।

এমনকি বৃহস্পতিবারও ইরানের খারগ দ্বীপ দখলের হুঁশিয়ারি দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় হামলা থেকে পিছিয়ে এসে ট্রাম্প আলোচনার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন।

তবে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের এই অনীহা প্রকাশ পাওয়ায় ইরান এর পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে। ট্রাম্পের এমন অবস্থান কেবল যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটকেই দীর্ঘায়িত করছে। এর ফলে পরিস্থিতি ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে, যা ইরানের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি ইরানের হামলায় আমেরিকান সেনাবাহিনীর একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পরও ট্রাম্পকে বেশ অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একে ‘বড় কোনো বিষয় নয়’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, ‘তবুও আমেরিকার এ হামলার জবাব দেওয়া প্রয়োজন।’

বৃহস্পতিবারও তিনি একদিকে খারগ দ্বীপ দখলের মতো কঠোর সামরিক অভিযানের কথা বলেন, যার জন্য স্থল সেনা পাঠানো এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি ছিল। কিন্তু এর কয়েক মিনিট পরেই ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সুর নরম করে বলেন, ‘আমেরিকার জনগণের এই মুহূর্তে যুদ্ধের মতো কোনো মানসিকতা নেই।’

একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে সেনা পাঠাতে চাই না। তবে আমি চাইলে ছোট একটি দল পাঠিয়ে পুরো জায়গা দখল করতে পারতাম।’

এর আগে গত ৭ এপ্রিল ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, যার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল ‘হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ এবং অবিলম্বে খুলে দেওয়া’। ইরান সে শর্ত পূরণ না করলেও ট্রাম্পের প্রশাসন বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।

এছাড়া গত ৩ ও ৪ জুন দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মতো ইরানের জিম্মি সংকটের মতো কোনো জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে চান না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই নমনীয়তা এবং নিজের পরিকল্পনা আগেভাগেই প্রকাশ করে দেওয়ার বিষয়টি ইরানকে চুক্তির ক্ষেত্রে আরো সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, যা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে ট্রাম্পকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑতিনি কি পুনরায় পুরোদমে যুদ্ধে জড়াবেন, নাকি রাজনৈতিক চাপ সামলাতে একটি দুর্বল চুক্তি মেনে নিয়ে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি টানবেন। -সিএনএনের বিশ্লেষণ

সমঝোতা স্মারক সব রণাঙ্গনেই যুদ্ধের অবসান ঘটাবে: আরাগচি

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনো কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়নি। প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ অবসানের ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

আরাগচি বলেন, এই সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি ও ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তিনি বলেন, আলোচকেরা সমঝোতা স্মারকের খসড়া বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করেছেন। পারমাণবিক ইস্যুতে তেহরান ওয়াশিংটনের দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বিষয়টি দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে।

এই চুক্তিতে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা লেবাননকে কখনো একা ছেড়ে দেব না।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সুরক্ষা জোরদার করছে ইরান
উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে ইরান। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ কথা জানায় সিএনএন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান মজুতের কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন করেছে এবং যেসব স্থাপনায় এই উপাদান মজুত আছে বলে মনে করা হয়, সেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত করার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে বলা হয়, ইরান সুড়ঙ্গগুলো ভরাট করে দিয়েছে এবং কিছু প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন স্থাপন করেছে। এর ফলে ইউরেনিয়াম মজুতে প্রবেশ করা এক মাস আগের তুলনায় ‘অনেক বেশি কঠিন, বিপজ্জনক ও সময়সাপেক্ষ’ হয়ে উঠেছে। এদিকে, মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, ইরানের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে মজুত রাখা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জোরপূর্বক জব্দ করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযানের প্রস্তুতি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সূত্র: মিডল ইস্ট আই