Friday, November 2, 2012
বৃষ্টি by আলাউদ্দিন আল আজাদ
বৃষ্টি by আলাউদ্দিন আল আজাদ
বৃষ্টি নামবে। ঈষৎ শিশির-ছোঁয়া বসন্ত রাত্রে দক্ষিণ থেকে বইবে যে হাওয়া, তাতে থাকবে সমুদ্রের আর্দ্রতা, ফাটল-ধরা শুকনো মাঠ আর পাতাঝরা গাছের শাখায় শিহরণ জাগিয়ে দিয়ে সেই অতি-দূরে পাহাড়ের চূড়ায় ঘনীভূত হবে,
এরপর গর্জনে বজ্রে বিদ্যুতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে সারাটা আসমান, মঙ্গলসুধার মতো অজস্রধারায় নামবে বৃষ্টি। গাছের শুকিয়ে যাওয়া ডালপালাগুলি কচি পাতায় ভরে উঠবে, সারা খামার ছেয়ে যাবে সবুজে সবুজে। দুপুরের রোদে পাটক্ষেতের চারা বাছতে গিয়ে শরীর থেকে হয়তো দরদর করে ঘাম ঝরবে, কিন্তু তাতে আসবে না এতটুকু ক্লান্তি। কেননা নতুন ফসলের খোয়াব প্লাবনের মতো মিশে থাকবে রক্তের বিন্দুতে।
কিন্তু সে বছর এসব কিছুই হলো না। ফাল্গুন চলে গেল, উত্তরদিকটা কিঞ্চিৎ কালোও হলো না; চৈত্র শেষ হতে চলল, আকাশে দু-একদিন গুরু গুরু আওয়াজ হলো, গুমোট হয়ে রইল সারাটা প্রকৃতি; কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।
এরপর এল বৈশাখ। আর এখনও সূর্য আগুনের ফুলকি উড়িয়ে তীব্র তেজে জ্বলতেই লাগল, মাটির বুক চিরে মাথা উঁচিয়ে-ওঠা পাটের চারাগুলি আস্তে আস্তে কুঁকড়ে গেল। ওপরে খাঁ-খাঁ শূন্য, নিচে আদিগন্ত মুক্ত সুদূর, তারও নিচে বাঘবন্দি নকশার মতো জমিগুলি রোদে-পোড়া, বিবর্ণ। দুপুরবেলা ক্ষেতের আলের ওপর গিয়ে দাঁড়ালে কলজেটা সহসা ছ্যাঁৎ করে ওঠে, ঝলসানো তামাটে জিহ্বা বার করে সারা মাঠটা ডাইনির মতো হাঁ করে আছে। জ্বলন্ত ক্ষুধা নিয়ে সে নিজের বুকের শিশুশস্যকে গ্রাস করেছে, আগামী বছর যে গজব নেমে আসবে তাতে সন্দেহ নেই।
কিন্তু কেন? এর পিছনে নিশ্চয় কোনো গুরুতর কারণ আছে। সেদিন জুম্মা নামাজের পর আলোচনা উঠল। মিম্বরের কাছে দাঁড়িয়ে মৌলানা মহীউদ্দিন বলতে লাগলেন, 'বেরাদরানে-ইসলাম! আমি অধম বান্দা, আপনাদের খেদমতে কী বয়ান করব, আপনারা সব বিষয়েই ওয়াকিফহাল। কিতাবে আছে, খোদার গজব নামে তখনি, যখন দুনিয়া গুনাগারিতে ভরে যায়। আমরা এখন কী দেখছি? না, ছেলে বাপের কথা শোনে না, জেনানা বেপর্দা, চুরি-ডাকাতি বদমায়েশিতে দুনিয়া পূর্ণ হয়েছে। এদিকে নামাজ নেই, রোজা নেই, হজ-জাকাত নেই। আজ চলুন, আমরা তাঁর দরবারে জার-জার হয়ে কাঁদি, মাঠে গিয়ে সবাই হাত তুলে মোনাজাত করি, তিনি রাহমানুর রহিম, ইচ্ছা করলে একটু দয়া করতেও পারেন।'
মৌলানা সাহেবের কণ্ঠস্বরে গুরুগম্ভীর ধ্বনিতরঙ্গে পাকা মসজিদের ভিতরটা গমগম করতে লাগল। মুসলি্লদের মধ্যে থেকে উঠে দাঁড়ালেন হাজি কলিমুল্লাহ। থুতনিতে একগুচ্ছ সাদা দাড়ি, মাথায় কিস্তি টুপি, নামাজ পড়তে পড়তে কপালের মাঝখানটায় দাগ পড়েছে। তিনি প্রথমে গলা খাঁকরানি দিলেন, পরে আবেগকল্পিত গলায় বলতে লাগলেন, 'মৌলানা সায়েব যা বললেন তা অবশ্যই আমরা পালন করব। কিন্তু এইসঙ্গে একটা কথা সক্কলের মনে রাখতে হবে, কুকর্মের বিচার চাই। এই অনাবৃষ্টি কেন হলো, আপনারা ভেবেছেন কি? খোলাখুলি বলতে গেলে, নিশ্চয় কোনো মেয়ে অবৈধভাবে গর্ভবতী হয়েছে, তৌবা, আস্তাক ফেরোল্লা। এই অঞ্চলে, আশেপাশের কোনো গ্রামে অথবা আমাদের গ্রামেও হতে পারে। এদের তালাশ করে বার করতেই হবে, নইলে এই আজাবের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে না। এরে দুররা মেরে ঠাণ্ডা করতে হবে।'
ডান হাতের আঙুলগুলি দাড়িতে একবার চালিয়ে গরমে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন হাজি কলিমুল্লাহ, তাঁর মগজের কোষে কোষে সত্যিকারের অপরাধীকে খুঁজে পাওয়ার ভাবনা।
দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে ফুটবল খেলার ময়দানে যেদিন 'মেঘের নামাজ' হওয়ার কথা, তার এক দিন আগেই অসুখে পড়লেন সুফি মৌলানা মহীউদ্দিন।
জামাতে ইমামতি করবার জন্য হাজি সাহেবকে গাঁয়ের তরফ থেকে অনুরোধ করা হলো। প্রথমে বিনয় করলেও, সকলের খেদমতে পরে রাজি হলেন।
সেদিন নামাজ শেষ হওয়ার পর পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়ালেন হাজি কলিমুল্লাহ, বহু দূর চাউনি বুলিয়ে দেখলেন, দুনিয়াটা এখনো জিন্দেগির অযোগ্য হয়ে ওঠেনি, এখনো ডাক দিলে আলেমুল গায়েবের দরবারে হাজিরা দিতে হাজার লোককে পাওয়া যায়। তিনি চেয়ে রইলেন, আর দেখলেন অগুনতি টুপির শোভা, হোক না সেগুলি তেল-চিটচিটে অথবা ছেঁড়াখোঁড়া। খোলা প্রান্তরে গালভাঙা তামাটে মানুষগুলি বসে আছে অসহায়ের মতো, সবারই মনে একটুখানি রহমের প্রার্থনা। হাজি কলিমুল্লাহ দুহাত তুলে দরাজ গলায় উচ্চারণ করতে লাগলেন : 'ইয়া আল্লাহ, ইয়া বারে খোদা, তুই চোখ তুলে চা, একটু দয়া কর তোর বান্দাদের। তুই আসমান-জমিন, চান-সুরুজের মালিক, তোর অঙ্গুলি হেলনে সাগর দোলে, হাওয়া ছুটে চলে, নহর বয়, তোর একটুখানি ইচ্ছায় এই দুনিয়া ফুলে-ফসলে ভরে উঠতে পারে। মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে, শান্তি দে তুই!'
'আল্লাহুম্মা আমিন! আল্লাহুম্মা আমিন!' সারা জামাতজোড়া একই কাতর আওয়াজ। হাজি কলিমুল্লাহর সাদা দাড়ি চোখের পানিতে ভিজে গেল। কেঁদে জার-জার হয়ে তিনি দোয়া খতম করলেন, 'সোবহানাকা রাবি্বকা রাবি্বল ইজ্জাতে আম্মাইয়াসসেফুন, আসসালামু আলাল মুরসালিনা, আলহামদু লিল্লাহে রাবি্বল আলামিন!'
একইভাবে এক দিন, দুই দিন, তিন দিন ময়দানে গিয়ে জামাতে শামিল হলো ছেলে-বুড়ো-জোয়ানেরা। তাদের এক চোখ আকাশের দিকে, আরেক চোখ ফসল কুঁকড়ে যাওয়া খামারের দিকে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, এক মায়ের এক পুত্রের গায়ে চুনকালি মাখিয়ে, তার মাথার কুলোয় কোলাব্যাঙ আর বিষকাঁটালির গাছ রেখে রাতের পর রাত মেঘ-খেলা খেলল, নদীর ধারে শিনি্ন রেঁধে কলাপাতায় ফকির-ফকরাকে খাওয়াল। তাদের ঘাড়ে ব্যথা হয়ে গেল ওপরের দিকে চেয়ে থাকতে; কিন্তু সেই রোদ-চুয়ানো কাকচক্ষু নীল একখণ্ড মেঘের আভাসও দেখা গেল না।
মাগরিবের নামাজের পর পাটিতে বসে তসবিহ জপতে জপতে এসব কথাই ভাবছিলেন হাজি কলিমুল্লাহ। তাঁর চোখের পুতুলিতে অবসাদের ছায়া। গভীর ভাবনার কারণ আছে বৈকি! সুতোর চোরাকারবার থেকে যে কয়েক হাজার টাকা পেয়েছিলেন, তার অর্ধেক দিয়ে গুদাম কিনেছেন মেঘনার বন্দরে, বাকি অর্ধেক দিয়ে কিনেছেন দুন দেড়েক জমি। নিজে পাট কিনে মজুদ করতে না পারলে গুদাম কেনার ফায়দা নেই। মাসিক দেড় শ টাকা ভাড়ায় আর কী হয়! অথচ এ বছর গুদামটাকে নিজে ব্যবহার করতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। এদিকে সবগুলি জমি নিজে চাষ করেছেন। এখানটায়ই হয়েছে চরম বোকামি। যদি পত্তনি দিতেন, তাহলে হাজার দেড়েক টাকা নগদ পাওয়া যেত, কিন্তু মুনি-মজুর ও জমির তদারক করতে জান বেরিয়ে যাচ্ছে। বীজ বোনা থেকে এক নিড়ি পর্যন্ত পয়সাকড়ি কম খরচ হয়নি, ভবিষ্যতে আরো হবে, অথচ এদিকে আকাশের যা হাল, তাতে ফসল পাওয়ার বিশেষ আশা নেই।
সুতোর কারবার ছেড়ে দিয়েও ভালো কাজ করেননি। গত বছর হাওয়াগাড়িতে চড়ে গিয়ে হজ করে এসেছেন; ভেবেছিলেন, অতঃপর সংসারের ঝামেলাতে নিজেকে এতটা জড়াবেন না, গুদামটা ছেলেদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজে জমিজমা নিয়েই থাকবেন। কিন্তু টাকার অভাবে সব ভেস্তে গেল। আসলে ব্যবসা ব্যবসাই, এতে সৎ-অসৎ-এর প্রশ্ন নেই, নিয়ত ভালো থাকলে দান-খয়রাত করলেই হলো।
জানালার বাইরে আমের বোলের তীব্র গন্ধ ভেসে আসছিল, বাঁশঝাড়ে শালিকের কিচিরমিচির অনেকটা মন্দীভূত। তসবিহর গুটিগুলি চঞ্চল হয়ে ঘুরছে হাজি কলিমুল্লাহর আঙুলে আঙুলে, এই সঙ্গে তাঁর মনটা ক্রমেই আচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
জৈগুন ঘরে বাতি দিতে এসে যেন চমকে উঠল। বলল, 'মিয়াসাব এখানে? মসজিদে যাননি?'
'না, শরীরটা খুব ভালো নয়।' হাজি সাহেব ওর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, 'তা ছাড়া তোর গিনি্নমা বোধ হয় একখুনি এসে পড়বেন।'
দিন-পনেরো হলো নতুন গিনি্ন বাপের বাড়ি গিয়েছিল নাইওর করতে, আজকে তার আনবার তারিখ। হাজি নিজে যেতে পারেননি, প্রথম তরফের তৃতীয় ছেলে খালেদকে পাঠিয়েছিলেন সকালবেলায়। আসলে বৌকে বাপের বাড়িতে বেশিদিন থকতে দিতে তিনি সব সময়ই নারাজ। প্রথম স্ত্রীকে দশ দিন থাকতে দিয়েছিলেন, তাও একেবারে নতুন অবস্থায়। দ্বিতীয় স্ত্রীর বেলায় দিনের সংখ্যা আরো কিছুটা বেড়েছিল। তবে এখন পড়তি বয়েস, সব ব্যাপারে কড়াকড়ি চলে না। দুবছর আগে দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সংসার থেকে তাঁর মন একেবারে উঠেই গিয়েছিল। কিন্তু খোদার কুদরত, কার সাধ্য তার কিনারা করে? তিনি কপালে যা লিখে রেখেছেন, তা একদিন ফলবেই। গতবার যখন হজে গিয়েছিলেন, তার মাসখানেক আগে সবাই ধরে বসল, এমন সোনার সংসার, একজন গৃহিণী না থাকলে কোনো কিছুই ঠিক থাকবে না।
কিন্তু পাত্রী? বয়েস ষাট পুরো হতে চলল, এখন হাতে ধরে কে নিজের মেয়ে দিতে যাবে?
'হাসালেন হাজি সাহেব, হাসালেন। আপনার কি না পাত্রীর অভাব?' মজু প্রধান দাড়িতে হাত বুলিয়ে কন যে বিয়ে করবেন, আমি পাত্রী ঠিক করে দিচ্ছি। তাও যেমন-তেমন নয়, এমন কন্যা দেব, চোখে পলক পড়বে না।'
হাজি কলিমুল্লাহর চোখের তারা দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। একটা অজানা অনুভূতিতে তাঁর হৃৎপিণ্ডটা ধুক ধুক করছিল; কিন্তু বাইরে আগাগোড়া ম্লান হয়েই রইলেন, আগেকার সহধর্মিণীদের স্মৃতি এত শিগগির ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তিনি একটা ঢোক গিলে বললেন, 'দেখুন, তিনকাল গিয়ে এককাল পড়েছি, এখন আমোদ-আহ্লাদ করার সময় নয়। ঘরের তদারক আমার ফাইফরমাশটা করতে পারলেই হলো।'
'তা তো বুঝলাম।' মজু প্রধান যুক্তি দেখালেন, 'ভাঙা নাওয়েও কাজ চলে, আবার নতুন নাওয়েও চলে; কিন্তু কোন্টা আমরা চাই? কোন্টা দিয়ে গাঙ পাড়ি দিতে সুখ?'
এর পর সাতকানি জমি সাফকাওলা করে দিয়ে যে পাত্রী ঠিক হয়েছিল, সে মজু প্রধানেরই মেয়ে-ঘরের নাতনি। বয়স একুশ-বাইশ বছর হবে। এ দেশের মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি হয়, সে হিসেবে হাজি সাহেবের সঙ্গে সম্বন্ধটা মোটেই বেমানান হয়নি।
রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিল গুছিয়ে জৈগুন এল। অর্থপূর্ণ গাম্ভীর্যের সঙ্গে একটা পিঁড়ি টেনে নিয়ে বসল। হাজি সাহেবের ওজিফা তখনো শেষ হয়নি। মুখের বিড়বিড় খানিকক্ষণের জন্য থামিয়ে তিনি জিগগেস করলেন, 'কিরে, কিছু খবর আছে?'
জৈগুন বলল, 'আছে।'
'কী শুনি!' তসবিহর মালায় আঙুল থেমে গেল হাজি কলিমুল্লাহর, তিনি উৎসুক দৃষ্টিতে চাইলেন। কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে গোপন খবর সংগ্রহের জন্য তিনি জৈগুনকে নিযুক্ত করেছিলেন, আর সে জন্যই এই আগ্রহ।
'আমি আজ গিয়েছিলাম বাতাসীর কাছে। গিয়ে দেখি, সে তার খাশিটার জন্য আমপাতা পাড়ছে। আমাকে দেখেই সে নানান কথা বলতে লাগল, কিন্তু আমি চেয়ে রইলাম ওর শরিলের দিকে।' দরজায় একবার চেয়ে নিয়ে জৈগুন বলল, 'ওর তলপেটটা বেশ ফোলা মনে হলো।'
হাজি চিন্তিতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, 'ওর জামাই না কবে মারা গেছে?'
'তা সাত-আট মাস তো হবেই!' জৈগুন হিসাব করে বলল, 'কিন্তু ওর পেট মনে হলো চার-পাঁচ মাসের।'
'তাই নাকি? তাহলে তো বেশ অনেক দিনের ফাঁক।' হাজি কলিমুল্লাহ যেন সত্যদর্শন করেছেন, তাঁর চোখে আশার আলো ফুটে উঠল। নিচুগলায় জিগগেস করলেন, 'আচ্ছা, বাতাসীর ঘরে যে লোকটা থাকে, তাকে দেখলি?'
'হ্যাঁ, দেখলাম। অসুখ এখনো সারেনি, তবে আগের চেয়ে একটু ভালো। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখি, সে ঘরের ভিতরে বিছানায় শুয়ে আছে।'
'তা হোক, তা হোক।' হাজি অসহিষ্ণুর মতো বললেন, 'শুয়ে থাকলে কী হবে? শুয়ে থাকলে কি আর এসব কাজ করা যায় না? নিশ্চয় যায়। তুই কী বলিস?'
'হ্যাঁ, আপনি ঠিকই কইছেন। তা ছাড়া বাতাসীর চলাফেরা আমার ভালো মনে হয় না। রজবালি বেঁচে থাকতেই এর সম্বন্ধে কত লোক কত কথা বলেছে। নামাপাড়ার ছমু যে ওর দরজা খুলেছিল, তা কি কেউ শোনেনি? রজবালি টের পেয়েছিল বলেই না দোষটা ছমুর ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। না-হলে মেয়েমানুষের চোখঠারানি ছাড়া কি অমন কাজ কেউ করতে সাহস পায়?'
'যদি এই ঠিক হয়, তাহলে তো আর কোনো কথাই নাই। আমার বিশ্বাস, বাতাসীই এ কাম করেছে_না হলে বৃষ্টি হবে না কেন?' হাজি আবার তসবিহ জপতে লাগলেন, খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন, 'তবু রাখ্, আমি নিজে একটু পরখ করে নিই, এর পর একটা কিছু করা যাবে।'
জৈগুন চলে গেলে আবার গভীর চিন্তামগ্ন হলেন হাজি কলিমুল্লাহ। তাঁর কপালের বলিরেখা আরো কুঁচকে গেল। তসবিহর গুটিতে ঘন ঘন আঙুল চলতে লাগল। বাতাসী, বাতাসী, বাতাসী। বাতাসী ছাড়া এ কাজ আর কারো নয়। অল্প বয়েসে স্বামী মারা যাওয়ার এই দোষ! কেননা, স্বামীসঙ্গ একবার যে পেয়েছে, সে সেই স্বাদ কি সহজে ভুলতে পারে? এ হচ্ছে আফিমের মতো, ভাত ছাড়া যায়, তবু ছাড়া যায় না এর নেশা। তা ছাড়া ওর পুরো জোয়ানী। যেমন তেমন দু-একজন পুরুষ ওর কাছে কিছু নয়, এক চোখের বাঁকা চাউনিতেই কাৎ করে ফেলতে পারবে। অথচ কথা বলার কী কায়দা। মামাতো ভাই, দিনমজুরি করত, কালাজ্বরের কবলে পড়ে বিপদ হয়েছে, কেউ নেই, না দেখলে চলে না। এসব কথা দিয়ে আর চিঁড়ে ভিজবে না। আসলে লোকটাকে এনেছে এক বিছানায় রাত কাটাবার বুঝতে বাকি নেই।
কিন্তু এর শাস্তি হবে কী? কিতাবের হুকুম মানলে, গলা-ইস্তক মাটিতে পুঁতে এর মাথায় পাথর মারতে হবে, যতক্ষণ না প্রাণটা বেরিয়ে যায়। কিন্তু এ যুগে তা কি সম্ভব? থানা আর পুলিশ রয়েছে যে। তাহলে উপায়? জুতো মারা? একঘরে করে রাখা? গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া?
হাজি কলিমুল্লাহ যখন এসব ভাবনায় তন্ময় ছিলেন, তখন খালেদ তার নতুন মাকে নিয়ে মরা-গাঙের পানির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
পূর্ণিমা-চাঁদ দেখা দিয়েছিল বাড়ি থেকে রওনা দেয়ার অনেক আগেই, এইবার তো বাঁশঝাড়ের মাথা ছাড়িয়ে উঠে ঝলমল করছে। চারদিক নিঝঝুম, গাছপালায় বাতাসের নড়াচড়ার গরজ নেই।
মরা-গাঙে এখন হাঁটু পানি। দুই পাশে কাদা ঠেলে ডাঙার সঙ্গে যে সরুপথটার মিল হয়েছে তার পরিষ্কার বালুর ওপর দিয়ে ঝিলঝিল করে কেটে চলেছে ফোয়ারার স্রোত। পানির ভিতর থেকে গজিয়ে ওঠা বোরো ক্ষেতগুলিতে কচি ধান-পাতার জড়াজড়ি।
নিচু হয়ে জুতোজোড়াটা ডান হাত দিয়ে খুলে ফেলল জোহরা। তার কাঁধে ছোট ছেলেটা। আর অসুবিধা হচ্ছে দেখে পিছন থেকে খালেদ পাশে এসে বলল, 'সাজুকে আমার কাছে দিন।'
ওরা দুজনে প্রায় সমবয়সী। প্রথম প্রথম 'আপনি' বলতে লজ্জা করত খালেদের, কিন্তু এখন আর সে ভাবটা নেই।
জোছনায় আলোকিত বড় ছেলের মুখের দিকে চাইল জোহরা, টানা ভুরুর নিচে ওর সুন্দর চোখ দুটো আরো সুন্দর মনে হলো তার, একটা অব্যক্ত অনুভূতির ছলছলানিতে বনের অন্ধকারে শিহরিত নদীর মতো দুলে উঠল বুকের ভিতরটা। আচ্ছন্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার কষ্ট হবে না তো?'
খালেদ হাসল! বলল, 'না, এ আবার কষ্ট কী?'
সাজুকে পাঁচ বছরের রেখে ওর আম্মা এন্তেকাল করেছেন দুবছর আগে, আদর-যত্ন না-পাওয়ায় ওকে কান্নারোগে ধরেছিল। কিন্তু বর্তমানে তা নেই। নতুন মাকে তার এমনি ভালো লেগেছে যে সে এক মুহূর্তের জন্যও তার কাছছাড়া হয় না। জোহরা যখন নাইওর করতে যায়, তখন ও তার কোলে উঠে চলে গিয়েছিল।
অন্য কাঁধের ওপর থেকে অঘোরে ঘুমিয়ে থাকা ছোটভাইটিকে নিজের কাঁধে নিতে গিয়ে খালেদের মনে হলো, কপোতের বুকের মতো উষ্ণ, প্রবালের মতো কোমল কিসের মধ্যে যেন তার বাঁ হাতের আঙুলগুলি ক্ষণিকের জন্য হঠাৎ হাওয়ায় চাঁপার কলির মতো কাঁপুনি খেয়ে গেল। নিমেষে তার সমস্ত শরীরটা শিরশির করে উঠল ভরামেঘে বিদ্যুৎ সঞ্চারের মতো। পলকের জন্য তার চোখে পড়ল, সহসা কেমন রাঙা হয়ে উঠল মেয়েটির মুখ, তার সারা চেহারায় রক্তের প্রবাহ বহ্নির মতো ছড়িয়ে গেল। খালেদ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না; আরেক জন্মের কোনো নিবিড় স্মৃতি অস্পষ্ট মনে পড়ার মতো কী এক অজানা বেদনায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঝিরঝিরে পানির ওপর দিয়ে সুমুখে হাঁটতে লাগল।
কিন্তু জোহরা দাঁড়িয়েই রইল। কাপড়টা ঠিক করে নিয়ে চাঁদের দিকে মুখ উঁচিয়ে চাইল একবার, আবার চাইল সামনে চলমান মূর্তিটার দিকে। এর পর সে চঞ্চল হয়ে উঠল। সেই রুপালি বালুর ওপরে ফোয়ারার স্রোতে বয়ে চলা রাস্তাটায় ত্রস্ত হরিণীর মতো পা ফেলে হাঁটুপানির কাছে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে পিছন থেকে শাড়িটা কুচকে এনে ডান হাতে হাঁটুর কাছে ধরা, জোছনা-উছল কালো পানির দিকে মুখ নিচু করে জোহরা দেখল, তার মূর্তিটা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে, এই সঙ্গে ছোট ছোট ঢেউয়ে ভেঙে যাচ্ছে চাঁদের চেহারাটাও। হঠাৎ মুখ তুলে সে ডাকল, 'খালেদ!'
'কী!'_কিছুদূর থেকে খালেদ সাড়া দিল।
'আমাকে ফেলেই চলে যাচ্ছ।'_স্বপ্নের স্বরে যেন জোহরা বলল, 'আমি চলতে পারছি না। দ্যাখো, দ্যাখো! পানিটা কী সুন্দর!'
খালেদ ফিরে এল। বলল, 'আপনার কী হয়েছে বলুন তো, চলুন তাড়াতাড়ি। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে।'
'ও তাই তো। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে!' পানি ঠেলে কিছু দূর এগিয়ে আবার থমকে দাঁড়াল জোহরা। ঝিলিমিলি ঢেউয়ের দিকে চেয়ে বলল, 'দেখছ, কী সুন্দর পানি! এমন পানিতে মরতেও সুখ।'
কোনো জবাব দিল না খালেদ, মুখ নিচু করে চুপচাপ এগোতে লাগল।
ওপারে কোথায় একটা পাখি ডেকে যাচ্ছে_'বৌ কথা কও।'
নদী পেরিয়ে এসে চপচপ পানি থেকে পা দুটো ঝাড়া দিয়ে নতুন জুতোজোড়াটা পরার সময় জোহরার মনে হলো তার বুকের ভিতরে কিছু নেই, বিবাগী হাওয়ার মতো কিসের এক রিক্ত হাহাকার গুমরে গুমরে মরছে। নিজের কথা ভাবতেই সে আঁতকে উঠল, তার শরীরটা ঝিম ধরে অবশ হয়ে এল।
খালেদ আস্তে আস্তে হাঁটছিল। পিছন থেকে সে একটা কাতর-স্বর শুনতে পেল_'একটু দাঁড়াও!'
'আবার কী হলো আপনার!'
'কী জানি কিছু বুঝতে পারছি না! আমার চোখ দিয়ে এমন পানি পড়ছে কেন?' জোহরা ব্যাকুলভাবে এগিয়ে গিয়ে খালেদের চোখের সামনে নিজের চোখজোড়া বিস্ফারিত করে দাঁড়াল, চাঁদের আলোয় দেখা গেল, তার টলটলে দুটো চোখ দিয়ে মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে।
খালেদ আবার উচ্চারণ করল, 'কী হলো আপনার?'
'তুমি কিচ্ছু জানো না, কিচ্ছু বোঝো না!' কাপড়ের খুঁট দিয়ে চোখ দুটো মুছে জোহরা অপ্রকৃতিস্থের মতো বলল, 'সাজুকে দাও আমার কাছে। চলো শিগগির। লোকজন নেই, আমার বড্ড ভয় করছে।'
ওরা যখন মুখোমুখি হয়েছিল, তার কিছু আগে থেকে কিঞ্চিৎ হাওয়া বইতে শুরু করেছিল, আর যখন চুপচাপ চলতে শুরু করল, তখন একখণ্ড ঈষৎ কালো মেঘ দক্ষিণ থেকে ধীরে ধীরে ভেসে আসতে লাগল। খড়ম পায়ে উঠোনে পায়চারী করছিলেন হাজি কলিমুল্লাহ, আকাশের দিকে চেয়ে তিনি চমকে উঠলেন। তাহলে তাঁর আন্দাজই ঠিক?
'জৈগুন! ও জৈগুন!' তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'দেখে যা, আমরা যা ভাবছি তাই ঠিক। আসমানে সাজ দেখা দিয়েছে।'
জৈগুন চৌকাঠের কাছে এসে মুখ বাড়িয়ে বলল, 'তবু তো আপনি বলছেন, আরো পরখ করতে। আমার মনে কোনো সুবা-সন্দে নেই। বাতাসী যা ছিনাল।'
আকাশে চলমান মেঘটার দিকে চেয়ে আবার পায়চারী করতে লাগলেন হাজি কলিমুল্লাহ, এর বিচারটা কী হবে তিনি তার কিনারা করতে পারছেন না।
আধঘণ্টা পরে জোহরা যখন এল, শুয়ে শুয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতেও বারবার তাল কেটে যেতে লাগল, অনেক রাত পর্যন্ত চোখে ঘুম এল না!
মনস্থির করে পরদিন সকালে তিনি গিয়ে উঠলেন বাতাসীর বাড়িতে, পুবপাড়ার আমবাগানের ওধারে। বাঁশের চালার নিচটায় পাকালের ধারে বসে ও খুদের জাউ রাঁধছিল, হাজি সাহেবের সাড়া পেয়ে একটা চৌকি হাতে উঠানে এল। এমন গণ্যমান্য লোক, সাতজন্মে একবার এসেছেন ওর এখানে, কী দিয়ে মেহমানদারি করবে, সে ঠাহর করতে পারল না।
মাথায় কাপড় টেনে ও কী বলছিল সেদিকে হাজির মোটেই নজর ছিল না, তিনি গোপনে আড়চোখে হরিদ্রাভ লাবণ্য-স্নিগ্ধ ওর দেহটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন।
এদিকে বাড়ির নাশতা-পর্বের তদারক শেষ হওয়ার পর জোহরা গুম হয়ে বসেছিল তার শোবার ঘরে চৌকির কিনারায়।
বিয়ে হওয়ার পর থেকে কিসের যেন এক আশ্চর্য মায়ায় বিনা কাজের সময়টুকু সে এখানটায় বসেই কাটিয়ে দেয়। এ কিসের জাদু? কিসের মন্ত্রণা? জোহরা তা বুঝতে পারে না। বাড়ির চেহারা বোধ হয় অনেকদিন থেকেই অদলবদল হয়েছে, কিন্তু এ কামরাটায় কোনো পরিবর্তন নেই, দিনে দিনে নতুন জিনিস যোগ হয়েছে মাত্র। আগেকার গিনি্নদের হাতের ছাপ অনেক কিছুতেই এখনও টাটকা হয়েই আছে, অন্ধকারে বসে থাকলে তাদের ঠোঁটের ফিসফিস আলাপও যেন সে শুনতে পায়। তখুনি ওর মনে হয়, এ ঘরে ঢোকবার কোনো অধিকার তার নেই, এখানকার সব দখল করে সে ডাকাতের কাজ করল।
কিন্তু আমার কী দোষ? আমি তো রাজি হতে চাইনি! নানা বলল, বোন কাঁদিসনে, দু-একটা বছর সবুর কর, বুড়োটা মরল বলে। তখন বেশ জোয়ান দেখে একটা বর জুটিয়ে দেব। এখন সম্পত্তিটা হাত করে নে।'
জোহরা আপন মনে আওড়াল, 'ছাই সম্পত্তি!'
দগদগে ঘার ওপর দিয়ে গরম বাতাস বইতে থাকলে যেমন করে জ্বলে, ওর বুকের ভিতরটা তেমনি করে জ্বলতে লাগল। দম যেন ক্রমেই বন্ধ হয়ে আসছে। একসময় সে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। ওর চোখের দুটো তারায় জ্বলজ্বল করতে লাগল একটা দুর্বিনীত বন্যতা!
মগজটা গিজগিজ করছিল, এলোচুলে ঝাঁকড়া মাথাটা একবার ঝাড়া দিয়ে জোহরা বাইরে চলে এল। চোখ তুলে চাইতেই ওর দৃষ্টি পড়ল কুয়োর ধারে মেহেদি গাছটার দিকে, ভিজে মাটির রসে তাতে ঘন হয়ে কচিপাতা দেখা দিয়েছে।
কদিন সংকল্প করেও সে মেহেদি গাছটা কাটতে পারেনি। কিন্তু আজকে ডান হাতটা শিরশির করতে লাগল। ত্রস্ত পায়ে সে চলে গেল রান্নাঘরের ভিতরে। সেখান থেকে ধারালো বঁটিটা এনে একেক কোপে একেকটি ডাল কেটে ফেলতে লাগল।
'আহা হা, করে কী গিনি্নমা'_জৈগুন দৌড়ে এল। বলল, 'গাছটা অনেক দিনের, মানুষের কত কাজে লাগে। কর্তা শুনলে ভীষণ রাগ করবেন।'
'তুই এখান থেকে যা তো। কে রাগ করবেন না করবেন, তোর চাইতে আমি ভালো বুঝি। আমার ইচ্ছা হয়েছে, আমি কাটবই।'
'আমি কাম করে খাই, আমার কী? আপনার ভালোর জন্যই বলছিলাম।'
'আশ্চর্য!' জোহরা মুখ তুলে চাইল। বলল, 'আমার ভালো-মন্দের চিন্তা তোকে করতে হবে? দুনিয়াতে আর লোক নেই।'
কর্তার প্রিয় গিনি্নকে আর ঘাঁটাতে সাহস করল না জৈগুন, মুখ কালো করে সে নিজের কাজে চলে গেল।
কেমন করে দুপুর হলো, কেমন করে এল বিকেল, আর কেমন করেই বা রাত্রি এসে পৃথিবীর মুখ ঢেকে দিল, জোহরা কিছুই বলতে পারবে না। তার হৃদয়ের একটা অংশ কে যেন ঝকঝকে ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে নিয়ে গেছে, প্রতিদিনের উচ্ছল ঢেউ সেখানে লাগে না, সেখানে তুষের আগুনের মতো শুধু একটি জ্বালা।
এশার নামাজের পর বিছানায় শুয়ে হাজি কলিমুল্লাহ বললেন, 'যা ভেবেছিলাম, বাতাসীই কুকাম করেছে।'
'কেমন করে জানলেন?'_জোহরা শুধাল।
'এসব জানতে কি আর খুব বুদ্ধি লাগে? তারে ঠিকমতো ঘা দিলাম, আর তা বেজে উঠল। ব্যস্ আর ভাবনা নেই। বিচারটা করতে পারলে বৃষ্টি হবেই। হাজি একটুখানি নীরব থেকে বললেন, 'আগামী শুক্রবার রাত বারোটার পর বিচার বসাব। দেখা যাক কী হয়।'
জোহরা চুপচাপ শুয়ে বাইরের দিকে কান পেতে রইল। আমের বোলের গন্ধ এমন মাতাল কেন? রাত কেন এমন কালো, অন্ধকার? সূর্য যদি আর না উঠত, তাহলেই ছিল ভালো, সবার চোখের আড়ালে চিরদিনের জন্য সে হারিয়ে যেত, যেখানে কেউ নেই, কেউ থাকবে না।
কপালে কোমল হাতের ছোঁয়া পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকতে শুরু করলেন হাজি কলিমুল্লাহ। ওই শব্দটুকু বাদ দিলে, জোহরার মনে হলো, তার পাশে শুয়ে আছে একটা মৃতলোক, বুক থেকে পা পর্যন্ত সাদা কাপড়ে ঢাকা। সে লোমশ হাতটা ছাড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল। এরপর আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। অতি সন্তর্পণে দরজার খিলটা খুলে উঠানের একপাশে আমগাছতলায় এল।
'সারা দিন কোথায় ছিলে তুমি?' খালেদ চুপি চুপি বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই সাঁ করে তার সামনে গেল জোহরা, চাপা-গলায় বলল, 'না খেয়ে থাকতে খুব ভালো লাগে, না?'
কথা বলার চেষ্টাও না করে খালেদ থ হয়ে রইল। হঠাৎ ডান হাতটা তুলে ওর গালে একটা চড় মেরে ক্ষিপ্তের মতো জোহরা বলল, 'আমি আর এত কষ্ট সইত পারব না। বাড়ি থেকে চলে যাও, চলে যাও তুমি!'
কাপড় দিয়ে মুখটা ঢেকে ও প্রায় দৌড়ে উঠে গেল বারান্দায়, ঘরের ভিতরে গিয়ে খিল এঁটে দিল।
খালেদ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল। তার দুই চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে, কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। ভোরবেলায় অন্যেরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, নদীর ধারে ধারে জমির আলের ওপর দিয়ে মিছিমিছি সে হেঁটে বেড়াল, এরপর চলে গেল বন্দরে, তার বড় দুই ভাই যেখানে কজ করেন, সেই গদিতে; কিন্তু কোথাও মন টিকল না। শেষ পর্যন্ত কি যেন এক অজানা আকর্ষণে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিল।
শুক্রবার রাত বারোটা বেজে গেলে একে একে সবাই গিয়ে হাজির হলো মৌলানা মহীউদ্দিনের বৈঠকখানায়। এর আগেই কানাঘুষার মারফতে ব্যাপারটা সারা গ্রামে জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সবার তো আর বিচারের ক্ষমতা নেই। আজকের মজলিশ শুধু গ্রামের আলেমমণ্ডলী ও মাতব্বরদের নিয়ে। দরজা-জানালা বন্ধ করার পর আসামিদের মাঝখানটায় বসিয়ে তাঁরা আলোচনা শুরু করলেন।
তিন দিন তিন রাত্রি হাদিস-কিতাব ঘেঁটে একটা ফতোয়া তৈরি করেছিলেন হাজি কলিমুল্লাহ। মৌলানার অনুমতি নিয়ে তিনি তা পড়ে শোনালেন।
বাতাসী অনেক আগে থেকেই বিনিয়ে বিনিয়ে গুনগুন করছিল, এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। বিলাপ করে বলতে লাগল, 'ও মা গো, এ-ও আমার কপালে ছিল গো! আঁতুড়ঘরে কেন মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেললে না গো!'
'এই বেটি কান্না থামা!' হাজি ধমক দিয়ে উঠলেন। বললেন,_'সে সময় বুঝি খুব ফুর্তি লেগেছিল?'
মৌলানা মহীউদ্দিনকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। তাঁর সৌম্য মুখমণ্ডলে বেদনাতুর গাম্ভীর্যের কান্তি। ধীরে ধীরে মুখ তুলে শান্ত গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন,_'কি গো, তোমার কিছু কওয়ার আছে?'
'কী কইব বাবা, আপনারা তো গরিবের কথা বিশ্বাস করেন না। আমরা তো মানুষ নই, কুকুর-বেড়াল! আমাদের আবার ইজ্জত কী! বাতাসী চোখ-মুখে বলল,_'না হলে এমন বদনাম আপনারা আমার ওপর ফেলতে পারতেন!'
'কিন্তু এসব কথা তো আর আসমান থেকে পড়ে না!' হাজি কলিমুল্লাহ বললেন,_'অন্য কারো নামে তো ওঠেনি?'
'সে আমার কপালের দোষ। না হলে, ও বেঁচে থাকতেই আমি কতবার বমি করেছি, প্রতিরোজ পোড়ামাটি আর তেঁতুল না খেয়ে থাকতে পারিনি_এসব জিনিস কারো চোখে পড়ত না!'
একটা ময়লা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে বসে বসে কোঁকাচ্ছিল বাতাসীর মামাতো ভাই রহিমদ্দি। তাকে সওয়াল করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শুধু।
বিচারের আলোচনা যখন এগিয়ে চলছিল, তখন দক্ষিণ দিক থেকে পালে পালে কালো মেঘ এসে সমস্ত আকাশ ছেয়ে ফেলেছিল। চাঁদ বারেবারে আড়ালে পড়ছে, গাছপালা ও খামারে-নদীতে আলোছায়ায় লুকোচুরি।
একসময় বাতাস বন্ধ হয়ে গেল, অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল সারাটা প্রকৃতি! ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে মাঝে মাঝে গুরু গুরু আওয়াজ উঠল, সঙ্গে সঙ্গে চমকাল বিদ্যুৎ। ঘরের ভেতর সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল।
ঠিক এমনি সময় হাজি সাহেবের বাড়িটার পিছনটায় আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল একটি মানুষের ছায়ামূর্তি। পা টিপে টিপে খোলা জানালার কাছে এসে অনেকক্ষণ সন্ধানী দৃষ্টিতে চেয়ে রইল, ঘরের ভেতরে আলো নেই; নাম-না-জানা অরণ্যের ভেতর কোনো প্রেতপুরীর মতো সমস্ত বাড়িটা রুদ্ধ-নিশ্বাসে ঝিম ধরে আছে।
জানালা থেকে সরে এসে মূর্তিটা ভিটির ধার ঘেঁষে চলতে শুরু করল, রান্নাঘরের পাশ দিয়ে ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। একেকবার বিজলি চমকায় আর সে যেন শিউরে ওঠে গভীর আতঙ্কে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাস বইতে শুরু করল, মেঘে মেঘে সংঘাতে, গর্জনে চারদিক তোলপাড় হতে লাগল। দরজাটা হয়তো ভেজানো ছিল, আচমকা দমকা হাওয়ায় তা সশব্দে খুলে গেল। মানুষটা ত্রস্তপদে এসে উঠল বারান্দায়। এদিক-ওদিক খানিক চেয়ে একসময় মরিয়া হয়েই যেন ঘরে ঢুকে পড়ল। ওপরে-নিচে কেবল শব্দ, শব্দ আর শব্দ। জোর বাতাসের তোড়ে একেকবার মোচড় খেয়ে ওঠে করগেটের চালগুলি, কাঠের বেড়ায় অবিরত ধুপধাপ আওয়াজ।
খাটের কাছে এসে ইতস্তত করতে লাগল মানুষটা, কী করবে যেন ঠিক করে উঠতে পারছে না। শরীরে রোমগুলি কাঁটা দিয়ে উঠছে, ঢিবঢিব করছে হৃৎপিণ্ড, চিনচিন করে মস্তিষ্কে রক্ত উঠে চোখ দুটো ঝাপসা করে দিচ্ছে। তার ভাবনা, কোথায় এলো সে? এ কি জন্ম, না মৃত্যু? এ কি সব হারানোর হাহাকার, না মিলনের উন্মত্ত রংরাগ? কান পেতে সে যেন শুনল, চুরির রিনিঝিনি, একটি গভীর শান্ত নিশ্বাস, কাপড়ের মৃদু খসখস। ঘ্রাণ আসছে, এ কী আমের বোলের, না চুলের গন্ধ? না, না, এখানে নয়। এ তো সে চায় না, চাইতে পারে না।
এক পা-দু পা করে সে পিছিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় অনুভব করল, একটা সুপুষ্ট নম্র মসৃণ হাত অন্ধকার থেকে উঠে এসে গানের কলির মতো পরম আশ্বাসে তার হাতকে আকর্ষণ করল।
তখন সমস্ত আকাশে মেঘেদের হুড়োহুড়ি লুটোপুটি লেগে গেছে, মন্দ্র-গর্জনে একেকবার কেঁপে কেঁপে উঠছে সারা পৃথিবী। একটানা ঝড়ের তীব্র বেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে গাছপালা, মত্ত হয়ে কে যেন লেগেছে লুণ্ঠনের উচ্ছৃঙ্খল তৎপরতায়। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল মন্থন করে যেন এক মহাপ্রলয়ের উচ্ছ্বসিত শব্দের ভয়ংকর-সুন্দর রাগিণী।
এভাবে কতক্ষণ ঝড় চলল হয়তো কেউ বলতে পারবে না। বাতাস যখন কমতে লাগল, তখন অযুত মুক্তাবিন্দুর মতো নামল বৃষ্টি।
ধারালো হাওয়ার সঙ্গে প্রথম যখন বৃষ্টি নামল, তখন তাতে রইল শুধু নবজাতকের বিক্ষোভ, ঘরবাড়ির ওপর দিয়ে শুধু ঝরঝর ঝাপটা দিয়ে গেল। কিন্তু বেশিক্ষণ এ রইল না। ধ্রুপদ সংগীতের বিলম্বিত লয়ের মতো বাতাস যতই কমতে লাগল, বর্ষণে ততই এল নিবিড়তা। এরপর শুধু ঝমঝম শব্দ।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল জানা নেই। একসময় খোলা দরজা পার হওয়ার পর উঠোনে নেমে বৃষ্টির মধ্য দিয়েই টলতে টলতে উত্তর-ভিটির ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল মানুষটা। তার পেছনে পেছনে এসে জোহরা এলোমেলো কাপড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীর ভিজে যেতে লাগল বৃষ্টির ছাটে।
খানিকক্ষণ পরে একটা ছাতা মাথায় ঘাড় নিচু করে ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়িতে ঢুকলেন হাজি কলিমুল্লাহ। হঠাৎ তাঁকে দেখতে পেয়ে জোহরা বলে উঠল,_'অত দেরি যে! আর ইদিকে আমার বড্ড ডর লাগছে।'
'কী আর করি বলো, আপদ চুকিয়ে এলাম!' ছাতাটা বেড়ায় ঠেস দিয়ে রেখে হাজি বললেন,_'সে একটা পাঁড়-হারামজাদী, শেষ পর্যন্ত কিছুতেই দোষ স্বীকার করল না। কিন্তু বাতাসীর মতো মেয়েলোকের ফাই-ফুই বুঝি আমি ধরতে পারি না? দুটোকে দিলাম পঞ্চাশ জুতো করে, তার ওপর কালকে গাঁ ছেড়ে চলে যাবে। দেখলে আল্লাহর রহমত? সঙ্গে সঙ্গে বিষ্টি নামল!'
'হ্যাঁ, তাই তো, বড় তাজ্জব ব্যাপার!' কথাটা শেষ করে ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে গেল জোহরা, তার অঙ্গভঙ্গি রহস্যময়।
হাজি হৈ হৈ করে উঠলেন, বললেন,_'আরে, আরে করছ কী? তুমি পাগল হলে নাকি? এত রাত্রে ভিজছ, সর্দি করবে যে।'
'না, সর্দি আমার কোনোকালেই করে না।' জোহরা বারান্দার কাছে এলো। চোখের ওপর থেকে একরাশ চুল ডান হাতে সরিয়ে ফোটা-ফুলের মতো উজ্জ্বল মুখটা তুলে মধুর হাসি-ওপচানো ঠোঁটে বলল_'আপনি জানেন না? বছরের পয়লা বিষ্টি, ভিজলে খুব ভালো। এতে যে ফসল ফলবে।'
কিন্তু সে বছর এসব কিছুই হলো না। ফাল্গুন চলে গেল, উত্তরদিকটা কিঞ্চিৎ কালোও হলো না; চৈত্র শেষ হতে চলল, আকাশে দু-একদিন গুরু গুরু আওয়াজ হলো, গুমোট হয়ে রইল সারাটা প্রকৃতি; কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।
এরপর এল বৈশাখ। আর এখনও সূর্য আগুনের ফুলকি উড়িয়ে তীব্র তেজে জ্বলতেই লাগল, মাটির বুক চিরে মাথা উঁচিয়ে-ওঠা পাটের চারাগুলি আস্তে আস্তে কুঁকড়ে গেল। ওপরে খাঁ-খাঁ শূন্য, নিচে আদিগন্ত মুক্ত সুদূর, তারও নিচে বাঘবন্দি নকশার মতো জমিগুলি রোদে-পোড়া, বিবর্ণ। দুপুরবেলা ক্ষেতের আলের ওপর গিয়ে দাঁড়ালে কলজেটা সহসা ছ্যাঁৎ করে ওঠে, ঝলসানো তামাটে জিহ্বা বার করে সারা মাঠটা ডাইনির মতো হাঁ করে আছে। জ্বলন্ত ক্ষুধা নিয়ে সে নিজের বুকের শিশুশস্যকে গ্রাস করেছে, আগামী বছর যে গজব নেমে আসবে তাতে সন্দেহ নেই।
কিন্তু কেন? এর পিছনে নিশ্চয় কোনো গুরুতর কারণ আছে। সেদিন জুম্মা নামাজের পর আলোচনা উঠল। মিম্বরের কাছে দাঁড়িয়ে মৌলানা মহীউদ্দিন বলতে লাগলেন, 'বেরাদরানে-ইসলাম! আমি অধম বান্দা, আপনাদের খেদমতে কী বয়ান করব, আপনারা সব বিষয়েই ওয়াকিফহাল। কিতাবে আছে, খোদার গজব নামে তখনি, যখন দুনিয়া গুনাগারিতে ভরে যায়। আমরা এখন কী দেখছি? না, ছেলে বাপের কথা শোনে না, জেনানা বেপর্দা, চুরি-ডাকাতি বদমায়েশিতে দুনিয়া পূর্ণ হয়েছে। এদিকে নামাজ নেই, রোজা নেই, হজ-জাকাত নেই। আজ চলুন, আমরা তাঁর দরবারে জার-জার হয়ে কাঁদি, মাঠে গিয়ে সবাই হাত তুলে মোনাজাত করি, তিনি রাহমানুর রহিম, ইচ্ছা করলে একটু দয়া করতেও পারেন।'
মৌলানা সাহেবের কণ্ঠস্বরে গুরুগম্ভীর ধ্বনিতরঙ্গে পাকা মসজিদের ভিতরটা গমগম করতে লাগল। মুসলি্লদের মধ্যে থেকে উঠে দাঁড়ালেন হাজি কলিমুল্লাহ। থুতনিতে একগুচ্ছ সাদা দাড়ি, মাথায় কিস্তি টুপি, নামাজ পড়তে পড়তে কপালের মাঝখানটায় দাগ পড়েছে। তিনি প্রথমে গলা খাঁকরানি দিলেন, পরে আবেগকল্পিত গলায় বলতে লাগলেন, 'মৌলানা সায়েব যা বললেন তা অবশ্যই আমরা পালন করব। কিন্তু এইসঙ্গে একটা কথা সক্কলের মনে রাখতে হবে, কুকর্মের বিচার চাই। এই অনাবৃষ্টি কেন হলো, আপনারা ভেবেছেন কি? খোলাখুলি বলতে গেলে, নিশ্চয় কোনো মেয়ে অবৈধভাবে গর্ভবতী হয়েছে, তৌবা, আস্তাক ফেরোল্লা। এই অঞ্চলে, আশেপাশের কোনো গ্রামে অথবা আমাদের গ্রামেও হতে পারে। এদের তালাশ করে বার করতেই হবে, নইলে এই আজাবের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে না। এরে দুররা মেরে ঠাণ্ডা করতে হবে।'
ডান হাতের আঙুলগুলি দাড়িতে একবার চালিয়ে গরমে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন হাজি কলিমুল্লাহ, তাঁর মগজের কোষে কোষে সত্যিকারের অপরাধীকে খুঁজে পাওয়ার ভাবনা।
দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে ফুটবল খেলার ময়দানে যেদিন 'মেঘের নামাজ' হওয়ার কথা, তার এক দিন আগেই অসুখে পড়লেন সুফি মৌলানা মহীউদ্দিন।
জামাতে ইমামতি করবার জন্য হাজি সাহেবকে গাঁয়ের তরফ থেকে অনুরোধ করা হলো। প্রথমে বিনয় করলেও, সকলের খেদমতে পরে রাজি হলেন।
সেদিন নামাজ শেষ হওয়ার পর পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়ালেন হাজি কলিমুল্লাহ, বহু দূর চাউনি বুলিয়ে দেখলেন, দুনিয়াটা এখনো জিন্দেগির অযোগ্য হয়ে ওঠেনি, এখনো ডাক দিলে আলেমুল গায়েবের দরবারে হাজিরা দিতে হাজার লোককে পাওয়া যায়। তিনি চেয়ে রইলেন, আর দেখলেন অগুনতি টুপির শোভা, হোক না সেগুলি তেল-চিটচিটে অথবা ছেঁড়াখোঁড়া। খোলা প্রান্তরে গালভাঙা তামাটে মানুষগুলি বসে আছে অসহায়ের মতো, সবারই মনে একটুখানি রহমের প্রার্থনা। হাজি কলিমুল্লাহ দুহাত তুলে দরাজ গলায় উচ্চারণ করতে লাগলেন : 'ইয়া আল্লাহ, ইয়া বারে খোদা, তুই চোখ তুলে চা, একটু দয়া কর তোর বান্দাদের। তুই আসমান-জমিন, চান-সুরুজের মালিক, তোর অঙ্গুলি হেলনে সাগর দোলে, হাওয়া ছুটে চলে, নহর বয়, তোর একটুখানি ইচ্ছায় এই দুনিয়া ফুলে-ফসলে ভরে উঠতে পারে। মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে, শান্তি দে তুই!'
'আল্লাহুম্মা আমিন! আল্লাহুম্মা আমিন!' সারা জামাতজোড়া একই কাতর আওয়াজ। হাজি কলিমুল্লাহর সাদা দাড়ি চোখের পানিতে ভিজে গেল। কেঁদে জার-জার হয়ে তিনি দোয়া খতম করলেন, 'সোবহানাকা রাবি্বকা রাবি্বল ইজ্জাতে আম্মাইয়াসসেফুন, আসসালামু আলাল মুরসালিনা, আলহামদু লিল্লাহে রাবি্বল আলামিন!'
একইভাবে এক দিন, দুই দিন, তিন দিন ময়দানে গিয়ে জামাতে শামিল হলো ছেলে-বুড়ো-জোয়ানেরা। তাদের এক চোখ আকাশের দিকে, আরেক চোখ ফসল কুঁকড়ে যাওয়া খামারের দিকে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, এক মায়ের এক পুত্রের গায়ে চুনকালি মাখিয়ে, তার মাথার কুলোয় কোলাব্যাঙ আর বিষকাঁটালির গাছ রেখে রাতের পর রাত মেঘ-খেলা খেলল, নদীর ধারে শিনি্ন রেঁধে কলাপাতায় ফকির-ফকরাকে খাওয়াল। তাদের ঘাড়ে ব্যথা হয়ে গেল ওপরের দিকে চেয়ে থাকতে; কিন্তু সেই রোদ-চুয়ানো কাকচক্ষু নীল একখণ্ড মেঘের আভাসও দেখা গেল না।
মাগরিবের নামাজের পর পাটিতে বসে তসবিহ জপতে জপতে এসব কথাই ভাবছিলেন হাজি কলিমুল্লাহ। তাঁর চোখের পুতুলিতে অবসাদের ছায়া। গভীর ভাবনার কারণ আছে বৈকি! সুতোর চোরাকারবার থেকে যে কয়েক হাজার টাকা পেয়েছিলেন, তার অর্ধেক দিয়ে গুদাম কিনেছেন মেঘনার বন্দরে, বাকি অর্ধেক দিয়ে কিনেছেন দুন দেড়েক জমি। নিজে পাট কিনে মজুদ করতে না পারলে গুদাম কেনার ফায়দা নেই। মাসিক দেড় শ টাকা ভাড়ায় আর কী হয়! অথচ এ বছর গুদামটাকে নিজে ব্যবহার করতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। এদিকে সবগুলি জমি নিজে চাষ করেছেন। এখানটায়ই হয়েছে চরম বোকামি। যদি পত্তনি দিতেন, তাহলে হাজার দেড়েক টাকা নগদ পাওয়া যেত, কিন্তু মুনি-মজুর ও জমির তদারক করতে জান বেরিয়ে যাচ্ছে। বীজ বোনা থেকে এক নিড়ি পর্যন্ত পয়সাকড়ি কম খরচ হয়নি, ভবিষ্যতে আরো হবে, অথচ এদিকে আকাশের যা হাল, তাতে ফসল পাওয়ার বিশেষ আশা নেই।
সুতোর কারবার ছেড়ে দিয়েও ভালো কাজ করেননি। গত বছর হাওয়াগাড়িতে চড়ে গিয়ে হজ করে এসেছেন; ভেবেছিলেন, অতঃপর সংসারের ঝামেলাতে নিজেকে এতটা জড়াবেন না, গুদামটা ছেলেদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজে জমিজমা নিয়েই থাকবেন। কিন্তু টাকার অভাবে সব ভেস্তে গেল। আসলে ব্যবসা ব্যবসাই, এতে সৎ-অসৎ-এর প্রশ্ন নেই, নিয়ত ভালো থাকলে দান-খয়রাত করলেই হলো।
জানালার বাইরে আমের বোলের তীব্র গন্ধ ভেসে আসছিল, বাঁশঝাড়ে শালিকের কিচিরমিচির অনেকটা মন্দীভূত। তসবিহর গুটিগুলি চঞ্চল হয়ে ঘুরছে হাজি কলিমুল্লাহর আঙুলে আঙুলে, এই সঙ্গে তাঁর মনটা ক্রমেই আচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
জৈগুন ঘরে বাতি দিতে এসে যেন চমকে উঠল। বলল, 'মিয়াসাব এখানে? মসজিদে যাননি?'
'না, শরীরটা খুব ভালো নয়।' হাজি সাহেব ওর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, 'তা ছাড়া তোর গিনি্নমা বোধ হয় একখুনি এসে পড়বেন।'
দিন-পনেরো হলো নতুন গিনি্ন বাপের বাড়ি গিয়েছিল নাইওর করতে, আজকে তার আনবার তারিখ। হাজি নিজে যেতে পারেননি, প্রথম তরফের তৃতীয় ছেলে খালেদকে পাঠিয়েছিলেন সকালবেলায়। আসলে বৌকে বাপের বাড়িতে বেশিদিন থকতে দিতে তিনি সব সময়ই নারাজ। প্রথম স্ত্রীকে দশ দিন থাকতে দিয়েছিলেন, তাও একেবারে নতুন অবস্থায়। দ্বিতীয় স্ত্রীর বেলায় দিনের সংখ্যা আরো কিছুটা বেড়েছিল। তবে এখন পড়তি বয়েস, সব ব্যাপারে কড়াকড়ি চলে না। দুবছর আগে দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সংসার থেকে তাঁর মন একেবারে উঠেই গিয়েছিল। কিন্তু খোদার কুদরত, কার সাধ্য তার কিনারা করে? তিনি কপালে যা লিখে রেখেছেন, তা একদিন ফলবেই। গতবার যখন হজে গিয়েছিলেন, তার মাসখানেক আগে সবাই ধরে বসল, এমন সোনার সংসার, একজন গৃহিণী না থাকলে কোনো কিছুই ঠিক থাকবে না।
কিন্তু পাত্রী? বয়েস ষাট পুরো হতে চলল, এখন হাতে ধরে কে নিজের মেয়ে দিতে যাবে?
'হাসালেন হাজি সাহেব, হাসালেন। আপনার কি না পাত্রীর অভাব?' মজু প্রধান দাড়িতে হাত বুলিয়ে কন যে বিয়ে করবেন, আমি পাত্রী ঠিক করে দিচ্ছি। তাও যেমন-তেমন নয়, এমন কন্যা দেব, চোখে পলক পড়বে না।'
হাজি কলিমুল্লাহর চোখের তারা দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। একটা অজানা অনুভূতিতে তাঁর হৃৎপিণ্ডটা ধুক ধুক করছিল; কিন্তু বাইরে আগাগোড়া ম্লান হয়েই রইলেন, আগেকার সহধর্মিণীদের স্মৃতি এত শিগগির ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তিনি একটা ঢোক গিলে বললেন, 'দেখুন, তিনকাল গিয়ে এককাল পড়েছি, এখন আমোদ-আহ্লাদ করার সময় নয়। ঘরের তদারক আমার ফাইফরমাশটা করতে পারলেই হলো।'
'তা তো বুঝলাম।' মজু প্রধান যুক্তি দেখালেন, 'ভাঙা নাওয়েও কাজ চলে, আবার নতুন নাওয়েও চলে; কিন্তু কোন্টা আমরা চাই? কোন্টা দিয়ে গাঙ পাড়ি দিতে সুখ?'
এর পর সাতকানি জমি সাফকাওলা করে দিয়ে যে পাত্রী ঠিক হয়েছিল, সে মজু প্রধানেরই মেয়ে-ঘরের নাতনি। বয়স একুশ-বাইশ বছর হবে। এ দেশের মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি হয়, সে হিসেবে হাজি সাহেবের সঙ্গে সম্বন্ধটা মোটেই বেমানান হয়নি।
রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিল গুছিয়ে জৈগুন এল। অর্থপূর্ণ গাম্ভীর্যের সঙ্গে একটা পিঁড়ি টেনে নিয়ে বসল। হাজি সাহেবের ওজিফা তখনো শেষ হয়নি। মুখের বিড়বিড় খানিকক্ষণের জন্য থামিয়ে তিনি জিগগেস করলেন, 'কিরে, কিছু খবর আছে?'
জৈগুন বলল, 'আছে।'
'কী শুনি!' তসবিহর মালায় আঙুল থেমে গেল হাজি কলিমুল্লাহর, তিনি উৎসুক দৃষ্টিতে চাইলেন। কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে গোপন খবর সংগ্রহের জন্য তিনি জৈগুনকে নিযুক্ত করেছিলেন, আর সে জন্যই এই আগ্রহ।
'আমি আজ গিয়েছিলাম বাতাসীর কাছে। গিয়ে দেখি, সে তার খাশিটার জন্য আমপাতা পাড়ছে। আমাকে দেখেই সে নানান কথা বলতে লাগল, কিন্তু আমি চেয়ে রইলাম ওর শরিলের দিকে।' দরজায় একবার চেয়ে নিয়ে জৈগুন বলল, 'ওর তলপেটটা বেশ ফোলা মনে হলো।'
হাজি চিন্তিতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, 'ওর জামাই না কবে মারা গেছে?'
'তা সাত-আট মাস তো হবেই!' জৈগুন হিসাব করে বলল, 'কিন্তু ওর পেট মনে হলো চার-পাঁচ মাসের।'
'তাই নাকি? তাহলে তো বেশ অনেক দিনের ফাঁক।' হাজি কলিমুল্লাহ যেন সত্যদর্শন করেছেন, তাঁর চোখে আশার আলো ফুটে উঠল। নিচুগলায় জিগগেস করলেন, 'আচ্ছা, বাতাসীর ঘরে যে লোকটা থাকে, তাকে দেখলি?'
'হ্যাঁ, দেখলাম। অসুখ এখনো সারেনি, তবে আগের চেয়ে একটু ভালো। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখি, সে ঘরের ভিতরে বিছানায় শুয়ে আছে।'
'তা হোক, তা হোক।' হাজি অসহিষ্ণুর মতো বললেন, 'শুয়ে থাকলে কী হবে? শুয়ে থাকলে কি আর এসব কাজ করা যায় না? নিশ্চয় যায়। তুই কী বলিস?'
'হ্যাঁ, আপনি ঠিকই কইছেন। তা ছাড়া বাতাসীর চলাফেরা আমার ভালো মনে হয় না। রজবালি বেঁচে থাকতেই এর সম্বন্ধে কত লোক কত কথা বলেছে। নামাপাড়ার ছমু যে ওর দরজা খুলেছিল, তা কি কেউ শোনেনি? রজবালি টের পেয়েছিল বলেই না দোষটা ছমুর ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। না-হলে মেয়েমানুষের চোখঠারানি ছাড়া কি অমন কাজ কেউ করতে সাহস পায়?'
'যদি এই ঠিক হয়, তাহলে তো আর কোনো কথাই নাই। আমার বিশ্বাস, বাতাসীই এ কাম করেছে_না হলে বৃষ্টি হবে না কেন?' হাজি আবার তসবিহ জপতে লাগলেন, খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন, 'তবু রাখ্, আমি নিজে একটু পরখ করে নিই, এর পর একটা কিছু করা যাবে।'
জৈগুন চলে গেলে আবার গভীর চিন্তামগ্ন হলেন হাজি কলিমুল্লাহ। তাঁর কপালের বলিরেখা আরো কুঁচকে গেল। তসবিহর গুটিতে ঘন ঘন আঙুল চলতে লাগল। বাতাসী, বাতাসী, বাতাসী। বাতাসী ছাড়া এ কাজ আর কারো নয়। অল্প বয়েসে স্বামী মারা যাওয়ার এই দোষ! কেননা, স্বামীসঙ্গ একবার যে পেয়েছে, সে সেই স্বাদ কি সহজে ভুলতে পারে? এ হচ্ছে আফিমের মতো, ভাত ছাড়া যায়, তবু ছাড়া যায় না এর নেশা। তা ছাড়া ওর পুরো জোয়ানী। যেমন তেমন দু-একজন পুরুষ ওর কাছে কিছু নয়, এক চোখের বাঁকা চাউনিতেই কাৎ করে ফেলতে পারবে। অথচ কথা বলার কী কায়দা। মামাতো ভাই, দিনমজুরি করত, কালাজ্বরের কবলে পড়ে বিপদ হয়েছে, কেউ নেই, না দেখলে চলে না। এসব কথা দিয়ে আর চিঁড়ে ভিজবে না। আসলে লোকটাকে এনেছে এক বিছানায় রাত কাটাবার বুঝতে বাকি নেই।
কিন্তু এর শাস্তি হবে কী? কিতাবের হুকুম মানলে, গলা-ইস্তক মাটিতে পুঁতে এর মাথায় পাথর মারতে হবে, যতক্ষণ না প্রাণটা বেরিয়ে যায়। কিন্তু এ যুগে তা কি সম্ভব? থানা আর পুলিশ রয়েছে যে। তাহলে উপায়? জুতো মারা? একঘরে করে রাখা? গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া?
হাজি কলিমুল্লাহ যখন এসব ভাবনায় তন্ময় ছিলেন, তখন খালেদ তার নতুন মাকে নিয়ে মরা-গাঙের পানির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
পূর্ণিমা-চাঁদ দেখা দিয়েছিল বাড়ি থেকে রওনা দেয়ার অনেক আগেই, এইবার তো বাঁশঝাড়ের মাথা ছাড়িয়ে উঠে ঝলমল করছে। চারদিক নিঝঝুম, গাছপালায় বাতাসের নড়াচড়ার গরজ নেই।
মরা-গাঙে এখন হাঁটু পানি। দুই পাশে কাদা ঠেলে ডাঙার সঙ্গে যে সরুপথটার মিল হয়েছে তার পরিষ্কার বালুর ওপর দিয়ে ঝিলঝিল করে কেটে চলেছে ফোয়ারার স্রোত। পানির ভিতর থেকে গজিয়ে ওঠা বোরো ক্ষেতগুলিতে কচি ধান-পাতার জড়াজড়ি।
নিচু হয়ে জুতোজোড়াটা ডান হাত দিয়ে খুলে ফেলল জোহরা। তার কাঁধে ছোট ছেলেটা। আর অসুবিধা হচ্ছে দেখে পিছন থেকে খালেদ পাশে এসে বলল, 'সাজুকে আমার কাছে দিন।'
ওরা দুজনে প্রায় সমবয়সী। প্রথম প্রথম 'আপনি' বলতে লজ্জা করত খালেদের, কিন্তু এখন আর সে ভাবটা নেই।
জোছনায় আলোকিত বড় ছেলের মুখের দিকে চাইল জোহরা, টানা ভুরুর নিচে ওর সুন্দর চোখ দুটো আরো সুন্দর মনে হলো তার, একটা অব্যক্ত অনুভূতির ছলছলানিতে বনের অন্ধকারে শিহরিত নদীর মতো দুলে উঠল বুকের ভিতরটা। আচ্ছন্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার কষ্ট হবে না তো?'
খালেদ হাসল! বলল, 'না, এ আবার কষ্ট কী?'
