পশ্চিমবঙ্গে পরপর তিন খুন ঘিরে উত্তেজনা, নিহতদের সবাই মুসলিম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়ায় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এক কর্মীর বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা রাজ্য সরকারকে ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় পুলিশের ওপর চাপ বজায় রাখতে তাঁরা আপাতত বাঁকুড়া জেলাতেই অবস্থান করছেন তিনি।

পাশাপাশি রাঙ্কা পুরো ঘটনার একটি আদালতের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত, নিহতের পরিবারের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা এবং নিহত ব্যক্তির স্মৃতিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যালয় স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের দাবি, ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিবারটির অভিযোগ, সিজেপির কর্মীর বৃদ্ধ বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ গত সপ্তাহান্তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে খুনের ঘটনায় রাজ্যে কিছুটা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গত শনিবার রাতে নদীয়া জেলায় বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা ৫৪ বছর বয়সী আনিসুর রহমান এবং তাঁর ২৩ বছর বয়সী ছেলে আবু সুফিয়ানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের হাত। গত রোববার এই ঘটনায় পুলিশ স্থানীয় হরনগর পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান ফাতেমা বিবি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাহেব আলী মণ্ডল ও মিঠু শেখকে গ্রেপ্তার করেছে। ঠিক এই সময়ই অর্থাৎ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক তাণ্ডব চলার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেন।

এই চারটি মৃত্যুর জেরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি স্বাভাবিকভাবেই এসব খুনের দায় এড়াতে পারে না; কারণ, তারা রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু বিরোধী পক্ষ সরকারকে খুব একটা কোণঠাসা করতে পারেনি। কারণ, প্রধান বিরোধী মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া বাকি তিন বিরোধী অর্থাৎ সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ঋতব্রতপন্থী অংশ এখনো ঘর গুছিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে বিজেপির ওপর চাপ খুব একটা বাড়েনি। তবে পরপর এতগুলো খুন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রবল উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

বাঁকুড়ার ঘটনা

ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা দিল্লি থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ইন্দাসের কারিশুন্ডা গ্রামে এসে পৌঁছান এবং বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মারা যাওয়া মোহাম্মদ মাফিকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন।

দুদিন আগে নিজের বাড়িতেই নির্মমভাবে পেটানোর পর মাফিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী। তাঁদের আসার ও এই ঘটনা নিয়ে আন্দোলনে নামার কারণ, নিহত মাফিকের ছেলে আবদুল হাফিজ সিজেপির সদস্য। দিল্লিতে সিজেপির প্রতিবাদ চলাকালে তিনি সক্রিয়ভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন।

রাঙ্কা জানিয়ে দেন, ১০ দিনের মধ্যে সব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত আইনি ধারায় কঠোর সাজা দিতে হবে এবং ইন্দাস থানার পুলিশ কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও আদালত-পর্যবেক্ষিত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ, পুলিশ প্রশাসন পরিবারটির পাশে সঠিকভাবে দাঁড়ায়নি।

​নিহত মাফিকের পরিবার রাজ্য সরকারের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং মাফিকের ছেলে আবদুল হাফিজ তাঁর বাবার স্মরণে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্কুল গড়ে তোলার দাবি তুলেছেন।

হাফিজের কথায়, শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে এ ধরনের স্কুল তৈরি হওয়াই হবে তাঁর বাবার প্রতি সঠিক শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে সিজেপি নেতা রাঙ্কা ঘোষণা করেন, তাঁরা হাফিজকে আর্থিক সহায়তা দেবেন এবং রাজ্যজুড়ে ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন গড়ে তুলবেন, একই সঙ্গে সময়সীমার মধ্যে আসামিরা গ্রেপ্তার না হলে জেলা প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করারও হুঁশিয়ারি দেন।

নদীয়া জেলার ঘটনা

​এরই মধ্যে নদীয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া তৃণমূল নেত্রীসহ তিনজনকে শারীরিক পরীক্ষার পর আদালতে পেশ করে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে চায়। আদালত তাঁদের ৯ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

শনিবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ কংগ্রেসের নদীয়া জেলা সম্পাদক আনিসুর রহমান তাঁর ছেলে, পেশায় আইনজীবী আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলেন। একটি রেলওয়ে আন্ডারপাসের কাছে তাঁদের গাড়ি আটকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয় এবং পরে গাড়ি থেকে টেনে বের করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়।

​তদন্তের শুরুতেই পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ইঙ্গিত দিয়েছে, এই জোড়া হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফল। কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অতুল ভি এই তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর নিশ্চিত করেছেন।

তবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য কী এবং এর পেছনে আর কারা জড়িত রয়েছে, তা নিয়ে এখনই মন্তব্য করা তড়িঘড়ি হয়ে যাবে বলে তিনি জানান।

নিহত কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান (বাঁয়ে) ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান
নিহত কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান (বাঁয়ে) ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান ছবি: সংগৃহীত। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় বাড়ি ফেরার পথে এক কংগ্রেস নেতা ও তাঁর ছেলেকে কুপিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। নিহত ব্যক্তিরা হলেন আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান। গত শনিবার রাতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এতে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় এক পঞ্চায়েতপ্রধানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, কারাবন্দী তৃণমূল নেতা জব্বার শেখের পরিকল্পনা ও নির্দেশে এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর আগে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ জব্বারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুমান, নিজের গ্রেপ্তারের বদলা নিতেই এই নেতার নির্দেশে প্রতিপক্ষ কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া পঞ্চায়েতপ্রধান ফাতেমা বিবি জব্বার শেখের স্ত্রী। রাজ্য সচিবালয়ে রোববার সাংবাদিকদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘তৃণমূলই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ আমাকে জানিয়েছে, জব্বার শেখ এখন জেলে আছে। জেল থেকেই সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। জব্বার শেখের স্ত্রীও গ্রেপ্তার হয়েছেন, যিনি তৃণমূলের পঞ্চায়েতপ্রধান।’ জব্বার শেখের স্ত্রী হরনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান। তাঁর নাম ফাতেমা বিবি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাতে নদীয়ার নাগাদি রেলগেটের কাছে একদল দুষ্কৃতকারী বেথুয়াডহরী থেকে ফেরার পথে আনিসুর রহমানের গাড়ি আটকে বোমা ছুড়ে তাঁকে গাড়ির ভেতর থেকে টেনে বের করে পিটিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করে। স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে বেথুয়াডহরী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। জব্বার শেখের গ্রেপ্তারের বদলা নিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে।