Tuesday, October 21, 2025
জুলাই সনদের ভূত–ভবিষ্যৎ by মহিউদ্দিন আহমদ
জুলাই সনদের ভূত–ভবিষ্যৎ by মহিউদ্দিন আহমদ
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে ১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশ নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করে এবং আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র নামে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করে। তারা কেন স্বাধীনতা চাইছে, এই ঘোষণাপত্রে তার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আমেরিকার এই পালাবদলের এক দশক পরে ইউরোপে পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে যায়। রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রথম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ফ্রান্সে। ফরাসি বিপ্লবের মূল ঘোষণাপত্রে ছিল মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের অঙ্গীকার, যা ১৭৮৯ সালের ২৬ আগস্ট প্রকাশিত হয়। এই দলিলে ফরাসি জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সব মানুষের সহজাত, অবিচ্ছেদ্য ও সর্বজনীন অধিকারগুলোর উল্লেখ ছিল, যেমন স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী। ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার আন্দোলনের ওপর যুগান্তকারী প্রভাব ফেলে। আমেরিকার সংবিধান ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ফরাসি বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
অনেকটা আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আলোকেই লেখা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, যা প্রথম পাঠ করা হয় ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। কী কারণে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হলো, তার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে ফরাসি বিপ্লবের আদলে ঘোষণা করা হয় রাষ্ট্রের মূলনীতি—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার।
এতগুলো উদাহরণ দিলাম এ জন্য যে ওপরের তিনটি দেশে ঘোষিত লক্ষ্য ওই দেশের নাগরিকেরা অর্জন করেছেন। সেসব দেশে জনগণের সরকার আছে। তারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। সেখানে উন্নতি ও সমৃদ্ধির খবর আমরা রাখি। আমরা সেসব দেশে আমাদের সন্তানদের পাঠাতে পারলে স্বস্তি পাই।
আমরা আমাদের দেশটা গোছাতে পারিনি। এখানেই প্রশ্ন, আমরা কেন পারিনি? আমরা কেউ গাল দিই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে, কেউ মন্দ বলি পাকিস্তানি শাসকদের, কথায় কথায় আলোচনায় আনি মীর জাফর। মীর জাফর মরে ভূত হয়ে গেছে আড়াই শ বছর আগে। কোম্পানির শাসন শেষ হয়েছে ৭৮ বছর আগে, পাকিস্তানের থাবা সরে গেছে ৫৪ বছর হলো। তারপরও আমাদের কেন এই ব্যর্থতা, কেন এত আক্ষেপ, কেন এই হতাশা? আর কতকাল আমরা অতীতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজেদের আড়াল করে রাখব? আমাদেরই তো সবকিছুর দায় নিতে হবে।
অনেক আশা নিয়ে দেশটা স্বাধীন হলো। গুটিকয় পরিবার ছাড়া স্বাধীনতার জন্য সবাই মূল্য দিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ফল পকেটে পুরেছে কিংবা আঁচলে বেঁধেছে হাতে গোনা কিছু পরিবার ও গোষ্ঠী। আমরা গণতন্ত্র চাই, নাকি সমাজতন্ত্র, নাকি খেলাফত—এ নিয়ে এখনো বাহাস করি। ১৭ কোটি মানুষের কাঁধে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসেছে গুটিকয় অলিগার্ক, যারা নিজ নিজ ডকট্রিন নিয়ে আস্ফালন করছে। সেখানে শুধু তারাই আছে, মানুষ নেই। মানুষ এখানে কখনো কামানের খোরাক, কখনো ক্ষমতায় আরোহণের কাঁচামাল।
রাজনৈতিক দলের সিন্ডিকেট আর ব্যক্তিশাসনের বিরুদ্ধে ইতিহাসে একবারই এ দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এককাট্টা হয়েছিল। ১৯৯০ সালে আমরা পেয়েছিলাম একটি সনদ, যেটি ‘তিন জোটের রূপরেখা’ নামে পরিচিত। সেখানে কী ছিল? মূল কিছু দিক উল্লেখ করছি।
১. হত্যা, ক্যু, চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ধারা থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশে পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
২. একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সার্বভৌম জাতীয় সংসদ গঠনের ব্যবস্থা করা।
৩. গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ রাখতে রেডিও-টেলিভিশনসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমকে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করা।
