Showing posts with label টিপু সুলতান. Show all posts
Showing posts with label টিপু সুলতান. Show all posts

Saturday, February 21, 2026

শুরুটা আরও সুন্দর হতে পারত by টিপু সুলতান

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়নি; জন্ম দিয়েছিল এক নতুন প্রত্যাশার। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশ পেল একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। গতকাল মঙ্গলবার ছিল নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথ। সব মিলিয়ে দিনটি হওয়ার কথা ছিল নতুন রাজনৈতিক সূচনার প্রতীক, গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের এক বড় আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপন।

কিন্তু শুরুতেই দেখা দিল অনাকাঙ্ক্ষিত টানাপোড়েন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হলো প্রথম জটিলতা। বিএনপি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে এ ধরনের শপথের উল্লেখ নেই। শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতেই তারা জানিয়ে দেয়, তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না। তাদের যুক্তি—সংবিধানে যেহেতু এর ভিত্তি নেই।

বিএনপির এই অবস্থান রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সকালে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জানায়, বিএনপি যদি সংস্কার পরিষদের শপথ না নেয়, তবে তারা সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের শপথ না–ও নিতে পারে। এতে দিনের প্রথম ভাগে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই নেন। তবে দল দুটির কেউ বিকেলে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি, যা অনেকের কাছে রাজনৈতিক দূরত্বের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে জনরায় এসেছে। সেই রায় কার্যকর করার জন্যই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা। আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই অনুষ্ঠানে পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান ছিল এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারিত। সূচনালগ্নেই এই প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়ার কারণে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বেড়ে গেছে।

১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, এটা কেবল সরকার পরিবর্তন বা নতুন সরকার গঠন নয়; এটা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশার নির্বাচন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তঝরা পটভূমিতে দেশের তরুণেরা নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখার আশা জুগিয়েছিল—সংলাপ, সমঝোতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ী ভাষণে বলা হয়েছিল, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা।

নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে চায়। বিএনপি জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির কথা বলছে জোরেশোরে।

কিন্তু শপথের দিনেই যে দৃশ্য দেখা গেল, তা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে অনেকটাই বেমানান।

গণতন্ত্রে মতভেদ অস্বাভাবিক নয়; বরং সেটিই তার প্রাণশক্তি। তবে সূচনালগ্নে প্রতীকী ঐক্যের গুরুত্বও কম নয়। নতুন সরকারের প্রথম দিনটি যদি আরও দৃশ্যমান ঐক্যের বার্তা দিতে পারত, তবে সেটা হতো গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগের প্রতি গভীরতর শ্রদ্ধা।

এখন দেখার বিষয়, এই প্রাথমিক টানাপোড়েন বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়, নাকি সংলাপের মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে নেয় নতুন বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে বলা যায়, এত ত্যাগের পর যে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা গড়ে উঠেছে, তার আনুষ্ঠানিক শুরুটা আরও সুন্দর হতে পারত।

* টিপু সুলতান: সাংবাদিক

বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে শপথবাক্য পাঠ করেন
বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে শপথবাক্য পাঠ করেন। ছবি: বাসস থেকে নেওয়া

Tuesday, September 17, 2019

আল-কায়েদার সঙ্গে পুরোনো জেএমবির নতুন যোগাযোগ by টিপু সুলতান

কেবল আইএসপন্থীরাই নয়, আল–কায়েদার মতাদর্শ অনুসরণ করা জঙ্গিরাও আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে জেএমবির সদস্যরা আল–কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছে, এমন তথ্য জানা গেছে। দেশের পুরোনো এই জঙ্গিগোষ্ঠী নতুন লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। গোপনে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে আনসার আল ইসলামও।
জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জ্যেষ্ঠ একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এমনটা জানা গেছে। নাম না প্রকাশের শর্তে এসব কর্মকর্তা জানান, জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবির বর্তমান শীর্ষ নেতা পলাতক সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন ভারতে বসেই একিউআইএসের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন বলে তাঁরা ধারণা করছেন। এ ক্ষেত্রে জেএমবির কারাবন্দী আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের এক মেয়ে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করছেন। সাইদুর রহমানের ওই মেয়েকে বিয়ে করেন একসময়কার জামায়াতুল মুসলেমিনের নেতা এজাজ হোসেন ওরফে সাজ্জাদ ওরফে কারগিল। বেশ কয়েক বছর আগে এজাজ সস্ত্রীক পাকিস্তান চলে যান।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এর খবর অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৯ জানুয়ারি করাচিতে পাকিস্তানি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এজাজসহ আল-কায়েদার চার জঙ্গি নিহত হন। এখন এজাজের স্ত্রী পাকিস্তানে আল–কায়েদার আশ্রয়ে রয়েছেন। তাঁর মাধ্যমে সালাহউদ্দিন আল–কায়েদার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অবশ্য বছর দুয়েক আগে থেকেই জানা যাচ্ছিল, একিউআইএসের বাংলাদেশ শাখা হিসেবে দাবি করা আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে কারাগারে পুরোনো জেএমবির সখ্য গড়ে উঠেছে।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে উভয় জঙ্গিগোষ্ঠীর শীর্ষ নেতারা দীর্ঘদিন ধরে বন্দী রয়েছেন। সেখানে তাঁদের সম্পর্ক নিবিড় হয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে এ–সংক্রান্ত দুই রকম তথ্য পাওয়া ​যাচ্ছে, একটা সূত্রের দাবি, কারাগারে আনসার আল ইসলামের শীর্ষ নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানীর কাছে বায়াত (নেতা মেনে আনুগত্য প্রকাশ) নিয়েছেন সালাহউদ্দিন। আবার আরেক সূত্রের দাবি, সালাহউদ্দিনের কাছে বায়াত নিয়েছেন জসীমুদ্দীন রাহমানী।
এ বিষয়ে ​বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মুনীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, একিউআইএস ভারতে বেশ তৎপর। তাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি নতুন করে নজর দেওয়া হচ্ছে। একিউআইএসের তৎপরতা অনেকখানি বৃদ্ধি পাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
এ মুহূর্তে দেশে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে জেএমবি সবচেয়ে পুরোনো। ১৪ বছর আগে সারা দেশে ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা ফাটিয়ে আলোচনায় আসা এই সংগঠনের সদস্যসংখ্যাও অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি বলে ধারণা করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমানসহ পাঁচ শীর্ষ নেতার ফাঁসি কার্যকর হয় ২০০৭ সালে। এরপর আমির হন সাইদুর রহমান। তিনিও ৯ বছর ধরে কারাগারে। পুরোনো নেতাদের মধ্যে সালাহউদ্দিনই এখন জেএমবির মূল নেতৃত্বে। তাঁকেসহ তিন জঙ্গিকে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে মুক্ত করে নিয়ে যায় জঙ্গিরা। সেই থেকে সালাহউদ্দিন ভারতে আছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে। সেখানে বসেই তিনি জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, বাংলাদেশে র‍্যাব–পুলিশের টানা অভিযানের মুখে জেএমবি দেশে সুবিধা করতে না পেরে ভারতে সংগঠনের বিস্তার ঘটায়। ২০১৪ সালের অক্টোবরে বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের পর বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর ভারতে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে জেএমবির বেশ কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হন।
‘সাহম আল হিন্দ’ নামক ইন্টারনেট​ভিত্তিক জেএম​বির প্রচারমাধ্যমে ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎ​কারে পলাতক জঙ্গি সালাহউদ্দিন বলেছেন, ‘আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন প্রথমত আমাদের টার্গেট ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে। যার জন্য জামাহর নাম ছিল জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ। সংক্ষেপে জেএমবি। কিন্তু আমরা এই দীর্ঘ পথচলা পাড়ি দিয়ে এখন আর আঞ্চলিক কোনো তানজীমে (সংগঠন) সীমাবদ্ধ নই। বিভিন্ন রাষ্ট্রে আমাদের শাখা স্থাপন করেছি। যেমন জামাআতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া–জেএমআই। এ ছাড়া আরও কিছু ভূখণ্ডে কাজ চলছে। বর্তমানে আমাদের মূল জামাহকে (সংগঠন) “জামাআতুল মুজাহিদীন” হিসেবে প্রকাশ করছি।’
হোলি আর্টিজানে হামলার ৩ বছর পূর্ণ।
একিউআইএসের তৎপরতা অনেকখানি বৃদ্ধি পাওয়ার লক্ষণ।
ঘাপটি মেরে থাকলেও লক্ষ্য থেকে সরেনি আনসার আল ইসলাম।
আনসার আল ইসলাম গোপনে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে তারা।
তবে ভারতে সাংগঠনিক বিস্তার ঘটালেও জেএমবির মূল দৃষ্টি বাংলাদেশেই। জঙ্গি কার্যক্রম প্রতিরোধে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, দেশে বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করেও জেএমবি কোনো নেতৃত্বকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। তারা অর্থসংকটে আছে। এ কারণে জেএমবি অনেক দিন ধরে ডাকাতিতে যুক্ত হয়েছে তহবিল সংগ্রহের নামে।
তবে আল–কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পর এখন নতুন করে জেএমবি এ দেশে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টায় আছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। গত বছর মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ব্লগার ও প্রকাশক শাজাহান বাচ্চুকে হত্যা করে সেটার জানান দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই হত্যার পর ইন্টারনেটে ​জেএমবির প্রচার সাইট ‘সাহম আল হিন্দ’–এ এর দায় স্বীকার করে জেএমবি। এ ছাড়া পীর, মাজার–খানকার মতো পুরোনো লক্ষ্যবস্তুতেও জেএমবি কয়েক বছর ধরে বিক্ষিপ্তভাবে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে।
জঙ্গিরা বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে গত রোববার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। তবে তিনি বলেন, আগের মতো সক্ষমতা জঙ্গিদের নেই। হোলি আর্টিজান হামলার পরপরই দেশে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ঘাপটি মেরে আছে আনসার আল ইসলাম
এদিকে এদেশে আল–কায়েদাপন্থী হিসেবে পরিচিত সংগঠন আনসার আল ইসলামকে এ মুহূর্তে জঙ্গি​ সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংগঠিত বলে মনে করছেন জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
২০০৮ সালে জন্ম নেওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলাম ২০১৩ সাল থেকে ব্লগার হত্যার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে। তাদের সর্বশেষ হত্যাযজ্ঞ ছিল ২০১৬ সালের এপ্রিলে রাজধানীর কলাবাগানে সমকামী অধিকারকর্মী ও মার্কিন দূতাবাসের কর্মী জুলহাজ মান্নান এবং তাঁর বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয় হত্যা।
জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করেন এমন ব্যক্তিদের মতে, আনসার আল ইসলাম ঘাপটি মেরে আছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু থেকে তারা সরে আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটির অনুসারীদের অনলাইনে তৎ​পরতা বেড়েছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তাদের কথিত দাওয়াতি কার্যক্রমও থেমে নেই। যদিও বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনের অনেকে গ্রেপ্তার, কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।
আনসার আল ইসলামের কথিত সামরিক শাখার প্রধান চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। তাঁকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই সংগঠনের তৎপরতা নজরদারি করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন একজন কর্মকর্তার মতে, আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য ৪০ থেকে ৫০ জন হতে পারে। যাদের অনেকে প্রশিক্ষিত ও তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ। এদের সদস্যদের বড় অংশই শিক্ষিত। এ ছাড়া এদের বেশ কিছু অনুসারী আছে। এরা জেএমবির সঙ্গে যৌথভাবে নাশকতায় নামে কি না, সেটাই এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

Wednesday, October 14, 2015

নতুন নেতৃত্বে জেএমবি, বেছে বেছে হত্যা by টিপু সুলতান

নতুন নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে ‘টার্গেট কিলিং’ বা বেছে বেছে হত্যায় নেমেছে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। গত পাঁচ সপ্তাহে ঢাকা, পাবনা ও চট্টগ্রামে তিনটি ঘটনার পর এই নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনটি আবার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জঙ্গি দমন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার মতে, এই গোপন সংগঠনটি বছর দুয়েক আগে খুলনা থেকে হত্যাকাণ্ড শুরু করে। এরপর গত দুই বছরে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ১২টি হত্যার ঘটনা ঘটায়। সব কটি ঘটনার নেপথ্যে ধর্মীয় মতাদর্শগত ভিন্নতা ও উগ্রপন্থীদের সন্দেহ করা হলেও এত দিন বিষয়টি পরিষ্কার ছিল না। কারণ, এর মধ্যে পরপর কয়েকজন ব্লগারকে হত্যার ঘটনায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাম আলোচনায় আসে। ফলে ওই সব খুনের ঘটনা মনোযোগ হারায়।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানায়, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবি সদস্যদের মধ্যে একজন সুজন ওরফে বাবু গত ৪ সেপ্টেম্বর জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রাম নগরের আকবর টিলা এলাকায় ‘ল্যাংটা ফকিরের মাজারে’ রহমতউল্লাহ ওরফে ল্যাংটা ফকির ও তাঁর খাদেমকে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। সুজনের ভাষ্য, ‘শরিয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকায়’ তাঁরা ল্যাংটা ফকির ও খাদেমকে খুন করেছেন।
ঢাকার একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে এই পাঁচ জঙ্গি গ্রেপ্তারের পর জেএমবি নতুন নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে মাঠে নামার বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর ৪ অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদীতে খ্রিষ্টান যাজক লুক সরকারকে হত্যার চেষ্টায় জেএমবির সদস্য ধরা পড়া এবং গত সোমবার তাঁর স্বীকারোক্তির পর এ সংগঠনটির ওপর আরও নিবিড় নজরদারির ওপর জোর দেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
গোপন সংগঠনটি বছর দুয়েক আগে খুলনা থেকে হত্যাকাণ্ড শুরু করে। এরপর গত দুই বছরে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ১২টি হত্যার ঘটনা ঘটায়, এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও ঈশ্বরদীর দুটি ঘটনা আমরা গভীরভাবে পর্যালোচনা করছি। জেএমবি আরও তৎপরতা চালাতে পারে, এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে সংগঠনটির ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য নিয়েও আমরা কাজ করছি।’
জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে নজরদারির দায়িত্বে থাকা একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, তাঁরা এখন আর কারাবন্দী জেএমবির আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে নেই। তাঁরা নতুন নেতৃত্বে কয়েক বছর ধরে সংগঠিত হয়েছেন। তাঁদের শীর্ষ নেতা ডাক্তার নজরুল। তাঁকে সংগঠনের সদস্যরা মূলত ‘ডাক্তার সাহেব’ বলে ডাকেন। তাঁর বাড়ি উত্তরাঞ্চলে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামে রিমান্ডে থাকা জেএমবির সদস্য সুজন বলেছেন, চট্টগ্রামের জেএমবিতে তাঁদের গ্রুপে ১৩-১৪ জন সদস্য ছিলেন। নেতৃত্বে আছেন ফারদিন, যিনি ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সদরঘাটে ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে নিজেদের বোমায় আহত হয়েছিলেন। গত রমজান মাসে ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরের একটি সাততলা বাড়ির ষষ্ঠ তলায় টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে জেএমবি বোমা তৈরির ওপর প্রশিক্ষণ দেয়। চট্টগ্রামে গ্রেপ্তারের পর ‘বিস্ফোরণে’ নিহত সুজন ও জাবেদ এতে অংশ নেন।
জিজ্ঞাসাবাদে সুজন জানিয়েছিলেন, তাঁদের অনেক পথ ঘুরিয়ে মিরপুরের ওই বাসায় নেওয়া হয়, তাই বাসার সঠিক অবস্থান তিনি বলতে পারছেন না। তাঁদের প্রশিক্ষক ছিলেন দুজন। একজন নিজেকে রানা ও আরেকজন আবদুল্লাহ নামে পরিচয় দেন। দুটি নামই ছদ্মনাম বলে ধারণা জিজ্ঞাসাবাদ-সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের।
সর্বশেষ ঈশ্বরদীতে যাজক হত্যাচেষ্টায় গত সোমবার পাবনার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জেএমবির সদস্য রাকিবুল হাসান ওরফে রাব্বী বলেছেন, রকিবুল ইসলাম ওরফে রাকিবের নেতৃত্বে তাঁরা যাজককে হত্যার চেষ্টা চালান। তাঁদের মূল নেতা কে বা কে এই খুনের নির্দেশ দিয়েছেন, তা পলাতক রাকিব বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাবনার পুলিশ সুপার আলমগীর কবির গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেএমবি যে নতুন করে নাশকতা শুরু করেছে, তা দেখতে পাচ্ছি। তবে তাঁদের মূল নেতা কে, সেটা জানা যায়নি। কারণ, যাজক হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী রাকিবুল ইসলামকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।’ তিনি জানান, এই রাকিবুল ঢাকায় চাকরি করতেন। বছর দেড়েক ধরে পাবনায় জেএমবিকে সংগঠিত করছিলেন।
এ ছাড়া ঢাকার বাড্ডায় ৫ অক্টোবর পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে তাঁর খানকায় জবাই করে হত্যার ঘটনায়ও এখন জেএমবি মূল সন্দেহভাজন। জঙ্গি তৎপরতা নজরদারিতে থাকা গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, খিজির খান ও গত ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে ল্যাংটা ফকির রহমতউল্লাসহ দুজনকে হত্যার সঙ্গে ২০১৩ সালের ৮ আগস্ট খুলনার খালিশপুরে উম্মুল মোমেনিন দাবিদার কথিত ধর্মীয় নেতা তৈয়বুর রহমান ও তাঁর কিশোর ছেলে নাজমুম মনিরকে জবাই করে হত্যা, একই বছর ২১ ডিসেম্বরে ঢাকায় ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি দাবিদার লুৎফর রহমানসহ ছয়জনকে হত্যা এবং গত বছরের আগস্টে মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীর হত্যার ঘটনায়ও এখন জেএমবির দিকেই মূল সন্দেহ।
জেএমবির কার্যক্রমের বিষয়ে শুরু থেকেই নজর রাখছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক (তদন্ত) মো. নুর খান। তাঁর পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জেএমবির শুরুর দিকে বিভিন্ন স্থানে অনেক পীর, খানকা ও মাজার, মেলা-যাত্রা প্যান্ডেলে জেএমবি হামলা করেছিল। তখন জয়পুরহাটের একটি খানকায় জবাই করার ঘটনা ছাড়া বাকি সব হামলায় তারা বোমা ব্যবহার করেছিল। কিন্তু এখন তারা কৌশল পাল্টে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিশানা করে হত্যা করছে। খুব দ্রুততার সঙ্গে তারা এসব ঘটনা ঘটিয়ে একধরনের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।
জঙ্গিবাদ-বিষয়ক বিশ্লেষক মো. নুর খান বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জেএমবি আবার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। তারা আরও বড় কোনো ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, ২০০৫ সালের পর জেএমবি এত সুবিধা করতে পারেনি; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও তৎপরতার মুখে অনেকটা ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রতীয়মান হচ্ছে, এই জঙ্গিরা আবার সংগঠিত ও প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে।
জেএমবি নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হচ্ছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মনে করি, ঘটনা ঘটিয়ে কেউ পার পাবে না। জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক তৎপরতা অব্যাহত আছে। বিভিন্ন সময়ে এসব গোষ্ঠীর অনেকে ধরাও পড়েছে। অভিযান আরও জোরদার করা হবে।’

Saturday, August 22, 2015

বিচারের অপেক্ষায় ১১ বছর by টিপু সুলতান ও প্রশান্ত কর্মকার

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর ঘটনাস্থল
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ১১ বছর পার হলো। এখনো বিচারের অপেক্ষায় আছে ওই ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের পরিবার। কিন্তু এ বছরও মামলার বিচারকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে আছে। এ বছরের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করা যাবে বলে তিনি আশাবাদী । তিনি বলেন, মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আরও একজন বিশেষ পিপি নিয়োগ করা হয়েছে।
এ মামলার ৪৯১ জন সাক্ষীর মধ্যে গত বুধবার পর্যন্ত ১৭৬ জনের সাক্ষ্য-জেরা শেষ হয়েছে। অন্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অভিযোগ প্রমাণের জন্য যাঁকে যাঁকে প্রয়োজন মনে হবে, তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আদালতে ডাকা হবে বলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা জানান।
বিচারকাজ শেষ হতে আর কত সময় লাগতে পারে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কত দিন লাগবে তা বলা ঠিক হবে না। তবে চলতি বছরের মধ্যে বিচারকাজ শেষ না হলেও একটি বিশেষ পর্যায়ে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
অপর দিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া দাবি করেন, এ মামলার বিচারকাজের গতি-প্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। সপ্তাহে দু-তিন দিন সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। ফলে আসামিপক্ষ সাক্ষীকে জেরা ও প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে না। অবশ্য সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, এটা ঠিক নয়। আসামিপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জেরা করে সময়ক্ষেপণ করছে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা করা হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে তদন্ত শুরু করায়। বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের জুনে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর মামলার বিচার শুরু হয়। ৬১ জনের সাক্ষ্য নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এসে এর অধিকতর তদন্ত করে। এরপর বিএনপির নেতা তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরীসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিলে আবার বিচার শুরু হয়। তারপর পেরিয়ে গেছে আরও সাড়ে তিন বছর।
এ মামলার মোট ৫২ জন আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচার চলছে। ইতিমধ্যে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চারজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাঁরা জোট সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও র্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২২ জন নিহত হন। আহত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী। এঁদের অনেকে আজও শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন। আহত ব্যক্তিরাসহ নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা বিচারের অপেক্ষায় আছেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে অবস্থিত ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিশেষ এজলাসে মামলার বিচারকাজ চলছে।
বিএনপি সরকারের সাজানো তদন্ত: গ্রেনেড হামলার দিনই পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করে। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা দিতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি। শুরু থেকেই তদন্তের গতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে তৎকালীন সরকার। তদন্তের নামে বিষয়টিকে বিতর্কিত করার কাজ শুরু হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ একটি মহলের প্রভাব ছিল বলে শুরু থেকেই অভিযোগ ছিল। পরে একাধিক তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে।
ঘটনার গুরুত্ব নষ্ট করতে হামলার শিকার আওয়ামী লীগের দিকেই সন্দেহের আঙুল তুলেছিল বিএনপি। ওই সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নেতা তাঁদের বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ নিজেরাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রচার চালান। হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত বলেও তখন একটা মহল থেকে প্রচারণা চালানো হয়।
ঘটনা তদন্তে ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে চারদলীয় জোট সরকার। সেই কমিশনও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অপপ্রচারের পথ ধরেই চলেছিল। ১ মাস ১০ দিনের মাথায় কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়ে বলে, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, এই হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল। প্রতিবেদনে বিদেশি শক্তি বলতে কোনো দেশের নাম বলা হয়নি। তবে ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন বৃহৎ প্রতিবেশী শক্তি হিসেবে ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করেন।
অবশ্য কেবল এ ঘটনাই নয়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। বেশ কিছু নাশকতামূলক বোমা-গ্রেনেড হামলা চালায়। জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান, তৎপরতা এবং এ ব্যাপারে সরকারের নির্লিপ্ততা নিয়ে তখন গণমাধ্যমে ব্যাপক লেখালেখি হয়। কিন্তু ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলার আগ পর্যন্ত তৎকালীন সরকার জঙ্গিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে গেছে। শুধু তা-ই নয়, ২০০৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে রাজশাহীর তিন উপজেলায় সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির তাণ্ডবে বিএনপির একাধিক মন্ত্রী ও সাংসদের সহযোগিতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তখন শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী বলেছিলেন, বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। এরপর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো শুরু করে। প্রথমে পার্থ সাহা নামে এক নিরীহ যুবককে আটক করে। তাঁকে নির্যাতন করে সাজানো জবানবন্দি আদায় করে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু গণমাধ্যমের কারণে ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
জজ মিয়া উপাখ্যান: ঘটনার ১০ মাসের মাথায় ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বীরকোট গ্রামের বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে সিআইডি আটক করে। ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে জজ মিয়ার কাছ থেকে সিআইডি সাজানো জবানবন্দি নেয়।
এই জজ মিয়াকে দিয়েই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে তদন্তের নামে ‘আষাঢ়ে গল্প’ প্রচার করেছিলেন মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদ ও তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন। সিআইডির এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনিও এই সাজানো ছকে কথিত তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যান। এই গল্প সাজানোর ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন বলে পরে তদন্তে জানা গেছে।
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া সেই সাজানো জবানবন্দিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, তিনি আগে কখনো গ্রেনেড দেখেননি; গ্রেনেড ও বোমার মধ্যে পার্থক্য তিনি জানেন না। পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় ভাইদের নির্দেশে তিনি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নেন। আর বড় ভাইয়েরা হচ্ছেন সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ, মুকুল প্রমুখ। উল্লিখিত সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগ চারদলীয় জোট সরকারের সময় ভারতে পালিয়ে যায়।
এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই সিআইডি তাঁর পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি। (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ আগস্ট ২০০৬)
সত্য উদ্ঘাটনের শুরু: ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে এ মামলা তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তাতে বেরিয়ে আসে, বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় গোপন জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই হামলা চালিয়েছিল।
তদন্ত শেষে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে হুজি-বির নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। পিন্টু ছাড়া বাকি সবাই হুজি-বির জঙ্গি।
অধিকতর তদন্ত: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিআইডি এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। তাতে আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। উভয় অভিযোগপত্র মিলে মোট আসামির সংখ্যা ৫২।
আসামিরা হলেন তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সাবেক সাংসদ শাহ মোহাম্মদ কায়কোবাদ, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম (ডিউক), এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম ও মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, পুলিশের সাবেক তিন আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি খান সাইদ হাসান ও মো. ওবায়দুর রহমান, জোট সরকারের আমলে মামলার তিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদ, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ এবং হুজি-বির ১০ জন নেতা।
২০১২ সালের ১৮ মার্চ হত্যা মামলায় ৫২ জনের বিরুদ্ধে এবং বিস্ফোরক মামলায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। আসামিদের মধ্যে পুলিশের সাবেক ছয় কর্মকর্তা, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান জামিনে আছেন। বাবর, পিন্টু, মুজাহিদসহ ২৬ জন আসামি কারাগারে আছেন। পলাতক রয়েছেন ১৮ জন।

Monday, June 29, 2015

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা জেএমবি ও হুজির by টিপু সুলতান

আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ দুই জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও হরকাতুল জিহাদ (হুজি-বি)। এর মধ্যে জেএমবি তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়ে সংগঠিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দেশে জঙ্গি তৎপরতার ওপর নজরদারি করে এমন একাধিক সূত্র জানায়, জেএমবির কারাবন্দী আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বা তাঁর অনুসারীরা মূলত সংগঠন গোছানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এরা নতুন সদস্য সংগ্রহ ও পুরোনো নিষ্ক্রিয় সদস্যদের উজ্জীবিত করাসহ শক্তি সঞ্চয়ের প্রতি মনোযোগ দিয়েছে। এই অংশটি এখন কোনো নাশকতায় জড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে রাজি নয়।
অপরদিকে পুলিশ হত্যা করে প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন ও বোমা মিজান নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেএমবির আরেকটি অংশের। এই অংশটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে ২০০৫ সালের মতো নতুন করে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু গত অক্টোবরে ভারতের বর্ধমানে বিস্ফোরণের ঘটনায় সেটা সফল হয়নি বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো দাবি করছে।
ভারতে গিয়ে বর্ধমানের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং পরে ওই সূত্রে দেশে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদেরও জেরা করেছেন—এমন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, জেএমবির এই অংশটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মুখে দেশে বসে প্রস্তুতি নিতে পারছিল না। তাই সীমান্তের ওপারে ভারতের বর্ধমানে বসে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ২০০৫ সালের মতো একযোগে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নতুন করে নিজেদের জানান দেওয়া। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্দোলন মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকবে বলে ওই সময়টাকে তারা বেছে নিয়েছিল।
বর্ধমানের ঘটনার সূত্র ধরে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে জেএমবির কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী জেনেছে যে জেএমবির এই অংশটি এখনো আগের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা কারাবন্দী আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গিনেতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছে বলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়।
গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে আক্রমণ করে সাজাপ্রাপ্ত তিন জঙ্গিনেতা সালাহউদ্দিন, বোমা মিজান ও হাফেজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জেএমবি। এঁদের একজন হাফেজ মাহমুদ ওই দিন সন্ধ্যায় ধরা পড়েন এবং ক্রসফায়ারে নিহত হন।
জেএমবির এই অংশটি মূলত ভারতের মুর্শিদাবাদ-মালদহকেন্দ্রিক সংগঠনের পুরোনো কর্মীদের সমর্থন নিয়ে বর্ধমানে আস্তানা গড়ে তুলেছিল বলে জানা গেছে। জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান গ্রেপ্তারের পর যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তাতেও বলেছিলেন, সংগঠনটি যাত্রার শুরুতেই মালদহে কমিটি করে। সেটা ছিল তাঁদের ৬৫তম জেলা কমিটি।
জঙ্গিবিরোধী অভিযানে যুক্ত গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, এর বাইরে জেএমবির তৃতীয় ধারাটিতে আছে মূলত তরুণ কর্মীরা। তাদের আগ্রহ এখন সিরিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের প্রতি। এই অংশটি এর আগে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রতি ঝুঁকেছিল। কেউ কেউ আনসারুল্লাহর সদস্য হিসেবে গ্রেপ্তারও হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। গত মার্চে ঢাকার তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান হত্যায় হাতেনাতে ধরা পড়া দুজনের একজন জিকরুল্লাহও আগে জেএমবির সদস্য ছিল।
রাজধানীর গোপীবাগের স্বঘোষিত ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি লুৎফুর রহমানসহ ছয় খুন এবং রাজাবাজারে মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকীকে হত্যার ঘটনায় জেএমবির এই তরুণ অংশটিকে সন্দেহের শীর্ষে রেখেছে তদন্তকারী সংস্থা।
অপরদিকে দেশের সবচেয়ে পুরোনো জঙ্গি সংগঠন হুজির প্রায় সব কেন্দ্রীয় নেতা দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দী এবং বিভিন্ন নাশকতা মামলায় অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত। সংগঠনটি অনেক দিন ধরে নিষ্ক্রিয়।
বছর খানেক ধরে হুজি-বির একটা অংশ পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা মূলত কারাবন্দী দুই হুজি নেতা মাওলানা আবু সাইদ ও মুফতি আবদুর রউফের অনুসারী। হুজির নতুন করে তৎপরতা প্রথম নজরে আসে গত অক্টোবরে। তখন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে এই দলের সাতজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের একটি আস্তানা থেকে বোমা তৈরির বিপুল উপকরণও উদ্ধার হয়। ওই অভিযানের নেতৃত্বদানকারী ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ছানোয়ার হোসেন বলেন, এই দলটি আবু সাইদের নির্দেশে সংগঠিত হয়। তারা অস্ত্র-বিস্ফোরকের মজুত গড়ে তুলছিল। নারায়ণগঞ্জে রীতিমতো বোমা তৈরির গবেষণাগার গড়ে তুলেছিল। তিনি বলেন, ৭ জুন ঢাকা থেকে তাঁরা ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেন। এরপর একই সূত্রে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করেন। এরা কারাবন্দী হুজি নেতা মুফতি আবদুর রউফের নির্দেশনায় সংগঠিত হচ্ছিল।
এসব জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে যে মতাদর্শিক দূরত্ব ছিল, তা সাম্প্রতিককালে অনেকটা ঘুচে গেছে বলেও জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেন, হুজি, জেএমবি, আনসারুল্লাহ—সবগুলো সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এখন কাশিমপুর কারাগারে আছেন। তাঁদের মধ্যে মতাদর্শিক যে দূরত্ব ছিল, কারাগারে বসে তা অনেকটা মিটিয়ে ফেলেছেন বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব গোষ্ঠীর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টার বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘পরিস্থিতি খুব ভয়ংকর পর্যায়ে গেছে—এমনটা আমার মনে হচ্ছে না। তবে সাবধান না হলে ভবিষ্যতে বিপদ হতে পারে।’ তিনি বলেন, যুবসমাজকে বেশি করে খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ভালো কাজে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতায় যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, পরিবারকেও সচেতন হতে হবে। সন্তানের মধ্যে হঠাৎ পরিবর্তন চোখে পড়লে মা-বাবাকে সতর্ক হতে হবে। অনলাইনসহ নানা মাধ্যমে উগ্র মতাদর্শ প্রচার, ধর্মের ভুল বা খণ্ডিত ব্যাখ্যার বিপরীতে সরকারকেও পাল্টা কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

Sunday, June 28, 2015

আনসারুল্লাহর লক্ষ্য মাসে একটি খুন by টিপু সুলতান

ছোট ছোট লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে নিয়মিত বিরতিতে, সম্ভব হলে প্রতি মাসে একটি করে খুনের ঘটনা ঘটাতে চায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। তাদের বিবেচনায় যেসব ব্যক্তি ইসলামবিরোধী, তাদের ওপর হামলা চালাতে সংগঠনটির মতাদর্শে উদ্বুদ্ধদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক কালে গ্রেপ্তার হওয়া আনসারুল্লাহর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন জঙ্গি দমন কার্যক্রম তদারকিতে যুক্ত একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাঁরা বলেন, আনসারুল্লাহ এই পর্বে একক ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাদের তারা ইসলামবিরোধী মনে করছে। তারা প্রতি মাসে এ রকম একজনকে খুন করে কর্মীদের সক্রিয় রাখতে চায়।
এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ব্লগার ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা, মার্চে ওয়াশিকুর রহমান ও মে মাসে সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যার সঙ্গে জড়িত বলে এই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকেই সন্দেহ করছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। মাঝে এপ্রিল মাস বাদ গেছে। ওই কর্মকর্তাদের ধারণা, এপ্রিলে আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে নয়জনকে গুলি করে হত্যার পর অভিযানের মুখে আনসারুল্লাহর জঙ্গিরা চাপে ছিল, অনেকে গ্রেপ্তার হয়। ফলে ওই মাসে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করতে পারেনি তারা।
অবশ্য আনসারুল্লাহ লেখালেখির কারণে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে প্রথম হত্যার ঘটনা ঘটায় ২০১৩ সালে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার মিরপুরে ব্লগার রাজীব হায়দারকে খুন করে। এরপর গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আশরাফুল আলম ও দেড় মাস পর ১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফিউল ইসলাম একই কায়দায় খুন হন। এই দুটি হত্যার ঘটনায়ও আনসারুল্লাহ প্রধান সন্দেহভাজন।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া আনসারুল্লাহর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত ছিলেন—গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, যতসংখ্যক এ ধরনের হত্যা করা যায়, সেদিকে এই গোষ্ঠীটির বেশি মনোযোগ। তারা এ ধরনের খুন করানোর জন্য নিজেদের সদস্যদের পাশাপাশি উগ্র মতাদর্শের অন্যদের উদ্বুদ্ধ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। ব্লগার ওয়াশিকুরকে এমন লোকদের দিয়েই হত্যা করানো হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন। ফলে হাতেনাতে দুজন ধরা পড়লেও মূল পরিকল্পনাকারীকে শনাক্ত করতে পারছেন না তাঁরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আনসারুল্লাহ এখন আর একক কোনো সাংগঠনিক কাঠামোতে নেই। এটা এ প্রজন্মের উগ্রপন্থীদের একটা ‘প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে কাজ করছে। তারা শুরু থেকেই আল-কায়েদার নীতি-কৌশলকে অনুসরণ করে আসছে। শুরুতে আল-কায়েদা আরব উপদ্বীপের প্রয়াত নেতা ইয়েমেনের আনোয়ার আওলাকিকে আধ্যাত্মিক নেতা মানত। আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট বা একিউআইএস ঘোষণার পর এর অধিভুক্ত হয় আনসারুল্লাহ। তারা এখন আধ্যাত্মিক নেতা মানছে আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরিকে।
আনসারুল্লাহর ওপর নজরদারি এবং এর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে যুক্ত—এমন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ২০১৩ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীসহ সংগঠনটির বেশ কিছু সদস্য গ্রেপ্তার হয়। এরপর ২০১৪ সালে তারা চুপচাপ থেকে মূলত প্রস্তুতি নিয়েছে। গত ডিসেম্বর থেকে নতুন করে সক্রিয় হতে থাকে। তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে সংগঠিত হয়। প্রতিটি দলের আলাদা আলাদা নাম থাকলেও সব সদস্যকে সেটা জানানো হয় না। একজন সদস্য একটা বিশ্বাসযোগ্য পর্যায়ে যাওয়ার পরই সংগঠনের নাম জানতে পারে। এ কারণে সাম্প্রতিককালে যতগুলো দল ধরা পড়েছে, একপর্যায়ের পর তাদের বিষয়ে আর কিছু জানা যাচ্ছে না। এক দল ব্যাংক ডাকাতি করে তহবিল গড়ার পরিকল্পনা করছে, কিন্তু অন্য দলগুলো জানছে না। ফলে আগাম গোয়েন্দা তথ্যও মিলছে না।
দেশে তৎপর জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আনসারুল্লাহকে এখন সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করছে জঙ্গি তৎপরতা দমনে নিয়োজিত সংস্থাগুলো। এ কারণ জানতে চাইলে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা আধুনিক শিক্ষিত, চৌকস, বিত্তবানদের সন্তান। এদের পেছনে প্রশিক্ষিত জনবল আছে। এই গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ ২৫ জনের একটা তালিকা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৮ জনই ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করা। এমন কয়েকজন সম্প্রতি গ্রেপ্তারও হয়েছে।
২০০৭ সালে জন্ম নেওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। চলতি বছরের ২৫ মে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার।
আনসারুল্লাহকে এ দেশে চতুর্থ প্রজন্মের জঙ্গি সংগঠন বলে মনে করা হয়। প্রথম প্রজন্মের জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশের (হুজি-বি) জন্ম বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ দিকে। আফগানিস্তানে সোভিয়েটবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়া এদেশীয় মুজাহিদরা এটি প্রতিষ্ঠা করে। এর এক দশক পর জন্ম হয় দ্বিতীয় প্রজন্মের জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি)। একুশ শতকে এসে এ দেশে কার্যক্রম শুরু করে আন্তর্জাতিক সংগঠন হিযবুত তাহ্রীর। এটিকে এ দেশে তৃতীয় প্রজন্মের সংগঠন বলে মনে করা হয়। হিযবুত তাহ্রীরকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালের ১০ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপরও সংগঠনটির তৎপরতা বন্ধ হয়নি। প্রায় প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর কোনো না কোনো মসজিদের সামনে তারা ছোটখাটো সমাবেশ করে এবং তার সচিত্র সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠায়।

Saturday, June 27, 2015

হঠাৎ সক্রিয় নতুন-পুরোনো সব জঙ্গিগোষ্ঠী by টিপু সুলতান

হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছে দেশের নতুন-পুরোনো সব জঙ্গিগোষ্ঠী। ছোট ছোট নানা দলে ভাগ হয়ে সংগঠিত হচ্ছে নতুন নতুন নামে। দলে ভেড়াচ্ছে শিক্ষিত তরুণদের। অস্ত্র-বিস্ফোরকের মজুত গড়ার চেষ্টাও করছে তারা। কেউ কেউ সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তথ্য মিলছে।
অনেক দিন ধরে দেশে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম তদারক করছেন—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর যেসব তৎপরতা গোয়েন্দা নজরদারিতে এসেছে, ২০০৫ সালের পর নয় বছরে এমনটা দেখা যায়নি।
হঠাৎ জঙ্গিদের তৎপরতা বাড়ার কথা স্বীকার করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলামও। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে উগ্র মতাদর্শীদের মধ্যে আইএসকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা চলছে, তার প্রভাব এ দেশেও পড়েছে। এর মধ্যে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারিও বেড়েছে। যার কারণে গত ছয় মাসে বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর প্রায় ১০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ উপাদান উদ্ধার করা হয়েছে।
জঙ্গিগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি তৎপর ব্লগার হত্যার ঘটনায় বহুল আলোচিত ও সদ্য নিষিদ্ধঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। সংগঠনটির একটি উপদল গত এপ্রিলে রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে নয়জনকে হত্যা করেছে। তহবিল সংগ্রহের জন্য জঙ্গিরা এমন আরও ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা করছিল বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে।
রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস থেকে গত ৩১ মে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার ছেলে আবদুল্লাহ আল-গালিব। ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, গালিব মূলত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সহ-সমন্বয়ক। তিনি সম্প্রতি ‘জুনুদ আত-তাওহিদ ওয়াল খিলাফা’ নামে সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৫-২০ জন সদস্য সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণও শুরু করেছিলেন। তাঁর কাছ থেকে নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশের ঘোষণাসংবলিত যে সিডি উদ্ধার করা হয়, তাতে আইএসের প্রধান আবু বকর আল বাগদাদির প্রতি আনুগত্যের কথা বলা হয়। ওই ভিডিওতে তাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণের চিত্রও সংযুক্ত করা হয়, যা আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ইন্টারনেটে নিজস্ব ওয়েবপেজে আপলোড করা হয়।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে র্যা ব জঙ্গি সন্দেহে ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছে বিপুল অস্ত্র ও বিস্ফোরকসামগ্রী উদ্ধার করা হয়। র্যা বের কর্মকর্তাদের দাবি, এরা সবাই নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘শহীদ হামজা ব্রিগেডের’ সদস্য। ২০১৩ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রামে সংগঠনটির জন্ম।
খোঁজখবর করে জানা গেছে, কথিত এই সংগঠনটির নেতা-কর্মীরাও মূলত আনসারুল্লাহর প্রধান মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর অনুসারী। ব্লগার রাজীব হত্যা এবং এরপর জসিমউদ্দিন রাহমানী গ্রেপ্তার হওয়ার পর আনসারুল্লাহ নামটি ব্যাপক জানাজানি হওয়ায় চট্টগ্রামে দলটি নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করে।
কয়েক মাস আগে রাজশাহীতে ইসলামি লিবারেশন ফ্রন্ট (আইএলএফ) নামে উগ্র মতবাদসংবলিত বক্তব্যসহ প্রচারপত্র ছড়ানো হয়। যদিও রাজশাহীর তৎকালীন পুলিশ সুপার (সম্প্রতি পাবনায় বদলি হন) আলমগীর কবির প্রথম আলোকে বলেন, চারঘাট উপজেলার হলিদিয়া রেলস্টেশনে এ রকম প্রচারপত্র পাওয়ার পর পুলিশ এ নিয়ে তদন্ত করে। কিন্তু এই নামের সংগঠনের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি।
ঢাকায় একজন পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, তাঁরা এখন আইএলএফ বিষয়ে জানার চেষ্টা করছেন। কারণ, সাম্প্রতিককালে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁরা জেনেছেন যে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে পুরোনো নাম ব্যবহার করছে না। কারণ তাদের পুরোনো বা পরিচিত সংগঠনের নামে কাজ করলে কাজ শুরুর আগেই ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে। সহজে সংগঠনের তৎপরতা সম্পর্কে পুলিশ ধারণা পেয়ে যায়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজশাহীতে অধ্যাপক শফিউল হত্যার পর ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ নামে ফেসবুকে হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। এরপর লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যার আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ‘আনসার বাংলা সেভেন’ নামে টুইটার অ্যাকাউন্ট খুলে দায় স্বীকার করা হয়। সম্প্রতি ‘আনসার বাংলা-১৩’ নামে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হুমকি দিয়ে উড়ো চিঠি এসেছে। এসব জঙ্গিদের নতুন নতুন নামে সংগঠিত হওয়ার নমুনা কিংবা মানুষকে বিভ্রান্ত করার কৌশলও হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে গত অক্টোবর ও নভেম্বরে ডিবি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে, যারা ‘বাংলাদেশ জিহাদি গ্রুপ’ নামে সংগঠিত হচ্ছিল। তাদের একটি আস্তানা থেকে বোমা তৈরির বিপুল উপকরণও উদ্ধার হয়। ওই অভিযানের নেতৃত্ব দেন ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ছানোয়ার হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা মূলত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় অভিযুক্ত হুজি নেতা মুফতি আবু সাঈদ ওরফে জাফরের অনুসারী। কারাবন্দী আবু সাঈদের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা বাংলাদেশ জিহাদি গ্রুপ নামে সংগঠিত হয়ে দেশের সব ‘জিহাদিকে’ এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করছিল।
হুজি মূলত মাদ্রাসায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের সংগঠন হিসেবে পরিচিত হলেও এই গ্রুপের মো. উমর ওরফে ফয়জুল নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রও গ্রেপ্তার হন। তিনি রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। তিনি এই গ্রুপের বোমা বিশেষজ্ঞ বলে ডিবি দাবি করে।
সম্প্রতি ঢাকার পৃথক স্থান থেকে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয় ১০ জনকে। তাদের ৮ জুন গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে ডিবি। তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এদের মধ্যে মাওলানা নুরুল্লাহ কাশেমী কারাবন্দী হুজি নেতা মুফতি আবদুর রউফের অনুসারীদের সংগঠিত করছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে কাশেমী স্বীকার করেছেন যে তিনি রউফের অনুসারীদের ‘প্রকৃত জিহাদ’ কী, সেটা শিক্ষা দিচ্ছিলেন। আর তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ছেলে ফাহাদ বিন কাশেমী আবার নিজেকে হুজি বা রউফের অনুসারী নন, আইএসের অনুসারী বলে দাবি করেছেন।
ওই কর্মকর্তা বলে, ফাহাদ আইএসে যোগ দিতে সিরিয়া যাওয়ার পথ খুঁজছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন। তাঁর বাসা থেকে উদ্ধার করা ল্যাপটপে ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা আইএসের অনেক অডিও-ভিডিও পাওয়া গেছে। অবশ্য ফাহাদ বলেছেন, ওই ল্যাপটপ তাঁর ভগ্নিপতি মায়মুন মুনাজের।
অপর একটি সূত্র জানায়, মায়মুন মুনাজ সাবেক একজন সচিবের ছেলে। লেখাপড়া করেছেন ইংরেজি মাধ্যমে। তিনি আগে জামায়াতুল মুসলেমিনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত এই সংগঠনটির তিনজন সদস্য ২০০৯ সালে ইয়ামেনে আল-কায়েদাবিরোধী অভিযানে ধরা পড়েছিল। পরে দেশে ফেরার পর তারা অনেক দিন গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল।
পারিবারিক সূত্র দাবি করছে, মায়মুন প্রায় আট মাস আগে উচ্চশিক্ষার জন্য মালয়েশিয়া গেছেন। কিন্তু ছয় মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। গোয়েন্দাদের ধারণা, মায়মুন মালয়েশিয়া থেকে সিরিয়া গেছেন।
এ দেশে আইএস সন্দেহে গত ছয় মাসে ১৭ জন গ্রেপ্তার হয়। তারা দেশে আইএসের মতাদর্শ প্রচারে জড়িত ছিল এবং সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে অভিযোগ আছে। আইএস অনুসারী এই গোষ্ঠীটি দেশি-বিদেশি জঙ্গিনেতাদের বক্তব্য, পুস্তিকা, ফতোয়া এবং বোমা তৈরি ও জঙ্গি প্রশিক্ষণের নির্দেশিকা বাংলায় অনুবাদ করে ইন্টারনেটে নিজস্ব ওয়েবপেজ ও অনলাইনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে প্রচার করছিল। মূলত শিক্ষিত তরুণদের লক্ষ্য করে এসব তৎপরতা চলছিল।
ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ছোট আকারের দল গঠন করে এ দেশের কিছু যুবক আইএসের পক্ষে লড়াই করতে সিরিয়া বা ইরাক যাওয়ার চেষ্টা করছে। গত ২৪ মে গ্রেপ্তার হওয়া একটি বহুজাতিক কোমল পানীয় কোম্পানির তথ্যপ্রযুক্তি শাখার প্রধান আমিনুল বেগ এমন একটি দলের নেতা বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা। আমিনুল ও তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক সাকিব বিন কামাল জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে বলেছেন, আইএসে যোগ দিয়ে সিরিয়ায় যুদ্ধ করছে বাংলাদেশি দুই যুবক। আরও ১৫-২০ জন সিরিয়ায় যেতে সুযোগের অপেক্ষায় আছে। এমন একজনকে গত শুক্রবার রাতে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর নাম ফায়েজ ইমাম খান, তিনিও একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার ছেলে।
তবে বাংলাদেশ থেকে কেউ সিরিয়া বা ইরাকে গিয়ে আইএসের হয়ে লড়ছে, এমন নিশ্চিত তথ্য দায়িত্বশীল কোনো সূত্র থেকে পাওয়া যায়নি। আইএসে যোগ দিতে দেশ ছেড়েছে, এমন অন্তত চারজনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এদের একজন ২১ বছরের তরুণী, যাকে আগাম খবর পেয়ে তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় ফেরত পাঠিয়েছে ওই দেশের কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ডা. আরাফাত, আশিকুর রহমান ও নিয়াজ মোর্শেদ নামের তিনজন দেশ ছেড়েছেন কয়েক মাস আগে। তাঁরা সিরিয়া পৌঁছেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে সিরিয়া গিয়ে লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছে, এমন সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ তাঁরা পাননি। তবে আইএসে যোগ দিতে যাওয়ার চেষ্টা ও প্রস্তুতিকালে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

Monday, June 1, 2015

মাফিয়া পতনের সূচনা করলেন অদম্য বাবা by টিপু সুলতান

থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আবিষ্কৃত প্রথম গণকবর। ডানে বড়
মানব পাচারকারী চক্রের প্রধান আনোয়ার l ফাইল ছবি
ছেলের কবর আর ঘাতকের খোঁজে দিনের পর দিন থাই সমুদ্র উপকূলে কাটান কুইল্যা মিয়া। তাঁর টানা চার মাসের অদম্য চেষ্টায় ধরা পড়ল মানব পাচারকারী সবচেয়ে ভয়ংকর মাফিয়া চক্রের প্রধান আনোয়ার। সন্ধান মিলল থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবর। এরপর একে একে প্রকাশ পেল রোমহর্ষক সব ঘটনা।
এই অদম্য বাবাকে পাচারকারী চক্র খুন করতে পারে—এ আশঙ্কায় তাঁকে রাখা হয় থাইল্যান্ড পুলিশের একটি সেফ হোমে। রোহিঙ্গা সোসাইটি ইন থাইল্যান্ডের সহায়তায় কুইল্যা মিয়ার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয় ২১ মে।
মিয়ানমারের আরাকানে বাড়ি কুইল্যা মিয়ার। সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের মুখে অন্য আরও অনেক রোহিঙ্গার মতো তিনি দেশ ছাড়েন। সেটা প্রায় এক দশক আগে। তখন থেকে আছেন দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংখলা প্রদেশে। ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্ত্রী-সন্তান থাকেন দেশে।
কুইল্যা মিয়া জানান, তাঁর দেশে রোহিঙ্গা যুবক ছেলেদের রাখাও বিপজ্জনক। তাই ছেলে মো. আবুল কাশেমকে (২৫) মালয়েশিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। আরাকানকেন্দ্রিক পাচারকারী চক্রের সঙ্গে মালয়েশিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দিতে থাইল্যান্ডের মুদ্রায় ৬০ হাজার বাথ (বাংলাদেশি দেড় লাখ টাকার সমান) চুক্তি করেন। আগাম টাকা পরিশোধের পর গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সাগরপথে যাত্রা শুরু করেন কাশেম। দুই সপ্তাহ পর কুইল্যা মিয়ার কাছে ছেলের ফোন আসে থাইল্যান্ডের নম্বর থেকে। পাচারকারীরা আরও ৬০ হাজার বাথ দাবি করছে। না দিলে ছেলে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বন্দী থাকবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর আরও কয়েক দফা ফোন করে মুক্তিপণের জন্য তাগাদা দেয় পাচারকারীরা। নির্যাতন করে ছেলের কান্নাও শোনায়। থাইল্যান্ডে বসবাসকারী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন থেকে ধার করে একপর্যায়ে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করেন কুইল্যা মিয়া। কিন্তু তত দিনে খবর আসে, ছেলে আর জীবিত নেই।
এরপর থেকে ছেলের কবর ও ঘাতকের সন্ধানে বের হন কুইল্যা মিয়া। তাঁকে সহায়তায় এগিয়ে আসে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে দীর্ঘদিন বসবাসরত রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত কিছু থাই নাগরিক এবং রোহিঙ্গা সোসাইটি ইন থাইল্যান্ড। তাঁরা একপর্যায়ে জানতে পারেন, মিয়ানমারকেন্দ্রিক মানব পাচারকারীদের সবচেয়ে বড় চক্রের ক্যাম্পে মারা গেছেন কাশেম। এই চক্রের প্রধান মো. আনোয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর ও প্রভাবশালী, থাকেন দক্ষিণ থাইল্যান্ডের হাতজ্জাই শহরে।
কুইল্যা মিয়া বলেন, আনোয়ারের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁরা যোগাযোগ করেন সেনাবাহিনীর ওই এলাকার উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। ওই কর্মকর্তা জানান, প্রমাণ ছাড়া তিনি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবেন না।
প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টায় কুইল্যার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হন থাইল্যান্ডের পাটানি প্রদেশের নূর আহাম্মদ। তিনিও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ, দুই পুরুষ ধরে থাইল্যান্ডের বাসিন্দা।
নূর আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, একদিন তাঁরা খবর পান আনোয়ারের হাতজ্জাইয়ের বাড়িতে পাচারকারীদের বৈঠক হবে। জানালেন ওই সেনা কর্মকর্তাকে। ওই রাতেই সেখানে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু আগে থেকে টের পেয়ে আনোয়ার ও তাঁর সঙ্গীরা সটকে পড়েন। বাড়ি তল্লাশি করে টাকা লেনদেনের কিছু কাগজপত্র পাওয়া যায়।
ওই অভিযানের পর আনোয়ার মিয়ানমার পালিয়ে যান। নূর আহাম্মদ জানালেন, ২৫ দিন পর আনোয়ার থাইল্যান্ডে ফেরেন। তাঁরা খবর পান, আনোয়ার পাশের প্রদেশ নাখন সি থাম্মারাতের এক বাড়িতে অবস্থান করছেন। ফোনে খবর দেন ওই সেনা কর্মকর্তাকে। এরপর ২৮ এপ্রিল ভোরে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আনোয়ারকে আটক করা হয়।
নাখন সি থাম্মারাতে পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আনোয়ার মানব পাচার ও মুক্তিপণ আদায়ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং কুইল্যা মিয়ার ছেলের কবর কোথায় জানান। সে তথ্য অনুযায়ী, ১ মে মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী থাইল্যান্ডের পাদাম বেসার জঙ্গলে প্রথম গণকবরের সন্ধান পায় থাই পুলিশ। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ২৭ জনের কঙ্কাল। এরপরই সারা দুনিয়া জানল গণকবরের খবর। পরদিন থেকে থাইল্যান্ডের সরকার শুরু করে মানব পাচারবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান।
রোহিঙ্গা সোসাইটি ইন থাইল্যান্ডের সদস্য ও ব্যাংককের ব্যবসায়ী মামুন রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, কুইল্যা মিয়া লেগে না থাকলে এ গণকবরের খবরও কেউ জানত না। এ কারবারও বন্ধ হতো না। লাশ হতো আরও অনেকের ছেলে। তিনি জানান, নিরাপত্তার কারণে কুইল্যা মিয়াকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। কারণ, তিনি থাইল্যান্ডে এ-সংক্রান্ত মামলার প্রধান সাক্ষী। আর এসব মামলায় পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি সন্দেহভাজন হিসেবে আছেন।
রুটি বিক্রেতা থেকে শতকোটি টাকার মালিক: থাইল্যান্ডের গণমাধ্যমের দাবি, মানব পাচারে জড়িয়ে আনোয়ার ওই দেশের মুদ্রায় অন্তত ৪০০ কোটি বাথের সম্পদের মালিক হয়েছেন।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, আনোয়ার এক দশক আগেও হাতজ্জাই শহরের রাস্তায় রুটি বেচতেন। তাঁর জন্মস্থান মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডুর নলবইন্যা গ্রামে। বাবার নাম ননু মিয়া।
২০ বছর আগে সাগরপথে ট্রলারযোগে থাইল্যান্ড আসেন আনোয়ার। আবাস গড়েন সংখলা প্রদেশের হাতজ্জাই শহরে। এ শহরের রাস্তায় রুটি বিক্রি করতেন। পরে থাইল্যান্ডের নাগরিকত্ব পান।
প্রায় একই সময়ে আরাকান থেকে এসে হাতজ্জাই আবাস গড়েছেন এবং আনোয়ারকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন, এমন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা জানান, ২০০৮ সালে আনোয়ার রুটি বিক্রি ছেড়ে দেন। কাজ শুরু করেন মানুষ পাচারকারী চক্রের সঙ্গে। শুরুতে তিনি নৌকায় (ওদের ভাষায় জাহাজ) দোভাষীর কাজ করতেন। পথঘাট চেনার পর বছর দুয়েকের মাথায় আনোয়ার যোগ দেন হাফেজ আহাম্মদের সঙ্গে। মিয়ানমার থেকে মানব পাচারের সে সময়ের বড় হোতা হাফেজ মিয়ানমারের নাগরিক, থাকেন ইয়াঙ্গুনে।
দুই বছরের মধ্যে আনোয়ার ছাড়িয়ে যান ওস্তাদ হাফেজ আহাম্মদকেও। তিনি নিজেই গড়ে তোলেন আরও বড় পাচারকারী চক্র। অল্প দিনে হয়ে ওঠেন এ জগতের সবচেয়ে বড় মাফিয়া। এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল অনেকগুলো সূত্রই নিশ্চিত করেছে যে ২০১২ সাল থেকে আনোয়ারই পুরোনো মানব পাচার কারবারকে মুক্তিপণ বাণিজ্যে রূপান্তর করেন। জঙ্গলে ক্যাম্প বা নিজস্ব বন্দিশালা গড়ে তোলেন, যা পরে অন্যরা অনুসরণ করে।

Sunday, May 24, 2015

দেশান্তরি করছে অভাব by টিপু সুলতান

দীর্ঘদিন ধরে জান্তা সরকারের সীমাহীন নিপীড়ন এবং জাতিগত বর্বরতার শিকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশিরা কেন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শামিল হলো? এ প্রশ্ন এখন সর্বত্র।
‘অভাব, কাজ নাই, সংসার চলে না’—বলছিলেন চুয়াডাঙ্গার সেলিম উদ্দিন। একই গ্রামের রফিকসহ তিনি ভাগ্য বদলের জন্য মালয়েশিয়ায় যেতে দালালদের হাত ধরে ঘর ছাড়েন। এখন ঠাঁই হয়েছে সংখলা প্রদেশের রাত্তফোম জেলার বন্দিশালায়। ৯ মে থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে আরও অনেকের সঙ্গে এঁদের উদ্ধার করে সেখানকার পুলিশ।
এ প্রতিবেদক গত এক সপ্তাহে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের বিভিন্ন বন্দিশালায় থাকা অন্তত ৫০ জন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছেন। ফোনে কথা হয়েছে থাই জঙ্গল থেকে মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফেরা কয়েকজনের সঙ্গেও। বেশির ভাগ মানুষেরই দাবি, তাঁরা ঘর ছেড়েছেন অভাব আর বেকারত্ব ঘোচাতে। কেউ কেউ ভালো উপার্জনের প্রলোভনে পড়ে বা প্রতারণার শিকার হয়েও পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েছেন।
আর এর সুযোগ নিয়েছে মানব পাচারকারীরা। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া—এই চার দেশের চক্র মিলে গড়ে উঠেছে মুক্তিপণ-বাণিজ্য।
তবে সবার সমুদ্রযাত্রার কাহিনি এক নয়। তিন ধরনের ঘটনা শোনা গেছে থাই বন্দিশালায় আটক ভুক্তভোগীদের মুখে। এক. কেউ এসেছেন স্বেচ্ছায় দালাল ধরে আগাম টাকা দিয়ে। তারপর তাঁদের থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আটকে, নির্যাতন করে দেশে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। দুই. আগাম কোনো টাকা লাগবে না বলে দালাল চক্র মিথ্যা আশ্বাস ও প্রলোভনে ফেলে অনেককে নিয়ে আসে। তিন. জোর করে ও জাহাজে চাকরি দেওয়ার কথা বলে নৌকায় তুলে দেওয়ার ঘটনাও আছে। তবে এটা বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে কম।
সিরাজগঞ্জের রায়হান বেকারত্ব ঘোচাতে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য নিজেই দালাল ধরেন। জমি বিক্রি করে দালালকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। ‘আমরা জানি বিদেশি জাহাজে যাব। সেখানে ফাইভ স্টার হোটেলের মতো রুম। গদির বিছানা। আর মালয়েশিয়া গেলেই চাকরি। কিন্তু এসে দেখি তিনতলা কাঠের বড় নৌকা। কিছু বলার উপায় নেই। শুরু হলো সমুদ্রের বুকে বন্দিজীবন, এরপর থাইল্যান্ডের জঙ্গলে। আবার বন্দী, খাবার নাই, পানি নাই, গোসল নাই, টাকার জন্য মারধর...বলে শেষ করা যাবে না।’ বলছিলেন এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করা রায়হান।
এ বিষয়ে পত্রিকায় এত লেখালেখি, টেলিভিশনে প্রচার, কখনো দেখেননি? রায়হানের জবাব, ‘এটা দালালদের জিজ্ঞাসা করেছি। তারা বলল, সাংবাদিকেরা বানাইয়া বানাইয়া লেখে।’
জঙ্গল থেকে অনেকের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া রায়হান এখন থাইল্যান্ডের বন্দিশালায়। তাঁর মতোই গণমাধ্যমের খবরকে বিশ্বাস করেনি চুয়াডাঙ্গার রফিকও। রফিকদের সমুদ্রযাত্রার গল্প ভিন্ন। তাঁদের দালাল বলেছে, আগাম কোনো টাকা লাগবে না। মালয়েশিয়া পৌঁছে টাকা দিলে হবে।
কিংবা রোজগার করে কিস্তিতেও দিতে পারবে। রফিকের মতো সম্প্রতি যাঁরা থাইল্যান্ডে পাচারকারীদের ক্যাম্প থেকে উদ্ধার হয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই এ প্রলোভন বা প্রতারণার ফাঁদে পড়া বলে জানা গেছে।
মুক্তিপণ দিয়ে সম্প্রতি দেশে ফেরা নূর নবী জানালেন, তাঁকে জোর করে তুলে নিয়েছে দালালেরা। সেটা কীভাবে সম্ভব? নুর নবী বলেন, তাঁরা তিন বন্ধু কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের ছবি তুলে জীবিকা নির্বাহ করেন। অপর দুজন হলেন ফেনীর রফিক ও চট্টগ্রামের মিঠু। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে টানা হরতাল-অবরোধের কারণে কক্সবাজার ছিল পর্যটকশূন্য। আয়-রোজগার ছিল না। তখন ডিসেম্বর মাস। টেকনাফের এক দালাল প্রস্তাব দেয়, মালয়েশিয়ায় অনেক কাজের সুযোগ আছে। কোনো টাকা লাগবে না। মালয়েশিয়া গিয়ে মাসে মাসে বেতন পেয়ে কিস্তিতে টাকা শোধ করলে চলবে। কিস্তির টাকা দিয়েও বাড়িতে ৫-১০ হাজার টাকা করে পাঠানো যাবে।
নূর নবীর দাবি, এতে তিনি রাজি হননি। রফিক ও মিঠু রাজি হন। দুই বন্ধুকে বিদায় জানাতে তিনি টেকনাফ পর্যন্ত যান। তখন তাঁকেও জোর করে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘এত চিৎকার করলাম, কেউ এগিয়ে এল না। বড় ট্রলারে তুলে আমাদের আটকে রাখে। সেখানে আরও অনেক রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি ছিল। তিন দিন পর ট্রলার ছাড়ে। আট দিন, আট রাত পর ট্রলারটি থাইল্যান্ডে পৌঁছায়। এরপর পায়ে হেঁটে ও গাড়িতে তাঁদের নেওয়া হয় মালয়েশিয়ার সীমানায় বাদাম বেসার জঙ্গলে।
নূর নবী জানান, তত দিনে ক্ষুধা, পিপাসায় তাঁরা সবাই ক্লান্ত, তার ওপর মারধর। এরপর দালালেরা থাই ফোন দিয়ে দেশে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয় নূর নবীকে। মুক্তিপণ চায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ভাই গ্রামে জমি বেচে দালালদের টাকা পাঠান। এরপর নির্যাতন থামলেও মুক্তি মেলেনি। একদিন পুলিশ এসে ক্যাম্প থেকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর জেল খেটে দেশে ফেরা। সেটা আরেক বেদনাদায়ক পর্ব।
কিন্তু নূর নবী তবু প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন। অনেকের মৃত্যু হয়েছে সাগরে, জঙ্গলে-নির্যাতন, অনাহার কিংবা অসুস্থ হয়ে। অনেকে নিখোঁজ। ১ মে এমন ৩২টি লাশের কঙ্কাল উদ্ধার এবং কয়েকটি গণকবরের সন্ধান মেলার পর থাই সরকার পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। এরপর থেকে সাগরপথে পাচারের শিকার মানুষদের ওপর বর্বরতার ঘটনাগুলো বিশ্বব্যাপী আলোচিত খবর।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডের এসব এলাকায় একাধিক সরকারি কর্মকর্তা এবং পাচারকারী চক্রগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাগর পথ চালুর পর থেকেই সংখ্যায় কম হলেও বাংলাদেশিরা আসছিল। যদিও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ছিল সাগরপথের মূল যাত্রী। ২০০৯ সাল থেকে সংখ্যা ক্রমে বাড়ছিল। ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশির সংখ্যা বেশ বাড়তে থাকে।
সংখলা প্রদেশে কোনো বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা আটক হলে দোভাষী হিসেবে ডাক পড়ে আরাকান বংশোদ্ভূত থাই নাগরিক আমিন সাইয়্যাকের। গত এক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন যাঁরা আইস্যে না, এঁরার ৭০ ভাগই বাংলাদেশের বাচ্চা ছেলে।’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের কিছু নেই। টাকা দিতে পারে না। মাসকে মাস জঙ্গলে আটকা থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশিদের কাছ থেকে দ্রুত মুক্তিপণ পাওয়া যায়। এ কারণে বাংলাদেশিদের প্রতি পাচারকারী চক্রের আগ্রহ বেশি।
২০০৯ সাল থেকে সাগরপথে মানব পাচার নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে আসছেন দক্ষিণ থাইল্যান্ডের স্থানীয় এক সাংবাদিক। তাঁর অনুমান, থাই উপকূল দিয়ে গত এক বছরে যত মানুষ পাচারের শিকার হয়েছে, তাদের অর্ধেক বাংলাদেশি। সম্প্রতি যারা এ দেশে আটক বা উদ্ধার হয়েছে, তাদের অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশি।
গত ২০ দিনে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিসংখ্যানও ওই সাংবাদিকের আন্দাজকে সমর্থন করে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আন্দামান সাগরে আটকে পড়া অবৈধ অভিবাসীদের অর্ধেকই বাংলাদেশি। তারা অর্থনৈতিক কারণেই দেশান্তরি হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ২৫ হাজার মানুষ সাগরপথে দেশ ছেড়েছেন। এদের অন্তত ৩০০ জন মারা গেছে।
এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার কথা হয় কেরাম এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়ক হারুণ অর রশিদের সঙ্গে। অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে মালয়েশিয়ায় কাজ করেন তিনি। অভিবাসী-সংক্রান্ত জাতিসংঘের এক সভায় যোগ দিতে এখন তিনি থাইল্যান্ডে। তাঁর দাবি, মালয়েশিয়ার এমন কোনো কর্নার পাবেন না, যেখানে সাগরপথে আসা বাংলাদেশি নেই।
হারুণ অর রশিদ বলেন, মুক্তিপণ দিয়ে যেসব বাংলাদেশি মালয়েশিয়া পৌঁছাতে সক্ষম হন, পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তাঁদের একটা অংশের ঠাঁই হয় এ দেশের কারাগারে, অন্যদের বেশির ভাগেরই কর্মস্থল হয় রাবার বাগান বা পাম অয়েল প্ল্যান্টেশনে। কেউ কেউ রেস্তোরাঁয় বা কারখানায় কাজ পান। কিন্তু সারাক্ষণ থাকেন পুলিশ-আতঙ্কে। কঠোর পরিশ্রম করেও কম বেতন পান।
সংখলার আমিন সাইয়্যাক জানালেন, তিনি এখানকার বন্দিশালায় পুলিশের দোভাষীর কাজ করতে গিয়ে আগে কক্সবাজার বা চট্টগ্রামের মানুষ পেতেন। গত এক বছর অনেক জেলার মানুষকে পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তঁরার দেশিত মানুষ জঙ্গলে ও আশপাশে মরে পড়ে থাকতেও দেখেছি। রোহিঙ্গা মইরছে মনে করে তঁরার সরকার খবরও নিতো না।’
অনেক দিন ধরে দেশে এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে বাংলাদেশি নামে যারা সাগরপথে যাচ্ছে, তাদের বড় অংশ এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর। কিন্তু এ প্রতিবেদক দক্ষিণ থাইল্যান্ডের পাঁচটি বন্দিশালা ঘুরে সমুদ্রপথে এসে আটক হওয়া বাংলাদেশের ১৫ জেলার মানুষের হদিস পেয়েছেন। জেলাগুলো হলো কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও কুষ্টিয়া।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশে তো মিয়ানমারের মতো জাতিগত সহিংসতা নেই। সামরিক সরকারও নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার কমনওয়েলথভুক্ত ৩৭ সাংসদের একটি প্রতিনিধিদলকে বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিবিএসের সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়ছে। গত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা হবে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। তার পরও বাংলাদেশিরা কেন রোহিঙ্গাদের কাতারে শামিল হচ্ছেন?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, রোহিঙ্গাদের পাচার হওয়া এবং বাংলাদেশিদের পাচার হওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। রোহিঙ্গারা কোনো দেশের নাগরিক না। তারা চরম কোণঠাসা হয়ে আছে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার প্রায়ই বলে, দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। শিগগিরই মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে দেশের নাগরিকেরা এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছে, তা ওই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অধ্যাপক ইমতিয়াজ মনে করেন, সমুদ্রপথে মানব পাচারের ঘটনায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি খারাপ হতে বাধ্য।

Friday, May 22, 2015

চার ঘাটে বিক্রি বাংলাদেশিরা by টিপু সুলতান

দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশিরা ঘাটে ঘাটে চার দফা বিক্রি হন। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে এর শুরু। আর শেষ ঘাট হলো মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী থাইল্যান্ডের জঙ্গল।
ভুক্তভোগীরা জানান, শেষ ধাপ হলো সবচেয়ে জঘন্য ও কষ্টের। মুক্তিপণ দিতে না পারলে এখানেই জীবনের শেষ।
জঙ্গল ক্যাম্প’ নামে পরিচিতি পাওয়া শেষ ধাপ থেকে বিভিন্ন সময়ে মুক্তি পাওয়া ও উদ্ধার হওয়া অনেক বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা এখন থাইল্যান্ডের বন্দিশালায় আছেন। এমন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী এবং পাচারকারী চক্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সংখলা প্রদেশের স্থানীয় বাসিন্দা এবং ধরা পড়া দালালদের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে দোভাষীর কাজ করা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে পাচারের রুট, ঘাটে ঘাটে হাতবদল ও মানুষ বেচাকেনার চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রথম ঘাট: বাংলাদেশিদের পাচারের ক্ষেত্রে প্রথম ঘাট হলো কক্সবাজারের টেকনাফ। বিভিন্ন এলাকা থেকে মাঠপর্যায়ের দালালেরা লোকজন এনে টেকনাফের ছোট ইঞ্জিন নৌকায় তুলে দেন। জনপ্রতি দালালেরা পান ১০ হাজার টাকা। টেকনাফ উপকূল থেকে ছোট নৌকায় এসব লোকেক নেওয়া হয় সমুদ্রে থাকা বড় ইঞ্জিন নৌকায়। মাছ ধরা ট্রলার বা ট্রলারের আদলে কাঠের তৈরি এসব বড় নৌকাকে পাচারকারীরা বলে ‘শিপ’ বা জাহাজ।
এসব জাহাজ বা বড় নৌকা যদি বাংলাদেশ জলসীমার কাছাকাছি থাকে, তাহলে টেকনাফের ছোট নৌকাগুলো ৪–৬ ঘণ্টা চলার পর সেখানে পৌঁছায়। আর যদি বাংলাদেশের জলসীমার বাইরে থাকে, তাহলে এক দিন এক রাত চলতে হয়। একেকটি ছোট নৌকায় ১০–১৫ জন করে নেওয়া হয়। এ সময় মানুষগুলোকে নৌকায় শুইয়ে রেখে গায়ের ওপর মাছ ধরার জাল বিছিয়ে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ধাপ: বড় নৌকায় তুলে দিলে ছোট নৌকার মালিকেরা জনপ্রতি পান ১০ হাজার থাই বাথের সমান ২৫ হাজার টাকা। একইভাবে মিয়ানমারের দালালেরা আরাকান উপকূল থেকে ছোট নৌকায় রোহিঙ্গাদের এনে বড় নৌকায় বিক্রি করে মিয়ানমারের মুদ্রায় দুই লাখ কিয়াত (বাংলাদেশি ১৪ হাজার টাকার সমান)।
বড় নৌকায় ৩০০ থেকে ৫০০ জন পর্যন্ত লোক নেওয়া হয়। ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত বড় নৌকা ছাড়ে না। এ জন্য এক থেকে দুই মাসও অপেক্ষা করা হয়।
পাচারকারীদের-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এই দীর্ঘ সময় বড় নৌকাগুলো থাকে মিয়ানমারের জলসীমায় সে দেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করে। এ জন্য নৌকাপ্রতি মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে দিতে হয় ওই দেশি মুদ্রায় তিন লাখ কিয়াত (বাংলাদেশি ২১ হাজার টাকার সমান)। ১৫ দিন রাখার জন্য এ টাকা দেওয়া হলেও নৌকাগুলো সাধারণত দুই মাস পর্যন্ত রাখে।
একবার বড় নৌকায় উঠে গেলে আর ফেরার সুযোগ নেই। সেখানে অনেকটা বন্দিদশায় থাকেন সবাই। গাদাগাদি করে রাখা হয়। খাবার দেওয়া হয় সামান্য ভাত ও মরিচ। পানিও অপর্যাপ্ত। কেউ অসুস্থ হলে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সংখলার ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকা আরাকানের জাফর আহমদ বললেন, তাঁদের নৌকা থেকে অসুস্থ দুজনকে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
নৌকায় পাহারায় থাকে সশস্ত্র পাহারাদার। সংখ্যায় পাঁচ-ছয়জন। কারও কারও হাতে অস্ত্রও থাকে। কেউ কোনো বিষয়ে বাগ্বিতণ্ডা করলে প্রহরীরা মেরে সাগরে ফেলে দেয়।
এ ধরনের চক্রের সঙ্গে কিছুদিন কাজ করেছেন এবং এখন সংখলার পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করছেন—এমন একজন রোহিঙ্গা এই প্রতিবেদককে বলেন, চার-পাঁচজন লোক দিয়ে চার-পাঁচ শ লোককে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। এ জন্য প্রত্যেক নৌকায় শুরুতেই এক-দুজনকে হত্যা করে সবার মধ্যে আতঙ্ক ধরিয়ে দেওয়া হয়।
একেকটি নৌকায় বিভিন্ন চক্রের পাঠানো মানুষ থাকে। নৌকায় সংশ্লিষ্ট চক্রের একজন করে প্রতিনিধি থাকে। তারা নৌকায় তুলেই এক দফা নির্যাতন করে এসব মানুষকে দিয়ে দেশে স্বজনদের ফোন করায় এবং টাকা দাবি করে।
তৃতীয় ধাপ: নৌকা পূর্ণ হওয়ার পর সেটি যাত্রা শুরু করে। টানা সাত দিন, সাত রাত চলার পর থাইল্যান্ডের উপকূলে পৌঁছায়। সেখানে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থামে। এরপর ছোট নৌকায় করে স্থলভূমিতে তোলা হয়।
থাই উপকূলে বড় জাহাজ থেকে এসব মানুষকে বিক্রি করা হয় এখানকার চক্রের কাছে। পাচারকারীদের ভাষায় ‘এজেন্টের’ কাছে। এজেন্টরা জনপ্রতি ১৫ হাজার বাথ পরিশোধ করে বড় নৌকাকে।
এই এজেন্টদের ব্যবস্থাপনায় সবাইকে স্থলভাগে তোলা হয়। বেশির ভাগ সময় দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংখলার রাত্তফুম, সতুন, রেনং ও ফুকেটের পাঙ্না উপকূলের পাহাড় বা জঙ্গল এলাকা দিয়ে পাচার করা মানুষদের তোলা হয়। এর বাইরে রেইয়ং উপকূলও পাচারকারী চক্র রুট হিসেবে ব্যবহার করেছে, তবে সেটা অনেক কম।
এর মধ্যে ছোট নৌকায় যদি সতুন উপকূলে তোলা হয়, তারপর দুই ঘণ্টা হেঁটে রাস্তা পাওয়া যায়। সেখানে পিকআপ ভ্যান থাকে। তাতে করে মানুষগুলোকে নেওয়া হয় কোয়ানডন নামক সংখলা প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায়। এটা দুই ঘণ্টার যাত্রা। এরপর এক দিন এক রাত হাঁটিয়ে নেওয়া হয় মালয়েশিয়ার সীমান্তের খুব কাছে বাদাম বেসার জঙ্গলে পাচারকারীদের ক্যাম্পে।
রাত্তাফুম দিয়ে তুললে গাড়িতে প্রায় চার ঘণ্টার যাত্রায় পৌঁছানো হয় কোয়ানডন জঙ্গলে। এরপর এক দিন এক রাত হাঁটা পথ।
রেনং উপকূলে উঠলে দুই থেকে চার ঘণ্টা হাঁটতে হয়। তারপর রাস্তা মেলে। সেখানে আগে থেকে গাড়ি থাকে। ওই সব গাড়িতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা চলার পর বাদাম বেসার পৌঁছায়। সড়কপথে পুরো পথ এসব লোককে পিকআপ ভ্যানের পেছনে শুইয়ে রাখা হয়। আর পাঙ্না নামলে প্রথমে সাগর তীর থেকে দুই থেকে চার ঘণ্টা হাঁটতে হয়। তারপর গাড়িতে আট ঘণ্টা চড়ে বাদাম বেসার।
চতুর্থ ধাপ: এজেন্টরা বড় নৌকা থেকে এসব মানুষকে এনে বাদাম বেসার জঙ্গল ক্যাম্পে জনপ্রতি ২৩ হাজার বাথ (এক বাথ বাংলাদেশি প্রায় আড়াই টাকা) বিক্রি করে। এখানে যারা ক্রেতা, এরাই মূল চক্র। পাচারকারীদের ভাষায় ‘মাফিয়া’। মাফিয়ার সংখ্যা বেশি নয়। এরা বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের। এই মাফিয়ারাই মিলেমিশে বড় নৌকা ভাড়া করে পাঠায়। তাদের অধীন মাঝারি, ছোট ও মাঠপর্যায়ের দালালেরা চারটি পর্যায়ে কাজ করে।
জঙ্গলে স্থাপন করা ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা আলাদা। ক্যাম্পে রাখার জন্য দিতে হয় জনপ্রতি ১০ হাজার বাথ। এ টাকায় থাকা, পাহারা, খাবার দেওয়া ও মালয়েশিয়া সীমান্ত পার করে ক্যাম্প পরিচালনাকারীরা। একজন ব্যক্তি এক দিন থাকুক আর এক বছর থাকুক ভাড়া ১০ হাজার বাথ।
একেকটি ক্যাম্পে কয়েকজন মাফিয়ার কেনা মানুষ থাকে। সঙ্গে প্রত্যেক মাফিয়ার একজন বা দুজন প্রতিনিধি থাকে। এদের কাজ হলো নির্যাতন করে ফোনে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলিয়ে মুক্তিপণ আদায় করা।
এর মধ্যে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ন্যূনতম ৬০ হাজার বাথ সমপরিমাণ আর বাংলাদেশিদের কাছ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে। এ ক্ষেত্রে মাফিয়াদের প্রতিনিধিরা কেনা মানুষদের মারধর করে। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত মুক্তি নেই।
কেউ মরলেও দালালের লোকসান নেই: পুলিশের সোর্স ও বাদাম বেসারের বাসিন্দা পাচারকারী চক্রের সাবেক ওই সদস্য বললেন, ক্যাম্প থেকে কেউ পালালে বা পুলিশের হাতে আটক হলে লোকসান হয়। কিন্তু মারা গেলে লোকসান নেই। কারণ, কেউ মারা গেলে ওই ব্যক্তি বাবদ ক্যাম্পের ভাড়া দিতে হবে না।
এ কারণে আমৃত্যু জঙ্গল ক্যাম্পে রাখা হয়। তবে জঙ্গল ক্যাম্প সব সময় এক জায়গায় থাকে না। মাঝে মাঝে সরানো হয়। অনেকটা ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্প। ক্যাম্পগুলো মূলত মোটা পলিথিনের চাল আর খুঁটি দিয়ে চারপাশে কাঠ বা বাঁশ দিয়ে খুপরির মতো তৈরি। কোনো কোনো ক্যাম্পে শুধু পলিথিনের চাল দেওয়া। ক্যাম্পে একই ব্যক্তিদের সব সময় একসঙ্গে রাখা হয় না। বিভিন্ন ক্যাম্পে অদলবদল করা হয়। নারীদের রাখা হয় পৃথক ক্যাম্পে।
এসব ক্যাম্পে নির্যাতনে কিংবা অনাহার-অর্ধাহারে অনেকে মারা যান। অনেকে হাঁটতে পারেন না। তাঁদের এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে লুঙ্গিতে বসিয়ে চার কোনায় চারজন ধরে বহন করা হয়। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ব্যাংকক কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা এমন অনেককে পেয়েছেন, যাঁরা হাঁটতে পারেন না। এরা মূলত ভিটামিন বি-এর অভাবে বেরি বেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে এ দশা হয়েছে। অনেকে মারা গেছেন জ্বরে।
কথা হয় সংখলার বন্দিশালায় থাকা কিশোরগঞ্জের সবুজ নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ক্যাম্পে খাবার বলতে দুই বেলা পলিথিনে দুই মুঠো সাদা ভাত ও শসা। সঙ্গে বড়জোর মরিচ। সারা দিনে দুই বেলা এক গ্লাস পরিমাণে পানি দেওয়া হয়। হাত ধোয়া, মুখ ধোয়া, কুলি করার সুযোগ নেই। শৌচকর্মের জন্য জঙ্গলে এক জায়গায় গর্ত করে প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা দেওয়া। মাটির ঢিলা হচ্ছে পরিষ্কার হওয়ার সম্বল। আর মারধর তো আছেই। রাত হলে মেয়েদের ক্যাম্প থেকে চিৎকার শোনা যেত।
সবুজ বলেন, ‘মুখে বলে বোঝাতে পারব নারে ভাই, এটা একটা দোজখ, দুনিয়ার দোজখখানা।’
চার ধাপেই পৃথক ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দালালের মাধ্যমে লোক সংগ্রহ থেকে শুরু করে চার ধাপে মানুষ কেনাবেচা, জলে-স্থলে পরিবহন, মালয়েশিয়ায় পাঠানো—সবই পৃথক ব্যবস্থাপনায় হলেও সব পর্যায়ে মাফিয়াদের অংশীদারি আছে। সব পর্যায়ের লাভের টাকার ভাগ তাদের কাছে আসে। যেমন জঙ্গল ক্যাম্প পরিচালনা করে থাই মাফিয়ারা, তাদের সঙ্গে ক্যাম্পে অংশীদারি আছে বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের মাফিয়াদের। আবার বড় নৌকা ভাড়া করা, থাইল্যান্ডের উপকূলে এনে ছোট নৌকায় বিক্রি—সব ক্ষেত্রেই সবার অংশীদারি আছে। উদ্ধার হওয়া আরাকানের লোকদের ত্রাণ সাহায্যে নিয়োজিত রোহিঙ্গা সোসাইটি ইন থাইল্যান্ডের সভাপতি মো. আনোয়ারের মতে, অনেকটা গ্রুপ অব কোম্পানিজের মতো চলছে এ নেটওয়ার্ক।