Wednesday, March 4, 2026
বোমার আগুন কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ঘরেই লাগবে by আজিজ হক
বোমার আগুন কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ঘরেই লাগবে by আজিজ হক
কারণ, এই হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের সীমা, সাংবিধানিক কর্তৃত্ব, তথ্যের সত্যতা—সবই রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কাছে গৌণ হয়ে উঠছে। একবার যদি এই দরজা খুলে যায়, তা হলে সহিংসতার সেই নজির আর কেবল বিদেশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা কে দেবে? আমেরিকানদের, আর যারা বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের আমেরিকার বন্ধু বলে মনে করে, তাদের শুধু আজকের ‘খারাপ’ শত্রুকে আক্রান্ত দেখে খুশি হলে চলবে না। তাঁদের ভাবতে হবে আজ যে শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, কাল সেটা কার বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে?
যে প্রেসিডেন্ট তথ্য বা আইনের ধার ধারেন না, তাঁর হাতে এই ক্ষমতা থাকলে বিষয়টি চিন্তার হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশে কোনো স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ এক কথা। কিন্তু একই ক্ষমতা যদি দেশের ভেতরে নিজের বিরোধীদের ‘দেশের শত্রু’ বলে দমন করতে ব্যবহার করা হয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এখন সেই আশঙ্কাও সামনে চলে এসেছে।
ঘটনাচক্র কখনো কখনো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। যেদিন তেহরানের মাটিতে বোমা পড়তে শুরু করল, সেদিনই ওয়াশিংটন পোস্ট জানাল, হোয়াইট হাউস নাকি খুব শিগগির একতরফা নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারে, যাতে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কে, কখন, কীভাবে ভোট দেবে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট নিজের হাতে টেনে নিতে পারেন। যুক্তি? উত্তর হলো জাতীয় নিরাপত্তা; বিশেষত কথিত চীনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কা। লক্ষ্য? উত্তর হলো এমন বিধিনিষেধ আরোপ, যা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য প্রকাশ্যে বলেননি, তিনি এমন আদেশ দিতে চলেছেন। কিন্তু কয়েক দিন আগে দেওয়া তাঁর স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ইরান আক্রমণের পরিকল্পনাও তিনি গোপন রেখেছিলেন। ফলে অস্বীকারের রাজনৈতিক ভাষা দিয়ে বাস্তব সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার ওপর সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে, এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের প্রলোভন বাড়তেই পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা জেরিম্যান্ডারিংয়ের (জেরিম্যান্ডারিং হলো নির্বাচনী সীমান্ত বা কংগ্রেসিয়াল/ভোটকেন্দ্রের সীমানা এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করা, যাতে রাজনৈতিক সুবিধা একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর জন্য নিশ্চিত করা যায়) চেষ্টাও যে খুব সফল হয়েছে, তা নয়। টেক্সাসে রিপাবলিকানদের সীমানা-কারচুপি ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা আক্রমণের মুখে থমকে যায়। এমনকি প্রবল রিপাবলিকান ঘাঁটি ইন্ডিয়ানাও নিজেদের রাজ্যে নতুন করে সীমানা সাজাতে অনীহা দেখায়। এর সঙ্গে যদি সামনের মাসগুলোতে শেয়ারবাজারে বড়সড় সংশোধন বা ধস নেমে আসে, তা হলে হোয়াইট হাউসের ওপর নির্বাচনী ‘অলৌকিক ঘটনা’ ঘটানোর চাপ বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই।
কিন্তু সংবিধান কী বলে? মার্কিন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ স্পষ্ট জানায়, কংগ্রেসীয় নির্বাচনের নিয়ম নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে, যদিও কংগ্রেস তা অতিক্রম করতে পারে। প্রেসিডেন্টের হাতে একতরফাভাবে ডাকযোগে ভোট নিষিদ্ধ করা বা বাধ্যতামূলক ভোটার পরিচয়পত্র চালু করার ক্ষমতা নেই। রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত ‘সেভ অ্যাক্ট’-এ ভোটার আইডির কথা থাকলেও তা এখনো আইন হয়ে ওঠেনি। তা হলে উদ্বেগ কোথায়? উদ্বেগ এই যে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ঐতিহাসিকভাবে ঢিলেঢালাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইরানে হামলার ঘটনাই তার উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান আন্তর্জাতিক সংঘাত শুরু করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসকে দিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদ একতরফা শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে, তবু আইনি কর্তৃত্বের ঘাটতি হামলা ঠেকাতে পারেনি।
ইরানে হামলার পক্ষে ট্রাম্প যে যুক্তি দেখিয়েছেন, তা নিউইয়র্ক টাইমস–এর ভাষায় ‘প্রমাণহীন ও অতিরঞ্জিত’। আরও সরাসরি বললে, প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন, তিনি দায়মুক্তভাবে মিথ্যা বলতে পারেন এবং সেই মিথ্যার ভিত্তিতে শত বা সহস্র প্রাণহানির ঝুঁকি নিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন। এ এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। আর এই প্রবণতা কেবল পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিস্তৃত ক্ষমতার দাবি কীভাবে ঘুরিয়ে দেশের ভেতরেও প্রয়োগ করা যায়।
ইরান-সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় (যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না), তা হলে বোমাবর্ষণ ও পাল্টা হামলার আবহকে সামনে রেখে নতুন দেশি বিধিনিষেধ আরোপের যুক্তি তৈরি করা আরও সহজ হবে। জাতীয় নিরাপত্তার জরুরি অবস্থা একবার ঘোষিত হলে, তা প্রায়ই ক্ষমতার প্রসার ঘটায়, সংকোচন নয়। আজ জাতীয় নিরাপত্তার ছুরি ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকদের দিকে তাক করা। তাঁদের প্রতি সহানুভূতি না থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—রাষ্ট্রীয় শক্তি দূরের শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করাকে আমরা স্বাগত জানাই, কিন্তু সেই শক্তিই একদিন আমাদের দিকে ঘুরে আসতে পারে।
প্রশ্ন তাই ইরানকে ঘিরে নয়, প্রশ্ন আমেরিকার গণতন্ত্রকে ঘিরে। বোমা কি শেষ পর্যন্ত বাইরের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তার প্রতিধ্বনি একদিন ভোটকেন্দ্র, আদালত ও শহরের রাস্তায়ও শোনা যাবে? সেই আশঙ্কাই আজ সবচেয়ে বড় ‘ব্লো-ব্যাক’।
* আজিজ হক, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বোমা হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের সামনে ইরানের পতাকা। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1435)
-
▼
March
(202)
-
▼
Mar 04
(8)
- বোমার আগুন কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ঘরেই লাগব...
- ঠিক এই সময়ে কেন ইরানে হামলা, কী চায় ইসরায়েল
- ইউক্রেনের পর এবার মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আতঙ্ক ছড়াচ্ছ...
- কাশ্মীর নিয়ে ইরান কীভাবে ভারতকে বাঁচিয়েছিল by সৌম্...
- যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শিক্ষা দেয়ার’ হুমকি দেয়া কে এই আলি...
- ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদে’ যোগ দিতে মিত্রদের অনীহা কেন
- খামেনির হত্যা আগ্রাসনের চূড়ান্ত প্রতীক: সংঘাত বন্ধ...
- ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জের’ চেষ্টা যেভাবে উন্মোচিত হলো b...
-
▼
Mar 04
(8)
-
▼
March
(202)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment