যুদ্ধ থেকে পালাতে সাগরে ভেসে, গুলির মুখে পড়ে ইয়েমেনি তরুণের রোমহর্ষক এক যাত্রা

দ্য গার্ডিয়ানঃ আমাল সাহেলের (ছদ্মনাম) বয়স তখন ১৫ বছর। একদিন সে ও তার বন্ধুরা রাস্তায় পড়ে থাকা লম্বা একটা ধাতব টুকরা কুড়িয়ে পায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা ভেবে নিল এর সেরা ব্যবহার কী হতে পারে: একটি তলোয়ার। একটা বছর ধরে নিজেদের মহল্লায় অদ্ভুত সব ধ্বংসাবশেষ দেখতে দেখতে ওদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল—সাহেল যেগুলোকে ‘দারুণ সব ধাতব টুকরা’ বলত।

ইয়েমেনে সাহেলের নিজের শহরে বারবার বিমান হামলার কারণে এমন ভাঙাচোরা জিনিসের স্তূপ পড়ে থাকত, গৃহযুদ্ধে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাওয়ার আগে এই শহর ছিল বেশ শান্ত।

‘আমরা জানতাম না যে এগুলো বিপজ্জনক এবং আমাদের কাছে এগুলো স্রেফ অদ্ভুত জিনিস বলেই মনে হতো,’ সাহেল বলেন। ‘(আমার) এক বন্ধু তলোয়ারের মতোই সেটি নিয়ে খেলছিল, সেটা বাতাসে শাঁই শাঁই করে ঘোরাচ্ছিল। আমাকে একটু পরেই তাদের ছেড়ে চলে আসতে হয়, কারণ আমাকে বক্সিং প্রশিক্ষণের জন্য জিমে (ব্যায়ামাগার) যেতে হতো।’

সাহেল যখন নিজের ঘরে, সে তখনই একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পায়।

‘কী হয়েছে দেখার জন্য আমি উল্টো ঘুরে দৌড়াতে শুরু করলাম। গিয়ে দেখি আমার বন্ধুরা রক্তে মাখামাখি এবং এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে…ওদের একজন দৌড়ে এসে ঠিক আমার সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং আরেকজনের ঘাড় ফুঁড়ে গোলার একটি টুকরা গেঁথে ছিল। আমার মনে হয়, ততক্ষণে সে মারা গিয়েছিল।’

ওরা যে ধাতব টুকরাগুলো নিয়ে খেলছিল, সেগুলোর একটি ছিল আসলে এক অবিস্ফোরিত বোমা, যেটি হঠাৎ ফেটে যাওয়ায় বিস্ফোরণের কবলে পড়ে ছয়টি ছেলে।

‘আমরা গাড়ি আছে—এমন কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকলাম এবং ওদের হাসপাতালে নিয়ে গেলাম…দুই ঘণ্টা পর তারা এসে আমাদের জানাল, আমার তিন বন্ধু মারা গেছে। আমি বোধশূন্য হয়ে পড়ি, কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না।’

সাহেলের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার চারটি অভিজ্ঞতার মধ্যে এটি ছিল প্রথম। এখন তাঁর বয়স ২৩ বছর। পরের বছরগুলোতে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহী যোদ্ধা হিসেবে জবরদস্তিমূলকভাবে সামরিক দলে যোগ দেওয়া থেকে কোনোমতে রক্ষা পান সাহেল, তাঁর ওপর গুলি চালানো হয়েছিল, এরপর ইউরোপে পালিয়ে যাওয়ার পথে তিনি প্রায় ডুবে মরতে বসেছিলেন।

অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে ইয়েমেনে বেড়ে ওঠার দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতো, বলছিলেন সাহেল। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক। সাহেল বলেন, অনিন্দ্য সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য ও চমৎকার আবহাওয়ার এই নিরাপদ ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশটি ছিল ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের সেরা জায়গা’।

কিন্তু ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সবকিছু পাল্টে যায়। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের প্রথম দিনের কথা মনে করে সাহেল বলেন, ‘বোমার শব্দে আমি জেগে উঠতাম।’ গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগে এই যুদ্ধে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ মারা যায়।

হুতিরা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশের পশ্চিমে অবস্থিত তাঁর নিজের শহরটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং অস্ত্রে সয়লাব হয়ে যায়। সাহেল বলেন, ‘আমার মনে আছে, কোনো কোনো দিন বাইরে গিয়ে দেখতাম, বোমার কারণে বালু একদম কালো হয়ে আছে।’

পরের কয়েক বছর ধরে যখন যুদ্ধ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন সশস্ত্র দলগুলো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। কিন্তু সাহেল নিজের পড়াশোনায় মন দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এসব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতাম।’

নিজের একটা ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন ছিল সাহেলের। কিন্তু পার্ট-টাইম ফটোগ্রাফার ও মডেল হিসেবে কাজ করতে গিয়েই তিনি হুতিদের নজরে পড়ে যান। আর এটাই তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

সাহেল বলেন, ‘আমরা একটা পার্কে ফটোশুটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমন সময় তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয়।’ সেনারা তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও সামরিক ঘাঁটির ছবি তোলার অভিযোগ আনে। সাহেল বলেন, ‘তারা ক্যামেরাটি কেড়ে নেয়। এমনকি (ক্যামেরার) ছবিগুলো দেখার পরও তারা আমাকে তাদের ব্যারাকে ধরে নিয়ে যায় এবং মারধর শুরু করে।’

‘তারা বারবার বলছিল যে আমি যেহেতু ইংরেজি বলতে পারি, তাই আমি নিশ্চয়ই যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করি। আর আমি তাদের জন্যই ছবি তুলছি।’ তারা আমাকে তাদের সঙ্গে সেনা হিসেবে যোগ দিতে বলে। আমি যখন বললাম, ‘ভাই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি আপনাদের কোনো কিছুর মধ্যে জড়াতে চাই না,’ তখন তারা বলত, ‘না, তার মানে তুমি শত্রুদের সঙ্গে আছ। তুমি আমাদের হয়ে লড়ছ না কেন?’

শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া হলেও সাহেলের মনে হতে লাগল তিনি যেন একজন ‘পালিয়ে বেড়ানো মানুষ’, যাকে সবাই খুঁজছে। লোকেরা বারবার তাঁর বাড়িতে আসত এবং তাঁকে সেনাদলে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিত।

‘তারা আমাকে বলত, “তুমি খুব ভালো ও শিক্ষিত ছেলে। তুমি সুন্দর করে কথা বলতে পারো। চিন্তা কোরো না, আমরা তোমাকে যুদ্ধে পাঠাব না। আমরা তোমাকে নিরাপদে রাখব। আমরা তোমাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি বানাবো।” কিন্তু আমি জানতাম, তারা ১৪ বছরের ছোট শিশুদেরও ধরে নিয়ে যেত। এরপর পরিবারের কাছে তাদের লাশ ফেরত দিয়ে বলত, “সে এখন বেহেশতে আছে।” আমি আসলে মরতে চাইনি।’

২০২৩ সালে ২১ বছর বয়সে সাহেল দেশ ছাড়েন, গন্তব্য মিসর। ইয়েমেনের নাগরিকেরা ভিসা ছাড়াই যে গুটিকয়েক দেশে যেতে পারত, মিসর তার মধ্যে একটি। তিনি জানান, সেখানে যাওয়ার পর তাঁকে বারবার ইয়েমেনে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেওয়া হতো।

‘তুমি যে দেশে গেলে মারা পড়বে, এই নিয়ে তাদের কোনো দয়া নেই। তারা শুধু ফেরত পাঠিয়ে দেয়। আমার অনেক বন্ধুকেই এমন ভাগ্য মেনে নিতে হয়েছিল।’ তুরস্ক থেকে গ্রিসে যেতে মাত্র ১৫ মিনিট লাগে, এটা জানতে পেরে তিনি বন্ধুদের পরামর্শে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

তা করতে গিয়ে সাহেলকে তৃতীয়বারের মতো মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়েছিল।

তুরস্ক থেকে নৌকায় পার হতে টাকা দেওয়ার পরও সাহেলসহ একদলকে সাঁতরে তীরে উঠতে বাধ্য করা হয়েছিল, কারণ ওই মানব পাচারকারী পাহারারত গ্রিক কোস্টগার্ডের নজর এড়ানোর চেষ্টা করছিল। ‘আমি সাঁতরে তীরে পৌঁছে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখতে পেলাম একজন লোক আর একটি শিশু পানিতে ডুবে যাচ্ছে।’

তখন সাহেল আবার পানিতে নেমে পড়েন।

‘এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। ছেলেটার বয়স ১৬ বা ১৭ হবে, কিন্তু সে বড় ও মোটা ছিল এবং সাঁতারও জানত না। সে পানিতে ভেসে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, আর বারবার আমার মাথা পানির নিচে চেপে ধরছিল…আমি ডুবে যাচ্ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না ওকে কীভাবে বাঁচাব। সেদিন আমি চোখের সামনে মৃত্যু দেখেছি। অবশেষে আমি ঘুরে ওর পেছনের দিকে চলে যাই। এরপর ওকে ঠেলতে ঠেলতে সাঁতরাতে থাকি, যাতে সে আমাকে আর ধরতে না পারে।’

শেষমেশ তীরে ফিরে আসার পর সাহেল বেঁচে ফেরা ওই দুজনসহ একদল মানুষকে টানা পাঁচ ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে পার হতে সাহায্য করেন।

সাহেলের দলটি একটি পুলিশ স্টেশনে পৌঁছায়। তিনি বলেন, তাঁদের রাস্তায় ঘুমাতে বলা হয়েছিল। সাহেল শেষ পর্যন্ত গ্রিসে তিন মাস ছিলেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে একদম অপরাধীর মতো আচরণ করা হয়েছিল। বন্ধুরা তাঁকে বলেছিলেন, ইউরোপে তিনি কখনোই আশ্রয় পাবেন না। ‘তাঁরা বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যই একমাত্র যে দেশ, যেটি এখনো আশ্রয় দিচ্ছে।’

২০২৪ সালের শেষের দিকে সাহেল ফ্রান্সের ক্যালে শহরে যান ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার এক বিপজ্জনক যাত্রায় অংশ নিতে। ডিসেম্বরের শুরুতে যেদিন তিনি সমুদ্র পার হচ্ছিলেন, সেদিন ছিল বেশ ঠান্ডা, বৃষ্টি পড়ছিল।

সাহেল বলেন, ‘যারা এভাবে চ্যানেল পার হতে গিয়ে মারা যাচ্ছে, তাদের কথা আমি পাচারকারীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। পাচারকারী আমাকে বলল, যারা মারা গেছে তারা নাকি হিরো হতে চেয়েছিল!’ আমি ভাবলাম, মরে গেলে যাব। তবু স্বাধীন হওয়ার বড় সুযোগ যখন আছে, চেষ্টাটা অন্তত করে দেখব।’

শেষমেশ দেখা গেল, সবচেয়ে বড় বিপদটা নৌকা ডুবে যাওয়ার কারণে আসেনি, বরং এসেছিল আরেকজন পাচারকারীর সঙ্গে সাহেলের যাত্রার দায়িত্ব নেওয়া লোকটির এক ভয়ংকর মারামারির কারণে।

‘তারা বন্দুক বের করে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে লাগল। কে জানে কী কারণে তারা আমাদের মেরে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা শুধু দৌড়াতে লাগলাম আর লুকিয়ে পড়লাম। এত গোলাগুলির পরও সেখানে কোনো পুলিশ আসেনি।’

ওই দিন সন্ধ্যায় সাহেল আরও প্রায় ৬০ জনের সঙ্গে অন্য একটি নৌকায় উঠতে সক্ষম হন। আর এবার তাঁরা ঠিকঠাকমতো যুক্তরাজ্যে পৌঁছে যান।

পৌঁছানোর পর এক অন্য রকম অনুভূতি সাহেলকে ছুঁয়ে যায়। তিনি বলেন, সেখানকার আবহাওয়া আর অভ্যর্থনায় তিনি বেশ স্বস্তি পান।

‘যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আগে আমি বহুদিন মানুষের মুখে কোনো হাসি দেখিনি। আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছে, এমনটা অনুভব করেছিলাম। এখানে তুমি মানবতা আর দয়া খুঁজে পাবে। আমাকে আর মেরে ফেলা হবে না। আমি নিরাপদ।’

এ বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যে আইনি বৈধতা নিয়ে থাকা ও কাজ খোঁজার সুযোগ পাওয়ার পর সাহেল নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবেন। একই সঙ্গে ফেলে আসা ইয়েমেন নিয়ে বেদনাও তাঁকে পোড়ায়। সাহেলের ভাষায়, তাঁর দেশ ‘শয়তানের হাতে বন্দী এক টুকরা বেহেশত’।

‘আমি সত্যিই দেশটাকে খুব গভীরভাবে অনুভব করি। কিন্তু আমার সঙ্গে যা যা ঘটেছে, তা আমি ভীষণ ঘৃণা করি। আমি মাঝরাস্তায় গুলি খেয়ে অকারণে মরতে চাই না। আমি জগতে বড় কিছু করতে চাই এবং একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চাই। আমি এই জিনিসটারই খোঁজ করছি।’

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা তরুণ আমাল সাহেল। নিরাপত্তার স্বার্থে ছবিতে তাঁর মুখাবয়ব অস্পষ্ট করে দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা তরুণ আমাল সাহেল। নিরাপত্তার স্বার্থে ছবিতে তাঁর মুখাবয়ব অস্পষ্ট করে দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। ছবিটি দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

No comments

Powered by Blogger.