ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কি জাতিসংঘকে অকার্যকর করার নীলনকশা?

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বোর্ড অব পিস’ ক্রমেই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসছে। শুরুতে গাজা উপত্যকায় শান্তি ও পুনর্গঠন তদারকির লক্ষ্যে এই সংস্থার কথা বলা হলেও, সর্বশেষ প্রকাশিত সনদে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কোনো উল্লেখই নেই। এতে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে- এই বোর্ড কি আদতে জাতিসংঘকে দুর্বল বা অকার্যকর করার একটি পরিকল্পনা?

ডয়চে ভেলের এক খবরে বলা হচ্ছে, গত বছরের নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৮০৩-এর মাধ্যমে গাজা সংকটে সীমিত ভূমিকার অনুমোদন পেলেও, আইন বিশেষজ্ঞরা তখনই সতর্ক করেছিলেন যে এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ট্রাম্প বোর্ড অব পিসকে একটি বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে চান, যা জাতিসংঘের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
বোর্ড অব পিসের সনদ অনুযায়ী, এই সংস্থার লক্ষ্য হলো বিশ্বের সংঘাতপীড়িত বা সংঘাত-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ‘স্থিতিশীলতা, কার্যকর ও বৈধ শাসনব্যবস্থা এবং স্থায়ী শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করা। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো- ডনাল্ড ট্রাম্পকে আজীবনের জন্য বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করা বা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া অপসারণযোগ্য নন। এমনকি তিনি নিজেই উত্তরসূরি মনোনীত করার ক্ষমতাও রাখেন। ফলে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সির মেয়াদ শেষ হলেও, বোর্ড অব পিস কার্যত মার্কিন প্রভাবেই থেকে যাবে।

সদস্য নির্বাচনের পূর্ণ ক্ষমতা চেয়ারম্যানের হাতে। প্রথম বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন না করলে কোনো দেশ স্থায়ী সদস্য হতে পারবে না। ইতিমধ্যে জার্মানি, কানাডা, তুরস্ক, হাঙ্গেরিসহ ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশ আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও আমন্ত্রণ বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। মধ্যপ্রাচ্যে মিশর ও জর্ডান, দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান এবং লাতিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েও আমন্ত্রণ পেয়েছে। এরমধ্যে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড অব পিসে যোগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

বোর্ডের কার্যক্রম চেয়ারম্যান-কেন্দ্রিক। সদস্য রাষ্ট্রগুলো এজেন্ডা প্রস্তাব ও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও, সব সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে চেয়ারম্যানের অনুমোদন প্রয়োজন। এমনকি সদস্য বহিষ্কারের ক্ষমতাও তার হাতে, যা কেবল দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে আটকে দেয়া সম্ভব।
ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে যুক্ত করার খবরে বিতর্ক তৈরি হলেও, সনদ অনুযায়ী তারা ভোটাধিকারপ্রাপ্ত সদস্য নন। তারা বিভিন্ন উপকমিটিতে দায়িত্ব পালন করবেন।

জাতিসংঘের বিকল্প নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী?
বোর্ড অব পিসের সনদের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান ও প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার সাহস প্রয়োজন। জাতিসংঘের নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমালোচনা বিবেচনায় এটি জাতিসংঘকেই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এলিয়াভ লিবলিখের মতে, এই সনদ জাতিসংঘের প্রতি অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ। তার ভাষায়, বোর্ড অব পিস যদি তার মূল ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে কাজ শুরু করে, তবে তা সরাসরি জাতিসংঘের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামবে। অনেক দেশ এতে যোগ দিলে জাতিসংঘের ভূমিকা সত্যিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার নতুন উদ্যোগ নাকি জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র তৈরির চেষ্টা- এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এর কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে, তা নিশ্চিত।

mzamin

No comments

Powered by Blogger.