Friday, September 19, 2025
অচলাবস্থা কাটাতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধতা অন্তর্বর্তী সরকারের আছে by সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন
অচলাবস্থা কাটাতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধতা অন্তর্বর্তী সরকারের আছে by সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন
আইনের চিন্তাভাবনার ভেতরও (অস্ট্রিয়ান-আমেরিকার জুরিষ্ট ও আইন বিশারদ হান্স কেলসনের ‘পিউর থিওরি অব ল’ বা গ্রুন্ডনর্ম) আইনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে সাধারণের বৈধতার ভাবনা স্বীকৃত। সরকার পতনের পর নতুন সাংবিধানিক কাঠামো সৃষ্টির বৈধতাকেও এই তত্ত্ব স্বীকৃতি দেয়। ব্রিটিশ আইন তাত্ত্বিক এইচ এল এ হার্টের ‘রুল অব রিকগনিশন’—আরও বলে যে রাষ্ট্রের সব অঙ্গের প্রতিনিধিরা যদি কোনো শাসককে মেনে নেয়, তবে সেই শাসন বৈধ। তার মানে, রাষ্ট্রের সব অঙ্গের নিয়ন্ত্রণ যে শক্তি নিতে পারবে, সেই শক্তিই বৈধ।
এই দুই ধারণা ধর্তব্যে নিলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৈধতা পেতে সংবিধানের প্রয়োজন ছিল না। তারা জন-আন্দোলন থেকে তৈরি বলে সরকার হিসেবে তারা স্বয়ম্ভূ। যদি তারা সংবিধানের ১০৬ ধারার মাধ্যমে সাংবিধানিক পরম্পরা বজায় রাখতে চেষ্টা করে থাকে, তবে সেটা ছিল তাদের মর্জি। সেটা করার কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের ছিল না। হাইকোর্টের নির্দেশনা নয়, আইনের মৌলিক ভিত্তিবলেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তখন যেমন বৈধ ছিল, এখনো বৈধ।
শেখ সাহেবকে হত্যা করার পর ফারুক বা রশিদরা ক্ষমতা নেননি কারণ, তাঁরা জানতেন, সামরিক বাহিনীর ওপর তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই অতএব দেশের মানুষের সম্মতি পাওয়ার কোনো উপায় তাঁদের নেই। এই অবস্থায় তাঁদের দেশের মানুষের সম্মতি এবং সেনাবাহিনীর সম্মতি আদায় করতে খন্দকার মুশতাককে ক্ষমতায় বসাতে হয়। একই কারণে কর্নেল তাহেরের অভ্যুত্থানের পর বিদ্রোহীরা সক্রিয় থাকায়, উপসামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সামনে রাখার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর জিয়া প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে যান এবং পরে সায়েমের অবসরের পর রাষ্ট্রপতি হতে তাঁর আর কোনো বাধা থাকে না।
জিয়াউর রহমানের বৈধতা নিয়ে যতটুকু প্রশ্ন বাকি থাকে, সেটাও সমাধান করেন সাজানো হ্যাঁ/ না ভোট দিয়ে। ইতিহাস নিশ্চয়ই সেই গণভোটকে জিয়ার বৈধতার উৎস বলে মনে করে না। তাঁকে আবার কেউ অবৈধও বলে না। অবৈধ না বলার কারণ, আমার মতে, ডকট্রিন অব নেসেসিটি নয়, বরং রুল অব রিকগনিশনের জন্য বলে না। ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদলের নাটকে সাংবিধানিক বৈধতা খুব কম অঙ্কেই ভূমিকা রাখে, বরং সংবিধানই দেখা যায় নাটকের নায়ককে অনুসরণ করে।
জুলাই অভ্যুত্থান সাংবিধানিক পথে হয়নি, সে জন্য তার সাংবিধানিক ভিত্তি খুঁজে বের করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অভ্যুত্থানকারীরা জানতেন যে সেনাবাহিনীর কিছু অংশও তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তেমনি সেনাবাহিনীও জানত যে তাদের সমর্থনের গণভিত্তি খুবই দুর্বল। শক্তির এই ভারসাম্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সৃষ্টি। সৃষ্টির পর সাংবিধানিক প্রশ্নের বোঝাপড়ায় এবং সমাজের পণ্ডিতদের চাপে ১০৬-এর মাধ্যমে তাদের বৈধতার সিল দিতে বিচার বিভাগের মতামত চাওয়া হয়। লক্ষণীয় যে সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পরই বৈধতার প্রশ্নের মীমাংসা চাওয়া হয়েছে। আমার মতে, এই প্রক্রিয়া একাডেমিক কারণ, আওয়ামী দলদাস এবং উপদেষ্টারা নিজেরা ছাড়া তত দিনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে দেশের মানুষের এবং প্রশাসনের নিরঙ্কুশ সমর্থন এসে গিয়েছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইচ্ছা করলে নতুন সংবিধান তৈরি করতে কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি তৈরি করতে পারত বা ইচ্ছা করলে সাংবিধানিক পরম্পরা রক্ষা করার একটা উপায় বের করতে পারত আবার কিছু না করে দুদিন পর নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণাও দিতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যত দিন জনপরিসরে তাদের বৈধতা আছে, তত দিন তারা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। তাদের কাজ যত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং বিশেষত রাষ্ট্রের সব অঙ্গের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ যত দুর্বল বলে প্রকাশ পাচ্ছে, ততই তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে। সে জন্যই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এখন আমাদের সামনে।
এই সরকার এই দেশের নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝে চলার চেষ্টা করছে এবং সেই লক্ষ্যেই তাদের কাজ সাজানোর চেষ্টা করছে। জন-অসন্তোষ থেকে বাঁচার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটা সাংবিধানিক পরম্পরায় নিজেদের যুক্ত করতে চেষ্টা করেছে। জন-আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দেওয়ার জন্যই তারা ঐক্য কমিশন সৃষ্টি করে গণতান্ত্রিকভাবে সব রাজনৈতিক দলকে যুক্ত করে সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি করেছে।
একই জন-আকাঙ্ক্ষাকে মাথায় রেখে বাস্তবায়নের পথও তারা খুঁজে নিতে পারে। সংস্কার প্রস্তাবের মতো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও গণতান্ত্রিকভাবে খুঁজে নেওয়ার প্রক্রিয়া এখন চলমান। এই প্রক্রিয়ায় যদি ঐকমত্যে না পৌঁছাতে পারে, তবে তাদের বুঝতে হবে যে নেতৃত্ব মানে শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পালন করা নয়। দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাদের যে দায়িত্ব দিয়েছে, তাতে অচলাবস্থা নিরসনের জন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধতা তাদের আছে। শুধু খাস নিয়তের বিষয়ে আপস না করলেই হবে।
খাস নিয়ত নিয়ে ভাবলে বাস্তবায়নের সীমারেখাগুলো কী হবে, সেটা তারা নিজেরাই পেয়ে যাবে। ঐক্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব দেখলে কোন প্রস্তাব সর্বোত্তম, সেটা আরও পরিষ্কার হবে। তারা নিজের মনের ভেতর খুঁজলেই দেখবে যে রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপন দিয়ে সংবিধানের পরিবর্তন করলে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার হবে। গণভোট ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির জন্য হুমকি হলেও তারা বুঝতে পারবে যে সেটা জন-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে যাবে। আবার দেখবেন, সংবিধানের ১০৬ ধারা ব্যবহার করে আপিল বিভাগ দিয়ে আগামী সংসদকে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চাপ দেওয়ার চেষ্টার পক্ষেই ঐক্য কমিশনে সমর্থন বেশি। গণপরিষদ করে সংবিধান নতুন করে লেখার ঝুঁকি এই প্রস্তাবে নেই। সনদে লেখা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাবনা যেমন এই প্রস্তাবে বেশি, তেমনি নতুন সংসদ নির্বাহী দায়িত্ব নিয়ে দেশকে নিরাপদ করার বিষয়ও এই প্রস্তাবে সংযুক্ত।
ঐক্য কমিশনের সভায় এটা পরিষ্কার যে সভার পরিসমাপ্তিতে কমিশন কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে না এবং তারা কেবল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ রাখবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি তার বৈধতা এবং দায়িত্বের প্রতি সজাগ থাকে, তবে তাদেরই সেই প্রস্তাব থেকে একটা পদ্ধতি বেছে নিতে হবে। দেশের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে দেশের মানুষ সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে।
* সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের একজন কর্মী hasibh@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ছবি: সংগৃহীত |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
- ► 2026 (1523)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
September
(221)
-
▼
Sep 19
(6)
- মালয়েশিয়ায় হালাল পণ্যের মেলায় প্রাণের ৫০০ পণ্য by ...
- দলিত জনগোষ্ঠীকে আর কত পিছিয়ে রাখা হবে by ফারাহ্ কবির
- দুবাইয়ে বিকৃত যৌন ব্যবসা চক্রের প্রধানকে চিহ্নিত ক...
- অচলাবস্থা কাটাতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধতা অন্...
- এক পরিবারের অ্যাকাউন্টে ৮ হাজার কোটি টাকা লেনদেন b...
- বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের ‘গেমপ্ল্যান’টা কী by হাসান ফে...
-
▼
Sep 19
(6)
-
▼
September
(221)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment