Thursday, October 9, 2025
ট্রাম্পের জামাই কুশনারের ধোঁকা, শান্তির আড়ালে দেশ চুরির গল্প by রঞ্জন সলোমন
ট্রাম্পের জামাই কুশনারের ধোঁকা, শান্তির আড়ালে দেশ চুরির গল্প by রঞ্জন সলোমন
কুশনার ‘কিছুই জানেন না’ এমনটা ভেবে তাঁকে হালকাভাবে নেওয়াটা ভুল হবে। কারণ, তাঁর কাজের মধ্যে একটি বড় বিপদ লুকিয়ে আছে। ফিলিস্তিন ও আরব বিশ্বে মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতি প্রণয়নে কুশনারের ভূমিকা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়।
এটি সম্রাজ্যবাদের নতুন চেহারাকে প্রতিফলিত করে। এখানে ব্যক্তিস্বার্থ এবং অনির্বাচিত ও শক্তিশালী ব্যক্তির ওপর ভর করে কোনো কিছু অর্জন করা হয়। কুশনার আসলে স্বতন্ত্র কোনো ব্যক্তি নন; বরং তিনি এমন একটি ব্যবস্থার প্রতিনিধি, যে ব্যবস্থাটি কিনা বহুজাতিক রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ও রাষ্ট্রশক্তি মিলে জমি দখল, জনগণকে দমন এবং অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।
কুশনারের তথাকথিত ‘শতাব্দীর চুক্তি’ একটি আশ্চর্যজনক উন-পরিকল্পনা। তাঁর পরিকল্পনা হলো গাজার কিছু অংশকে ‘ভূমধ্যসাগরীয় সিঙ্গাপুর’ বা ‘গাজা রিভিয়েরা’ বানানো। প্রথম দৃষ্টিতে এটিকে দরিদ্র্য থেকে মুক্তির পরিকল্পনা বলে মনে হলেও বাস্তবে এটি ফিলিস্তিনিদের জমি ও অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রকল্প। ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজের জমিতে কম বেতনের সেবাকর্মী হিসেবে নিয়োজিত হবে আর বিনিয়োগকারী ও বিদেশি সরকার সেখান থেকে লাভ করবে।
এটি ডেভিড হার্ভের ‘সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে পুঁজি’ বানানোর ধ্রুপদি উদাহরণ। মানুষের কষ্টকে লাভে পরিণত করা। কুশনারের স্লোগানটি হলো ‘গাজা রিভিয়েরা: খোলা আকাশের কারাগার থেকে পর্যটকদের খেলার মাঠ’।
উপনিবেশিত আফ্রিকার ‘মডেল গ্রাম’ বা দখলকৃত কাশ্মীরের ‘উন্নয়ন করিডরের’ মতো, ‘গাজা রিভিয়েরা’ও দখলের নান্দনিক রূপের প্রদর্শন। এটি আধুনিকতার আড়ালে সার্বভৌমত্ব চুরি করা। এটি কোনো বাস্তব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; বরং সভ্যতার জন্য অপমান।
কুশনার আব্রাহাম চুক্তিকে ‘শান্তি’ অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন; কিন্তু বাস্তবে এই চুক্তি হলো আরব প্রতিরোধকে দুর্বল করার, ফিলিস্তিনকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের দখলদারি স্বাভাবিক করার একটি পরিকল্পনা। রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায়, এটি হলো অভিজাত শাসক ও বিদেশি শক্তির মধ্যকার একটি চুক্তি।
এখানে অভিজাত শাসকেরা দেশের মধ্যে বৈধতা হারানো সত্ত্বেও বিদেশি শক্তির কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানকে এমন চুক্তিতে টেনে আনা হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিদের কোনো লাভই হয়নি। বরং আরব লীগ ও ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগ দুর্বল হয়ে গেছে।
এটি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একুশ শতকের সংস্করণ। এখানে সরাসরি সামরিক শক্তির সাহায্যে কোনো দেশে দখলের বদলে, যুক্তরাষ্ট্র এমন চুক্তি চাপিয়ে দেয় যেখানে অভিজাত শাসকেরা জনগণের রাজনীতিকে দমন করে বাজার, জমি ও অন্যান্য সুবিধা বিদেশি শক্তির কাছে তুলে দেয়। তবে এ ধরনের চুক্তি সব সময়ই নড়বড়ে হয়। কারণ, স্বৈরশাসকেরা চিরকাল জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না।
কুশনারের দল শুধু জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর করেনি; তারা মানচিত্রও বদলিয়েছে। গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর সেটিকে ‘ট্রাম্প মালভূমি’ নাম দেওয়া হয়। কুশনারের নীতি হলো ফিলিস্তিনকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা এবং বসতি স্থাপনকে স্বাভাবিক করা। আইন ব্যবহার করে মানুষের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া। এই নীতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
আরব সার্বভৌমত্বের ওপর দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা যুদ্ধের একদিন অবসান হবে। এটা অবশ্যই হবে। ১৯৫০-এর দশকে সিআইএর প্ররোচনায় অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ পর্যন্ত মার্কিন নীতি সব সময়ই ছিল স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ আরব শক্তি তৈরি হওয়া রোধ করা। কুশনারের পরিকল্পনা সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ।
বিনিয়োগ অঞ্চল, প্রযুক্তি হাব এবং আধুনিকীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আরব অভিজাতদের একটি শ্রেণি তৈরি করছে, যারা পশ্চিমি মূলধনের সঙ্গে যুক্ত। এর বিপরীতে সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ কারণেই এই চুক্তিগুলো নড়বড়ে। এই চুক্তিগুলো ওপরের দিক থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, নিচ থেকে আলোচনার মাধ্যমে এগুলো সম্পাদিত হয়নি।
যে আরব তরুণেরা গাজা ধ্বংস এবং জেরুজালেম অবরুদ্ধ হতে দেখেছেন, তাঁরা ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্যে’র গল্পে বিশ্বাস করছেন না। আমরা আরব বসন্ত দেখেছি। এটাই জেনারেশন জেডের কাজের ধরন। হয়তো সময় লাগবে; কিন্তু একদিন তাঁরা ঠিকই আশ্চর্যজনক কিছু ঘটাবে। আরব শাসকেরা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে জেন-জিরা ডিজিটাল প্রজন্ম। অন্যায্যতার গভীর স্মৃতি তারা বহন করছে। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন কমানোর ব্যাপারেও তাঁরা সচেতনতা অর্জন করেছেন।
তাঁরা ফিলিস্তিনকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে তাঁরা নিজেদের বঞ্চনার প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। বিংশ শতাব্দীর মধে৵র সময়টার উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের মতো করে এই প্রজন্মও একটি নতুন রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে।
কুশনারের প্রকল্প শুধু জমি ও তেলের জন্য নয়। তাঁর প্রকল্পের মূল বিষয় হলো—একটি করপোরেট ও উপনিবেশবাদী সভ্যতা। এটি পবিত্র শহর থেকে শরণার্থীশিবির পর্যন্ত সবকিছুকে ব্যবসার পণ্য হিসেবে দেখো। যুক্তরাষ্ট্র দেশটি আদিবাসীদের থেকে চুরি করা জমির ওপর গড়ে উঠেছে। দেশটি ২২৫টি যুদ্ধে জড়িত হয়েছে। কিন্তু কখনো সত্যিকার অর্থে ন্যায়যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেনি; বরং দেশটি দক্ষ হয়ে উঠেছে ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে। প্রান্তবর্তী অঞ্চলগুলোকে বিশৃঙ্খলার ময়দানে পরিণত করে যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে সম্পদের দুর্গে রূপান্তর করে চলেছে। এ জন্য মার্কিন সাম্রাজ্য নৈতিকভাবে দুর্বল। তাত্ত্বিকরা বলেন, এমন শাসনব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর রাজনীতি চালায়। এখানে সভ্যতার ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে।
এর সবটাই বিভ্রম। এই বিভ্রম একদিন ভেঙে যাবে। ট্র্যাজেডি হলো, এই ব্যবস্থা পতনের আগে ফিলিস্তিনি এবং অন্য আরবদের প্রচণ্ড কষ্ট ভোগ করতে হবে; কিন্তু পতন আসবেই। কারণ, কোনো ‘চুক্তি’ যতই চমকপ্রদ হোক না কেন, সেটি সেই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে না যে জনগণকে তাদের ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। কুশনারের পরিকল্পনা শান্তির ছদ্মবেশে এক বড় চুরির অংশ। মানুষ এটিকে চুরি হিসেবেই মনে রাখবে ও প্রতিরোধ করবে।
* রঞ্জন সলোমন, ভারতীয় রাজনৈতিক ভাষ্যকার
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
| জারেড কুশনার ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
October
(199)
-
▼
Oct 09
(9)
- গাজার ভবিষ্যৎ কেমন হবে?
- নোবেলজয়ী ওমারের জন্ম ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারে
- যেমন করে হলো গাজা শান্তিচুক্তি: জাতীয় অধিকারের প্র...
- ‘আল-আকসার মালিক এখন ইসরাইল’
- গাজায় দুই বছর ধরে নৃশংসতা: একদিকে আলোচনা, অন্যদিকে...
- যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র দিলে ‘গণতন্ত্র’, ইরান ড্রোন দি...
- ট্রাম্পের জামাই কুশনারের ধোঁকা, শান্তির আড়ালে দেশ ...
- গাজার হাসপাতালে হত্যাযজ্ঞ ও পশ্চিমা দ্বিচারিতা by ...
- আফগানিস্তানের বাগরাম ঘাঁটি ইস্যুতে ট্রাম্পের বিরুদ...
-
▼
Oct 09
(9)
-
▼
October
(199)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment