Friday, October 10, 2025
ট্রাম্পকে যে কৌশলে বশে আনলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান by এলফাদিল ইব্রাহিম
ট্রাম্পকে যে কৌশলে বশে আনলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান by এলফাদিল ইব্রাহিম
এ বছর হোয়াইট হাউসে এটিই ছিল মুনিরের দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠক। কয়েক দশকের মধ্যে পাকিস্তানের কোনো সেনাপ্রধান এমন সুযোগ পাননি। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর এ সাক্ষাৎ ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত। একসময়ের অবিশ্বস্ত ও সমাজচ্যুত দেশ থেকে আঞ্চলিক অংশীদার মর্যাদায় পাকিস্তানকে পুনর্বাসন।
ট্রাম্প সেই একই প্রেসিডেন্ট, যিনি তাঁর প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানকে প্রকাশ্যেই কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন, দেশটি ‘মিথ্যা ও প্রতারণা ছাড়া’ কিছু দেয়নি।
পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দেওয়াও তিনি বন্ধ করেছিলেন। কিন্তু এখন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সম্পর্ক ঘুরে গেছে। বাইডেন প্রশাসনের সময় উপেক্ষার পাত্র হওয়া পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্ব এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের এ মোড় পরিবর্তন নতুন কোনো মূল্যবোধ বা বড় কোনো কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে হয়নি; বরং এটি এমন কিছু কার্যকর পদক্ষেপের ওপর নির্মিত হয়েছে, যেটা সরাসরি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মোহাম্মদ শরিফুল্লাহর গ্রেপ্তার। তিনি ২০২১ সালে কাবুলে অ্যাবি গেট বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে অভিযুক্ত। ওই হামলায় মার্কিন ১৩ সেনা নিহত হয়েছিলেন। গত মার্চে সিআইএর তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে আটক করে।
ট্রাম্পের জন্য এটি ছিল মার্কিন জনগণের সামনে পরিষ্কার বিজয় দেখানোর মতো একটি ঘটনা। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খলভাবে সরে আসার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যে ব্যর্থতাবোধ তৈরি হয়েছিল, তার বিপরীতে এ গ্রেপ্তার ছিল একটা সাফল্য।
দ্বিতীয়টি ছিল ট্রাম্পের অহংবোধকে বুঝে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেটা খুশি করার কৌশল। মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ বন্ধের পর ইসলামাবাদ অতি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপকে শান্তি স্থাপনের কারণ হিসেবে স্বীকার করে।
নয়াদিল্লি যদিও ট্রাম্পের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান চতুরতার সঙ্গে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। একজন নেতা যিনি পররাষ্ট্রনীতিকে ব্যক্তিগতভাবে নেন, তাঁর জন্য তোষামোদ হলো খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতোই ব্যাপার।
তৃতীয়ত, এখানে অর্থনৈতিক মধুও আছে। পাকিস্তানের বিরল খনিজ ও তেল অনুসন্ধান থেকে শুরু করে ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রকল্প—সবকিছুর জন্য চুক্তি করা হচ্ছে।
ট্রাম্প তাঁর নিজের বক্তব্যে বলেছেন, পাকিস্তানে ‘বিশাল তেলের মজুত’ রয়েছে। কিন্তু তাঁর এ দাবি জ্বালানিবিশেষজ্ঞদের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকেছে। ট্রাম্পের এ বক্তব্য যতটা ভূতত্ত্ব বা জ্বালানিসংক্রান্ত, তার চেয়ে বেশি নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব–সম্পর্কিত ইঙ্গিত।
যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদকে (১৯ শতাংশ) ভারতের (৫০ শতাংশ) সঙ্গে তুলনায় অনেক কম শুল্ক ধার্য করেছে। মনে করা হচ্ছে পাকিস্তানের সম্পদ ব্যবহারে যুক্তরাষ্টের প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য এই আমেরিকান আলিঙ্গন দেশটিকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সুরক্ষা দেয়। এটি ইসলামাবাদকে ওয়াশিংটন বিরক্ত হবে কি না, এ ভয়ের বাইরে বেরিয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাসী ভূ-অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করার সুযোগ করে দেয়।
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্প্রতি প্রতিরক্ষা চুক্তি (আগের যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন যেটিকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখত) করেছে পাকিস্তান। এটা সম্ভব হয়েছে পাকিস্তানের নেতৃত্ব হোয়াইট হাউসের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়ায়।
এই নতুন স্বাধীনতা পাকিস্তানকে একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ দেয়। ফলে পাকিস্তান বিশ্বের এমন বিরল দেশের একটি, যারা বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে সমন্বয় করতে পারে।
সাম্প্রতিক সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্কের ঐতিহাসিক স্বাভাবিক স্তরে ফিরে যাওয়ার মতো। এ অংশীদারত্ব সব সময় সুবিধা ও সমস্যার মিশ্রণ হিসেবে ওঠানামা করেছে।
শীতল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত’। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার সম্পর্ককে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তখন পাকিস্তানকে সোভিয়েত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি দুর্গ হিসেবে দেখা হতো।
৯/১১–পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ‘সামনের সারির দেশে’ পরিণত হয়। কোটি কোটি ডলারের কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের বিনিময়ে পাকিস্তানের এ সহযোগিতা কেনা হয়েছিল। তবে ড্রোন হামলা এবং ২০১১ সালে অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনকে আবিষ্কারের ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সেই তিক্ত সম্পর্কের যৌক্তিক সমাপ্তি দেখা গিয়েছিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা বাতিল করেছিল। বর্তমান উষ্ণ সম্পর্কও সেই একই চক্রের ওঠানামা। যৌথ আদর্শের কারণে নয়; বরং নতুন পারস্পরিক স্বার্থের কারণেও সম্পর্ক আবার উষ্ণ হয়েছে।
পেন্টাগন ও ল্যাংলির (সিআইএর সদর দপ্তর) ঝানু কর্মকর্তারা ভালো করেই জানেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের রাস্তাটি হলো রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দপ্তর।
এমনকি যখন রাজনৈতিক সম্পর্ক চূড়ান্ত শীতল থাকে, তখনো দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক টিকে থাকে। মুনিরের বারবার যুক্তরাষ্ট্র সফর (প্রথমে জুনে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজ, তারপর সেন্টকম কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সর্বশেষ ওভাল অফিস) এ বাস্তবতারও স্বীকৃতি।
ওয়াশিংটনের জন্য সরাসরি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে কাজ করা সুবিধাজনক। কারণ, দেশটির প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে এটা সরাসরি যোগাযোগ। যদিও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের সমর্থকদের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
যাহোক যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের এ পরিবর্তন বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ২০ বছর ধরে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ ঐকমত্য ছিল যে চীনের উত্থানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে গণতান্ত্রিক ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করবে। পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক সহযোগিতা সেই নীতিকে উল্টে দিয়েছে।
রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতের ওপর শুল্ক চাপানো এবং মে মাসের সংঘাতে পাকিস্তানের পাশে হোয়াইট হাউসের দাঁড়ানোর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের মিত্রকে ক্ষুব্ধ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় নরেন্দ্র মোদি সাত বছরের মধ্যে প্রথমবার চীন সফর করেন।
যাহোক, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এখন চুপচাপ করে সম্পর্ক মেরামত এবং একটি বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
হোয়াইট হাউসের কাছে আপাতত ইসলামাবাদের নেতারা ‘খুব দারুণ মানুষ’ হতে পারেন। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, এই রোলারকোস্টারে পরের ঢাল খুব কাছেই।
* এলফাদিল ইব্রাহিম, একজন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
![]() |
| ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে শেহবাজ শরিফ ও আসিম মুনির। ছবি : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1426)
- ▼ 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment