‘নারী জঙ্গি’ কি নতুন অশনিসংকেত?

হাসিনা আইটবুলাসেনের কথা মনে আছে? হাসিনা ছিল ইউরোপের প্রথম আত্মঘাতী মহিলা জঙ্গি। সুন্দরী, ভদ্র, নম্র ২৬ বছরের এ ফরাসি তরুণী ছিল প্রচণ্ড হাসিখুশি স্বভাবের একটি মেয়ে। পড়াশোনায় ভালো। নাচে ভালো। তার মাঝে ধর্মানুরাগ বা ধর্মভীরুতা কেউ কখনও দেখেনি। এমনকি জীবনে কখনও তাকে কোরআন পড়তেও দেখেনি তার পরিবার। সারাক্ষণ ফোন, ফেসবুক, হোয়াটসআপ- এ নিয়ে ছিল তার ব্যতিব্যস্ততা। উল্টো নিয়মিত মদ্যপান করত। মাথায় হ্যাট পরত। তজ্জন্য এলাকায় উপাধিও জুটেছিল ‘কাউগার্ল’। সেই মেয়ে একদিন আচমকা ভোজবাজির মতো পাল্টে গেল। ধর্মবিরাগী মেয়ে হঠাৎ ধর্মানুরাগী হয়ে উঠল। হ্যাটের জায়গা নিল নিকাব-হিজাব। ফেসবুকের পোস্টে ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা নিল আইএসের বক্তব্য, ছবি-ভিডিও। জনে জনে দিতে লাগল জিহাদের ডাক। ৮ মাসের মাথায় জঙ্গিদের সঙ্গে ভিড়ে কোমরে বোমা বেঁধে পরিণত হল আত্মঘাতী বোমারুতে। তার এ অস্বাভাবিক পরিবর্তনে সবাই অবাক। কেউ সমীকরণ মেলাতে পারে না। তবে একটা জায়গায় মিলল। হাসিনা ছিল প্যারিসের সন্ত্রাসী হামলার সন্দেহভাজন মূল হোতা আবদেলহামিদ আবাউদের দূর সম্পর্কিত; কিন্তু মানসিকভাবে ঘনিষ্ঠ বোন (বিবিসি)।
জীবদ্দশায় হাসিনা সিরিয়ায় পালাতে চেয়েছিল। পারেনি। পেরেছিল ২০ বছর বয়সী ব্রিটিশ তরুণী আকসা মাহমুদ। কেবল নারীদের নিয়ে আইএসের একটি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট আছে। নাম ‘আল খানসা ব্রিগেড’। অন্তত ৬০ ব্রিটিশ তরুণী বর্তমানে এ ব্রিগেডে কাজ করছে। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৪। মাসিক বেতন ২৫ হাজার সিরিয়ান পাউন্ড। কাজ ইসলামবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। তারা সবাই ব্রিটেন থেকে সিরিয়ায় পালিয়ে গেছে। পরে তাদের বেশিরভাগ আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে করেছে। আকসা বর্তমানে ওই ব্রিগেডেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। ২০১৩ সালে ব্রিটেনের গাসগো থেকে পালিয়ে এ বাহিনীতে যোগ দেয়। ২০১৪ সালে ম্যানচেস্টার থেকে পালিয়ে একই বাহিনীতে যোগ দেন জাহরা এবং সালমা হেলেন নামে দুই যমজ বোন। আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে করে তারা ওই বছরই আবার বিধবা হন। ওই আকসা মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে তুরস্ক হয়ে পালিয়ে সিরিয়ায় যায় খাদিজা সুলতানা, আমিরা আবাসী ও শামিমা বেগম নামের তিন স্কুলছাত্রী। তিনজনই পূর্ব লন্ডনের বেথনল গ্রিন একাডেমির শিক্ষার্থী ( সূত্র : ডেইলি মেইল, মিরর, টেলিগ্রাফ)।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত ৭০০ ব্রিটিশ নাগরিক আইএসে যোগ দিতে সিরিয়া গেছে। তন্মধ্যে ১০০ নারী। আইএসের জঙ্গি তৎপরতা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২০০ পশ্চিমা তরুণী ওই ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এখনও ‘হাসিনা আইটবুলাসেন’ বা ‘আকসা মাহমুদ’দের পাওয়া যায়নি। তবে যা পাওয়া গেছে, তাতেই আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘুম হারাম। তাতেই ঘরে ঘরে এখন আতংক- বাসার শান্ত-বিশিষ্ট অবুঝ-সুবোধ তরুণীটি তলে তলে তথাকথিত জিহাদি কার্যক্রমে