ভারতে ৩০ লাখ যৌনকর্মী

প্রায় এক বছর আগে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল তার স্বামী। যখন সংসার ছিল, তখন দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির ভাড়া এক কুঁড়েঘরে থাকতো সুমনা। কিন্তু এরপর শহরের ব্যস্ততম কেন্দ্রে পাড়ি জমায় সে। ফুলশোভিত সালোয়ার কামিজ পরে আর চোখে কাজল লাগিয়ে সে প্রতিদিন ২ থেকে তিনজন খদ্দেরের আশায় থাকে। বিনিময়ে প্রতিবার ৩০০ রুপির মতো পায়। খদ্দেরদের বেশির ভাগই গাড়িচালক। তবে সুমনার মতে, মাঝেমাঝে কিছু ভদ্র আর সুন্দর পোশাক পরা লোকও যায় তার কাছে। তার পরিবার কিন্তু এসব জানে না। তারা জানে, সে হয়তো কোন অফিসে চাকরি করে। তার লেখাপড়া জানা নেই। তার কিশোর ছেলেটি স্কুল শেষ করা পর্যন্ত সে মুক্ত। এ সময়ে ঘরে যাকে খুশি তাকে নেয়া যায়। যা খুশি তা-ই করা যায়। তাই ছেলে স্কুল থেকে না ফেরা পর্যন্ত সে এ কাজ চালিয়ে যায়। সে জানে ভিক্ষা করা অবৈধ। কিন্তু পতিতাবৃত্তি অবৈধ কিনা সেটা আসলেই অসপষ্ট। কনডম ব্যবহারের সুবিধাটা সে জানে। কিন্তু তার খদ্দেররা সে সব খুব কমই ব্যবহার করে। কোন দালাল নেই সুমনার। আবার তাকে কেউ পাচার করে আনেনি এ পথে। তার মতো একই পরিস্থিতি বীণার। তুলনামূলক কমবয়সী সে। ফোনে যোগাযোগ করে ধনী খদ্দের ধরে সে। কর্মকর্তারা জানান, ভারতে এমন প্রায় ৩০ লাখ যৌনকর্মী রয়েছে। তবে এটা সপষ্ট যে, এদের মধ্যে কিছু আছে টাকার প্রয়োজনে এ পেশায়। কিছু মেয়েকে বাধ্য করা হয়েছে এ পথে আসতে। আবার কিছু আছে স্বেচ্ছায় এ পথে পা বাড়ানো। অল ইন্ডিয়া নেটওয়ার্ক অব সেক্স ওয়ার্কার্স-এর প্রেসিডেন্ট ভারতী দে যুক্তি দেখালেন, পতিতাবৃতি ঐচ্ছিক বিষয়। তাই যৌনকর্মীদের অন্য মানুষের মতো সমান অধিকার থাকা উচিত। এ শিল্প নারীভিত্তিক। তবে মূলত স্বল্পশিক্ষিত অনেক গরিব অভিবাসী মেয়েই এর মূল ভিত্তি। এরা ভারতের শ্রমবাজারে খুব অল্পবেতন পায়। তাই বাধ্য হয়ে তুলনামূলক বেশি অর্থের জন্য এ পেশায় আসতে হয় তাদের। ভারতীদের মতো অনেকে চান যৌনবৃত্তিকে ছায়া থেকে সরিয়ে নিয়ে আসতে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘের সেপশাল র‌্যাপোর্টিয়ার বলেন, ভারতে যৌনকর্মীদের অপরাধী হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ হলে তারা আরও শক্ত হবে। পাঁচ বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, পতিতাবৃত্তি আইনসিদ্ধ হওয়া উচিত। এরপর ভারতের জাতীয় নারী কমিশন এ সমপর্কে তাদের পূর্বের অবস্থানে পরিবর্তন আনে। এর প্রধান ললিতা কুমারামঙ্গলাম মনে করেন, পাচার করে এ পেশায় আসতে বাধ্য করা ও শিশুদের এ পেশায় নিয়ে আসা থামানো সম্ভব নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে। যৌনকর্মী ও তাদের খদ্দেরদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার মাধ্যমে এইচআইভি বিস্তার সীমিত করা সম্ভব। এ সমপর্কিত আইনের সংশোধনকল্পে সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ প্যানেলের কাছে একথা তিনি জানাবেন। জিবি রোডের পতিতালয়গুলো নিয়ে বই লিখেছেন মায়ানক অস্টেন সুফি। তিনি বলেন, তার জানাশোনা প্রত্যেক যৌনকর্মী বৈধ হতে চায়। এখনও পতিতারা বিভিন্ন কারণে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে দ্বিধা করে। এছাড়া পুলিশি হয়রানি তো আছেই। যৌনবৃত্তিতে আসতে অনেককে বাধ্য করা হয়। এ বিষয়ের অবসান জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এসবের অবসানে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। মানবপাচার বিরোধী সংগঠন ‘আপনে আপ’ জানিয়েছে, গ্রামের মেয়েদের শহরে নিয়ে যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করায় যেসব দালাল, তারা ওই মেয়ের পরিবারকে প্রতিমাসে মাত্র ৪ হাজার রুপি পরিশোধ করে। বিভিন্ন পতিতালয়ে এনজিও ও পুলিশের অভিযান প্রায়শই ব্যর্থ হয়। কেননা, পরিবারটি একই দালালের কাছে আবার মেয়েটিকে ফিরিয়ে দেয়। আবার তরুণীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে বা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এ কাজে বাধ্য করা হয়। আপনে আপ দাবি করেছে, এক-তৃতীয়াংশ যৌনকর্মীই ১৮ বছরের নিচে। তবে সংস্থাটি এ পেশা বৈধতা দেয়ার বিরোধিতা করেছে। তাদের যুক্তি, এর ফলে যৌনবৃত্তির চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে আরও মানবপাচার বৃদ্ধি পাবে। এর পরিবর্তে আপনে আপ প্রচার চালাচ্ছে, ‘কুল ম্যান ডোন্ট বাই সেক্স’-  অর্থাৎ সত্যিকার পুরুষ কখনও অর্থ দিয়ে যৌনতা কেনে না। অর্থাৎ তারা চাইছে, পতিতাবৃত্তির চাহিদা যাতে সমাজে কমে যায়। তবে এর সফলতা পাবার সম্ভাবনা কম। আবার একে আইনসিদ্ধ করার সম্ভাবনাও কম। কোন  রাজনীতিবিদই এর পক্ষে নন। তাছাড়া রক্ষণশীল দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এ আইনকে সমর্থন করবে না বোঝাই যাচ্ছে। ফলে যৌনতার বিক্রিটা ভারতে অন্ধকারের মধ্যেই অব্যাহত থাকবে। এর চাহিদাও কমবে না, আবার এর ব্যাপারে ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে রাখা হবে।
সূত্র দ্য ইকোনমিস্ট

No comments

Powered by Blogger.