Sunday, July 26, 2026
অরুন্ধতী রায় অভিনয় করতেন, পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও by তপতী বর্মন
অরুন্ধতী রায় অভিনয় করতেন, পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও by তপতী বর্মন
গত শতকের আশির দশকের কথা। ভারতের স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা ও পরিবেশবিদ প্রদীপ কৃষেণ একটি চিত্রনাট্য লেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পান। এর আয়োজক ছিল ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এনএফডিসি)। তারা প্রদীপকে সেই চিত্রনাট্য নিয়ে সিনেমা বানাতে উৎসাহ দেন।
প্রদীপ কৃষেণ মোটামুটি কে কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন, সেটা ঠিক করে ফেলেন। তবে মূল নারী চরিত্রের জন্য কাউকে মনে ধরছিল না।
একদিন তিনি তাঁর স্ত্রীর অফিসে গিয়ে কোঁকড়া চুলের, হালকা-পাতলা গড়ন আর চোখে গভীর কী যেন আছে; এমন এক তরুণীকে দেখতে পান। দেখেই তাঁর মনে হয়, তিনি-ই সেই নারী, যাকে তিনি সিনেমার জন্য মনে মনে খুঁজছিলেন।
এই তরুণী হলেন অরুন্ধতী রায়। তিনি তখন দিল্লির স্কুল অব প্ল্যানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার থেকে পাস করে স্থপতি হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছেন। স্ত্রীর মাধ্যমে প্রদীপ সেই তরুণীকে ডাকেন। তিনি কী চান, সেটা জানান।
তবে অভিনয় করার ব্যাপারে একদমই রাজি ছিলেন না অরুন্ধতী রায়। তিনি প্রদীপকে বলেছিলেন, অভিনয়ের অ-ও তিনি জানেন না, তা ছাড়া তাঁর হিন্দি ভীষণ খারাপ। প্রদীপ দমে যাওয়ার পাত্র নন। অরুন্ধতীকে আশ্বস্ত করে বললেন, ওই চরিত্রের নাম শৈলা আর তাঁর কোনো সংলাপ নেই। গল্পটি সংক্ষেপে অরুন্ধতীকে শোনালেন। চিত্রনাট্যটি হাতে ধরিয়ে দিলেন। বাড়ি গিয়ে ভালোভাবে ভেবে দেখতে অনুরোধ করলেন।
অভিনয়ের প্রস্তাবটি নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বললেন অরুন্ধতী রায়। সেই বন্ধু তাঁকে রাজি হয়ে যেতে বললেন। তিনিও ‘দেখি না কী হয়’ মনে করে রাজি হয়ে গেলেন। এভাবেই ১৯৮৪ সালে ‘ম্যাসি সাহেব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জগতে পা রাখেন অরুন্ধতী রায়। ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য না পেলেও সমালোচকদের মন জয় করেছিল।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়েছিল। সিনেমার নায়ক ও পরিচালক উভয়েই দেশ-বিদেশে নানা পুরস্কার পেয়েছিলেন।
প্রদীপের বন্ধুরা মিলে প্রযোজনা সংস্থা করেন। তখন অরুন্ধতী রায়কে তাঁদের সঙ্গে কাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি গল্পের খসড়া তৈরি করতে শুরু করেন।
২৬ পর্বের একটি ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য লিখেন তিনি। নাম—‘বারগদ’। খুব উৎসাহ নিয়ে শুটিং শুরু করেন, তবে টাকার অভাবে মাঝপথে সব থেমে যায়। সেই ধারাবাহিক আর কখনো আলোর মুখ দেখেনি।
এরপর অরুন্ধতী রায় ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোস ওয়ানস’ নামের (১৯৮৯) একটি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেন। সেখানে তিনি অ্যানি নামের চরিত্রে অভিনয় করেন। সেটার সঙ্গে অবশ্য তাঁর নিজের জীবনের মিল ছিল। অ্যানি স্থাপত্যবিদ্যার একজন, কিন্তু সেটা ছেড়ে তিনি লেখালেখির জগতে ঢুকে পড়েন।
এই সিনেমার জন্য সেরা চিত্রনাট্য বিভাগে অরুন্ধতী রায় সেবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এ ছাড়া অন্য ভাষার (ভারতের সংবিধানে উল্লিখিত ভাষা ছাড়া) সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও পেয়েছিল এটি, যা অরুন্ধতী রায়ের কাছে ‘প্রিয়তম পুরস্কার’। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেরও সুনাম কুড়িয়েছিল ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোস ওয়ানস’।
অরুন্ধতী রায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের একটি বর্ণনাও দিয়েছেন তাঁর বইয়ে। সেখানে তিনি লিখেছেন, অনুষ্ঠানটি ছিল গুরুগম্ভীর ও জাঁকজমকপূর্ণ।
মূলধারার চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালকসহ সবাই চমকপ্রদ পোশাকে হাজির। রাষ্ট্রপতি আর ভেঙ্কটারামন পুরস্কার তুলে দিচ্ছিলেন। যখন অরুন্ধতীর ডাক এল, তিনি মঞ্চে যাচ্ছেন পুরস্কার নেওয়ার জন্য; তখন এক আমলা তাঁর পোশাক দেখে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। বলেছিলেন, পোশাকবিধি করতে হবে। কারণ, তিনি প্রতিদিনের সাধারণ পোশাক পরে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন।
অরুন্ধতী রায়ের জন্ম ১৯৬১ সালে, ভারতের শিলংয়ে। শৈশব কাটিয়েছেন কেরালায়। স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ালেখা করেছেন। তবে লেখালেখিতেই তাঁর মন ও খ্যাতি। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর জন্য বুকার পুরস্কার পান। সাহিত্যের বাইরে তিনি যুক্ত আছেন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার আন্দোলনে। কাশ্মীর, নর্মদা আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী রাজনীতি—এসব বিষয়ে তাঁর প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত।
প্রদীপ ও অরুন্ধতী মিলে আরেকটি সিনেমা বানানোর উদ্যোগ নেন। নাম—‘ইলেকট্রিক মুন’ (১৯৯২)। এই সিনেমার জন্য ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল ‘চ্যানেল ফোর’ তাদের টাকা দিয়েছিল।
‘মাদার মেরি কামস টু মি’ বইয়ে অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, তিনি এই চিত্রনাট্য মাথা দিয়ে লিখেছেন, মন দিয়ে নয়। ভালোবাসার মতো কিছু এটাতে তিনি পাননি। অনেকটা টাকার প্রয়োজনে যুক্ত থাকার মতো ব্যাপার ছিল।
‘বিদেশি সিনেমা’ হিসেবে শুটিং করতে গিয়ে নানা দপ্তরের, কর্মকর্তাদের এত বাধাবিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছিল যে অরুন্ধতী রায় খুব বিরক্ত হন। ছন্দে ফিরতে তিনি নিজের জন্য লিখতে শুরু করেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, লিখতে তাঁর খুব ভালো লাগছে। সিদ্ধান্ত নিলেন, সিনেমাজগতে আর না। তিনি শুধু লিখবেন, যা ইচ্ছা হবে তা-ই লিখবেন।
একদিন বেড়াতে এসে অরুন্ধতী রায়ের লেখার খাতা পড়ে মুগ্ধ হলেন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সানডে’র সম্পাদক। তিনি সেই লেখা নিয়ে নিজের কাগজে ছাপালেন। এভাবেই ১৯৯২ সালে প্রথম কোনো কাগজে তাঁর লেখা প্রকাশিত হলো। ওই বছরই তিনি ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন।
পরের বছর ১৯৯৭ সালে এটি প্রকাশিত হলে হইচই পড়ে যায়। অরুন্ধতী রায় এই বইয়ের জন্য বুকার পুরস্কার পান। লেখালেখির পাশাপাশি ক্রমশ অধিকারকর্মী হিসেবে নানা কাজে জড়িয়ে পড়তে থাকেন তিনি।
তাঁর জীবন থেকে সিনেমাজগৎ একেবারেই হারিয়ে যায়। আসলে কী তাই! বরং উল্টো করে বলা চলে, সিনেমার জগতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, স্থপতি নন, অভিনেত্রী নন কিংবা চিত্রনাট্যকারও নন; তিনি শুধু লেখক হতে চেয়েছেন।
![]() |
| অরুন্ধতী রায়। ছবি: প্রথম আলো |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1419)
-
▼
July
(222)
-
▼
Jul 26
(8)
- ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও...
- ইরানের ‘খাইবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্রেই কুপোকাত যুক্ত...
- ইরানের হামলার শিকার হওয়ার পরও কেন মার্কিন উপস্থিতি...
- প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কাতেই কি ...
- সিআইএ ঘাঁটিতে ইরানের হামলা: রাশিয়া যেভাবে ‘কলকাঠি’...
- মার্কিন গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতে টান, ইরান...
- অরুন্ধতী রায় অভিনয় করতেন, পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র ...
- বারান্দা ও বাগানের টবে বিটরুট ফলাবেন যেভাবে by এম ...
-
▼
Jul 26
(8)
-
▼
July
(222)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment