প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান কেন মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে by জাকারিয়া সুমন

একসময় ধারণা ছিল, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক চিরস্থায়ী। কিন্তু আজ ‘নো কন্ট্যাক্ট’ বা সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া অনেক পরিবারে বাস্তবতা। মা-বাবারা একে অকৃতজ্ঞতা বা বিশ্বাসঘাতকতা ভাবলেও বহু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কাছে এটি আত্মরক্ষার শেষ উপায়।

গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বিচ্ছেদ হঠাৎ ঘটে না। এটি দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত, অবহেলা, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ ও অপূর্ণ সম্পর্কের পরিণতি। সন্তান মনে করে, সে বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর মা-বাবা প্রায়ই সেই অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করেন বা তুচ্ছ করে দেখেন।

বেশ কয়েকজন পিএইচডি গবেষক এ বিষয়ের ওপর গবেষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটির ক্রিসটেন কার, ক্রেইটন ইউনিভার্সিটির আমান্ডা হোলম্যান, কলেজ অব চার্লস্টনের পি এ জেনা স্টিফেনসন অ্যাবেটজ ও ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কার জোডি কোয়েনিগ কেলাস ‘গিভিং ভয়েস টু দ্য সাইলেন্স অব ফ্যামিলি এসট্রেঞ্জমেন্ট: কমপেয়ারিং রিজনস অব এসট্রেঞ্জড প্যারেন্টস অ্যান্ড অ্যাডাল্ট চিলড্রেন ইন আ ননম্যাচড স্যাম্পল’ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। এ গবেষণায় ৮৯৮ জন মা-বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচ্ছিন্নতার কারণ সম্পর্কে মা-বাবা ও সন্তানের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। মা-বাবারা সাধারণত সন্তানের আপত্তিকর সম্পর্ক বা অতিরিক্ত অধিকারবোধকে বিচ্ছিন্নতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে।

মনের বন্ধুর হেড অব মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম এবং লিড সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর কাজী রুমানা হক বলেন, ‘মা-বাবা যখন পৃথিবীতে সন্তানকে নিয়ে আসেন, তখন মনে করেন যেহেতু আমার মাধ্যমে এসেছে, আমার মতো চলবে। কিন্তু একজন আলাদা মানুষ হিসেবে সন্তানেরও আলাদা মতামত থাকতে পারে। বিষয়টি অনেক সময়ই উপেক্ষা করা হয়। অভিভাবক হিসেবে মনে করেন, আমরা অনেক করেছি ওর জন্য। কিন্তু কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেন না, আমিও তো ব্যস্ততার কারণে বা কাজের কারণে সময় দিচ্ছি না। সন্তানের ওপর রেগে গিয়ে অনেকে গায়ে হাত তোলেন অথবা সাইলেন্স ট্রিটমেন্ট দেন। এটা খারাপ। বড় হওয়ার পরও সন্তান এটা মনে রাখে।’

রুমানা আরও বলেন, ‘সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, সন্তানের অর্জনকে ছোট করে দেখা। এটা সন্তানদের মনে ক্ষোভ তৈরি করে। অনেক সময় আমরা দেখেছি যে সন্তানেরা ছোটবেলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মা-বাবার মন ভরানো যায় না। পরীক্ষায় ৮০ বা ৯০ নম্বর পেলেও তাঁদের চাওয়া থাকে যেন ১০০ পাই। অর্জনগুলোকে অবহেলা করেন দেখে বন্ধন ভেঙে যায়।’

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, প্যারেন্টিং স্টাইলের ওপর নির্ভর করে সন্তানের সঙ্গে বন্ধন বাড়ে–কমে। যেই অভিভাবকের প্যারেন্টিং স্টাইলে এড়িয়ে যাওয়ার মনোভাব আছে, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেটার প্রভাব পড়ে। সঠিকভাবে সন্তান পালন করা না হলে দুই সম্পর্কের বন্ধনেও নেতিবাচক প্রভাব পরে। যেটার ফলাফল দেখা যায় বড় হওয়ার পর।
সন্তান বিয়ে করলে বা দেশের বাইরে গেলে মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদজনিত উদ্বেগ কাজ করে। সন্তানের জীবনের এই পরিবর্তন অনেকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারেন না। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, নিজেরা যেটা করতে পারেননি, চান যে সন্তান সেটা পূরণ করুক। নিজেদের অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে সন্তানেরা চাপে পড়ে যায়।

আঘাতের স্মৃতি: দুই পক্ষের দুই গল্প

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সম্পর্কচ্ছেদের কারণ হিসেবে প্রায়ই আবেগগত নির্যাতন, অতিরিক্ত সমালোচনা, অসম্মান, বিশ্বাসভঙ্গ বা শৈশবের গভীর মানসিক দূরত্বের কথা বলে। কখনো মা-বাবা শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও আবেগগতভাবে অনুপস্থিত ছিলেন।
আবার অনেক পরিবারে ভালোবাসা ছিল শর্তসাপেক্ষ—সন্তান মা-বাবার ইচ্ছামতো চললে সে স্নেহ, প্রশংসা ও গ্রহণযোগ্যতা পেত; কিন্তু ভিন্নমত প্রকাশ করলে, নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে বা প্রত্যাশার বাইরে আচরণ করলে তাকে অবহেলা, সমালোচনা কিংবা দূরত্বের মুখোমুখি হতে হতো।
অন্যদিকে অনেক মা-বাবা মনে করেন, তাঁদের সন্তানকে কেউ প্রভাবিত করেছে—জীবনসঙ্গী, বন্ধু বা আত্মীয়স্বজন। এতে তাঁরা নিজেদের দায়মুক্ত রাখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সন্তান প্রথমবারের মতো এমন কারও কাছ থেকে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পায়, যা তাকে নিজের পারিবারিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।

কেন অনেক মা-বাবা সমস্যাটি বুঝতে পারেন না

সমাজে মা-বাবার আচরণের সমালোচনা করাকে অনেক সময় অভদ্রতা, অবাধ্যতা বা অকৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সন্তান যখন নিজের কষ্ট, অপমান বা মানসিক আঘাতের কথা বলতে চায়, তখন অনেক মা-বাবা সেটিকে অভিযোগ হিসেবে নেন, অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়।
অনেকের ধারণা থাকে, ‘আমি তো সন্তানের জন্য এত কষ্ট করেছি, তাহলে সে কষ্ট পেল কীভাবে?’
অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন, লেখাপড়ার খরচ বহন বা সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়াকেই তাঁরা ভালো অভিভাবকত্বের প্রধান প্রমাণ মনে করেন। কিন্তু সন্তান প্রায়ই আবেগগত সমর্থন, সম্মান, বোঝাপড়া ও নিরাপদ সম্পর্কের অভাবের কথা বলে, যা মা-বাবার কাছে দৃশ্যমান না-ও হতে পারে।

ফলে সন্তান যখন তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে, তখন অনেক মা-বাবা সন্তানের ওপরই দোষ চাপান। কেউ বলেন, ‘আমরা তো তোমার ভালোর জন্যই করেছি।’ কেউ বলেন, ‘এত ছোট একটা বিষয় নিয়ে কষ্ট পাওয়ার কী আছে?’ এভাবে সন্তানের অনুভূতিগুলো বারবার অগ্রাহ্য হতে থাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্তান বুঝতে পারে, তার কথা শোনা হচ্ছে না; তখন সে দূরে সরে যায়।
এ কারণে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অনেক মা-বাবা সত্যিই বিস্মিত হন। তাঁরা প্রায়ই শেষ ঘটনাটিকে কারণ মনে করেন, অথচ বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আঘাত, অপূর্ণতা ও না-শোনা অনুভূতিগুলোই ছিল প্রকৃত কারণ। সন্তানের কথাগুলো তাঁদের কানে পৌঁছেছিল, কিন্তু সেসবের গভীরতা উপলব্ধি করার মানসিক প্রস্তুতি বা সক্ষমতা অনেক সময় তৈরি হয়নি।

সম্পর্কচ্ছেদ শাস্তি নয়, আত্মরক্ষার সিদ্ধান্ত

গবেষণা বলছে, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ সাধারণত হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের আশা, হতাশা ও সম্পর্ক ঠিক করার অসংখ্য চেষ্টা। সন্তান বারবার নিজের কষ্টের কথা জানায়, বোঝাপড়ার আশা করে এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু যখন সে দেখে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না, তখন ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।
তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পর্কচ্ছেদ প্রতিশোধ বা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; বরং নিজের মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান ও সুস্থতা রক্ষার জন্য নেওয়া একটি কঠিন সিদ্ধান্ত।

সূত্র: মিডিয়াম

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে। ছবি: প্রথম আলো

No comments

Powered by Blogger.