Showing posts with label সমকাল. Show all posts
Showing posts with label সমকাল. Show all posts

Saturday, July 6, 2024

গল্প- সুরতারিণীর ধারণকৃত কণ্ঠস্বর by মঈনুস সুলতান

মোটরবাইকের একজস্ট পাইপ দিয়ে বেরুচ্ছে প্রচুর ধোঁয়া। কাদা বাঁচিয়ে মেঠোপথে চালাতে গেলে বিচিত্র আওয়াজ হয়। উল্টা দিকের বাতাস বয়ে আনে পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ। অনেকদিনের হোন্ডা বাইকখানা বেজায় লজজড়। আদিবাসী পাত্র সম্প্রদায়ের গ্রাম বহরগুলে যাওয়ার জন্য সরোজ মোহাইমিন বাইকখানা তার সহকর্মীর কাছ থেকে ধার করে এনেছে। এবড়ো-খেবড়ো সড়কে দু-চাকার বাহনটিকে সামলাতে তার সমস্যা হয়। কাছেই জাফলংয়ের দিকে ছুটে চলা পিচঢালা হাইওয়ের পাশে তাদের এনজিও, ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সংক্ষেপে ভিডিআই। বছর দুয়েক হলো সরোজ ওখানে কাজ করছে। কর্মরত হওয়ার আগে সে পাক্কা দশ বছর কাটিয়েছে ঢাকা শহরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ছাড়াও ওখানে সে দেদার সময় ব্যয় করেছে ছোটগল্প লেখায়। গল্প সে লিখেছে প্রচুর, কিন্তু রচনাগুলোর ছেপেছে কেবলমাত্র লিটল ম্যাগাজিনে, তা-ও কাজা-কচ্ছিৎ। গল্পগুলোর বিষয়বস্তু অপ্রথাগত, তাই সম্পাদকরা আগ্রহ দেখাননি। রচনাশৈলীতে নিরীক্ষা থাকায় পাঠকরাও তার সৃষ্টির কদর করেনি।

ঢাকাতে সরোজের কোন গতি হচ্ছিলো না, এক ধরনের ব্যর্থতাবোধ কাঁচা বাঁশে ঘুণের মতো তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো। ভিডিআইতে কাজ পাওয়ায় বেকার বদনাম যেমন ঘুচেছে, তেমনি প্রতি মাসে হাতে আসছে সামান্য কিছু উপার্জন। এতে দিনযাপনে সচ্ছলতা এসেছে বটে, তবে সহকর্মীদের সংস্থাভিত্তিক সংস্কৃতিতে সে নিজেকে মিশ খাওয়াতে পারছে না। তার দুর্বলমাপের লেখক পরিচিতি ও পাঠাভ্যাস আড়াল-আবডালে উপহাসের বিষয় হয়েছে। নিশিরাতে নিরিবিলিতে বসে ধ্রুপদী সঙ্গীত শোনার হবিও হয়েছে সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায়।

এনজিওর পেশাগত কাজে সে প্রচুর দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু সংস্থার এজেন্ডানুযায়ী চলতে পারেনি। আদিবাসী পাত্র সম্প্রদায়ের গ্রামে উন্নয়নমূলক কাজের সূচনায় খানা-জরিপের দায়িত্ব পড়েছিলো তার ওপর। জরিপ করতে গিয়ে সে ছোট্ট নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। সিলেটের সংলগ্ন শহরতলি ছাড়িয়ে চা-বাগানগুলোর ফাঁকফোকরে টিলাশোভিত বনভূমির প্রান্ত-ছোঁয়া মাত্র কয়েকটি গ্রামে এ সম্প্রদায়ের বাস। জনসংখ্যার নিরিখে অত্যন্ত ক্ষুদ্র; তবে এদের ভাষা ও সংস্কৃতি মূলধারার হিন্দু-মুসলমানদের চেয়ে ভিন্ন। এদের সম্পর্কে বইপত্রে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য সরোজ খুঁজে পায়নি। তো এক পর্যায়ে সে নিজে থেকে তাদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মরীতি, বিবাহ প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে এসবের ভিত্তিতে লিখেছে একটি প্রবন্ধ। রচনাটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। এতে বিরাগভাজন হন কর্মক্ষেত্রে তার সুপারভাইজার। উনার অভিমত হলো, সরোজের দায়িত্ব হচ্ছে পাত্র গ্রামে এনজিওর নির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়িত করা। কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কহীন তথ্য সংগ্রহ সম্পর্কে তার আপত্তি। তিনি চাচ্ছেন না- সরোজ ব্যক্তিগত আগ্রহের জন্য সংস্থার সময় ব্যয় করুক। পাত্র গ্রামের কিছু পরিবারের সঙ্গে তার গড়ে উঠেছে সুন্দর সম্পর্ক; এ বিষয়টাও সুপারভাইজার পছন্দ করেননি। মাঠে অনেক বছর ধরে কাজ করা অত্যন্ত সিজনড্‌ ভদ্রলোক তাকে গ্রাম পর্যায়ে কেবলমাত্র পেশাদারি সম্পর্ক রক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সরোজ চরিত্রের দিক থেকে গহন-বিচারি একজন প্যাশনেট প্রকৃতির পুরুষ। যা তার ভালো লাগে, যে বিষয়ে তার মধ্যে তৈরি হয় প্যাশন, তা অবজ্ঞা করে নৈর্ব্যক্তিক আচরণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তো সে সুপারভাইজারের পরামর্শ উপেক্ষা করেছে। পরিণতিতে মাঠ পর্যায়ে দারুণ পরফরমেন্সের পরও বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট পায়নি সরোজ।

বালুকাময় পথে হোন্ডাটি ফটফটিয়ে থেমে যায়। ঠেলা-ধাক্কা করে সে বাহনটিকে নিয়ে আসে একটি পাখিয়ারা গাছের তলায়, কিন্তু স্টার্ট করতে পারে না। ভারি উদ্বেগ হয়, কলকব্জা কিছু যদি গড়বড় হয়, তাহলে যে সহকর্মীর কাছ থেকে বাইকটি ধার করে এনেছে, তার কাছে সে লজ্জা পাবে। এ বাইকের সহায়তা ছাড়া অফিস-কর্মের চাপের ভেতর এক ফাঁকে হুট করে পাত্র গ্রাম ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা মুশকিল হয়ে পড়বে।

বেশ খানিকটা সময় বাইকটি সারাই করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে সিগ্রেট ধরায়। স্মোক করতে করতে দেখে, কাছের একটি আমগাছের তিডালার গোড়া থেকে বেরিয়ে এসেছে গোলাপিতে ছোপ ছোপ শুভ্রতা ছড়ানো আমকুড়ালির ফুল। সে ব্যাকপ্যাক থেকে ক্যামেরা বের করতে যায়। তখনই খেয়াল করে, আমকুড়ালির অর্কিড গুচ্ছটি ঘিরে উড়ে উড়ে সুচালো ঠোঁটে মধু চয়ন করছে অত্যন্ত ছোট্ট একটি মৌটুসি পাখি। দৃশ্যটি থেকে ছড়াচ্ছে এমন এক ধরনের মায়া, সে সম্মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। ক্যামেরার শাটার টিপতে তার আগ্রহ হয় না। এ অলিম্পিয়া ক্যামেরাটিও সরোজ ধার করে নিয়েছে ভিডিআইর একজন সহকর্মীর কাছ থেকে। বয়সের কারণে অলিম্পিয়া হালফিল তেমন একটা কার্যকর না। এতে ছবি ওঠে বটে, কিন্তু কীভাবে যেন ফিল্মের সর্বত্র আঁকা হয়ে যায় আলোর বেজায় উজ্জ্বল দাগ। এতে আলোকচিত্রের বিষয়বস্তুর ডিটেলস্‌ ঝাপসা হয়ে পড়ে।

এ ক্যামেরা দিয়ে কয়েক মাস আগে পাত্র সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণের দারুণ কিছু দৃশ্য ধারণ করেছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আলোকচিত্রগুলো এমনভাবে ঝাপসা হয়েছে যে, এগুলো কোন লেখার সাথে ব্যবহার করার কোন উপায়ই থাকেনি। পাত্রদের পূজার রীতি-রেওয়াজ মূলধারার হিন্দুদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিন্দু দেব-দেবীর আরাধনা তারাও করে থাকে, তবে তাদের অর্চনায় কোন মূর্তি বা বিগ্রহের ব্যবহার নেই। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বহরগুল গ্রামের এক মহিলা- সুরতারিণীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চার সন্তানের জননী বিধবা সুরতারিণী সরোজকে ভাই ডাকেন। গ্রামে গেলে তিনি তাকে তার দাওয়ায় বসিয়ে শসা খেতে দেন। সরোজও তার জন্য কখনো-সখনো নিয়ে যায় গ্লুকোজ বিস্কিটের প্যাকেট। পাত্ররা জংগলের অনেক পত্রলতা ও শিকড়-বাকড়ের রস জারিত করে তৈরি করে 'খর' নামে পরিচিত পানীয়। সুরতারিণী তার ঘরের পেছনে মাটির তলায় শিয়ালের গর্তের মতো সুড়ঙ্গ খুঁড়ে খর প্রক্রিয়াজাত করেন। মাঝেমধ্যে সরোজের ভাগেও জোটে যৎসামান্য ঝাঁঝালো পানীয়। বস্তুটি পান করে সে একবার অফিস ফিরলে, উৎকট গন্ধে তার সুপারভাইজার জোড়া ভুরু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন।

সুরতারিণী তাকে পূজার দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মাস চারেক আগে চৈত্র মাসের অপরাহেপ্ত সরোজ বহরগুলে ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলো। অই দিন সুরতারিণী খর পানে দারুণভাবে মাতেলা ছিলেন। তিনি ক্রমাগত নাসির বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে পাতানো ভাই সরোজকে নিয়ে গিয়েছিলেন পাকুড় গাছের তলায় পূজার থানে। পাত্রদের পূজা-পার্বণে পূজারি ব্রাহ্মণের কোন চল নেই। সুরতারিণীর জেঠা, বহরগুলের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি সুরেশ পাত্র পূজা পরিচালনা করছিলেন। লাঠি ভর দেয়া থুরথুরে মানুষটি প্রচুর পানে এমনভাবে বিভোর হয়েছিলেন যে, তিনি ক্যামেরা ব্যবহারে কোন আপত্তি তোলেননি। গাছের গোড়ায় ভারি স্নিগ্ধ চেহারার এক পাত্র-কিশোরী কুলায় করে নিয়ে এসেছিলো পান, সুপারি, নারিকেল, গুড়, কলা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো উপাচার।

মেয়েটির নাম রত্নামণি। সে হাসি হাসি মুখে উপাচারের ডালাটি হাতে ছবির জন্য ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছিলো। পূজাতে এক জোড়া কবুতর ও গজার মাছ বলি দেয়া হয়। রত্নামণি আধলা ইট দিয়ে বানানো খোলা চুলায় রান্না করে ভোগ। গ্রামবাসীর সাথে সরোজেরও জুটেছিলো কলাপাতায় প্রসাদ। এ ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর বহরগুলে এসে সে ঝাপসা হয়ে ওঠা ফটোগ্রাফের একটি প্রিন্ট মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো। তাতে রত্নামণি এমন খুশি হয় যে, সে কেবলই সরোজকে জোড়-হাতে প্রণাম জানাতে থাকে।

আজ সুরতারিণীর তালাশে সরোজ বহরগুলে গিয়েছিলো। কিন্তু তিনি বাড়িতে ছিলেন না। প্রতিবেশীদের সাথে বাতচিত করে সে জানতে পারে, সকালবেলা সুরতারিণী গ্রামের দুটো ছেলের কান কাঁটা দিয়ে ফুঁড়ে দেন। কৈশোর অতিক্রান্ত পাত্র ছেলেদের মধ্যে কান ফোঁড়ার রেওয়াজ আছে। এ আচার সম্পাদন করতে গিয়ে সুরতারিণী নাকি পান করেছেন প্রচুর পরিমাণে খর। তারপর হেঁটে গেছেন পিচঢালা রাজসড়কের দিকে। সরোজ ভেবেছিলো, সুরতারিণীকে নিয়ে সে যাবে সুরেশ পাত্রের কাছে। তিনি 'সিটকই' বলে সমাজে পরিচিত, জোর করে পাত্র যুবতীদের অনভিপ্রেতভাবে বিবাহ করা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে রাজি হয়েছিলেন। তো সুরতারিণীকে না পেয়ে সে একাই চলে গিয়েছিলো সুরেশ পাত্রের ঘরে।

সরোজ ভাবতেও পারেনি, সুরেশ পাত্রের স্বাস্থ্য ভেঙে গিয়ে এত দ্রুত তিনি মরণাপন্ন হয়ে উঠবেন! ঘরের দাওয়ায় বাতাবি লেবু গাছের ছায়াতলে তাকে চাটাইতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার গলা দিয়ে বেরুচ্ছে ঘড়-ঘড়ে আওয়াজ। কোন ডাক্তার-কবিরাজের ব্যবস্থা নেই। পাশে বসে রত্নামণি বাটি থেকে কেরাইয়া পাতার রস ত্যানা দিয়ে তুলে লেপে দিচ্ছে মরণাপন্ন বৃদ্ধের কপালে। তাকে দেখতে পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয় রত্নামণি। তার হলুদাভ আভা ছড়ানো ত্বক যেন জ্বলে-পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। রাহুগ্রাসে বিলুপ্ত হওয়া জ্যোৎস্নার মতো মেয়েটির অবয়ব থেকে মুছে গেছে স্নিগ্ধ শ্রী।

রত্নামণির হাতে ঝাপসা ফটোগ্রাফটি তুলে দেয়ার ঠিক চার দিন পর মেয়েটি কলসি কাঁখে পানি আনতে যায়। সেনানিবাসের সংলগ্ন হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের জংলা ভূমিতে হামেশা সৈনিকদের মহড়া চলে। যতটা জানা যায়, জল নিয়ে ফেরার পথে দু'জন সৈনিক বিন্নাঝোপের আড়ালে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ভায়োলেন্টভাবে ধর্ষণ করে। এতে তার জননেন্দ্রিয় জখম হয় মারাত্মকভাবে। ভিডিআইর এক মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে এ তথ্য পেয়ে সরোজ চেষ্টা করেছিলো রত্নামণির নাম উল্লেখ না করে স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদটি ছাপানোর। কিন্তু দেশে চলছে জেনারেল এরশাদের কড়া মার্শাল-ল। যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া কোন পত্রিকা এ ধরনের সংবাদ ছাপতে রাজি হয় না।

রত্নামণির প্রসঙ্গ মনে আসতেই তার মধ্যে বিচিত্র এক অনুভূতি হয়। কিশোরীটি সুদর্শনা; আকর্ষণ বলতে যা বোঝায়, সরোজ কখনো তা ফিল করেনি, বরং স্নেহটাই তার সংবেদনে প্রধান হয়ে উঠেছে। শরীরে নারীত্ব ফুটে ওঠার কারণে একটি মেয়েকে দৈহিকভাবে বিক্ষত হতে হবে, আঘাত ও অপমানের বোঝা জনমভর বয়ে বেড়াতে হবে- এ ব্যাপারটা সরোজ মেনে নিতে পারে না। কিন্তু বিহিত কিছু করার মতো সামাজিক শক্তিও তার নেই। এ অসহায়বোধ থেকে তার মধ্যে জন্ম নেয় ক্রোধ। সে তেড়িয়া হয়ে বাইকের স্টার্টারে কিক কষায়। স্রেফ কপালগুণে তা চালু হয়। বাহনটি ম্যানেজ করতে করতে ফের সে সুরেশ পাত্রের কথা ভাবে। কথাবার্তায় সরোজ জেনেছে যে, কিছু পাত্র মেয়ে শরীরীভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে মূলধারার জনগোষ্ঠীর যুবকদের হাতে। পরিণতিতে কোন কোন যুবক জোর করে পাত্র মেয়েকে বিয়েও করেছে। এ বিষয়টা পাত্র ভাষায় 'সিটকই' বলে পরিচিত। সিটকই-এর শিকার মেয়েদের পাত্র সমাজে সহানুভূতির চোখে দেখা হয় না। সুরেশ বুড়ো তাকে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। দোষ তারই, সময়মতো সে ফলোআপ করেনি। কারণ সুপারভাইজারের নির্দেশে প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য তাকে যেতে হয়েছিলো কুষ্টিয়া, বরিশাল ও খুলনায় তিন-তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ট্রিপে। কোনভাবেই সুরেশ পাত্রের ফের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য সময় করে উঠতে পারছিলো না। ভাবতে ভাবতে সরোজের কেবলই মনে হতে থাকে, সুরেশ পাত্রের পরলোকপ্রাপ্তির ভেতর দিয়ে সামাজিকভাবে কিছু অন্যায় সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য হারিয়ে যাবে।

মলই পাড়ার কাছে বাঁক নিতে গিয়ে সে দেখে, গ্লাবেত বনের ঝোপটির আড়ালে বসে নকুল পাত্র কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করছেন অঙ্গার। মনে হয়, শতাব্দীকাল থেকে পাত্র পুরুষরা অঙ্গার তৈরি করে তা চায়ের দোকান প্রভৃতিতে সরবরাহ করার ব্যবসা করে আসছেন। সরোজ বাইকের স্টার্ট চালু রেখে মাটিতে পা ঠেকিয়ে তা থামায়। সে নকুলের কাছে জানতে চায়- কোথায় সুরতারিণী দিদি? জবাবে জানা যায়- তার শরীর খারাপ, জ্বর-জারি ও কফ-কাশিতে কষ্ট পাচ্ছেন, তো তিনি সরোজের তালাশে তার অফিসের দিকে গিয়েছেন। শুনতে পেয়ে প্রমাদ গুনে ফের সে তোড়ে বাইক হাঁকায়। যেতে যেতে মন থেকে নকুল পাত্রের সম্প্রতি নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি এড়াতে পারে না। পাত্র পুরুষদের সনাতনী ব্যবসা অঙ্গার তৈরির জন্য কাঠ কুড়াতে গিয়ে তিনি বন বিভাগের কর্মীর হাতে ধৃত হয়েছিলেন মাস খানেক আগে। ফরেস্ট গার্ডরা তাকে গাছের সাথে বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটায়। এতে তার পায়ে মারাত্মকভাবে জখম হয়। বর্তমানে নকুল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। ভিডিআই অফিসের কাছাকাছি এসে সরোজের কেবলই মনে হতে থাকে, হাল জামানার রিজার্ভ ফরেস্ট তো এক যুগে পাত্র সম্প্রদায়ের খাসভূমি ছিলো। ব্রিটিশ প্রশাসকরা জোর করে পত্তনি দিয়ে অনায্যভাবে রিজার্ভ ফরেস্ট গড়ে তোলে। তো নকুল- হলেনই বা তিনি বনতস্কর, তাই বলে তাকে বেঁধে পেটাবে? অন্যান্য আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মতো পাত্রদের একটি কল্যাণ সমিতি থাকলে এ বাবদে প্রতিবাদ করা যেত।

অফিসের বারান্দায় দেখা হয় সুপারভাইজারের সঙ্গে। অবাক হয় সরোজ! তিনি না সকালে ব্রাঞ্চ অফিস পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন! তার তো এত তাড়াতাড়ি ফেরার কথা না? প্রৌঢ় ভদ্রলোকের চুল উসকোখুসকো হয়ে আছে, কলপের কালিমালিপ্ত কেশগুচ্ছের তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে ছোপ ছোপ ধূসরাভা। তিনি বিদ্রূপাত্মকভাবে বলেন, 'তোমার পাত্র রিলেটিভ বসে আছেন রিসেপশন লাউঞ্জে; যাও, মেহমানদারি করো।'

বেতের চেয়ারে বসে চুপচাপ ঝিমাচ্ছিলেন সুরতারিণী। রোদে পুড়ে তার চোখমুখ এত কালো হয়েছে যে; মনে হয়, মহিলা পোড়া অঙ্গার ছেনে এসেছেন। তার কাঁধ থেকে খসে পড়েছে আঁচল, চতুর্দিকে ছড়াচ্ছে খরের ঝাঁঝালো গন্ধ। সরোজকে দেখতে পেয়ে আধপোড়া বিড়িটি মুখে দিয়ে ফস করে দেশলাইয়ের কাঠি ঘষেন। বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে সরোজ বুঝতে পারে, তার দিদি ক্যাসেটটি ফেরত চাচ্ছেন। ঘটনা হলো, মাস দুয়েক আগে সরোজ অনানুষ্ঠানিকভাবে সুরতারিণীর সাক্ষাৎকার একটি ক্যাসেটে ধারণ করে। এতে টেপ করা আছে পাত্র সম্প্রদায়ের জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু সংক্রান্ত খুঁটিনাটি তথ্য। তিনি কেন ক্যাসেটটি ফেরত চাচ্ছেন- তা জানতে গিয়ে তার তাজ্জব হওয়ার দশা হয়! সুরতারিণীর জেঠা সুরেশ পাত্র মশাইয়ের জ্যোতিষ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি আছে। তিনি গ্রহ-নক্ষত্র বিচরিয়ে অনেক দিন আগে নাকি বলেছিলেন, তার ভাই এর কন্যার মৃত্যু হবে তার মৃত্যুর ঠিক সাত দিন পর। গ্রহ-নক্ষত্রের ফের তো খণ্ডানোর কোন উপায় নেই। এখন সমস্যা হচ্ছে- পরলোকপ্রাপ্তির পরপরই মরদেহ দাহ করার বিধান, কিন্তু দেহটি ভস্ম হলেও তার ধারণকৃত বক্তব্য থেকে যাবে পৃথিবীতে। তো সুরতারিণী দেহে প্রাণ থাকাবস্থায় ক্যাসেটটি পুড়িয়ে ফেলতে চান। অনেক কথাবার্তা বলেও সরোজ ক্যাসেটটি না পোড়ানোর ব্যাপারে সুরতারিণীকে কনভিন্স করতে পারে না।

ক্যাসেটটি থেকে জরুরি উপাত্ত ট্রান্সক্রিপ্ট করে নোটবুকে টুকে ফেলা হয়নি। তো সরোজের করোটিতে একটি ধূর্ত আইডিয়া খেলে যায়। অন্য একটি ক্যাসেটে উপাত্ত রিরেকর্ড করে সুরতারিণীকে তা ফেরত দেয়া যেতে পারে। কিন্তু অফিসে এম্পটি কোন ক্যাসেট নেই। সিলেট শহরে গিয়ে এ মুহূর্তে তা কিনে আনারও কোন উপায় নেই। কারণ সামরিক সরকারের নির্দেশে ছাত্রমিছিলের ওপর ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করার প্রতিবাদে হরতাল চলছে। তাই বাইক হাঁকিয়ে শহরে গিয়ে ক্যাসেট কিনে আনা অসম্ভব।

তো বিষয়টি আদ্যোপান্ত ভেবে সে সুরতারিণীর কাছে ক্যাসেট ফেরত দেয়ার জন্য তিন দিন সময় চেয়ে নেয়। মহিলা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে থেকে বিড়িতে দীর্ঘ দম দিয়ে আস্তে আস্তে অফিস থেকে বেরিয়ে যান। সরোজও তার সাথে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। বিদায় দিতে গিয়ে মনে হয়, মহিলা হচ্ছেন গবেষণার পরিভাষায় একজন ইনফরম্যান্ট। তিনি যে তথ্য সরবরাহ করেছেন, তার অধিকার আছে তা ফিরিয়ে নেয়ার। তবে কি সে ক্যাসেটটি ফেরত দেবে? কিন্তু এ উপাত্তকে ভিত্তি করে সে লিখতে চাচ্ছে আরেকটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ। হামেশা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগার সমস্যা আছে তার। কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। খুক-খুকিয়ে কাশতে কাশতে সুরতারিণী সিঁড়ির কাছে থুক করে এক দলা কাশ ফেলেন। তারপর তার পাতানো দিদিটি হেঁটে যান দূরের জংগলশোভিত পল্লীর দিকে। অফিসের কামরায় ফেরার আগে নোংরা থুথুর দিকে সরোজের চোখ পড়ে। ওখানে রক্তের ছিটা দেখতে পেয়ে ভারি উদ্বেগ হয়। কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তার দারুণ অসহায় লাগে।

Saturday, May 9, 2020

গুড়ের ৭ গুণ

গুড় সারা বছরই পাওয়া যায়। সাধারণত আখ ও খেজুর গুড় বেশি জনপ্রিয়। এটি পুষ্টি গুণে সমৃদ্ধ একটি খাবার। এতে প্রচুর পরিমাণে খনিজ, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, সেলেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও জিঙ্ক থাকে। আয়ুর্বেদ চিকিৎসা অনুযায়ী, পেটের নানা অসুখ সারাতে গুড় দারুণ কার্যকরী।
গুড় খেলে যেসব স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যাবে-
১. অ্যানিমিয়া আক্রান্তদের জন্য গুড় দারুণ উপকারী। রোজ গুড় খেলে শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি পূরণ হবে। 
২.  গুড়ে বিশেষ করে আখের গুড়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালরি ও শর্করা থাকে। এ কারণে ডায়রিয়া রোগীদের জন্য গুড়ের স্যালাইন উপকারী।
৩. গুড়ে থাকা ম্যাঙ্গানিজ গলা খুশখুশ, শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জি প্রতিরোধ করে। এটি খেলে ব্রংকিয়াল মাংসপেশী আরাম পায়। ফলে গলা ও শরীরে অনেক বেশি হালকা বোধ হয়।
৪. গুড়ে থাকা আয়রন শরীরে রক্ত তৈরি করে। সেই সঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে তোলে ।মাইগ্রেনের ব্যথা সারিয়ে তুলতেও বেশ কার্যকরী গুড়।
৫. গুড়ে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট অ্যান্টি-অ্যালার্জি হিসেবে কাজ করে।
৬. গুড় জন্ডিস রোগীদের জন্যও বেশ উপকারী।
৭. গুড় খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। শরীরে থাকা ফ্রি রেডিকেল দূর করতে সাহায্য করে গুড়। এতে থাকা জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া

Tuesday, May 5, 2020

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন যেভাবে

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন পরিচিত এক সমস্যা। কখনও কখনও এটি প্রাণ সংশয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনিয়মিত খাদ্যাভাস, অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ এবং শরীরচর্চা না করার কারণে এই সমস্যা বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, জীবনযাত্রা এবং খাদ্যতালিকায় কিছু পরিবর্তন আনতে পারলে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। যেমন-
১. উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে লবণ খাওয়া কমাতে হবে। কারণ, অতিরিক্ত লবণ রক্তে মিশে শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট করে। তখন রক্তচাপ অস্বাভাবিক ভাবে বাড়তে থাকে।এছাড়া শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে কিডনির সমস্যাও হতে পারে।
২. আয়ুর্বেদ চিকিৎসা অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মধু অত্যন্ত কার্যকরী । ১ কাপ হালকা গরম পানিতে ১ চামচ মধুর সঙ্গে কয়েক ফোঁটা অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে খান। প্রতিদিন সকালে এটি খেতে পারলে রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের মতো সমস্যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
৩. কলাতে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।দিনের যে কোনও সময়, সারাদিনে অন্তত একটা কলা খাওয়ার চেষ্টা করুন।
৪. পুষ্টিবিদদের মতে, কমলার রসের সঙ্গে ডাবের পানি মিশিয়ে দিনে ২ থেকে ৩ বার খেতে পারলে রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
৫. তরমুজে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এ, লাইকোপিন, পটাশিয়াম এবং ফাইবার থাকে যা উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের মতো সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
৬. ওটসে খুব কম পরিমাণে সোডিয়াম থাকে। এছাড়া এতে উচ্চমাত্রার ফাইবার থাকায় এটি রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের মতো সমস্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
৭. উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে মশলাদার খাবারের পরিবর্তে সবুজ শাক-সবজি খেতে পারেন। কারণ সবুজ সবজিতে উপস্থিত ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফলিক অ্যাসিড উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। সূত্র : জি নিউজ

Friday, January 10, 2020

পানিশূন্যতা প্রতিরোধে করণীয়

গরমে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা একটা বড় দুশ্চিন্তার কারণ৷ শরীরে যখনই পানির পরিমাণ কমে যায় তখনই ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ নানাবিধ শারীরিক চক্র সচল রাখতে পানির গুরুত্ব অপরিসীম৷
ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা প্রয়োজন। ডিহাইড্রেশনের মাত্রা কম হলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করলেই তা ঠিক হয়ে যায়। তবে গুরুতর ডিহাইড্রেশন হলে চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে৷
গরমের দিন অনেকটা সময় বাইরে রোদে থাকতে হয়৷অনেকে আবার নিয়মিত ব্যায়ামও করেন৷ এই দুই কারণে অতিরিক্ত ঘাম হয়। তখন শরীরে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হতে পারে৷ এ কারণে সারাদিন কম বেশি পানি পান করা উচিত৷ তা না হলে ডিহাইড্রেশন হয়, শরীরে অবসাদ দেখা দেয়।
ডিহাইড্রেশন হলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন-প্রচণ্ড পানি পিপাসা পায়, মুখ শুকিয়ে যায়, মাথা যন্ত্রণা হয়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, পেশীতে টান ধরে, চামড়া শক্ত হয়ে যায়, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হয়, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায় ইত্যাদি।
ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে কিছু বিষয় অনুসরণ করতে পারেন। যেমন-
১. বাইরে বের হওয়ার সময় পানির বোতল সঙ্গে রাখুন৷ যত বেশি ঘাম হবে তত বেশি পানি পান করুন৷
২. তাপমাত্রা বেশি থাকলে শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের পরিমাণ কমিয়ে আনুন৷
৩. বাইরে বের হওয়ার সময়ে হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পড়ুন।
৪. একটানা বেশি সময় গরম এলাকায় থাকবেন না। মাঝে মধ্যে ছায়ায়, ফ্যান বা এসির নীচে অবস্থান নিন৷
৫. গরমের সময় নিয়মিত মৌসুমি ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।
৬. বেশি গরম অনুভূত হলে শরীরে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দেওয়া উচিত৷ সম্ভব হলে শরীরে একটু ভেজা তোয়ালে পেঁচিয়ে রাখলে ভালো হয়৷
ডিহাইড্রেশনকে অবহেলা করা উচিত নয়৷ ডায়রিয়া কিংবা বমিজনিত ডিহাইড্রেশন অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷

Thursday, December 19, 2019

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে করণীয়

উচ্চ রক্তচাপ একটি পরিচিত সমস্যা। অনেকের আজকাল অল্প বয়সেই এই সমস্যা ধরা পড়ছে। কেউ কেউ দু’বেলা ওষুধ খেয়েও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাপন পদ্ধতি পরিবর্তন করা জরুরি।

১. চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মেদ  ঝরাতে পারলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।এ কারণে খাদ্যাভাস ও শরীরচর্চার মাধ্যমে মেদ ঝরানোর চেষ্টা করুন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেদ কমাতে সপ্তাহে ১৫০ মিনিট, অর্থাৎ পাঁচদিন ৩০ মিনিট করে হালকা থেকে ভারী শরীরচর্চা করুন। এছাড়া ঘাম ঝরিয়ে হাঁটলে, সাইক্লিং করলে অথবা সাঁতার কাঁটলেও শরীর  ঝরঝরে থাকে। সেই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপও থাকে নিয়ন্ত্রণে।

২. উচ্চ রক্তচাপ কমাতে নিয়মিত পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার, শাক সবজি, ফল এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন।  নিয়মিত খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। 

৩. খাবারে কাঁচা লবণ খাবেন না। রান্নায় যথাসম্ভব লবণ কমিয়ে দিন। প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া বর্জন করুন।

৪. ধূমপান ছাড়তে পারলে স্বাভাবিক নিয়মেই হৃৎপিণ্ডের অবস্থার উন্নতি হবে। সেই সঙ্গে অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে।

৫. যারা নিয়মিত কফি খান, তারা হয়তো  পরিবর্তনটা বুঝতে পারবেন না।  কিন্তু যাদের সেই অভ্যাস নেই,, তারা হঠাৎ করে শুরু করলেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন। এজন্য কফি পানের ৩০ মিনিট আগে একবার উচ্চ রক্তচাপ মাপুন। এরপর  কফি খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে আবার  মাপুন। এতে দেখা যাবে উচ্চ রক্তচাপের পরিমাণ কতটা বেড়েছে। এ কারণে ঘন ঘন কফি পানের অভ্যাস পরিহার করুন।

৬. মানসিক চাপ , উচ্চ রক্তচাপ বাড়ার অন্যতম কারণ। মানসিক চাপ , উদ্বেগ আসতে পারে, এ ধরণের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন। সাংঘাতিক উচ্চাশা থাকলে চাপ হবেই। আপনি যা কিছু নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তা নিয়েই কাজ করুন।

৭. উচ্চ রক্তচাপ মাপার মেশিন আজকাল অনেকের ঘরেই থাকে। নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। একটু কম বেশি হলে ক্ষতি নেই। তবে হঠাৎ অনেক ওঠানামা করলে অবশ্যই চিকিৎকের পরামর্শ নিন। সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Wednesday, November 20, 2019

তথ্যপ্রযুক্তির যুদ্ধে কার লাভ, কার ক্ষতি

তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়ায় যুদ্ধের দামামা বেশ জোরেসোরেই বেজে উঠেছে। অনেক আগে থেকেই এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে, যার অংশ ছিল প্রায় গোটা দুনিয়া। কিন্তু চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষায়িত নিষেধাজ্ঞা জারি এবং একই সময়ে হুয়াওয়ের সঙ্গে গুগলের চুক্তি বাতিলের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধটা এখন আর শুধু স্নায়ুর টানাপোড়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্ব বাণিজ্যের ময়দানে পূর্ণাঙ্গ অবয়বে প্রতিভাত হতে শুরু করেছে। কিন্তু এই যুদ্ধে কার লাভ, কার ক্ষতি? এই যুদ্ধের ভেতরে ভবিষ্যতের জন্য কোনো সম্ভাবনা কি আছে?

আধুনিক যুগের কম্পিউটার প্রযুক্তির জনক হিসেবে খ্যাত চার্লস ব্যাবেজের মেকানিক্যাল কম্পিউটার থেকে শুরু করে আজকের স্মার্ট কম্পিউটিং ডিভাইস পর্যন্ত বিশ্বে কম্পিউটিং সিস্টেমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তথ্য ভাণ্ডারের বিবেচনায় আধুনিক কম্পিউটার থেকে সুপার কম্পিউটারই হোক, আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক কিংবা ডিভাইসই হোক– সবকিছুতেই যুক্তরাষ্ট্র একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে।

আপনি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ কিনতে গেলে সাধারণত কোন কোন ব্র্যান্ডের কথা আগে ভাবেন? নিশ্চয়ই ডেল, এইচপি, আসুস কিংবা লেনোভোর কথা। এই চারটি প্রধান ব্র্যান্ডের মধ্যে ডেল, এইচপি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি। আর আসুস তাইওয়ানের কোম্পানি হলেও এর ওপর নিয়ন্ত্রণ চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রেরই বেশি। লেনোভো চীনের কোম্পানি, ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর এটি প্রথম বিশ্বে নাড়া দেয় ২০০৮ সালে, যখন এর মার্কেট শেয়ার শীর্ষ পাঁচটি ব্র্যান্ডের মধ্যে চলে আসে। আর একটি কোম্পানি কমপ্যাক বেশ ভালোভাবে বাজারে এসেছিল, কিন্তু এটা অধিগ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এইচপি।

স্ট্যাটিসটার তথ্য অনুযায়ী, ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেমের (ওএস) ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ৭৬ শতাংশ একক মার্কেট শেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রোসফটের। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপলে'র আইওএসে'র মার্কেট শেয়ার ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। আর লিনাক্সের ১ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে স্মার্টফোনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ওএসের মার্কেট শেয়ার ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আইওএসে'র ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আবার ধরুন, এন্টারপ্রাইজ নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি সিসকো এক নম্বরে, ব্রডব্যান্ড ইন্টারন্টে বা ফাইবার অপটিক ট্রান্সমিশন যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি সিয়েনা এক নম্বরে। আপনি ডিভাইস তৈরির জন্য চিপসেট, মাইক্রোচিপ যেটার কথাই বলুন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কোয়ালকম, ইনটেল, ডেল সিংহভাগ বাজার দখল করে আছে। শুধুমাত্র টেলিযোগাযোগে রেডিও যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে চীনের হুয়াওয়ে ২০১৮ সালে ২৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বিশ্ব বাজারে এক নম্বরে ছিল, যা এ বছর ৩২ শতাংশে বিস্তৃতি হওয়ার আভাস রয়েছে।

স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ২৩ শতাংশ একক মার্কেট শেয়ার নিয়ে শীর্ষে আছে। তার ঠিক নিচে থাকা চীনের হুয়াওয়ের মার্কেট মেয়ার ১৯ শতাংশ। আর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপলের আইফোনের মার্কেট শেয়ার ১১ শতাংশ। এর বাইরে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় কোম্পানিগুলোর ক্ষুত্র ক্ষুদ্র মার্কেট শেয়ার রয়েছে। এসব ছাড়াও অনলাইনে বিশ্বে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেমন: ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ইয়াহু, হোয়াটস অ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম– সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন।

উপরের পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে কম্পিউটার, স্মার্টফোন, নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতির মূল উপাদান চিপসেট, মাইক্রোচিপ থেকে শুরু করে নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি এবং কম্পিউটিং সিস্টেমের সব কিছুর বাজার মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোরই নিয়ন্ত্রণে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে– তাহলে এ তথ্যপ্রযুক্তির যুদ্ধে চীনের সত্যিই কোনো অবস্থান আছে কি? খোলা চোখে দেখলে তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে চীনের অবস্থানও এখনও খুবই দুর্বল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মত নয়। কিন্তু খোলা চোখে এই যুদ্ধটাকে দেখলে ভুল হবে।

এখানে যুদ্ধের দু'টি দিক আছে। প্রথম দিকটি হচ্ছে, চীনের নিজস্ব বাজার। একশ' কোটির বেশি মানুষের দেশ চীন নিঃসন্দেহে বিশ্বের বৃহত্তম বাজার। এই বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো ক্রমাগত বাজার হারিয়েছে। কারণ চীনা কোম্পানিগুলো যতটা না বিশ্ব বাজারের দিকে নজর দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি নজর দিয়েছে নিজের বাজারের দিকে। কারণ চীনের বাজারে ১০ থেকে ১২ শতাংশ মার্কেট শেয়ার পেলেই একটা কোম্পানি লাভের হিসেব করতে পারে চোখ বন্ধ করে। চীনে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুক, গুগল, ইয়াহু, হোয়াটস অ্যাপ, ইউটিউব, জিমেইল সবকিছুই বন্ধ। এর পরিবর্তে চীনারা ব্যবহার করে উইচ্যাট আর ইউবো। এ দু'টি নেটওয়ার্কিং সাইটের কথা চীনের বাইরে অনেকেই জানেন না। কিন্তু চীনে এ দু'টি সাইটের মার্কেট শেয়ার ৯৫ শতাংশের বেশি। চীনের বাজারে আইফোনের মার্কেট শেয়ার ১০ শতাংশ, স্যাংমসাংয়ের ১ শতাংশের নিচে। যেখানে চীনের হুয়াওয়ের ৬০ শতাংশ, শাওমি, ভিভো, অপোর বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ। চীনা কর্তৃপক্ষের যুক্তি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো সারা বিশ্বের মানুষের তথ্যের মালিক হয়ে যাচ্ছে, যে তথ্য তারা যে কোনো সময় অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। যে কারণে চীনের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের নেটওয়ার্কিং সাইট ব্যবহার করতে পারবে না। অথচ অদ্ভুত হচ্ছে, চীনা কোম্পানিগুলো নেটওয়ার্কিং ডিভাইস থেকে শুরু করে স্মার্টফোন– সবকিছুতেই মার্কিন কোম্পানির তৈরি মাইক্রোচিপ ও চিপসেট এবং মাইক্রোপ্রসেসর ব্যবহার করছে! হুয়াওয়ে, অপো, ভিভো, ওয়ান প্লাস– সবাই নিজেরা গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছে, অথচ চীনে গুগলের ব্যবহার নিষিদ্ধ!

উল্টোদিকে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে, জেডটিই'র নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তথ্য চুরি ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো বার বার কোম্পানি দু'টিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপলসহ বেশিরভাগ কোম্পানিরই সবচেয়ে বড় কারখানা চীনে অবস্থিত এবং 'রেয়ার আর্থ' (মাইক্রোচিপসহ ডিভাইস তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতব মৌল খনিজ উপাদান ল্যান্থানাইড গ্রুপের ১৫টি এবং স্কায়ন্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম) মৌল কিনছে চীনের কাছ থেকেই! প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে অপরিহার্য রেয়ার আর্থ মৌলের ব্যবসায় যেহেতু চীনের একক আধিপত্য, সে কারণে চীন এটাকেও পুঁজি করে যুক্তরাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। কিন্তু জাপানসহ বিভিন্ন দেশের ভূতত্ত্ববিদরা প্রমাণ করেছেন, নাম 'রেয়ার আর্থ' হলেও প্রকৃতপক্ষে এই খনিজ মৌল উপাদান বিশ্বে 'রেয়ার' নয়। বাজারের বাস্তবতায় এতদিন পর্যন্ত চীনের বাইরে অনেক দেশ বিপুল সম্ভার থাকা সত্ত্বেও রেয়ার আর্থের বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়নি, কিন্তু চীন এটাকে পুঁজি করলে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অনেক দেশের 'রেয়ার আর্থ' মৌলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে বেশি সময় লাগবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোতে প্রতিকূল পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ের উত্থান তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে সত্যিই একটি বিস্ময়। হুয়াওয়ে চীনের একমাত্র কোম্পানি যারা তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ববাজারে নিজেদের শীর্ষ পর্যায়ভুক্ত করেছে এবং এত কম সময়ে বিশ্বজুড়ে হুয়াওয়ে এত বেশি বিস্তৃত হয়েছে যেটা যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। চীনের বাজার তো নেইই, এখন বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছে হুয়াওয়ে।

হুয়াওয়ে বিশ্ববাজারে নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তির ব্যাপক বাজারজাতকরণ শুরু করে ২০০০ সাল থেকে। ২০১০ সালের মধ্যেই হুয়াওয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সিসকো, সিয়েনা, সিমেন্স, অ্যালকাটেল, ইউরোপের এরিকসন, নোকিয়ার বাজারে ধস নামিয়ে প্রবল আধিপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এশিয়া ও আফ্রিকায় হুয়াওয়ের মার্কেট শেয়ার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ২০১৫ সালের মধ্যে হুয়াওয়ে ইউরোপের বাজারের ২০ শতাংশের বেশি মার্কেট শেয়ার দখলে নেয়। আবার স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে হুয়াওয়ের ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করে ২০১৮ সালের মধ্যেই বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় স্থানে চলে আসাটাও বড় বিস্ময়ের। এমনকি হুয়াওয়ে চীনের একমাত্র কোম্পানি যারা সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে নিজেদের অপবাদ ঘুচিয়ে ২০১৮ সালেই 'নিরাপদ প্রযুক্তি'র জন্য আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে।

অতএব চীনের একটি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের এতগুলো কোম্পানিকে এভাবে বিশ্ববাজারে পর্যুদস্ত করে ফেলছে যেটা নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষকে বেশ চিন্তিত করেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু এবারে কট্টর রক্ষণশীল চিন্তার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন তাকে হুয়াওয়ের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হিসেবে দেখছেন অনেক প্রযুক্তবিদ। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানিকে হুয়াওয়ের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হলে বিশেষভাবে অনুমতি নিতে হবে। প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কেয়ালকম ও ইনটেল মাইক্রোচিপ ও চিপসেট সরবরাহ না করলে হুয়াওয়েকে বিকল্প উৎপাদনের কথা ভাবতে হবে। এই বিকল্প পথে যাওয়ার সক্ষমতা হয়তো হুয়াওয়ের আছে, কিন্তু সে পথে যেতে যে সময়টা লাগবে তার প্রবল নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিশ্ববাজারের মার্কেট শেয়ারে। আবার হুয়াওয়ের স্মার্টফোনে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা সম্ভব না হলে এক্ষেত্রেও হুয়াওয়েকে নতুন করে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয় জিমেইল, গুগল ম্যাপ কিংবা ইউটিউবের বিকল্পও। এসব ক্ষেত্রে বিকল্প তৈরি হুয়াওয়ের মত বিশাল কোম্পানির জন্য অসম্ভব নয়। কিন্তু বিকল্প অপারেটিং সিস্টেম এবং নেটওয়ার্কিং সাইটের বাজার তৈরি করা সত্যিই কঠিন, যা সামনের দিনগুলোতে হুয়াওয়েকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।

এক্ষেত্রে আপাতত সংকট হলেও হুয়াওয়ের হাত ধরে বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন মেরুকরণের একটা সম্ভাবনাও বিপুলভাবে তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগের উদারপন্থী প্রেসিডেন্টরা বিশ্ববাজারের যুক্তির আলোয় নানা বিচার-বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের কৌশল অবলম্বন করতেন। যে কারণে তারা চীনের বড় বড় কোম্পানিগুলোকে নানাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল করে রাখার কৌশল নিয়েছিলেন। রক্ষণশীল নীতির হলেও চীনা কর্তৃপক্ষ সহজে এবং কম সময়ে বাজার দখলের ব্যাকুলতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এতদিন খুব বেশি বিচলিত বোধ করেনি। কিন্তু অতি রক্ষণশীল ট্রাম্প যুক্তিকে পেছনে ঠেলে রক্ষণশীল নীতির চোখ দিয়ে বিশ্ববাজারকে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেছেন। তিনি চারদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র মার্কেট শেয়ারে অভিভূত হয়ে নিয়ন্ত্রণে কৌশলের খোলসটাকে দুর্বল করে দিয়েছেন একটা নিষেধাজ্ঞা জারি করেই। আর এটাই তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনাকে প্রবল করে তুলেছে। কারণ ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী পরিস্থিতিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে প্রযুক্তিগতভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে। দুই-তিন বছর বিশ্ববাজারে হুয়াওয়েকে হয়ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হবে, উজানে নৌকা ঠেলতে হবে। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ এবং চীনের কোম্পানিগুলো এখন স্রোতের গতিমুখই বদলে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নেবে। সেটায় তারা সফল হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই একক আধিপত্য ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে বিশ্ববাজারে অস্তিত্ব ধরে রাখতে কঠোর পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। কারণ চীন শুধু তথ্যপ্রযুক্তিতে নয়, এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন অ্যামেরিকা ও ইউরোপের একটি অংশে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্যটাও স্পষ্ট করেছে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়ার আজকের যুদ্ধ অদূর ভবিষ্যতে বড় বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সবশেষ একটা আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য। তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় হুয়াওয়ের উত্থান সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি থেকে ডিভাইস– সবকিছুই সুলভ মূল্যে পাওয়া সহজ করে দিয়েছিল। কিন্তু আজকের 'যুদ্ধাবস্থার' কারণে প্রযুক্তি পণ্যের দাম বেড়ে গেলেও যেতে পারে।

Thursday, October 17, 2019

মিয়া-বাবুদের মেগাসিটি এবং চাষা-ভূষার গাঁয়ের রাস্তার গল্প by রাশেদ মেহেদী

রাস্তার এক পাশের অর্ধেকটা জুড়ে গাঁয়ের বড় বড় মাথা মিয়া বাবুদের বাগান বাড়ির প্রধান ফটক। আরেক পাশের অর্ধেকটা দখল করে রেখেছে বাবুদের দোকান-পাট, গুদাম ঘর। আর রাস্তার মাঝখান দিয়ে মোড়লের পোষা মস্তানরা যখন ইচ্ছা তখন হাডুডু খেলে, শখের বসে নিজেরা লাঠালাঠি করে, এ ওর কান কেটে নেয়, চোখে গুঁতো দেয়। তারপরও এ রাস্তা দিয়েই গাঁয়ের চাষা-ভূষা থেকে শুরু করে ভদ্রলোকদের একসঙ্গে চলতে হয়। সমস্যা হল ভদ্রলোকদের চলাচল নিয়ে। মাঝে মধ্যেই চাষা-ভূষাদের গায়ের সঙ্গে লেগে যায়, চকচকে পালিশ করা জুতোতে চাষাদের খালি পায়ের ধুলো এসে পড়ে, ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধ এসে দামি পারফিউমের সৌরভ মলিন করে দেয়।

অতএব গাঁয়ের বাবুরা সিদ্ধান্ত নিলেন, গাঁয়ের চাষা-ভূষারা আর রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। তাদের চলতে হবে ক্ষেতের আল দিয়ে। ছেলে হোক, বুড়ো হোক, মর মর রোগী হোক চাষা-ভুষারা কীভাবে চলাচল করবে, মরবে না বাঁচবে, সেটা ভদ্রলোক মিয়া বাবুদের দেখার বিষয় নয়। তবে এই চাষা-ভূষাদের ঠিকঠাক মত বাড়তি খাজনা দিতে হবে, কোন ছাড় নয়!

ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকে তাকালে কোনো এক গাঁয়ের মিয়া-বাবুদের এই গল্পটার সঙ্গে বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। এবার ঢাকার রাস্তা থেকেই উদাহরণ দেই। আপনি ঢাকায় বাস করলে বনানী-মহাখালীর প্রতিদিনের ভয়াবহ যানজটের অভিজ্ঞতার কথা নিশ্চয় জানেন। দেখুন নৌবাহিনী সদরদফতরের সামনে থেকে চেয়ারম্যান বাড়ি পর্যন্ত মাত্র এক থেকে দেড় কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাঁচটি ইন্টার ক্রসিং। প্রত্যেকটা ক্রসিং এ এলাকার অভিজাত মিয়া-বাবুদের গাড়ি চলাচলের প্রয়োজনে। এর চাপে পড়ে চাষা-ভূষা নিম্ন আয়ের মানুষ গাদগাদি সিটের বাসে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে ঘামতে থাকেন। এখানে অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, মিয়া-বাবুদের উপায় নাই। তাদের চকচক গাড়িও জ্যামে আটকে থাকে। তবে বাবুরা এসি গাড়িতে বসে ঠাণ্ডা হাওয়ায় দামি স্মার্টফোনে পরিচিত কারও সঙ্গে খোশ গল্প করে সময় কাটান বলে এই যানজটটা খুব একটা গায়ে লাগে না! আর এটা তাদের এলাকা, বাড়ির কাছে এসে একটু রাস্তায় বসে থাকলে সমস্যা কী? অথচ দেখুন, একটু দূরে যেখানে বেশিরভাগ চাষা-ভুষা মানুষ থাকেন সেই খিলক্ষেত এলাকার মানুষকে জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি ব্যবহার করলে রাস্তার এ পাশ থেকে ওপাশে যেতে তিন কিলোমিটার দূরে বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকা থেকে ইউটার্ন নিতে হয়। কুড়িল বিশ্বরোডের পর একেবারে কাওলা, এর মধ্যে কোনো ইউটার্ন নেওয়ার জায়গা নেই। এটাই হওয়া উচিত। কমপক্ষে দুই কিলোমটারের মধ্যে কোনো ইন্টার ক্রসিং থাকবে না। কিন্তু বনানী-গুলশানের বাসিন্দা বড় বাবুরা সেটা মানেন না। তারা নিজেদের বাড়ির দরজার সামনে পারলে একটা করে ইন্টার ক্রসিং বসিয়ে দেন! যেমন ধরুন বনানী ১১ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় এক ইন্টার ক্রসিং এর পর মাত্র তিন-চার গজ দূরে আর একটা অপ্রয়োজনীয় ইন্টার ক্রসিং শুধুমাত্র পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলোনিতে থাকা কয়েকজনের সুবিধার জন্য!

বনানী এলাকার আর একটা বাস্তবতা বিবর্জিত পদক্ষেপের কথা বলি। এখানে কাকলি ইন্টার ক্রসিংয়ের আগে প্রায় ৩০০ মিটার দূর থেকে রডের বেড়া দেওয়া হয়েছে ফুটপাত ঘিরে। সেখানে উত্তর সিটি করপোরেশনের সাইনবোর্ড 'এখানে বাস থামিবে না'। অথচ এই কাকলি মোড়ে ত্রিভুজ ইন্টারক্রসিংয়ে প্রতিটি ট্রাফিক সিগন্যালে যানবাহনগুলোকে কমপক্ষে ৯ মিনিট দাঁড়াতে হয়। এখন আপনিই বলুন, যেখানে একটি সিগন্যালে বাসকে কমপক্ষে ৯ মিনিট দাঁড়াতে হয় সেখানে 'বাস থামিবে না' নোটিশ কতটা হাস্যকর! আর এখানে দীর্ঘ ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে যাত্রীদের ওঠা-নামা করতেই হয়। কিন্তু বাস থেকে নেমেই মোটা রডের বেড়া। ফুটপাতে ওঠার সুযোগ নেই। অতএব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। এরপর ক্রসিং পার হয়ে একটা বাস বে আছে বটে, কিন্তু সেটা অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে। এখানে যদি সব বাস দাঁড়ায় তাহলে যে যানজট হবে তাতে কাকলি ইন্টার ক্রসিংয়ের প্রতিটি সিগন্যালের দৈর্ঘ্য কমপক্ষে আধঘণ্টার বেশি হবে। বিশ্বাস না হলে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যে ট্রাফিক পুলিশরা রাস্তায় দায়িত্বপালন করছেন, তাদের জিজ্ঞেস করুন। এখানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ করা মিয়া-বাবু কর্মকর্তারা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়ে সাধারণ বাসযাত্রীদের ওঠা-নামা চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন। দীর্ঘ বেড়ার ফাঁকে দু'একটা কাটা রেখে ফুটপাতে ওঠার জায়গা করে দিলেই কিন্তু ঝুঁকিটা কমে যায়, উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা সেটা বেঝেন না! কোনোদিন যখন বড় একট দুর্ঘটনা ঘটবে, নিরীহ মানুষের জীবন যাবে, তখন হয়ত মেয়র এসে বলবেন, এখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি। সময়ত তারা ব্যবস্থা নেওয়ার সময় পান না! কিংবা তারা কি আদৌ কখনও এ এলাকায় সারা জীবনে এসেছেন– এ প্রশ্নটাও করা যায়।

এটাই ঢাকার সড়ক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত থাকা কর্তৃপক্ষগুলোর বাস্তবতা। তারা বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেন না। দেখুন ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ১৭৬টি বাসের রুট। মাত্র তিনটি প্রধান সড়ক যে শহরে সেখানে ১৭৬টি রুট হয় কোন বাস্তবতায়? অথচ ঢাকার প্রশাসন এটা করেছে! এই ১৭৬টি রুট মূলত শেষ মাথায় বিভিন্ন অলি-গলিতে বিভক্ত করে করা হয়েছে। কিন্তু প্রধান সড়ক এবং রুট কিন্তু একটাই ব্যবহার করছে গাড়িগুলো। যেমন ধরুন মিরপুর ১০-১১-১২ নম্বর থেকে প্রায় ১০টি রুটে গাড়ি চলে উত্তরা-গাজীপুরের ভেতর। উত্তরায় গিয়ে কোনো গাড়ি দিয়াবাড়ি, কোনো গাড়ি আব্দুল্লাহপুর, কোনো গাড়ি স্লুইস গেট, কোনো গাড়ি টঙ্গী, কোনো গাড়ি গাজীপুর পর্যন্ত চলাচল করছে। এখন প্রত্যেকটি গাড়িকে কিন্তু যাত্রপথে জনবহুল এলাকা কুড়িল বিশ্বরোড, খিলক্ষেত এবং উত্তরার মূল এলাকা জসীমউদ্দিন, রাজলক্ষ্মী, আজমপুর, হাউজবিল্ডিং হয়ে যেতে হয়। সর্বশেষ গন্তব্যের চেয়ে মাঝ পথের এসব এলাকার যাত্রীই বেশি। ফলে বাসগুলোর রুটের সর্বশেষ গন্তব্য যাই হোক, তারা মাঝখানের জনবহুল এলকার জন্য যাত্রী বেশি পায় এবং যাত্রী নেওয়ার জন্য চালকরা পাগল প্রায় হয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করে। এখন বাসে বাসে প্রতিযোগিতার জন্য দায়ী কে? সেই কর্তৃপক্ষ যারা ঢাকার ভেতরে বাসের রুট পারমিট দেয়। ঢাকার বাস সার্ভিসে মূল বিশৃঙ্খলার জন্য দায়, বাসে বাসে প্রতিযোগিতায় নিরীহ মানুষের মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়ার কিংবা পঙ্গু হওয়ার জন্য দায়ী এই কর্তৃপক্ষটিই।

ঢাকায় মিনিবাসগুলোর মডেলও হাস্যকর। এখানে ৩০ আসনের বাসে ৫০টির বেশী আসন গাদাগাদি করে বসানো আছে। আর বাসে মেয়েদের আসন চালকের পাশে ইঞ্জিন কভারের সামনে। এ অংশে আসন বসানো অবৈধ। অথচ এখানে ঝুঁকিপূর্ণ আসন বসিয়ে বছরের পর বছর ধরে নারীদের চলতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এসব ফালতু মডেলের বাস ঢাকায় কেন চলবে? বিশ্বের বেশির ভাগ মেগাসিটিতে দুই ধরনের বাস চলে। ডাবল ডেকার এবং লম্বা বড় বাস যেখানে একসঙ্গে অনেক যাত্রী যেতে পারে। ঢাকার প্রধান তিনটি সড়কে ৯ থেকে ১০টি রুট করে প্রতি রুটে ৫০ থেকে ৬০টি এসি বাস এবং একশ' থেকে দেড়শ' ভালো মানের ডাবল ডেকার দিলেই যানজট সমস্যা এবং বাস সংকট ও বিশৃঙ্খলা– তিনটিই অনেকটা সহনীয় করা সম্ভব সহজ উপায়ে। ঢাকায় ভালো এবং আধুনিক মানের বাস সার্ভিস চালুর কোনো উদ্যোগ কখনও নেওয়া হয়েছে? নেওয়া হয়নি। বরং গত ১০ বছরে ঢাকায় এক সময়ের নিরাপদ, রোড স্টার, প্রিমিয়াস বাস, বিআরটিসির দোতলা ভলভো বাস সার্ভিস তুলে দিয়ে তার পরিবর্তে সেখানে পুরনো আমলের সেই নোংরা ফালতু মডেলের মিনিবাস চলাচলই অনুমোদন করা হয়েছে এবং হচ্ছে, কার স্বার্থে?

ঢাকাসহ সারাদেশের বাস সার্ভিস একটা মাফিয়া সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে সেটা সবাই জানেন। কারা মাফিয়া, তার সর্দারকে, তার পৃষ্ঠপোষককে সবাই খুব ভাল করে জানেন। গণপরিবহন খাত মূলত এই মাফিয়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গডফাদার-ক্যাডার ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। মালিক-শ্রমিক নির্ভর শিল্প ব্যবস্থা গণপরিবহন ব্যবস্থায় নেই। গণপরিবহন ব্যবস্থা মাফিয়া সিন্ডিকেট মুক্ত করতে কোনো ব্যবস্থা কি নেওয়া হয়েছে? ঢাকার কোনো বাসে এখন টিকেট দেওয়া হয় না। আগে দেওয়া হত। মাফিয়া সিন্ডিকেট টিকেটের বিরুদ্ধে। তারা টিকেট না দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে গায়ের জোরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। ঢাকায় বিকাশ পরিবহন-ভিআইপি পরিবহন নামে 'সিটিং সার্ভিস' নামধারী লোকাল বাস আছে, যার সর্বনিম্ন ভাড়া ৪০ টাকা। এদের কথা সবাই জানে। কিন্তু ঢাকার কোনো প্রশাসন কি এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পেরেছে? ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন মাঝে মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে হুঙ্কার ছাড়েন– ওমুখ তারিখ থেকে ঢাকায় কাউন্টার সার্ভিস, টিকেট সার্ভিস বাস চালু হবে। এ রকম প্রায় ডজনখানে তারিখ চলে গেছে, মেয়র সাহেব কিছুই করতে পারেননি। ভবিষ্যতেও পারবেন– সে আস্থা আমজনতার নেই।

আসুন প্রগতি সরণীর উদাহরণ দেখে রিকশা তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গটি বিবেচনা করে দেখি। প্রগতি সরণীর সড়ক কিন্তু অনেক বড়। কিন্তু ফুটপাত থেকে শুরু করে রাস্তার দু'পাশে নানা কায়দায় দখল। দোকানের মালামাল, গাড়ির গ্যারেজ। এই সড়কে চলাচল করা বাসগুলো চলে বেওয়ারিশ ষাঁড়ের মত। রাস্তার মাঝখানে তিন-চারটা বাস একটা আরেকটার আগে গলা বাড়িয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করাচ্ছে। আর পেছনে বিশাল যানজট লেগে যাচ্ছে, ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখছে অনেকটা অসহায়ের মত। আপনি যমুনা ফিউচার পার্কের আগে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার উল্টোদিকে কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই বুঝবেন পরিবহন ক্যাডারদের কী ভয়াবহ রাস্তা দখলের দৌরাত্ম্য। রাস্তা দখল করে যাত্রী ওঠা-নামা করার কারণেই এখানে নদ্দা ছাড়িয়ে যানজট বিস্তৃত হয়ে কখনও কখনও নতুন বাজারে গিয়ে ঠেকে। এই যানজটের জন্য রিকশা নয়, বিশৃঙ্খল বাস চলাচল আর ত্রুটিপূর্ণ ট্রাফিক চলাচল ব্যবস্থা দায়ী।

দেখুন কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন কিংবা সরকার ভালো করেই জানে রাস্তায় দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন, সবাই তো নিজেদেরই ভাই-ব্রাদার। বেপরোয়া ও বিশৃঙ্খল বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না, কারণ মাফিয়া সিন্ডিকেট কখন কোন চাল দিয়ে বেকায়দায় ফেলে দেয়! অতএব রিকশাওয়ালাদের তুলে দেওয়াটাই সবচেয়ে সহজ। এরা তো আর নিজেদের ভাই-ব্রাদারও না, মাফিয়াও না, কয়েকদিন চেঁচামেচি করবে। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।

গুলশান-বনানী হলেও কথা ছিল, গ্রগতি সরণীর মত গড় পড়তা মানুষের এলাকার রাস্তায় ভদ্রলোকের গাড়ি দীর্ঘ সময় জ্যামে আটকে থাকবে, এটা কি হয় নাকি? পাশ দিয়ে রিকশা গেলে গাড়ির ভেতরে সুগন্ধময় ঠাণ্ডার ভেতরেও কেমন পচা ঘামের দুর্গন্ধ পাওয়া যায়! এটা মেনে নেওয়া যায় না। আর রিকশাওয়ালাদের তুলে দিলে সমস্যা নেই। এতে তো ভদ্রলোকদের সমস্যা হবে না। তাদের গাড়ি আছে। মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত ক্যাডারদের বাস সার্ভিসে চলতে পারলে চলুক, না হলে যেমনে চলে চলুক।

টেলিভিশনের টক শোকে দেখলাম কয়েকজন তারকা বক্তা বলছেন, এর আগে অনেক জায়গায় রিকশা তুলে দেওয়া হয়েছে, তাই বলে কী নিম্ন আয়ের মানুষের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ থেকেছে? এই তারকা বক্তা জানেন না, ঢাকার ভয়াবহ বিশৃঙ্খল বাস সার্ভিসে উঠলে একজন সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যান, তারপরও তারা চলছেন। কিন্তু এই চলাটাই চলা নয়। মেগাসটিতে রিকশা চলে না ঠিক আছে, আগে ঢাকাকে সত্যিকারের মেগা সিটি বানান, তারপর অন্যসব বুলি আওড়ান। কয়েকটি ফ্লাইওভার বানালেই একটি বিশৃঙ্খল, জরাজীর্ণ শহর মেগাসিটি হয়ে যায় না। চোখের সামনে মগবাজার ফ্লাইওভারের চেহারা দেখেও কি 'ফ্লাইওভার উন্নয়নে'র বাস্তবতাটা বুঝতে পারছেন না?

Tuesday, September 17, 2019

বৃক্ষ তোমার নাম কী 'ফলকে' পরিচয়: বন গবেষণা ইনস্টিটিউট

উচ্চতার দিক থেকে সবচেয়ে বড় গাছের নাম হলো বৈলাম। বিলুপ্তপ্রায় ও বিরল প্রজাতির এ তালিকায় আরও আছে তেলশুর, ঢাকিজাম, বার্মা শিমুলসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ। হঠাৎ এসব গাছ দেখলে শহুরে অনেক নাগরিক থমকে দাঁড়াতে পারেন। কারণ, এসব গাছ তাদের অচেনা। তাই ছোট-বড় ৪১০টি গাছে 'নামফলক' দিয়ে পরিচিতি করেছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) চট্টগ্রাম।
এ প্রসঙ্গে বিএফআরআইয়ের পরিচালক ড. খুরশীদ আকতার বলেন, 'সাধারণত যারা উদ্ভিদ ও বন নিয়ে কাজ করেন তারা ছাড়া সাধারণ মানুষ সব গাছের নাম জানেন না। তাই বিএফআরআইয়ের ক্যাম্পাসে বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতিসহ চার শতাধিক গাছে নামফলক দিয়ে পরিচিতি করানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব গাছেরও নামকরণ হবে।'
জানা যায়, ৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় বিএফআরআইয়ের গাছের নামফলক উন্মোচনের কাজ। চলতি মাসে শেষ হবে এসব গাছের নামফলক দেওয়ার কাজ। ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলমের তত্ত্বাবধানে গবেষণা সহকারী গ্রেড-১ (উদ্ভিদ শ্রেণিবিন্যাসতত্ত্ববিদ) ছৈয়দুল আলম ৪১০টি বৃক্ষের হালনাগাদ নামকরণ দিয়ে নামফলক তৈরি করেন। প্রতি গাছের নামফলকে চারটি বিষয়ের মধ্যে স্থানীয় নাম, ইংরেজি নাম, বৈজ্ঞানিক নাম ও পরিবারের নাম দেওয়া হয়েছে। বিএফআরআইয়ের মূল ফটক থেকে শুরু করে অফিস ভবন, আবাসিক এলাকা, পূর্ব পাহাড়, পশ্চিম পাহাড় ও অতিথিশালা এলাকার ছোট, মাঝারি ও বড় গাছে এসব 'নামফলক' দেওয়া হয়েছে।
নামফলক দেওয়া বৃক্ষের মধ্যে স্থানীয় নামগুলো হলো তেলশুর, তেলিগর্জন, ঢাকিজাম, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, শাল, চম্পা, লোহাকাঠ, দেবদারু, শ্রীলংকান ছাতিম, জ্যাকেরান্ডা, ক্ষণা, বার্মা শিমুল, ধূপ, গুটগুইট্টা, সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, হলুদ কৃষ্ণচূড়া, ঝাউ, নাগেশ্বর, কাউগোলা, বহেরা, কাঠবাদাম, বৈলাম, কাইনজল ভাদী, পলাশ, অর্মোসিয়া, চালমুগড়া, সিধাজারুল, লম্বু, তুন, খয়ের, রাজকড়ই, রেইনট্রি, বটগাছ, বটল ব্রাশ, সিলকি ওক, কন্যারি, বাজনা, রক্তন, মহুয়া, বকুল, সুন্দরী, বান্দরহোলা, জংগলী বাদাম, অয়েল পাম, চায়না পাম, বটল পাম, অরোকেরিয়া, পাইন, বাঁশপাতা ইত্যাদি।
২০১৫ সালে বিএফআরআই ক্যাম্পাসের এক বৃক্ষ চিহ্নিতকরণ জরিপে দেখা যায়, উদ্ভিদের ১১২ পরিবারের মধ্যে ৩৯১ জেনাসের অধীনে ৬০৫ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বন্যপ্রাণীদের আবাস ও খাদ্য উৎপাদনকারী অনেক গাছপালা আছে এখানে। ক্যাম্পাস এলাকায় যেমন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষ রয়েছে, তেমনি ঔষধি গুণাগুণসম্পন্ন বৃক্ষও রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর অরণ্যে পাওয়া যায় এমন অনেক গাছপালাও রয়েছে ক্যাম্পাসে। তাছাড়া ৮ প্রজাতির বেত, ৩৩ প্রজাতির বাঁশ সংরক্ষিত আছে এখানে। ৭ প্রজাতির বিদেশি বৃক্ষ এই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে বর্ধিত করেছে আরও। এখানে সাইকাস নামে একটি নগ্নবীজী বৃক্ষ রয়েছে, যেটি সীতাকুণ্ড পাহাড় ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথাও পাওয়া যায় না।
চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহর এলাকায় ১৯৫৫ সালে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ২৮ হেক্টর জায়গার মধ্যে ৮০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে বৃক্ষ আচ্ছাদিত পাহাড়, উপত্যকা ও সমতল ভূমি। এই ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ উদ্ভিদ চিরসবুজ প্রকৃতির। ক্যাম্পাস এলাকাটির সব উদ্ভিদের স্বভাব দেখতে অনেকটা প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের মতো।
বন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা অসীম কুমার পাল বলেন, 'প্রতিদিন বিএফআরআই ক্যাম্পাসে অনেক দর্শনার্থী আসেন। আবার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী ও গবেষকরাও আসেন। তারা এখানকার সব গাছের নাম জানেন না। তাই ক্যাম্পাসের রাস্তার পাশে ও যেখানে সবার যাতায়াত আছে, ওই সব জায়গার গাছগুলোতে নামফলক দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে আমরা যে সব গাছের নামফলক তৈরি করেছি, তার কাজ শেষ হবে।'

Wednesday, September 11, 2019

কাশ্মীর কি ভারতের 'পশ্চিম তীর' হবে by ড. তারেক শামসুর রেহমান

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর কি শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের 'পশ্চিম তীর'-এর মতো পরিস্থিতি বরণ করতে যাচ্ছে? গত ৫ আগস্ট ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদটি বাতিল হওয়ায় জম্মু ও কাশ্মীর যে 'বিশেষ সুবিধা' ভোগ করত, তা আর বহাল নেই। উপরন্তু জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মর্যাদাও হারিয়েছে। কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। কিন্তু কাশ্মীরে অশান্তি বেড়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও যেসব খবর পশ্চিমা সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছে, তা মোদি সরকারের জন্য কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনছে না। জম্মু ও কাশ্মীরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, কোনো কোনো পর্যবেক্ষক এর সঙ্গে ফিলিস্তিনের 'ওয়েস্ট ব্যাংক' বা 'পশ্চিম তীর'-এর পরিস্থিতিকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন (ব্লুমবার্গ, ৫ আগস্ট, ফরেন পলিসি. ৮ আগস্ট)। পাঠক মাত্রেই 'পশ্চিম তীর' সম্পর্কে একটি ধারণা পেতে পারেন।

মাত্র ৫৬৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে পশ্চিম ব্যাংক বা পশ্চিম তীর। ইসরায়েল ও জর্ডানের মাঝখানে পশ্চিম তীর অবস্থিত। লোকসংখ্যা মাত্র ৩৪ লাখ। একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এই পশ্চিম তীর ও গাজা এলাকা নিয়ে। গাজা এলাকার আয়তন কম, মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। গাজা এলাকার দক্ষিণ-পশ্চিমে ১১ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে মিসরীয় সীমান্ত আর পূর্ব-উত্তরাঞ্চলের ৫১ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে ইসরায়েলি সীমান্ত। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলের ছয় দিনের যুদ্ধে পুরো এলাকাটি ইসরায়েল দখল করে নেয়। পরে অসলো চুক্তি অনুযায়ী (১৯৯৩) পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাঝে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে (প্রেসিডেন্ট) একটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হলেও, গাজার নিয়ন্ত্রণভার চলে গেছে চরমপন্থি সংগঠন হামাসের হাতে। গাজায় মাহমুদ আব্বাসের কর্তৃত্ব তেমন একটা নেই বললেই চলে। গাজায় হামাসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এই এলাকা বারবার ইসরায়েলি আগ্রাসনের সম্মুখীন হয়েছে। সর্বশেষ কোরবানির ঈদের সময় জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদেও ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা (১১ আগস্ট)। বলা ভালো, জেরুজালেম নগরী পশ্চিম তীরে অবস্থিত। অসলো চুক্তি অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের ১১ ভাগ এলাকা (যা 'এ' এলাকা নামে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে) ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

২৮ ভাগ এলাকা ('বি' এলাকা), যা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ইসরায়েলের যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যৌথ নিয়ন্ত্রণে সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এর বাইরে রয়েছে 'সি' এলাকা (৬১ ভাগ) পরিপূর্ণভাবে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বোঝাই যায়, নামে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব থাকলেও, পশ্চিম তীরে (পূর্ব জেরুজালেমসহ) ইসরায়েলের কর্তৃত্ব ও প্রভাব অনেক বেশি। বিশ্বের ১৬৪টি দেশ পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি কর্তৃত্বকে 'অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকা' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। স্মরণ থাকতে পারে, ইসরায়েল ইতিমধ্যে জেরুজালেমে তাদের রাজধানী স্থানান্তর করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে সেখানে তাদের দূতাবাস স্থানান্তর করেছে, যা বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। পশ্চিম তীরের মানচিত্রের দিকে যদি তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে, 'তথাকথিত একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র' কীভাবে ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল। চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছে ইসরায়েল।

২০০৭ সালের পর থেকেই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দু'ভাগে ভাগ হয়ে আছে- ফাতাহ নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিম তীর, মাহমুদ আব্বাস এদের প্রতিনিধি আর হামাস নিয়ন্ত্রণ করে গাজা। এখন কাশ্মীরের পরিস্থিতি আগামীতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে মোদি-অমিত শাহের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ইসরায়েলের একটি ভূমিকা থাকতে পারে! বালাকোটের ঘটনার (জইস-ই-মোহাম্মদের জনৈক আত্মঘাতী বোমারুর হামলায় ৪০ জন ভারতীয় জওয়ানের মৃত্যু) পরপরই মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক লিখেছিলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টিতে ইসরায়েলের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে একটা প্রশ্ন থাকলই যে, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ব্যাপারে ইসরায়েলের কোনো পরামর্শ মোদি সরকার নিয়েছিল কি-না? যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জম্মু ও কাশ্মীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে তিনি রাজ্যের স্ট্যাটাস পুনর্বহাল করবেন। তবে এই সিদ্ধান্ত ভারতের অন্যত্র একটা 'ভুল মেসেজ' পৌঁছে দিতে পারে। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর আলাদা মর্যাদা পেত। এ ধরনের বিশেষ সুবিধা (স্থানীয়দের চাকরি-শিক্ষা থেকে সুবিধা, স্থায়ী নাগরিকের মর্যাদা ইত্যাদি) শুধু জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রেই যে প্রযোজ্য ছিল তেমনটি নয়, বেশ কিছু রাজ্য এখনও সাংবিধানিকভাবে এ ধরনের বিশেষ সুবিধা ভোগ করে থাকে।

৩৭১-এ ও ৩৭১-জি অনুচ্ছেদমূলে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থানীয় জনগোষ্ঠী অনেকটা কাশ্মীরিদের মতো একই ধরনের সুবিধা পায়। পার্বত্য এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জমির ওপর, বন ও খনিজসম্পদের ওপর ব্যক্তিগত অধিকার স্বীকৃত। তাদের কোনো কর দিতে হয় না। চাকরির ক্ষেত্রেও রয়েছে অগ্রাধিকার। এই অঞ্চলে সংবিধানের অনেক অনুচ্ছেদ কার্যকর নয়। সেখানে দেশীয় আইন, ঐতিহ্য অনুযায়ী অনেক কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। সম্পত্তি ও জমির হস্তান্তরও নিজস্ব নিয়মে চলে। সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে ৩৭১ নম্বর অনুচ্ছেদে ৯টি রাজ্যকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কাশ্মীরের বাইরে মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও অন্ধ্রপ্রদেশ রয়েছে সেই তালিকায়। ৩৭১-জি অনুচ্ছেদে কিংবা ২৪৪-এ অনুচ্ছেদে আসাম বেশ কিছু সুবিধা পেয়ে থাকে। ৩৭১-ডি ও ই অনুচ্ছেদে অন্ধ্রপ্রদেশে শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণসহ কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে রাষ্ট্রপতির হাতে। ৩৭১-এইচ অনুচ্ছেদমতে, অরুণাচল রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত উল্টে দিতে পারেন কেন্দ্র থেকে নিযুক্ত রাজ্যপাল। সুতরাং যেসব অঞ্চল বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে, তাদের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে নাগাল্যান্ড, মিজোরামে বিক্ষোভ হয়েছে এবং স্থানীয় নেতারা কঠোর হুমকি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, জম্মু ও কাশ্মীর দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় অনেক রাজ্যেই এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দার্জিলিংয়েও পৃথক রাজ্য গঠনের দাবি প্রকাশ্যে এসেছে। দার্জিলিংয়ের পৃথক রাজ্য গড়ার নেতা গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিমল গুরং আত্মগোপনস্থল থেকে এক বার্তায় দার্জিলিংয়েও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এটা একটা অশনিসংকেত। অন্যান্য রাজ্য থেকেও এ ধরনের দাবি উঠতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন্দ্রের বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার কি শুধু 'মিশন কাশ্মীর' নিয়েই ক্ষান্ত থাকবে? নাকি অন্যান্য অঞ্চলের ব্যাপারে সংবিধানে যে সুযোগ-সুবিধা ও বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তা খর্ব করারও উদ্যোগ নেবে? কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে জন-অসন্তোষ গড়ে উঠছে, তা যদি কেন্দ্র বিবেচনায় নেয়, তাহলে সংবিধানে অন্যান্য ও পশ্চাৎপদ রাজ্যের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থে সংবিধানের রক্ষাকবচগুলো বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। তবে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত মুসলমানবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, বরং ধর্মীয়ভাবে তারা খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী।

এটা ঠিক, 'মিশন কাশ্মীর' এনডিএ সরকারকে একটি সংকটে ফেলে দিয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? ভারত অন্য কারও মধ্যস্থতা মানবে না। একমাত্র সমাধান হতে পারে কাশ্মীরি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করা। লাদাখ আলাদা হয়ে গেলেও তা আর জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হচ্ছে না। একটি 'পশ্চিম তীর' মডেল এখানে কাজ করতে পারে। দুই পতাকার অস্তিত্ব (কাশ্মীরের জন্য আলাদা পতাকা ছিল) আর এখন থাকবে না। 'দিল্লি মডেল' অনুসরণ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী) নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হাতে থাকতে পারে। বিনিয়োগে উন্মুক্ত হওয়ার স্বার্থে স্থানীয় কাশ্মীরি নাগরিকরা শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন। তবে কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনো ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা কম। অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান এত দুর্বল যে, এই দেশটির পক্ষে কোনোক্রমেই যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব না। ফলে 'পশ্চিম তীর' মডেলকে সামনে রেখে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশ্নে যদি একটি সমঝোতা হয়, আমি তাতে অবাক হবো না।

>>>অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক, tsrahmandb@yahoo.com

Saturday, August 24, 2019

বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার করছে ভারতীয় গ্যাং

বাংলাদেশ আলোচিত মাদক ইয়াবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও তা বন্ধ করতে না পারায় ধারণা করা হচ্ছিল, অভিযানের মুখে টেকনাফে ইয়াবার চিহ্নিত রুট বদলে ফেলেছে মাদক কারবারিরা। শেষ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেই অনুমানই সত্যি হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকায় বিপুল সংখ্যক ইয়াবাসহ ভারতীয় এক নাগরিককে গ্রেফতারের পর এর নতুন রুট নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

চলতি মাসে ঢাকার রামপুরা এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া আসামের স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুস ছবুর মিয়া গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি আসামের একটি মাদক সিন্ডিকেট থেকে ইয়াবা কেনেন। পরে তা বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এরপর কুড়িগ্রামের সহযোগীদের মাধ্যমে তা ঢাকার পাইকারি কারবারিদের হাতে তুলে দেন। তিনি তো বেশ কয়েকটি চালান এনেছেনই, তার মতো আরও অনেকেই নতুন রুটে ইয়াবা পাচার করছে।

ছবুর জানিয়েছেন, আসামের ওই গ্রুপটি মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসে। তিনি তাদের কাছ থেকে প্রতি পিস ইয়াবা ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় কেনেন। পরে তা বাংলাদেশের সিন্ডিকেটের কাছে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। সবুরের দুই সহযোগী জাকির হোসেন এবং শামসুল আলমও গ্রেফতার হয়েছে। গত ৯ আগস্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) উত্তর বিভাগ এই অভিযান চালায়।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা ইয়াবা পাচারের এই নতুন রুটের সন্ধান পেয়ে কিছুটা চিন্তায় পড়েছেন। তারা বলছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল সীমান্ত এলাকা রয়েছে। এসব সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার হতে থাকলে ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। এ জন্য সীমান্ত এলাকাগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য সংস্থাগুলো কঠোর নজরদারি করছে।

পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্ত পার হয়ে আসা মাদক ঠেকাতে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করছে। এর ফলে ফেনসিডিলের পাচার প্রায় বন্ধ হয়েছে। তবে ভারতের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশের তথ্য পেয়ে তারা উদ্বিগ্ন। শিগগিরই বিষয়টি ভারতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সীমান্ত বাহিনীর দৃষ্টিতে আনা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের উপদেষ্টা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ও মাদকবিরোধী সংগঠন মানসের প্রতিষ্ঠাতা ড. অরূপ রতন চৌধুরী সমকালকে বলেন, বিভিন্ন সময়েই তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার হচ্ছে। তবে গ্রেফতারের পর ভারতীয় নাগরিক যে তথ্য দিয়েছেন, তা খুবই উদ্বেগের। এখনই বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বৈঠক করা উচিত। মাদক ব্যবসায়ীদের নতুন রুট বন্ধ করতে না পারলে ইয়াবা আরও মহামারি আকার ধারণ করবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, ইয়াবা সাধারণত মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। এ জন্য সবার চোখ ওই দিকেই থাকে। তবে তাদের কাছে তথ্য ছিল, ইয়াবার নতুন বাজার খুঁজতে ভারতীয় একজন নাগরিক ঢাকায় অবস্থান করছেন। সেই তথ্য নিশ্চিত হয়ে ভারতীয় পাসপোর্টসহ আব্দুস ছবুরকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াবা পাচারের নতুন রুট সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ভারতীয় নাগরিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, টেকনাফ সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় মিয়ানমার থেকে আসাম হয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়ে তারা ইয়াবা পাচার করছিলেন। তার মতো আরও অনেকেই আসামের সিন্ডিকেট থেকে ইয়াবা কিনে একই পথে বাংলাদেশে পাচার করছে।

ডিবি পুলিশ জানায়, গত ৯ আগস্ট রাজধানীর রামপুরার উলন রোডে একটি বাড়ির পঞ্চমতলার ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আব্দুস ছবুর মিয়া, জাকির হোসেন ও শামসুল আলমকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ইয়াবা পাচারের নতুন রুটের বিষয়ে তথ্য মেলে। ওই ফ্ল্যাটটির ভাড়াটিয়া জাকির হোসেন। তার বাড়ি কুড়িগ্রামের রৌমারী থানার তেকানী এলাকায়। পূর্বপরিচিত এই জাকিরের কাছেই উঠেছিলেন ভারতীয় নাগরিক ছবুর।

এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিবি-উত্তর বিভাগের এডিসি জুনায়েদ আলম সরকার। তিনি বলেন, ছবুর জানিয়েছেন, জুন ও জুলাই মাসে তিনি আসাম থেকে ইয়াবার তিনটি চালান রৌমারী হয়ে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। সর্বশেষ চালানটি নিয়ে তিনি নিজেই গত মাসের ২৬ তারিখ বাংলাদেশে আসেন। ছবুর মিয়া বাংলাদেশে ইয়াবা পাইকারদের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হতে, বাজার যাচাই ও নতুন ক্রেতা খুঁজতে এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন।

এই কর্মকর্তা বলেন, রৌমারীর জাকির হোসেন এক সময়ে সীমান্ত এলাকায় গরুসহ বিভিন্ন চোরাচালান করত। তার বিরুদ্ধে রৌমারী থানায় মামলাও রয়েছে। ভারতীয় নাগরিক ছবুর মিয়াও আসামে কাঁচামালের ব্যবসার আড়ালে চোরাচালানে জড়িত ছিলেন। সেখান থেকেই তাদের দু’জনের সঙ্গে পরিচয়। জাকির এখন ঢাকায় বাসা নিয়ে বসবাস করলেও রৌমারী সীমান্তে চোরাচালানের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তার হয়ে শামসুল আলম ভারতীয় নাগরিককে ইয়াবাসহ ঢাকায় নিয়ে আসে।

ওই ভারতীয় নাগরিকের পাসপোর্ট নম্বর-এস ৭৩৬৯৯৮৪. পাসপোর্টে থাকা তথ্যানুযায়ী আব্দুস ছবুরের বাড়ি আসামের গৌহাটির কুকুরমারা, পার্ট-২ এলাকায়। তার জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৬ সালে। চলতি বছরের জুলাই মাসে তিনি ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরি করেন। এরপর ২৬ জুলাই ভারতের ভারতের মানিকচর স্থলবন্দর দিয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী স্থলবন্দর দিয়ে বৈধভাবে ইমিগ্রেশন পার হন। গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ওই সময় ১০ হাজার পিস ইয়াবা তার লাগেজে কয়েকটি পুঁটলিতে ছিল।
>>>সাউথ এশিয়ান মনিটর,