আমেরিকার ‘গানবোট পুঁজিবাদ’ বিশ্বকে আরও দরিদ্র করে তুলবে
এতে আরও বলা হয়, আগামী সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের পর্বতঘেরা রিসোর্ট দাভোসে যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানির প্রধানরা জড়ো হবেন, তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হবে- সরকারগুলোর ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ। ইউরোপে যুদ্ধ ফিরে আসা এবং কর্তৃত্ববাদী চীনের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে রাজনীতিবিদরা বৈশ্বিক ব্যবসার মানচিত্র নতুন করে এঁকেছেন- কোথায় বহুজাতিকরা কাজ করতে পারবে আর কোথায় পারবে না, তা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্রক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। তিনি আমেরিকান তেল কোম্পানির কর্তাদের ভেনেজুয়েলার কারাকাসে ফিরে যেতে বলেছেন, না গেলে প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন; প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে শেয়ার পুনঃক্রয় বন্ধ করতে চাপ দিয়েছেন; এবং চীনে উন্নত প্রসেসর বিক্রি করা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সরকারের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগি করতে বলেছেন।
রাষ্ট্রীয় এই হস্তক্ষেপ পশ্চিমা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অস্থিরতা ডেকে আনবে, যারা বছরে প্রায় ২৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বিক্রি, ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মুনাফা করে এবং সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়। এর ফল হবে কম সমৃদ্ধ একটি বিশ্ব।
ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ইতিমধ্যেই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর রূপ বদলে দিচ্ছে। শুল্ক, ভর্তুকি ও নিষেধাজ্ঞা চীন ও রাশিয়ার মতো দেশ থেকে পুঁজি সরিয়ে নিয়ে নিজ দেশের বাজারে ফেরত আনছে। ২০১৬ সালে আমেরিকান বহুজাতিকদের পুঁজিবিনিয়োগের ৪৪ শতাংশ ছিল দেশে; আজ তা ৬৯ শতাংশ। বিদেশে বিক্রি প্রকৃত অর্থে কমেছে, দেশে বিক্রি বেড়েছে। সফটওয়্যার, ওষুধ ও গাড়ি শিল্পের মতো কৌশলগত খাতগুলোতে এই পশ্চাদপসরণ আরও স্পষ্ট।
ট্রাম্পের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার যেমন বলেছেন, বিশ্বায়নের স্বর্ণযুগ আর ফিরছে না। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ আরও বাড়বে। বাণিজ্যিক লাভের লোভই ট্রাম্পকে ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাতের পথে ঠেলেছে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতিতেও প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যবসাকে রাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধছে- কয়েকটি খনি কোম্পানি ও সংকটে থাকা একটি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে সরকার অংশীদারিত্ব নিয়েছে। আমেরিকা যত বেশি নিজের কোম্পানিকে সহায়তা করবে এবং অন্যদের শাস্তি দেবে, অন্য দেশগুলোর জন্যও নিজেদের কোম্পানিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া ততটাই যৌক্তিক হয়ে উঠবে।
নতুন গানবোট পুঁজিবাদ কেমন হবে?
এটি হবে আরও ব্যয়বহুল ও কম দক্ষ। আজকের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতির অনেক বড় অংশ- আমেরিকায় তারা বেসরকারি কর্মসংস্থানের এক-পঞ্চমাংশ, ভৌত বিনিয়োগের দুই-পঞ্চমাংশ এবং মুনাফার তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বৈশ্বিক অবকাঠামো পণ্য ও তথ্যের চলাচল সহজ করে সীমান্তজুড়ে ব্যবসাকে লাভজনক করেছে এবং ভোক্তাদের জন্য দাম কমিয়েছে। কিন্তু যখন কোম্পানিকে ভূরাজনৈতিক নির্দেশে পুঁজি বরাদ্দ করতে বাধ্য করা হয়, তখন তাদের উৎপাদনশীলতা কমে। ফলে সবারই ক্ষতি হয়।
ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার হার শুধু দেশীয়ভাবে কাজ করা কোম্পানিগুলোর চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৩-২৪ সালে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রির পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে- নয়টি শিল্পের সাতটিতেই বহুজাতিকদের রিটার্ন কম। ২০১৮-১৯ সালের পর থেকে এই ব্যবধান আরও বেড়েছে।
তবু যদি এতে দেশগুলো নিরাপদ হতো, তাহলে এই খরচ মেনে নেয়া যেত। চিপ শিল্পে নিষেধাজ্ঞা যদি শত্রুপক্ষকে সামরিক সুবিধা পাওয়া থেকে আটকাতে পারে, তবে কিছু ক্ষতি যৌক্তিক। কিন্তু মূল কথা হলো- হস্তক্ষেপ হতে হবে বুদ্ধিদীপ্ত।
ট্রাম্পের নীতি এখানে ব্যর্থ। তিনি শক্তির ভুল উৎসে নজর দিচ্ছেন। আজ বাণিজ্যিক শক্তি আর তেল বা কাঁচামাল দখলে নয়, বরং তা উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক সম্পদ। অথচ বিজ্ঞান ও অভিবাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ট্রাম্প সেই উদ্ভাবনের সম্ভাবনাই দুর্বল করছেন।
আর নীতিগুলোও অস্পষ্ট ও অস্থির। চীনে সেমি-কন্ডাক্টর বিক্রির নিয়ম বারবার বদলাচ্ছে। এতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত লবিং, এমনকি দুর্নীতির ঝুঁকিতে পড়ছে। অনিশ্চয়তাই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হওয়ায় ব্যবসাগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারছে না।বেশি গানবোট, কম মাখন
ট্রাম্প প্রশাসন এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে এমন আশা কম। প্রশ্ন হলো, অন্য সরকারগুলো কি ভালোভাবে এই মডেল চালাতে পারবে? ইকোনমিস্ট এ বিষয়ে সন্দিহান। ইতিহাস বলে- সরকার যখন ‘রেন্ট’ তৈরি করে, বাজার বিকৃত হয়; বিকৃত বাজার দেশকে দরিদ্র করে এবং নাগরিকদের উদ্যোগী মনোভাব কমিয়ে দেয়। গানবোট পুঁজিবাদের মোহ হলো, এটি একই সঙ্গে সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা দেবে। বাস্তবতা হলো এটি কোনোটাই দেবে না।

No comments