Sunday, July 13, 2025
‘জালিবি’ অভিনেত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু, ময়নাতদন্তে উঠে এল ভয়াবহ চিত্র
বাড়িওয়ালার অভিযোগেই খোঁজ মেলে
পাকিস্তানের গণমাধ্যম জিও নিউজ জানায়, হুমাইরার মরদেহ করাচির অভিজাত এক অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করে পুলিশ ও আদালতের নিযুক্ত প্রতিনিধি। ফ্ল্যাট খালি করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ভেতরে পড়ে আছে একটি সম্পূর্ণ পচে যাওয়া দেহ। এ ঘটনায় শোক ও বিস্ময় ছড়িয়েছে পাকিস্তানের বিনোদন অঙ্গনে।
পুলিশ জানায়, বাড়িওয়ালার অভিযোগ ছিল—হুমাইরা কয়েক মাস ধরে ভাড়া দেননি এবং যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই আদালতের আদেশে ফ্ল্যাটে ঢুকে তারা মরদেহ খুঁজে পায়। যদিও শুরুতে খবর ছড়িয়েছিল, নিয়মিত ভাড়া দিতেন অভিনেত্রী।
মরদেহের ভয়াবহ অবস্থা
ময়নাতদন্তে বলা হয়েছে, হুমাইরার দেহ ছিল ‘অগ্রসর পচনের স্তরে’। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানান, শরীরের প্রধান অঙ্গগুলো ছিল অচেনা রূপে এবং মুখমণ্ডলের কোনো বৈশিষ্ট্য বোঝার উপায় ছিল না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শরীরের বেশির ভাগ অংশে পেশি ছিল না। হাড় স্পর্শ করলেই ভেঙে যাচ্ছিল। মস্তিষ্ক পুরোপুরি পচে গিয়ে দেহের অভ্যন্তরে একটি কালো জৈব পদার্থে পরিণত হয়েছিল।’ আরও উল্লেখ করা হয়, হাড়ে কোনো ভাঙা বা ক্ষতের চিহ্ন নেই, তবে জয়েন্টের কার্টিলেজও ছিল না।
দেহের চুলে পাওয়া গেছে বাদামি রঙের পোকা। তবে ময়নাতদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে, ম্যাগট বা শুঁয়াপোকা দেখা যায়নি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, মরদেহ যে পরিবেশে পড়ে ছিল, সেটি অপেক্ষাকৃত শুকনা ছিল এবং তাপমাত্রা দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত ছিল।
মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়
দেহ এতটাই পচে গিয়েছিল যে মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। তবে ফরেনসিক পরীক্ষার পাশাপাশি ডিএনএ বিশ্লেষণ ও টক্সিকোলজি রিপোর্টের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।
শেষ ফোনকল ২০২৪ সালের অক্টোবরে
আরব নিউজকে করাচির ডিআইজি সৈয়দ আসাদ রেজা জানান, হুমাইরার মুঠোফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড অনুযায়ী সর্বশেষ কল করা হয়েছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে। প্রতিবেশীরাও জানান, শেষবার তাঁকে দেখতে পেয়েছিলেন সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে।
অক্টোবরে বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বিল না দেওয়ায়। অ্যাপার্টমেন্টে কোনো জেনারেটর বা বিকল্প বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা ছিল না। পানির পাইপ ছিল শুকনা, মরিচা পড়ে গিয়েছিল, খাবারের জারগুলোয় ছয় মাস আগে পচন ধরেছিল। ব্যালকনির একটি দরজা খোলা ছিল, যেখান দিয়ে বাতাস প্রবেশ করত।
ফ্ল্যাটে দুর্গন্ধ টের পাননি কেউ
যেহেতু ওই তলায় হুমাইরার অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়া আর কেউ থাকতেন না, তাই কেউ দুর্গন্ধ টের পাননি। যেসব প্রতিবেশী ফেব্রুয়ারিতে ফিরে আসেন, তাঁরা জানান, তখন দুর্গন্ধ থাকলেও খুব হালকা ছিল এবং তাঁরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।
পরিবার শুরুতে মরদেহ গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিল
পুলিশ শুরুতে জানায়, হুমাইরার পরিবার মরদেহ নিতে চায়নি। তবে পরে ভাই নাভিদ আসগর করাচিতে এসে আইনিপ্রক্রিয়া শেষে মরদেহ গ্রহণ করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা এখানে এসেছি, সব আইনিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ বুঝে নিয়েছি।’
নাভিদ আসগর জানান, ‘হুমাইরা সাত বছর আগে লাহোর থেকে করাচিতে চলে আসেন এবং পরিবার থেকে দূরত্ব তৈরি হয়। প্রায় দেড় বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না। এ কারণেই আমার বাবা বলেছিলেন, যদি কোনো জরুরি অবস্থা হয়, তাহলে সেখানেই দাফন করো।’
কে ছিলেন হুমাইরা আসগর?
লাহোরের মেয়ে হুমাইরা ২০১৫ সালে মিডিয়ায় পথচলা শুরু করেন। ছোট পর্দায় ‘জাস্ট ম্যারেড’, ‘এহসান ফারামোশ’, ‘গুরু’ ও ‘চল দিল মেরে’র মতো সিরিয়ালে অভিনয় করেছেন। বড় পর্দায় কাজ করেছেন ‘জালিবি’ ও ‘লাভ ভ্যাকসিন’ (২০২১) চলচ্চিত্রে।
২০২২ সালে এআরওয়াই ডিজিটালের রিয়েলিটি শো ‘তমাশা ঘর’–এ অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন। ২০২৩ সালে ‘ন্যাশনাল উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডস’–এ সেরা সম্ভাবনাময় অভিনেত্রীর পুরস্কার পান।
![]() |
| মডেল ও অভিনেত্রী হুমাইরা আসগর। ছবি: ইনস্টাগ্রাম |
Saturday, December 14, 2024
বিদায় কবি হেলাল হাফিজ (১৯৪৮-২০২৪)
কবি হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ সালের ৭ই অক্টোবর নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য কেটেছে নিজের শহরেই। ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। উত্তাল ষাটের দশক হয়ে ওঠে তার কবিতার উপকরণ। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় রচিত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি তাকে কবিখ্যাতি এনে দেয়। তার কবিতা হয়ে ওঠে মিছিলের স্লোগান।
‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ কালজয়ী কবিতার এই লাইন দুটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পরবর্তীতে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও কবিতাটি মানুষের মাঝে তুমুল সাড়া জাগায়।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কবিকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এরপর বইটির ৩৩টির বেশি সংস্করণ বেরিয়েছে। দীর্ঘসময় নিজেকে অনেকটা আড়ালে সরিয়ে নিয়েছিলেন হেলাল হাফিজ। আড়াই দশক পর ২০১২ সালে তিনি পাঠকদের জন্য আনেন দ্বিতীয় বই ‘কবিতা ৭১’। তৃতীয় এবং সর্বশেষ বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’ প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে।
কবিতায় অসামান্য অবদানের স্মারক হিসেবে হেলাল হাফিজকে ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেয়া হয়। এ ছাড়া তিনি পেয়েছেন যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (১৯৮৬), আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৭), নেত্রকোনা সাহিত্য পরিষদের কবি খালেকদাদ চৌধুরী পুরস্কার ও সম্মাননা।
মৃত্যু যেভাবে: কবি হেলাল হাফিজ রাজধানীর শাহবাগের একটি হোস্টেলে মারা যান। ওই হোস্টেলের ওয়াশরুমে পড়েছিলেন কবি হেলাল হাফিজ। তখন তার মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল। পরে বিএসএমএমইউ-তে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজাউর রহমান বলেছেন, উনাকে কয়েকজন ব্যক্তি নিয়ে আসেন মৃত অবস্থায়। উনারা পরিবারের সদস্য নন, উনার হোস্টেলের প্রতিবেশী হতে পারে। বিষয়টি আমি শাহবাগ থানার ওসিকে জানিয়েছি। এদিকে এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খলিল মনসুর বলেছেন, শাহবাগের একটি হোস্টেলে থাকতেন কবি হেলাল হাফিজ। দুপুরে তিনি হোস্টেলের একটি কমন ওয়াশরুমে যান। অনেকক্ষণ হলেও তিনি ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছিলেন না। পরে হোস্টেলের অন্য রুমের সদস্যরা ওয়াশরুমের সামনে এসে ডাকাডাকি করলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তারা বাধ্য হয়ে ওয়াশরুমের দরজা ভাঙেন। দরজা ভেঙে দেখতে পান কবি হেলাল হাফিজ ওয়াশরুমের ফ্লোরে পড়ে রয়েছেন এবং তার মাথা ফেটে অনেক রক্ত বের হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রাথমিক ধারণা স্ট্রোক বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি বাথরুমে পড়ে যান। বাথরুমের বেসিনটিও ভাঙা ছিল। আমাদের ধারণা, তিনি বেসিনের ওপর পড়ে যান। তখন বেসিন ভেঙে যায় এবং উনার মাথা ফেটে যায়।
প্রধান উপদেষ্টার শোক: কবি হেলাল হাফিজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল এক শোক বার্তায় মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দ্রোহ ও প্রেমের কবি হেলাল হাফিজের মৃত্যু বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রধান উপদেষ্টা কবির পরকালীন জীবনের শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, কবি হেলাল হাফিজ ছিলেন তারুণ্যের শক্তি এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠ। তার কালজয়ী কবিতার মতোই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ছায়া: প্রিয় কবির মৃত্যু যেন মেনে নিতে পারছেন না তার অজস্র পাঠক-ভক্ত। শোক ও ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করছেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা থেকে শুরু করে সব অঙ্গনের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পুরোটা যেন হেলাল হাফিজের কবিতা-স্মৃতির চাদরে ঢেকে গেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ফেসবুকে লিখেছেন, কবি হেলাল হাফিজ আর যৌবনের গান প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি আরও নানা রকম কবিতাও লিখেছিলেন। যেমন: ‘কথা ছিল একটি পতাকা পেলে আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা’! কিন্তু আমাদের অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা এই জুলাইতেও লিখতে হয়েছে। কবির প্রয়াণে শোক এবং শ্রদ্ধা। আগামীকাল সকাল ১১টায় বাংলা একাডেমি এবং বাদ জোহর প্রেস ক্লাবে হেলাল হাফিজের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা।

Tuesday, November 19, 2024
‘অধিনায়ক’ জাকারিয়া পিন্টুর চিরবিদায় by সামন হোসেন
তিন বছর আগে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে সংবর্ধনা দেয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ এবং পরবর্তী সময়ের নানা আক্ষেপ নিয়ে সেদিন জাকারিয়া পিন্টু বলেছিলেন, ‘আমার সৌভাগ্য যে, আজ আমরা সবাই একসঙ্গে বসেছি। এমন সৌভাগ্য আমার জীবনে বহুবার এসেছে। কাজী সালাউদ্দিনকে (তখনকার বাফুফে সাবেক সভাপতি) ধন্যবাদ, এমন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য। অনেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে আমার মাঝে-মধ্যে দেখা হয়েছে; আবার দেখাও হয়নি। আমি অধিনায়ক হিসেবে আমার যে দায়িত্ব, সেটা পালন করার চেষ্টা করেছি।’ পিন্টুর মৃত্যুর পর সেটা স্বীকার করলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। গতকাল তিনি বলেন- পিন্টু ভাই আমাদের নেতা ছিলেন। আজ আমরা আমাদের নেতাকে হারালাম।
১৯৫৭ সালে ইস্টএন্ড দিয়ে ঢাকার শীর্ষ ফুটবলে শুরু জাকারিয়া পিন্টুর। পরের বছরও একই দলে খেলেন তিনি। ১৯৫৯-৬০ কাটান ওয়ান্ডারার্সে। ১৯৬১-৭৫ পর্যন্ত সময় মোহামেডানে। ১৯৬৮-৭৫ পর্যন্ত টানা আট বছর ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। যা ঘরোয়া ফুটবলে একটি রেকর্ড। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচ হয়েছিল। সে দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রপতি একাদশের বিপক্ষে মুজিবনগর একাদশের অধিনায়কও ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। ওই বছরই একই মাঠে কলকাতার মোহনবাগানের বিপক্ষে প্রদর্শনী ম্যাচে ছিলেন বাংলাদেশের নির্বাচিত একাদশের অধিনায়ক। আসামের গুয়াহাটিতে সর্বভারতীয় লোকপ্রিয় বরদুলই কাপে ঢাকা একাদশেরও অধিনায়ক ছিলেন তিনি। ১৯৫৭ এর দিকে যখন জগন্নাথ কলেজে পড়তেন, তখনো দুই বছর কলেজটির অধিনায়ক ছিলেন। জীবনে কত ম্যাচে যে, অধিনায়কত্ব করেছেন, সেই হিসাব নিজের কাছেও ছিল না। খেলতেন স্টপার পজিশনে। তার কড়া মার্কিং পেরিয়ে স্ট্রাইকাররা বেরিয়ে যেতে পারতেন কমই। খেলোয়াড়ি জীবনের মাঝপথেই সুযোগ পেয়েছিলেন পাকিস্তান জাতীয় দলে। ১৯৬৮ সালে তুরস্কের আরসিডি কাপে পাকিস্তানের জার্সিতে খেলেছেন। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত খেলেন ইরানের ফ্রেন্ডশিপ টুর্নামেন্ট, নেপালের রাজা মাহেন্দ্র কাপসহ আরও কিছু আসরে। পাকিস্তান জাতীয় দল আলোকিত করেন মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ (অব.), প্রতাপ শংকর হাজরা গোলাম সারোয়ার টিপুরা। তবে তারা সবাই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় দলে খেলেননি। যারা পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দু’টি জাতীয় দলেই খেলেছেন, তাদের অন্যতম জাকারিয়া পিন্টু। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের গোড়াপত্তনে তার নামটি সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। শুধু ফুটবলার নন, ১৯৭৭ ও ১৯৮৭ সালে কিছুদিন মোহামেডানকে কোচিংও করান জাকারিয়া পিন্টু। ১৯৭৯ সালে ঢাকা সফরে আসা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্লাব দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জাতীয় দলের কোচ ছিলেন।
১৯৮০ সালে কুয়েতে সপ্তম এশিয়া কাপের চূড়ান্ত পর্বে ছিলেন বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার। বর্ণময় এক ফুটবল ক্যারিয়ারই। যার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৫ সালে পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৭৮ সালে। এসব নিয়ে তার ছিল অনেক গর্ব। সবার কাছ থেকে পেতেন আলাদা সম্মান। সবার কাছে ছিলেন ‘পিন্টু ভাই’, বাংলাদেশের ফুটবলে অবিস্মরণীয় এক চরিত্র। ১৯৪৩ সালের ১লা জানুয়ারি নওগাঁয় তার জন্ম। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন, চিকিৎসকও। জাকারিয়া পিন্টু তার বড় ছেলে। জীবনের সংগ্রহশালায় দেড় হাজারের বেশি মাঠ ও মাঠের বাইরের ছবি রেখে গেছেন। ঢাকার ফার্মগেটে ইন্দিরা রোডের বাসায় শো- কেসে থরে থরে ট্রফি-ছবি সাজিয়ে রেখে চিরবিদায় নিলেন ‘পিন্টু ভাই’। কিন্তু তিনি থাকবেন। দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে, ফুটবলে, বাঙালির মনে।

Saturday, October 9, 2010
আবার রাসায়নিকের আগুন, আবার লাশ
এবার দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর একটি প্রতিষ্ঠানের কারখানা ও গুদামে রাসায়নিক দ্রব্যের অগ্নিকাণ্ডে মর্মান্তিকভাবে নিহত হলো নয়জন। আবাসিক এলাকায় এ রকম রাসায়নিকের গুদাম কিংবা কারখানা অবৈধ। তার পরও এর অস্তিত্ব ছিল এবং প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জামহীনভাবেই। এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা যতটা প্রভাবশালীই হোক না কেন, পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। নিমতলী ট্র্যাজেডি সংশ্লিষ্টদের চোখ খুলে দেওয়ার কথা। প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় ও ছবি প্রকাশ করে আমরা এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তৎপর হওয়ার ব্যাপারে চেষ্টা করেছি। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো এবং আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম উচ্ছেদ করতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া বা গাফিলতির সুযোগ নেই। কেননা, এর সঙ্গে মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা সবচেয়ে জরুরি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যে জনগণের নিরাপত্তার ব্যাপারে যত্নশীল, তা তাদের কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ দিতে হবে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক মৃত্যু আমরা আর দেখতে চাই না।
আমাদের সমাজে, কি ঘরে, কি বাইরে, নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার অভাব দেখা যায়। আগুন লেগে কিছুদিন পরপর বহু মানুষ নিহত হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় প্রতিদিন মারা যায়। নিরাপত্তার ব্যাপারে সচেতনতা সবার মনে শিশু বয়সেই প্রোথিত করা দরকার এবং শিশুশিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। নিরাপত্তার মৌলিক মানদণ্ড সম্পর্কে সবার ধারণা সৃষ্টি করা গেলে আস্তে আস্তে এ অবস্থা পাল্টে যেতে থাকবে।
সমৃদ্ধি সবারই চাই, কিন্তু তা মানুষের প্রাণের বিনিময়ে নয়। অন্যের অবহেলার আগুনে এভাবে আর কত শ্রমজীবী মানুষ ভস্মীভূত হবে?
Monday, July 5, 2010
নজরুলদের নীরব মৃত্যু by মশিউল আলম
৬ জুনের পর থেকে প্রতিদিন টেলিফোনে নজরুলের খোঁজ নিয়েছি তার খালাতো ভাই জাহাঙ্গীরের কাছে। ভোলার লালমোহন থেকে আসা নজরুলের এই এক খালাতো ভাই ছাড়া ঢাকায় তার আর কেউ নেই। জাহাঙ্গীর জানাচ্ছিলেন, নজরুলের অবস্থার ক্রমেই অবনতি ঘটছে। ৯ জুন তিনি জানালেন, তাকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছে। ১০ জুন দুপুরে বার্ন ইউনিটে আবার গিয়েছিলাম; তখন আইসিইউতে নজরুলকে দেখেছি দুই চোখ বন্ধ। ঘুমাচ্ছিল সে। ১২ তারিখ বিকেল তিনটায় জাহাঙ্গীরকে ফোন করে জানতে চাই, ‘নজরুলের অবস্থা কী?’ জাহাঙ্গীর বললেন, ‘ভালো না, মারা গেছে। ডেড।’
বিস্ময় প্রকাশ করেছিলাম জাহাঙ্গীরের কাছে। তাঁর কণ্ঠে অবশ্য বিস্ময় ছিল না, তিনি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছিলেন, দিনরাত অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগে তিলে তিলে মারা যাচ্ছে তাঁর খালাতো ভাইটি, যার বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর, যার সামনে পড়ে ছিল জীবনের দীর্ঘ পথ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে যেসব পোড়া রোগী চিকিৎসা নিতে আসে, তাদের মধ্যে ১৪ শতাংশ নজরুলের মতো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট রোগী। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনা বিভিন্ন রকম। নজরুল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছিল একটি বাড়ি তৈরির কাজ করতে করতে। ভূমি থেকে লোহার রড তিনতলার ছাদে তোলার সময় ৪৪০ কেভি বিদ্যুতের লাইনের সঙ্গে রডের স্পর্শের ফলে তার পরনের জামা-লুঙ্গি তো বটেই, গায়ের চামড়াও পুড়ে গিয়েছিল। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিল সে। তাকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করিয়েছিলেন সেই বাড়ির মালিক। ৬ জুন বার্ন ইউনিটের এইচডিইউতে তার সংজ্ঞা ছিল, সে আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। তখন ধারণা করতে পারিনি, সে বাঁচবে না। কিন্তু সে সময় এইচডিইউতে কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স তপন কুমার আমাকে বলেছিলেন, নজরুলের পোড়া ৪১ শতাংশ, তাও ফ্লেম বার্ন বা আগুনে পোড়া নয়, ইলেকট্রিক বার্ন। এমন রোগীকে বাঁচানো খুব কঠিন।
তার পাঁচ দিনের মাথায় নজরুল বিদায় নিল। অকুল পাথারে ভাসিয়ে দিয়ে গেল এক বছর ১০ দিন বয়সী একটি শিশুসন্তান আর তার অসহায় মাকে। নজরুল চলে গেল নীরবে, কোনো সংবাদ শিরোনাম হলো না সে। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের শিকার জীবিত, চিকিৎসারত রোগীদের চেয়ে নজরুল অনেক অভাগা। কারণ, নিমতলীর রোগীরা কেমন আছেন সে খবর এখনো নেওয়া হচ্ছে। নজরুলের খবর কেউ নিতে যায়নি। যেসব মানুষ নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত, তাদের অনেকেই এভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। কেবল তখনই তারা সংবাদ শিরোনাম হতে পারে, যখন একসঙ্গে অনেকে দুর্ঘটনায় পড়ে প্রাণ হারায়। কিন্তু যদি সারা দেশে গড়ে দৈনিক একজন করেও মারা যায়, তাহলে এক বছরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬৫। নিমতলীর মৃতের তালিকার (এ পর্যন্ত ১২৩) চেয়ে কিন্তু ঢের লম্বা হয়ে যায় এই ভাবে মৃতদের তালিকা। কিন্তু নিমতলীর মতো দুর্ঘটনা ঘটে খুব কদাচিৎ, নজরুলের মতো নীরব মৃত্যু ঘটছে প্রতিদিন।
১৩ জুন বেলা ১১টায় বার্ন ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক সামন্তলাল সেনের সঙ্গে হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখার পর তাঁর কক্ষে বসে আলাপের একপর্যায়ে তিনি মন্তব্য করলেন, পোড়া রোগীদের চিকিৎসা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রিভেনশান—পোড়া ঠেকানো। কারণ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে, আগুনে বা এসিডে পুড়লে কেউ যদি মারা না-ও যায়, পুরোপুরি সুস্থ আর সে কখনোই হয় না। একটি অ্যালবাম খুলে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অনেক রোগীর ছবি দেখালেন, যাদের চিকিৎসা দিয়ে, অস্ত্রোপচার করে তিনি প্রাণে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু তাদের কারও হাত নেই, কারও পা নেই। আগুনে ও এসিডে পোড়া রোগীদেরও বেশির ভাগই আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায় না। সারা জীবন যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয়; কর্মক্ষমতা হারিয়ে তারা বেঁচে থাকে পরিবারের ওপর একটা বোঝার মতো।
তাই দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ডা. সামন্তলাল সেন। তিনি দেখেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের শ্রমিকেরা খালি হাতে, বিপজ্জনক উচ্চতায় উঠে প্রয়োজনীয় প্রিকশান বা সতর্কতাপূর্ণ ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করেন; এবং শুধু শ্রমিকেরা নয়, প্রকৌশলীদেরও অনেকে হাতে গ্লাভস না পরেই কাজ করেন। ডা. সেন আরও জানালেন, বিভিন্ন কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের শিকার হয়ে অনেক শ্রমিক বার্ন ইউনিটে আসেন। অর্থাৎ যেসব কারখানায় বয়লার থাকে, সেগুলোতে শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। বয়লার নির্মাণে ও ব্যবহারেও নিশ্চয়ই ত্রুটি থাকে, নইলে কেন সেগুলো বিস্ফোরিত হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু ডেকে আনবে, তাঁদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গহীন করে দেবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে মাঝেমধ্যেই বার্ন ইউনিটে যেতে হয়। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা দীর্ঘ দিন ধরে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। সেখানকার শ্রমিকেরা প্রায়ই কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে (প্রাণ না হারালে) বার্ন ইউনিটে আসেন চিকিৎসা নিতে। জাহাজভাঙা শিল্প কেবল সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে না; প্রতিবছর অনেক শ্রমিকের প্রাণহানি, অঙ্গহানি ও স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে। কারণ, সেখানেও শ্রমিকদের কাজ করতে হয় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই। সেখানকার শ্রমিকেরা বিষাক্ত পুরোনো জাহাজের লোহা কাটেন মুখে মুখোশ না পরে, হাতে গ্লাভস না পরে, খালি পায়ে, খালি গায়ে। বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের নীরব বিষক্রিয়া তো আছেই, সরবে ট্যাংকার বিস্ফোরণে একসঙ্গে অনেক শ্রমিকের প্রাণহানি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও সেখানে মাঝেমধ্যেই ঘটে।
ডা. সামন্তলাল সেন জোর দিয়ে বলেন: দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে মনোযোগী হওয়া দরকার। বাংলাদেশে যত ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পেশা রয়েছে, সেগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তা নিয়মিত মনিটর করার জন্য সরকারের একটি সংস্থা থাকা উচিত। তৈরি পোশাকশিল্পের মতো আনুষ্ঠানিক শিল্পখাত ছাড়াও অনেক পেশা রয়েছে যেগুলো ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। নজরুলের মতো নির্মাণশ্রমিকেরা বাঁশ-দড়ির সাহায্যে বহুতল ভবনের অনেক উঁচুতে উঠে দেয়াল প্লাস্টার করেন, রং লাগান। তাঁদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই নেই। এই শ্রমিকেরা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন কেবল সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে (একজন তরুণ শ্রমিকের ভাষ্য: আল্লাহ আছে, কিছু হইব না)।
নজরুলের খালাতো ভাই বাংলাদেশ বিমানে মোটর ট্রান্সপোর্ট অপারেটর হিসেবে কর্মরত জাহাঙ্গীরকে আবার যখন ফোন করি (১৫ জুন), সেদিন নজরুলের মিলাদ। তার লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে গ্রামে, ভোলার লালমোহনে। সেখানে নজরুলের মা আছেন। লাশ পাঠানোর খরচ বাবদ ১৪ হাজার টাকা দিয়েছেন নজরুল যে বাড়ি নির্মাণের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন, তার মালিক ১০২ মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার সঞ্জয় রায় বাবু। তিনি নজরুলের চিকিৎসার সময় ১৩ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর জানালেন, চিকিৎসা বাবদ মোট খরচ হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা, এ টাকা গেছে তাঁর (জাহাঙ্গীরের) নিজের পকেট থেকে। সঞ্জয় রায়ের আরও টাকা দেওয়া উচিত বলে জাহাঙ্গীর মনে করেন। সঞ্জয় রায় অবশ্য মনে করেন, দুর্ঘটনার দায় তাঁর নিয়োজিত ঠিকাদার ইউনুস মিয়ার; ক্ষতিপূরণও তাঁরই দেওয়া উচিত। কিন্তু জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, ঠিকাদার আগাগোড়াই দূরে দূরে থেকেছেন। জাহাঙ্গীর তাঁর নাগাল পাননি। আমি অনেকবার মুঠোফোনে সঞ্জয় রায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি, তাঁর নাম্বারটি বন্ধ। ইউনুস মিয়ার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে মনে হলো, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে নিয়োগকারীর জন্য বাধ্যতামূলক—এ বিষয়টি তাঁর জানাই নেই।
নজরুলের অকালমৃত্যু একটি দুর্ঘটনা বটে, কিন্তু সে দুর্ঘটনা ঘটেছে তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার ফলে। এর দায় অবশ্যই নিতে হবে বাড়ির মালিক বা তাঁর নিয়োজিত ঠিকাদারকে। আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা বাধ্য। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য-ঝুঁকি সংক্রান্ত বিধান মেনে চলার গাফিলতির কারণে শ্রমিকের মৃত্যু হলে নিয়োগকারীর চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। কিন্তু নজরুলের জন্য এখন মামলা-মোকদ্দমা করতে যাবে কে? তার চেয়েও বড় কথা, নজরুলের তরুণী স্ত্রী (২২) ও দুধের বাচ্চাটির (এক বছর ১০ দিন) ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার হয়ে গেল, এর জবাব কী?
এবং আরও বড় জিজ্ঞাসা: সারা দেশে এভাবে প্রতিদিন কতজন নজরুল ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে মজুরি বিক্রি করতে করতে প্রাণ হারায়, কিন্তু সংবাদ শিরোনাম হয় না?
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com
Sunday, February 28, 2010
বাঘের কবলে মানুষের মৃত্যু, আমাদের দায় by খসরু চৌধুরী
বাঘের আক্রমণে মানুষ মারা যাওয়ার পর গ্রামবাসীর বাঘের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠাটা অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপার। মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হলো বাঘ মানুষ মারে এবং মৃত মানুষের মৃতদেহ খেয়েও ফেলে। এই খেয়ে ফেলাটা মানুষ কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারে না। সুন্দরবন-সংশ্লিষ্ট গ্রামাঞ্চলে বাঘের আক্রমণে যত মানুষ মারা পড়ে তার চেয়ে তিন গুণ বেশি মানুষ মারা যায় সাপের কামড়ে। অথচ মানুষ সাপের ব্যাপারে উদাসীন। প্রসঙ্গত, প্রাক বর্ষা, বর্ষা ও উত্তর বর্ষায় সারা দেশে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ সাপের দংশনে মারা যায়।
এবার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে আসছি। সুন্দরবনের লোকালয়গুলোর বিরাট সংখ্যক মানুষ জীবিকার জন্য বনে ঢোকে। ইদানীং, বিশেষ করে এ বছর আইলাবিধ্বস্ত মানুষজন সুন্দরবনে বেশি ঢুকছে। এদের বেশির ভাগই বেপাশী—বন বিভাগের রাজস্ব না দিয়ে, অনুমতি না নিয়েই বনে ঢুকছে নিতান্তই পেটের দায়ে।
বাঘের মানুষ মারার প্রধান কারণ স্বাভাবিক শিকারের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। একটি স্বাভাবিক বাঘের যেটা নিয়ন্ত্রণ এলাকা, সেটাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে নেয় মানুষমারা বাঘ। স্থানিক বাঘের সঙ্গে তার সংঘাত হয় না, কারণ স্বাভাবিক বাঘ যেখানে দিনের বেলা বিশ্রামে কাটায়, মানুষমারা বাঘ সেখানে মানুষের কর্ম এলাকার খোঁজে বের হয় দিনের বেলায়।
আমি দুটি মানুষমারা বাঘের মানুষ মারা শুরু হতে বাঘগুলো মারা যাওয়া পর্যন্ত সময়কালের খোঁজ রেখেছিলাম। এদের মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জের মরা পশরের বাঘটির মানুষ খাওয়ার ক্যারিয়ার ছিল আড়াই বছরের। এটির মানুষ মারার কর্ম এলাকা বিস্তৃত ছিল বাংলাদেশ সুন্দরবনের প্রায় ১৬ ভাগের এক ভাগ এলাকা। এটি শিকারির হাতে মারা পড়ে ২৯ জন মানুষ মারার পর। অন্য বাঘটিও চাঁদপাই এলাকার, এর কর্ম এলাকা ছিল সুন্দরবনের এক-অষ্টমাংশ এলাকা। চার বছরে এক বাওয়ালির কুঠারের আঘাতে বাঘটির মৃত্যু হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ মেরেছিল ৫৪ জন।
বর্তমান সময়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের কলগাছিয়া এলাকায় গত বছরের মধ্য অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত আটজন মানুষ বাঘের আক্রমণে মারা গেছে। তিনজন কোনো রকমে বেঁচে এসেছে। এ বছর ওই সব এলাকায় গোল ও গরানের ঘের পড়েছে। ওখানে কয়টি বাঘ মানুষ মেরেছে তা ঠিক জানি না। বাঘ ওখানে মানুষ মারা শুরু করেছিল গত বছরের শেষের দিকে। নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কুয়াশার আবডালে বাঘ প্রধানত গরান গোলের কুপে হানা দিত। কুয়াশা সরে যাওয়ায় এখন অন্যান্য বনচারীর ওপর হামলে পড়ছে।
কোনো এলাকায় একটি বাঘ যখন মানুষখেকো হয়ে পড়ে, তখন বাঘটি যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে আতঙ্ক ছড়ায় এর কয়েক গুণ। উপদ্রুত এলাকার মানুষ নিজের ছায়াকেও ভয় পেতে শুরু করে।
সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল সম্পূর্ণ সরকারের অধীনে। বন বিভাগ এর দেখভালের দায়িত্বে আছে। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে যখন কোনো মানুষ রাজস্ব দিয়ে, অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করে তখন তার নিরাপত্তার দায় সরকার তথা বন বিভাগের ওপর। দুর্ঘটনা ঘটে গেলে দুর্গত পরিবারটিকে আর্থিক সাহায্য করাও নীতিগতভাবে বন বিভাগের ওপর বর্তায়। অথচ লজ্জাকর এবং দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য বন বিভাগের হাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। রাজস্ব দিয়ে বাঘের হাতে মারা পড়া মানুষের সাধারণ দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয় বন কর্মচারীদের সহায়তায়।
লাশ বন অফিসে এনে মৃত্যুর সার্টিফিকেট নিতে হয় বন অফিস থেকে। আমি দেখেছি, সাহায্য করতে না পারা অসহায় বন কর্মীরা অনেক সময় নিজেদের পকেটের সামান্য অর্থ দিয়ে সাহায্য করে দুর্গত পরিবারগুলোকে, যাতে অন্তত দেহাবশিষ্টের কবর দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। বাঘের কবলে মানুষ মারা পড়ার বিষয়টি হেলথ হ্যাজার্ডের অংশ। পৃথিবীর কোনো সভ্য, বন-সংরক্ষণকামী বননীতি এটা হতে পারে না। সরকারকে ব্যাপারটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। এলাকার লোকজন খ্যাপিয়ে বাঘ রক্ষা হবে না। এলাকাবাসীর জন্য অন্তত সান্ত্বনার হাত বাড়ানো দরকার এখনই।
খসরু চৌধুরী: বন বিশেষজ্ঞ।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1782)
-
▼
August
(329)
-
▼
Aug 30
(14)
- লেবাননে সমৃদ্ধ ইতিহাসের নতুন তথ্য, মিলছে হাজার বছর...
- আরব বিশ্বে বাড়ছে খাদ্য ও পানির সংকট, মরুকরণে ব্যাহ...
- তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে চাপে নেতানিয়াহু
- ইরান যুদ্ধে অস্ত্রের মজুত ‘সংকটজনক’, চীন-রাশিয়া মো...
- নিষেধাজ্ঞায় কি নত হবে ইরান, ট্রাম্পের সামনে বড় প্রশ্ন
- ব্যাগে ছয় দেশের পাসপোর্ট, বেনজীর এখন সেন্ট লুসিয়ায়...
- ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ এখন রড-সিমেন্টের কারবারি by নাজমু...
- ইরানের হুমকি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরলেন নে...
- পশ্চিম তীরের গ্রামের একমাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দিল...
- ইরান যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে...
- কেন লোকচক্ষুর আড়ালে ব্যারন ট্রাম্প
- ক্যানসারের চিকিৎসার মধ্যেই সিনেমার কাজ, কঠিন লড়াইয়...
- কিয়েভের কাছে গোলাবারুদের গুদামে রাশিয়ার হামলা, নিহ...
- কলকাতার মুসলিম কলোনিতে এক মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ...
-
▼
Aug 30
(14)
-
▼
August
(329)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
