তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু আসল বিজয়ী কি ড. ইউনূস? by যুধাজিৎ শংকর দাস
আমি যে ঘূর্ণিঝড়ের কথা বলছি, তা হলো আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ও নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিনের সংঘাত। এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংকট ও রাজনৈতিক বিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল। ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়া, সহিংসতা, নাটকীয়ভাবে শেখ হাসিনার পতন এবং হঠাৎ করে মুহাম্মদ ইউনূসের আবির্ভাব- সবকিছুই যেন ঘড়ির কাঁটার মতো সময়মতো ঘটেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূস জানান, হাসিনাকে সরানোর আন্দোলন ছিল সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলেছে, রাজনৈতিক দল ও ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো ছাত্রনেতাদের পেছনে মাঠের শক্তি জুগিয়েছিল। আজকের প্রশ্ন হলো- ফেব্রুয়ারি ১২’র নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলেও এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলেও, প্রকৃত বিজয়ী কি ইউনূস? রাজনৈতিক শক্তি না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি নিজের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করলেন? আর ইতিহাস কি তার প্রতি সদয় হবে?
৮৫ বছর বয়সী ইউনূস নির্বাচিত সরকার শপথ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ১৮ মাসের শাসনামলে তিনি যেসব লক্ষ্য নিয়েছিলেন, তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন- অর্ডিন্যান্স জারি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, সেনাপ্রধান ডিসেম্বর ২০২৫-এ নির্বাচন চাইলেও তিনি ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাচন নির্ধারণ করেন এবং সেই নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া- সব মিলিয়ে ইউনূস বড় বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শফকত রাব্বী বলেন, ৮৫ বছর বয়সে ইউনূস অল্প সময়ে প্রায় সব লক্ষ্য পূরণ করেছেন। তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রোডাকটিভ সরকারপ্রধান বলা যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, ইউনূস অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে ও নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জনতার উচ্ছৃঙ্খলতা রোধ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। ইউনূসের বড় ব্যক্তিগত বিজয় হলো- তিনি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ভোট সম্পন্ন করেছেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতিও আদায় করেছেন। সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, বাংলাদেশের অন্তত ৪০ শতাংশ ভোটার-সমর্থিত দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করেও তিনি তা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। এটা একপ্রকার অলৌকিক ঘটনা।
ইউনূস-হাসিনা দ্বন্দ্বের শিকড়
এই সংঘাতের সূত্রপাত বহু আগে। ২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র আওতায় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে ইউনূসকে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ইউনূসের বিরুদ্ধে চাপ বাড়তে থাকে। গ্রামীণ টেলিকমের শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সমালোচকরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে উল্লেখ করেন। অবশেষে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন
ড. ইউনূস অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে পারেননি। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও জনতার হাতে হত্যার ঘটনা অব্যাহত ছিল। নারীর অধিকার ইস্যুতে ইসলামপন্থীদের দাবির কাছেও তিনি নতি স্বীকার করেন। তবে তিনি তথ্য সুরক্ষা, ডাটা প্রাইভেসি ও ক্লাউড কম্পিউটিং সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স পাস করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তার প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোটে ৬২ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিলেও, বিএনপি তার কিছু ধারায় আপত্তি জানিয়েছে। ফলে এর বাস্তবায়ন অনিশ্চিত।
রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া কীভাবে সফল?
ড. ইউনূসের নিজস্ব রাজনৈতিক দল নেই। ছাত্রদের আহ্বানে তিনি দায়িত্ব নেন। কিন্তু তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের মতো শক্তিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একত্র করতে সক্ষম হন। তিনি ছাত্রনেতাদের সংগঠন এনসিপি ও যুবসমাজের সমর্থন পান। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতাও বড় ভূমিকা রেখেছে।
এখন ইউনূসের ভবিষ্যৎ কী?
কেউ কেউ ধারণা করছিলেন তিনি হয়তো প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, তবে বিএনপি ক্ষমতায় থাকায় সেই সম্ভাবনা কম। অধ্যাপক শাহান মনে করেন, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করাই তার বড় অর্জন। তবে বিশ্লেষকরা বলবেন- তার সাফল্য ও ব্যর্থতা মিলিয়ে এক মিশ্র উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন।
সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, ইউনূস প্রমাণ করেছেন তিনি আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক অ্যাক্টর।
কিন্তু ইতিহাস কি মুহাম্মদ ইউনূসকে উষ্ণ আলিঙ্গন দেবে? স্বদেশ রায়ের ভাষায়, ইতিহাস বেছে নেয়। সবাইকে জায়গা দেয়, কিন্তু সব বিজয়ীকে নয়।
(অনলাইন ইন্ডিয়া টুডে থেকে অনুবাদ)

No comments