Tuesday, August 18, 2026
তালেবান পাঁচ বছরে যা অর্জন করেছে, যা করতে ব্যর্থ হয়েছে by ওবাইদুল্লাহ বাহির
তালেবান পাঁচ বছরে যা অর্জন করেছে, যা করতে ব্যর্থ হয়েছে by ওবাইদুল্লাহ বাহির
২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সেনারা তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ছিল। সেই সময়ের বিশৃঙ্খলার মধ্যে বোমা হামলায় প্রায় ২০০ আফগান প্রাণ হারান।
আজকের কাবুল অনেকটাই ভিন্ন। বোমা হামলা ঠেকাতে শক্ত দেয়াল, নিরাপত্তাব্যবস্থা আর যান চলাচলে বাধা দেওয়া অস্ত্রধারী বহর এখন আগের মতো নেই। শহরটি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন ও শান্ত। স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে কাবুল। তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্তিতে তাই দেখা দরকার, তারা কী অর্জন করেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে।
তালেবানের প্রথম শাসনামলের বড় ব্যর্থতা ছিল পুরো আফগানিস্তান দখল করতে না পারা। যেসব প্রদেশ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেছিল, পরে সেগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তালেবানবিরোধী লড়াইয়ের ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
এবার তালেবান সেই ভুল করেনি। তারা পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং তুলনামূলক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারের শেষ বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রদেশের যে হুমকি ছিল, সেটিও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে।
এখন বড় কোনো বিদ্রোহী চ্যালেঞ্জ নেই। আফগানরা দেশের এমন অনেক এলাকায় যেতে পারছেন, যেখানে আগে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। দীর্ঘ সংঘাতের দেশে এটিকে তালেবানের বড় অর্জন হিসেবেই দেখতে হবে।
অর্থনীতির চিত্র অবশ্য জটিল। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগের দুই দশকে আফগান অর্থনীতি আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতাও অর্থনীতিকে দুর্বল করেছিল। ২০২১ সালে বিদেশি সহায়তা হঠাৎ কমে যাওয়ায় বড় ধাক্কা এলেও তালেবান অর্থনীতিকে সচল রাখতে পেরেছে। নিরাপত্তার উন্নতিতে ব্যবসা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বেড়েছে। দেশে ফেরা শরণার্থীরা পুঁজি এনেছেন এবং কেউ কেউ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। কর ও শুল্ক আদায় বেড়েছে। বিদেশে থাকা আফগানরা প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক ও বাণিজ্যও সহায়ক হয়েছে। তালেবান কোশ তেপা খাল, তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মতো বড় প্রকল্পে কাজ করছে। সড়ক ও অন্যান্য নির্মাণকাজও চলছে। এসব প্রকল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সৃষ্টি করেছে।
তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে অনীহা রয়ে গেছে। ফলে জবাবদিহি ও দুর্নীতির মতো কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলায় সরকার দুর্বল।
তালেবানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সামাজিক নীতিতে। গত পাঁচ বছরে একের পর এক আদেশে নারী ও মেয়েদের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের আধুনিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ। ফলে আফগানিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে চরম লিঙ্গবৈষম্যের উদাহরণগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এর অর্থনৈতিক মূল্যও বড়। নারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অথচ যে কাজগুলোতে নারীদের প্রয়োজন, সেই কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগই তাঁদের দেওয়া হচ্ছে না।
শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক ধরে রাখার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব নেই। বরং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে। ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ স্থান থাকলেও তা আধুনিক শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না।
এর সঙ্গে বেড়েছে নৈতিক পুলিশিং। নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। এতে শুধু মানুষের জীবনযাপন বদলাচ্ছে না, সরকার ও জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে দূরত্বও বাড়ছে।
তালেবান সরকারকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতেও ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে পাশে সরিয়ে দিয়েছেন। দোহা চুক্তিতে আলোচনাকারী ও স্বাক্ষরকারীদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ হারিয়েছেন। ফলে ক্ষমতা একজন নেতাকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এতে শাসনব্যবস্থা ধীর হয়েছে এবং অল্প কয়েকজনের দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাধান্য পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তালেবানের প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। প্রতিবেশী ও কিছু ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক থাকলেও আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো অধরা। নারীশিক্ষা ও অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ বহাল থাকলে এই বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে তালেবানের বিরুদ্ধে কার্যকর সামরিক হুমকি নেই। রাজনৈতিক বিরোধীরা বিভক্ত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও আবার সামরিকভাবে সরকার পরিবর্তনের আগ্রহ বা সামর্থ্য নেই। তাই তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকির চেয়ে ধীরে ধীরে জমতে থাকা জনঅসন্তোষই তালেবানের জন্য বড় বিপদ হতে পারে।
কোনো সরকার দীর্ঘদিন বিরোধিতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন সরকারের প্রতি এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যে তাকে দুর্বল করতে চাওয়া শক্তিগুলোর প্রতি আর উদ্বিগ্ন থাকে না, তখন সরকার ঝুঁকিতে পড়ে। সেই শক্তি বিদেশি রাষ্ট্রও হতে পারে, আবার দেশের ভেতরের বিদ্রোহী গোষ্ঠীও হতে পারে।
পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু তারা এখনো মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারেনি—তারা আসলে কী ধরনের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও জনবিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তালেবানের ভেতরে কেউ কেউ তা বুঝতেও পারছেন। কিন্তু তাঁরা কি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের পথ খুলবেন? কোনো না কোনো জায়গায় পরিবর্তন আসতেই হবে।
* ওবাইদুল্লাহ বাহির, আফগানিস্তানের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার বিষয়ের শিক্ষক
- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| এবার পুরো দেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তালেবান। ছবি: রয়টার্স |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1873)
-
▼
August
(340)
-
▼
Aug 18
(14)
- এবার মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই, উত্তপ্ত পশ্চ...
- শাসকের পরামর্শকরা একালে ও সেকালে by এলাহী নেওয়াজ খান
- ইরান ও ইউক্রেন যেভাবে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ...
- নিজের নির্বাচনী প্রচারের বিলবোর্ডে মামদানির ছবি ব্...
- পশ্চিমবঙ্গে পরপর তিন খুন ঘিরে উত্তেজনা, নিহতদের সব...
- ইরানি বিপ্লব এখন তৃতীয় অধ্যায়ে by সাইয়্যেদ মার্কো...
- গাজায় অবরোধে বিপর্যস্ত নারীরা, চিকিৎসা সংকট চরমে
- তালেবান শাসন: শরিয়া আইন পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে কী ...
- বিয়ে করে সংসারী পপি, ইরিন নিউজার্সিতে, সিমলা ও জেব...
- চাপের মুখেও আবু সাঈদকে গুলির দৃশ্য কীভাবে টেলিভিশন...
- হার্ভার্ডের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি ...
- ৭৯ বছর বয়সে বাবা হওয়া; ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক এই ...
- তালেবান পাঁচ বছরে যা অর্জন করেছে, যা করতে ব্যর্থ হ...
- নগ্ন ছবি তুলে ব্ল্যাকমেল! স্বামীর বিরুদ্ধে সেলিনার...
-
▼
Aug 18
(14)
-
▼
August
(340)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment