Wednesday, June 15, 2022
দ্বিজেন শর্মা : কবি ও বিজ্ঞানী by মশিউল আলম
দ্বিজেন শর্মা : কবি ও বিজ্ঞানী by মশিউল আলম
পাথারিয়া
পাহাড়ের কোলে বিস্ময়ের কুয়াশায় জেগে উঠেছিল এক খোকা, যখন নিকড়ি নদীটি খুব
চঞ্চল ছিল। সে-খোকার মুখদর্শন করতে এসে বুড়োবুড়িরা উপহার দিয়েছিল রুমাল :
লাল নীল সবুজ হলুদ বেগুনি কমলা – বিচিত্র সব রং। স্বপ্নের মতো রঙিন সেইসব
রুমাল সুতায় বেঁধে খোকার দোলনায় ঝুলিয়ে রেখেছিল তার সবচেয়ে বড় দিদি।
খোকা একটু বড় হয়ে দিদির কাছে শুনবে, দোলনা দুলত আর হাওয়ায় দোল খেত নানা রঙের রুমালগুলি, তাই দেখে শূন্যে হাত-পা নাচাত খোকা। তার কচি মুখখানা সব সময় অনাবিল হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকত।
পরে দিদি আরো বলবে, জন্মের সময় খোকা কাঁদেনি। পৃথিবীতে তার প্রথম চিৎকার ছিল আনন্দধ্বনি।
এসব কথা শুনে খোকা শুধু আপনমনে হাসবে, কিছু বলবে না।
তার দিদি আরো পরে বলবে, খোকা স্বপ্নের মধ্যে হেঁটে বেড়াত। শীতের এক পূর্ণিমা রাতে স্বপ্নের ঘোরে সে হেঁটে হেঁটে গিয়েছিল নদী দেখতে।
খোকা ভেবে দেখবে, দিদির ভুল হয়েছে; স্বপ্নের ঘোরে হেঁটে বেড়ানোর অভ্যাস ছিল বড় দাদা প্রভাতের। খোকার এই ভাইটি নিকড়ি নদীটিকে খুব ভালোবাসত। শীতকালের নিকড়ি ছিল তার বিশেষ প্রিয়। রাতের এক প্রহর ঘুমিয়ে সে উঠে পড়ত, তারপর ভূতগ্রসেত্মর মতো ছুটে যেত নদীকে দেখতে।
বাবা বলতেন, ‘প্রভাত, রাতের বেলা ঘোরাঘুরি করিও না। সাপে কাটিবে।’
বাবা ছিলেন বিখ্যাত কবিরাজ, অখ্যাত কবি। চন্দ্রকান্ত শর্মা ছিল তাঁর নাম, লম্বা দাড়ি ছিল মুখে। নিজেকে নিয়ে তিনি এরকম পদ্য রচনা করেছিলেন :
চন্দ্রকান্ত কবিরাজ মুখে লম্বা দাড়ি
ঔষধের ডিবি লৈয়া বেড়াইন বাড়ি বাড়ি।
পান-তামাক দিলে তিনি কিছু নাহি খাইন
সুন্দরী রমণী দেখলে আড়নয়ানে চাইন \
বাবার ছিল ছটি ছেলেমেয়ে আর ছিল অনেক ফুলগাছ, আম-কাঁঠালের গাছ আর বনৌষধি। লোকে বলত কবিরাজ ঠাকুর। পৌষ-মাঘের শীতে খালি গায়ে ঘুরে বেড়াতেন; খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছেলেমেয়েদের ডাকতেন, ‘এই উঠো উঠো, গাছে জল দাও।’
গাছগুলো ছিল নবীন, গরু-ছাগলের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের ঘিরে রাখা হতো ‘হুপি’ দিয়ে; চিকন চোঙের মতো হুপিগুলো ছিল খোকার চেয়ে লম্বা, খোকা বদনা ভরে জল নিয়ে জলচৌকির ওপর দাঁড়িয়ে তাদের গায়ে জল ঢেলে দিত।
গাছের চারাদের গায়ে জল ঢেলে দিতে দিতে খোকা বড় হবে, পাঠশালায় যাবে; কিন্তু বশোই খোকার মতো পাঠশালা যাবার বয়েসি হয়েও পাঠশালা যাবে না, সে চুরি করে আনবে মরিচমার্কা সিগারেট। খড়ের গাদার আড়ালে বসে বসে তারা মরিচমার্কা সিগারেটে আগুন ধরাবে, খোকা দুই টান দিয়ে বেদম কাশবে আর বলবে, বশোই, এটা ভালো না, সিগারেট খেতে নেই। কিন্তু বশোই জামগাছে উঠে মরিচমার্কা সিগারেট খেতে খেতে বড় হয়ে যাবে, তারপর শিমুলগাছে চড়ে পাখির বাচ্চা ধরে নিয়ে আসবে, সেই পাখির বাচ্চার গায়ে সাদরে হাত বোলাতে বোলাতে খোকা বলবে, ‘তুই বড় হ, ওই আকাশে উড়ে চলে যা…।’
স্থবির গাছেদের দেখে খোকার মনে বিস্ময় জাগেনি, প্রথম জেগেছিল পাখি দেখে।
পাখি নিয়ে তাঁর মা এই ছড়াটি বলতেন :
কাঁঠালগাছে দেখছি দুটো হলদে
পাখির ছানা
মায়ের মুখে খাচ্ছে আধার নাড়িয়ে
দুটি দানা।
সেই থেকে খোকা হলদে পাখির ছানা খুঁজে খুঁজে হয়রান। সঙ্গে বশোই, যে বশোই খুব দুষ্টু, যে মরিচমার্কা সিগারেট চুরি করে এনেছিল। তারপর ছেলেবেলার সেই খেলার সাথি কখন অজান্তে হারিয়ে গেছে, কিন্তু অশীতিপর বয়সেও সেই হারিয়ে যাওয়া কৈশোর মাঝে মাঝেই ফিরে আসত। তিনি আমাকে সেসব গল্প বলতেন, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর খন্দকারের গলির ভাড়া বাসায়। গত শতকের ষাট দশক থেকে তাঁর কেটেছে এই খন্দকারের গলিতেই, প্রথমে খন্দকার মঞ্জিল নামের এক দোতলা বাড়িতে, তারপর ক্রিস্টাল গার্ডেন নামের বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভাড়া বাসায়।
------দুই------
তাঁর জন্ম ব্রিটিশ ভারতের সিলেট জেলার মৌলভীবাজারের বড়লেখার শিমুলিয়া গ্রামে, ১৯২৯ সালের ২৯ মে। নাম রাখা হয় দ্বিজেন্দ্র শর্মা। বাবা চন্দ্রকান্ত শর্মা ছিলেন ওই অঞ্চলের বিখ্যাত ভিষক, তাঁর বাড়িটি আজো কবিরাজ বাড়ি বলে পরিচিত। মায়ের নাম ছিল মগ্নময়ী দেবী। তাঁদের সন্তান ছিল ছয়জন : প্রভাতকুমার শর্মা, মৃণালিনী দেবী, বলরাম শর্মা, প্রভাবতী দেবী (মিঠু), দ্বিজেন্দ্র শর্মা (খোকা) ও সন্ধ্যারানী দেবী (খুকি)। দ্বিজেন্দ্র ছিলেন তাঁদের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র।
খোকার পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন সেখানকার পিসি হাইস্কুলে। নবম শ্রেণিতে উঠে ভর্তি হন করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে, সে-সময় করিমগঞ্জ ছিল আসামের একটি মহকুমা। ভারতবিভাগের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে সেই স্কুল থেকেই তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তারপর করিমগঞ্জ কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কলেজটি তাঁর ভালো লেগে যায়; কিন্তু গুরুতর সমস্যা দেখা দেয় উচ্চতর গণিত নিয়ে। এই বিষয়টার মাথামুণ্ডু কিছুই তাঁর মাথায় ঢোকে না। কিন্তু গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত করিমগঞ্জ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চতর গণিত বাধ্যতামূলক। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখলেন, ত্রিপুরার আগরতলায় মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চতর গণিত বাধ্যতামূলক নয়। ওই কলেজ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। তিনি করিমগঞ্জ কলেজ থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে আগরতলায় গিয়ে মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে ভর্তি হলেন। সেখান থেকেই ১৯৪৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর মা তাঁকে বললেন, ‘কলকাতা যাও, ডাক্তারিতে ভর্তি হও।’
বহু বছর পরে সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দ্বিজেন শর্মা আমাকে বলেন, ‘আমার পিতামহ, পিতা, অগ্রজ সকলেই ছিলেন প্রখ্যাত ভিষক। আমারও তা-ই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমার মা সেটা চাননি। তিনি আমাকে আধুনিক চিকিৎসক বানাতে চেয়েছিলেন।’
মায়ের আদেশে তিনি কলকাতা গিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন কলকাতা পৌঁছেন তার আগের দিনই মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার শেষ সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়া তাঁর হলো না। ভর্তি হলেন বিএসসিতে, তা-ও নামী কোনো কলেজে নয়, কলকাতা সিটি কলেজে, এবং অনার্স ছাড়াই। এই প্রসঙ্গে তাঁর খেদোক্তি : ‘অনার্স যে নেওয়া যায়, আমার সে বুদ্ধিও ছিল না। গ্রাম থেকে কলকাতা গেছি, প্রেসিডেন্সি কলেজের নাম জানতাম না, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের নাম পর্যন্ত জানতাম না, এমনই গেঁয়ো ছিলাম।’
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তি হতে পারেননি বলে তাঁর কোনো আফসোস ছিল না। তিনি নিজের মুখেই বরং আমাকে বলেন, ‘ভালো যে ডাক্তারিতে ভর্তি হইনি। ভর্তি হলে সর্বনাশ হতো।’ কারণ, কলকাতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার আর্থিক সামর্থ্য তাঁর পরিবারের ছিল না, ভর্তি হতে পারলেও মাঝখানে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হতো। সিটি কলেজে পড়ার সময় তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ভালো ছিল না, কারণ মূলত আর্থিক। কলকাতায় তাঁর ভালো লাগত না, সবুজ রঙের ট্রেন পূর্ববঙ্গের দিকে যাচ্ছে – এমন দৃশ্য দেখলেই তাঁর বাড়ির কথা মনে পড়ত, আর বাড়ির কথা মনে পড়লে তিনি বিষণ্ণ হয়ে পড়তেন।
সিটি কলেজ থেকে ১৯৫২ সালে বিএসসি পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কলকাতা ত্যাগ করেন। বাড়ি ফিরে যান, তখন করিমগঞ্জ কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞানের একজন ডেমোন্স্ট্রেটর প্রয়োজন ছিল। তিনি সেই চাকরিটা পান। কিন্তু দেড় বছর চাকরি করার পর তাঁর একঘেয়ে বোধ হয়, তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মার্কসবাদী বইপত্র পড়া শুরু করেন। অবশ্য তাঁর মার্কসবাদের দীক্ষা ঘটে কলকাতা সিটি কলেজে পড়ার সময়ই। তখন বামপন্থি বইপত্র পড়েছিলেন প্রচুর। বাম রাজনীতির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় ও মেলামেশাও হয় অনেক। গড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে নেতাদের বক্তৃতা শুনতেন। একদিন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তৃতা শুনেছিলেন।
------তিন-----
বাড়িতে নিয়মিত পত্রপত্রিকা পড়া হতো। তাঁর বাবা ও বড় ভাই ছিলেন একাধিক সাময়িকপত্রের গ্রাহক। একদিন আজাদ পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন তাঁর চোখে পড়ে : বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ উদ্ভিদবিজ্ঞানের একজন ডেমোন্স্ট্রেটর চায়। তখন তিনি জানতেন না বরিশাল কোথায়। কোনো দিন বাংলার মানচিত্র খুলে দেখেননি। তাঁরা দেখতেন আসামের মানচিত্র। পত্রিকায় সেই বিজ্ঞাপন পড়ার পর খুলে বসলেন বেঙ্গলের ম্যাপ। দেখলেন, বরিশাল বঙ্গোপসাগরের কাছে। পাহাড়ের সন্তান কোনো দিন সমুদ্র দেখেননি। তাই ভীষণ উৎসাহের সঙ্গে দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টেলিগ্রাম চলে এলো : ‘আপনি অবিলম্বে এসে কাজে যোগদান করুন।’ তিনি বরিশাল গিয়ে সমুদ্র খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথায় সমুদ্র? বঙ্গোপসাগর বরিশাল থেকে অনেক দূরে। তবু তিনি আর বরিশাল থেকে ফিরে এলেন না। বরং জীবনানন্দ দাশের ওই শহরের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে উঠল। ১৯৫৪ সালে ব্রজমোহন কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ডেমোন্স্ট্রেটর হিসেবে যোগ দিলেন।
কিন্তু ডেমোন্স্ট্রেটরের কাজে তাঁর মন ভরেনি। যদিও হাতেকলমে উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়াতে তাঁর ভালো লাগত, তবু শুধু ব্যবহারিক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা একধরনের অসম্পূর্ণ কাজ বলে তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। তাঁর ইচ্ছে ক্লাসে লেকচার দেওয়ার। কিন্তু ডেমোন্স্ট্রেটরদের দায়িত্বের মধ্যে সেটা নেই। কলেজের প্রভাষক হতে হলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারী হতে হবে। তাই করিমগঞ্জ কলেজ ও বরিশালের বিএম কলেজে মোট চার বছর ডেমোন্স্ট্রেটরের চাকরি করার পর তিনি ঢাকা এসে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন, ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে। কিন্তু বিএম কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে চিরতরে হারাতে চায় না। তারা তাঁকে বলল, তিনি যেন মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার পরে আবার ওই কলেজে ফিরে যান। তাঁকে ফিরে পাওয়ার জন্য তারা একটা কৌশলও অবলম্বন করল : দ্বিজেন শর্মা যতদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবেন, ততদিন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ৫০ টাকা মাসোহারা দেবে।
১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর কোর্সে পড়াশোনা শুরু করার পর তাঁর মনোজগতে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যায়। উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে তাঁর নতুন উপলব্ধি জাগে। এই প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেন, ‘বিএসসি পাশ করার পর চার বছর চাকরি করে আমার ধারণা জন্মেছিল, আমি তো প্রচুর পড়াশোনা করেছি, আমি অনেক কিছু জানি, আর বিশেষ কিছু জানার দরকার নাই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে প্রথম জানলাম যে আমি কিছুই জানি না। শুধু বায়োলজি কেন, মার্কসবাদ, ইতিহাস, অর্থনীতি, সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি নানা বিষয়ে যে পড়াশোনা করেছি সেসব কিছুই নয়। এ ধরনের পড়া কোনো কাজেই লাগে না। ইউনিভার্সিটি এডুকেশন ইজ এ মাস্ট। তোমাকে অবশ্যই সিস্টেম্যাটিক্যালি পড়াশোনা করতে হবে, কোনো ডিসিপিস্ননে যেতে হবে।’
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করেন সত্যিকার অর্থে সিস্টেম্যাটিক পড়াশোনা। সে-সময় ঢাকায় অনেক বিদেশি বইপত্র পাওয়া যেত। একদিন তাঁর হাতে আসে এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি বিষয়ে আইরিশ এক ভদ্রলোকের লেখা ছোট্ট একটা বই। হ্যাসলফ হ্যারিসন নামের সেই ভদ্রলোক তখন ডাবলিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। বইটি পড়ে দ্বিজেন শর্মা বেশ আলোড়িত হন। এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি বিবর্তনবাদকে বর্তমান ধারায় প্রতিষ্ঠা করার একটা পদ্ধতি। তিনি আমাকে বলেন, ‘এটা আমাকে হন্ট করতে লাগল। আমি আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিতে হ্যারিসনের কাছে চিঠি লিখলাম। তিনি পাল্টা চিঠিতে আমাকে লিখলেন, তুমি এখানে চলে এসো। তখন আমি ঠিক করি, এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি পড়ব, আমি বিজ্ঞানী হব।’
তিনি মাস্টার্স শেষ করার পর আয়ারল্যান্ডে পিএইচ.ডি করতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের সঙ্গে বিভাগীয় প্রধানের দ্বন্দ্বের ফলে তিনি এমএসসিতে দ্বিতীয় শ্রেণি পেলেন। ফলে পিএইচ.ডি করার জন্য তাঁর আর বিদেশ যাওয়া হলো না। এ-বিষয়ে তাঁর খেদোক্তি : ‘এটাই আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিল।’
এ নিয়ে তাঁর মনে গভীর দুঃখ ছিল। আলাপের সময় কখনো কখনো সেই দুঃখ প্রকাশ পেত। তাঁর একাধিক লেখায়ও এই দুঃখের আভাস আছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনোর প্রায় দুই দশক পরে আশির দশকে মস্কো বসবাসকালে তিনি লন্ডন বেড়াতে যান। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ন্যাচারাল হিস্ট্রি বিভাগের হলঘরে ঢুকেই স্যার রিচার্ড ওয়েনের আবক্ষ মূর্তি দেখে মনে পড়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের কথা, এবং তিনি বিরক্ত হন। ‘গল্পবিজ্ঞান’ নামের ছোট্ট একটি লেখায় এই প্রসঙ্গটা আছে; নিজের দুর্ভাগ্য সম্পর্কে তৃতীয় পুরুষে তিনি লিখেছেন :
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে থিসিসের মালমশলা সংগ্রহকালে অমত্ম্যজ উদ্ভিদবর্গের একটি নতুন প্রজাতি সে খুঁজে পেয়েছিল। তার তত্ত্বাবধায়ক এই সাফল্যে শোরগোল তোলেন, বিভাগে হইচই পড়ে যায় এবং পরীক্ষা শেষে একটি প্রথম শ্রেণি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে সে স্বগ্রামে ফেরে। অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও গবেষণার স্বপ্নে মশগুল থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল এবং এই সুবাদে নিজেকে প্রাণের উৎসসন্ধানী এক বিজ্ঞানী বানিয়ে একটি চটকদার গল্পও লিখে ফেলেছিল। কাগজে গল্পটি ছাপা হলেও তার স্বপ্ন সফল হয়নি। তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে রেষারেষি কিংবা অবোধ্যতর কোনো কারণে বিভাগীয় প্রধান তার গলায় দ্বিতীয় শ্রেণির যে ঘণ্টিটি ঝুলিয়ে দেন, তাতে মধ্যযুগীয় কুষ্ঠরোগীর মতো গুহাবাস তার নিয়তি হয়ে ওঠে এবং মফস্বলের কলেজের বিবর্ণ প্রাত্যহিকতায় কালাতিপাত ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
এই প্রসঙ্গে আমি একবার তাঁকে বলেছিলাম, ‘আপনি যদি পিএইচ.ডি করতে আয়ারল্যান্ড চলে যেতেন, তাহলে আমরা সম্ভবত আপনাকে আর ফিরে পেতাম না। বাংলাদেশ আপনাকে হারাত। কারণ বিদেশের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি পিএইচ.ডি করতেন, তারা আপনার মেধা আর পড়াশোনা ও গবেষণায় একাগ্রতা দেখে আপনাকে আর ছাড়ত না। সারাজীবন আপনাকে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই অধ্যাপনা করতে হতো। আপনার আর শ্যামলী নিসর্গ লেখা হতো না, বাংলা ভাষায় হয়তো কোনো বই-ই আপনার লেখা হতো না। প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদক হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়া, সমাজতন্ত্রে বসবাস করা এবং সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লেখা হতো না। বই অনুবাদ করা হতো না, আপনার সুন্দর অনুবাদ থেকে বাংলা ভাষার পাঠকেরা বঞ্চিত হতো। তরুপলস্নবের মতো সংগঠন গড়ে তোলা হতো না।’
আমার কথা শুনে তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘তাই আমি আমার অতীত নিয়ে আফসোস করি না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর অনেক বন্ধুবান্ধব জুটে যায়। ওই সময় তিনি সিকান্দার আবু জাফর-সম্পাদিত সাময়িকপত্র সমকালে প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন ওই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক, তাঁর সঙ্গে দ্বিজেন শর্মার গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। হাসান হাফিজুর রহমানের পীড়াপীড়ির ফলেই তিনি সমকালের জন্য প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘শেষ গোলাপগুচ্ছ’ নামের স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন : ‘তখন সমকাল পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে। হাসান সহকারী সম্পাদক। ইতিপূর্বে আমি উলেস্নখ্য কিছুই লিখিনি। হাসানের ঈর্ষণীয় বন্ধুপ্রীতি, অনমনীয় জবরদস্তি আর অহেতুক প্রশংসার কল্যাণেই সাহিত্যের অঙ্গনে আমি প্রবেশাধিকার পাই। বলতে দ্বিধা নেই, হাসানের হাত ধরেই এ পথে আমার যাত্রা শুরু।’
সমকাল পত্রিকায় যেসব প্রবন্ধ লেখেন সেগুলোর বিষয়বস্ত্ত ছিল বিচিত্র-সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বিজ্ঞান পর্যন্ত। কয়েকটি প্রবন্ধের শিরোনাম উলেস্নখ করলেই তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে : ‘সংস্কৃতি বিচার’, ‘বঙ্কিম সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’, ‘লিসেন্কোর বংশগতিতত্ত্ব’, ‘তমসার শেষ অঙ্কে’ ইত্যাদি।
স্বাধীনতার পরে হাসান হাফিজুর রহমান মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস অ্যাটাশে হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৭৪ সালে দ্বিজেন শর্মা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে মস্কো গেলে তাঁদের সখ্য আরো নিবিড় হয়।
১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পর তিনি প্রতিশ্রম্নতি অনুযায়ী বরিশাল বিএম কলেজে ফিরে গিয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দ্বিতীয় শ্রেণি পাওয়ায় পিএইচ.ডি করতে বিদেশ যাওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার ফলে তাঁর মন সে-সময় ভীষণ খারাপ ছিল। তবে তখনো সব আশা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বরিশালে ফেরার পরেও তাঁর মনে আশা ছিল যে পিএইচ.ডি করার জন্য আয়ারল্যান্ডে অধ্যাপক হ্যারিসনের কাছে যাবেন।
কিন্তু গোল বাধাল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি : ইতিমধ্যে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তানের ক্ষমতার মসনদে বসেছেন। তারপর স্বৈরাচারী সরকার একটা শিক্ষানীতি ঘোষণা করে এবং সঙ্গে সঙ্গে সারা পূর্ববাংলাজুড়ে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের ঘোষিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রবল ছাত্র-আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। তিনি তখন বরিশাল বিএম কলেজের ছাত্র হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট, আন্দোলনরত ছাত্রদের সহযোগিতা করছেন এই অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে ধরতে যায়। তিনি পালিয়ে বরিশাল থেকে চলে যান মৌলভীবাজারের বড়লেখায় নিজের গ্রামে। সেখানে ও ময়মনসিংহের আত্মীয়বাড়িতে মাসতিনেক লুকিয়ে থাকার পর পরিস্থিতি থিতু হয়েছে ভেবে কলেজে ফিরে কাজে যোগদান করেন এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার ও কারাগারে নিক্ষেপ্ত হন। ফলে উচ্চতর শিক্ষার জন্য তাঁর বিদেশ যাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এই প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেন, ‘বাষট্টি সালে বরিশালে আমাকে সিকিউরিটি প্রিজনার হিসেবে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকিয়ে দিল। তারপর আইয়ুব খানের পাকিস্তানে আমার পক্ষে আর পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব ছিল না। আমি উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে ঠিক করলাম, বরিশালেই পিএইচডি করব বরিশাল ফ্লোরা (বরিশালের উদ্ভিদকুল) নিয়ে। কিন্তু সেখানে কোনো গাইড নাই। নিজেই নিজেই কিছু কাজ করলাম। জেল থেকে বেরিয়ে আমি আর বরিশালেই থাকিনি, ঢাকায় এসে নটর ডেম কলেজে যোগ দিলাম। ঢাকায় এসেই আমার ইচ্ছা হলো, ঢাকা শহরের গাছপালা নিয়ে লেখালেখি করব। মোটরসাইকেলে করে সারা ঢাকা চষে বেড়াতাম, গাছপালা দেখতাম।’
বরিশালে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের আগে ১৯৬০ সালের ২৭ নভেম্বর তাঁর বিয়ে হয় বরিশালবাসী আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তীর কন্যা দেবী চক্রবর্তীর সঙ্গে। দেবী চক্রবর্তী তখন বরিশাল বিএম কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। সেখানে ১৯৬১ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান সুমিত্র শর্মার (টুটুল) জন্ম হয়। দ্বিতীয় সন্তান শ্রেয়সী শর্মা (মুন্নী) জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭১ সালে।
------চার-----
১৯৬২ সালে বরিশাল ছেড়ে ঢাকা চলে আসার পর দ্বিজেন শর্মা কিছু সময় কায়েদে আজম কলেজ, সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজ ও বাংলা কলেজে শিক্ষকতা করেন। তারপর যোগ দেন নটর ডেম কলেজে। ওই কলেজের প্রাঙ্গণে অনেক গাছ লাগান, বাগান গড়ে তোলেন। তাঁর লাগানো কিছু গাছ এখনো ওই কলেজের প্রাঙ্গণে রয়ে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর প্রথম গ্রন্থ শ্যামলী নিসর্গ লেখেন। বাংলা ভাষায় এরকম বই এটাই প্রথম। এ-বইয়ের প্রকাশনা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আমাকে বলেন, ‘গাছপালার ছবি আঁকার জন্য পেয়ে গেলাম আঁকিয়ে গোপেশ মালাকারকে। বাংলা একাডেমীকে বললাম, তারা সঙ্গে সঙ্গে বইটা প্রকাশ করতে রাজি হয়ে গেল। শ্যামলী নিসর্গ-ই আমার প্রথম বই, এটাই এখনো পর্যন্ত আমার প্রধান বই, লোকে এখনও এটার কথা বলে।’ কিন্তু তিনি পাণ্ডুলিপি ১৯৬৫ সালে জমা দিলেও বাংলা একাডেমি বইটি প্রকাশ করে অনেক পরে, ১৯৮০ সালে।
শ্যামলী নিসর্গ লেখার সময়েই তিনি পপুলার সায়েন্সের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্পের আঙ্গিকে আরো দশ-বারোটা নিবন্ধ-প্রবন্ধ লেখেন। সে-লেখাগুলো নিয়ে আরো পরে প্রকাশিত হয় জীবনের শেষ নেই নামে আরেকটা বই।
ছাত্র পড়াতে তাঁর ভালো লাগত, বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল আরো বেশি। একবার তিনি আমাকে বলেন, ‘আমার মূল লক্ষ্য ছিল গাছপালা নিয়ে গবেষণা করব, বিজ্ঞানী হব, এবং এই ধারার লেখালেখি করব। তাই নটর ডেম কলেজে যোগ দেওয়ার কিছুকাল পরে অধ্যাপক নজরুল ইসলামের অধীনে ক্যারোফাইটা নিয়ে পিএইচ.ডি গবেষণা শুরু করি। মস্কো যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি সেটা চালিয়ে গেছি। আমি একজন বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার মনের গড়ন।’
রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। অবশ্য তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রবেশ করেননি, কিন্তু তাঁর বন্ধুবান্ধবদের অধিকাংশই ছিলেন বামপন্থি। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল।
কলেজে পড়ার সময় বামপন্থি বইপত্র পড়েছিলেন প্রচুর। বাম রাজনীতির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশাও হয়েছে কম নয়। সে-সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘ওটা ছিল বিদ্রোহের বয়স। তার ওপর দেশবিভাগের ফলে আমাদের পরিবারে দারিদ্র্য নেমে আসে। আমার সে সময়ের দারিদ্রে্যর অভিজ্ঞতা ভীষণ তিক্ত। ফলে আই ওয়াজ ভেরি অ্যাংরি। আমি প্রথম যে গল্পটা লিখেছিলাম, সেটার নাম ছিল কী, জানিস? ‘যে নদী মরুপথে’। এক গরিব ছাত্রের জীবনসংগ্রামের কাহিনি। যা হয় আর-কি। গল্পের আড়ালে নিজের দারিদ্রে্যর বয়ান। তার পরও কয়েকটা গল্প লিখেছিলাম। সেগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর কলকাতা পড়ার সময় আমি থাকতাম ব্যারাকপুরে। সেখানে বামপন্থিরা গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। আমি ‘সীমান্ত’ নামে একটা গল্প লিখি, সেটা ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে যায়। সো আই বিকেম পপুলার অ্যামং দেম। প্রচুর বন্ধুবান্ধব জুটে গেল।’
-----পাঁচ-----
১৯৭৪ সালে দ্বিজেন শর্মা সোভিয়েত ইউনিয়নের সুবৃহৎ পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে সপরিবারে মস্কো চলে যান। ফলে অ্যাকাডেমিক জগতের সঙ্গে তাঁর চিরতরে বিচ্ছেদ ঘটে যায়। অনুবাদের কাজ তাঁর ভালো লাগেনি, কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এ-কাজটি তাঁকে করতে হয়েছে। প্রগতি প্রকাশনের জন্য তিনি প্রায় ৪০টি বই ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ করতে ভালো না লাগলেও সোভিয়েত ইউনিয়নে তাঁর বসবাস আনন্দময় ছিল। তিনি মনে করতেন, তাঁর জীবনে এটা ছিল এক বিরাট সৌভাগ্যজনক ঘটনা। এ-কথা তিনি নিজ মুখেই আমাকে বলেছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘নটর ডেম কলেজে পিএইচ.ডি গবেষণা, উদ্ভিদবিদ্যা পড়ানো, ঢাকার গাছপালা নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি, অসংখ্য ভক্ত, বন্ধুবান্ধব – এইসব ছেড়েছুড়ে অনুবাদের মতো নিরানন্দ, একঘেয়ে, কষ্টকর কাজ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়াকে আপনি সৌভাগ্য বলছেন?’
উত্তরে তিনি বলেন, ‘সৌভাগ্য মানে? বিরাট সৌভাগ্য! সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে আমি এমন সমাজ দেখার সুযোগ পেয়েছি, যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আরো কত কিছু দেখার সুযোগ হয়েছে, কত দেশে গেছি, কত মানুষ দেখেছি, কত বই কিনতে পেরেছি, পড়তে পেরেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নে না গেলে হয়তো মূর্খই থেকে যেতে হতো। পিএইচ.ডি হয়তো করে ফেলতাম। লিখতামও হয়তো, কিন্তু সেসব লেখা এ-রকম হতো না। আর জীবনটা সেখানে কী সুখেরই না ছিল। টাকা-পয়সার চিন্তা নাই, প্রাচুর্য নাই, প্রাচুর্যের চিন্তাই নাই, অভাবও তেমন নাই। কাজের অমানুষিক চাপ নাই। অদ্ভুত সমাজ ছিল সেটা। সোভিয়েত ইউনিয়নে থাকার সুবাদে ইউরোপ ভ্রমণে যেতে পেরেছি, কতকিছু দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমি তো বলি শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্য নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া উচিত। সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো উচিত।’
২০০৬ সালের ২৯ মে তাঁর ৭৭তম জন্মদিনে তাঁর সঙ্গে আমার ওই আলাপচারিতায় তিনি আমাকে আরো বলেন, ‘ওই দেশটিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতায় এক অভূতপূর্ব পরীক্ষা হয়ে গেছে। পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় প্রমাণিত হয়েছে, এটা যারা বলে, তারা ঠিক বলে না। এই পুঁজিবাদ শুধু মানুষের শোষণ-বঞ্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে মানবসভ্যতাকেই ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে সে। সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন ও পরিভোগের এই ব্যবস্থা বদলাতে হবে। বদলাতে হবে সব বিষয়ে এথনোপোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। সবার ওপরে মানুষ সত্য নয়, পৃথিবীর ইকোসিস্টেমে একটি কীটস্ব কীটেরও ন্যায্য জায়গা রাখতে হবে। নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যান্ডিকো ফারমিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমাদের গ্যালাক্সির অন্যান্য গ্রহে কি সভ্যতা আছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আছে, নিশ্চয়ই অনেক আছে। পরের প্রশ্ন, তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না কেন? এবার ফারমির উত্তর : সে-রকম প্রযুক্তি তৈরি করার আগে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলে।’
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সময় তিনি মস্কোতেই ছিলেন। তারপর প্রগতি প্রকাশনেরও বিলোপ ঘটে এবং তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরে আসেননি, ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মস্কোই ছিল তাঁর আবাসস্থল। ওই বছর স্বদেশে ফেরেন বটে, তবে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই একবার করে মস্কো যেতেন এবং টানা কয়েক মাস সেখানে বাস করতেন। ২০০৫ সালের পর মস্কোর পাট পুরোপুরি গুটিয়ে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। এই যাওয়া-আসার সময়েই তিনি ঢাকায় এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়া প্রকল্পের অন্যতম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাপিডিয়ার অনেক ভুক্তি নিজে অনুবাদও করেন। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ প্রকল্পের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
আমার মনে হয়, দ্বিজেন শর্মার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নে বসবাসের দুই দশক। এই পর্ব শেষ করে স্বদেশে ফিরে আসার পরে পত্রপত্রিকায় প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে তাঁর অনেক লেখা প্রকাশিত হওয়া এবং এসব বিষয়ের প্রতি তরুণ সমাজের আগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্যে সাংগঠনিক সক্রিয়তার ফলে প্রকৃতিবিদ হিসেবে তাঁর পরিচয়টাই প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবনা, বিশেষত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার গুরুত্বও বিরাট বলে আমার মনে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি সমাজতন্ত্রে বসবাস নামে একটি বই লেখেন। ঢাকার প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল তা প্রকাশ করে ১৯৯৯ সালে। বইটিকে সংক্ষিপে স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ইতিবৃত্ত বলা যেতে পারে। ২০০৪ সালের জুন মাসে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে বইটির বিষয়ে আমার একটি ছোট্ট আলোচনা প্রকাশিত হয়। আমি সেই আলোচনার এক জায়গায় লিখি : ‘দীর্ঘকাল মস্কোপ্রবাসী লেখক-অনুবাদক দ্বিজেন শর্মার সমাজতন্ত্রে বসবাস বইটি পাঠ করে মনে হয়েছে কিছুরই সুরাহা হলো না; লেখক তো জানালেন না এত বছর সমাজতন্ত্রে বসবাস করে এই ব্যবস্থাটি সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত কী দাঁড়াল। কেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে, কেন প্রথমে রাশিয়াতেই ঘটল, কী করে ৭০ বছর টিকে থাকল আর কেনই-বা ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো? সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ কি আসলেই সম্ভব? এমন ব্যবস্থা কি মানব প্রজাতির অন্তর্গত স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? নাকি সমাজতন্ত্র জবরদস্তি করে কৃত্রিম উপায়ে চাপিয়ে দেওয়া একটি ব্যবস্থা, যা চাপানো গেলেও এবং জোর করে কিছুকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘকাল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়?’
আমার এই আলোচনার প্রতিক্রিয়ায় দ্বিজেন শর্মা প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতেই লেখেন, ‘মশিউল লিখেছেন, ‘লেখক তো জানালেন না এত বছর সমাজতন্ত্রে বসবাস করে ব্যবস্থাটি সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত কী দাঁড়াল।’ যথার্থ জিজ্ঞাসা। আমি যে বিভ্রান্ত তেমন সাক্ষ্য বইটিতেই আছে। অধিকন্তু এমন একটি জটিল বিষয় সম্পর্কে সুচিমিত্মত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো বিদ্যাও আমার নেই। এ ক্ষেত্রে প্রসাধারণীকরণের ঝুঁকি রয়েছে। গোটা বিশ্বের কত মনীষী, কত মহৎ ব্যক্তি সমাজতন্ত্রের জন্য প্রাণপাত করেছেন তা ভুলি কেমনে।
‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর প্রগতি প্রকাশনের সহকর্মীদের কেউ কেউ এ দেশ ছাড়ার সময় তাঁদের সংগৃহীত মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বইগুলো আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়ে যাচ্ছেন দেখে দুঃখ পেয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপুঞ্জ ভেঙে পড়া সত্ত্বেও আমি আজও সমাজতন্ত্রকে সর্বাধিকসংখ্যক মানুষের জন্য সর্বোত্তম রাষ্ট্রব্যবস্থা বলে মনে করি। তবে ইদানীং এমন একটি ভাবনা আমাকে সর্বদাই আলোড়িত করে এবং তা হলো, সমাজতন্ত্রের মতো একটি মানবিক ব্যবস্থায় উত্তরণ কি সহিংস শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপুল রক্তপাতের মাধ্যমে সম্ভব? লেনিন মার্কসীয় তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন এবং তার অভিজ্ঞতাকে খুবই মূল্যবান মনে করি। যদিও তাঁর সমগ্র রচনা পাঠ আমার সাধ্যাতীত, যেটুকু পড়েছি তা সামান্য এবং অধিকাংশই অনুবাদ ও সম্পাদনার সুবাদে। লেনিনের কোনো কোনো লেখায় এমন ইংগিতও আছে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শামিত্মপূর্ণ উপায়েও সম্পন্ন হতে পারে। রুশ বিপ্লবের পরিণতি দেখে এমন একটি চিন্তা অযৌক্তিক মনে হয় না যে, ধনতন্ত্র অপেক্ষা উন্নততর কোনো সভ্যতার জন্য অহিংসাই হবে মূল চালিকাশক্তি, অন্যথা উপায় ও লক্ষ্যের দ্বন্দ্ব নিরসন অসম্ভব হবে এবং বিপ্লবের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা বিপ্লবেরই উদরস্থ হবেন।’
‘সমাজতন্ত্র চিরতরে বিদায় নিয়েছে এমন ভাবনার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। সমাজ বিবর্তনের মার্কসীয় ধারণা, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ একটা পর্যায়ে পৌঁছালে উৎপাদন-সম্পর্কের পরিবর্তন অনিবার্য, তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। পুঁজিতন্ত্র এখনও তেমন কোনো ক্রামিত্মলগ্নে পৌঁছায়নি, সে নানা কৌশলে বা অপকৌশলে এই দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করতে সক্ষম, কিন্তু অনন্তকাল তা পারবে না।’ পুঁজিতন্ত্র মানবসভ্যতার সর্বোত্তম ও শেষ পর্যায় এমন ভাবনা অবশ্যই অযৌক্তিক, বিশেষত আমরা উন্নয়নশীল দেশের মানুষ তা মর্মে মর্মে অনুভব করি। পশ্চিমের কোনো কোনো পণ্ডত মনে করেন বর্তমান বিশ্বায়ন আসলে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের ফল, অর্থাৎ নতুন উৎপাদিকা শক্তির উচ্ছ্রয়ের অভিঘাতের ফসল। বিশ্ব পুঁজিতন্ত্র বিশ্বায়নকে কতটা বিশ্বমানবের কল্যাণের উপযোগী করতে পারবে তার ওপর নির্ভর করছে এই ব্যবস্থার সাফল্য। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের তো এটা আরম্ভমাত্র, তার বিকাশ বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের বিপর্যয় ডেকে আনবে কি না তা এখনও কেউ জানে না। আরেকটি শক্তি-উৎসের উদ্ভাবনও আসন্ন আর সেটা হলো অ-ফসিল জ্বালানি আবিষ্কার। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স একযোগে ফিউশন এনার্জি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে, তাতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হবে পানি এবং তাতে কোনো তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য থাকবে না, শক্তির পরিমাণও হবে বিপুল। এই প্রযুক্তি কি মুষ্টিমেয় পরাশক্তি দীর্ঘকাল তাদের একচেটিয়া দখলে রাখতে পারবে? অবশ্যই না। আমরা তখন বুঝতে পারব পৃথিবীর চেহারাটা অতঃপর কেমন হবে আর উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধি সত্যিই উৎপাদন সম্পর্ক বদলায় কি না। সেই দিন কিন্তু বেশি দূরে নয়।
‘মশিউল আলম জানতে চেয়েছেন, ‘পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেন প্রথম রাশিয়াতেই ঘটল, কী করে ৭০ বছর টিকে থাকল আর কেনইবা ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো?’
‘এ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত’, তবে সবচেয়ে সহজ অনুমান : ইউরোপের সর্বাধিক দীর্ঘস্থায়ী সামন্ততন্ত্র ছিল রাশিয়ায় আর লেনিনের ভাষায় সে জন্য ‘বিশ্বপুঁজিতন্ত্রের দুর্বলতম গ্রন্থি’, যথাসময়ে সেখানে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেনি, যখন ঘটল তখন কমিউনিস্টরা তা ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন, তাঁরা সমাজ বিকাশের একটি অপরিহার্য পর্যায় পুঁজিতন্ত্র এড়াতে চাইলেন আর সে জন্যই শেষ পর্যন্ত টেকসই সমাজতন্ত্র নির্মাণে সফল হননি। ৭০ বছর রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র টিকে ছিল প্রথমে বিপ্লব থেকে উৎপাদিত শক্তি ও জনগণের প্রবল আশাবাদের কল্যাণে, শেষে রাষ্ট্রশক্তির কঠোরতম নিয়ন্ত্রণে। কালে কালে প্রথম দুটি উবে যায়, থাকে শুধু শেষেরটি। সমাজে ব্যাপক দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটে, আমলাতান্ত্রিকতার দরুন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিপ্লবের সুফল কুড়োতে ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে রাশিয়া ব্যর্থ হয়। টফলারের মতে, ‘সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন-সম্পর্ক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে বাধা হয়ে ওঠে’, নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের সঙ্গে পুরনোদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে, গর্বাচেভ সমাজতন্ত্র সংস্কারে উদ্যোগী হন; কিন্তু ততদিনে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষয়ে গিয়েছিল, তাই সংস্কার আর সম্পন্ন হলো না, ভেঙে পড়ল গোটা কাঠামো।
‘এভাবেই রাশিয়ায় পুঁজিতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটল, যে-ব্যবস্থাকে এড়াতে চাওয়া হয়েছিল এবং ‘অপুঁজিতান্ত্রিক বিকাশের পথ’ নামে একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে বিপুল শক্তি ও অর্থের অপচয় ঘটানো হয়েছিল, আমরা জানি পৃথিবীর কোথাও তা সফল হয়নি। এর বেশি কিছু বলার মতো জ্ঞানের পুঁজি আমার নেই। তবে এও বলা প্রয়োজন যে, রাশিয়া ব্যর্থ সমাজতন্ত্র আমাদের জন্য কিছু ইতিবাচক অবদানও রেখে গেছে; সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার দ্রম্নত পতন, তৃতীয় দুনিয়ার
উত্থান (বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ঘটনা-পরম্পরাও প্রসঙ্গত স্মর্তব্য), সমতাভিত্তিক সমাজে জীবনযাত্রার কিছু মূল্যবান দৃষ্টান্ত যা অতীতে কোথাও ছিল না, আজও নেই।’
------ছয়-----
দ্বিজেন শর্মা বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলেন, তাঁর মনটা ছিল বিজ্ঞানীর মন। ভাগ্যচক্রে তা ঘটেনি, কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর চিন্তা, পড়াশোনা ও লেখালেখি কখনো থামেনি। এ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তিনি এক বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ কামনা করতেন। বিজ্ঞান শিক্ষা ছিল তাঁর গভীর ভাবনার বিষয়গুলোর অন্যতম। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার জন্য ছেলেমেয়েরা যে-বয়সে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ পায় তার অনেক আগে, কৈশোরের শুরুতেই বিজ্ঞানের রহস্যময় জগতের সঙ্গে তাদের একটি মধুময় সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।
কীভাবে তা গড়ে তোলা সম্ভব? বিজ্ঞান বিষয়ে সুখপাঠ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও সায়েন্স ফিকশন বা বিজ্ঞান-রহস্যোপন্যাস পড়া, বিজ্ঞানবিষয়ক চলচ্চিত্র, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি দেখার মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের দেশে এসব উপকরণ ও উদ্যোগ অপ্রতুল। বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালেখির পরিমাণ খুব কম এবং সেগুলো অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য সুখপাঠ্য ও প্রাঞ্জল নয়।
জীবনের শেষ নেই নামের বইয়ের ভূমিকায় দ্বিজেন শর্মা এসব কথা লিখেছেন। তাঁর মতে, ‘আমাদের কাছে বিজ্ঞানের পরিচয় ও প্রতিষ্ঠা অর্থকর বিদ্যা হিসেবেই গণ্য। অজানাকে জানার, প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটনের প্রবল কৌতূহল থেকে আমরা বিজ্ঞান শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হই না। আমাদের দেশের বিজ্ঞানের সেরা ছাত্ররাও যে কর্মজীবনে সৃজনশীল বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জনে ব্যর্থ হন, এর মূলে পূর্বোক্ত কারণসমূহের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা ছাড়া এ সত্য অত্যন্ত স্পষ্ট যে আমাদের সমাজমানস মূলত বিজ্ঞান-বিমুখ। আমাদের অর্থনীতি তথা সাংস্কৃতিক জীবনে মধ্যযুগের অস্তিত্ব আজও সুপ্রকট। আমরা যান্ত্রিক প্রগতির যা-কিছু জীবনের দায়ে গ্রহণ করেছি, তা আজও আমাদের সমাজের বহিরঙ্গেই পৃথকীকৃত হয়ে রয়েছে। আমাদের অন্তরের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র স্থাপিত হয়নি। তাই আমাদের দৈনন্দিন আলোচনা থেকে কলাকৃষ্টির বিসত্মৃততর পরিসরেও বিজ্ঞান নির্বিশেষে অনুপস্থিত। বিজ্ঞান যেন আমাদের ক্রীতদাস; তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হলেও সে অচ্ছুত, তার সখ্য অনাকাঙিক্ষত।
‘তাই আমাদের ছেলেমেয়েরা শৈশব-কৈশোরে পারিবারিক সূত্রে বিজ্ঞানমুখী হবার অনুপ্রেরণা লাভে স্বাভাবিকভাবেই ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতা এবং পরবর্তীকালের ত্রম্নটিপূর্ণ বিজ্ঞান শিক্ষার যুগ্ম প্রতিক্রিয়ার ফলেই সম্ভবত আমাদের বিজ্ঞান বন্ধ্যা, নিষ্ফলা।’
দ্বিজেন শর্মা মনে করতেন, এই সমস্যার যে-কোনো সমাধান নেই তা নয়। তবে এজন্য ব্যাপক উদ্যোগ প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে সুখপাঠ্য ও প্রাঞ্জল বই লেখার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, এবং নিজে সেই চেষ্টা কিছুটা করে গেছেন। ডারউইন, বিবর্তনবাদ, উদ্ভিদজগৎ ও প্রকৃতি-পরিবেশ বিষয়ে তিনি প্রাঞ্জল ও সুখপাঠ্য ভাষায় অনেক লেখা লিখেছেন। অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ, প্রাবন্ধিক মফিদুল হকসহ অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশে বিজ্ঞান বিষয়ে সুন্দর ভাষায় লেখালেখিতে দ্বিজেন শর্মা ছিলেন অনন্য।
বিজ্ঞান শিক্ষা তো বটেই, সামগ্রিক শিক্ষা সম্পর্কেও দ্বিজেন শর্মা চিন্তাভাবনা করতেন। তিনি মনে করতেন, ‘আধুনিক শিক্ষা সর্বৈব শিল্পবিপ্লব-উত্তর ইউরোপের এবং সেজন্য তা নাগরিক পরিবেশের তথা শিক্ষিত পারিবারিক প্রতিবেশের অধিক উপযোগী। একটি গ্রামীণ শিশুমন প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে, সেখানকার জীবনধারা থেকে যে উদ্দীপনা ও অন্যান্য উপকরণ আত্তীকরণে লালিত হয়, তার সঙ্গে শিল্পপ্রধান সমাজের শিক্ষা-উপকরণের বৈপরীত্য আছে। তাই এ-শিক্ষা তার কাছে অনাকর্ষী ও পরকীয় হয়ে ওঠে (শিক্ষকদের উদ্যত বেতের কথা না-ই বা ধরা হলো)। তার জগতের লাগসই শিক্ষাদর্শীর অভাবে তার পাঠ্য বিষয়ে ‘গোবরেপোকা’ এত স্পষ্ট হয়ে ওঠে না, কোনো দিন ‘ব্যাঙের খাঁটি কথাটি’ কিংবা ‘নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি’ লেখা হয় না। যে শিশু দুপায়ে দাঁড়ানোর পরই উঠোনে কাদামাটি ছানে, ফড়িং ধরে, চাষবাসের ও মাছ ধরার উপকরণ দেখে, তার পক্ষে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, নদীতে মাছ ধরা, গাছের মগডালে পাখির বাচ্চা খোঁজার সঙ্গে স্কুলের বন্দি বেষ্টনীতে বইয়ের পাতার সজ্জাহীন নীরস তথ্যের বিমূর্ত বস্ত্ত থেকে জ্ঞানার্জনের বিরক্তিকর মলস্নযুদ্ধ কি তুলনীয়? এভাবেই আধুনিক শিক্ষার উপকরণ ও পদ্ধতি এ দুয়ের সঙ্গেই তার অন্তর্লীন এক বিরোধ গড়ে ওঠে এবং শেষাবধি তা শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতা দেখা দেয়।’
দ্বিজেন শর্মা কবিতা লেখেননি, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ও মন কাব্যিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। তাঁর বিজ্ঞানচিন্তায় ও পরিবেশ ভাবনায় সৌন্দর্যবোধের স্থানটি ছিল একদম কেন্দ্রে। প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে তিনি মূলত যা দেখতে পেয়েছেন তা হলো সৌন্দর্য। তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন নিসর্গশোভা। তাঁর দৃষ্টিতে জগতের কোনো গাছ, কোনো ফুল, কোনো নদী, কোনো প্রাণী অসুন্দর ছিল না। প্রাকৃতিক জঙ্গল যেমন, তেমনই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা উদ্যান বা বাগানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। উদ্যানের মধ্যে প্রাকৃতিক জঙ্গলের বিশৃঙ্খলা তাঁর ভালো লাগত না।
একই কথা প্রযোজ্য নগরের সৌন্দর্যায়ন কিংবা পথতরু রোপণের ক্ষেত্রেও। তিনি রমনা উদ্যানের অনেক গাছ কেটে ফেলার পরামর্শ দিতেন, কারণ সেগুলো উদ্যানের পরিপাটি সৌন্দর্যের পক্ষে বেমানান, কিংবা অন্যান্য গাছের জন্য ক্ষতিকর। নগরীর মধ্যে পথতরু লাগানোর ক্ষেত্রেও তিনি সুবিবেচিত পরিকল্পনার পক্ষে ছিলেন। কোথায় কোন গাছ লাগাতে হবে, কোন গাছের পাশে কোন গাছ লাগানো হলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে ইত্যাদি খুঁটিনাটি নানা বিষয়ের দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিল।
তাঁর সৌন্দর্যবোধ সর্বাঙ্গীনভাবে মানুষের উন্নততর জীবনের আকাঙক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের পক্ষে তাঁর জোরালো অবস্থানের পেছনে কোনো রোমান্টিকতা ছিল না, ছিল অতি জরুরি বাস্তববুদ্ধি। মানুষের দ্বারা প্রকৃতির যথেচ্ছ শোষণ ও দোহনের মধ্যে তিনি মানব জাতির অস্তিত্বের সংকট দেখতে পেতেন। এর পেছনের প্রধান শক্তি হিসেবে তিনি প্রথমে চিহ্নিত করেন পুঁজিতন্ত্রকে। তারপর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও দেখতে পেয়েছেন প্রকৃতির যথেচ্ছ দোহন ও শোষণ। তখন তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বৈষয়িক উন্নতি তথা সীমাহীন ভোগবিলাসের লালসাই এই ক্ষেত্রে মূল সমস্যা। বৈষয়িক সম্পদ তথা আরাম-আয়েশের বৃদ্ধি ঘটাতে হলে প্রকৃতিকে যথেচ্ছ শোষণ ও দোহন ছাড়া গত্যন্তর নেই – মানুষের এই দুর্বুদ্ধিই তাকে তার অস্তিত্বের সংকটে উপনীত করেছে এবং সীমাহীন ভোগলালসার লাগাম টানার আগ পর্যন্ত এই সর্বনাশা প্রক্রিয়া থামার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তিনি মানুষকে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন। প্রকৃতিকে জয় করা নয়, তাকে ভালোবেসে তার অংশ হয়ে স্নিগ্ধ সুন্দর জীবনযাপনের দিকে তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। তাঁর খুব প্রিয় একটা বই ফরাসি লেখক অতোয়ান দো সাঁৎ একঝুপেরির ছোট রাজকুমার; এ-বইয়ের মূল বাণী ভালোবাসা। মানুষ ও প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা দ্বিজেন শর্মাকে সুন্দর মনের অধিকারী করেছিল।
খোকা একটু বড় হয়ে দিদির কাছে শুনবে, দোলনা দুলত আর হাওয়ায় দোল খেত নানা রঙের রুমালগুলি, তাই দেখে শূন্যে হাত-পা নাচাত খোকা। তার কচি মুখখানা সব সময় অনাবিল হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকত।
পরে দিদি আরো বলবে, জন্মের সময় খোকা কাঁদেনি। পৃথিবীতে তার প্রথম চিৎকার ছিল আনন্দধ্বনি।
এসব কথা শুনে খোকা শুধু আপনমনে হাসবে, কিছু বলবে না।
তার দিদি আরো পরে বলবে, খোকা স্বপ্নের মধ্যে হেঁটে বেড়াত। শীতের এক পূর্ণিমা রাতে স্বপ্নের ঘোরে সে হেঁটে হেঁটে গিয়েছিল নদী দেখতে।
খোকা ভেবে দেখবে, দিদির ভুল হয়েছে; স্বপ্নের ঘোরে হেঁটে বেড়ানোর অভ্যাস ছিল বড় দাদা প্রভাতের। খোকার এই ভাইটি নিকড়ি নদীটিকে খুব ভালোবাসত। শীতকালের নিকড়ি ছিল তার বিশেষ প্রিয়। রাতের এক প্রহর ঘুমিয়ে সে উঠে পড়ত, তারপর ভূতগ্রসেত্মর মতো ছুটে যেত নদীকে দেখতে।
বাবা বলতেন, ‘প্রভাত, রাতের বেলা ঘোরাঘুরি করিও না। সাপে কাটিবে।’
বাবা ছিলেন বিখ্যাত কবিরাজ, অখ্যাত কবি। চন্দ্রকান্ত শর্মা ছিল তাঁর নাম, লম্বা দাড়ি ছিল মুখে। নিজেকে নিয়ে তিনি এরকম পদ্য রচনা করেছিলেন :
চন্দ্রকান্ত কবিরাজ মুখে লম্বা দাড়ি
ঔষধের ডিবি লৈয়া বেড়াইন বাড়ি বাড়ি।
পান-তামাক দিলে তিনি কিছু নাহি খাইন
সুন্দরী রমণী দেখলে আড়নয়ানে চাইন \
বাবার ছিল ছটি ছেলেমেয়ে আর ছিল অনেক ফুলগাছ, আম-কাঁঠালের গাছ আর বনৌষধি। লোকে বলত কবিরাজ ঠাকুর। পৌষ-মাঘের শীতে খালি গায়ে ঘুরে বেড়াতেন; খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছেলেমেয়েদের ডাকতেন, ‘এই উঠো উঠো, গাছে জল দাও।’
গাছগুলো ছিল নবীন, গরু-ছাগলের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের ঘিরে রাখা হতো ‘হুপি’ দিয়ে; চিকন চোঙের মতো হুপিগুলো ছিল খোকার চেয়ে লম্বা, খোকা বদনা ভরে জল নিয়ে জলচৌকির ওপর দাঁড়িয়ে তাদের গায়ে জল ঢেলে দিত।
গাছের চারাদের গায়ে জল ঢেলে দিতে দিতে খোকা বড় হবে, পাঠশালায় যাবে; কিন্তু বশোই খোকার মতো পাঠশালা যাবার বয়েসি হয়েও পাঠশালা যাবে না, সে চুরি করে আনবে মরিচমার্কা সিগারেট। খড়ের গাদার আড়ালে বসে বসে তারা মরিচমার্কা সিগারেটে আগুন ধরাবে, খোকা দুই টান দিয়ে বেদম কাশবে আর বলবে, বশোই, এটা ভালো না, সিগারেট খেতে নেই। কিন্তু বশোই জামগাছে উঠে মরিচমার্কা সিগারেট খেতে খেতে বড় হয়ে যাবে, তারপর শিমুলগাছে চড়ে পাখির বাচ্চা ধরে নিয়ে আসবে, সেই পাখির বাচ্চার গায়ে সাদরে হাত বোলাতে বোলাতে খোকা বলবে, ‘তুই বড় হ, ওই আকাশে উড়ে চলে যা…।’
স্থবির গাছেদের দেখে খোকার মনে বিস্ময় জাগেনি, প্রথম জেগেছিল পাখি দেখে।
পাখি নিয়ে তাঁর মা এই ছড়াটি বলতেন :
কাঁঠালগাছে দেখছি দুটো হলদে
পাখির ছানা
মায়ের মুখে খাচ্ছে আধার নাড়িয়ে
দুটি দানা।
সেই থেকে খোকা হলদে পাখির ছানা খুঁজে খুঁজে হয়রান। সঙ্গে বশোই, যে বশোই খুব দুষ্টু, যে মরিচমার্কা সিগারেট চুরি করে এনেছিল। তারপর ছেলেবেলার সেই খেলার সাথি কখন অজান্তে হারিয়ে গেছে, কিন্তু অশীতিপর বয়সেও সেই হারিয়ে যাওয়া কৈশোর মাঝে মাঝেই ফিরে আসত। তিনি আমাকে সেসব গল্প বলতেন, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর খন্দকারের গলির ভাড়া বাসায়। গত শতকের ষাট দশক থেকে তাঁর কেটেছে এই খন্দকারের গলিতেই, প্রথমে খন্দকার মঞ্জিল নামের এক দোতলা বাড়িতে, তারপর ক্রিস্টাল গার্ডেন নামের বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভাড়া বাসায়।
------দুই------
তাঁর জন্ম ব্রিটিশ ভারতের সিলেট জেলার মৌলভীবাজারের বড়লেখার শিমুলিয়া গ্রামে, ১৯২৯ সালের ২৯ মে। নাম রাখা হয় দ্বিজেন্দ্র শর্মা। বাবা চন্দ্রকান্ত শর্মা ছিলেন ওই অঞ্চলের বিখ্যাত ভিষক, তাঁর বাড়িটি আজো কবিরাজ বাড়ি বলে পরিচিত। মায়ের নাম ছিল মগ্নময়ী দেবী। তাঁদের সন্তান ছিল ছয়জন : প্রভাতকুমার শর্মা, মৃণালিনী দেবী, বলরাম শর্মা, প্রভাবতী দেবী (মিঠু), দ্বিজেন্দ্র শর্মা (খোকা) ও সন্ধ্যারানী দেবী (খুকি)। দ্বিজেন্দ্র ছিলেন তাঁদের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র।
খোকার পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন সেখানকার পিসি হাইস্কুলে। নবম শ্রেণিতে উঠে ভর্তি হন করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে, সে-সময় করিমগঞ্জ ছিল আসামের একটি মহকুমা। ভারতবিভাগের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে সেই স্কুল থেকেই তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তারপর করিমগঞ্জ কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কলেজটি তাঁর ভালো লেগে যায়; কিন্তু গুরুতর সমস্যা দেখা দেয় উচ্চতর গণিত নিয়ে। এই বিষয়টার মাথামুণ্ডু কিছুই তাঁর মাথায় ঢোকে না। কিন্তু গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত করিমগঞ্জ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চতর গণিত বাধ্যতামূলক। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখলেন, ত্রিপুরার আগরতলায় মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চতর গণিত বাধ্যতামূলক নয়। ওই কলেজ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। তিনি করিমগঞ্জ কলেজ থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে আগরতলায় গিয়ে মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে ভর্তি হলেন। সেখান থেকেই ১৯৪৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর মা তাঁকে বললেন, ‘কলকাতা যাও, ডাক্তারিতে ভর্তি হও।’
বহু বছর পরে সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দ্বিজেন শর্মা আমাকে বলেন, ‘আমার পিতামহ, পিতা, অগ্রজ সকলেই ছিলেন প্রখ্যাত ভিষক। আমারও তা-ই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমার মা সেটা চাননি। তিনি আমাকে আধুনিক চিকিৎসক বানাতে চেয়েছিলেন।’
মায়ের আদেশে তিনি কলকাতা গিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন কলকাতা পৌঁছেন তার আগের দিনই মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার শেষ সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়া তাঁর হলো না। ভর্তি হলেন বিএসসিতে, তা-ও নামী কোনো কলেজে নয়, কলকাতা সিটি কলেজে, এবং অনার্স ছাড়াই। এই প্রসঙ্গে তাঁর খেদোক্তি : ‘অনার্স যে নেওয়া যায়, আমার সে বুদ্ধিও ছিল না। গ্রাম থেকে কলকাতা গেছি, প্রেসিডেন্সি কলেজের নাম জানতাম না, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের নাম পর্যন্ত জানতাম না, এমনই গেঁয়ো ছিলাম।’
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তি হতে পারেননি বলে তাঁর কোনো আফসোস ছিল না। তিনি নিজের মুখেই বরং আমাকে বলেন, ‘ভালো যে ডাক্তারিতে ভর্তি হইনি। ভর্তি হলে সর্বনাশ হতো।’ কারণ, কলকাতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার আর্থিক সামর্থ্য তাঁর পরিবারের ছিল না, ভর্তি হতে পারলেও মাঝখানে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হতো। সিটি কলেজে পড়ার সময় তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ভালো ছিল না, কারণ মূলত আর্থিক। কলকাতায় তাঁর ভালো লাগত না, সবুজ রঙের ট্রেন পূর্ববঙ্গের দিকে যাচ্ছে – এমন দৃশ্য দেখলেই তাঁর বাড়ির কথা মনে পড়ত, আর বাড়ির কথা মনে পড়লে তিনি বিষণ্ণ হয়ে পড়তেন।
সিটি কলেজ থেকে ১৯৫২ সালে বিএসসি পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কলকাতা ত্যাগ করেন। বাড়ি ফিরে যান, তখন করিমগঞ্জ কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞানের একজন ডেমোন্স্ট্রেটর প্রয়োজন ছিল। তিনি সেই চাকরিটা পান। কিন্তু দেড় বছর চাকরি করার পর তাঁর একঘেয়ে বোধ হয়, তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মার্কসবাদী বইপত্র পড়া শুরু করেন। অবশ্য তাঁর মার্কসবাদের দীক্ষা ঘটে কলকাতা সিটি কলেজে পড়ার সময়ই। তখন বামপন্থি বইপত্র পড়েছিলেন প্রচুর। বাম রাজনীতির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় ও মেলামেশাও হয় অনেক। গড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে নেতাদের বক্তৃতা শুনতেন। একদিন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তৃতা শুনেছিলেন।
------তিন-----
বাড়িতে নিয়মিত পত্রপত্রিকা পড়া হতো। তাঁর বাবা ও বড় ভাই ছিলেন একাধিক সাময়িকপত্রের গ্রাহক। একদিন আজাদ পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন তাঁর চোখে পড়ে : বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ উদ্ভিদবিজ্ঞানের একজন ডেমোন্স্ট্রেটর চায়। তখন তিনি জানতেন না বরিশাল কোথায়। কোনো দিন বাংলার মানচিত্র খুলে দেখেননি। তাঁরা দেখতেন আসামের মানচিত্র। পত্রিকায় সেই বিজ্ঞাপন পড়ার পর খুলে বসলেন বেঙ্গলের ম্যাপ। দেখলেন, বরিশাল বঙ্গোপসাগরের কাছে। পাহাড়ের সন্তান কোনো দিন সমুদ্র দেখেননি। তাই ভীষণ উৎসাহের সঙ্গে দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টেলিগ্রাম চলে এলো : ‘আপনি অবিলম্বে এসে কাজে যোগদান করুন।’ তিনি বরিশাল গিয়ে সমুদ্র খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথায় সমুদ্র? বঙ্গোপসাগর বরিশাল থেকে অনেক দূরে। তবু তিনি আর বরিশাল থেকে ফিরে এলেন না। বরং জীবনানন্দ দাশের ওই শহরের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে উঠল। ১৯৫৪ সালে ব্রজমোহন কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ডেমোন্স্ট্রেটর হিসেবে যোগ দিলেন।
কিন্তু ডেমোন্স্ট্রেটরের কাজে তাঁর মন ভরেনি। যদিও হাতেকলমে উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়াতে তাঁর ভালো লাগত, তবু শুধু ব্যবহারিক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা একধরনের অসম্পূর্ণ কাজ বলে তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। তাঁর ইচ্ছে ক্লাসে লেকচার দেওয়ার। কিন্তু ডেমোন্স্ট্রেটরদের দায়িত্বের মধ্যে সেটা নেই। কলেজের প্রভাষক হতে হলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারী হতে হবে। তাই করিমগঞ্জ কলেজ ও বরিশালের বিএম কলেজে মোট চার বছর ডেমোন্স্ট্রেটরের চাকরি করার পর তিনি ঢাকা এসে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন, ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে। কিন্তু বিএম কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে চিরতরে হারাতে চায় না। তারা তাঁকে বলল, তিনি যেন মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার পরে আবার ওই কলেজে ফিরে যান। তাঁকে ফিরে পাওয়ার জন্য তারা একটা কৌশলও অবলম্বন করল : দ্বিজেন শর্মা যতদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবেন, ততদিন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ৫০ টাকা মাসোহারা দেবে।
১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর কোর্সে পড়াশোনা শুরু করার পর তাঁর মনোজগতে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যায়। উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে তাঁর নতুন উপলব্ধি জাগে। এই প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেন, ‘বিএসসি পাশ করার পর চার বছর চাকরি করে আমার ধারণা জন্মেছিল, আমি তো প্রচুর পড়াশোনা করেছি, আমি অনেক কিছু জানি, আর বিশেষ কিছু জানার দরকার নাই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে প্রথম জানলাম যে আমি কিছুই জানি না। শুধু বায়োলজি কেন, মার্কসবাদ, ইতিহাস, অর্থনীতি, সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি নানা বিষয়ে যে পড়াশোনা করেছি সেসব কিছুই নয়। এ ধরনের পড়া কোনো কাজেই লাগে না। ইউনিভার্সিটি এডুকেশন ইজ এ মাস্ট। তোমাকে অবশ্যই সিস্টেম্যাটিক্যালি পড়াশোনা করতে হবে, কোনো ডিসিপিস্ননে যেতে হবে।’
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করেন সত্যিকার অর্থে সিস্টেম্যাটিক পড়াশোনা। সে-সময় ঢাকায় অনেক বিদেশি বইপত্র পাওয়া যেত। একদিন তাঁর হাতে আসে এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি বিষয়ে আইরিশ এক ভদ্রলোকের লেখা ছোট্ট একটা বই। হ্যাসলফ হ্যারিসন নামের সেই ভদ্রলোক তখন ডাবলিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। বইটি পড়ে দ্বিজেন শর্মা বেশ আলোড়িত হন। এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি বিবর্তনবাদকে বর্তমান ধারায় প্রতিষ্ঠা করার একটা পদ্ধতি। তিনি আমাকে বলেন, ‘এটা আমাকে হন্ট করতে লাগল। আমি আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিতে হ্যারিসনের কাছে চিঠি লিখলাম। তিনি পাল্টা চিঠিতে আমাকে লিখলেন, তুমি এখানে চলে এসো। তখন আমি ঠিক করি, এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি পড়ব, আমি বিজ্ঞানী হব।’
তিনি মাস্টার্স শেষ করার পর আয়ারল্যান্ডে পিএইচ.ডি করতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের সঙ্গে বিভাগীয় প্রধানের দ্বন্দ্বের ফলে তিনি এমএসসিতে দ্বিতীয় শ্রেণি পেলেন। ফলে পিএইচ.ডি করার জন্য তাঁর আর বিদেশ যাওয়া হলো না। এ-বিষয়ে তাঁর খেদোক্তি : ‘এটাই আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিল।’
এ নিয়ে তাঁর মনে গভীর দুঃখ ছিল। আলাপের সময় কখনো কখনো সেই দুঃখ প্রকাশ পেত। তাঁর একাধিক লেখায়ও এই দুঃখের আভাস আছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনোর প্রায় দুই দশক পরে আশির দশকে মস্কো বসবাসকালে তিনি লন্ডন বেড়াতে যান। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ন্যাচারাল হিস্ট্রি বিভাগের হলঘরে ঢুকেই স্যার রিচার্ড ওয়েনের আবক্ষ মূর্তি দেখে মনে পড়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের কথা, এবং তিনি বিরক্ত হন। ‘গল্পবিজ্ঞান’ নামের ছোট্ট একটি লেখায় এই প্রসঙ্গটা আছে; নিজের দুর্ভাগ্য সম্পর্কে তৃতীয় পুরুষে তিনি লিখেছেন :
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে থিসিসের মালমশলা সংগ্রহকালে অমত্ম্যজ উদ্ভিদবর্গের একটি নতুন প্রজাতি সে খুঁজে পেয়েছিল। তার তত্ত্বাবধায়ক এই সাফল্যে শোরগোল তোলেন, বিভাগে হইচই পড়ে যায় এবং পরীক্ষা শেষে একটি প্রথম শ্রেণি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে সে স্বগ্রামে ফেরে। অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও গবেষণার স্বপ্নে মশগুল থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল এবং এই সুবাদে নিজেকে প্রাণের উৎসসন্ধানী এক বিজ্ঞানী বানিয়ে একটি চটকদার গল্পও লিখে ফেলেছিল। কাগজে গল্পটি ছাপা হলেও তার স্বপ্ন সফল হয়নি। তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে রেষারেষি কিংবা অবোধ্যতর কোনো কারণে বিভাগীয় প্রধান তার গলায় দ্বিতীয় শ্রেণির যে ঘণ্টিটি ঝুলিয়ে দেন, তাতে মধ্যযুগীয় কুষ্ঠরোগীর মতো গুহাবাস তার নিয়তি হয়ে ওঠে এবং মফস্বলের কলেজের বিবর্ণ প্রাত্যহিকতায় কালাতিপাত ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
এই প্রসঙ্গে আমি একবার তাঁকে বলেছিলাম, ‘আপনি যদি পিএইচ.ডি করতে আয়ারল্যান্ড চলে যেতেন, তাহলে আমরা সম্ভবত আপনাকে আর ফিরে পেতাম না। বাংলাদেশ আপনাকে হারাত। কারণ বিদেশের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি পিএইচ.ডি করতেন, তারা আপনার মেধা আর পড়াশোনা ও গবেষণায় একাগ্রতা দেখে আপনাকে আর ছাড়ত না। সারাজীবন আপনাকে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই অধ্যাপনা করতে হতো। আপনার আর শ্যামলী নিসর্গ লেখা হতো না, বাংলা ভাষায় হয়তো কোনো বই-ই আপনার লেখা হতো না। প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদক হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়া, সমাজতন্ত্রে বসবাস করা এবং সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লেখা হতো না। বই অনুবাদ করা হতো না, আপনার সুন্দর অনুবাদ থেকে বাংলা ভাষার পাঠকেরা বঞ্চিত হতো। তরুপলস্নবের মতো সংগঠন গড়ে তোলা হতো না।’
আমার কথা শুনে তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘তাই আমি আমার অতীত নিয়ে আফসোস করি না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর অনেক বন্ধুবান্ধব জুটে যায়। ওই সময় তিনি সিকান্দার আবু জাফর-সম্পাদিত সাময়িকপত্র সমকালে প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন ওই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক, তাঁর সঙ্গে দ্বিজেন শর্মার গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। হাসান হাফিজুর রহমানের পীড়াপীড়ির ফলেই তিনি সমকালের জন্য প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘শেষ গোলাপগুচ্ছ’ নামের স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন : ‘তখন সমকাল পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে। হাসান সহকারী সম্পাদক। ইতিপূর্বে আমি উলেস্নখ্য কিছুই লিখিনি। হাসানের ঈর্ষণীয় বন্ধুপ্রীতি, অনমনীয় জবরদস্তি আর অহেতুক প্রশংসার কল্যাণেই সাহিত্যের অঙ্গনে আমি প্রবেশাধিকার পাই। বলতে দ্বিধা নেই, হাসানের হাত ধরেই এ পথে আমার যাত্রা শুরু।’
সমকাল পত্রিকায় যেসব প্রবন্ধ লেখেন সেগুলোর বিষয়বস্ত্ত ছিল বিচিত্র-সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বিজ্ঞান পর্যন্ত। কয়েকটি প্রবন্ধের শিরোনাম উলেস্নখ করলেই তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে : ‘সংস্কৃতি বিচার’, ‘বঙ্কিম সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’, ‘লিসেন্কোর বংশগতিতত্ত্ব’, ‘তমসার শেষ অঙ্কে’ ইত্যাদি।
স্বাধীনতার পরে হাসান হাফিজুর রহমান মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস অ্যাটাশে হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৭৪ সালে দ্বিজেন শর্মা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে মস্কো গেলে তাঁদের সখ্য আরো নিবিড় হয়।
১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পর তিনি প্রতিশ্রম্নতি অনুযায়ী বরিশাল বিএম কলেজে ফিরে গিয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দ্বিতীয় শ্রেণি পাওয়ায় পিএইচ.ডি করতে বিদেশ যাওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার ফলে তাঁর মন সে-সময় ভীষণ খারাপ ছিল। তবে তখনো সব আশা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বরিশালে ফেরার পরেও তাঁর মনে আশা ছিল যে পিএইচ.ডি করার জন্য আয়ারল্যান্ডে অধ্যাপক হ্যারিসনের কাছে যাবেন।
কিন্তু গোল বাধাল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি : ইতিমধ্যে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তানের ক্ষমতার মসনদে বসেছেন। তারপর স্বৈরাচারী সরকার একটা শিক্ষানীতি ঘোষণা করে এবং সঙ্গে সঙ্গে সারা পূর্ববাংলাজুড়ে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের ঘোষিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রবল ছাত্র-আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। তিনি তখন বরিশাল বিএম কলেজের ছাত্র হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট, আন্দোলনরত ছাত্রদের সহযোগিতা করছেন এই অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে ধরতে যায়। তিনি পালিয়ে বরিশাল থেকে চলে যান মৌলভীবাজারের বড়লেখায় নিজের গ্রামে। সেখানে ও ময়মনসিংহের আত্মীয়বাড়িতে মাসতিনেক লুকিয়ে থাকার পর পরিস্থিতি থিতু হয়েছে ভেবে কলেজে ফিরে কাজে যোগদান করেন এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার ও কারাগারে নিক্ষেপ্ত হন। ফলে উচ্চতর শিক্ষার জন্য তাঁর বিদেশ যাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এই প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেন, ‘বাষট্টি সালে বরিশালে আমাকে সিকিউরিটি প্রিজনার হিসেবে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকিয়ে দিল। তারপর আইয়ুব খানের পাকিস্তানে আমার পক্ষে আর পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব ছিল না। আমি উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে ঠিক করলাম, বরিশালেই পিএইচডি করব বরিশাল ফ্লোরা (বরিশালের উদ্ভিদকুল) নিয়ে। কিন্তু সেখানে কোনো গাইড নাই। নিজেই নিজেই কিছু কাজ করলাম। জেল থেকে বেরিয়ে আমি আর বরিশালেই থাকিনি, ঢাকায় এসে নটর ডেম কলেজে যোগ দিলাম। ঢাকায় এসেই আমার ইচ্ছা হলো, ঢাকা শহরের গাছপালা নিয়ে লেখালেখি করব। মোটরসাইকেলে করে সারা ঢাকা চষে বেড়াতাম, গাছপালা দেখতাম।’
বরিশালে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের আগে ১৯৬০ সালের ২৭ নভেম্বর তাঁর বিয়ে হয় বরিশালবাসী আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তীর কন্যা দেবী চক্রবর্তীর সঙ্গে। দেবী চক্রবর্তী তখন বরিশাল বিএম কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। সেখানে ১৯৬১ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান সুমিত্র শর্মার (টুটুল) জন্ম হয়। দ্বিতীয় সন্তান শ্রেয়সী শর্মা (মুন্নী) জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭১ সালে।
------চার-----
১৯৬২ সালে বরিশাল ছেড়ে ঢাকা চলে আসার পর দ্বিজেন শর্মা কিছু সময় কায়েদে আজম কলেজ, সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজ ও বাংলা কলেজে শিক্ষকতা করেন। তারপর যোগ দেন নটর ডেম কলেজে। ওই কলেজের প্রাঙ্গণে অনেক গাছ লাগান, বাগান গড়ে তোলেন। তাঁর লাগানো কিছু গাছ এখনো ওই কলেজের প্রাঙ্গণে রয়ে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর প্রথম গ্রন্থ শ্যামলী নিসর্গ লেখেন। বাংলা ভাষায় এরকম বই এটাই প্রথম। এ-বইয়ের প্রকাশনা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আমাকে বলেন, ‘গাছপালার ছবি আঁকার জন্য পেয়ে গেলাম আঁকিয়ে গোপেশ মালাকারকে। বাংলা একাডেমীকে বললাম, তারা সঙ্গে সঙ্গে বইটা প্রকাশ করতে রাজি হয়ে গেল। শ্যামলী নিসর্গ-ই আমার প্রথম বই, এটাই এখনো পর্যন্ত আমার প্রধান বই, লোকে এখনও এটার কথা বলে।’ কিন্তু তিনি পাণ্ডুলিপি ১৯৬৫ সালে জমা দিলেও বাংলা একাডেমি বইটি প্রকাশ করে অনেক পরে, ১৯৮০ সালে।
শ্যামলী নিসর্গ লেখার সময়েই তিনি পপুলার সায়েন্সের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্পের আঙ্গিকে আরো দশ-বারোটা নিবন্ধ-প্রবন্ধ লেখেন। সে-লেখাগুলো নিয়ে আরো পরে প্রকাশিত হয় জীবনের শেষ নেই নামে আরেকটা বই।
ছাত্র পড়াতে তাঁর ভালো লাগত, বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল আরো বেশি। একবার তিনি আমাকে বলেন, ‘আমার মূল লক্ষ্য ছিল গাছপালা নিয়ে গবেষণা করব, বিজ্ঞানী হব, এবং এই ধারার লেখালেখি করব। তাই নটর ডেম কলেজে যোগ দেওয়ার কিছুকাল পরে অধ্যাপক নজরুল ইসলামের অধীনে ক্যারোফাইটা নিয়ে পিএইচ.ডি গবেষণা শুরু করি। মস্কো যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি সেটা চালিয়ে গেছি। আমি একজন বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার মনের গড়ন।’
রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। অবশ্য তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রবেশ করেননি, কিন্তু তাঁর বন্ধুবান্ধবদের অধিকাংশই ছিলেন বামপন্থি। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল।
কলেজে পড়ার সময় বামপন্থি বইপত্র পড়েছিলেন প্রচুর। বাম রাজনীতির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশাও হয়েছে কম নয়। সে-সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘ওটা ছিল বিদ্রোহের বয়স। তার ওপর দেশবিভাগের ফলে আমাদের পরিবারে দারিদ্র্য নেমে আসে। আমার সে সময়ের দারিদ্রে্যর অভিজ্ঞতা ভীষণ তিক্ত। ফলে আই ওয়াজ ভেরি অ্যাংরি। আমি প্রথম যে গল্পটা লিখেছিলাম, সেটার নাম ছিল কী, জানিস? ‘যে নদী মরুপথে’। এক গরিব ছাত্রের জীবনসংগ্রামের কাহিনি। যা হয় আর-কি। গল্পের আড়ালে নিজের দারিদ্রে্যর বয়ান। তার পরও কয়েকটা গল্প লিখেছিলাম। সেগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর কলকাতা পড়ার সময় আমি থাকতাম ব্যারাকপুরে। সেখানে বামপন্থিরা গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। আমি ‘সীমান্ত’ নামে একটা গল্প লিখি, সেটা ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে যায়। সো আই বিকেম পপুলার অ্যামং দেম। প্রচুর বন্ধুবান্ধব জুটে গেল।’
-----পাঁচ-----
১৯৭৪ সালে দ্বিজেন শর্মা সোভিয়েত ইউনিয়নের সুবৃহৎ পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে সপরিবারে মস্কো চলে যান। ফলে অ্যাকাডেমিক জগতের সঙ্গে তাঁর চিরতরে বিচ্ছেদ ঘটে যায়। অনুবাদের কাজ তাঁর ভালো লাগেনি, কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এ-কাজটি তাঁকে করতে হয়েছে। প্রগতি প্রকাশনের জন্য তিনি প্রায় ৪০টি বই ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ করতে ভালো না লাগলেও সোভিয়েত ইউনিয়নে তাঁর বসবাস আনন্দময় ছিল। তিনি মনে করতেন, তাঁর জীবনে এটা ছিল এক বিরাট সৌভাগ্যজনক ঘটনা। এ-কথা তিনি নিজ মুখেই আমাকে বলেছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘নটর ডেম কলেজে পিএইচ.ডি গবেষণা, উদ্ভিদবিদ্যা পড়ানো, ঢাকার গাছপালা নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি, অসংখ্য ভক্ত, বন্ধুবান্ধব – এইসব ছেড়েছুড়ে অনুবাদের মতো নিরানন্দ, একঘেয়ে, কষ্টকর কাজ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়াকে আপনি সৌভাগ্য বলছেন?’
উত্তরে তিনি বলেন, ‘সৌভাগ্য মানে? বিরাট সৌভাগ্য! সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে আমি এমন সমাজ দেখার সুযোগ পেয়েছি, যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আরো কত কিছু দেখার সুযোগ হয়েছে, কত দেশে গেছি, কত মানুষ দেখেছি, কত বই কিনতে পেরেছি, পড়তে পেরেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নে না গেলে হয়তো মূর্খই থেকে যেতে হতো। পিএইচ.ডি হয়তো করে ফেলতাম। লিখতামও হয়তো, কিন্তু সেসব লেখা এ-রকম হতো না। আর জীবনটা সেখানে কী সুখেরই না ছিল। টাকা-পয়সার চিন্তা নাই, প্রাচুর্য নাই, প্রাচুর্যের চিন্তাই নাই, অভাবও তেমন নাই। কাজের অমানুষিক চাপ নাই। অদ্ভুত সমাজ ছিল সেটা। সোভিয়েত ইউনিয়নে থাকার সুবাদে ইউরোপ ভ্রমণে যেতে পেরেছি, কতকিছু দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমি তো বলি শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্য নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া উচিত। সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো উচিত।’
২০০৬ সালের ২৯ মে তাঁর ৭৭তম জন্মদিনে তাঁর সঙ্গে আমার ওই আলাপচারিতায় তিনি আমাকে আরো বলেন, ‘ওই দেশটিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতায় এক অভূতপূর্ব পরীক্ষা হয়ে গেছে। পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় প্রমাণিত হয়েছে, এটা যারা বলে, তারা ঠিক বলে না। এই পুঁজিবাদ শুধু মানুষের শোষণ-বঞ্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে মানবসভ্যতাকেই ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে সে। সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন ও পরিভোগের এই ব্যবস্থা বদলাতে হবে। বদলাতে হবে সব বিষয়ে এথনোপোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। সবার ওপরে মানুষ সত্য নয়, পৃথিবীর ইকোসিস্টেমে একটি কীটস্ব কীটেরও ন্যায্য জায়গা রাখতে হবে। নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যান্ডিকো ফারমিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমাদের গ্যালাক্সির অন্যান্য গ্রহে কি সভ্যতা আছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আছে, নিশ্চয়ই অনেক আছে। পরের প্রশ্ন, তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না কেন? এবার ফারমির উত্তর : সে-রকম প্রযুক্তি তৈরি করার আগে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলে।’
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সময় তিনি মস্কোতেই ছিলেন। তারপর প্রগতি প্রকাশনেরও বিলোপ ঘটে এবং তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরে আসেননি, ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মস্কোই ছিল তাঁর আবাসস্থল। ওই বছর স্বদেশে ফেরেন বটে, তবে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই একবার করে মস্কো যেতেন এবং টানা কয়েক মাস সেখানে বাস করতেন। ২০০৫ সালের পর মস্কোর পাট পুরোপুরি গুটিয়ে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। এই যাওয়া-আসার সময়েই তিনি ঢাকায় এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়া প্রকল্পের অন্যতম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাপিডিয়ার অনেক ভুক্তি নিজে অনুবাদও করেন। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ প্রকল্পের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
আমার মনে হয়, দ্বিজেন শর্মার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নে বসবাসের দুই দশক। এই পর্ব শেষ করে স্বদেশে ফিরে আসার পরে পত্রপত্রিকায় প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে তাঁর অনেক লেখা প্রকাশিত হওয়া এবং এসব বিষয়ের প্রতি তরুণ সমাজের আগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্যে সাংগঠনিক সক্রিয়তার ফলে প্রকৃতিবিদ হিসেবে তাঁর পরিচয়টাই প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবনা, বিশেষত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার গুরুত্বও বিরাট বলে আমার মনে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি সমাজতন্ত্রে বসবাস নামে একটি বই লেখেন। ঢাকার প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল তা প্রকাশ করে ১৯৯৯ সালে। বইটিকে সংক্ষিপে স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ইতিবৃত্ত বলা যেতে পারে। ২০০৪ সালের জুন মাসে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে বইটির বিষয়ে আমার একটি ছোট্ট আলোচনা প্রকাশিত হয়। আমি সেই আলোচনার এক জায়গায় লিখি : ‘দীর্ঘকাল মস্কোপ্রবাসী লেখক-অনুবাদক দ্বিজেন শর্মার সমাজতন্ত্রে বসবাস বইটি পাঠ করে মনে হয়েছে কিছুরই সুরাহা হলো না; লেখক তো জানালেন না এত বছর সমাজতন্ত্রে বসবাস করে এই ব্যবস্থাটি সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত কী দাঁড়াল। কেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে, কেন প্রথমে রাশিয়াতেই ঘটল, কী করে ৭০ বছর টিকে থাকল আর কেনই-বা ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো? সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ কি আসলেই সম্ভব? এমন ব্যবস্থা কি মানব প্রজাতির অন্তর্গত স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? নাকি সমাজতন্ত্র জবরদস্তি করে কৃত্রিম উপায়ে চাপিয়ে দেওয়া একটি ব্যবস্থা, যা চাপানো গেলেও এবং জোর করে কিছুকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘকাল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়?’
আমার এই আলোচনার প্রতিক্রিয়ায় দ্বিজেন শর্মা প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতেই লেখেন, ‘মশিউল লিখেছেন, ‘লেখক তো জানালেন না এত বছর সমাজতন্ত্রে বসবাস করে ব্যবস্থাটি সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত কী দাঁড়াল।’ যথার্থ জিজ্ঞাসা। আমি যে বিভ্রান্ত তেমন সাক্ষ্য বইটিতেই আছে। অধিকন্তু এমন একটি জটিল বিষয় সম্পর্কে সুচিমিত্মত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো বিদ্যাও আমার নেই। এ ক্ষেত্রে প্রসাধারণীকরণের ঝুঁকি রয়েছে। গোটা বিশ্বের কত মনীষী, কত মহৎ ব্যক্তি সমাজতন্ত্রের জন্য প্রাণপাত করেছেন তা ভুলি কেমনে।
‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর প্রগতি প্রকাশনের সহকর্মীদের কেউ কেউ এ দেশ ছাড়ার সময় তাঁদের সংগৃহীত মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বইগুলো আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়ে যাচ্ছেন দেখে দুঃখ পেয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপুঞ্জ ভেঙে পড়া সত্ত্বেও আমি আজও সমাজতন্ত্রকে সর্বাধিকসংখ্যক মানুষের জন্য সর্বোত্তম রাষ্ট্রব্যবস্থা বলে মনে করি। তবে ইদানীং এমন একটি ভাবনা আমাকে সর্বদাই আলোড়িত করে এবং তা হলো, সমাজতন্ত্রের মতো একটি মানবিক ব্যবস্থায় উত্তরণ কি সহিংস শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপুল রক্তপাতের মাধ্যমে সম্ভব? লেনিন মার্কসীয় তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন এবং তার অভিজ্ঞতাকে খুবই মূল্যবান মনে করি। যদিও তাঁর সমগ্র রচনা পাঠ আমার সাধ্যাতীত, যেটুকু পড়েছি তা সামান্য এবং অধিকাংশই অনুবাদ ও সম্পাদনার সুবাদে। লেনিনের কোনো কোনো লেখায় এমন ইংগিতও আছে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শামিত্মপূর্ণ উপায়েও সম্পন্ন হতে পারে। রুশ বিপ্লবের পরিণতি দেখে এমন একটি চিন্তা অযৌক্তিক মনে হয় না যে, ধনতন্ত্র অপেক্ষা উন্নততর কোনো সভ্যতার জন্য অহিংসাই হবে মূল চালিকাশক্তি, অন্যথা উপায় ও লক্ষ্যের দ্বন্দ্ব নিরসন অসম্ভব হবে এবং বিপ্লবের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা বিপ্লবেরই উদরস্থ হবেন।’
‘সমাজতন্ত্র চিরতরে বিদায় নিয়েছে এমন ভাবনার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। সমাজ বিবর্তনের মার্কসীয় ধারণা, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ একটা পর্যায়ে পৌঁছালে উৎপাদন-সম্পর্কের পরিবর্তন অনিবার্য, তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। পুঁজিতন্ত্র এখনও তেমন কোনো ক্রামিত্মলগ্নে পৌঁছায়নি, সে নানা কৌশলে বা অপকৌশলে এই দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করতে সক্ষম, কিন্তু অনন্তকাল তা পারবে না।’ পুঁজিতন্ত্র মানবসভ্যতার সর্বোত্তম ও শেষ পর্যায় এমন ভাবনা অবশ্যই অযৌক্তিক, বিশেষত আমরা উন্নয়নশীল দেশের মানুষ তা মর্মে মর্মে অনুভব করি। পশ্চিমের কোনো কোনো পণ্ডত মনে করেন বর্তমান বিশ্বায়ন আসলে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের ফল, অর্থাৎ নতুন উৎপাদিকা শক্তির উচ্ছ্রয়ের অভিঘাতের ফসল। বিশ্ব পুঁজিতন্ত্র বিশ্বায়নকে কতটা বিশ্বমানবের কল্যাণের উপযোগী করতে পারবে তার ওপর নির্ভর করছে এই ব্যবস্থার সাফল্য। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের তো এটা আরম্ভমাত্র, তার বিকাশ বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের বিপর্যয় ডেকে আনবে কি না তা এখনও কেউ জানে না। আরেকটি শক্তি-উৎসের উদ্ভাবনও আসন্ন আর সেটা হলো অ-ফসিল জ্বালানি আবিষ্কার। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স একযোগে ফিউশন এনার্জি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে, তাতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হবে পানি এবং তাতে কোনো তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য থাকবে না, শক্তির পরিমাণও হবে বিপুল। এই প্রযুক্তি কি মুষ্টিমেয় পরাশক্তি দীর্ঘকাল তাদের একচেটিয়া দখলে রাখতে পারবে? অবশ্যই না। আমরা তখন বুঝতে পারব পৃথিবীর চেহারাটা অতঃপর কেমন হবে আর উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধি সত্যিই উৎপাদন সম্পর্ক বদলায় কি না। সেই দিন কিন্তু বেশি দূরে নয়।
‘মশিউল আলম জানতে চেয়েছেন, ‘পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেন প্রথম রাশিয়াতেই ঘটল, কী করে ৭০ বছর টিকে থাকল আর কেনইবা ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো?’
‘এ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত’, তবে সবচেয়ে সহজ অনুমান : ইউরোপের সর্বাধিক দীর্ঘস্থায়ী সামন্ততন্ত্র ছিল রাশিয়ায় আর লেনিনের ভাষায় সে জন্য ‘বিশ্বপুঁজিতন্ত্রের দুর্বলতম গ্রন্থি’, যথাসময়ে সেখানে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেনি, যখন ঘটল তখন কমিউনিস্টরা তা ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন, তাঁরা সমাজ বিকাশের একটি অপরিহার্য পর্যায় পুঁজিতন্ত্র এড়াতে চাইলেন আর সে জন্যই শেষ পর্যন্ত টেকসই সমাজতন্ত্র নির্মাণে সফল হননি। ৭০ বছর রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র টিকে ছিল প্রথমে বিপ্লব থেকে উৎপাদিত শক্তি ও জনগণের প্রবল আশাবাদের কল্যাণে, শেষে রাষ্ট্রশক্তির কঠোরতম নিয়ন্ত্রণে। কালে কালে প্রথম দুটি উবে যায়, থাকে শুধু শেষেরটি। সমাজে ব্যাপক দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটে, আমলাতান্ত্রিকতার দরুন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিপ্লবের সুফল কুড়োতে ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে রাশিয়া ব্যর্থ হয়। টফলারের মতে, ‘সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন-সম্পর্ক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে বাধা হয়ে ওঠে’, নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের সঙ্গে পুরনোদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে, গর্বাচেভ সমাজতন্ত্র সংস্কারে উদ্যোগী হন; কিন্তু ততদিনে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষয়ে গিয়েছিল, তাই সংস্কার আর সম্পন্ন হলো না, ভেঙে পড়ল গোটা কাঠামো।
‘এভাবেই রাশিয়ায় পুঁজিতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটল, যে-ব্যবস্থাকে এড়াতে চাওয়া হয়েছিল এবং ‘অপুঁজিতান্ত্রিক বিকাশের পথ’ নামে একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে বিপুল শক্তি ও অর্থের অপচয় ঘটানো হয়েছিল, আমরা জানি পৃথিবীর কোথাও তা সফল হয়নি। এর বেশি কিছু বলার মতো জ্ঞানের পুঁজি আমার নেই। তবে এও বলা প্রয়োজন যে, রাশিয়া ব্যর্থ সমাজতন্ত্র আমাদের জন্য কিছু ইতিবাচক অবদানও রেখে গেছে; সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার দ্রম্নত পতন, তৃতীয় দুনিয়ার
উত্থান (বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ঘটনা-পরম্পরাও প্রসঙ্গত স্মর্তব্য), সমতাভিত্তিক সমাজে জীবনযাত্রার কিছু মূল্যবান দৃষ্টান্ত যা অতীতে কোথাও ছিল না, আজও নেই।’
------ছয়-----
দ্বিজেন শর্মা বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলেন, তাঁর মনটা ছিল বিজ্ঞানীর মন। ভাগ্যচক্রে তা ঘটেনি, কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর চিন্তা, পড়াশোনা ও লেখালেখি কখনো থামেনি। এ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তিনি এক বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ কামনা করতেন। বিজ্ঞান শিক্ষা ছিল তাঁর গভীর ভাবনার বিষয়গুলোর অন্যতম। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার জন্য ছেলেমেয়েরা যে-বয়সে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ পায় তার অনেক আগে, কৈশোরের শুরুতেই বিজ্ঞানের রহস্যময় জগতের সঙ্গে তাদের একটি মধুময় সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।
কীভাবে তা গড়ে তোলা সম্ভব? বিজ্ঞান বিষয়ে সুখপাঠ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও সায়েন্স ফিকশন বা বিজ্ঞান-রহস্যোপন্যাস পড়া, বিজ্ঞানবিষয়ক চলচ্চিত্র, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি দেখার মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের দেশে এসব উপকরণ ও উদ্যোগ অপ্রতুল। বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালেখির পরিমাণ খুব কম এবং সেগুলো অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য সুখপাঠ্য ও প্রাঞ্জল নয়।
জীবনের শেষ নেই নামের বইয়ের ভূমিকায় দ্বিজেন শর্মা এসব কথা লিখেছেন। তাঁর মতে, ‘আমাদের কাছে বিজ্ঞানের পরিচয় ও প্রতিষ্ঠা অর্থকর বিদ্যা হিসেবেই গণ্য। অজানাকে জানার, প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটনের প্রবল কৌতূহল থেকে আমরা বিজ্ঞান শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হই না। আমাদের দেশের বিজ্ঞানের সেরা ছাত্ররাও যে কর্মজীবনে সৃজনশীল বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জনে ব্যর্থ হন, এর মূলে পূর্বোক্ত কারণসমূহের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা ছাড়া এ সত্য অত্যন্ত স্পষ্ট যে আমাদের সমাজমানস মূলত বিজ্ঞান-বিমুখ। আমাদের অর্থনীতি তথা সাংস্কৃতিক জীবনে মধ্যযুগের অস্তিত্ব আজও সুপ্রকট। আমরা যান্ত্রিক প্রগতির যা-কিছু জীবনের দায়ে গ্রহণ করেছি, তা আজও আমাদের সমাজের বহিরঙ্গেই পৃথকীকৃত হয়ে রয়েছে। আমাদের অন্তরের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র স্থাপিত হয়নি। তাই আমাদের দৈনন্দিন আলোচনা থেকে কলাকৃষ্টির বিসত্মৃততর পরিসরেও বিজ্ঞান নির্বিশেষে অনুপস্থিত। বিজ্ঞান যেন আমাদের ক্রীতদাস; তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হলেও সে অচ্ছুত, তার সখ্য অনাকাঙিক্ষত।
‘তাই আমাদের ছেলেমেয়েরা শৈশব-কৈশোরে পারিবারিক সূত্রে বিজ্ঞানমুখী হবার অনুপ্রেরণা লাভে স্বাভাবিকভাবেই ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতা এবং পরবর্তীকালের ত্রম্নটিপূর্ণ বিজ্ঞান শিক্ষার যুগ্ম প্রতিক্রিয়ার ফলেই সম্ভবত আমাদের বিজ্ঞান বন্ধ্যা, নিষ্ফলা।’
দ্বিজেন শর্মা মনে করতেন, এই সমস্যার যে-কোনো সমাধান নেই তা নয়। তবে এজন্য ব্যাপক উদ্যোগ প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে সুখপাঠ্য ও প্রাঞ্জল বই লেখার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, এবং নিজে সেই চেষ্টা কিছুটা করে গেছেন। ডারউইন, বিবর্তনবাদ, উদ্ভিদজগৎ ও প্রকৃতি-পরিবেশ বিষয়ে তিনি প্রাঞ্জল ও সুখপাঠ্য ভাষায় অনেক লেখা লিখেছেন। অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ, প্রাবন্ধিক মফিদুল হকসহ অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশে বিজ্ঞান বিষয়ে সুন্দর ভাষায় লেখালেখিতে দ্বিজেন শর্মা ছিলেন অনন্য।
বিজ্ঞান শিক্ষা তো বটেই, সামগ্রিক শিক্ষা সম্পর্কেও দ্বিজেন শর্মা চিন্তাভাবনা করতেন। তিনি মনে করতেন, ‘আধুনিক শিক্ষা সর্বৈব শিল্পবিপ্লব-উত্তর ইউরোপের এবং সেজন্য তা নাগরিক পরিবেশের তথা শিক্ষিত পারিবারিক প্রতিবেশের অধিক উপযোগী। একটি গ্রামীণ শিশুমন প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে, সেখানকার জীবনধারা থেকে যে উদ্দীপনা ও অন্যান্য উপকরণ আত্তীকরণে লালিত হয়, তার সঙ্গে শিল্পপ্রধান সমাজের শিক্ষা-উপকরণের বৈপরীত্য আছে। তাই এ-শিক্ষা তার কাছে অনাকর্ষী ও পরকীয় হয়ে ওঠে (শিক্ষকদের উদ্যত বেতের কথা না-ই বা ধরা হলো)। তার জগতের লাগসই শিক্ষাদর্শীর অভাবে তার পাঠ্য বিষয়ে ‘গোবরেপোকা’ এত স্পষ্ট হয়ে ওঠে না, কোনো দিন ‘ব্যাঙের খাঁটি কথাটি’ কিংবা ‘নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি’ লেখা হয় না। যে শিশু দুপায়ে দাঁড়ানোর পরই উঠোনে কাদামাটি ছানে, ফড়িং ধরে, চাষবাসের ও মাছ ধরার উপকরণ দেখে, তার পক্ষে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, নদীতে মাছ ধরা, গাছের মগডালে পাখির বাচ্চা খোঁজার সঙ্গে স্কুলের বন্দি বেষ্টনীতে বইয়ের পাতার সজ্জাহীন নীরস তথ্যের বিমূর্ত বস্ত্ত থেকে জ্ঞানার্জনের বিরক্তিকর মলস্নযুদ্ধ কি তুলনীয়? এভাবেই আধুনিক শিক্ষার উপকরণ ও পদ্ধতি এ দুয়ের সঙ্গেই তার অন্তর্লীন এক বিরোধ গড়ে ওঠে এবং শেষাবধি তা শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতা দেখা দেয়।’
দ্বিজেন শর্মা কবিতা লেখেননি, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ও মন কাব্যিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। তাঁর বিজ্ঞানচিন্তায় ও পরিবেশ ভাবনায় সৌন্দর্যবোধের স্থানটি ছিল একদম কেন্দ্রে। প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে তিনি মূলত যা দেখতে পেয়েছেন তা হলো সৌন্দর্য। তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন নিসর্গশোভা। তাঁর দৃষ্টিতে জগতের কোনো গাছ, কোনো ফুল, কোনো নদী, কোনো প্রাণী অসুন্দর ছিল না। প্রাকৃতিক জঙ্গল যেমন, তেমনই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা উদ্যান বা বাগানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। উদ্যানের মধ্যে প্রাকৃতিক জঙ্গলের বিশৃঙ্খলা তাঁর ভালো লাগত না।
একই কথা প্রযোজ্য নগরের সৌন্দর্যায়ন কিংবা পথতরু রোপণের ক্ষেত্রেও। তিনি রমনা উদ্যানের অনেক গাছ কেটে ফেলার পরামর্শ দিতেন, কারণ সেগুলো উদ্যানের পরিপাটি সৌন্দর্যের পক্ষে বেমানান, কিংবা অন্যান্য গাছের জন্য ক্ষতিকর। নগরীর মধ্যে পথতরু লাগানোর ক্ষেত্রেও তিনি সুবিবেচিত পরিকল্পনার পক্ষে ছিলেন। কোথায় কোন গাছ লাগাতে হবে, কোন গাছের পাশে কোন গাছ লাগানো হলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে ইত্যাদি খুঁটিনাটি নানা বিষয়ের দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিল।
তাঁর সৌন্দর্যবোধ সর্বাঙ্গীনভাবে মানুষের উন্নততর জীবনের আকাঙক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের পক্ষে তাঁর জোরালো অবস্থানের পেছনে কোনো রোমান্টিকতা ছিল না, ছিল অতি জরুরি বাস্তববুদ্ধি। মানুষের দ্বারা প্রকৃতির যথেচ্ছ শোষণ ও দোহনের মধ্যে তিনি মানব জাতির অস্তিত্বের সংকট দেখতে পেতেন। এর পেছনের প্রধান শক্তি হিসেবে তিনি প্রথমে চিহ্নিত করেন পুঁজিতন্ত্রকে। তারপর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও দেখতে পেয়েছেন প্রকৃতির যথেচ্ছ দোহন ও শোষণ। তখন তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বৈষয়িক উন্নতি তথা সীমাহীন ভোগবিলাসের লালসাই এই ক্ষেত্রে মূল সমস্যা। বৈষয়িক সম্পদ তথা আরাম-আয়েশের বৃদ্ধি ঘটাতে হলে প্রকৃতিকে যথেচ্ছ শোষণ ও দোহন ছাড়া গত্যন্তর নেই – মানুষের এই দুর্বুদ্ধিই তাকে তার অস্তিত্বের সংকটে উপনীত করেছে এবং সীমাহীন ভোগলালসার লাগাম টানার আগ পর্যন্ত এই সর্বনাশা প্রক্রিয়া থামার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তিনি মানুষকে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন। প্রকৃতিকে জয় করা নয়, তাকে ভালোবেসে তার অংশ হয়ে স্নিগ্ধ সুন্দর জীবনযাপনের দিকে তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। তাঁর খুব প্রিয় একটা বই ফরাসি লেখক অতোয়ান দো সাঁৎ একঝুপেরির ছোট রাজকুমার; এ-বইয়ের মূল বাণী ভালোবাসা। মানুষ ও প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা দ্বিজেন শর্মাকে সুন্দর মনের অধিকারী করেছিল।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ইরান
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
কালবেলা
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
ইউক্রেন
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
জ্যোতির্বিজ্ঞান
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
জীবনযাপন
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মেহেদী হাসান
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
মসজিদ
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
ইয়েমেন
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
Exclusive
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
জনস্বাস্থ্য
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
লাতিন আমেরিকা
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
মহাকাশচারী
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
জোহরান মামদানি
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
ইহুদি
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
স্পেন
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট

No comments:
Post a Comment