Tuesday, January 6, 2026
দুর্ভিক্ষ দূর হলেও গাজাবাসীর ক্ষুধার কষ্ট দূর হয়নি
দুর্ভিক্ষ দূর হলেও গাজাবাসীর ক্ষুধার কষ্ট দূর হয়নি
চার মাস আগে আইপিসি জানিয়েছিল, গাজা উপত্যকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে। সংখ্যায় প্রায় ৫ লাখ ১৪ হাজার মানুষ। ইসরায়েল তখন সেই মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছিল। এবার নতুন প্রতিবেদনে আইপিসি বলছে, দুর্ভিক্ষের শর্ত পূরণ না হলেও গাজার পরিস্থিতি এখনো ‘গুরুতর ও সংকটাপন্ন’। যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয় এবং মানবিক ও বাণিজ্যিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো গাজাই আবার দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, দুর্ভিক্ষ আপাতত ঠেকানো গেছে। কিন্তু এই অর্জন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজন বাড়ছে এমন গতিতে, যা সহায়তার দিয়ে সামলানো যাচ্ছে না।
গাজার সব কটি প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢুকছে, যার ৭০ শতাংশই খাদ্যসামগ্রী। হামাস এই দাবি মানতে চায় না। তাদের বক্তব্য, দিনে ৬০০ ট্রাক তো দূরের কথা, তার চেয়ে অনেক কম ঢুকতে পারছে। শুক্রবার আইপিসির মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে কোগাট অভিযোগ করে, প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহে বড় ফাঁক রয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানায়, প্রতিবেদনে দেখানো সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি সহায়তা গাজায় যাচ্ছে এবং জুলাইয়ের পর থেকে সেখানে খাদ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে ত্রাণ সংস্থাগুলো বারবার বলছে, গাজায় প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা এখনো খুবই কম এবং অনেক জরুরি সামগ্রী ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলের দাবি, খাবারের ঘাটতি নেই; সমস্যা হচ্ছে গাজার ভেতরে বিতরণব্যবস্থায়।
আইপিসি মনে করিয়ে দিয়েছে, গত ১৫ বছরে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে এমন দুর্ভিক্ষ বিশ্বে ঘটেছে মাত্র পাঁচটি। ২০১১ সালে সোমালিয়া, ২০১৭ ও ২০২০ সালে দক্ষিণ সুদান, ২০২৪ সালে সুদান এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের আগস্টে গাজা। কোনো অঞ্চলকে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে হলে অন্তত ২০ শতাংশ মানুষকে চরম খাদ্যসংকটে থাকতে হয়, প্রতি তিন শিশুর একজনকে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে হয় এবং প্রতিদিন প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত দুজনকে অনাহার বা অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যেতে হয়।
শুক্রবারের প্রতিবেদনে আইপিসি বলেছে, বর্তমানে গাজার কোনো এলাকাই আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ শ্রেণিতে নেই। তবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে নিয়মিত, বিস্তৃত ও নিরবচ্ছিন্ন মানবিক এবং বাণিজ্যিক সহায়তার ওপর। দুর্ভিক্ষের মানদণ্ড পূরণ না হলেও আইপিসি ‘বিপর্যয়কর পরিস্থিতি’ নির্ধারণ করতে পারে। এমন জায়গার জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি নির্ধারণ করা হয়, যেখানে পরিবারগুলো চরম খাদ্যাভাব, অনাহার এবং অপুষ্টি ও মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
এ মুহূর্তে গাজায় এক লাখের বেশি মানুষ এমন বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইপিসি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ এই সংখ্যা কমে প্রায় ১ হাজার ৯০০-এ নামতে পারে। তবে পুরো গাজা উপত্যকাই এখনো ‘জরুরি’ পর্যায়ে রয়েছে, যা বিপর্যয়কর অবস্থার ঠিক এক ধাপ নিচে।
গাজায় শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। আইপিসির হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক বছরে গাজায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১ লাখ ১ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগবে এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ৩১ হাজারের বেশি হবে মারাত্মকভাবে অপুষ্ট। একই সময়ে ৩৭ হাজার গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীও তীব্র অপুষ্টির শিকার হবেন।
দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালে চিকিৎসকেরা শঙ্কায় আছেন ৪ বছরের আরজওয়ান আল-দাহিনি ও ছয় বছরের ইয়াসের আরাফাতকে নিয়ে। দুজনই মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, ক্ষুধার সবচেয়ে ভয়ংকর স্তরে আছে এরা। আরজওয়ানের মা হানিন বলেন, খাবারের সংকটে মেয়েটি হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছে, বেড়ে ওঠা থেমে গেছে এবং শরীরের প্রায় অর্ধেক ওজন কমে গেছে। ইয়াসের আরাফাতের ভাই ইতিমধ্যেই অপুষ্টিতে মারা গেছে বলে জানান চিকিৎসক আহমেদ আল-ফাররা। তাঁর বাবা নিজেও অসুস্থ ও অপুষ্ট, আর মা ইমান বলেন, পরিবারটি ডিম বা অন্য কোনো উচ্চ প্রোটিন খাবার কিনতেই পারছে না।
গাজার আল-শিফা হাসপাতালের প্রধান মোহাম্মদ আবু সেলমিয়া জানান, অপুষ্টি এখনো ব্যাপক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষায় ছয় হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় এক হাজার অপুষ্টিতে ভুগছে, যার মধ্যে ১০০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির গাজা ও পশ্চিম তীরের প্রধান কর্মকর্তা আন্তোয়ান রেনার্ড বলেন, উন্নতির কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এখন গাজার বেশির ভাগ মানুষ দিনে দুই বেলা খাবার পাচ্ছে। কিন্তু গাজায় সহায়তা প্রবেশ সহজ করা এখনো ‘নিরন্তর সংগ্রাম’। জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, ইসরায়েল যদি বাধা না তোলে, তবে মানবিক কার্যক্রম ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গুতেরেস আবারও বলেন, টেকসই যুদ্ধবিরতি ছাড়া সমাধান নেই। আরও প্রবেশপথ খুলতে হবে, জরুরি সামগ্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলতে হবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে, গাজার ভেতরে নিরাপদ চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে, স্থায়ী অর্থায়ন দরকার এবং বাধাহীন প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটি সতর্ক করে বলেছে, এই অগ্রগতিকে যেন সংকট শেষ হয়ে গেছে বলে ভুল না করা হয়। তাদের ভাষায়, গাজায় ক্ষুধা এখনো বিপর্যয়কর পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুত, পর্যাপ্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা না পেলে দুর্ভিক্ষ ও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঝুঁকি খুব দ্রুতই ফিরে আসতে পারে।
গাজায় দুর্ভিক্ষ হয়তো আপাতত দূর হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষুধা, অপুষ্টি আর অনিশ্চয়তা।
সূত্র: রয়টার্স
| ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করেছে ত্রাণবাহী ট্রাক। ফিলিস্তিনিরা সংগ্রহ করছেন জরুরি ত্রাণসহায়তা। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে। ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1402)
-
▼
January
(307)
-
▼
Jan 06
(12)
- ইরান কেন নিজের ‘সেরা লোকদের’ উপর চড়াও হয়েছে by ববি...
- চীনের পাতা ফাঁদে যেভাবে সরাসরি পা দিচ্ছেন স্টারমার...
- দুর্ভিক্ষ দূর হলেও গাজাবাসীর ক্ষুধার কষ্ট দূর হয়নি
- ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’: ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালিয়ে ...
- ট্রাম্প তাঁর ভূ-অর্থনৈতিক যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন by হ...
- ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর ট্রাম্পের নজর কেন, কী আছে সে...
- সৌদি আরব কি আদৌ পারমাণবিক অস্ত্র পাবে, কেন এতটা মর...
- সাবাহ’র নিবন্ধ: বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নিয়ে নতুন ...
- ভেনেজুয়েলার নতুন নেত্রীকে ট্রাম্পের সতর্কতা, মাদুর...
- ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের আড়াই দশক
- আমি নির্দোষ, আমি আমার দেশের প্রেসিডেন্ট: নিকোলা মা...
- জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষার উদ্যোগ -...
-
▼
Jan 06
(12)
-
▼
January
(307)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment