Sunday, August 9, 2026
লাশই যাদের নিত্যসঙ্গী, কবরই যাদের কর্মস্থল by এমরানা আহমেদ
লাশই যাদের নিত্যসঙ্গী, কবরই যাদের কর্মস্থল by এমরানা আহমেদ
এভাবে দীর্ঘ ২০ বছরে অন্তত ৩০ হাজার মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খনন করেছেন ৫০ বছর বয়সি গোরখোদক মিঞা হোসেন। বিভিন্ন রকমের মানুষকে কবরস্থ করেছেন তিনি। ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি, কিশোর-তরুণসহ সব বয়সি মানুষ তার হাতে মাটির অন্দরে চলে গেছেন। বাবা সোহরাব মিঞা প্রথম তার হাতে কোদাল তুলে দিয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু। এখন কবর না খুঁড়লে বোধহয় পেটের ভাতই হজম হয় না। এমন অনুভূতিই আমার দেশকে জানালেন মিঞা হোসেন।
৩৫ বছরের ইকবালের আর কোনো আয়ের পথ নেই। সারা দিনে তিন-চারটি কবর খোঁড়েন তিনি। এ কাজে দিনে ৩০০ টাকা থেকে হাজার টাকাও আয় হয়। কবরস্থ করতে আসা মৃতের স্বজনেরা খুশি হয়ে যা দেন, তাই নেন। কোনো দাবি করেন না। কারো কাছে জোরও করেন না তারা। গরিব মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে তারা কোনো টাকা নেন না। ভালোবেসেই তাদের কাজটি করে দেন।
তবে এমনও ব্যক্তি আসেন, যারা স্বজনদের কবরস্থ করে কোনো টাকা-পয়সা না দিয়েই চলে যান। মানবতার খাতিরে তারা তা মেনে নেন। শুধু কবর খোঁড়া নয়, কবরের দেখভালও করেন তারা। স্বজনেরা খুশি হয়ে মাসিক একটা টাকা দেন। এ টাকাটা তাদের বাড়তি আয়। প্রতিদিনকার আয় আর বাড়তি এ আয়ের টাকায় কোনো রকমে চলে তাদের সংসার।
গোরখোদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা প্রতিদিন এ কাজ করেন নিজ দায়িত্বে। বেশির ভাগ মানুষের দেহের মাপ সাড়ে তিন হাত ধরেই তারা প্রতিটি কবর কাটেন। কবরস্থ করতে তারা শুধু কবর খুঁড়ে দেন। বাকি বাঁশ, চাটাই সরবরাহ করা হয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে।
কবরস্থান কর্তৃপক্ষের অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে গড়ে ৩০-৩৫টি লাশ আসে। প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য সরকারি ফি ৫০০ টাকা। ছোট বাচ্চাদের লাশের জন্য চাটাই, কবর খোদাই, বাঁশের জন্য ৪৪৮ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়। ছোট থেকে বয়স্ক লাশের দাফনের জন্য ১ হাজার ১০৫ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়।
পৃথিবীতে বিচিত্র পেশার মানুষের বসবাস। তেমনি মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে সংসারের চাকা ঘোরে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন গোরস্থানে। কেউ ডাকুক আর না-ই ডাকুক, তারা নিজ থেকে কাজটি করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। তাদের নির্দিষ্ট কোনো বেতন নেই, নেই মাসিক ভাতাও। কবর খুঁড়ে যা বকশিস পান, তাতেই চলে তাদের সংসারের চাকা।
শুধু ইকবাল, নাজমুল হাসান নন, তার মতো ৪২ জন আজিমপুর কবরস্থানে কবর খোঁড়ার কাজ করে সংসার চালান। তাদের দিনভর একটাই কাজ—কবর খোঁড়া এবং মৃত ব্যক্তিকে দাফনে সহায়তা করা। দুটি গ্রুপ মিলে কবর খোঁড়াখুঁড়ির কাজটি করেন তারা। সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত একটি গ্রুপ। দ্বিতীয় গ্রুপটি কাজ করেন বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। কিন্তু লাশ চলে এলে রাত ১টা, ২টা পর্যন্তও খননের কাজ করতে হয়। তবুও কোনো অভিযোগ বা দুঃখ নেই তাদের। সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পুরস্কার, প্রতিদানের আশা আর মনের প্রশান্তি থেকে কাজটি করেন তারা।
আজিমপুর কবরস্থানে গোরখোদকদের একজন দলনেতা আছেন। তাদের প্রতিদিনের আয়ের টাকা এ দলনেতার কাছে জমা হয়। পরে ওই টাকা সবার মধ্যে ভাগ করে দেন দলনেতা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা বা বিরোধ নেই। শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তারা।
ধানমন্ডির এক বাসিন্দা মদিনা জানান, প্রায় দুবছর আগে তার শ্বশুর মারা গিয়েছেন। এ আজিমপুর গোরস্থানেই তাকে কবরস্থ করা হয়। তার কবরটি দেখভালের জন্য যাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তিনি ভালোভাবেই তার দায়িত্ব পালন করছেন। তার তদারকিতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে বিরূপ অভিজ্ঞতাও রয়েছে এ গোরখোদকদের নিয়ে। কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা মোস্তাফা তার স্ত্রীর কবরটি দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন এমনি একজন গোরখোদকের ওপর। তিনি অভিযোগ করেন, নিয়মিত নির্ধারিত মাসিক অর্থ গ্রহণ করেও কবরের কোনো যত্ন নেননি সে গোরখোদক। প্রথমদিকে ঠিকমতো চললেও কয়েক মাস পর গিয়ে দেখা যায়, কবরের নামফলক নেই। যত্নও নেওয়া হচ্ছে না। ফোনেও পাওয়া যায় না তাকে। পরে অফিসে জানালে কর্তৃপক্ষ তাকে ডেকে তিরস্কার ও সতর্ক করে দেয়।
২৮ জুলাই দুপুর ১২টা। সাইকেলে করে এলেন আরেক গোরখোদক সাইফুল। গত সোমবার রাতে দুটি কবর খোঁড়ার কাজ করেছেন। এখন এসেছেন দাফনের কাজে সহায়তা করতে।
কবরের অপর এক পরিচর্যাকারী রাইসুল বলেন, এসব কবরের ফুলগাছ, ঘাসের যত্ন নেওয়া লাগে। সঙ্গে মাটি ঠিকঠাক রাখা, কবর গর্ত হলে মাটি ভরাট করা এসব কাজ করতে হয়। শুরুর দিকে আলগা ঘাস লাগানো হয়। এ ঘাস জন্ম না নেওয়া পর্যন্ত পানি দিতে হয়। তিনি আরো বলেন, এসব কাজের জন্য তাদের কোনো বেতন দেওয়া হয় না। স্বজনরাই খুশি হয়ে কিছু টাকা দেন। সে টাকায়ই আমাদের পেটে ভাত জোটে ।
গোরখোদক ইসমাইল, নিশাদ, রহিম, আলমগীর এ কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমার দেশের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানালেন, প্রথমদিকে তাদের কবর খোঁড়ার কাজটি করতে ভয় লাগত। কবরস্থান নিয়ে যে ভীতি তা বদলে গেছে কাজ করতে করতে। কিন্তু এখন কিছুই মনে হয় না। তাদের মতে, কবরস্থান পবিত্র জায়গা, কবরস্থানে খারাপ কিছুর দেখা মেলে না। তাদের সঙ্গেও কখনো আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। তারা জানান, এ কবরস্থানেই সারাদিন কাটে তাদের। এখানে ঢুকলে মনে প্রশান্তি আসে, মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়। খারাপ কাজ করার কথা কখনো মাথায়ই আসে না।
গোরখোদক ইবরাহিম বলেন, আমার বাবা কবর খোঁড়ার কাজ করতেন। তার মৃত্যুর পর আমি কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করি। যখন আমার বয়স ১৫ বছর, তখন থেকে আমি কবর খোঁড়ার কাজ করি। এ পর্যন্ত বহু কবর খুঁড়েছি। বাবার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আমি এ কাজ করি। এমনও আছে, একদিনে পাঁচ-ছয়টি কবর খুঁড়েছি। অনেক সময় কবর তৈরি করতে গিয়ে পুরোনো কঙ্কাল পেলে ওই কবরেই জায়গা করে গুঁজে রাখি।
তিনি আরো জানান, বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময় করোনা আক্রান্ত পরিবারের লোকজন বা আত্মীয়স্বজন মারা গেলে পাশে আসেনি কেউ। ওই সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোসল দাফন-কাফন, কবর খোঁড়াসহ সবকিছু একাই করে মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করেছি।
প্রতি ঈদ বা লম্বা সরকারি ছুটির আগে আগাম কিছু কবর খুঁড়ে রাখেন তারা। আর এসব কবর ছয় মাস অবধি খুঁড়ে রাখা যায়। ঈদে একটা টিম গ্রামে যায়। তারা ফিরলে বাকিরা যান।

About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1512)
-
▼
August
(59)
-
▼
Aug 09
(12)
- লাশই যাদের নিত্যসঙ্গী, কবরই যাদের কর্মস্থল by এমরা...
- গাজায় যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে টিনের কৌটায় প্রাণ পেল মা...
- দুই বছর পর প্রকাশ্যে শামীম ওসমান, করলেন কর্মীসভা b...
- পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা
- হুমকি-ধমকিতে ওস্তাদ ইসরাইল, নেতৃত্ব দেওয়ার মুরোদ নেই
- ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ইরানকে লক্ষ্য করে নয়—তু...
- গাজায় একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ মরদেহ উদ্ধার, ...
- রুনা লায়লার ‘মাস্ত কালান্দার’-এর পেছনের গল্প জানেন কি
- শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে হারানো যাবে না: যুক...
- ফিলিস্তিনপন্থি মার্কিনিদের ইসরায়েলে প্রবেশের অনুমত...
- ভারতে স্ত্রীকে প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে দিলেন স্বামী, ...
- ঠিক কোন বয়সে অভিনয়ে আসা উচিত, জানালেন তমা
-
▼
Aug 09
(12)
-
▼
August
(59)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment