ব্রেক্সিট ধাক্কায় লন্ডভন্ড ব্রিটিশ রাজনীতি

ব্রেক্সিট ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) খণ্ডিত করেছে এবং ব্রিটিশ রাজনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। গত ২০১৬ সালের ২৩ জুন যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ৫২-৪৮ শতাংশ ভোটে রায় দিয়েছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পর নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের এক দশক পূর্ণ হওয়ার দিনে যুক্তরাজ্য এখন তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে। ব্রেক্সিট গণভোটের ডাক দেওয়া তৎকালীন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন যুক্তরাজ্যের ইইউ-তে থাকার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটের ফলাফল বিপক্ষে যাওয়ায় তিনি পরদিনই পদত্যাগ করেন।

তার পরের উত্তরসূরিরা সবাই ব্রেক্সিটের এই বিচ্ছেদের পরিণতি সামাল দিতে গিয়ে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন। সর্বশেষ লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গতকাল সোমবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন। অলস বা ধীরগতির অর্থনীতি, সরকারের অকার্যকারিতা এবং বিভক্ত ও ক্লান্ত ভোটারদের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন, যার সবই অন্তত আংশিকভাবে ব্রেক্সিটের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।

যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগ নিয়ে গবেষণা করা শিক্ষাবিদ ক্রিস গ্রে বলেন, যদিও এই সিদ্ধান্তটি এখন আর সংবাদপত্রের শিরোনামে নেই, তবুও ব্রেক্সিটের অভ্যন্তরীণ ক্ষত ব্রিটেনের ক্রমবর্ধমান অশান্ত রাজনীতির মধ্য দিয়ে এখনও প্রবাহিত হচ্ছে।

অসন্তোষকে পুঁজি করে ব্রেক্সিট প্রচার

ব্রেক্সিটের পক্ষের প্রচারকারীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ২৮ সদস্যের এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্লক বা জোট থেকে বেরিয়ে গেলে যুক্তরাজ্য তাদের আইন, অর্থনীতি এবং সীমান্তের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে’।

‘রিমেইন’ বা ইইউ-তে থেকে যাওয়ার পক্ষের দল যখন অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির ওপর জোর দিয়েছিল, তখন ‘লিভ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষের দল মানুষের আবেগকে পুঁজি করেছিল। ব্রেক্সিটের প্রধান প্রচারক এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হওয়া বরিস জনসন গণভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে বলেছিলেন, আমরা সামনের আলোকিত পথ দেখতে পাচ্ছি। এই জীবনে একবারই পাওয়া সুযোগের দরজা দিয়ে হেঁটে না যাওয়াটা হবে আমাদের বোকামি।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান বলেন, ব্রেক্সিট মূলত একটি কল্পিত অতীতের প্রতি মানুষের নস্টালজিয়া বা আকুলতাসহ বিভিন্ন কারণে ত্বরান্বিত হয়েছিল। মানুষ এটিকে অবাধ অভিবাসন এবং ইইউ-র নিয়মের বিরুদ্ধে একটি অবস্থান হিসেবে দেখেছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল নস্টালজিয়া, যেমন আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একাই লড়েছিলাম, যা আসলে সত্যি ছিল না। ব্রেক্সিটের ফলে আসলে কী ঘটতে পারে, তা কখনোই স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

ব্রেক্সিট কার্যকরের চেষ্টা সবাইকে অসন্তুষ্ট করেছে

ব্রেক্সিটপন্থিদের দেওয়া অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য চুক্তি, জনসেবায় আরো অর্থ বরাদ্দ এবং ব্রাসেলস থেকে আসা জটিল নিয়মের অবসান ঘটানোর সাহসী প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুতই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিক্ত বিচ্ছেদ আলোচনা চলার পর ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে। এরপর চূড়ান্ত বিচ্ছেদের জন্য আরো ১১ মাসের একটি অন্তর্বর্তী সময় পার করতে হয়।

ডেভিড ক্যামেরনের উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে একটি বিভক্ত পার্লামেন্টের কাছে গ্রহণযোগ্য বিদায়ী শর্ত খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন। বরিস জনসন মে-র স্থলাভিষিক্ত হন এবং ‘ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার’ প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আলোচনার মাধ্যমে একটি নামমাত্র বাণিজ্য চুক্তি করতে সক্ষম হলেও যুক্তরাজ্য ও ইইউ-র সম্পর্ককে সম্পূর্ণ শীতল বা স্থবির করে রেখে যান।

ক্রমবর্ধমান আর্থিক ও নৈতিক কেলেঙ্কারির কারণে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে কনজারভেটিভ পার্টি জনসনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া লিজ ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। পরের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বড় কোনো পরিবর্তন না করেই ইইউ-র সঙ্গে শীতল সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলিয়েছিলেন। কিয়ার স্টারমার সম্পর্ক ‘পুনর্নির্ধারণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে তিনি ইইউ-র শুল্কমুক্ত একক বাজারে পুনরায় যোগদানের বিষয়টি বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানান। স্টারমার ক্ষমতা হস্তান্তর করার সময়ও ব্রেক্সিট একটি অসমাপ্ত কাজ হিসেবেই রয়ে গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি

ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডন বলেন, ক্যামেরন এই আশায় গণভোটের ডাক দিয়েছিলেন যে এটি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের বিতর্ক দূর করবে, যা কনজারভেটিভ পার্টিকে বিভক্ত করে রেখেছিল। কিন্তু তা হয়নি।

সেলডন টাইমস রেডিওকে বলেন, যারা এটি নিয়ে পড়েছিলেন, তারা এখনও এটি নিয়েই পড়ে আছেন এবং ব্রিটেনের সমস্যাগুলো অব্যাহত রয়েছে।

বিচ্ছেদ আলোচনার সময় যে কনজারভেটিভরা ইইউ-র সঙ্গে নরম ব্রেক্সিট বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চেয়েছিলেন, তাদের দল থেকে বের করে দেয় জয়ী ব্রেক্সিটপন্থি গোষ্ঠী। অন্যদিকে লেবার পার্টি অনেক বেশি ইইউ-পন্থি হওয়া সত্ত্বেও দলের ভেতরে বিভক্তি রয়েছে। দলের একাংশ ইইউ-র আরো কাছাকাছি যেতে বা পুনরায় যোগ দিতে চায়, তবে স্টারমারের মতো শীর্ষ নেতারা পুরোনো ক্ষত নতুন করে খুঁড়তে চান না।

এক দশক পর লাখ লাখ ভোটার বড় দুটি দল ছেড়ে বামপন্থি গ্রিন পার্টি এবং নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থি রিফর্ম ইউকে-র মতো বিকল্প দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। নাইজেল ফারাজ সম্ভবত ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয়ী। তিনি প্রথমে বিচ্ছেদের জন্য প্রচার চালান এবং পরে অভিযোগ করেন যে ব্রেক্সিটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তার অভিবাসনবিরোধী বার্তা এখন পোলিশ প্লাম্বারদের থেকে সরে গিয়ে ছোট নৌকায় আসা আশ্রয়প্রার্থীদের দিকে মোড় নিয়েছে। তার দল বর্তমানে জনমত জরিপগুলোতে ক্রমাগত এগিয়ে রয়েছে।

সংশয়বাদ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি

গত এক দশকে ব্রিটেনের অর্থনীতি বেশ লড়াই করছে। ব্রেক্সিটই একমাত্র কারণ না হলেও এর ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে এই ধীরগতির প্রবৃদ্ধির পেছনে কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধও ভূমিকা রেখেছে।

থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্ট’-এর পরিচালক হ্যানা হোয়াইট বলেন, আমরা এমন কোনো রাজনীতিবিদ পাইনি যারা জনগণের সামনে অকপটে সত্য বলতে পেরেছেন। ক্ষমতায় আসার পর তারা কর না বাড়িয়ে, ঋণ না বাড়িয়ে একই সঙ্গে উন্নত জনসেবা দিতে পারবেন না এই সত্যটি তারা বলেননি। ফলে মানুষ আশাহত হয়েছে।

ব্রেক্সিট অভিবাসন সংক্রান্ত বিতর্ক কমাতে ব্যর্থ হয়েছে, বরং সংখ্যার হেরফের নির্বিশেষে এটি আরো তীব্র হয়েছে। ব্রেক্সিটের পর ২০২৩ সালে নিট অভিবাসন বেড়ে ৯ লাখের বেশি হয়েছিল, যা গত বছর কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে নেমে এসেছে।

রাজনীতিবিদদের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে এবং সংশয়বাদ বা সিনিকিজম বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জের ধরে বা মিথ্যা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে উসকানিদাতারা রাস্তায় অভিবাসনবিরোধী সহিংসতা ছড়িয়েছে।

ক্রিস গ্রে বলেন, অতীতে ব্রিটেনের প্রচলিত রাজনৈতিক আলোচনা ও তর্ক এবং রাস্তার সহিংসতার মধ্যে একটি দৃঢ় প্রাচীর বা সীমানা ছিল। আমি মনে করি সেই সীমানা এখন ভেঙে যাচ্ছে এবং বড় আকারে এর শুরুটা ব্রেক্সিট দিয়েই হয়েছিল।

অনুশোচনা

যুক্তরাজ্যের মানুষের মধ্যে এখন কিছুটা ‘ব্রেক্সিট নিয়ে অনুশোচনা’ বা অনুতাপ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ইপসস জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৫২ শতাংশ মানুষ পুনরায় ইইউ-তে যোগ দিতে চান এবং ৩৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন।

গত শনিবার শত শত মানুষ নীল এবং হলুদ রঙের ইইউ পতাকা উড়িয়ে লন্ডনের রাস্তায় ‘পুনরায় যোগদানের’ দাবিতে একটি মিছিল করেছেন। তবে ব্রেক্সিট নাটকের চূড়ান্ত সময়ের তুলনায় এই জমায়েত ছিল অনেক ছোট। কারণ অনেক মানুষ এখন এটি ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে চান।

কিন্তু ব্রেক্সিট এমন একটি ল্যান্ডমাইন বা বিপজ্জনক ক্ষেত্র, যা স্পর্শ করতে রাজনীতিবিদরা ভয় পান। ব্রিটেন যদি পুনরায় যোগ দিতেও চায়, তবে সতর্ক বা সংশয়ী ইইউ-র কাছে ফিরে যাওয়ার পথটি হবে অনেক দীর্ঘ।

ক্রিস গ্রে বলেন, যতক্ষণ না রাজনীতিবিদরা ব্রেক্সিটের এই উত্তরাধিকারের মুখোমুখি হতে রাজি হচ্ছেন, ততক্ষণ ব্রিটেন একটি মৃদু সংকটের আবর্তে থাকবে।

তিনি যুক্তরাজ্যের অবস্থাকে একজন মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সঙ্গে তুলনা করেছেন যা তার শক্তি কমিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা হয়তো নিরাময় অযোগ্য নয়। তবে তারা ডাক্তারের কাছে যেতে পছন্দ করছে না কারণ তারা জানে যে বিষয়টি খুব একটা সুখকর হবে না।

সূত্র: এপি

ব্রেক্সিট ধাক্কায় লন্ডভন্ড ব্রিটিশ রাজনীতি
ছবি: এপি

1 comment:

  1. আর্থিক ও নৈতিক কেলেঙ্কারি. ব্রেক্সিটের বিচ্ছেদের পরিণতি...

    ReplyDelete

Powered by Blogger.