বাংলাদেশের ছাত্র সংসদ নির্বাচন আঞ্চলিক রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে

ডেইলি সাবাহ’র প্রতিবেদনঃ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও তুলনামূলকভাবে হস্তক্ষেপমুক্ত এসব নির্বাচনে রক্ষণশীল ছাত্র প্যানেলগুলোর ব্যাপক বিজয় দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থাকা পছন্দ-অভিরুচিকে সামনে এনেছে।

দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত ক্যাম্পাসগুলোতে এবার ব্যালট বাক্স ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের আদর্শ হঠাৎ করেই বদলে গেছে- শুধু এ কারণেই এই নির্বাচনগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক পরিসরে, যেখানে দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক পছন্দ তুলনামূলক স্বাধীনভাবে প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে জাতীয় রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সমীকরণ, কূটনৈতিক হিসাব ও নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রভাবিত। আগের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরই ছাত্র সংসদগুলো ভিন্ন পরিবেশে কার্যক্রম শুরু করে। যেখানে প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রচার চালাতে পারেন, ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, এখন আর ক্ষমতাসীন দলের ছায়া ক্যাম্পাস রাজনীতির কোনো পক্ষকে সুরক্ষা দেয় না।

ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে ছাত্র সংসদ কখনোই প্রান্তিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে ক্যাম্পাস ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব গঠনের প্রশিক্ষণভূমি। ছাত্র সংসদ কার্যকর থাকলে তা তরুণদের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও বৈধতার বিষয়ে মূল্যায়নের প্রতিফলন ঘটায়।

সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য ক্ষয়ে যায়। ছাত্র সংগঠনগুলো প্রধান রাজনৈতিক দলের শাখায় পরিণত হয়ে পৃষ্ঠপোষকতা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো অনুকরণ করতে থাকে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত থাকে। ফলে ছাত্র রাজনীতি প্রতিনিধিত্বের বদলে ক্রমে জবরদস্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এটিকে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার নয়, বরং সীমিত পরিসরে নির্বাচন ব্যবস্থার আংশিক প্রত্যাবর্তন হিসেবেই দেখা হয়। অংশগ্রহণ ছিল অসম, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রার্থীতা ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন অধিকাংশ পদ দখল করে। নব্বইয়ের দশক থেকে কার্যত নিষিদ্ধ থাকা ইসলামী ছাত্রশিবির তখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে ছিল।

পরবর্তী সময়ের নির্বাচনগুলো সেই ধারা ভেঙে দেয়। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সব বড় ছাত্র গোষ্ঠী প্রকাশ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর—একাধিক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূমিধস বিজয়। বিশেষ করে ডাকসুতে ফলাফল নজর কেড়েছে, যা দীর্ঘদিন বাম ও জাতীয়তাবাদী ধারার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।

এই পরিবর্তনের নানা ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন দমন হওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতিক্রিয়া, কেউ আস্থা সংকট বা সংগঠনিক সক্ষমতার কথা তুলছেন। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে অংশগ্রহণ। শিক্ষার্থীরা ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেন ভোটের মূল্য আছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রার্থীদের মূল্যায়ন হয়েছে আচরণ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে। চাপের মুখে তারা কেমন ছিলেন, ভয়ভীতি ছাড়াই সংগঠিত হতে পেরেছেন কি না, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে দৈনন্দিন ছাত্র সমস্যা মোকাবিলা করতে পারবেন কি না, এসব প্রশ্নই মুখ্য হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ফলাফল ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানের চেয়ে বাস্তব আস্থার প্রতিফলন হিসেবেই ধরা পড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও এসব নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় যেখানে জাতীয় নির্বাচন নানা নিয়ন্ত্রণ ও দূরবর্তী শক্তির প্রভাবে পরিচালিত হয়, সেখানে ক্যাম্পাস রাজনীতি অনেক সময় পরিবর্তনের আগাম ইঙ্গিত দেয়। মুখোমুখি নেতৃত্বের পরীক্ষা হয়, ব্যর্থতা ঢাকার সুযোগ কম থাকে।

আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাও তাই বলে। ভারতে ছাত্র রাজনীতি বহুবার জাতীয় জোট বদলের আগাম সংকেত দিয়েছে। পাকিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে ক্যাম্পাস আন্দোলন আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়—মূলধারার রাজনৈতিক পথ সংকুচিত হলে ছাত্র পরিসরেই প্রথম বৈধতার পরীক্ষা হয়।

এতে ধরে নেয়ার কারণ নেই যে ক্যাম্পাসের বিজয় সরাসরি জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। ছাত্র নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়। তবে এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উন্মোচন করে- রাষ্ট্রের বাইরে কে সংগঠিত হতে পারে, জবরদস্তি ছাড়া কে আস্থা অর্জন করে, আর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে কে বৈধতা পায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন ভবিষ্যৎ বলে দেয় না, তবে বর্তমানকে স্পষ্ট করে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির গতিপথ বুঝতে এই বার্তাকে উপেক্ষা করা কঠিন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201938_sdgh.webp

No comments

Powered by Blogger.