Sunday, February 2, 2025
তোফায়েল আহমেদ এখন নির্বাক, ভাবলেশহীন
এক সময় এ বাড়িটি খুব ভোরে কোলাহলমুখর হয়ে উঠতো। গভীর রাত অব্দি মানুষের আনাগোনা ছিল সেখানে। যারা আসতেন তাদের লক্ষ্য ছিল প্রিয় নেতাকে দেখা অথবা নিজের কাজটি করিয়ে নেয়া। এক সময় সকাল-বিকাল বা রাতে পালা করে বাড়িটির নিচ তলায় বসতেন তিনি। সেখানে এক পাশে ছোট্ট স্টাডি রুম, যেখানে দেশি-বিদেশি হাজারো বই। কত্তো কি বিষয়ে লেখা বই সেসব। কখনো নিবিষ্ট মনে বই পড়তেন তিনি, কখনো বা টেলিফোনে প্রয়োজনীয় কথোপকথন সারতেন। যারা খুব ঘনিষ্ঠজন তাদের প্রায় সবাই এ কক্ষে যেতে পারতেন। পাশেই বিশাল এক ড্রয়িং রুম। সেখানে দেয়াল জুড়ে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঐতিহাসিক নানা ছবি, মার্বেল পাথরের তৈরি বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিনন্দন অ্যান্টিকস শোভা পাচ্ছে। এখানে দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় নেতাকর্মী, সুহৃদসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে বসে তাদের সমস্যা-সংকট শুনতেন তিনি। প্রায় সবাই তার অকৃপণ সহযোগিতা নিয়ে আনন্দিত মনে ফিরতো। স্থানগুলো আগের মতো থাকলেও এর সঙ্গে মিতালী গড়া মানুষটি সেরকম নেই। তোফায়েল আহমেদ ইতিহাস জন্ম দিয়ে হয়ে আছেন ইতিহাসের বরপুত্র। বাঙালির মুক্তি আন্দোলন ও বাংলাদেশের জন্মসূত্রের সঙ্গে মিশে থাকবেন তিনি অনন্তকাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত থাকবেন আপন সৌকর্যে। নামের দিক থেকে তিনি স্বপ্নময়-সুন্দর-উদার। কর্মেও তার ছোঁয়া রেখেছেন বিভিন্ন সময়। কিন্তু হঠাৎ করে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন দৈনন্দিন ব্যতিব্যস্ততা থেকে। এখন তিনি কোনো কিছু বোঝার মতো অবস্থায় নেই। প্রায় বিনষ্ট স্মৃতিশক্তি তাকে অনেকটাই অনুভূতিহীন করে দিয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কেউ দেখতে এলে নির্বাক তাকিয়ে থাকেন।
তোফায়েল আহমেদ তার পুরো জীবনের অধিকাংশ সময় আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। দেশের রাজনীতি ও আন্দোলন থেকে শুরু করে বিশ্বের তাবৎ রাজনীতি ও সেসব দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ছিল তার নখদর্পণে। শুধু কি ইতিহাস; বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কেও ভালো জ্ঞান রাখতেন। খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবন-যাপন সবকিছুতেই তার দখল ছিল। বাংলাদেশসহ বৃটিশ বা ভারত উপমহাদেশের রাজনীতির ঘটনা প্রবাহ তিনি এক পলকে তারিখ ধরে বলতে পারতেন। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসও বলতে পারতেন অনর্গল। সে কারণে তাকে অনেকেই ‘ইতিহাসের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু আজ যেন তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। স্মৃতিশক্তির অবনমন তাকে করে তুলেছে অসহায়। এই যে, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন বা চলমান অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড এর কোনো কিছুই তিনি আঁচ করতে পারছেন না।
ভয়াবহ স্ট্রোকের কারণে শরীরের একাংশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে। এর ফলে স্মৃতিভ্রষ্টতা তাকে আড়ষ্ট করে ফেলায় তিনি চেনাজানা জগতের কিছুই ঠাওর করতে পারছেন না। বর্তমানে তার বাঁ হাত ও পা একেবারেই অবশ। চলাফেরায় অক্ষম। মাঝে-মধ্যে নিকটজনেরা বাড়ির চৌহদ্দীতে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ঘুরিয়ে আনেন সতেজ বাতাসের সঙ্গে মেলবন্ধনের আশায়। কিন্তু তা তিনি অনুভব করতে পারেন না। পারেন না কথা বলতে। কমে গেছে খাওয়া-দাওয়াও। যার প্রভাব পড়েছে শরীরে। অনেকটাই শুকিয়ে গেছেন। অধিকাংশ সময় বিছানায় শুয়ে থাকতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার দিন-রাতের দুই- তৃতীয়াংশ সময়ই ঘুমিয়ে থাকেন। হাঁটতে পারেন না। শারীরিক জটিলতার কারণে প্রায়ই তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, চাইলেও চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তোফায়েল আহমেদের পরিবারের একাধিক সদস্য জানান, প্রায় তিন বছর আগে প্রথম দফায় স্ট্রোক করার পর তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঘটনা ঘটে। এরপর তিনি করোনায় আক্রান্ত হন। সে সময় তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। কিছুটা ভুলোমনা হয়ে যান। এরপর ২য় দফা স্ট্রোকে আবারো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটলে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন দাপুটে এই নেতা। ফলে ২৪-এর ঘটনা প্রবাহের পর ভোলায় তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে হওয়া মামলা বা বিএফআইইউ কর্তৃক ব্যাংক হিসাব স্থগিতের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। পরিবারের কেউ এসব বিষয়ে তাকে কোনো কিছু অবহিত করেননি।
সমপ্রতি তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত তোফায়েল আহমেদ চলমান কোনো কিছুই বোঝার মতো পরিস্থিতিতে নেই। ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন ও তার স্ত্রী ডা. তসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী (তোফায়েল আহমেদের মেয়ে) বাংলাদেশের এই অতিচেনা মানুষটির সার্বক্ষণিক দেখভাল করেন।
তোফায়েল নামের আরবি অর্থ স্বপ্নময়, চিন্তামুক্ত, উদ্যমী। ইসলামিক স্কলাররা এ নামের অর্থ সুন্দর, দৃঢ়, সম্মানিত বলেও উল্লেখ করেছেন। বাংলায় আহমেদ নামের অর্থ হলো মহৎ, প্রশংসিত। সমগ্র জীবন পর্যালোচনা করলে এর সবগুলো অর্থই খুঁজে পাওয়া যাবে তোফায়েল আহমেদের ক্ষেত্রে। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের অন্যতম নাম তোফায়েল আহমেদের সেই কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুলের কথা আজও অনেকের মন ছুঁয়ে যায়। তার সেই পেটানো শরীরের ছন্দবদ্ধ হাঁটা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। আর টানা বক্তৃতা দেয়ার গুণটি রপ্ত করতে চাইতেন সতীর্থরাসহ উত্তরসূরি রাজনীতিবিদরা।
অকুতোভয় তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২শে অক্টোবর তৎকালীন বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ভোলা জেলার কোড়ালিয়া গ্রামে। তার পিতা মৌলভী আজহার আলী, মা ফাতেমা বেগম। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে এমএসসি পাস করেন। ১৯৬৪ সালে ভোলা শহর নিবাসী সম্ভ্রান্ত আলহাজ মফিজুল হক তালুকদারের জ্যেষ্ঠ কন্যা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাদের একমাত্র কন্যা তসলিমা আহমেদ জামান (মুন্নী) পেশায় চিকিৎসক।
বর্তমানে ৮২ বছর বয়সী তোফায়েল আহমেদ কলেজজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং অশ্বিনী কুমার হলের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন ১৯৬২ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহ-সভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফা কর্মসূচি হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর মহান গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তোফায়েল আহমেদ। সে আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দানে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসক। ২৩শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভার সভাপতি হিসেবে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন তিনি। সে সময় স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করতে ছাত্র সমাজের যে অবিস্মরণীয় ভূমিকা ছিল তার মূল নেতৃত্বে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তৎকালীন তারুণ্যের অহংকার তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭০ সালের ২রা জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন তরুণ এই নেতা। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলত খাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তখন তার বয়স মাত্র ২৭ বছর। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন টগবগে তরুণ তোফায়েল। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ওই বছরের ১০ই এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিব নগরে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ ও ১৭ই এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠার তিনি অন্যতম সংগঠক। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত ও বলবৎকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ‘সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায়’ তার সক্রিয় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।
১৯৭২ সালের ১৪ই জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে নিজের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি নিজ জেলা ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তিনি দীর্ঘ ৩৩ মাস কারাগারে ছিলেন। ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
১৯৭০ থেকে ২০২৪- সর্বমোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৯২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এই পদে ছিলেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকারে’ তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে বিজয়ী তোফায়েল আহমেদ জাতীয় সংসদে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনকালীন সরকারে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৮ ও ২০২৪ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালে নির্বাচনে জিতলেও মন্ত্রিত্ব পাননি, তবে জাতীয় সংসদে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান।
আজীবন রাজনীতিতে নিবেদিত ও বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের রাজনীতির ব্যাঘ্রশাবক তোফায়েল আহমেদ এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় তাকে সংস্কারপন্থি বলে মনে করা হতো। এক পর্যায়ে তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক ভাবনা প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া বিয়োগান্তক ১৫ই আগস্ট উপলক্ষে শেখ হাসিনা তার লেখা ‘বেদনায় ভরা দিন’-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খুনিদের পাশাপাশি দলের যাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদের নামও এসেছে। এর আগেও ওই ঘটনার জন্য তাকে ঘিরে বিতর্ক ছিল। কিন্তু সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে আলো ছড়িয়েছেন এই আজন্ম রাজনীতিক।
জীবন সায়াহ্নে এই অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে সেটা বোধহয় কখনো ভাবেননি জনতা ও নেতাদের নেতা তোফায়েল আহমেদ। কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল বা বিধাতার ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সাধ্য প্রাণিকুলের নেই। হয়তো এ অবস্থায় নির্বাক তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাজনীতির এই প্রবাদ পুরুষের মনে ঘুরে বেড়ায় কবিগুরুর সেই পংক্তিমালা- ‘অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার...’।
সূত্র- জনতার চোখ

Monday, December 7, 2015
সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসাই সাফল্য -তোফায়েল আহমেদ by সোহরাব হাসান
![]() |
| তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্যমন্ত্রী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, আ.লীগ |
তোফায়েল আহমেদ: ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রাম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই তিনি দেখলেন, পশ্চিমারা বাঙালিদের স্বার্থ রক্ষা করবে না। তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। সেই লক্ষ্যেই তিনি ৬ দফা কর্মসূচি দিলেন, এরপর ছাত্রসমাজের ১১ দফা যুক্ত হলো। মানুষের হৃদয়ের দাবিকে যুক্ত করেছিলাম বলেই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছিল, আন্দোলন সফল হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটে নব্বইয়েও।
প্রথম আলো: আন্দোলন তো সফল হয়েছিল। কিন্তু মানুষ কী পেল?
তোফায়েল আহমেদ: গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে যে সংসদ গঠিত হয়, সেই সংসদ সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। আর সেটি ছিল আওয়ামী লীগেরই প্রস্তাব। বিএনপি প্রথমে সংসদীয় ব্যবস্থায় যেতে চায়নি। পরে তারা মেনে নেয়। আমরা সর্বসম্মতভাবে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আগের ধারায় দেশ শাসন করলেও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরিয়ে আনে। এটাও নব্বইয়ের আন্দোলনের বিজয়।
প্রথম আলো: নব্বইয়ে আপনারা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সফল হয়েছিলেন। সেই স্বৈরশাসকের এখনকার অবস্থান কী?
তোফায়েল আহমেদ: এটাও সত্য যে এরশাদ ১৯৯১ সালেও কারাগারে থেকে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। তাঁর দল ৩৫টি আসন পেয়েছিল। এ ভোট তো আমরা দিইনি। ১৯৯৬-এও তিনি পাঁচটি আসনে জয়ী হন। দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ায় ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। আমরা তাঁকে বলি স্বৈরাচার, কিন্তু জনগণ তো তাঁকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। সেখানে আমরা কী করতে পারি?
প্রথম আলো: আমরা সাংসদ এরশাদের কথা বলছি না। আমরা বলছি সেই এরশাদের কথা, যিনি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ: অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখলের পালা শুরু হয় জাতির জনককে হত্যার পর। এরপরই সামরিক শাসকেরা গায়ের জোরে ক্ষমতায় এসে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো আমরা ভাবিনি বাংলাদেশে এ রকমটি হবে। বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। সামরিক শাসকেরা তা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন; স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের এটাও কারণ।
প্রথম আলো: নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন তথা তিন জোটের রূপরেখায় আপনারা কার্যকর সংসদের কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখছি?
তোফায়েল আহমেদ: আমরা তো এখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই আছি। নবম সংসদে তো বিএনপি ছিল, তাদের আসন যত কমই হোক না কেন। ক্ষমতায় থাকতে তারা বলেছিল, আওয়ামী লীগ ৩০টি আসনও পাবে না। কিন্তু আমরা তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করি। সেই সংসদে তাঁরা কথা বলতেন, আমরা তার জবাব দিতাম। সংসদ কার্যকর হয় সরকারি ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণে। তাঁরা প্রায়ই সংসদে গরহাজির থাকতেন। এখন জাতীয় পার্টির সাংসদেরা বিরোধী দলের আসনে। আমি মনে করি, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে যে নির্বাচন হবে, সেটি সব দলের অংশগ্রহণেই হবে এবং সংসদীয় ধারা এগিয়ে যাবে।
প্রথম আলো: তখন আপনারা স্বৈরাচারকে সঙ্গে রাখবেন না?
তোফায়েল আহমেদ: আমি তাঁকে এভাবে দেখি যে তিনি পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছেন। তিনি নিজেও ভুল স্বীকার করেছেন।
প্রথম আলো: তিন জোটের রূপরেখার অঙ্গীকার ছিল সংসদের সার্বভৌমত্ব। সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি?
তোফায়েল আহমেদ: আমরা রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে এসেছি। এটা কম অর্জন নয়। গণতন্ত্রের বিকল্প কিছু নেই। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ও দশম সংসদ নিয়ে অনেকই প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু সারা বিশ্ব তো এটি মেনে নিয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সাবের হোসেন চৌধুরী, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভাপতি স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল আছে। আজ দেশের যে এত উন্নতি হয়েছে, বিএনপির আমল থেকে রপ্তানি তিন গুণ বেড়েছে, রিজার্ভ সাত গুণ বেড়েছে; গণতন্ত্রের কারণেই সেটি সম্ভব হয়েছে।
প্রথম আলো: আপনি সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাইছেন। কিন্তু বিরোধী দলকে তো সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
তোফায়েল আহমেদ: এটি তারা নিজেরা নষ্ট করেছে। আগে তো বিএনপি সভা-সমাবেশ করত। তারা আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে, মানুষকে পঙ্গু করেছে; এটি তো রাজনীতি নয়। এ জন্যই বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা হচ্ছে। এখনো জনসভার অনুমতি চাইলে অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রথম আলো: তিন জোটের রূপরেখায় রাষ্ট্রায়ত্ত বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এখন কী অবস্থা?
তোফায়েল আহমেদ: আসলে রাষ্ট্রায়ত্ত বেতার-টিভির আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। তবে এখন অনেক প্রাইভেট টিভি চ্যানেল আছে, এফএম রেডিও আছে; সেগুলো জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। বেসরকারি টিভি ও সংবাদপত্র তো অনেক সমালোচনা করে সরকারের।
প্রথম আলো: কিন্তু এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটছে না। জঙ্গিবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
তোফায়েল আহমেদ: জঙ্গিবাদ এখন বিশ্বব্যাপী প্রবণতা। বিশ্বের অনেক দেশই জঙ্গিবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। ইউরোপের মতো উন্নত দেশেও তারা হামলা চালাচ্ছে। কদিন আগে প্যারিসে হামলা হয়েছে, তার আগে তুরস্কে হয়েছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ অনেক নিরাপদ। সম্প্রতি মার্কিন জরিপেও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে বাংলাদেশ বেশি নিরাপদ।
প্রথম আলো: কিন্তু যে স্বৈরশাসককে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত করে গণতন্ত্রের সূচনা করলেন, সেই স্বৈরশাসন এখন আপনাদের সহযোগী। বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
তোফায়েল আহমেদ: দক্ষিণ আফ্রিকায়নেলসন ম্যান্ডেলাকে যে শ্বেতাঙ্গ শাসক ২৭ বছর কারাগারে বন্দী রেখেছিল, তিনি ক্ষমতায় এসে তো তাদের নিয়েই সরকার গঠন করেছিলেন। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ কালোদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করত। এটি করেছিলেন দেশের উন্নয়নের জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্য। সেটি করেছিলেন জাতীয় সমঝোতার জন্য।
প্রথম আলো: জাতীয় সমঝোতায় কি বিএনপির জায়গা নেই?
তোফায়েল আহমেদ: বিএনপির চিন্তা, ধ্যানধারণা গণতান্ত্রিক নয়। তাদের ধ্যানধারণা গণতান্ত্রিক হলে একটি নির্বাচনকে বন্ধ করার জন্য তারা এভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালাত না। পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক দল নির্বাচন বর্জন করে, কিন্তু বিএনপি তো শুধু নির্বাচন বর্জন করেনি, তারা নির্বাচন বানচাল করতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে খুন করেছে, ৫০০ ভোটকেন্দ্র ধ্বংস করেছে, ২৪ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে। এমনকি স্কুলশিক্ষিকাকেও রেহাই দেয়নি।
প্রথম আলো: আশির দশকে তাদের নিয়েই তো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন?
তোফায়েল আহমেদ: আমরা তাদের এই চেহারা বুঝতে পারিনি।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
তোফায়েল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান
Sunday, October 18, 2015
সরকারের সদিচ্ছার অঙ্গীকার থাকতে হবে by তোফায়েল আহমেদ
দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীক নিয়ে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের নীতিগত সিদ্ধান্ত দেশের নিস্তেজ-নিস্তরঙ্গ রাজনৈতিক অঙ্গনে সাময়িক একটি প্রাণবন্ত তর্ক-বিতর্কের অবকাশ সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অন্যরা এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে, বিশেষত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। জাতীয় পার্টির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। ইতিমধ্যে গণমাধ্যমের বিভিন্ন শাখায় প্রকাশিত মতামত মিশ্র। তবে অতি দ্রুততার সঙ্গে এ জাতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিটি প্রশ্নবোধক হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবেই হয়ে আসছিল এবং ভবিষ্যতেও দলীয়ভাবেই হতো এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। দেশে যেহেতু বিরোধী রাজনীতি ও রাজনৈতিক শক্তি নিষ্প্রভ, তাই সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বিনা বাধায় আইনে পরিণত করে বাস্তবায়নে যাবে তা স্বতঃসিদ্ধ। তবে দেশের রাজনীতি ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী উন্নয়নকে লক্ষ্য রেখে সরকার যদি আন্তরিকভাবে কিছু করতে চায়, তাহলে শুধু এতটুকু সংশোধনী বা সংযোজনী যথেষ্ট নয়। তাই পূর্ণাঙ্গ আইন করার সময় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করতে পারি।
এক.
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিরাজিত সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করে এই কাঠামোটিকে কথিত রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের আদল থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হলে দলভিত্তিক নির্বাচন অধিক ফলপ্রসূ হবে। নির্বাচন পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা সহজ হয়ে যাবে। হ্রাস পাবে নির্বাচনী ব্যয়। পরিষদের অভ্যন্তরে অধিক সংখ্যায় সক্ষম নেতৃত্বের সমাবেশ হবে।
দুই.
স্থানীয় সরকার, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের অন্যতম প্রধান সমস্যা অর্থায়ন ও অপ্রতুল জনবল। বিদ্যমান আইনে অর্থসম্পদসহ জনবল ও কার্যাদি হস্তান্তরের যে বিধান রয়েছে তা কার্যকর করলে পরিষদের সক্ষমতা ও কার্যকারিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে।
নতুন এ সংশোধনীর নেতিবাচক প্রবণতা নিয়ে যাঁরা সোচ্চার হয়েছেন, তাঁদের যুক্তি ও আশঙ্কাগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। নেতিবাচক আশঙ্কাগুলোকে ইতিবাচকে রূপান্তর করতে হলে দুটি দিক থেকে সরকার ও সরকারি দলে আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। প্রথমত. নির্বাচনের সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, কারণ এখন নির্বাচন নিয়ে কেউ আগ্রহ বোধ করে না। তাই সর্বত্র আইনের শাসন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত. ব্যবহারের চিন্তা থেকে যদি তড়িঘড়ি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তা বাস্তবায়নে সরকারি দল প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে তাহলে এ প্রচেষ্টা দীর্ঘ মেয়াদে তৃণমূলে রাজনীতির সুস্থ ও সুষ্ঠু বিকাশ বাধাগ্রস্ত করবে। অন্তত প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে এ নির্বাচন অনুষ্ঠান সব ধরনের হস্তক্ষেপমুক্তভাবে করা সম্ভব হলে, এ ব্যবস্থাটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে। অন্যথায় এ ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্তই করবে।
তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ।
Monday, October 12, 2015
স্থানীয় সরকার: দলভিত্তিক নির্বাচনের শর্ত by তোফায়েল আহমেদ
দলভিত্তিক নির্বাচন বিষয়ে সাধারণভাবে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে পারি: (১) ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে; (২) দল মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করবেন এবং (৩) প্রতিটি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বা প্রতিনিধিত্বকারী দলসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মনোনীত প্রার্থীদের ভালোমন্দ কাজের দায়দায়িত্ব গ্রহণ করবে। পূর্বেই বলা হয়েছে যে বিদ্যমান আইনে (সংবিধান ও বিভিন্ন স্থানীয় সরকার আইন) দলভিত্তিক নির্বাচনের পথে আইনি বাধা তেমন নেই। নির্বাচনী বিধিমালা, নির্বাচনী আচরণবিধি, প্রতীক বরাদ্দ নীতিমালা, সর্বোপরি জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৭৩–এর সূক্ষ্ম পর্যালোচনাই এখানে প্রয়োজন। তাই সরকার দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন করার বিষয়টিকে আইনি রূপ দিতে চাইলে তা সহজেই করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এ সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ও ফলাফল।
স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে করার আনুষ্ঠানিক বা আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান থাকতে পারে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে রাজনীতি এবং রাজনীতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিনের প্রথা, পদ্ধতি ও ঐতিহ্য হচ্ছে দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন। আমাদের কাছে প্রতিবেশী ভারতের দৃষ্টান্ত নানা কারণে আমাদের জন্য প্রণিধানযোগ্য। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবেই হয়ে আসছে। মূল স্থানীয় সরকার বা ‘পঞ্চায়েত রাজ’ আইনে দলীয়-অদলীয় কোনো ধারা-উপধারা নেই। নির্বাচনের মৌলিক বিধানসমূহ আমাদের আইনেরই মতো। এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও কেরালার আইন পর্যালোচনা করে তা–ই দেখা গেল। রাজনৈতিক দলভিত্তিক নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে মূলত নির্বাচনী বিধিমালায় এবং তাকে কার্যকর করা হয়েছে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে। পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচন বিধিমালা, ১৯৭৪ এ বিষয়ে তিনটি বিশেষ ধারায় (১৭, ১৮ ও ১৯) বিষয়টিকে স্বচ্ছ করা হয়েছে। এ ধারাগুলো মূলত প্রতীক বরাদ্দ–সংক্রান্ত। তাদের দুই রকমের প্রতীক রয়েছে—‘রাজনৈতিক দলের জন্য সংরক্ষিত প্রতীক’ ও ‘উন্মুক্ত প্রতীক’। দলীয় গঠনতন্ত্রের আলোকে দল মনোনীত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রে দলীয় প্রার্থী হিসাবে ‘ঘোষণা’ দেন এবং দল থেকে তা প্রত্যয়ন করা হয়। তাতে একজন প্রার্থী দলীয় প্রার্থী হয়ে যান। এ ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেরও সামঞ্জস্য বিধান করা হয়েছে।
আমাদের দেশেও স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে করার আনুষ্ঠানিক বা আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান থাকতে পারে। প্রথমত: ‘দলীয়করণ’ নামক প্রত্যয় মূর্তিমান আতঙ্ক। এ বিষয়টি সব দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিবেচনায় রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত: আমরা দল ও সরকার, রাজনীতি ও প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃত বিভাজন ও সীমারেখাকে সম্মান করতে শিখিনি। একটিকে অপরটির মধ্যে বিলীন হতে দেওয়া যাবে না। যদি ধীরে ধীরে তা করতে পারি, তাহলে দলভিত্তিক নির্বাচন ইতিবাচকতার দিকে ধাবিত হবে। সে জন্য প্রথমে প্রয়োজন হবে সুষ্ঠু, গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা এবং তা শিকড় থেকে শিখর পর্যন্ত সর্বত্র। দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক প্রথা-পদ্ধতি মেনে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তৃণমূলে দলের দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণে তা সহায়ক হবে এবং গড়ে উঠবে দায়িত্বশীল নেতৃত্বকাঠামো।
কিন্তু বিপরীতে যদি ব্যাপক দলীয়করণ, দলবাজি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভাগাভাগিতে দলের আনুকূল্য লাভের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি বিপর্যয়কর মোড় নিতে পারে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিপর্যয়ের প্রবণতাই স্পষ্ট। তাই সরকার যদি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়ানোর রক্ষাকবচের বিষয় বিবেচনায় নেয়, তাহলে নিম্নের তিনটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করব:
১. আইনের শাসনের প্রতি দৃঢ় ও আন্তরিক অঙ্গীকার এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা; ২. দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিধান এবং দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নৈতিক মানোন্নয়ন; ৩. নির্বাচনে প্রতিটি দল ও মতের প্রার্থীর জন্য সমতল ক্ষেত্র ও সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ। নির্বাচনের পর নিজ দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুকূল্য এবং বিরোধীদের প্রতি বৈরিতা পরিহারের গণতান্ত্রিক মানসিকতার চর্চা। এ তিনটি নীতি মেনে নিতে পারলে দলীয়ভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। ব্যত্যয় ঘটলে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক হানাহানি নতুন মাত্রা ও গতি পাবে।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক সদস্য, স্থানীয় সরকার কমিশন।
Thursday, July 2, 2015
বাংলাদেশই বেশি লাভবান হবে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : তোফায়েল আহমেদ by আব্দুল কাইয়ুম ও ফখরুল ইসলাম
![]() |
| তোফায়েল আহমেদ |
প্রথম আলো : আগেরবার যখন মন্ত্রী ছিলেন, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর চুক্তি করেও কিন্তু সফল হতে পারেননি। এখন করলেন চারদেশীয় চুক্তি। এবারও কি আগের মতো সমস্যা হতে পারে?
তোফায়েল আহমেদ: আসলে ১৯৯৬ সালে আমি যখন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন নেপালের বাণিজ্যমন্ত্রী ও আমি মিলে পঞ্চগড়ে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর উদ্বোধন করেছিলাম। পরে সেটা কার্যকর হয়নি। কারণ, ভারতের সঙ্গে তখন সংযুক্তির (কানেকটিভিটি) চুক্তি ছিল না। এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে সেই সমস্যার নিরসন হয়েছে। এখন সেই সমস্যা নেই।
প্রথম আলো : ওই সময় নেপালের ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, মহাসড়কে নিরাপত্তা না থাকায় পণ্য পাঠানো সমস্যা।
তোফায়েল আহমেদ: না। আসল কথা, তখন ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল না। কিন্তু এবার যে চুক্তি হয়েছে, তাতে ভারত, নেপাল ও ভুটানে সরাসরি পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যাবে। শুধু তা-ই নয়, এখান থেকে যাত্রীরাও তিন দেশে যাওয়া-আসা করতে পারবেন।
প্রথম আলো : আমাদের পণ্য যাবে, ওদের পণ্য আসবে, নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেবে না?
তোফায়েল আহমেদ: এখন তো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। আমাদের অংশে যেমন নিরাপত্তার সমস্যা নেই, তাদের অংশেও নেই। তবে এটা ঠিক, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
প্রথম আলো : ব্যাপারটা কি এমন যে আমাদের রাস্তার উন্নয়ন আমরা করব, আর তারা করবে তাদেরটা?
তোফায়েল আহমেদ: ঠিক তা-ই।
প্রথম আলো : আগে বলা হতো নেপাল ও ভুটানের পণ্য মংলা বন্দর দিয়ে আসবে?
তোফায়েল আহমেদ : আমাদের দুইটা বন্দর। তিন দেশই এ দুই বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। তাদের থেকে আমরা রাজস্ব পাব। সিঙ্গাপুরের উন্নতি ও লাভবান হওয়ার কারণ হচ্ছে দেশটির বন্দর বিশ্বের সবাই ব্যবহার করতে পারে। শ্রীলঙ্কাও অন্যদেরও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে লাভবান হচ্ছে। বন্দর শুধু আটকে রাখলে হবে না। তাই বন্দরেরও আমরা আধুনিকায়ন করছি।
প্রথম আলো : আগে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, নেপাল-ভুটানের জন্য মংলা ব্যবহৃত হলে পশ্চিম বাংলার বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
তোফায়েল আহমেদ : না, তা হবে না। যেমন পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছি ভারতের কাছ থেকে। চারদেশীয় চুক্তি যদি কাজে লাগাতে পারি, আমরা লাভবান হব।
প্রথম আলো : চুক্তির ফলে লাভবান বেশি হবে কারা?
তোফায়েল আহমেদ : বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে। আজকে বিশ্বায়ন ও উদারীকরণের যুগে সংযুক্তি ছাড়া কোনো দেশেরই ব্যবসা-বাণিজ্য সফলতা লাভ করে না। এখন আমাদের চার দেশের মধ্যে সংযুক্তি হয়ে গেল। তারপর আমরা জোর দেব বিসিআইএমের ওপর। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার—এই চার দেশের অর্থনৈতিক করিডর থেকেও আমরা সাংঘাতিক লাভবান হব। ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনাও চলছে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক, এডিবি (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) বিনিয়োগ করবে।
প্রথম আলো : অনেকের সন্দেহ যে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে আমরা আসলেই লাভবান হব কি না?
তোফায়েল আহমেদ : যারা এ দেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি করে, তারাই এসব কথা বলে। তাদের দল বা গোষ্ঠীবিশেষের জন্মই হয়েছে ভারতবিরোধিতা ও মৌলবাদিতার ওপর ভিত্তি করে। এগুলো আসলে স্রেফ ভারতবিরোধিতা।
নরেন্দ্র মোদির সফর দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। ৪১ বছরেও যে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন হয়নি, সম্প্রতি ভারত তা সর্বসম্মতভাবে করেছে। তারপর আছে সমুদ্রসীমা। সমুদ্রসীমা নিয়ে মামলা করতে আমরা ইতস্তত করিনি। ভুটান ও নেপালে আমরা সরাসরি যেতে পারতাম না। আজ সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যারা বিরোধিতা করে, তারা কেন গঙ্গার পানি আনতে পারল না? শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা আনতে পারল না?
প্রথম আলো : ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি তো অনেক বেশি।
তোফায়েল আহমেদ : বাণিজ্য ঘাটতি সব সময় যে ক্ষতি করে, তা নয়। চীনের সঙ্গে আমাদের ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য; চীন যদিও বলে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি আছে, পাশাপাশি চীনে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।
আবার ভিন্ন চিত্রটিও দেখুন। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা ৫৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করি, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে করি ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউ কিন্তু সে তুলনায় আমাদের কাছে রপ্তানি কম করে। এই বাণিজ্য ঘাটতির জন্য কি তারা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? প্রায়ই বক্তৃতা দেওয়া হয়, বাণিজ্য ঘাটতি, বাণিজ্য ঘাটতি। আমি চাই, এটা নিয়ে প্রথম আলো লিখুক।
প্রথম আলো : কিন্তু আমাদের রপ্তানি যদি ভারত বা চীনে আরও বাড়ানো যেত ভালো হতো না?
তোফায়েল আহমেদ : তা হতো। কিন্তু আমরা চীন-ভারতের কাছ থেকে পণ্য এনে নিজেরা লাভবান হই। ভারত যদি তুলা, সুতা বা পেঁয়াজ-রসুন ইত্যাদি নিত্যপণ্য আমাদের কাছে বিক্রি না করে, আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। ভারত যদি এখন মনে করে তারা বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করবে না। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? বাংলাদেশ। আর ভারতে রপ্তানি করতে না পারার যে প্রশ্নটি এসেছে, সে বিষয়ে বলব, ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার অনেক বড়। তাদের পণ্যের দাম কম। সেখানে আমাদের পণ্য রপ্তানি করে তেমন সুবিধা করা সহজ নয়।
প্রথম আলো : তাহলে তো যেখানে রপ্তানি করলে সুবিধা হবে, সেখানেই যাওয়া উচিত।
তোফায়েল আহমেদ : হ্যাঁ। সে জন্যই তো আমরা বিদ্যমান বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকা, ব্রাজিল, চিলিতে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) হয়েছে।
প্রথম আলো : ট্রানজিটের শর্তের মধ্যে কি মাশুলের (ফি) হার নির্ধারণের বিষয়ে কিছু বলা আছে?
তোফায়েল আহমেদ : বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ঠিক করা হবে। প্রতিটি দেশের মাশুল-হারের নিজস্ব হিসাব আছে, সেভাবে দিতে হবে। যেমন ইইউতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য যায়। তারা কীভাবে দেয়? এগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে শুল্ক দিতে হবে।
প্রথম আলো : এর আগে প্রয়াত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমতউল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিটির একটা সুপারিশ এসেছিল। বলা হয়েছিল, যেহেতু ট্রানজিট দেওয়া হলে ভারতের পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে ৮০ শতাংশ, তাই এর একটা অংশ বাংলাদেশের পাওয়া উচিত।
তোফায়েল আহমেদ : আমরা বিভিন্নভাবে লাভবান হব। যেমন আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত ২০০ কোটি ডলার সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে।
প্রথম আলো : ভারী ট্রাক আসা-যাওয়া করবে, কয়েক দিনের মধ্যে মেরামত করতে হবে। তখন?
তোফায়েল আহমেদ : এটা ঠিক না যে ভারী ট্রাকের কারণে রাস্তা ভেঙে যাবে। আমাদের প্রাণ গ্রুপ ত্রিপুরায় শিল্প করেছে। পূর্ব ভারতের প্রতিটি রাজ্যে প্রাণ পণ্য রপ্তানি করে। ওই রাজ্যগুলোতে আমাদের পণ্য ভারতের পণ্যের চেয়েও বেশি যাবে।
প্রথম আলো : কিন্তু ভারত ট্রানজিট পেলে পূর্ব ভারতে প্রাণ বাজার হারাবে কি না?
তোফায়েল আহমেদ : না, মোটেই না। কারণ, আমরা যত সহজে ও কম ব্যয়ে পূর্ব ভারতে পণ্য পাঠাতে পারব, দিল্লি বা ভারতের অন্য রাজ্য সেই সুবিধা পাবে না।
প্রথম আলো : তিস্তার পানি পেলাম না, অথচ ট্রানজিট দিয়ে দিলাম?
তোফায়েল আহমেদ : তিস্তার পানিও পাব আমরা। শুধু সময়ের ব্যাপার। প্রতিটি দেশেরই রাজনীতি আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুবার ঢাকা সফর করেন। পশ্চিম বাংলা চায় ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর বিষয়টা সমাধান করতে। এটা হলো বাস্তব কথা।
প্রথম আলো : ভারতকে দুইটা বিদ্যুৎকেন্দ্র আমরা দিয়ে দিলাম দরপত্র আহ্বান ছাড়াই। এই সময়ে এসে এমন দায়মুক্তি দেওয়ার দরকার ছিল?
তোফায়েল আহমেদ : দেখুন, বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের দরকার। এখন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লোক বিদ্যুৎ পায়। আমরা সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে চাই। কুইক রেন্টাল পাওয়ার যখন চালু করেছি, সমালোচকের কোনো অভাব ছিল না। তখন ছিল ঘরে ঘরে অন্ধকার। আর এখন আলোকিত বাংলাদেশ। কীভাবে হয়েছে?
সমালোচনা করবেন তখন, যদি দেখবেন বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছি। রামপালে আমরা কি এমন কোনো প্রকল্প করব, যা আমাদের স্বার্থের বিরোধী? আমরা কি দেশকে ভালোবাসি না? সবকিছু বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েই করা হচ্ছে।
প্রথম আলো : আপনি উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বে ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। সেই সময়ের স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
তোফায়েল আহমেদ : বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দেশ স্বাধীন করার। সে জন্য তিনি অনেক জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। ফাঁসির কাষ্ঠে পর্যন্ত গিয়েছেন। তাঁর সেই স্বপ্ন এখন ধীরে ধীরে পূরণ হতে চলেছে। আমরা সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হব এবং ২০৪১ সালের মধ্যে হব উন্নত দেশ।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
তোফায়েল আহমেদ : ধন্যবাদ।
Tuesday, June 16, 2015
নারীদের একটি নীরব নির্বাচন by তোফায়েল আহমেদ
এ নির্বাচন নিয়ে নারী-পুরুষ, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, এমনকি নারী সংগঠন—কারও কোনো প্রতিক্রিয়া, সরবতা নেই। নীরবে, নিভৃতে এ নির্বাচনের তিনটি পর্ব মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার এবং প্রতীক বরাদ্দের কাজ সম্পন্ন হলো। জানা গেছে, ৩ হাজার ১১৫ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় আছেন ২ হাজার ৮৬৬ জন। খুব সম্ভবত কমবেশি ১ হাজার ৮০০ নারী উপজেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে সংরক্ষিত মহিলা আসনে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্বশীলতা বা নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে।
নির্বাচনটি নীরবে হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে উপজেলা পরিষদের নিয়মিত সভা, স্থায়ী কমিটিগুলোর পুনর্গঠন এবং সভা অনুষ্ঠানে এ নির্বাচনের একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদগুলোর কিছু আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। নির্বাচনের পর দায়িত্ব গ্রহণে আবারও কালক্ষেপণ কাম্য নয়। অবশ্য ইতিমধ্যে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগ আসন্ন রমজানের পরপরই নবনির্বাচিতদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে রেখেছে। সেটি খুবই আশার কথা। আশা করা যায়, নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিরা তাঁদের নিজ নিজ ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার দায়িত্বের পাশাপাশি উপজেলা পরিষদের স্থায়ী কমিটি, পরিকল্পনা ও বাজেট প্রভৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোয় সংরক্ষিত আসনে নারীদের নির্বাচনের ব্যবস্থাটি কার্যকর রয়েছে। প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়, সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা তাঁদের উপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে পারেন না। উপজেলা পরিষদেও নবনির্বাচিতরা নির্বিঘ্নতার সঙ্গে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হবেন না, তা নয়। তবে সব পক্ষ থেকে এখানে সহযোগিতা ও সক্ষমতার প্রচেষ্টা থাকতে হবে। উপজেলা পরিষদ শুরু থেকেই নানা রকমের সাংগঠনিক, প্রশাসনিক, আইনগত ও আর্থিক সীমাবদ্ধতায় আড়ষ্ট। নবনির্বাচিত নারী প্রতিনিধিকেও সে সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির সুবিধা-অসুবিধাগুলো বুঝতে হবে। সে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকারিতার পথে ধাবিত করার ক্ষেত্রে অন্যান্য জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রধানদের তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে।
ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার চেয়ারম্যান বা মেয়ররা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাহী হলেও তাঁরা উপজেলা পরিষদের সদস্যমাত্র। এ ক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদের নারী সদস্য ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়ররা সমমর্যাদায় সদস্য—এ বিষয়টিকে সসম্মানে মেনে নিতে হবে। এ জন্য সম্মানিত সদস্য হিসেবে পরিষদে বিভিন্ন সভা ও ফোরামে অবদান রাখার জন্য সমান সক্ষমতা নারীদেরও অর্জন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিষদকে নবাগত সদস্যদের জন্য কাজ করার পরিসর বিশেষ করে, প্রাথমিক অবস্থায় তাঁদের উপজেলা পরিষদে যাতায়াত ও অবস্থানকালীন আর্থিক সহায়তার স্পষ্ট বিধান করে নিতে হবে। আর্থিক বছরের শুরুতে এই নির্বাচনটি হওয়ার কারণে নবনির্বাচিত সদস্যরা উপজেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নবিষয়ক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। এ সুযোগটি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রশিক্ষণটি বিশেষভাবে কাজে লাগতে পারে। তবে এখানে একটি সীমাবদ্ধতার কথাও বলে রাখা ভালো, এ সদস্যদের কার্যকাল আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কারণ, বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার বেশির ভাগের কার্যকাল বা মেয়াদ ২০১৬ সালে প্রথমার্ধের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ২০১৬ সালে আবারও নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন পড়বে।
সে জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে পরবর্তী ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের প্রথম তিন মাসের মধ্যেই পুনরায় উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। এটিও হয়তো সময়ের কাজ সময়ে না করার খেসারত। দেশে অন্তত বিলম্ব হলেও চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নারী সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গতা পেতে যাচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ উপজেলা পরিষদের এ নবযাত্রা শুভ হোক।
ড. তোফায়েল আহমেদ: পরিচালক-গভর্ন্যান্স, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং বিশেষ ফেলো, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।
Saturday, May 2, 2015
বলি হলো স্থানীয় সরকারব্যবস্থা by তোফায়েল আহমেদ
এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আবার নতুন করে আস্থা স্থাপন করা কঠিন হবে। এ নির্বাচনে ক্ষতি হয়েছে গণতন্ত্রের, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার। জাতীয় রাজনীতির সব ভার স্থানীয় সরকারের ওপর চাপানো হয়েছিল। সে ভার সওয়ার সাধ্য তার ছিল না, ফলে তাতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষের মধ্যে একটা ব্যাপারে খুব মিল রয়েছে। তারা কেউই স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর বা শক্তিশালী করতে চায়নি বা চায় না। তাদের অভিপ্রায়ের মধ্যেও তা নেই এবং ছিল না। দুপক্ষের কৌশলেও বেশ মিল আছে। এই তিন সিটির নির্বাচন ছিল উপলক্ষ মাত্র। তারা উভয়েই জাতীয় রাজনীতির কৌশল হিসেবে স্থানীয় সরকারকে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এই কৌশলে উভয়েই জয়ী হয়েছে। বিরোধীরা এখন জোর গলায় বলা শুরু করেছে, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব না। তারা বলছে, এর ফলে তাদের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আরও ‘পাকাপোক্ত’ হয়েছে। যদিও এই স্থানীয় নির্বাচনের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। আর সরকার দাবি করতে পারবে, বিরোধীরা কোণঠাসা হয়ে গেছে। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। এই কৌশলের রাজনীতিতে উভয়েই জয়ী হয়েছে তা ঠিক, কিন্তু এর ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সেটা আমাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি।
