মার্কিন হামলা প্রতিহত ও পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম ইরান

সিএনএন-এর বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা নবম রাতের মতো বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলতে থাকলেও, তেহরান দেখিয়ে দিচ্ছে, তারা মার্কিন সামরিক শক্তির আঘাত প্রতিহত করার পাশাপাশি কার্যকর ও প্রাণঘাতী পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জর্ডান ও ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর অন্তত তিন সদস্য নিহত, একজন নিখোঁজ এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

পেন্টাগন এখন পর্যন্ত নিজেদের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। তবে তেহরানের দাবি, তাদের হামলায় বহু মার্কিন ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে এবং বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গারসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সেতু, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে, তখন কুয়েত ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতির মুখে পড়ছে। এসব দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রতিদিনের বিবৃতিতে জানিয়ে আসছে যে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতেই হামলা অব্যাহত রয়েছে।

তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোতে এখনো প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র এবং কয়েক হাজার ড্রোন মজুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও স্বীকার করেছেন যে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা সম্ভব হবে না।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আপনি তাদের ওপর বোমা ফেলতে পারেন, রাডার ধ্বংস করতে পারেন, কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো তাদের জন্য এখনো খুবই সহজ।

সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনারাও ইরানের হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং সেই ঝুঁকি ইতোমধ্যেই প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।

এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দেশটির স্থলবাহিনী আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং ক্রমাগত অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো অনুপ্রবেশ তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম।

আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর অব্যাহত সতর্কতা এবং সর্বক্ষণিক প্রস্তুতিই দেশের টেকসই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এই প্রস্তুতি সব ধরনের অপারেশনাল খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বজায় রাখা হচ্ছে।

আইআরজিসির স্থলবাহিনীর উপ-কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুহুল্লাহ নুরি বলেন, ইরানি বাহিনী এমন অবস্থানে রয়েছে যে শত্রুপক্ষের যেকোনো অনুপ্রবেশ মুহূর্তের মধ্যেই নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারবে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘন করায় ইরান আর ওই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে না বলেও জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেন, অন্য পক্ষ শুধু চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থই হয়নি, বরং এর শর্ত ও মূল চেতনারও লঙ্ঘন করেছে। আমরাও ঘোষণা করেছি যে আমরা আর এটি বাস্তবায়ন করব না। বিষয়টি সম্পূর্ণ পরিষ্কার।

তিনি বলেন, চুক্তিটি ইরানের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য পারস্পরিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করায় তেহরানের পক্ষে চুক্তি বাস্তবায়ন বাস্তবিক অর্থেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র আবার আলোচনার প্রস্তাব দিলে ইরান কী করবে এমন প্রশ্নের জবাবে বাঘায়ি ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

তিনি বলেন, যেভাবে যুদ্ধ ইরানের স্বার্থ রক্ষার একটি উপায়, ঠিক সেভাবেই আলোচনা-আলোচনাও সেই লক্ষ্য অর্জনের আরেকটি মাধ্যম। 

হরমুজ প্রণালিতে ইরানি সেনাদের নজরদারি। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে ইরানি সেনাদের নজরদারি। ছবি: সংগৃহীত