Saturday, January 3, 2026
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কি এতটা সহজ হবে by মো. ছানাউল্লাহ
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কি এতটা সহজ হবে by মো. ছানাউল্লাহ
এই সংঘাতের কেন্দ্রে আছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ষাটোর্ধ্ব মাদুরো ক্ষমতা ছাড়লে কি ভেনেজুয়েলার সব সমস্যার সমাধান হবে? নাকি তাঁর বিদায় আরও বড় অস্থিরতার পথ খুলে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়, কারণ সংকটটি কেবল একজন শাসকের নয়; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জটিল সমীকরণ।
সংকটের উৎস: রাজনীতি থেকে ভূরাজনীতি
ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে হুগো চাভেজ-পরবর্তী রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, দেশটির তেলের ওপর অতিনির্ভরশীল অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতার কথা বলতে হয়। ২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, বিরোধী দল দমন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ—এই তিন অভিযোগ তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে উঠতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই মাদুরোর সরকারকে অবৈধ বলে দাবি করে আসছে। ২০১৯ সালে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া সেই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তোলে। যদিও গুয়াইদোকে নিয়ে তৈরি সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবু সে সময় থেকে বিশেষ করে তেল খাতকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়।
‘যুদ্ধাবস্থা’ কেন বলা হচ্ছে
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদন মতে, এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘যুদ্ধাবস্থা’ বলছেন মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি কার্যত অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নজরদারি বেড়েছে। তৃতীয়ত, মাদুরো সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিকভাবে তাদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে।
যুদ্ধ এখানে সরাসরি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে নয়; বরং অর্থনীতি ও কূটনীতির মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা একে ‘হাইব্রিড কনফ্লিক্ট’ বলছেন, যেখানে নিষেধাজ্ঞা নিজেই একটি অস্ত্র।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সরকার না জনগণ
যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো—নিষেধাজ্ঞা মাদুরো সরকারকে দুর্বল করবে। কিন্তু বাস্তবে এর বড় ধাক্কা গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। ভেনেজুয়েলায় খাদ্যসংকট, ওষুধের অভাব ও মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
এই মানবিক সংকট আবার মাদুরোর জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ারও হয়েছে। তিনি বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’-এর জন্য দায়ী করে জাতীয়তাবাদী আবেগ উজ্জিবিত করতে পারছেন। ফলে নিষেধাজ্ঞা একদিকে সরকারকে চাপে ফেললেও, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে শাসন টিকিয়ে রাখার শক্তিও জুগিয়েছে।
মাদুরো ক্ষমতা ছাড়লে কী হবে
অনেক পশ্চিমা নীতিনির্ধারকের ধারণা—মাদুরো ক্ষমতা ছাড়লেই ভেনেজুয়েলা স্বাভাবিক পথে ফিরবে। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সহজ নয়। কারণ, মাদুরোর শাসনব্যবস্থা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। নিরাপত্তা বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি—সবখানেই তাঁর অনুগতদের শক্ত অবস্থান রয়েছে।
মাদুরো হঠাৎ সরে গেলে একটি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে। সেই শূন্যতা কে পূরণ করবে—এটাই বড় প্রশ্ন। বিরোধী দল বিভক্ত, সেনাবাহিনীর ভূমিকা অনিশ্চিত, আর আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থ পরস্পরবিরোধী।
সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের কথা প্রকাশ্যে না বললেও, সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতে ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—একজন শাসককে সরিয়ে দিলেই স্থিতিশীলতা আসে না। বরং রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, দেশটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠী, সীমান্ত অপরাধচক্র এবং রাজনৈতিক মিলিশিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। সামরিক হস্তক্ষেপ হলে তা দ্রুত গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারে—যার প্রভাব পুরো লাতিন আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়বে।
রাশিয়া, চীন ও কিউবার ভূমিকা
ভেনেজুয়েলা সংকটকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বনাম মাদুরো হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এখানে রাশিয়া, চীন ও কিউবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন মতে, ভেনেজুয়েলাকে রাশিয়া সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে, চীন বিপুল ঋণ ও বিনিয়োগ করেছে, আর কিউবা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহায়তার মাধ্যমে মাদুরো সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।
মাদুরো ক্ষমতা হারালে এই শক্তিগুলোর স্বার্থও প্রশ্নের মুখে পড়বে। ফলে তারা সহজে পিছু হটবে—এমনটা ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এই বহুপক্ষীয় জটিলতাই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও উদ্বাস্তু সংকট
ভেনেজুয়েলার অস্থিরতা ইতিমধ্যে কলম্বিয়া, ব্রাজিল ও পেরুকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে। লাখ লাখ উদ্বাস্তু এসব দেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এটি লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম বড় মানবিক সংকট।
যুদ্ধ বা হঠাৎ শাসনপরিবর্তন হলে এই স্রোত আরও বাড়বে। ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করাও এখন আন্তর্জাতিক সমাজের বড় চ্যালেঞ্জ।
তাহলে পথ কী? অনেক বিশ্লেষকের মতে, একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হলো রাজনৈতিক সমঝোতা। অর্থাৎ, মাদুরো সরকারের সঙ্গে বিরোধী দল ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনার মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় যাওয়া। এর সঙ্গে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যেতে পারে।
কিন্তু এই সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি। যুক্তরাষ্ট্র ও বিরোধী দল মাদুরোকে বিশ্বাস করে না। আর মাদুরো বিশ্বাস করেন না যে ক্ষমতা ছাড়লে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা নিরাপদ থাকবেন।
- তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এপি, আল-জাজিরা
| ভেনেজুয়েলায় সেনাবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, লা গুয়াইরা। ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1402)
-
▼
January
(307)
-
▼
Jan 03
(13)
- ইরানে বিক্ষোভ দমনে কঠোর সরকার, হস্তক্ষেপের হুমকি ট...
- ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কি ...
- যুদ্ধ না করেই ইরানের জয়ের কৌশল by জাসিম আল-আজ্জাওয়ি
- বিদেশি মিডিয়ার রিপোর্ট: ‘লাজুক গৃহিণী’ হলেন কাণ্ডারি
- নিউইয়র্কের নতুন মেয়র: ইসরায়েল-সমর্থিত নির্বাহী আদে...
- ‘একটি কমেডি শো’: মিয়ানমারের তরুণদের চোখে জান্তার আ...
- অভিষেক ভাষণে মামদানি: নিউইয়র্কের এক নতুন গল্প লিখব...
- ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১৮ হাজার ফিলিস্তিনিকে দাফন কর...
- নিউইয়র্ক সিটির মেয়র: ৫০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে জ...
- সৈকতে টপলেস মডেল হাইদি ক্লুম
- ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে টিকে থাকা নিয়ে ইসরাই...
- রাজশাহীর সড়কে ড্রেনের কাদা, ধুলায় মিশছে ভয়ংকর জীবা...
- ‘জেবু’র বেড়ে ওঠার গল্প বললেন জাইমা রহমান
-
▼
Jan 03
(13)
-
▼
January
(307)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment