Friday, December 19, 2025
ফিলিস্তিনের ফুটবল যেভাবে মুছে ফেলছে রাজনীতির বিভাজন by খালেদ হরুব
ফিলিস্তিনের ফুটবল যেভাবে মুছে ফেলছে রাজনীতির বিভাজন by খালেদ হরুব
ফিলিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের কোচ ইহাব আবু জাজার নিবাস রাফায়। কোচের পরিবারের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, তাঁর মা আশ্রয় নিয়েছেন মাওয়াসি এলাকার একটি তাঁবুতে। তিনিই হয়ে উঠেছেন ফিলিস্তিনের আশা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। সব বাস্তবতার বিপরীতে তাঁর দল মাঠে এনে দিয়েছে বিজয়ের স্বাদ, উত্তীর্ণ হয়েছে পরের রাউন্ডে। এই জয় তাঁরা প্রথমেই উৎসর্গ করেছেন গাজাকে। এরপর পৃথিবীর পুরো ফিলিস্তিনকে।
‘ফিদায়ি’ নামে পরিচিত এ দলের পেছনে তৈরি হয়েছে এক যৌথ মনোভাব। এ নামের অর্থ যোদ্ধা। এটি শুধু খেলা নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যেখানে তারা বিভক্তি ও হতাশার দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আবারও এক অখণ্ড পরিচয় ফিরে পেতে চায়।
ক্যামেরার ফ্রেমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোয় দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন বয়সের নারী, গৃহিণী, প্রবীণ—সবাই সীমাহীন উচ্ছ্বাসে উল্লাস করছেন। কেউ স্টেডিয়ামে, কেউ ক্যাফেতে, কেউবা নিজের ঘরে।
ফুটবল বিশ্বজোড়া এক নেশা, কিন্তু আজ ফিলিস্তিনিদের জন্য এর অর্থ সাধারণ খেলার চেয়ে অনেক বেশি। এ দলের প্রতিটি জয় প্রতিরোধের মতো, গাজায় চলমান গণবিধ্বংসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী ওঠে দাঁড়ানো। প্রতিটি গোল যেন ঘোষণা দেয়, ‘আমরা এখনো আছি।’ অনেক ফিলিস্তিনের কাছেই এটা ঠিক ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো ফিনিক্স পাখির মতো বিষয়।
ইসরায়েল যখন মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিনকে মুছে দিতে চায়, তখন এই খেলোয়াড়দের পায়ের জবাব যেন বলে দেয়, ফিলিস্তিনিরা বিরাজমান এবং অটল। এটি তাদের জন্য একধরনের প্রতীকী চপেটাঘাত। প্রতীকের এই শক্তি গভীর। বহুদিন পর ফিলিস্তিনের নাম ও পতাকা ভেসে উঠছে এমন এক রূপে, যেখানে কোনো দলীয় রং বা রাজনৈতিক বোঝা নেই।
আরব বিশ্বজুড়ে সমর্থক ও খেলোয়াড়েরা ফিদায়ি দলের পাশে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিতে যে সংহতি বহুদিন চাপা রাখা হয়েছিল, তা এখন উন্মোচিত হয়েছে খেলার ময়দানে।
এটি একভাবে আরব ঐক্যের পুনরুত্থানও বটে, যা রাজনৈতিক সীমানা পেরিয়ে আরবদের একত্র করে। কাতারের সাম্প্রতিক বিশ্বকাপেও আমরা এমন অনুভূতির প্রকাশ দেখেছি।
তিউনিসিয়ার এক খেলোয়াড় ফিলিস্তিনের বিপক্ষে গোল করার পর দৌড়ে গিয়ে ফিলিস্তিনি কোচকে জড়িয়ে ধরেন, যেন ক্ষমা চান। আরব দর্শকেরা নিজেদের পতাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি পতাকাও উড়িয়ে সমর্থন জানান।
এক ফিলিস্তিনি খেলোয়াড় মাঠ ঘুরে বেড়ান হাতে জড়ানো সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো দৃশ্যটিকে একসূত্রে বেঁধে রাখে কেফিয়াহ।
অনেকের কাছে স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে সেই একমাত্র জায়গা, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে এমন কিছু প্রকাশ করতে পারে, যা কিছু আরব দেশে কর্তৃপক্ষ নিষিদ্ধ করে রেখেছে। স্টেডিয়ামে পতাকা আর ফিলিস্তিনের ধ্বনি অবাধে প্রবাহিত হয়। আর সেখানেই অগণিত প্রতিকূলতার পরও ফিলিস্তিনি দল উপহার দেয় দুর্দান্ত মানের ফুটবল।
অথচ ফিলিস্তিনের দল গঠন করা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। অনুশীলনের সুযোগ ছিল খুবই কম, আর সম্পদ প্রায় ছিল না বললেই চলে। দেশের ঘরোয়া লিগ বহু বছর ধরে বন্ধ। ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়েছে স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া–সুবিধা। এই বাস্তবতা তাদের সাফল্যকে আরও বিস্ময়কর করে তুলেছে। মনে হয় শুধু ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় মনোভাব এবং ফিদার আত্মা প্রতিটি প্রযুক্তিগত ঘাটতিকে পুষিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর সহায়তায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে দুই বছরের নির্মম গণহত্যার ভয়াবহতার পরও কীভাবে এই দল আবার একত্র হয়ে এমন পারফরম্যান্স দেখাল! এই প্রশ্নটাই নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়।
ফিলিস্তিনি সমাজতাত্ত্বিক জামিল হিলাল দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছেন যে সংস্কৃতি একটি ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি পরিচয় রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পরিচয় রাজনীতি, দল এবং গোষ্ঠীর সীমা ছাড়িয়ে যায়। সাহিত্য, কবিতা, শিল্প, সংগীত, নৃত্য, লোকগীতি, রান্না, সূচিশিল্প, প্রতীক, ঐতিহ্য, পুরোনো এবং আধুনিক সব মিলেই গড়ে ওঠে একটি সম্মিলিত চেতনার ভিত্তি। এই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে রক্ষা করাই ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।
আমরা জানি কীভাবে বারবার ফিলিস্তিনির সংস্কৃতি, প্রতীক, সূচিশিল্প এমনকি কুনাফা এবং খাবার পর্যন্ত ইসরায়েলের বলে দাবি করা হয়েছে। একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভিত্তি ভেঙে গেলে তারা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে যায়, তাদের জাতীয় পরিচয় এবং সামাজিক সংহতি বিপদের মুখে পড়ে।
ফিলিস্তিনের জাতীয় ক্রীড়াক্ষেত্র এখন সম্মিলিত সচেতনতা এবং পরিচয়ের একটি স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। এটি এমন এক দিকনির্দেশনা দেয়, যা মাতৃভূমির একত্বর দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে সবাই রাজনৈতিক পরিচয় ঝেড়ে ফেলে এক জায়গায় মিলিত হতে পারে। দলটির খেলাগুলোয় সারা বিশ্বের কোটি ফিলিস্তিনি শুধু কয়েকজন খেলোয়াড়কে দেখছিল না। তারা দেখছিল ফিদাইয়িনদের, যোদ্ধাদের। তারা দেখছিল ইতিহাসের বাহকদের, যারা শুধু একটি খেলা জেতার ইচ্ছার চেয়ে অনেক বড় বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।
* খালেদ হরুব, শিক্ষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| ফিলিস্তিনের জয়ের উচ্ছ্বাস গাজায় বৃষ্টিভেজা বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু থেকে শুরু করে পৌঁছে যায় লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার শরণার্থীশিবিরে। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1456)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
December
(274)
-
▼
Dec 19
(8)
- দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত যেভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়াচ্...
- ফিলিস্তিনের ফুটবল যেভাবে মুছে ফেলছে রাজনীতির বিভাজ...
- স্বৈরাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব এক জাগরণ b...
- সংকীর্ণ রশির ওপর ভারসাম্য রক্ষা: কেন পুতিনের সফর ভ...
- স্বৈরতন্ত্র উত্থানের দায় আসলে কাদের by ইসরাত জাহান
- মস্কোয় কেমন আছেন বাশার আল আসাদ
- যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের পরীক্ষা করতেন, এবার ন...
- বিতর্কের জবাব দিলেন শুভশ্রী
-
▼
Dec 19
(8)
-
▼
December
(274)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment