বানরের উৎপাত থেকে বাঁচাচ্ছে কুকুর! by আবু ইউসুফ মিন্টু

০৭ নভেম্বর ২০২৫ঃ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাঠি হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ধানক্ষেতে। মাঝে মাঝে ধর ধর বলে চিৎকার, চেঁচামেচিও করতে হয়। বনের ভেতর ওত পেতে থাকে বানরের পাল। কাউকে না দেখলে দেড় থেকে দুই হাজার বানর একসঙ্গে পাকা ধানে হানা দেয়। নিমেষেই খেয়ে নষ্ট করে ফেলে কৃষকের স্বপ্নের পাকা ধান। এমন ঘটনা ঘটছে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয়। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সত্যনগর, জয়চাঁদপুর, বীরচন্দ্রনগর, মহেশপুষ্করনি ও রাঙামাটি এলাকাগুলোয়। এ ছাড়া উপজেলার বক্সমাহমুদ, চিথলিয়া ও পৌর এলাকার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয়ও বানরের উপদ্রব বেড়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এ উপজেলা ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা। ভারতের প্রায় ৯০.৫৫ বর্গকিমি সীমান্ত রয়েছে। ওই এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য কৃষক নিজ নিজ পোষা কুকুরসহ লাঠি হাতে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন ধানক্ষেতের আইলে। বনের ভেতরে ও গাছে বাননের উপস্থিতি টের পেলেই চিৎকার, চেঁচামেচি করে কুকুর দিয়ে ধাওয়া করে বানর তাড়াচ্ছে। কৃষকরা জানান, ধানক্ষেতে নামার আগেই বানর তাড়াতে না পারলে নিমেষে শেষ করে দেবে জমির পাকা ধান।

জঙ্গলে খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় বানর পালের উপদ্রব বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এরই মধ্যে কয়েক হেক্টর জমির ধানক্ষেত নষ্ট করে ফেলেছে বানরের পাল।

চলতি বছর আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বানরের উপদ্রব। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পাকা ধান তুলবেন কৃষকরা। তার আগেই বানরের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। তাই বানর থেকে ধান রক্ষায় দিনরাত লাঠি নিয়ে ক্ষেত পাহারা দিচ্ছেন কৃষকরা।

উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সত্যনগর গ্রামের কৃষক ফরিদ আহমেদ বলেন, বানর মানুষকে খুব বেশি ভয় পায় না। আক্রমণেরও আশঙ্কা রয়েছে। তাই কুকুর সঙ্গে নিয়ে সারাদিন পাকা ধান পাহারা দিচ্ছি।

ফরিদ আহমেদ আরও বলেন, প্রতিদিন তার ছেলেসহ সময় ভাগাভাগি করে লাঠি হাতে নিয়ে ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে থাকি। তারপরও তার প্রায় পঞ্চাশ শতক জমির পাকা ধান নষ্ট করে ফেলেছে। এক পাশে তাড়ালে বানরের পাল আরেক পাশ দিয়ে ধানক্ষেতে নেমে ধান খেয়ে ফেলে। তারা মানুষের মতো লুকোচুরি খেলে। বানর জঙ্গলের ভেতর ওত পেতে থাকে। কাউকে না দেখলে মুহূর্তেই পাকা ধান খেয়ে ফেলে এবং নষ্ট করে দেয়।

আরেক কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমি চলতি আমন মৌসুমে ৬০ শতক জমিতে চাষাবাদ করেছি। কয়েকদিনের মধ্যে তার ধান কাটা শুরু করার কথা রয়েছে। কিন্তু বানরের পাল তার ২০ শতক জমির পাকা ধান খেয়ে ফেলেছে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। জাহাঙ্গীর আরও বলেন, শ্রমিকের মজুরি, জমি চাষাবাদের খরচ ও সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই প্রতি মৌসুমি লোকসান গুনতে হয়, এবার বানরের আক্রমণের কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছি।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি আমন মৌসুমে পরশুরামের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষাবাদ করা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে একাধিক বন্যায় কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, যেহেতু বানরের বিষয়টি বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে তারপরও পাকা ধানে বানরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের সতর্কতা সঙ্গে পাহারা দিয়ে পাকা ধান রক্ষার পরামর্শ দিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই ধান কাটা শুরু হয়ে যাবে, এ মুহূর্তে ধানক্ষেতে বানরের আক্রমণে কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

পরশুরাম উপজেলা বন কর্মকর্তা আবু নাসের জিয়াউর রহমান বলেন, চলতি বছরে বানরের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। জঙ্গলে খাবারের সংকটের কারণে বানরের পাল খাবারের সন্ধানে পাকা ধানে হানা দিচ্ছে। আমরা আমাদের বন বিভাগের দায়িত্বরত ফরেস্টর, বনমালীদের টহল জোরদার করেছি। একই সঙ্গে কৃষকদেরও পরামর্শ দিয়েছি, তারা তাদের পাকা ধান রক্ষার্থে যেন নিয়মিতভাবে পাহারা দেয়। বন্যপ্রাণীসহ বানর হত্যা না করতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বন কর্মকর্তা আরও বলেন, পাকা ধান ঘরে তোলার সময় বানরের হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে না পারলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এখানকার অসংখ্য কৃষক।

বানরের উৎপাত থেকে বাঁচাচ্ছে কুকুর!
বানরের উৎপাত থেকে বাঁচাচ্ছে কুকুর!


No comments

Powered by Blogger.