Saturday, July 12, 2025
অগ্নিঝরা জুলাই: এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি নাঈমার বাবা-মা by ফাহিমা আক্তার সুমি
অগ্নিঝরা জুলাই: এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি নাঈমার বাবা-মা by ফাহিমা আক্তার সুমি
শহীদ নাঈমা সুলতানার মা আইনুন নাহার মানবজমিনকে বলেন, সন্তান মারা যাওয়ার ট্রমা থেকে এখনো বের হতে পারছি না। সারাক্ষণ চোখের পানি ঝরতে থাকে। ১৯শে জুলাই বিকালের দিকে নাঈমা চারতলার বারান্দায় দাঁড়ানো অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়। বিকাল ৪টার দিকে নাঈমা তার রুমে বসে ‘বয়কট ছাত্রলীগ’, ‘কোটা সংস্কার চাই’ সহ নানা স্লোগানে রঙিন কালিতে প্রতিবাদী পোস্টার আঁকছিল। আঁকাআঁকি থেকে উঠে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আম্মু পিৎজা বানাবো। ফ্রিজে চিকেন আছে নাকি? এরপর বলে, ‘বেলকনিতে কাপড়গুলো শুকিয়েছে আমি নিয়ে আসি’- এই কথা বলে বারান্দায় যায়। সে সময় উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে পুলিশ গুলি করতে করতে ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় ছাত্ররা আমাদের বাসার নিচে অবস্থান করছিল। তখন বাসার ডানে-বামে যে বাসাগুলো রয়েছে সেখানের সব পরিবারের লোকজন বারান্দায়, ছাদের উপরে গিয়ে দেখছিল। ওই সময় আমার মেয়েটা বারান্দায় দাঁড়ানো ছিল। আমি পেছনে ছিলাম এক-দুই মিনিটের জন্য পাশে থাকা রান্নাঘরে যাই। তখনই আবার রান্নাঘর থেকে ছুটে যাই মেয়েটাকে আনতে বারান্দার দিকে। গিয়ে দেখি আমার মেয়ে পড়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, ওইদিন আমিও মেয়েটার সঙ্গে চলে যেতে পারতাম। আমি তার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, গুলির কোনো শব্দ পাইনি। মেয়েকে যে গুলিটা করা হয়েছে সেটি ছিল স্নাইপারের গুলি। ওর মাথার ক্ষত কতোটুকু গভীর হয়েছিল, সেটি এখনো চোখে ভাসে। মাথার মগজ বেরিয়ে গুঁড়ি হয়ে গিয়েছিল। আমার বাসা-বারান্দা রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। ছাত্ররা নিচ থেকে দেখেছিল গুলি লেগেছে কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি।
উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন নাঈমার পরিবার। তিন ভাই-বোন তাদের মাকে নিয়ে থাকতেন। বাবা পল্লি চিকিৎসক। তিনি গ্রাম থেকে আসা-যাওয়া করেন। নাঈমার ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে চিকিৎসক হবেন। আইনুন নাহার বলেন, ২০২২ সালে ঘর-বাড়ি ফেলে রেখে সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় আসি। অনেক স্বপ্ন ছিল- তাদের বড় করবো, মানুষের মতো মানুষ করবো। ভালো স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করাবো। নাঈমা অত্যন্ত মেধাবী ছিল। শুরু থেকে ওর প্রথম হওয়া কেউ ঠেকাতে পারতো না। নাঈমার জন্ম ২৫শে জুলাই ও মারা গেল ১৯শে জুলাই। কীভাবে যে আমাদের দিন যায়, কী হচ্ছে- একমাত্র আমরাই জানি। মেয়েটার জন্য ভালো-মন্দ রান্না করতাম। সব সময় ভালো-মন্দ খেতে চাইতো। জন্মদিন এলে ওর বড় বোন ওকে না জানিয়ে গিফট কিনতো, সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। আজ আর আমাদের কারও মনে খুশি নেই। আমাদের হাসি-খুশি সব হারিয়ে গেছে। খুব সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতো। আমি এবং ওদের বাবা দু’জনই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। নাঈমা সব সময় বলতো- আমার বাবা-মা আমার গর্ব। আমিও বড় হয়ে ডাক্তার হবো।
তিনি আরও বলেন, আমার খুব ইচ্ছা ছিল একবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার। কিন্তু সেখানেও বৈষম্য। অনেকে তার সঙ্গে দেখা করেছে কিন্তু আমার একবারের জন্যও দেখা হয়নি। আমার মেয়ে তো আন্দোলন নিয়ে অনেক কিছু করেছে। সে সব সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ থাকতো। ১৯শে জুলাই আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার, স্যালাইন কোথায় দিচ্ছে সেটি গ্রুপে গ্রুপে শেয়ার করতো। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুইটা লোক আমার বারান্দার দিকে বন্দুক ধরে আছে। তার মধ্যে একটা লোক নিচের দিকে গুলি করছে, আরেকটা লোক আমার নাঈমার দিকে টার্গেট করে গুলি করেছে। তিনি বলেন, আমার কষ্ট তো থামবে না। তবে একদিক থেকে আমি গর্বিত যে, আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে, আমি একজন শহীদের মা। কিন্তু আমি নিজেকে লজ্জিতও মনে করি, আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়। একজন মায়ের পাশে থেকেও একজন সন্তানের নিরাপত্তা ছিল না। বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে যদি গুলি খেতে হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তাটা কোথায়? সবার কাছে আমার এই একটাই প্রশ্ন। এটার বিচারটা করা উচিত। যেন ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিস্ট তৈরি না হয়।
শহীদ নাঈমার বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, সন্তান হারানো কোনো বাবাই ভালো থাকতে পারে না। আজ এক বছর হয়ে এলো, আমার সন্তান আমাকে বাবা বলে ডাকে না। সেই ১৯শে জুলাই থেকে আমরা পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমার বাচ্চাকে টার্গেট করে গুলিটা করা হয়েছে। মাথার বাম দিকে গুলিটা ঢুকে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। চোখের সামনের এই দৃশ্য কি কখনো ভুলে থাকা যায়। ওর মা দেখে সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারায়। আমাদের এখন মানসিক চিকিৎসক দেখাতে হচ্ছে। মেয়েটার মেধা ভালো দেখে তাকে মাইলস্টোন কলেজে ভর্তি করা হয়। এ বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। আমার দুই মেয়ে এক ছেলের মধ্যে নাঈমা ছিল মেজো। আমিতো আমার মেয়েকে আর কোনোদিন পাবো না। এই জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এটি খুব ধীরগতিতে চলছে, এই কার্যক্রমটা আরও ত্বরান্বিত হতে হবে। যারা জীবন দিয়েছে তাদের হত্যার বিচার যেন সুষ্ঠুু এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হয়। সুষ্ঠু বিচার হলে এটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে থাকবে আজীবন এবং সমস্ত রাজনীতিবিদরা এখান থেকে শিক্ষা নেবে। বিচার সঠিক এবং স্বচ্ছ হতে হবে, কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়। যারা দোষী শুধুমাত্র তাদের বিচারটাই যেন হয়। তিনি বলেন, আমার মেয়ে যে স্বপ্ন বা উদ্দেশ্য নিয়ে যুদ্ধ করেছিল সেটি পূরণ হয়েছে। শুধু আমার মেয়ে নয়, সমস্ত শহীদরা যে উদ্দেশ্য-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছে, হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। তাদের রক্তের বিনিময়ে সুন্দর একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই। যে আশা নিয়ে জুলাই আন্দোলন করেছিল, ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছিল সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়। তাদের স্বপ্ন যেন পূরণ হয়। এই বাংলায় আমরা কোনো বৈষম্য চাই না। সবার জন্য হোক এই দেশটা। যেই ক্ষমতায় আসুক যেন বৈষম্যমুক্ত, শোষণমুক্ত এবং সবার জন্য যেন এই আবাসনটা একটা নিরাপদ ভূমিতে রূপান্তর হয়।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1389)
- ▼ 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment