Wednesday, April 2, 2025
মিয়ানমারে ভূমিকম্পে ১৭০ স্বজন–প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ ইমাম সোয়ে
মিয়ানমারে ভূমিকম্পে ১৭০ স্বজন–প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ ইমাম সোয়ে
জুমাতুল বিদা মানে শেষ হতে চলেছে রমজান মাস, সামনেই খুশির ঈদ। অন্যান্য শুক্রবারের তুলনায় তাই এ দিন জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের ভিড় একটু বেশিই ছিল। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫১ মিনিট। মসজিদগুলো তখন লোকে লোকারণ্য। হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি শুরু হয়। ৭ দশমিক ৭ তীব্রতার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পুরো মিয়ানমার ও আশপাশের কয়েকটি দেশ।
ভূমিকম্পে সাগাইংয়ে তিনটি মসজিদ ধসে পড়ে, যার মধ্যে সেখানকার সবচেয়ে বড় মসজিদ মায়োমাও রয়েছে। ধসে পড়া তিনটি মসজিদের ভেতরে থাকা অনেক মুসল্লি নিহত হয়েছেন।
কয়েক শ কিলোমিটার দূরে থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী শহর মায়ে সোতে বসে ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠেন মায়োমা মসজিদের সাবেক ইমাম সোয়ে নাই ওও।
পরের কয়েক দিনে সোয়ে নাই একের পর এক স্বজন, বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীর মৃত্যুর খবর পেতে থাকেন। তাঁদের বেশির ভাগই মারা গেছেন মসজিদে। নিহত ব্যক্তিদের কেউ কেউ নগরের মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
ইমাম সোয়ে বলেন, ‘যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, আমি তাঁদের কথা ভাবি, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছোট ছোট শিশুরাও রয়েছে। তাদের কেউ কেউ খুবই ছোট ছিল। এটা নিয়ে কথা বলার সময় আমি আমার চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি।’
মিয়ানমারে শুক্রবারের ভূমিকম্পে মৃত্যুর সংখ্যা ২ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির জান্তা সরকার। সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়েছে সাগাইং ও মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে। ভূমিকম্পের উৎপত্তি স্থল ছিল সাগাইং অঞ্চলে। ধ্বংসস্তূপে এখনো উদ্ধারকাজ চলছে। তাই হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জান্তা সরকার থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বৌদ্ধ–অধ্যুষিত মিয়ানমারে মুসলিমরা সংখ্যালঘু। সাগাইং ও মান্দালয়ে প্রাচীনকালে তৈরি বহু বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে। তবে শহর দুটিতে মুসলিমদের সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো।
গত সোমবার মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং বলেছেন, নামাজ আদায় করার সময় ভূমিকম্পে মসজিদ ধসে পড়ে প্রায় ৫০০ মুসল্লি মারা গেছেন।
সাগাইংয়ের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ধসে পড়া মসজিদগুলো যে সড়কে ছিল, সেটির নাম মায়োমা স্ট্রিট। ভূমিকম্পে শহরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা এটি। মায়োমা সড়কের দুই পাশের অনেক ভবনও ধসে পড়েছে।
সাগাইংয়ের মায়োমা সড়কে এখনো শত শত মানুষ অবস্থান করছেন। হয় তাঁরা ভূমিকম্পে বাড়িঘর হারিয়েছেন অথবা বাড়িঘরে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ, এখনো পরাঘাতে (আফটার শক) ওই সব অঞ্চল কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেখানে খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
মায়োমা মসজিদ ধসেই ৬০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। মোয়েকিয়া ও মায়োদাও মসজিদ ধসেও বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার আরও বেশ কয়েকটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ইমাম সোয়ে বলেন, যাঁরা বেঁচে গেছেন, তাঁদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, ভূমিকম্পের সময় মুসল্লিরা মসজিদ থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ইমাম সোয়ে তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে থাইল্যান্ডে পালিয়ে যান।
সোয়ে বলেন, মসজিদ প্রাঙ্গণে যেখানে অজু করা হয়, সেখানেও মৃতদেহ পাওয়া গেছে। উদ্ধারের সময় মৃতদেহগুলোর মধ্যে কেউ কেউ একে অন্যের হাত ধরেছিলেন। খুব সম্ভবত ভূমিকম্পে তীব্র ঝাঁকুনির সময় তাঁরা একজন আরেকজনের হাত ধরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
সেখানে ভূমিকম্পে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সোয়ের স্ত্রীর পরিবারের বেশ কয়েকজন রয়েছেন। রয়েছেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাবেক একজন সহকারী ইমামও। স্থানীয় একটি সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান এবং মায়োমা মসজিদের একমাত্র নারী ট্রাস্টিও মারা গেছেন। সোয়ে বলেন, ওই নারী ট্রাস্টি খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি প্রায় সময়ই মসজিদে নানা অনুষ্ঠানের জন্য নিজের পকেট থেকে অর্থ দিতেন।
সোয়ে বলেন, যখনই তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কারও মৃত্যুর খবর পাচ্ছেন, নতুন করে শোকের ঢেউ তাঁর ওপর আছড়ে পড়ছে।
ইমাম সোয়ে আরও বলেন, ‘আমার বিধ্বস্ত লাগছে...আমার বারবার এসব মনে হচ্ছে। আমি তাঁদের স্মৃতি মনে রাখব। যদিও তাঁদের কেউ আমার খুব ঘনিষ্ঠ স্বজন ছিলেন না, কিন্তু তাঁরা সব সময় আমাকে তাঁদের একজন হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। আমার পেছনে নামাজ আদায় করেছেন, আমার সঙ্গে নামাজ আদায় করেছেন।’
মিয়ানমারের অন্যান্য ভূমিকম্প দুর্গত এলাকার মতো মুসলিমরাও একসঙ্গে এত মৃতদেহ দাফন করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী দলগুলোর সঙ্গে যে লড়াই চলছে, তার কারণেও মৃতদেহ কবর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সাগাইংয়ে মুসলিমদের যে কবরস্থান সেটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) নিয়ন্ত্রিত এলাকার খুব কাছে। বেশ কয়েক বছর ধরে সেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সাগাইং অঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় বিমান হামলাও চালিয়েছে।
সাগাইং শহরের মুসলিমদের মৃতদেহ দাফন করার জন্য মান্দালয়ে যেতে হয়। ইরাবতী নদীর ওপর একটি মাত্র সেতু শহর দুটিকে সংযুক্ত করেছে। ভূমিকম্পে নিহতদের মৃতদেহ মান্দালয়ের সবচেয়ে বড় মসজিদে নেওয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে নিহত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কবর দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ইমাম সোয়ে বলেন, ‘মুসলিমদের জন্য এটা খুবই দুঃখের, আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের তাদের শেষ যাত্রায় নিজের হাতে দাফন করতে পারছি না।’
এখানেই শেষ নয়। এই ইমাম বলেন, তিনি কয়েক দিন ধরে ঘুমাতে পারছেন না। তাঁর উদ্বেগের কারণ, এখনো কয়েকজন স্বজনের কোনো খোঁজ তিনি পাননি। তাঁদের মধ্যে তাঁর আপন ভাই-বোনও রয়েছেন। তাঁরা মান্দালয়ে বসবাস করতেন।
ইমাম সোয়ে সাগাইংয়ে উদ্ধারকাজে সহায়তা করার চেষ্টা করছেন। সেখানে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন অন্তত এক হাজার মুসলিমের সাহায্য প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সোয়ে বলেন, ‘সেখানে কেউ যখন সাহায্য চান তখনই কেবল আমার খানিকটা স্বস্তি লাগে এবং আমি তাঁদের সাহায্য করতে পারি।’
![]() |
| সাগাইংয়ে ভূমিকম্পে একটি ফায়ার স্টেশন ভবন ধসে পড়েছে। ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
April
(427)
-
▼
Apr 02
(11)
- চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে এবার খাল পরিষ্কার...
- ইরান নিয়ে উত্তেজনা: মার্কিন যুদ্ধবিমানের ওপর উপসাগ...
- যোগী আদিত্য সরকারের বুলডোজার–কাণ্ড, ক্ষতিপূরণের নি...
- মিয়ানমারে ভূমিকম্পে ১৭০ স্বজন–প্রিয়জনকে হারিয়ে শোক...
- দুর্ঘটনায় পুলিশ সদস্যের মৃত্যু: সন্তানের জন্মের এক...
- ড্রাগন-হাতির এক ছন্দে নাচা দরকার দুই দেশের মানুষের...
- কংগ্রেসের স্পেশাল ইলেকশন: রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠত...
- ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধপ্রস্তুতি: মধ্যপ্রাচ্যে বি-...
- মার্কিন হামলা হলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ‘বাধ্য হ...
- ইরানে হামলার হুমকি, ট্রাম্পকে সতর্ক করল রাশিয়া
- রতন টাটার বেশির ভাগ সম্পদ ব্যয় হবে দাতব্য ও জনহিতক...
-
▼
Apr 02
(11)
-
▼
April
(427)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment