হরমুজ প্রণালিতে নৌ-ফি চালুর প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইউরোপ

হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল ফি বা নেভিগেশনাল ফি আদায়ের জন্য ইরানের দেয়া প্রস্তাবগুলো খতিয়ে দেখছে ইউরোপ । তবে তারা উল্ল্যেখ করেছে এই টোল কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক করা যাবে না এবং সামুদ্রিক পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী জাতিসংঘ সংস্থার সমর্থন থাকতে হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। বৃটেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি জানিয়েছেন, বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করা হলে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে তার মন্ত্রিসভার কিছু সহকর্মী স্বীকার করেছেন যে মালাক্কা প্রণালি এবং ইংলিশ চ্যানেলসহ অনেক প্রাকৃতিক জলপথে নির্দিষ্ট নেভিগেশনাল সেবার জন্য অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা অনুমোদিত রয়েছে।

এমন এক সময়ে এই প্রস্তাবের কথা সামনে এলো যখন মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইরান যেন জনসমক্ষে একটি বিবৃতি দিয়ে জানায় যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর আর কোনো হামলা চালানো হবে না। মার্কিন কর্মকর্তারা তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং তা মেনে চলার ক্ষেত্রে মূল বাধা হিসেবে দায়ী করেছেন। ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে শেষ বলে মনে করছেন, তবে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে। এর কয়েক ঘণ্টা পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে তাকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ এনে নতুন করে হুমকি দিয়ে বলেন, ১০০০ মিসাইল লক ও লোড করা আছে এবং সেগুলো ইরানের দিকে তাক করা রয়েছে। মালাক্কা প্রণালির নীতিমালার আদলে হরমুজ প্রণালির জন্য একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে বৃটিশ আইনজীবীদের সহায়তায় ওমান তৈরি করেছে। মাস্কট এখন এই পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য তেহরানে তাদের আইনি বিশেষজ্ঞদের পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শুক্রবার জানিয়েছে, এই প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য শনিবার ওমান পৌঁছেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেইকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এই সফর হরমুজ প্রণালি এবং নৌ-চলাচলের নিরাপত্তার ওপর কেন্দ্র করে হবে এবং এটি গত এক বা দুই মাস ধরে ওমানের সাথে শুরু হওয়া পরার্মশেরই ধারাবাহিকতা। হরমুজ প্রণালির বেশিরভাগ নৌ-চলাচলযোগ্য জলপথ ওমানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা বাধ্যতামূলক টোলের বিরোধিতা করছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের পরিপন্থী উপায়ে ইরানকে এই প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব দেয়া হবে মূলত যে কোনো উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হওয়া মেনে নেয়া, যারা যখন-তখন এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।

তবে ওমানের এই বিকল্প পরিকল্পনা ইরানিদের, বিশেষ করে ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) উচ্চাকাক্সক্ষার সাথে নাও মিলতে পারে। একজন কূটনীতিক বলেছেন, আইআরজিসির কিছু অংশ বলছে যে যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারিতে তাদের ওপর একটি অবৈধ হামলা চালিয়েছিল, তাই তারা কেন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলবে? আবার অন্যরা সহযোগিতা করতে চায়। তেহরানের ভেতরে এই বিষয়ে বিভাজন রয়েছে। ইরান এই ফি আদায়ের বিষয়টি বাস্তবে বাধ্যতামূলক করবে কিনা, তা স্পষ্ট করার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর পক্ষ থেকেও চাপের মধ্যে রয়েছে। লন্ডনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস জানিয়েছে, এনার্জি পলিসি রিসার্চ গ্রুপের স্বাধীনভাবে প্রস্তুত করা প্রস্তাবগুলোর প্রতি তাদের আগ্রহ রয়েছে। ওই গবেষণাপত্রে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক ব্যবস্থার মধ্যে স্বচ্ছ সেবা ফি যুক্ত থাকলে তা সব পক্ষকে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করবে। এটি কেবল প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজের ওপর আরোপিত কোনো টোল নয়। গত বৃহস্পতিবার লন্ডনে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) লন্ডনের বৈঠকে কিছু উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় দেশের জোট একটি প্রস্তাব পাসের জন্য চাপ দেয়, যেখানে জাহাজে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার জন্য ইরানের নিন্দা জানানো হয়। তবে এই প্রস্তাবটি রাশিয়া বা চীন সমর্থন করেনি।

রাশিয়া বলেছে, এই সংঘাতমূলক প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণগুলোকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে। অন্যদিকে চীন এটিকে একতরফা এবং আইএমও-এর ম্যান্ডেটের বাইরে বলে অভিহিত করেছে। চলতি সপ্তাহে ড্রোন, মিসাইল ও ছোট নৌকার সাহায্যে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়ার ইরানি সক্ষমতা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ১৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর এই প্রস্তাবটি আসে। ইরান এর জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হেনেছে। একজন কূটনীতিক বলেন, নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার দুটি কারণ রয়েছে। একটি হলো প্রণালিটি পুনরায় খোলার সময় এর বিতর্কিত নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যটি হলো এই জলপথের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা, যার মধ্যে মালাক্কা প্রণালির মডেলটি ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তা অন্তর্ভুক্ত।

গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি আলোচনার রোডম্যাপ বা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ইরান কেবল ৬০ দিনের জন্য কোনো ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। কারিগরি ও সামরিক বাধাগুলো দূর হওয়ার পর, ৩০ দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক করার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে যে এই সমঝোতা স্মারকের অর্থ এই নয় যে জাহাজগুলো কেবল ইরানের অনুমতি নিয়ে এবং তেহরানের নির্দিষ্ট করে দেয়া রুটেই প্রণালি পার হতে পারবে। আলাদাভাবে, এই স্মারকে ইরান ওমানের সাথে প্রণালির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করেছে যে তারা মূলত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলো তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী পূরণ করেছে।

আইআরজিসি নৌবাহিনী জানিয়েছে, আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি যে এই ভূখণ্ডে বা হরমুজ প্রণালিতে বিদেশিদের কোনো ভূমিকা নেই। কূটনীতিকরা এখন খতিয়ে দেখছেন যে তেহরান আটকে থাকা জাহাজের জট কমাতে সব জাহাজকে ইরানের কাছের উত্তরাঞ্চলীয় রুট ব্যবহারের জন্য জোর দিচ্ছে, নাকি দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট ব্যবহারের জন্য দেশের পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটির অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করছে।

হরমুজ প্রণালিতে নৌ-ফি চালুর প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইউরোপ