Showing posts with label খেলা. Show all posts
Showing posts with label খেলা. Show all posts

Tuesday, July 21, 2026

আগামীর কিংবদন্তি লামিনে ইয়ামাল by নজরুল ইসলাম

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন ১৯ বছর বয়সি স্প্যানিশ তরুণ লামিনে ইয়ামাল অশ্রুসিক্ত লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন ফুটবল বিশ্ব এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো। এটি কেবল সান্ত্বনার কোলাকুলি ছিল না, বরং ছিল বিশ্বফুটবলের রাজদণ্ড এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরের প্রতীক।

নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক যখন ৩৯ বছর বয়সি মেসির নাম ধরে চিৎকার করছিলেন, তখন হয়তো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ক তার শেষ বিশ্বকাপ মঞ্চকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। আর ঠিক সে মুহূর্তে বার্সেলোনার বর্তমান ১০ নম্বর জার্সিধারী ইয়ামাল জড়িয়ে ধরলেন ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে কিংবদন্তি ১০ নম্বরকে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের র‍্যাফেলের অংশ হিসেবে ২০ বছর বয়সি মেসির কোলে থাকা ছয় মাসের শিশু ইয়ামালের সেই ভাইরাল ছবিটির বৃত্ত যেন আজ সম্পূর্ণ হলো। সেই শিশুটিই আজ বিশ্বজয়ী পুরুষ।

দুবছর আগে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেনের ইউরো জয়ের নায়ক ইয়ামাল এবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে একপ্রকার ‘পূর্ণতা’ দিলেন। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে টুর্নামেন্টে খেলতে আসা এই তরুণ মাত্র ১৯ বছর ছয়দিন বয়সে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একইসঙ্গে বিশ্বকাপ ও ইউরো জয়ের অনন্য কীর্তি গড়লেন।

ফাইনালের মঞ্চে ইয়ামালের উপস্থিতি ছিল স্পেনের নিখুঁত ও নান্দনিক কৌশলের মূল ভিত্তি। বিপরীতে আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ও শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। স্পেনের হয়ে খেলা ২৮টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের একটিতেও হারেননি ইয়ামাল। তাছাড়া বড় টুর্নামেন্টে মূল একাদশে থেকে টানা ১৩ ম্যাচ জেতার রেকর্ড গড়েছেন, যা ইউরোপীয় ফুটবলে আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই। পেলে (১৯৫৮), জিউসেপ্পে বার্গোমি (১৯৮২) এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের (২০১৮) পর ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম তরুণ হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মূল একাদশে খেলে শিরোপা জেতার গৌরব অর্জন করলেন ইয়ামাল ও তার সতীর্থ পাউ কুবার্সি।

আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোসহ প্রতিপক্ষের চরম শারীরিক ও মানসিক চাপ উড়িয়ে দিয়ে মাঠে শান্ত ছিলেন ইয়ামাল। তার এই পরিপক্বতা দেখে ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক ও বিবিসি স্পোর্টসের পণ্ডিত জো হার্ট বলেন, ‘লামিনে ইয়ামাল কেবল প্রতিক্রিয়াই দেখায়নি, সে বুক চিতিয়ে লড়েছে। পুরো দল তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শান্ত ছিল সে। ১৯ বছর বয়সেই সে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েদিল।’

অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে স্পেনের নতুন এই সোনালি অধ্যায় লেখা হয়েছে। ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ইয়ামালের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘ও দারুণ ফুটবল খেলেছে, যা তাকে আরো পরিপক্ব হতে সাহায্য করবে। দলের জন্য ও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে।’

রদ্রিগোর মতো অভিজ্ঞ অধিনায়কের ছায়ায় এবং নিজের অবিশ্বাস্য প্রতিভায় ভর করে ১৯ বছর বয়সেই ইয়ামাল বিশ্বজয় করেছে। ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে দাঁড়িয়ে থাকা এই তরুণের সামনে যে আরো কত সাফল্য অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলে দেবে।

আগামীর কিংবদন্তি লামিনে ইয়ামাল
বিশ্বকাপ শিরোপা হাতে লামিনে ইয়ামাল

Monday, July 20, 2026

স্পেনের জয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী মানুষকে আনন্দিত করেছে, বলল ইরান

বিশ্বকাপে স্পেনের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ে দেশটিকে অভিনন্দন জানিয়েছে ইরান। সোমবার এক বিবৃতিতে তেহরান জানায়, স্পেনের এই জয় বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্বাধীনতাকামী মানুষকে আনন্দিত করেছে।

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর নিন্দা ও ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতের সমালোচনা করায় সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল সমর্থন কুড়ায় স্পেন সরকার ও তাদের জাতীয় ফুটবল দল। কয়েক মাস ধরেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ছিল দেশটি।

আরেক দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রকাশ্যে ইসরায়েলের নীতিগুলোকে সমর্থন করেন। আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন অনেক ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ও সমর্থকও। রোববার নিউইয়র্ক–নিউ জার্সিতে আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন।

এরপর ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের পক্ষে খেলোয়াড়দের অবস্থান এবং ইরানের প্রতি স্পেনের সমর্থন প্রমাণ করে যে স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা সেই (স্পেন) বুদ্ধিমান ও সম্মানীয় জাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।’

বাঘের গালিবাফ আরও বলেন, ‘এই জয় কেবল স্পেনের জনগণের হৃদয়কেই স্পর্শ করেনি, বরং বিশ্বের বহু স্বাধীন, সার্বভৌম ও ন্যায়বিচারকামী মানুষের হৃদয়কেও আনন্দিত করেছে।’

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও স্পেনকে সমর্থনের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আগ্রাসন, গণহত্যা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পেনের সার্বিক অবস্থান এবং তাদের জাতীয় ফুটবল দলের আচরণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও মূল্যবান ছিল।’

স্পেন তারকা লামিনে ইয়ামাল
স্পেন তারকা লামিনে ইয়ামাল। রয়টার্স

শতবর্ষের ২০৩০ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলবে ছয় দেশ

২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা নামতেই ফুটবল বিশ্বের নজর এখন ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে। কারণ, এবারের আসর শুধু নতুন চ্যাম্পিয়ন খোঁজার নয়, উদযাপন করবে বিশ্বকাপের শতবর্ষও। সেই বিশেষ উপলক্ষে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন মহাদেশের ছয়টি দেশে অনুষ্ঠিত হবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।

ফিফার অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। তবে বিশ্বকাপের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উদ্বোধনী তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। এরপর টুর্নামেন্টের বাকি অংশ ইউরোপ ও আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে ছয়টি দেশই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার ছয়টি স্বাগতিক দল সরাসরি চূড়ান্ত পর্বে খেলবে।

ফিফা জানিয়েছে, ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপ। শতবর্ষ উপলক্ষে সেই ইতিহাসকে সম্মান জানাতেই উদ্বোধনী ম্যাচ ও বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে রাজধানী মন্টেভিডিওতে।

অন্যদিকে, ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের রানার্সআপ ছিল আর্জেন্টিনা। আর দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল)-এর সদর দপ্তর হওয়ায় প্যারাগুয়েকেও শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে একটি করে ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই পরিকল্পনাকে ‘ফুটবলকে একত্রিত করার প্রতীক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপন হবে অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা, বর্তমানের উদযাপন এবং ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা।

২০৩০ বিশ্বকাপে অংশ নেবে ৪৮টি দল। ২০২৬ সালের মতোই এই আসরেও ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রথমবারের মতো তিনটি মহাদেশ—ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের নজির গড়তে যাচ্ছে ফিফা।

ফলে ২০৩০ বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে ছয় দলের অংশগ্রহণ। তারা হলো—স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। বাকি ৪২টি দল বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নেবে।

বিশ্বকাপের শতবর্ষকে ঘিরে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ইতোমধ্যেই ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ফিফার সবচেয়ে প্রতীকী আসরগুলোর একটি।

বিশ্বকাপ মাতালেন এমবাপ্পে, রদ্রি আর স্পেন; ব্যক্তিগত পুরস্কারে কার ঝুলিতে কী?
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা নেমেছে স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে। তবে দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা পারফর্মাররাও। বিশ্বকাপ শেষে ফিফা ঘোষণা করেছে বিভিন্ন ব্যক্তিগত পুরস্কার, যেখানে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখিয়েছে নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে স্পেন। সেই সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের (গোল্ডেন বল) স্বীকৃতি পান দলের মিডফিল্ডার রদ্রি। পুরো আসরজুড়ে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, বলের দখল ধরে রাখা এবং ম্যাচের গতি নির্ধারণে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন তিনি। গোল করার লড়াইয়ে আবারও সবার ওপরে ছিলেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। সেমিফাইনালে ফ্রান্স বিদায় নিলেও ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। এর সুবাদে নিজের ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জেতেন ফরাসি অধিনায়ক। স্পেনের আরেক নায়ক উনাই সিমন জিতেছেন সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার (গোল্ডেন গ্লাভস)। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা ধরে রেখে তিনি স্পেনের রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা ছিলেন। অন্যদিকে স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবারসি জিতেছেন সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের (বেস্ট ইয়াং প্লেয়ার) পুরস্কার। ফলে বিশ্বকাপের চারটি প্রধান ব্যক্তিগত পুরস্কারের মধ্যে তিনটিই জিতে নিয়েছে স্পেন। শুধু গোল্ডেন বুট গেছে ফ্রান্সের এমবাপ্পের হাতে।

Tuesday, July 14, 2026

বিশ্বকাপ ২০২৬: ইউরোপে মুসলিম ফুটবলারদের পরিচয়ই নতুন চ্যালেঞ্জ

ইউরোপে ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বহুদিনের। তবে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে এক নতুন প্রজন্মের মুসলিম ফুটবলার নিজেদের পারফরম্যান্স ও বিশ্বাসের প্রকাশের মাধ্যমে সেই প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। স্পেনের লামিন ইয়ামাল, সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারি থেকে শুরু করে কেপ ভার্দের ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলাররা দেখিয়ে দিচ্ছেন, ইসলাম ইউরোপের সমাজ ও সংস্কৃতিরই একটি বাস্তব অংশ।

বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ফলে ১৩টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইসলামি বিশ্বাসের প্রকাশ অস্বাভাবিক নয়। তবে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এমন অনেক ফুটবলার, যারা খ্রিস্টান-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

স্পেন ও বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোলের পর সিজদাহ দিয়ে উদযাপন করেন। এর আগেও মার্চে স্পেন-মিশর প্রীতি ম্যাচে তার ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে দর্শকদের একটি অংশ বিদ্বেষমূলক স্লোগান দেয়। জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়ামাল লিখেছিলেন, আমি মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ। ফুটবল মানুষের বিনোদন ও আনন্দের জন্য, কারও বিশ্বাসকে অসম্মান করার জন্য নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বেড়েছে। অথচ ইয়ামালের মতো ফুটবলারদের উপস্থিতি সেই ধারণার বিপরীত বাস্তবতাই তুলে ধরছে।

জার্মানির ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগারও ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশের কারণে বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালে রমজান উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাওহিদের প্রতীক হিসেবে তর্জনী উঁচিয়ে ছবি পোস্ট করার পর সেটিকে উগ্রবাদী সংগঠনের প্রতীক বলে দাবি করা হয়। পরে তিনি মানহানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেন।

একইভাবে, তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করে সিজদাহ দিয়ে উদযাপন করেন সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারি। তিউনিসিয়ান বংশোদ্ভূত হলেও সুইডেনের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশটিতে নতুন করে পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তবে আয়ারির বাবা আজুজ আয়ারি স্পষ্টভাবে জানান, তার সন্তানরা সুইডেনেই জন্মেছে ও বেড়ে উঠেছে, তাই সুইডেনের প্রতিনিধিত্ব করাই তাদের স্বাভাবিক অধিকার।

ইউরোপে শুধু অভিবাসী পরিবার থেকেই নয়, ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারের সংখ্যাও বাড়ছে। নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ক্লারেন্স সিডর্ফ, ফরাসি বংশোদ্ভূত ফ্রেডেরিক কানুতে এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী পল পগবার পর এবার ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জেড স্পেন্সও ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলার হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অভিষেকের মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের প্রথম মুসলিম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন। স্পেন্স বলেন, ইতিহাসের অংশ হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি এটি বিশ্বের তরুণদের অনুপ্রাণিত করবে।

অন্যদিকে, কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ দলে ইউরোপে বেড়ে ওঠা তিন ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারও বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন। জ্যামিরো মন্টেইরো, লোগান কস্তা ও স্টিভেন মোরেইরা পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের ভাষ্য, মুসলিম সতীর্থদের জীবনযাপন ও ধর্মীয় অনুশীলন কাছ থেকে দেখেই তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন।

কেপ ভার্দে দলে ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হয়। মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য নিয়মিত হালাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয় এবং দলটির মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও ঐক্য বজায় রাখা হয়। লোগান কস্তার ভাষায়, আমরা মুসলিম হই বা খ্রিস্টান, আমাদের শক্তি হলো আমরা সবাই কেপ ভার্দিয়ান।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপে মুসলিম ফুটবলারদের এই উপস্থিতি ও আত্মবিশ্বাসী পরিচয় প্রকাশ শুধু ক্রীড়াঙ্গনের নয়, ইউরোপের বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে চলমান বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

বিশ্বকাপ ২০২৬: ইউরোপে মুসলিম ফুটবলারদের পরিচয়ই নতুন চ্যালেঞ্জ

Monday, July 13, 2026

ফিফা নিরপেক্ষ নয়, এটি রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে গেছে by জাভিয়ের আবু ঈদ

বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, ততই প্রশ্নের মুখে পড়ছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং তার নেতৃত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর এক মার্কিন ফুটবলারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মিসর ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার পক্ষে রেফারিদের পক্ষপাতের অভিযোগও উঠেছে।

ফিলিস্তিনের অভিজ্ঞতা আরও দীর্ঘ এবং তিক্ত। বহু বছর ধরেই সেখানে ফিফার আচরণকে পক্ষপাতদুষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে করা হচ্ছে। অথচ ফিফার নিজস্ব সংবিধানেই স্পষ্টভাবে মানবাধিকার রক্ষার কথা বলা রয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি ফুটবলের ক্ষেত্রে সেই নীতির ধার ধারেনি সংস্থাটি।

ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বহুবার দাবি জানিয়েছে, ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে নিষিদ্ধ করা হোক। কারণ, তাদের লিগের ম্যাচগুলো এমন জমিতে খেলা হয়, যা দখল করা এবং ছিনিয়ে নেওয়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, যেখানে অবৈধ বসতিতে থাকা দলগুলো খেলায় অংশ নেয়। কিন্তু ফিফা বারবার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

শুধু তা–ই নয়, ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের ওপর গণহত্যা চালানো, তাঁদের পঙ্গু করে দেওয়া, এমনকি তাঁদের আটক করার ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধেও কোনো অবস্থান নেয়নি ফিফা। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি নারী ফুটবল দলের সদস্য র‌্যান্ড হালাওয়ানি এবং নাতালি আবু দায়্যেহকে আটক করা হলেও সে বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ জানায়নি সংস্থাটি।

সম্প্রতি ধ্বংস করা হয়েছে ফিলিস্তিনের ফুটবল স্টেডিয়াম। কিন্তু তাতেও ফিফার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ফিলিস্তিনি দলগুলোকে যাতায়াতের অনুমতি না দেওয়াসহ নানা নীতির মাধ্যমে তাদের ফুটবলকে বাধাগ্রস্ত করা হলেও সে বিষয়ে কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি ফিফা।

ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শুধু বর্ণবাদ, দখলদারি ও বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করে তোলেনি, বরং গাজা ও লেবাননে যুদ্ধাপরাধে যুক্ত ইসরায়েলি ফুটবলারদের অংশগ্রহণকে অভিনন্দন জানানোর মতো কাজেও যুক্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একাধিক রায় এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও ফিফা বারবার দাবি করে এসেছে, এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘অত্যন্ত জটিল’ এবং পশ্চিম তীরের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান এখনো নির্ধারিত হয়নি।

বাস্তবে এটি ইসরায়েলের বক্তব্যকেই সমর্থন করা, যা ট্রাম্প প্রশাসনও তাদের মিত্র ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এবং ফিলিস্তিনি জমি দখলকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করেছে।

ইসরায়েল যেমন পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম বা কৃষিকে ব্যবহার করে তাদের অবৈধ দখলদারি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে, তেমনই ফিফার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে ফুটবলকেও সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফার এই ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযোগ জানিয়েছে। তাদের দাবি, তিনি জেনেশুনে এমন কাজ করেছেন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণবৈষম্য এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত। তাদের দাবি, এ বিষয়ে একাধিক রিপোর্ট ও চিঠি তিনি উপেক্ষা করেছেন।

ফিফার নেতৃত্ব শুধু নীরব বা নিষ্ক্রিয় থাকেনি, বরং সক্রিয়ভাবে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার কাজেও অংশ নিয়েছে।

গত মাসে ফিফা প্রস্তাব দেয়, অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করা হোক। তার কয়েক সপ্তাহ আগে ইনফান্তিনো নিজে ফিলিস্তিনি ফুটবল সংস্থার প্রধানকে ইসরায়েলি ফুটবল সংস্থার প্রধানের সঙ্গে করমর্দন করতে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন।

ফিফা যে আর নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা নেই, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

ইনফান্তিনোর কর্মকাণ্ডই তার প্রমাণ। ২০১৮ সালে তিনি কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ওয়াশিংটনে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল আরব বিশ্বের সম্মিলিত আলোচনায় ফিলিস্তিন প্রসঙ্গকে সরিয়ে দেওয়া। ২০২১ সালে তিনি ডানপন্থী ইসরায়েলি সংবাদপত্র জেরুজালেম পোস্ট আয়োজিত এক সম্মেলনে অংশ নেন। আর ওই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল জেরুজালেমের মামিল্লাহ অঞ্চলের এক মুসলিম কবরস্থানের ওপর নির্মিত স্থানে।

এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফিফা প্রধান তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই সংস্থার লক্ষ্য জাতিসংঘকে ফিলিস্তিন প্রশ্ন থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলি দখলদারি ও গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি প্রয়াস বন্ধ করা। সেখানে তিনি ফুটবলের মাধ্যমে শান্তি ও পুনর্গঠনের নামে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণাও করেন।

বিশ্বকাপ ঘিরে চলা বিতর্কগুলোকেও এই প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার। ফিফা তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে এবং ফুটবলকে রাজনীতির বাইরে রাখার দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়িয়েছে।

আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলার, রেফারি এবং দর্শকদের বিরুদ্ধে যে নানা নিয়মভঙ্গ করেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইনফান্তিনোর প্রতিক্রিয়া ছিল—সবাইকে ‘শান্ত থাকতে’ হবে।

এই সব ঘটনা আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে ফিফার ওপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ফুটবল এবং তার সর্বজনীনতার ভাবমূর্তি। ইনফান্তিনো যদি তাঁর পথ আমূল পরিবর্তন না করেন, তবে তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ধ্বংসের এক ইতিহাস হিসেবেই বিবেচিত হবে।

তবে ফিলিস্তিনি ফুটবল হার মানবে না। ১৯০৪ সালে জেরুজালেমে সেন্ট জর্জ স্কুল দলের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজও চলছে। ফিলিস্তিনের জীবনের প্রতিটি স্তরে ফুটবল জড়িয়ে রয়েছে। আর ফিলিস্তিনের মতোই এই খেলাও দখলদারি, গণহত্যা এবং একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ফিফার বিরুদ্ধেও টিকে থাকার শক্তি রাখে।

* জাভিয়ের আবু ঈদ, ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের পিএইচডি গবেষক ও ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা।
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফিফা প্রেসিডেন্ট
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফিফা প্রেসিডেন্ট। ছবি: রয়টার্স

Saturday, July 11, 2026

বিশ্বকাপের একটি মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ যেভাবে ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রতীক হয়ে উঠল

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশর ও আর্জেন্টিনার লড়াই শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিতর্কিত রেফারিং, ভিএআর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন এবং গ্যালারিতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শনের ঘটনায় ম্যাচটি দ্রুতই ফিলিস্তিন ইস্যুকে ঘিরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় মিশরের দ্বিতীয় গোল বাতিল করা হয়। এছাড়া আর্জেন্টিনার একটি গোলের আগে ভিএআর পর্যালোচনার আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি। এতে অনেক সমর্থক ও বিশ্লেষক অভিযোগ করেন, ভিএআর সমানভাবে ব্যবহার করা হয়নি এবং মিসরের ৩-২ গোলের হার ন্যায়সংগত ছিল না।

মিশরের কোচ হোসাম হাসান ম্যাচ শেষে বলেন, খেলাটি ‘ন্যায্য হয়নি’। তিনি ইঙ্গিত দেন, ফিফা হয়তো আর্জেন্টিনা ও তাদের তারকা লিওনেল মেসিকে জেতাতে চেয়েছিল। পরে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয়।

এই বিতর্কের আড়ালে আরও বড় একটি বিষয় সামনে এসেছে। ফিলিস্তিন ইস্যু এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হচ্ছে।

ম্যাচের আগে থেকেই কোচ হোসাম হাসান প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসছিলেন। ৩ জুলাই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মিসরের জয় পাওয়ার পর তিনি মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান এবং সেই জয় ফিলিস্তিনের জনগণকে উৎসর্গ করেন।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনেও তিনি ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘যার ফিলিস্তিনিদের জন্য সহানুভূতি নেই, সে মানুষই নয়।’

ম্যাচ চলাকালে গ্যালারিতেও এই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রকাশ দেখা যায়। গাজার ফিলিস্তিনিরা মিসরের পতাকা উড়িয়ে দলটিকে সমর্থন জানান। অন্যদিকে স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থক ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শন করলে মিসরের সমর্থকেরা ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরেন।

আর্জেন্টিনার জনগণের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের সমালোচক হলেও দেশটির বর্তমান সরকার ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে জায়নবাদপন্থী প্রেসিডেন্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসরায়েলের দৃঢ় সমর্থক।

ট্রাম্প ও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও কারো অজানা নয়। তাদের এ সম্পর্ক ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফিফা ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর দ্রুত রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করলেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। এ নিয়েও ক্রীড়াঙ্গনে সমালোচনা রয়েছে।

এসব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণেই মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্ককে অনেকেই কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ হিসেবে দেখেননি। বরং অনেক সমর্থকের কাছে এটি এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে, যেখানে শক্তিশালী পক্ষ তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায় । এতে করে আস্থার সংকট তৈরি হয় নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।

এর মানে এই নয় যে ফিফা গোপনে আর্জেন্টিনাকে জেতানোর ষড়যন্ত্র করেছে। ক্ষমতার প্রভাব সব সময় পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কাজ করে না, কখনও তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়।

মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্ক হয়তো দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে। তবে একইসঙ্গে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে কোচ হোসাম হাসানের ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ানো এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরার ঘটনাও অনেকের মনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

বিশ্বকাপে আর্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেয় মিশর। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপে আর্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেয় মিশর। ছবি: সংগৃহীত

Thursday, July 9, 2026

মিসর ম্যাচের ‘ডাকাতি’ নিয়ে মুখ খুললেন নিউইয়র্কের মেয়র

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোয় মিসরের হারের ম্যাচে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক এখনো থামেনি। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি মিসরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এ ম্যাচে আফ্রিকান দলটির সঙ্গে ‘ডাকাতি’ করা হয়েছে।

আটলান্টায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২–০ গোলে এগিয়ে ছিল মিসর। এরপর আর্জেন্টিনা অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩ গোল করে ম্যাচ ৩–২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। বিদায় নেয় মিসর। ম্যাচে ৫৮ মিনিটে মিসরের একটি গোল ফাউলের কারণে বাতিল হয়। সেই গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েই বিতর্ক হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

গত বুধবার ভোটারদের সঙ্গে আলাপকালে মামদানি বাসের সেবা উন্নত করার একটি নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। সেখানে মিসর ম্যাচের প্রসঙ্গ টানেন তিনি।
মামদানি বলেন, ‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাসে আপনাদের যাতায়াতের সময় ২৪ ঘণ্টা কমে আসবে। আর এক বছর পূর্ণ হতে হতে যাতায়তের সময় থেকে আপনারা বাঁচিয়ে ফেলতে পারবেন দুটির বেশি দিন। এর অর্থ হলো, আপনারা পরিবারের সঙ্গে সকালের নাশতা খাওয়ার সময় পাবেন। সন্তানের লিটল লিগ (বেসবল) ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক করার মতো বাড়তি সময় পাবেন। এর মানে হলো, রাতে ঘুমানোর আগে সময়মতো বাড়িতে ফিরতে পারবেন।’

উগান্ডায় জন্ম নেওয়া মামদানি এরপর বলেন, ‘এর মানে হলো, বন্ধুদের আড্ডায় বসে এ বিষয়ে একমত হওয়ার সময় পাওয়া যে, গতকালের ম্যাচে মিসরকে সত্যিই “ডাকাতি” করে হারানো হয়েছে। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আসল অর্থ হলো—নিউইয়র্কবাসীদের সেই মহামূল্যবান সময় ফিরিয়ে দেওয়া, যার ভীষণ অভাব রয়েছে তাঁদের জীবনে।’

দ্রুতগতির বাসের কল্যাণে প্রতিদিন যে ছয় মিনিট সময় বাঁচবে, তা দিয়ে তিনি কী করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বিতর্কিত রেফারিংকে আরও একবার খোঁচা দেন মামদানি, ‘বেঁচে যাওয়া ওই ছয় মিনিটে আমি সম্ভবত মিসরকে কীভাবে ডাকাতি করে হারানো হলো, সেই রিপ্লেগুলোই দেখব। বারবার দেখব।’

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি তথা ভিএআরের দিকে ইঙ্গিত করে মামদানি রসিকতা করে বলেন, ‘আপনারা তো জানেন, এখন কেবল ভিএআর স্ক্রিনের মতো চারকোনা ইশারাটাই করার বাকি আছে।’

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হারের পর মিসরের কোচ হোসাম হাসান রেফারিংয়ের তীব্র সমালোচনা করেন। মেসি ও আর্জেন্টিনার প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে হোসাম হাসান বলেন, ‘হয়তো তারা চেয়েছিল, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক। হয়তো তারা চেয়েছিল, মেসি প্রতিযোগিতায় থাকুক।’

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি। এএফপি

Wednesday, June 17, 2026

‘সেক্স আইকন’ জেমস রদ্রিগেজের বর্ণিল প্রেম, পর্নো তারকার সঙ্গে সম্পর্ক এবং...

জেমস রদ্রিগেজ হয়তো কখনো সেই কিংবদন্তি ফুটবলার হয়ে উঠতে পারেননি, যেভাবে তাকে নিয়ে একসময় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। তবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত প্রেম, বিচ্ছেদ এবং মডেলিং জগতের ঝলমলে উপস্থিতির কারণে কলম্বিয়ার অবিসংবাদিত ‘সেক্স আইকন’ হিসেবে তার পরিচিতি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী জেমস বৃহস্পতিবার উজবেকিস্তানের বিপক্ষে কলম্বিয়ার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামবেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হয়ে গোল্ডেন বুট জিতে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। সে সময় মোনাকোর হয়ে খেলা এই প্লেমেকার রাতারাতি তারকাখ্যাতি অর্জন করেন।

বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ তাকে ৬ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের চুক্তিতে দলে ভেড়ায়। এই দলবদলই তার জীবনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এরপর শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও নজর কাড়তে শুরু করেন জেমস রড্রিগেজ। নতুন খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার ফ্যাশন ব্র্যান্ড এক্সিতোর সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি করেন তিনি। একই বছরে স্প্যানিশ সংস্করণের পিপল ম্যাগাজিন তাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে আবেদনময় পুরুষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর এক বছর পর নিজের জে১০ জেমস অন্তর্বাস ব্র্যান্ড বাজারে আনার সময় একটি ফটোশুটেও অংশ নেন তিনি। এরপর একের পর এক বাণিজ্যিক চুক্তি আসতে থাকে তার ঝুলিতে।

সে সময় জেমসের স্ত্রী ছিলেন দানিয়েলা ওসপিনা। ২০১৬ সালে তিনি অন্তর্বাস ব্র্যান্ড কেলভিন ক্লেইনের বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হন। বিভিন্ন বিলবোর্ডে তাকে শুধু ওই ব্র্যান্ডের অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। কৈশোরেই দানিয়েলার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দানিয়েলা ছিলেন আর্সেনালের সাবেক তারকা এবং জেমসের কলম্বিয়ান সতীর্থ দাভিদ ওসপিনার বোন। পেশাদার ভলিবল খেলোয়াড় দানিয়েলাকে ২০১০ সালে বিয়ে করেন জেমস। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। তাদের সংসারে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। তার নাম রাখেন সালোমে। একসময় কলম্বিয়ার ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয় দম্পতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন তারা।

কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেয়ার পর জেমসের ক্রমবর্ধমান খ্যাতি তাদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। জীবনের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার বদলে যেতে থাকায় দু’জনের দূরত্ব বাড়ে। অবশেষে ২০১৭ সালে ছয় বছরের বেশি সময়ের দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন তারা। এর আগেই মডেল হেলগা লাভেকাতির সঙ্গে জেমসের সম্পর্কের গুঞ্জন শোনা যায়। পরে বায়ার্ন মিউনিখে ধারে খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তও সম্পর্কে ভাঙনের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দানিয়েলা জার্মানিতে যেতে আগ্রহী ছিলেন না।

একাকী জীবনে ফেরার পর জেমসের নাম বিভিন্ন নারীর সঙ্গে জড়িয়ে আলোচনায় আসে। ইনস্টাগ্রামে পরস্পরকে অনুসরণ করায় মার্কিন পর্নো তারকা কেন্দ্রা লাস্টের সঙ্গেও তার সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে মায়ামি সফরে মডেল শ্যানন দে লিমার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা মিউনিখে একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন। এক বছর পর গর্ভ ভাড়ার মাধ্যমে তাদের ছেলে স্যামুয়েলের জন্ম হয়। কিন্তু পরে জেমসের এভারটনে ধারে খেলা এবং পরবর্তীতে কাতারের আল-রাইয়ানে যোগ দেয়ার ফলে দূরত্ব তৈরি হয় তাদের সম্পর্কে। দীর্ঘ দূরত্বে সম্পর্কের চাপের কারণে ২০২১ সালে বিচ্ছেদ ঘটে তাদের।

পরবর্তীতে কলম্বিয়ান গায়িকা কারোল জি-এর সঙ্গে একটি ছবি প্রকাশের পর তাদের সম্পর্ক নিয়েও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ব্রাজিলিয়ান মডেল এরিকা শ্নাইডারের সঙ্গেও তার সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরের পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানানো এবং প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপস্থিত হওয়ার কারণে এই জল্পনা তৈরি হয়। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে কলম্বিয়ার একটি ম্যাচেও গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন শ্নাইডার। তবে গত বছরের শুরুতে কলম্বিয়ান মডেল লুইসা দুকের সঙ্গে জেমসের নতুন সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয়। মেজর লিগ সকারে যোগ দেয়ার পর মিনেসোটা টিম্বারউলভসের একটি এনবিএ ম্যাচে তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। কলম্বিয়ার গণমাধ্যমে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে, জেমস তার পরিবারের সঙ্গে লুইসার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এমনকি সাম্প্রতিক কলম্বিয়া ম্যাচগুলোর ভিআইপি গ্যালারিতে জেমসের মেয়ে সালোমের সঙ্গেও লুইসাকে সময় কাটাতে দেখা গেছে।

এই গ্রীষ্মে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলতে নামার আগে জেমস হয়তো ফিরে তাকাবেন এক বর্ণিল কিন্তু অপূর্ণতার ছাপ থাকা ক্যারিয়ারের দিকে। তিনি কখনো ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম হৃদয়জয়ী তারকা হিসেবে নিজের আলাদা পরিচয় ঠিকই গড়ে তুলেছেন।
(সূত্র দ্য সান)

Monday, June 15, 2026

ইরান দলের সংবাদ সম্মেলনে ফুটবল নিয়ে প্রশ্নই হলো না

২০২৬ বিশ্বকাপে সম্ভবত সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সংবাদ সম্মেলন ছিল এটি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ, ভিসা পাওয়া নিয়ে জটিলতা, বেস ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ইরানের ফুটবল দল এবারের বিশ্বকাপের আলোচিত দলগুলোর একটি। নিউজিল্যান্ড ম্যাচ সামনে রেখে এক দিন আগে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পা রেখেছে ইরানের ফুটবল দল।

সেই দলের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে রাজনীতির প্রসঙ্গ আসারই কথা। আর তা এতটাই বেশি যে ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি বলতে বাধ্য হয়েছেন—কেউ তো ফুটবল নিয়ে প্রশ্ন করলেন না!

ইরান বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এই ম্যাচ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা একের পর এক প্রশ্ন করেছেন দলটির বিশ্বকাপ প্রস্তুতি রাজনৈতিক প্রভাব ও তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের ভূমিকা নিয়ে।

সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই এ সব প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমরা এখানে ফুটবল খেলতে এসেছি। ইরানের ভেতরের এবং বাইরে থাকা সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা আমাদের কাজ। আমরা রাজনীতির মানুষ নই।’

লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের ম্যাচের ভেন্যু সোফি স্টেডিয়ামের বাইরে প্রবাসী ইরানিরা বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর বিরোধিতায় বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছেন খবর প্রকাশ হয়েছে। এ নিয়ে ইরানের কোচ বলেন, ‘ইরানি জাতি হিসেবে আমরা প্রতিটি ইরানিকে সম্মান করি।’

ট্রেনিং ক্যাম্প স্থানান্তরসহ প্রস্তুতির সময় দল যেসব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন করার জন্য গালেনোই সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান। ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি কোচের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘আমরা এখানে ফুটবল খেলতে এসেছি, আর ফুটবল সব সময় সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।’

ইরানের হয়ে ১০০টির বেশি ম্যাচ খেলা এবং বর্তমানে গ্রিক ক্লাব অলিম্পিয়াকোসে খেলা এই ফুটবলার আরও বলেন, ‘বহু বছর ধরে ইরান একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি, যারা একটি সভ্যতার অংশ। আমরা সেই ঐক্যটাই দেখাতে চাই। আমরা বিশ্বকাপে এসেছি বিশ্বের যেখানেই ইরানিরা থাকুক, তাদের মনে আনন্দ দিতে। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মতামত থাকতে পারে এবং আমরা তাকে সম্মান করি। তবে আমরা এখানে ফুটবলার হিসেবে এসেছি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে। আমরা রাজনীতিতে জড়াতে চাই না।’

তারেমি সাংবাদিকদের খোঁচা মারেন সংবাদ সম্মেলনে একেবারে শেষদিকে। তিনি বলেন, ‘কেউই ফুটবল নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না। আমরা নিউজিল্যান্ডের মতো দারুণ একটি দলের বিপক্ষে খেলছি। আমি আশা করি এটি একটি ভালো ম্যাচ হবে। রাজনীতির খবরের জন্য আপনাদের অন্য শহরের রাজনৈতিক সংবাদ সম্মেলনে যাওয়া উচিত।’

সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই ও ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি
সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই ও ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি। এএফপি

Wednesday, February 11, 2026

আইসিসিতে নিরপেক্ষতার সংকট by সাদ শাফকাত

আপনি যদি ১৯৪৭ সাল থেকে টানা ঘুমিয়ে না থাকেন, তাহলে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ খেলতে পাকিস্তানের অস্বীকৃতি আপনাকে অবাক করবে না। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটকে বহুদিন ধরেই এক ধরনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা হয়। একসময় এই ‘যুদ্ধ’ মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্যাট আর বলের লড়াইয়েই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতো। সেটা ছিল তখন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ম্যাচের ভেন্যু নির্বাচন, সফরসূচি- সবই রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এটাই এখনকার বাস্তবতা।

যুক্তি দিয়ে বলা যায়, এই খেলাটা শুরু করেছিল ভারতই, আর পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছে পাল্টা জবাব দিতে- চোখের বদলে চোখ। ২০০৮ সালে করাচিতে এশিয়া কাপ হওয়ার পর থেকে ভারতের ক্রিকেটাররা পাকিস্তানে আর খেলেনি। অথচ এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান ভারতের মাঠে অন্তত ১৯ বার খেলেছে। সবশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরে ওয়ানডে বিশ্বকাপে। শুরুতে ভারতের অস্বীকৃতিকে নিরাপত্তার যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যেত। ২০০৯ সালের লাহোরে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানকেও তো বছরের পর বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘ঘরের মাঠ’ বানিয়ে খেলতে হয়েছিল।

কিন্তু পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর এবং অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের মতো শীর্ষ দলগুলো যখন আবার পাকিস্তানে এসে খেলতে শুরু করল, তখন ভারতের ক্রিকেট বোর্ডকে নতুন অজুহাত খুঁজতে হলো। তারা সামনে আনল ‘সরকারি অনুমতির’ কথা। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের ভার তুলে দিল কট্টরপন্থী বিজেপি সরকারের হাতে। তখনই মুখোশ খুলে গেল।

এই ভারতীয় অনড় অবস্থানের ফলেই গত বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আয়োজন কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়। আট দলের টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলো যখন লাহোর, করাচি ও রাওয়ালপিন্ডিতে নির্বিঘ্নে চলছিল, তখন ভারতকে তার পাঁচটি ম্যাচই খেলতে দেয়া হয় দুবাইয়ে। এর মধ্যে ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারির পাকিস্তানের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ গ্রুপ ম্যাচ এবং ৯ মার্চের ফাইনালও। এই চরম বৈষম্যের ব্যাখ্যা একটাই- ক্রিকেটে ভারতের অপ্রতিরোধ্য প্রভাব।

একশ কোটির বেশি দর্শকের বাজার নিয়ে ভারত রাজস্ব, স্পনসরশিপ, লবিং এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)- সবকিছুর ওপরই কর্তৃত্ব কায়েম করেছে। পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মনে হচ্ছিল, আমাদের হাতে আর কোনো তাস নেই।
তবে সাম্প্রতিক দুটি নাটকীয় রাজনৈতিক ঘটনা এই হিসাব বদলে দিয়েছে। প্রথমটি হলো বাংলাদেশে ভারতসমর্থিত শেখ হাসিনা ওয়াজেদের ক্ষমতাচ্যুতি, যা দিল্লির হস্তক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ব্যর্থ দুঃসাহসিকতা, যা পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের ভারতের প্রতি অবস্থানে নতুন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। এই দুই ভূকম্পনের ঢেউ এসে মিলেছে ক্রিকেট দুনিয়ায়।

প্রথমে বাংলাদেশ আইসিসির কাছে অনুরোধ জানায়- তাদের আসন্ন বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো যেন ভারতের বাইরে, শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেয়া হয়। পাকিস্তান আগেই এমন ছাড় আদায় করেছিল। বাহ্যিকভাবে এই অনুরোধের কারণ ছিল আইপিএল থেকে এক বাংলাদেশি খেলোয়াড়ের রহস্যজনক বহিষ্কার। কিন্তু আসলে এর পেছনে রয়েছে ক্রমাবনত রাজনৈতিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের এই অবস্থানে সাহস পেয়ে পাকিস্তানও কঠোর অবস্থান নেয় এবং জানায়- বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ১লা ফেব্রুয়ারি সরকার নেবে। সেই সিদ্ধান্ত টুইটারে জানানো হয়: পাকিস্তান বিশ্বকাপ খেলবে, কিন্তু ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ বয়কট করবে। নকআউট পর্বে ভারতকে পেলে কী হবে- সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

খাঁটি ক্রিকেটের বিচারে গ্রুপ ম্যাচ ছেড়ে দেয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলেই মনে হতে পারে। দুটি মূল্যবান পয়েন্ট হাতছাড়া করা মানে পরের পর্বে ওঠা ঝুঁকির মুখে ফেলা। কিন্তু এখানে একটি বার্তা দেয়া জরুরি ছিল এবং পিসিবি সেটা কৌশলে দিয়েছে। আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের রেকর্ড ভয়াবহ; এই ম্যাচে হারার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। অন্যদিকে গ্রুপের বাকি তিন প্রতিপক্ষ সহযোগী স্তরের দল- যারা অঘটন ঘটাতে পারে ঠিকই, তবে অতিক্রম অযোগ্য নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, ভারতীয় দর্শকদের তাদের প্রিয় বিনোদন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সেটা হলো পাকিস্তানকে হারানোর দৃশ্য। এই ম্যাচগুলো ভারতের টিভি বাজারে সোনার খনি। ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের সম্মিলিত (টিভি ও ডিজিটাল) দর্শকসংখ্যা ছিল ৪০ কোটির বেশি। গত বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেই সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ৮০ কোটি। ১৫ই ফেব্রুয়ারির বাতিল হওয়া ম্যাচটিও নিশ্চয়ই একই রেকর্ড গড়ত। নকআউটে যদি দুই দল মুখোমুখি হয়, তাহলে সব দর্শকসংখ্যার রেকর্ড ভেঙে যাবে- এ নিয়ে সন্দেহ নেই।

এই বেছে নেয়া বয়কট পাকিস্তানে শান্ত আলোচনার জন্ম দিলেও ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সেটাই প্রমাণ করে, এটা কতটা কার্যকর হয়েছে। ভারতীয় কট্টরপন্থীরা ক্ষুব্ধ, সাধারণ দর্শক হতাশ। একই সঙ্গে কিছু যুক্তিবাদী ভারতীয় কণ্ঠও শোনা যাচ্ছে। শশী থারুর আইসিসির ছাতার নিচে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে আলোচনায় বসে ‘এই অর্থহীনতা বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছেন। প্রখ্যাত ক্রিকেট সাংবাদিক শারদা উগ্রা সরাসরি দায় চাপিয়েছেন ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের ওপর- তাদের ক্ষুদ্র অহং ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কথা বলেছেন।

এই পুরো বিশৃঙ্খলায়, ক্রিকেটের বাইরেও সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো বাংলাদেশ। তাদের সঙ্গে অন্যায় হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। পাকিস্তানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তারা শ্রীলঙ্কায় খেলতে পারত। কিন্তু আইসিসি তাদের হুমকি দেয়- না মানলে দল বদলে দেয়া হবে। শেষ পর্যন্ত সেই হুমকিই কার্যকর করা হয়।
এতে আইসিসির জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। বৈশ্বিক ক্রিকেটের কল্যাণের দায়িত্ব যাদের, সেই সংস্থাই যদি নিরপেক্ষ না থাকে, তাহলে সমস্যা আরও গভীর। এখন আইসিসি ভারতের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। সব ক্রিকেট জাতির উচিত একত্রিত হয়ে নীতিগত অবস্থান নেয়া এবং আইসিসিকে জবাবদিহির আওতায় আনা। কিছু না করার মূল্য অত্যন্ত চড়া।

(লেখক আগা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। তার এ লেখাটি অনলাইন দ্য ডন থেকে অনুবাদ)

mzamin