জড়াচ্ছে না তো? কারও প্ররোচনায় তাদের সহজ-সরল মেয়েটি জঙ্গিবাদের চোরাবালিতে পা দিচ্ছে না তো? এ আতংক এতকাল কেবল ছেলেদের নিয়েই ছিল। সম্প্রতি জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে চার তরুণী গ্রেফতারের ঘটনায় অভিভাবকরা তাদের তরুণী বা শিক্ষার্থী মেয়েদের নিয়েও ভীষণ চিন্তিত। কারণটাও অবশ্য অসঙ্গত নয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত ঢাকা মেডিকেল এবং মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য। দু’জন আবার একেবারে নীতিনির্ধারণী সদস্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘দাওয়াত’ দেয়া, সদস্য সংগ্রহ, তহবিল গঠনসহ বাংলাদেশে জেএমবির প্রসারে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে সর্বপ্রকার ‘জিহাদি’ কাজ করে যাচ্ছে। একইসঙ্গে তারা মোবাইল, ল্যাপটপ থেকে বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে অনলাইনে এ মুহূর্তের বিশ্বত্রাস আইএসের পক্ষে প্রচারণা চালাত।
অনলাইনে বিচিত্র গ্রুপ খুলে নিজেদের মধ্যে আইএসের তত্ত্ব, তথ্য, ছবি, অডিও ও ভিডিও ডাউনলোড এবং নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেইক আইডির মাধ্যমে আইএস সংক্রান্ত তথ্য-ছবি পোস্ট করত। আবার সেগুলো লাইক-শেয়ার করে মানুষকে আইএসে যোগদানে উৎসাহ দিত। এমনকি তাদের কাছে মিলেছে বিপুল পরিমাণ জিহাদি বই, বিভিন্ন ডকুমেন্ট, প্রচার কাজে ব্যবহৃত অডিও-ভিডিও-সিডি। মিলেছে আল কায়দার অন্যতম শীর্ষ নেতা আনওয়ার আওলাকীর জীবনদর্শনের বিপুল অডিও-ভিডিও, তার অডিও লেকচারের ২২টি অরিজিনাল সিরিজ, ৩০টি বাংলায় ডাবিংকৃত সিরিজ। অর্থাৎ এক কথায় আধুনিক জঙ্গিবাদের ষোলোকলায় (সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও আত্মঘাতী বোমা হামলা ছাড়া) এ কোমলমতি তরুণীদের এখন পাকা হাত। তাদের কতই বা বয়স? এই ২০ থেকে ২৫। এ বয়সে কেউ ডাক্তার হয়ে, কেউ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রী হয়েও; পড়াশোনা-ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে জঙ্গিবাদের মতো রাষ্ট্র-সমাজ-দেশবিরোধী এবং আত্মঘাতী ও সর্বনাশা পথ বেছে নিয়েছে; কী সেলুকাস! সত্যি বলতে কী, জঙ্গিবাদে নারীদের সম্পৃক্ততা এ দেশে আগে খুব বেশি একটা ভাবা হয়নি। বরাবরই তরুণ বা পুরুষেই আটকে ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ। বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজন নারীর প্রতি সন্দেহের তীর ছোড়া হয়েছে বটে। তবে সরাসরি অভিযোগ বা গ্রেফতারের ঘটনা এই প্রথম। তাও আবার প্রত্যক্ষ প্রমাণসহ।
সারা বিশ্বে এমনিতে অপরাধপ্রবণতায় নারীরা বরাবরই পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে। জঙ্গিবাদে তো আরও ব্যাক-বেঞ্চার (back bencher)। কিন্তু বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের দুর্দণ্ড প্রতাপে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যে এই চিত্রবদল শুরু হয়েছে, চার নারী জঙ্গি গ্রেফতারই তার প্রমাণ। শুধু এ চারজন নয়, গ্রেফতারকৃত ঐশীর ল্যাপটপে আবিষ্কৃত হয়েছে আরও ২৭ নারী জঙ্গির অস্তিত্ব। সামনে নারী জঙ্গির এ তালিকার দৈর্ঘ্য যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা আল্লাহ মালুম। কারণ শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদের সঙ্গে নারীর সংযোগ-সংশ্লিষ্টতা বাড়ছে। জঙ্গিবাদে তরুণদের ক্রমবর্ধনশীল সম্পৃক্ততার পেছনে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক-পারিবারিক-বিকৃত ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদি কারণ আবিষ্কৃত হলেও তরুণীদের ক্ষেত্রে এ রহস্য এখনও অনেকটা বারমুডা ট্রায়াঙ্গাল। তবে এ বিষয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদন বলছে, ব্রিটিশ তরুণীদের আইএসে যোগদানের অস্বাভাবিক আগ্রহ রীতিমতো আতংক তৈরি করেছে। কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটেনে আইএস দম্পতিরাই তরুণীদের উদ্বুদ্ধ করছে। তাদের জিহাদি জীবনের রোমাঞ্চকর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তাছাড়া ২০১৩ সালে আইএস ‘জিহাদ আল নিকা’ বা যৌন জিহাদের ধারণা চালু করে।
তাতে তরুণীদের প্রতি আইএস যোদ্ধাদের যৌন সেবাদানের আহ্বান জানানো হয়। যাতে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে যেসব যোদ্ধা লড়ছেন তারা প্রেরণা পান। আশ্চর্য হলেও সত্য, তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তখন মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো থেকে নারীরা মধ্যপ্রাচ্য যান আইএস মিশনে যোগ দিতে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইএসকে নিয়ে প্রতিদিন ১ লাখ টুইট হয়। তার অনেকই পাশ্চাত্য নারীর টুইট (২০ আগস্ট, ২০১৫)। জঙ্গি সম্পৃক্ততায় নারীর পাল্লা পুরুষের চেয়ে এখনও কম ভারি হলেও অভিভাবকদের আতংকের পাল্লায় নারী কিন্তু পুরুষের চেয়ে বহুদূর এগিয়ে। অভিভাবকরা সাধারণত মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। এখন সেখানে যোগ হল জঙ্গিবাদ। শরীরের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মনের গতিবিধি বা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কীভাবে? শরীর অনিরাপদ হলে তাকে নিরাপদ করা যায়; কিন্তু মন অনিরাপদ বা বিপথগামী হলে তাকে নিরাপদ করার বটিকা কই? বাবা-মা তাদের প্রিয় আত্মকেন্দ্রিক সন্তানটি ফেসবুক-ইন্টারনেটে গোপনে, ছদ্মনামে কী করছে কিংবা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে কোথায় যাচ্ছে, তা জানবে কীভাবে? খেয়াল করলে দেখবেন, গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের জঙ্গি সস্পৃক্ততার খবরে সিংহভাগ ক্ষেত্রে তাদের অভিভাবক-শিক্ষক-বন্ধু-বান্ধব বিস্মিত। তাদের কাছে খবরটি অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য। জঙ্গিবাদে দেশ ধুঁকছে অনেকদিন। এখনও অন্ধকার সুড়ঙ্গে সবাই আলোর মুখ খুঁজছি। সেখানে ঐশীদের মুখ। এটা পুরো দেশের জন্য নিঃসন্দেহে নতুন অশনিসংকেত।
‘নারী’ কবিতায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারীকে বলেছেন-
‘জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য-লক্ষ্মী নারী
সুষমা লক্ষ্মী, নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারী? ’
আজকের নারী জঙ্গি ডাক্তার ঐশী বা ব্রিটেনের আকসা মাহমুদ বা প্যারিসের হাসিনা আইটবুলাসেনকে দেখলে নজরুল কি এভাবে নারীর ছবি আঁকতে পারতেন?
আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট
aftabragib@yahoo.com