৪. জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে অসাংবিধানিক কোনো পথে ক্ষমতা দখল প্রতিরোধ করা।
৫. জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
৬. মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সব আইন বাতিল করা।
৭. ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা ও অপর দলের দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকা, সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং সাম্প্রদায়িক প্রচারণা সমবেতভাবে প্রতিরোধ করা (সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)।
প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। দলগুলোর মধ্যে আন্তরিকতার অভাব ছিল। প্রধান দুই দলের দুই নেত্রী এই সনদে সই দেননি। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন বৃথা যায়। আমরা ফিরে যাই আগের অবস্থায়। সাংঘর্ষিক রাজনীতির পটভূমিতে জন-আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে ২০০৭ সালে আসে এক-এগারো। সেটিও মুখ থুবড়ে পড়ে বছর না যেতেই। তারপর আমরা এ দেশের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম স্বৈরশাসকের দেখা পাই, যার তুলনা আছে কেবল মধ্যযুগে।
এই জগদ্দল পাথরকে রুখে দেয় চব্বিশের জুলাই আন্দোলন। আমরা দেখা পাই নতুন এক ডিজিটাল প্রজন্মের—জেনারেশন জেড। এদের বয়স ১৩ থেকে ৩০। এদের অস্ত্র মুঠোফোন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, সমাজসচেতনতা, দেশের প্রতি ভালোবাসা আর মৃত্যুভয় জয়ের অদম্য সাহস। আমরা মাও সে-তুংয়ের লেখায় পড়েছি, একটি স্ফুলিঙ্গ কীভাবে বিরাট একটি দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। আমরা সেটি দেখলাম চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে, যা ‘৩৬ জুলাই’ তারিখটিকে ইতিহাসে স্থান করে দিয়েছে। কিন্তু তারপর?
এখানে এসেই আমরা বারবার হোঁচট খাচ্ছি। আমাদের এখানে ১৯৪৯ সালের চীন কিংবা ১৯৫৮ সালের কিউবার আদলে পালাবদল হবে না। পরিবর্তনের একটি মডেল কখনোই আরেকটি মডেলকে হুবহু অনুসরণ করে না। এখানে ড্রয়িংরুম বিহারি কিছু শৌখিন স্বপ্নবিলাসী ছাড়া সম্ভবত সবাই বহুদলীয় সরকারব্যবস্থা চান।
কিন্তু আমরা সাড়ে পাঁচ দশক ধরে এমন একটা ব্যবস্থার চর্চা করেছি, যেটি নাগরিকের শাসনকে টেকসই করার দিকে যায় না। বরং পয়দা করে ‘নমরুদ’। এ থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায়? আমরা তো কারও ভাষণ কিংবা ইশতেহারে আস্থা রাখতে পারছি না? সে জন্য দরকার একটি চুক্তি, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নাগরিকদের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দেবে। তিন জোটের রূপরেখার পরিণতি দেখার পর লিখিত অঙ্গীকারের মাধ্যমে একটি সনদের দাবি উঠেছে। এটাই হচ্ছে প্রস্তাবিত জুলাই সনদের পটভূমি।
জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব আছে, যার মধ্যে যে ৪৭টি সংবিধান-সম্পর্কিত, এগুলো করবে নির্বাচিত সংসদ। যেসব প্রস্তাবে দলগুলোর ভিন্নমত আছে, প্রস্তাবের পাশেই সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সাত দফা অঙ্গীকারনামা, যার তৃতীয় দফায় বলা হয়েছে, এই সনদের বৈধতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে দলগুলো কোনো আদালতে প্রশ্ন তুলবে না। আর অঙ্গীকারনামার শেষ দফায় বলা হয়েছে, জুলাই সনদে ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত যেসব সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য, অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে।
অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োজিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর জুলাই সনদের চূড়ান্ত খসড়া তাদের কাছে পাঠিয়েছে ১৪ অক্টোবর। আজ এই সনদে তাদের সই দেওয়ার কথা। কিন্তু শেষ সময়ে এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে গোল বেধেছে।
এই মতভেদ দূর করার জন্য হাতে খুব বেশি সময় নেই। কয়েকটি বাম দল এরই মধ্যে সনদে সই না করার ঘোষণা দিয়েছে। কিছু দলের অবস্থান এখনো অস্পষ্ট। এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নানামুখী চাপ আছে। কারণ, জুলাই সনদ প্রশ্নে কোনো কোনো দলের অবস্থানের যৌক্তিক দিক আছে। আবার কোনো কোনো দল হয়তো ঘোঁট পাকাচ্ছে। আমরা দেখি, শেষ পর্যন্ত আজ কী হয়।
* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1399)
- ▼ 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment