মেক্সিকোতে এক দশকে গুমের ঘটনা বেড়েছে ২০০ শতাংশ

লাতিন আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতে গত দশ বছরে গুমের ঘটনা ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দেশটির পাবলিক পলিসি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ‘মেক্সিকো ইভালু’। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশটিতে গুমের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য একটি অংশ তরুণ। এ খবর দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান

এতে বলা হয়, ২০২২ সালের আগস্টের এক উজ্জ্বল সকালে ৩১ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক অ্যাঞ্জেল মন্টেনেগ্রোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মেক্সিকোর কুয়াউতলা শহরে সারারাত বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর তিনি কুয়ের্নাভাকায় ফেরার জন্য বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিলেন। সকাল ১০টার দিকে একটি সাদা ভ্যান এসে থামে। কয়েকজন ব্যক্তি নেমে তাকে ও তার এক সহকর্মীকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। কিছু দূর গিয়ে সহকর্মীকে ছেড়ে দেয়া হলেও মন্টেনেগ্রোকে আর পাওয়া যায়নি।

খবর পেয়ে তার মা প্যাট্রিসিয়া গার্সিয়া দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে পাওয়া যায় শুধু তার ছেলের একটি ক্যাপ ও এক পাটি জুতা। তিন বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ছেলেকে খুঁজে ফিরছেন। গার্সিয়া বলেন, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে হতাশা শুরু হয়।

মন্টেনেগ্রো মেক্সিকোর ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি নিখোঁজ বা গুম হওয়া মানুষের একজন। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুমের সংকট চলছে। জননীতি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান গল্কীরপড় ঊাধষúধ–র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে দেশে গুমের ঘটনা ২০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

মেক্সিকো ইভালুর নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরমান্দো ভার্গাস বলেন, এটি জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া সমস্যা। তার মতে, গত এক দশকে অপরাধী চক্রগুলোর দেশজুড়ে বিস্তার এবং মাদক পাচারের বাইরে নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়াই গুম বৃদ্ধির বড় কারণ।

অপরাধী গোষ্ঠীগুলো নতুন সদস্য সংগ্রহে জোরপূর্বক নিয়োগ করছে এবং নতুন এলাকা দখলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ‘নিশ্চিহ্ন’ করছে। সরাসরি হত্যা করলে নজরদারি বাড়ে বলে অনেক ক্ষেত্রে তারা লাশ গোপন কবরস্থানে পুঁতে ফেলে, পুড়িয়ে ফেলে বা অ্যাসিডে গলিয়ে দেয়। এভাবে লাশ গুম করে সহিংসতাকে ‘অদৃশ্য’ করে ফেলা হয় বলে মন্তব্য করেন ভার্গাস।

এদিকে মেক্সিকো সরকার অপরাধী চক্রগুলোর বিস্তার ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। ২০১৮ সালে সরকার নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে একটি জাতীয় অনুসন্ধান কমিশন গঠন করে এবং একটি উন্মুক্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করে। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদোর নিখোঁজের তালিকা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেন এবং সংখ্যা কমিয়ে ১২ হাজার ৩৭৭ দেখান। এতে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তা খারিজ করে বলেন, আগের প্ল্যাটফর্মে অনেক সমস্যা ছিল এবং সরকার নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিবন্ধিত গুমের সংখ্যাও প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম হতে পারে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মেক্সিকোতে ৯৬ শতাংশের বেশি অপরাধের কোনো সমাধান হয়নি।

সরকারি উদ্যোগের ঘাটতির কারণে গার্সিয়ার মতো বহু মা নিজেরাই খোঁজে নেমেছেন। তিনি ১২ নারীর একটি দলে যুক্ত হয়ে নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় ধাতব রড দিয়ে মাটি খুঁড়ে সম্ভাব্য গণকবরের সন্ধান করেন। মন্টেনেগ্রোর ফোনের শেষ সিগন্যালের সূত্র ধরে তারা কুয়াউতলার উপকণ্ঠের একটি মাঠে ছয়টি লাশ পান। কিন্তু এখনও তার ছেলের খোঁজ মেলেনি।

মেক্সিকোতে এক দশকে গুমের ঘটনা বেড়েছে ২০০ শতাংশ

No comments

Powered by Blogger.