কথা হচ্ছে, দেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক পরাশক্তির রাজনীতিতে স্থানীয় সরকারবিষয়ক নীতিকাঠামো নেই। নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা স্থানীয় সরকারকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। আগে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন ও সর্বশেষ এই তিন সিটি নির্বাচনে বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। যেমন: পাঁচ সিটির মেয়রদের দুজন কারাগারে, তিনজন পলাতক, উপজেলা পরিষদের খবর নেই, আর সেই মিছিলে যুক্ত হলো এই তিন সিটি। তবে এবার যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা সরকার-সমর্থিত হওয়ায় সে সমস্যা হয়তো হবে না। তবে সিটি করপোরেশন যে খুব কার্যকর হবে, তা বলা যায় না।
এই বিজয়ে বিজয়ীদের উল্লাস নেই, পরাজিতদের মনে বেদনাও নেই। পরাজিতরা এই নির্বাচনকে কৌশলগত দিক দিয়ে নতুন জায়গায় নিয়ে যাবে। তারা নতুন উদ্যমে পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাবে, তবে কীভাবে তারা সেটা করবে, সেটাই দেখার বিষয়। ক্ষমতাসীনদের শিরস্ত্রাণে নতুন পালক যুক্ত হয়নি, বরং তাদের কপালে কলঙ্কতিলক জুটেছে।
এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও কম। তিন সিটিতে ভোট পড়েছে মোট ৪৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। স্থানীয় নির্বাচনের ইতিহাসে এটা সর্বনিম্ন। আবার এটাও যে প্রকৃত হিসাব, তা-ও জোর গলায় বলা যাচ্ছে না। এদিকে ২০১৬ সাল হচ্ছে স্থানীয় নির্বাচনের বছর, কিন্তু মানুষ ভোট দিতে আস্থা পাবে বলে মনে হয় না। স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় ত্রুটিও আছে। যেমন সব আলোচনা ও ডামাডোল হয়েছে মেয়র প্রার্থীকে কেন্দ্র করে। সব আলো ছিল তাঁদের ওপর। কিন্তু কাউন্সিল প্রার্থীদের নিয়ে কেউ কথা বলেনি। অথচ তাঁরাই হচ্ছেন স্থানীয় সরকারের প্রাণ, সেই চেতনার ধারক-বাহক। ফলে এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার চেতনা ধ্বংস করা হয়েছে। আবার সহিংসতা করেছেন কিন্তু কাউন্সিলর প্রার্থীরাই। সেটাও ঘটেছে সরকার-সমর্থিত প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে। এ কারণে এসব সামাল দেওয়া যেত। আর সেটা হলে নির্বাচনকে কিছুটা কলঙ্কমুক্ত করা যেত।
অন্যদিকে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকলেও তারা ভোটারদের দিয়েই সেটা কাটিয়ে উঠতে পারত। ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করে তারা সরকারের গা-জোয়ারির জবাব দিতে পারত। কিন্তু তারা সেটা পারেনি। ফলে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় রাজনীতিতে বিরাজমান আস্থাহীনতার বলি হলো স্থানীর সরকারব্যবস্থা। এটা ক্রিয়াশীল না হলে গণতন্ত্র কখনো কার্যকর হতে পারবে না। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে বলে সেখানে নির্বাচনী গণতন্ত্র কার্যকর হয়েছে। আর সেখানে আমরা স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে আরও কমজোর করে ফেললাম। এর ফলে গণতন্ত্রের যে নিরুদ্দেশ যাত্রা শুরু হলো, তা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, আমরা তা জানি না।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সদস্য, স্থানীয় সরকার কমিশন।
Tuesday, April 28, 2015
ইশতেহারগুলো শূন্যে ঝুলে আছে by তোফায়েল আহমেদ
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের ইশতেহারগুলোর বক্তব্য অনেক কাছাকাছি। রাজনৈতিক দলের ইশতেহারের মতো এতে সবকিছু ঢোকানো হয়েছে। কিন্তু এক দিক থেকে ইশতেহারগুলো নিরর্থক। ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সম্মতিতে এসব ইশতেহার তৈরি হয়নি। মেয়র যে দলের সমর্থিত, সেই দল কি একে নিজের ইশতেহার মনে করে? এগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও রূপরেখাও স্পষ্ট করা হয়নি। তাই বলা যায়, ইশতেহারগুলো শূন্যে ঝুলে আছে। এর প্রাসঙ্গিকতা এতটুকুই, যে সমস্যাগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেসব বিষয়ে নগরবাসীও সজাগ। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সমাধানের দায়িত্ব কতটা সরকারের আর কতটা মেয়রের? সিটি করপোরেশনের আর্থিক সামর্থ্য, প্রশাসনিক সক্ষমতা, আইনগত এখতিয়ার, জনবল ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়েই সমাধানের চিন্তা করতে হবে। মেয়রের এখতিয়ারের অন্তর্ভুক্ত সমস্যার সমাধান মেয়রকেই করতে হবে।
মানুষ যানজট নিয়ে কথা বলে। এর সমাধান পুরোটা সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। তবে তারা অবদান রাখতে পারে তিন ক্ষেত্রে: ১. ঢাকার ২০ শতাংশ মানুষ ফুটপাতে হাঁটে। ফুটপাতকে দখলমুক্ত করে হাঁটার উপযোগী করলে যানবাহনের ওপর চাপ কমবে। ২. বাসগুলো কোথায় থামবে, তা নিয়ম করে দিতে হবে। বাস চলাচল সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব করতে হবে। ৩. সব শপিংমল ও বড় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করাতে হবে। নইলে জরিমানা করতে হবে। ৪. সড়কবাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
আইনে মেয়র কর্তৃপক্ষের যতটা ক্ষমতা দেওয়া আছে, ততটা প্রয়োগ করা হচ্ছে না। আরও ক্ষমতা যে চাওয়া হচ্ছে, সেটা কোথায় হবে? ক্ষমতা থাকলেও নেতৃত্বের গুণাবলি ও দায়বদ্ধতা না থাকলে কাজ হবে না। গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের ক্ষমতা মেয়রের হাতে নেই। আবাসন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এসব রাজউকের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজউকের উচিত ছিল ভবন নির্মাণের তদারকি করা। অথচ তারা জমি বিক্রি, প্লট তৈরি এমনকি নির্মাণকাজেও নিয়োজিত হচ্ছে। অথচ তাদের মূল কাজ হলো ভবন নির্মাণের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ। তারপর ড্যাপ কারা বাস্তবায়ন করবে? বিআরটিএ গাড়ির লাইসেন্স দিচ্ছে। তাদের গন্ডগোলের কারণে নাগরিক ভোগান্তি পাচ্ছে। কিন্তু নাগরিক তো বিআরটিএ চেনে না, তারা চেনে সিটি করপোরেশন। সুতরাং যার যা কাজ, তা না করলে সিটি করপোরেশন সফল হবে না।
কিছু কাজ মেয়র করবেন আর কিছু কাজ জনগণকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলন আকারে সরকারের কাছে হাজির করবেন। এভাবে কাজ ভাগ করে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কী কাজ করা যায় তা চিহ্নিত করে প্রচেষ্টা নিতে হবে। যেমন ওয়াসার সঙ্গে কিংবা তিতাস গ্যাসের সঙ্গে।
কতগুলো বিষয় হলো মেয়রের এজেন্ডা না। যেমন ঢাকার চারটা নদীর দূষণ, এগুলো উদ্ধার করতে হবে। এটা সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব না। তা ছাড়া, নগর অবিভাজ্য, ওয়াসা একটা, পুলিশ একটা, রাজউক একটা, কিন্তু সিটি করপোরেশন দুটি। দুজন মেয়রের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।
নগর সরকারের দাবি যাঁরা করছেন, তাঁদের রূপরেখা স্পষ্ট করতে হবে। এ শহরে যে ৫৬টি নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠান আছে, নগর সরকার কি এদের সবার ওপরেই কর্তৃত্ব করবে? আলাদা করে ঢাকা বা চট্টগ্রামের জন্য নয়, সমগ্র স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। সিটি করপোরেশন যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে সেটাই নগর সরকার। সংবিধানে স্থানীয় সরকারকে যে ক্ষমতা দেওয়া আছে তা কিন্তু স্বশাসিত নগর সরকারের মতোই। কিন্তু আইন সংবিধানে বলা স্থানীয় সরকারের ধারণার মতো না। যেমন এমপিকে স্থানীয় সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা আইনেও নেই, এটা সার্কুলার দিয়ে করা হচ্ছে। এখানে সংবিধান আইন ও সংসদের বাইরে সার্কুলারতন্ত্র চলছে। এভাবে স্থানীয় সরকারকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। নগর সরকারের অনেক মডেল বিভিন্ন দেশে কাজ করছে, এগুলো পর্যালোচনা করে আমরা আমাদের মতো করে বানাতে পারি।
দ্রুত নগরায়িত হচ্ছে বাংলাদেশ, গ্রামেও শহুরে কায়দায় জীবনযাপন হচ্ছে। স্থানীয় সরকারকে তাই আগের কায়দায় না রেখে সারা দেশের জন্যই সমন্বিত নাগরিক কাঠামো দরকার। খালি ঢাকা নিয়ে ভাবলে হবে না, সারা বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে নাগরিকদের মধ্যে সিভিক সেন্স তথা দায়িত্ববোধ সৃষ্টির কথাও। সিটি করপোরেশন ময়লাগুলো সরিয়ে নিয়ে কোথাও ফেলবে, আর নাগরিকেরা কিছুই করবে না, এটা সুষ্ঠু নগর–সংস্কৃতি নয়। যাঁরা ময়লা আবর্জনা ছড়াচ্ছেন তাঁদেরও দায়িত্ব আছে। সিটি করপোরেশনের উচিত মানুষকে বোঝানো, তাদের নগর পরিচালনার কাজে জড়িত করা। তাদের গাড়ি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ডাম্প করছে। ওয়ার্ড পর্যায়ে কতটা ময়লা তৈরি হচ্ছে, সেই ময়লার কত অংশ ওয়ার্ডের মধ্যে নিজেরাই রিসাইক্লিং করবে কি না, ইত্যাকার বিষয়গুলোও ভাবতে হবে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে নীরব সহিংসতা চলছে। চাপ, হুমকি ও আতঙ্কের জন্য বিরোধীপক্ষের প্রার্থীরা পোলিং এজেন্ট পাচ্ছেন না। ইতিমধ্যে বেশ কিছু অঘটন ঘটেছে, যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত ছিল না। এখনো বেশির ভাগ ভোটার সিদ্ধান্ত নেননি। এঁরাই নির্ধারক, এঁদের ভোটকেন্দ্রে আনার পরিবেশ সৃষ্টি করা না গেলে এত আয়োজন পুরোপুরি সার্থক হতে পারবে না।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সদস্য, স্থানীয় সরকার কমিশন।
Thursday, April 23, 2015
এখন সংলাপ কেন, আগাম নির্বাচন তো হবে না -সাক্ষাৎকারে : তোফায়েল আহমেদ by মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো: সংলাপ প্রশ্নে কিছুটা তুলনা করা যাক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চোখে ইরান এবং আওয়ামী লীগ ও ভারতের চোখে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কের আলোকে যদি দেখা হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত তেহরানের সঙ্গে বারাক ওবামার সাম্প্রতিক শান্তিচুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। ভারতও জানিয়েছে। আমরা পররাষ্ট্রনীতিতে এটা পারলে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে পারব না কেন?
তোফায়েল আহমেদ: ইরান কোনো সন্ত্রাসী দেশ নয়।
প্রথম আলো: ২০১২ সালেও যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইরান আগের মতোই আল-কায়েদাকে সক্রিয় মদদ দেওয়াসহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রয়ে গেছে। ২০০৭ সালে মার্কিন সিনেট ইরানি রেভল্যুশন গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তোফায়েল আহমেদ: কিন্তু ইরান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার নিজস্ব নীতি রয়েছে। সুতরাং, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক বিষয় নিয়ে জেনেভাতে যে আলোচনা হয়েছে, সেটা আর বিএনপি ও জামায়াতের বিষয় এক নয়। এবং এক হতেও পারে না। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের কোনো দেশ কখনো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংলাপ করে না। আইএস যখন দুজন জাপানি সাংবাদিককে জিম্মি করে শর্ত দিল, তখন জাপান তা মানেনি। এখানে জামায়াত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তারা জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত।
প্রথম আলো: কিন্তু তাকে আপনার সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণাও করেননি।
তোফায়েল আহমেদ: হ্যাঁ করিনি। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংলাপ তো অতীতে হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের নামে তারা যে নাশকতা করেছে এবং নিরীহ-নিরপরাধ মায়ের কোল খালি করেছে, নিষ্পাপ শিশুকে অগ্নিদগ্ধ করেছে, বাসের চালক ও সাধারণ মানুষকে যেভাবে পুড়িয়ে মেরেছে, সে কারণে তাদের সঙ্গে সংলাপের কোনো প্রশ্নই আসে না।
প্রথম আলো: ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো অন্তত এক ডজন সন্ত্রাসী হামলার দায়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অভিযুক্ত করেছিল। তারা বলেছে, ইরান তাদের বিমান ছিনতাই, দূতাবাস উড়িয়ে দেওয়া, আরও কত-কী করেছে। ওবামা শান্তিচুক্তি করতে গেলে ৪৭ জন সিনেটর বিরোধিতা করে চিঠি লিখে ইরানকে সতর্ক করেছে। তার পরও ওবামা থামেননি। বাংলাদেশও বলেছে, এটা কূটনীতি ও সংলাপের বিজয়। এখন বিশ্বব্যাংক বলেছে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। আমরা দেখছি দেড় শ লোক পেট্রলবোমায় নিহত হয়েছে। এখন আপনি এর পুরো দায় বিএনপিকে দিলেই আপনি এর দায়মুক্ত হতে পারেন?
তোফায়েল আহমেদ: কেন আমি দায়মুক্ত হব না। পুরো কাজটিই তো বিএনপির সৃষ্টি। দেশবাসী এটা জানে। যে দলটি বিশ্ব ইজতেমার সময় হরতাল-অবরোধ করে, বয়োবৃদ্ধদের কষ্ট দেয়, তাঁদের আসতে বাধা দেয়, যে দলের নেত্রী একুশে ফেব্রুয়ারি ও স্বাধীনতা দিবসে অবরোধ বজায় রেখে শহীদ মিনারবিমুখ থাকেন এবং নিজের ছেলের মৃত্যুর পরও হরতাল দিতে দ্বিধাহীন, সুতরাং তার দায় ক্ষমতাসীন দলের ওপর পড়বে কোন যুক্তিতে? ক্ষমতাসীন দল বরং সক্ষমতার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে এই নাশকতা ও জঙ্গি তৎপরতাকে বানচাল করে দিয়েছে। যে কারণে এই মুহূর্তে দেশ স্বাভাবিক। বিশ্বব্যাংক যা-ই বলুক, বিএনপির এই তথাকথিত আন্দোলনে আমার অর্থনীতির কিছুটা ক্ষতি হয়েছে, তারা গ্রামের সঙ্গে শহরকে বিচ্ছিন্ন করে যে ব্যাপক ক্ষতি করতে চেয়েছিল, সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রথম আলো: এত প্রাণহানি, মাত্র তিন মাসে জিডিপির ১ শতাংশ খেয়ে ফেলাকে ব্যাপক ক্ষতি মনে করেন না?
তোফায়েল আহমেদ: বিশ্বব্যাংকের এই তথ্যের সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ, একটি শিল্পকারখানাও বন্ধ হয়নি। এমনকি বিএনপির নেতাদের মালিকানাধীন কারখানাগুলোও উৎপাদন দিয়েছে। যদি সরবরাহ চেইন বন্ধই হতো, তাহলে মার্চ মাসে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ হতো না। আমি রপ্তানিতে ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার টার্গেট করেছি; এর হয়তো সামান্য ক্ষতি হতে পারে। আচ্ছা, এখন আপনি সংলাপের কথা বলছেন। বলুন তো যুক্তরাষ্ট্র কি আইএসের সঙ্গে সংলাপ করছে?
প্রথম আলো: আইএসের সঙ্গে বিএনপি তুলনীয় কি না? এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ফকির সাহাবুদ্দিনের বাসার বৈঠক আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিই। সেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ১৮০ ও ১২০টি আসন ভাগাভাগি হয়েছিল কি না? শেখ হাসিনা বিএনপিকে ১২০ আসন দেওয়ার চুক্তিতে সই করেন। এটা সত্যি কি না?
তোফায়েল আহমেদ: হ্যাঁ। জেনারেল মাজেদ উল হক, কর্নেল মোস্তাফিজ, ওবায়দুর রহমান, আবদুস সালাম এবং আমি, আবদুস সামাদ আজাদ, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক আমরা আলাপ করে তিন ফর্দ চুক্তিনামা তৈরি করি। বেগম খালেদা জিয়া সই দেননি।
প্রথম আলো: তাহলে সে রকমের একটি দলকে আপনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সরাতে চান, তা কতটা বাস্তবসম্মত?
তোফায়েল আহমেদ: এটা বাস্তবসম্মত নয় এবং আমি তাকে তো বের করতে চাই না। সে নিজেই বের হয়ে যাচ্ছে।
প্রথম আলো:১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি যায়নি বলে সে কি রাজনীতি থেকে বের হয়েছিল?
তোফায়েল আহমেদ: ১৯৮৬ আর ২০১৪ মেলে না।
প্রথম আলো: ১৯৮৬ সালে বেগম জিয়া কেন ওই আসন বণ্টন চুক্তিতে সই দেননি, সেই রহস্য ভেদ হয়েছে কি?
তোফায়েল আহমেদ: যত দূর জানি, তৎকালীন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় একটি বৈঠক হয়েছিল। এরশাদ অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন। একদিকে এরশাদের আপন লোকদের বেগম জিয়ার শুভানুধ্যায়ী বানানো হলো, তাঁকে নির্বাচনে না যেতে পরামর্শ দেওয়া হলো, যাতে ঐক্য না টেকে, বিভেদ হয় এবং খালেদা জিয়া সেই ফাঁদে পড়েছিলেন। তিনি সাভার বা উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহর বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে হয়তো লুকিয়েছিলেন। পরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। বলা হয়েছিল, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে, বাস্তবতা যদিও তা ছিল না। যেকোনো একটি অজ্ঞাত নির্দেশে সমঝোতার ভিত্তিতে তিনি নির্বাচন থেকে দূরে সরে যান। একই ঘটনা তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি করতে চেয়েছিলেন। উনি মনে করেছিলেন, একটি তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় এলে ওনার সুবিধা হয়। তা না হলে পাঁচটি সিটিতে জয়লাভের পরে তাঁর নির্বাচন না করার কারণ ছিল না।
প্রথম আলো: প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে গেলে বিএনপিকে কী কী মন্ত্রিত্ব দেওয়া হতো?
তোফায়েল আহমেদ: স্বরাষ্ট্রসহ পাঁচটি দেওয়া হতো। প্রধানমন্ত্রী আমাদের সামনেই তা বলেছেন। নেত্রী প্রথম যখন প্রস্তাব দিলেন, খালেদা জিয়া আলটিমেটাম দিলেন। পুনরায় প্রস্তাব দেওয়ার পরে বললেন, দুদিনের মধ্যে তাঁর সঙ্গে সংলাপ করতে হবে। আর সেই দুদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী কিন্তু খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছিলেন। আমি দ্বিধাহীন চিত্তে বলি, শেখ হাসিনা সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে এসব পরিচালনা করেছিলেন। হয়তো-বা সেদিন যদি টেলিফোন সংলাপের পরে বেগম খালেদা জিয়া গণভবনে আসতেন, তাহলে তিনি লাভবান হতেন। প্রধানমন্ত্রীর বড় গুণ, তিনি বঙ্গবন্ধুর মতোই নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া কারও সঙ্গে হয়তো সমঝোতা করেছিলেন যে তৃতীয় একটি শক্তি থাইল্যান্ডের মতো ক্ষমতা নেবে। আমরা নির্বাচন না করতে পারলে ওই তৃতীয় শক্তি ক্ষমতা নেবে। কিন্তু এখানে তিনি হেরে গেছেন।
প্রথম আলো: জিয়াউর রহমানকে বীর উত্তম ও সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করা মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের প্রতি বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি। আজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়ার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ভিত্তি কী? যদিও পঁচাত্তরে জিয়ার ভূমিকা নিয়ে আমরাও প্রশ্ন তুলি।
তোফায়েল আহমেদ: খন্দকার মোশতাকও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, মন্ত্রী ছিলেন, তাঁর নেতৃত্বেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু জিয়াকে বীর উত্তম উপাধি দেন, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর খুনিরাই তো জিয়ার নাম উল্লেখ করেছে। আর পঁচাত্তরের পরে তিনি স্বাধীনতার মূল্যবোধ ধ্বংস করেছেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহ বসিয়ে চার মূলনীতি বাতিল করেছেন। একাত্তরের জিয়া ও পঁচাত্তরের পরের জিয়াউর রহমান এক নন।
প্রথম আলো: আওয়ামী লীগের কেউ কেউ বলেছিলেন জামায়াত সঙ্গ ত্যাগ করলে সংলাপ হবে। আপনার কী মত?
তোফায়েল আহমেদ: সেটা যে বা যারা বলুক, আমার কোনো মন্তব্য নেই। কারণ, জামায়াত ত্যাগ করলেই বিএনপি গণতান্ত্রিক সংগঠন হবে, তা আমি মনে করি না।
প্রথম আলো: আপনি বলছেন ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারির ৯০ দিন আগে বিএনপির সঙ্গে সংলাপ হবে। এটা কীভাবে গণতন্ত্রসম্মত?
তোফায়েল আহমেদ: কেন হবে না। আপনি একজন সাংবাদিক। কোনো পক্ষ অবলম্বন করা উচিত নয়। টক শোতে কথা বলেন, সেটা ভিন্ন। আমি এখন সংলাপ করব কী কারণে? আগাম নির্বাচন দেব না। তাহলে কিসের সংলাপ? খালেদা জিয়ার সাত দফার প্রথম দফা তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেটা সম্ভব নয়। এখন সংলাপ মানে চাপের কাছে নতি স্বীকার করা, সেটা হবে না। সংলাপ হবে নির্বাচনের জন্য।
প্রথম আলো: বিএনপি আমলে গ্রেপ্তারের পরে আপনাদের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছিল, এখন তাদের সঙ্গে তার চেয়ে ভালো করছেন কি?
তোফায়েল আহমেদ: অবশ্যই। ২০০২ সালে বিমানবন্দরে আমাকে গ্রেপ্তার করে কাশিমপুর জেলে নেওয়া হয়। সেখানে ফাঁসির আসামি এরশাদ শিকদারের খাটবিহীন কনেডম সেলের মেঝেতে রাখা হয়েছিল। হাইকোর্টের আদেশের আগে আমাকে ডিভিশন দেওয়া হয়নি। অথচ এখন ভিন্ন চিত্র। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও সাংসদদের আদালত লাগে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁরা ডিভিশন পাচ্ছেন। আর জিয়ার আমলে ৩৩ মাস জেলে থাকতে আমার উপর দৈহিক নির্যাতন চলেছিল।
প্রথম আলো: আমাদের জানামতে কিছুদিন আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পিজির আউটডোরে ডাক্তার দেখাতে হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ: পিজির আউটডোর ও জেলখানা এক নয়, সেটা আমি জানিও না।
প্রথম আলো: সিটি নির্বাচনে বিএনপি যে ধরপাকড় ও হয়রানির আশঙ্কা করছে, তার কি একটা সুরাহা সম্ভব?
তোফায়েল আহমেদ: নির্বাচন কমিশন তো বলেই দিয়েছে যার নামে মামলা থাকবে, পুলিশ তো তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে।
প্রথম আলো: সাবেক মন্ত্রী সালাউদ্দিনের নিখোঁজ হওয়াকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রাজনীতিকদের জন্য শুভ লক্ষণ নয় বলে মনে করেন। আপনি কীভাবে দেখেন?
তোফায়েল আহমেদ: এটা কারও জন্যই শুভ লক্ষণ নয়। প্রকৃত ঘটনা আমার জানা নেই। দেখলাম, মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, তিনি আছেন। পুলিশ চেষ্টা করছে।
প্রথম আলো: আপনি কি আশাবাদী যে তাঁকে পাওয়া যাবে।
তোফায়েল আহমেদ: এর বেশি আমি বলতে পারব না। তিনি ওয়েস্টিন হোটেলের হেলথ ক্লাবে যেতেন। আমিও মাঝেমধ্যে যেতাম। আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হতো। জানাশোনা ছিল। আমরা তো অবশ্যই আশা করব, স্বাভাবিকভাবে তিনি ফিরে আসবেন।
প্রথম আলো: সিটি নির্বাচনে কোনো কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এক মন্ত্রী যেকোনো মূল্যে জিততে চাইছেন।
তোফায়েল আহমেদ: আমরা তো কেউ প্রচারণায় যাইনি, গণসংযোগ করি না। আপনি যাঁর নাম নেননি, সেই মাননীয় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি ‘যেকোনো মূল্যে’ কথাটা কর্মীদের কাছে ব্যাখ্যা দেন। কারচুপি নয়, প্রচারণায় কঠোর পরিশ্রমের অর্থে বলেছেন। একই কথা অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদও বলেছেন। ড. এমাজউদ্দীন যেকোনো মূল্যে বিজয় ছিনিয়ে আনার কথা বলেছেন। মোশাররফ তো আর বিজয় ছিনিয়ে আনতে চাননি। নির্বাচনই হলো না, অথচ এমাজউদ্দীন নির্বাচনে জিতে তার তিন মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচনের কথাও বলছেন।
প্রথম আলো: গত ৬ বছরের উন্নয়নের এমন কি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে?
তোফায়েল আহমেদ: হরতাল-অবরোধ সত্ত্বেও যুগান্তকারী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এগিয়ে চলছে। গ্রামগুলো দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে শহরে। ক্রমাগত প্রমাণিত হয়ে চলছে যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যেটা করতে চান, সেটা তিনি করে দেখাতে পারেন। তাঁর মধ্যে সন্দেহাতীত এক অসাধারণ দৃঢ়তা ও সংকল্প রয়েছে। পদ্মা সেতু, গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল শোধনাগার, কনটেইনার টার্মিনাল, গ্যাস আমদানির জন্য এলএনজি ভাসমান টার্মিনাল, মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক ১৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি সরকারের বৃহৎ অগ্রাধিকার প্রকল্প, আর এসব প্রকল্প যথাসময়ে সম্পন্ন হবেই।
বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবেই। এলডিসি টপকে আমরা পরিণত হব উন্নয়নশীল দেশে। মন্দায় আক্রান্ত বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে বাংলাদেশের জিডিপি ৬ ভাগের বেশি, এবারেও তা বজায় থাকবে। গোল্ডম্যান স্যাক্স, জেপি মরগ্যান প্রভৃতি নামী সংস্থার পূর্বাভাসে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম। এমনকি বিশ্বব্যাংকও বলেছে, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে তারা অংশীদার হতে প্রস্তুত। কিছু গম আমদানি লাগে; অন্যথায় আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, এমনকি আমাদের সুগন্ধি চাল রপ্তানি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তদুপরি এবারে তিন লাখ টন গম বেশি উৎপন্ন হয়েছে। তার মানে গম কেনাটাও বন্ধ হয়ে যাবে। ১৯৭২-৭৩ সালে আমাদের রপ্তানি ছিল ৩৪৮ মিলিয়ন ডলার, সেটা বেড়ে এখন ৩০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এ বছরে হবে ৩২ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে আমরা যখন ৫০ বছর পূর্তি করব, তখন আমাদের রপ্তানি হবে ৭০ বিলিয়নের বেশি, যার মধ্যে পোশাকেই থাকবে ৫০ বিলিয়ন ডলার। এটা লক্ষণীয় যে, পাকিস্তানের রপ্তানি কিন্তু ২৪ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন ডলারেরও কম। আমাদের তা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি, ২৩ বিলিয়ন। পাকিস্তানের রেমিট্যান্স ১০ বিলিয়ন, আমাদের ১৫ বিলিয়ন। সামাজিক খাতের সব সূচকে পাকিস্তানের এবং কিছু ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে আমরা ওপরে। ২০০৯ সালে আমরা যখন ক্ষমতা নিলাম, তখন আমাদের মোট রপ্তানি ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার, সেটা এখন দ্বিগুণের বেশি। রেমিট্যান্স ছিল চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলার, সেটা এখন বেড়ে তিন গুণ। রিজার্ভ ছিল পাঁচ-ছয় বিলিয়ন ডলার, সেটা এখন ২৩ বিলিয়ন ডলার। এই হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের একটি চকিত উন্নয়ন চিত্র। তিনি এভাবেই দেশটাকে এগিয়ে নিচ্ছেন। বাংলাদেশের জন্য ২০১৪ সাল ছিল একটি ‘সোনালি বসন্ত’; বেগম খালেদা জিয়া যাকে বাধাগ্রস্ত করতে গিয়েও বিফল হয়েছেন।
আমি সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে একটি বার্তা পাঠিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। নেত্রী, কংগ্রাচুলেসন্স। তিনি দয়া করে তাতে সাড়া দেন। তবে বুঝতে না পেরে জানতে চান, কেন? আমি বললাম, দুটি কারণে। প্রথমত, আপনাকে অভিনন্দন এ কারণে যে অবশেষে আপনি বেগম খালেদা জিয়াকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁকে আপনি তাঁর কার্যালয় থেকে বাসভবনে পাঠাতে পেরেছেন। এটা আপনার বিজয়।
প্রথম আলো: আমরা আপাতত একটি দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু তার স্থায়িত্ব কতটুকু?
তোফায়েল আহমেদ: শেখ হাসিনার কারণেই বঙ্গবন্ধু হত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার হলো। অন্য কেউ এটা করতে পারত না। বিশ্বের অনেক দেশ নিজেরা ফাঁসি দেয়, আমরা দিলে বিবৃতি দেয়। এই দ্বৈত নীতি শেখ হাসিনার মধ্যে নেই। বঙ্গবন্ধু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। একবার নিলে ফাঁসির মঞ্চে যেতে হলেও পেছাতেন না, ঠিক সেই একই তেজস্বিতা প্রদর্শন করে চলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আপনি যে স্থিতিশীলতা চাইছেন, সেটা আমার মনে হয় ২০১৯ পর্যন্তই টিকে যাবে। কারণ বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর লন্ডনপ্রবাসী পুত্র নিশ্চয় উপলব্ধি করেছেন যে এই তথাকথিত আন্দোলন করে শেখ হাসিনার যেমন পতন ঘটানো যাবে না, তেমনি তাঁর কাছ থেকে কিছু আদায়ও করা যাবে না। এই শিক্ষা তাঁরা লাভ করেছেন।
প্রথম আলো: তাহলে গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে উন্নয়ন করাই আপনাদের নীতি?
তোফায়েল আহমেদ: আমরা বিশ্বায়ন ও উদারীকরণ যুগে বাস করি, অবশ্যই গণতন্ত্রকে সম্মান করি। আবার একই সঙ্গে লক্ষ্যে অটল থেকে বাংলাকে শস্য-শ্যামলা-সুজলা-সুফলা তথা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় রূপান্তর করব। আগে আপনি বিএনপিকে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আচরণ করতে বলুন। তখন এ ধরনের সব প্রশ্ন আসবে। শেষ কথা হলো এই যে,১৯৮১ সালে আমরা আওয়ামী লীগের পতাকা শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। সেই পতাকা হাতে তিনি আওয়ামী লীগকে সাজিয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগেই তিনি ২০২১ রূপকল্প নির্দিষ্ট করেছিলেন, সেই গন্তব্যে তিনি পৌঁছাবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
প্রথম আলো: তার মানে ২০১৯ সালের নির্বাচনেও আপনারা জিতবেন বলে আপনি এখনই আস্থা ব্যক্ত করছেন।
তোফায়েল আহমেদ: হ্যাঁ (হাসি) আপনি তো সাংঘাতিক সাংবাদিক!
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
তোফায়েল আহমেদ: ধন্যবাদ।
Sunday, April 19, 2015
সমতল ও সংস্কার by তোফায়েল আহমেদ
প্রার্থিতা, প্রতীক এবং প্রতিশ্রুতিপর্ব চূড়ান্ত। প্রচারণা পর্ব চলছে কিন্তু গতি পেয়েছে বলা যাচ্ছে না। নির্বাচনের আগের ১০ দিন প্রার্থীরা প্রচারণায় সর্বশক্তিতে সমর্পিত হবেন। কিছু কিছু প্রার্থী এখনো আত্মগোপনে বা আদালতের বারান্দায়। তাতে সর্বসাধারণের মধ্যেও সংশয়, অবস্থা বুঝে নাটাইয়ের সুতায় কী ধরনের টান পড়ে, তা বোঝা যাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন তিন সিটি করপোরেশনের প্রার্থীদের নিয়ে সভা করে তাঁদের অভয় দিয়েছেন। এ উদ্যোগ অভিনন্দনযোগ্য। বিরোধী জোট-সমর্থিত প্রার্থীরা পুরোপুরি সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরতে পারেননি। তাঁদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয়টি হচ্ছে, যাঁরা বৈধ প্রার্থী হিসেবে কমিশনের প্রতীক বরাদ্দ পেলেন, তাঁদের অবাধ প্রচারণায় আইনি বাধা বা পুলিশি ভীতি বহাল থাকলে নিরীহ ভোটাররাই বা কোন ভরসায় ভোটকেন্দ্রে যাবেন।
নিকট অতীতের নির্বাচনী-প্রক্রিয়া এবং ফলাফল সাধারণ ভোটারদের কিছুটা নির্বাচনবিমুখ করেছে। সে প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বর্তমান নির্বাচনেও বজায় থাকবে, নাকি এখানে কিছু গুণগত পরিবর্তন আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গ নাই-ই বা আনা হলো। বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের অনিয়মগুলোর প্রতিরোধ বা প্রতিকারের বিষয় মনে এলেই নির্বাচনে আগ্রহ ফিরে আসার কথা নয়। এখানে সরকার ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে সদিচ্ছা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক নীতি-আদর্শের প্রতি আস্থা-বিশ্বাসের প্রমাণই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার গ্যারান্টি। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এবং দেশের ‘স্বাধীন’ বিচারব্যবস্থার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনটি সিটি করপোরেশনের মোট ১৭৯টি ওয়ার্ড। ভোটকেন্দ্র ২ হাজার ৭১০ এবং বুথ সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার ৫১৭। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং এবং পোলিং কর্মকর্তা মিলে কমপক্ষে ২৫ হাজার কর্মকর্তা নিয়োজিত হবেন। এই কর্মকর্তাদের নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হলে যে পদক্ষেপ ও সহায়তা দরকার, তার আয়োজন কতটুকু সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে হবে, সেটি নির্বাচন কমিশনের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, সাধারণ প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন তথা সরকারের ভূমিকা এখানেই সত্যিকারের অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন।
দশম জাতীয় সংসদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় উল্লিখিত সব পক্ষেরই একপক্ষীয় আচরণ উৎকটভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। অনেক নির্বাচন কর্মকর্তা লাঞ্ছিত-অপমানিত হয়েছিলেন, যার সত্যিকার কোনো প্রতিকার তাঁরা পাননি। কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সব বৈধ প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টদের আইনসম্মত দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশন (রিটার্নিং কর্মকর্তা) এজেন্টদের নিরাপত্তার বিষয়টির কী নিশ্চয়তা দিতে পারবে, সেটি অতীত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে আগাম নিশ্চিত করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, সেনাবাহিনী নিয়োগের প্রশ্নগুলো এ বিষয়গুলোর সঙ্গেই সম্পর্কিত। বিষয়টি ভাবাবেগে উপেক্ষার নয়।
নির্বাচনী বিরোধ, হয়রানি, হানাহানি নির্বাচনের দিনই শেষ হয় না। তার রেশ আরও বহুদিন চলে। তাই সুস্থ-স্বাভাবিক আইনের শাসনই এসব কিছুর স্থায়ী সমাধান। আমরা সবাই মিলে ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে আইনের শাসনের পথে কি হাঁটতে পারব? দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতাদের বচন এবং আচরণ তো আমাদের কোনোভাবে এ বিষয়ে আশাবাদী করতে পারছে না।
তবু নির্বাচনী প্রচারণা ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। এটি আরও গতি পাক। মেয়র পদপ্রার্থীরা রীতিমতো জাতীয় নির্বাচনের মতো তথাকথিত। ‘ইশতেহার’ প্রকাশ করছেন। নির্বাচনের পর কাকে, কীভাবে পাওয়া যাবে এবং শেষ পর্যন্ত আগামী পাঁচ বছরে এ দুটি নগরের মানুষ কী কী সমস্যার সমাধান পাবে, সেটি এখনো সুদূরের ভাবনা। তবে অন্তত একগুচ্ছ ইশতেহার ইতিমধ্যে পেয়েছে। এ পাওনাটিও নিতান্ত তুচ্ছ নয়। ঢাকা শহর নিয়ে জননেতৃত্ব থেকে এ-জাতীয় চিন্তাভাবনা অতীতে দেখা যায়নি। কিছু ব্যক্তি নির্বাচন উপলক্ষে অন্তত কিছু ‘স্বপ্নের সওদাগরি’ করছেন। শহর নিয়ে স্বপ্ন দেখা এবং দেখানো কিংবা স্বপ্নচর্চার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। নেতাদের কাজ স্বপ্ন বিনির্মাণ এবং সে স্বপ্নের সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্তি ঘটানো।
প্রসঙ্গক্রমে এ ইশতেহার বা ঘোষণাগুলোর একটি সাধারণ ভ্রান্তির কথা স্পষ্টভাবে এ সময়টাতেই বলা প্রয়োজন। ঢাকা বা চট্টগ্রাম মহানগর নিয়ে যে স্বপ্নের তালিকা মেয়র প্রার্থীরা সুলিখিত বাক্যে এবং সুললিত ভাষণে প্রচার করছেন, তা কি তাঁদের নিজ নিজ দলের প্রতিশ্রুতি নাকি প্রার্থীর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা? সিটি করপোরেশন একটি প্রতিষ্ঠান, যা একটি আইনি কাঠামোর অধীনে কাজ করে। প্রতিটি করপোরেশনে একটি নির্বাচিত কাউন্সিল থাকবে। মেয়ররা সে কাউন্সিলগুলোর সভাপতি হবেন। মেয়রই কাউন্সিল নয়। এখন মান্যবর মেয়র পদপ্রার্থীদের অনেকে যে ভাষায় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে তিনি কাউন্সিলের অস্তিত্ব, ভূমিকা এবং শক্তি সম্পর্কে হয়তো অজ্ঞ-উদাসীন কিংবা লা পরোয়া। এ-জাতীয় ইশতেহার অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করত যদি কোনো মেয়র প্রার্থী একগুচ্ছ কাউন্সিলর প্রার্থীসহ এ-জাতীয় ঘোষণাপত্র তৈরি করতে পারতেন। ব্যক্তি মেয়র প্রার্থীর একক ঘোষণাপত্রের ওপর আস্থা যেমন রাখা যাচ্ছে না, তেমনিভাবে ব্যক্তিসর্বস্বতা সিটি করপোরেশনকে তার প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও সামর্থ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ানোর পুরোনো ভীতিকে আবার নতুনভাবে নাড়া দিচ্ছে।
এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে ব্যক্তির সততা, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ব্যবস্থাপনাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার অপরিসীম মূল্য রয়েছে। ব্যক্তির যোগ্যতার সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকতার সংযোগের প্রশ্নও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমষ্টির চিন্তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের গণতান্ত্রিক আদর্শ এখানে ভূলুণ্ঠিত হতে পারে না। আমাদের বিদ্যমান কাঠামোর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যক্তিশাসনের প্রাবল্য এবং প্রাতিষ্ঠানিকতা ও গণতন্ত্রায়ণ পদে পদে বিপর্যস্ত। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের সব আইনের সরষের মধ্যেই ভূত। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন—সর্বত্রই নারী-পুরুষনির্বিশেষে সব সদস্য এবং কাউন্সিলরই অক্ষম ও অসহায়। আবার মেয়র-চেয়ারম্যানরা কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তির কাছে সমর্পিত-পরাজিত। স্থানীয় সরকারে সর্বত্রই অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে অনুগ্রহপ্রার্থীরা অনেক বেশি সক্রিয়। এ অচলায়তন আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অসংস্কৃতি এবং অধস্তনতার সংস্কৃতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। তাই বলা যায়, বর্তমান ব্যবস্থায় মোটামুটি একটা ভোটাভুটিই হবে। কিন্তু গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্বশাসনের সূচনা এখনো সুদূরপরাহত।
এসব বিষয় নিয়ে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম আজকাল অনেক সোচ্চার। কিন্তু বড় দুটি দল বা জোটের নীতিনির্ধারকেরা বরাবরের মতোই নির্বিকার। এ নীরবতা ভেঙে এ বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সক্রিয়তার কাছে আকুতি—এভাবে নির্বাচনেই শুরু, নির্বাচনেই শেষ—এ রাজনীতির ভবিষ্যৎ ভালো নয়। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যেমন প্রয়োজন, তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা প্রয়োজন। এগুলো দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত বিষয়। দিনে দিনে সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। নির্বাচিত স্থানীয় পরিষদগুলোকে কাজের সুযোগ করে দিলে জাতীয়ভাবে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির একটি স্থিতিশীল কাঠামো বিনির্মাণে আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতি অনেক বেশি অর্থবহ ও টেকসই হবে।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1782)
-
▼
August
(329)
-
▼
Aug 30
(14)
- লেবাননে সমৃদ্ধ ইতিহাসের নতুন তথ্য, মিলছে হাজার বছর...
- আরব বিশ্বে বাড়ছে খাদ্য ও পানির সংকট, মরুকরণে ব্যাহ...
- তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে চাপে নেতানিয়াহু
- ইরান যুদ্ধে অস্ত্রের মজুত ‘সংকটজনক’, চীন-রাশিয়া মো...
- নিষেধাজ্ঞায় কি নত হবে ইরান, ট্রাম্পের সামনে বড় প্রশ্ন
- ব্যাগে ছয় দেশের পাসপোর্ট, বেনজীর এখন সেন্ট লুসিয়ায়...
- ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ এখন রড-সিমেন্টের কারবারি by নাজমু...
- ইরানের হুমকি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরলেন নে...
- পশ্চিম তীরের গ্রামের একমাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দিল...
- ইরান যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে...
- কেন লোকচক্ষুর আড়ালে ব্যারন ট্রাম্প
- ক্যানসারের চিকিৎসার মধ্যেই সিনেমার কাজ, কঠিন লড়াইয়...
- কিয়েভের কাছে গোলাবারুদের গুদামে রাশিয়ার হামলা, নিহ...
- কলকাতার মুসলিম কলোনিতে এক মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ...
-
▼
Aug 30
(14)
-
▼
August
(329)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