সাজুকে পাঁচ বছরের রেখে ওর আম্মা এন্তেকাল করেছেন দুবছর আগে, আদর-যত্ন না-পাওয়ায় ওকে কান্নারোগে ধরেছিল। কিন্তু বর্তমানে তা নেই। নতুন মাকে তার এমনি ভালো লেগেছে যে সে এক মুহূর্তের জন্যও তার কাছছাড়া হয় না। জোহরা যখন নাইওর করতে যায়, তখন ও তার কোলে উঠে চলে গিয়েছিল।
অন্য কাঁধের ওপর থেকে অঘোরে ঘুমিয়ে থাকা ছোটভাইটিকে নিজের কাঁধে নিতে গিয়ে খালেদের মনে হলো, কপোতের বুকের মতো উষ্ণ, প্রবালের মতো কোমল কিসের মধ্যে যেন তার বাঁ হাতের আঙুলগুলি ক্ষণিকের জন্য হঠাৎ হাওয়ায় চাঁপার কলির মতো কাঁপুনি খেয়ে গেল। নিমেষে তার সমস্ত শরীরটা শিরশির করে উঠল ভরামেঘে বিদ্যুৎ সঞ্চারের মতো। পলকের জন্য তার চোখে পড়ল, সহসা কেমন রাঙা হয়ে উঠল মেয়েটির মুখ, তার সারা চেহারায় রক্তের প্রবাহ বহ্নির মতো ছড়িয়ে গেল। খালেদ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না; আরেক জন্মের কোনো নিবিড় স্মৃতি অস্পষ্ট মনে পড়ার মতো কী এক অজানা বেদনায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঝিরঝিরে পানির ওপর দিয়ে সুমুখে হাঁটতে লাগল।
কিন্তু জোহরা দাঁড়িয়েই রইল। কাপড়টা ঠিক করে নিয়ে চাঁদের দিকে মুখ উঁচিয়ে চাইল একবার, আবার চাইল সামনে চলমান মূর্তিটার দিকে। এর পর সে চঞ্চল হয়ে উঠল। সেই রুপালি বালুর ওপরে ফোয়ারার স্রোতে বয়ে চলা রাস্তাটায় ত্রস্ত হরিণীর মতো পা ফেলে হাঁটুপানির কাছে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে পিছন থেকে শাড়িটা কুচকে এনে ডান হাতে হাঁটুর কাছে ধরা, জোছনা-উছল কালো পানির দিকে মুখ নিচু করে জোহরা দেখল, তার মূর্তিটা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে, এই সঙ্গে ছোট ছোট ঢেউয়ে ভেঙে যাচ্ছে চাঁদের চেহারাটাও। হঠাৎ মুখ তুলে সে ডাকল, 'খালেদ!'
'কী!'_কিছুদূর থেকে খালেদ সাড়া দিল।
'আমাকে ফেলেই চলে যাচ্ছ।'_স্বপ্নের স্বরে যেন জোহরা বলল, 'আমি চলতে পারছি না। দ্যাখো, দ্যাখো! পানিটা কী সুন্দর!'
খালেদ ফিরে এল। বলল, 'আপনার কী হয়েছে বলুন তো, চলুন তাড়াতাড়ি। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে।'
'ও তাই তো। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে!' পানি ঠেলে কিছু দূর এগিয়ে আবার থমকে দাঁড়াল জোহরা। ঝিলিমিলি ঢেউয়ের দিকে চেয়ে বলল, 'দেখছ, কী সুন্দর পানি! এমন পানিতে মরতেও সুখ।'
কোনো জবাব দিল না খালেদ, মুখ নিচু করে চুপচাপ এগোতে লাগল।
ওপারে কোথায় একটা পাখি ডেকে যাচ্ছে_'বৌ কথা কও।'
নদী পেরিয়ে এসে চপচপ পানি থেকে পা দুটো ঝাড়া দিয়ে নতুন জুতোজোড়াটা পরার সময় জোহরার মনে হলো তার বুকের ভিতরে কিছু নেই, বিবাগী হাওয়ার মতো কিসের এক রিক্ত হাহাকার গুমরে গুমরে মরছে। নিজের কথা ভাবতেই সে আঁতকে উঠল, তার শরীরটা ঝিম ধরে অবশ হয়ে এল।
খালেদ আস্তে আস্তে হাঁটছিল। পিছন থেকে সে একটা কাতর-স্বর শুনতে পেল_'একটু দাঁড়াও!'
'আবার কী হলো আপনার!'
'কী জানি কিছু বুঝতে পারছি না! আমার চোখ দিয়ে এমন পানি পড়ছে কেন?' জোহরা ব্যাকুলভাবে এগিয়ে গিয়ে খালেদের চোখের সামনে নিজের চোখজোড়া বিস্ফারিত করে দাঁড়াল, চাঁদের আলোয় দেখা গেল, তার টলটলে দুটো চোখ দিয়ে মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে।
খালেদ আবার উচ্চারণ করল, 'কী হলো আপনার?'
'তুমি কিচ্ছু জানো না, কিচ্ছু বোঝো না!' কাপড়ের খুঁট দিয়ে চোখ দুটো মুছে জোহরা অপ্রকৃতিস্থের মতো বলল, 'সাজুকে দাও আমার কাছে। চলো শিগগির। লোকজন নেই, আমার বড্ড ভয় করছে।'
ওরা যখন মুখোমুখি হয়েছিল, তার কিছু আগে থেকে কিঞ্চিৎ হাওয়া বইতে শুরু করেছিল, আর যখন চুপচাপ চলতে শুরু করল, তখন একখণ্ড ঈষৎ কালো মেঘ দক্ষিণ থেকে ধীরে ধীরে ভেসে আসতে লাগল। খড়ম পায়ে উঠোনে পায়চারী করছিলেন হাজি কলিমুল্লাহ, আকাশের দিকে চেয়ে তিনি চমকে উঠলেন। তাহলে তাঁর আন্দাজই ঠিক?
'জৈগুন! ও জৈগুন!' তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'দেখে যা, আমরা যা ভাবছি তাই ঠিক। আসমানে সাজ দেখা দিয়েছে।'
জৈগুন চৌকাঠের কাছে এসে মুখ বাড়িয়ে বলল, 'তবু তো আপনি বলছেন, আরো পরখ করতে। আমার মনে কোনো সুবা-সন্দে নেই। বাতাসী যা ছিনাল।'
আকাশে চলমান মেঘটার দিকে চেয়ে আবার পায়চারী করতে লাগলেন হাজি কলিমুল্লাহ, এর বিচারটা কী হবে তিনি তার কিনারা করতে পারছেন না।
আধঘণ্টা পরে জোহরা যখন এল, শুয়ে শুয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতেও বারবার তাল কেটে যেতে লাগল, অনেক রাত পর্যন্ত চোখে ঘুম এল না!
মনস্থির করে পরদিন সকালে তিনি গিয়ে উঠলেন বাতাসীর বাড়িতে, পুবপাড়ার আমবাগানের ওধারে। বাঁশের চালার নিচটায় পাকালের ধারে বসে ও খুদের জাউ রাঁধছিল, হাজি সাহেবের সাড়া পেয়ে একটা চৌকি হাতে উঠানে এল। এমন গণ্যমান্য লোক, সাতজন্মে একবার এসেছেন ওর এখানে, কী দিয়ে মেহমানদারি করবে, সে ঠাহর করতে পারল না।
মাথায় কাপড় টেনে ও কী বলছিল সেদিকে হাজির মোটেই নজর ছিল না, তিনি গোপনে আড়চোখে হরিদ্রাভ লাবণ্য-স্নিগ্ধ ওর দেহটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন।
এদিকে বাড়ির নাশতা-পর্বের তদারক শেষ হওয়ার পর জোহরা গুম হয়ে বসেছিল তার শোবার ঘরে চৌকির কিনারায়।
বিয়ে হওয়ার পর থেকে কিসের যেন এক আশ্চর্য মায়ায় বিনা কাজের সময়টুকু সে এখানটায় বসেই কাটিয়ে দেয়। এ কিসের জাদু? কিসের মন্ত্রণা? জোহরা তা বুঝতে পারে না। বাড়ির চেহারা বোধ হয় অনেকদিন থেকেই অদলবদল হয়েছে, কিন্তু এ কামরাটায় কোনো পরিবর্তন নেই, দিনে দিনে নতুন জিনিস যোগ হয়েছে মাত্র। আগেকার গিনি্নদের হাতের ছাপ অনেক কিছুতেই এখনও টাটকা হয়েই আছে, অন্ধকারে বসে থাকলে তাদের ঠোঁটের ফিসফিস আলাপও যেন সে শুনতে পায়। তখুনি ওর মনে হয়, এ ঘরে ঢোকবার কোনো অধিকার তার নেই, এখানকার সব দখল করে সে ডাকাতের কাজ করল।
কিন্তু আমার কী দোষ? আমি তো রাজি হতে চাইনি! নানা বলল, বোন কাঁদিসনে, দু-একটা বছর সবুর কর, বুড়োটা মরল বলে। তখন বেশ জোয়ান দেখে একটা বর জুটিয়ে দেব। এখন সম্পত্তিটা হাত করে নে।'
জোহরা আপন মনে আওড়াল, 'ছাই সম্পত্তি!'
দগদগে ঘার ওপর দিয়ে গরম বাতাস বইতে থাকলে যেমন করে জ্বলে, ওর বুকের ভিতরটা তেমনি করে জ্বলতে লাগল। দম যেন ক্রমেই বন্ধ হয়ে আসছে। একসময় সে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। ওর চোখের দুটো তারায় জ্বলজ্বল করতে লাগল একটা দুর্বিনীত বন্যতা!
মগজটা গিজগিজ করছিল, এলোচুলে ঝাঁকড়া মাথাটা একবার ঝাড়া দিয়ে জোহরা বাইরে চলে এল। চোখ তুলে চাইতেই ওর দৃষ্টি পড়ল কুয়োর ধারে মেহেদি গাছটার দিকে, ভিজে মাটির রসে তাতে ঘন হয়ে কচিপাতা দেখা দিয়েছে।
কদিন সংকল্প করেও সে মেহেদি গাছটা কাটতে পারেনি। কিন্তু আজকে ডান হাতটা শিরশির করতে লাগল। ত্রস্ত পায়ে সে চলে গেল রান্নাঘরের ভিতরে। সেখান থেকে ধারালো বঁটিটা এনে একেক কোপে একেকটি ডাল কেটে ফেলতে লাগল।
'আহা হা, করে কী গিনি্নমা'_জৈগুন দৌড়ে এল। বলল, 'গাছটা অনেক দিনের, মানুষের কত কাজে লাগে। কর্তা শুনলে ভীষণ রাগ করবেন।'
'তুই এখান থেকে যা তো। কে রাগ করবেন না করবেন, তোর চাইতে আমি ভালো বুঝি। আমার ইচ্ছা হয়েছে, আমি কাটবই।'
'আমি কাম করে খাই, আমার কী? আপনার ভালোর জন্যই বলছিলাম।'
'আশ্চর্য!' জোহরা মুখ তুলে চাইল। বলল, 'আমার ভালো-মন্দের চিন্তা তোকে করতে হবে? দুনিয়াতে আর লোক নেই।'
কর্তার প্রিয় গিনি্নকে আর ঘাঁটাতে সাহস করল না জৈগুন, মুখ কালো করে সে নিজের কাজে চলে গেল।
কেমন করে দুপুর হলো, কেমন করে এল বিকেল, আর কেমন করেই বা রাত্রি এসে পৃথিবীর মুখ ঢেকে দিল, জোহরা কিছুই বলতে পারবে না। তার হৃদয়ের একটা অংশ কে যেন ঝকঝকে ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে নিয়ে গেছে, প্রতিদিনের উচ্ছল ঢেউ সেখানে লাগে না, সেখানে তুষের আগুনের মতো শুধু একটি জ্বালা।
এশার নামাজের পর বিছানায় শুয়ে হাজি কলিমুল্লাহ বললেন, 'যা ভেবেছিলাম, বাতাসীই কুকাম করেছে।'
'কেমন করে জানলেন?'_জোহরা শুধাল।
'এসব জানতে কি আর খুব বুদ্ধি লাগে? তারে ঠিকমতো ঘা দিলাম, আর তা বেজে উঠল। ব্যস্ আর ভাবনা নেই। বিচারটা করতে পারলে বৃষ্টি হবেই। হাজি একটুখানি নীরব থেকে বললেন, 'আগামী শুক্রবার রাত বারোটার পর বিচার বসাব। দেখা যাক কী হয়।'
জোহরা চুপচাপ শুয়ে বাইরের দিকে কান পেতে রইল। আমের বোলের গন্ধ এমন মাতাল কেন? রাত কেন এমন কালো, অন্ধকার? সূর্য যদি আর না উঠত, তাহলেই ছিল ভালো, সবার চোখের আড়ালে চিরদিনের জন্য সে হারিয়ে যেত, যেখানে কেউ নেই, কেউ থাকবে না।
কপালে কোমল হাতের ছোঁয়া পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকতে শুরু করলেন হাজি কলিমুল্লাহ। ওই শব্দটুকু বাদ দিলে, জোহরার মনে হলো, তার পাশে শুয়ে আছে একটা মৃতলোক, বুক থেকে পা পর্যন্ত সাদা কাপড়ে ঢাকা। সে লোমশ হাতটা ছাড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল। এরপর আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। অতি সন্তর্পণে দরজার খিলটা খুলে উঠানের একপাশে আমগাছতলায় এল।
'সারা দিন কোথায় ছিলে তুমি?' খালেদ চুপি চুপি বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই সাঁ করে তার সামনে গেল জোহরা, চাপা-গলায় বলল, 'না খেয়ে থাকতে খুব ভালো লাগে, না?'
কথা বলার চেষ্টাও না করে খালেদ থ হয়ে রইল। হঠাৎ ডান হাতটা তুলে ওর গালে একটা চড় মেরে ক্ষিপ্তের মতো জোহরা বলল, 'আমি আর এত কষ্ট সইত পারব না। বাড়ি থেকে চলে যাও, চলে যাও তুমি!'
কাপড় দিয়ে মুখটা ঢেকে ও প্রায় দৌড়ে উঠে গেল বারান্দায়, ঘরের ভিতরে গিয়ে খিল এঁটে দিল।
খালেদ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল। তার দুই চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে, কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। ভোরবেলায় অন্যেরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, নদীর ধারে ধারে জমির আলের ওপর দিয়ে মিছিমিছি সে হেঁটে বেড়াল, এরপর চলে গেল বন্দরে, তার বড় দুই ভাই যেখানে কজ করেন, সেই গদিতে; কিন্তু কোথাও মন টিকল না। শেষ পর্যন্ত কি যেন এক অজানা আকর্ষণে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিল।
শুক্রবার রাত বারোটা বেজে গেলে একে একে সবাই গিয়ে হাজির হলো মৌলানা মহীউদ্দিনের বৈঠকখানায়। এর আগেই কানাঘুষার মারফতে ব্যাপারটা সারা গ্রামে জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সবার তো আর বিচারের ক্ষমতা নেই। আজকের মজলিশ শুধু গ্রামের আলেমমণ্ডলী ও মাতব্বরদের নিয়ে। দরজা-জানালা বন্ধ করার পর আসামিদের মাঝখানটায় বসিয়ে তাঁরা আলোচনা শুরু করলেন।
তিন দিন তিন রাত্রি হাদিস-কিতাব ঘেঁটে একটা ফতোয়া তৈরি করেছিলেন হাজি কলিমুল্লাহ। মৌলানার অনুমতি নিয়ে তিনি তা পড়ে শোনালেন।
বাতাসী অনেক আগে থেকেই বিনিয়ে বিনিয়ে গুনগুন করছিল, এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। বিলাপ করে বলতে লাগল, 'ও মা গো, এ-ও আমার কপালে ছিল গো! আঁতুড়ঘরে কেন মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেললে না গো!'
'এই বেটি কান্না থামা!' হাজি ধমক দিয়ে উঠলেন। বললেন,_'সে সময় বুঝি খুব ফুর্তি লেগেছিল?'
মৌলানা মহীউদ্দিনকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। তাঁর সৌম্য মুখমণ্ডলে বেদনাতুর গাম্ভীর্যের কান্তি। ধীরে ধীরে মুখ তুলে শান্ত গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন,_'কি গো, তোমার কিছু কওয়ার আছে?'
'কী কইব বাবা, আপনারা তো গরিবের কথা বিশ্বাস করেন না। আমরা তো মানুষ নই, কুকুর-বেড়াল! আমাদের আবার ইজ্জত কী! বাতাসী চোখ-মুখে বলল,_'না হলে এমন বদনাম আপনারা আমার ওপর ফেলতে পারতেন!'
'কিন্তু এসব কথা তো আর আসমান থেকে পড়ে না!' হাজি কলিমুল্লাহ বললেন,_'অন্য কারো নামে তো ওঠেনি?'
'সে আমার কপালের দোষ। না হলে, ও বেঁচে থাকতেই আমি কতবার বমি করেছি, প্রতিরোজ পোড়ামাটি আর তেঁতুল না খেয়ে থাকতে পারিনি_এসব জিনিস কারো চোখে পড়ত না!'
একটা ময়লা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে বসে বসে কোঁকাচ্ছিল বাতাসীর মামাতো ভাই রহিমদ্দি। তাকে সওয়াল করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শুধু।
বিচারের আলোচনা যখন এগিয়ে চলছিল, তখন দক্ষিণ দিক থেকে পালে পালে কালো মেঘ এসে সমস্ত আকাশ ছেয়ে ফেলেছিল। চাঁদ বারেবারে আড়ালে পড়ছে, গাছপালা ও খামারে-নদীতে আলোছায়ায় লুকোচুরি।
একসময় বাতাস বন্ধ হয়ে গেল, অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল সারাটা প্রকৃতি! ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে মাঝে মাঝে গুরু গুরু আওয়াজ উঠল, সঙ্গে সঙ্গে চমকাল বিদ্যুৎ। ঘরের ভেতর সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল।
ঠিক এমনি সময় হাজি সাহেবের বাড়িটার পিছনটায় আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল একটি মানুষের ছায়ামূর্তি। পা টিপে টিপে খোলা জানালার কাছে এসে অনেকক্ষণ সন্ধানী দৃষ্টিতে চেয়ে রইল, ঘরের ভেতরে আলো নেই; নাম-না-জানা অরণ্যের ভেতর কোনো প্রেতপুরীর মতো সমস্ত বাড়িটা রুদ্ধ-নিশ্বাসে ঝিম ধরে আছে।
জানালা থেকে সরে এসে মূর্তিটা ভিটির ধার ঘেঁষে চলতে শুরু করল, রান্নাঘরের পাশ দিয়ে ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। একেকবার বিজলি চমকায় আর সে যেন শিউরে ওঠে গভীর আতঙ্কে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাস বইতে শুরু করল, মেঘে মেঘে সংঘাতে, গর্জনে চারদিক তোলপাড় হতে লাগল। দরজাটা হয়তো ভেজানো ছিল, আচমকা দমকা হাওয়ায় তা সশব্দে খুলে গেল। মানুষটা ত্রস্তপদে এসে উঠল বারান্দায়। এদিক-ওদিক খানিক চেয়ে একসময় মরিয়া হয়েই যেন ঘরে ঢুকে পড়ল। ওপরে-নিচে কেবল শব্দ, শব্দ আর শব্দ। জোর বাতাসের তোড়ে একেকবার মোচড় খেয়ে ওঠে করগেটের চালগুলি, কাঠের বেড়ায় অবিরত ধুপধাপ আওয়াজ।
খাটের কাছে এসে ইতস্তত করতে লাগল মানুষটা, কী করবে যেন ঠিক করে উঠতে পারছে না। শরীরে রোমগুলি কাঁটা দিয়ে উঠছে, ঢিবঢিব করছে হৃৎপিণ্ড, চিনচিন করে মস্তিষ্কে রক্ত উঠে চোখ দুটো ঝাপসা করে দিচ্ছে। তার ভাবনা, কোথায় এলো সে? এ কি জন্ম, না মৃত্যু? এ কি সব হারানোর হাহাকার, না মিলনের উন্মত্ত রংরাগ? কান পেতে সে যেন শুনল, চুরির রিনিঝিনি, একটি গভীর শান্ত নিশ্বাস, কাপড়ের মৃদু খসখস। ঘ্রাণ আসছে, এ কী আমের বোলের, না চুলের গন্ধ? না, না, এখানে নয়। এ তো সে চায় না, চাইতে পারে না।
এক পা-দু পা করে সে পিছিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় অনুভব করল, একটা সুপুষ্ট নম্র মসৃণ হাত অন্ধকার থেকে উঠে এসে গানের কলির মতো পরম আশ্বাসে তার হাতকে আকর্ষণ করল।
তখন সমস্ত আকাশে মেঘেদের হুড়োহুড়ি লুটোপুটি লেগে গেছে, মন্দ্র-গর্জনে একেকবার কেঁপে কেঁপে উঠছে সারা পৃথিবী। একটানা ঝড়ের তীব্র বেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে গাছপালা, মত্ত হয়ে কে যেন লেগেছে লুণ্ঠনের উচ্ছৃঙ্খল তৎপরতায়। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল মন্থন করে যেন এক মহাপ্রলয়ের উচ্ছ্বসিত শব্দের ভয়ংকর-সুন্দর রাগিণী।
এভাবে কতক্ষণ ঝড় চলল হয়তো কেউ বলতে পারবে না। বাতাস যখন কমতে লাগল, তখন অযুত মুক্তাবিন্দুর মতো নামল বৃষ্টি।
ধারালো হাওয়ার সঙ্গে প্রথম যখন বৃষ্টি নামল, তখন তাতে রইল শুধু নবজাতকের বিক্ষোভ, ঘরবাড়ির ওপর দিয়ে শুধু ঝরঝর ঝাপটা দিয়ে গেল। কিন্তু বেশিক্ষণ এ রইল না। ধ্রুপদ সংগীতের বিলম্বিত লয়ের মতো বাতাস যতই কমতে লাগল, বর্ষণে ততই এল নিবিড়তা। এরপর শুধু ঝমঝম শব্দ।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল জানা নেই। একসময় খোলা দরজা পার হওয়ার পর উঠোনে নেমে বৃষ্টির মধ্য দিয়েই টলতে টলতে উত্তর-ভিটির ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল মানুষটা। তার পেছনে পেছনে এসে জোহরা এলোমেলো কাপড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীর ভিজে যেতে লাগল বৃষ্টির ছাটে।
খানিকক্ষণ পরে একটা ছাতা মাথায় ঘাড় নিচু করে ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়িতে ঢুকলেন হাজি কলিমুল্লাহ। হঠাৎ তাঁকে দেখতে পেয়ে জোহরা বলে উঠল,_'অত দেরি যে! আর ইদিকে আমার বড্ড ডর লাগছে।'
'কী আর করি বলো, আপদ চুকিয়ে এলাম!' ছাতাটা বেড়ায় ঠেস দিয়ে রেখে হাজি বললেন,_'সে একটা পাঁড়-হারামজাদী, শেষ পর্যন্ত কিছুতেই দোষ স্বীকার করল না। কিন্তু বাতাসীর মতো মেয়েলোকের ফাই-ফুই বুঝি আমি ধরতে পারি না? দুটোকে দিলাম পঞ্চাশ জুতো করে, তার ওপর কালকে গাঁ ছেড়ে চলে যাবে। দেখলে আল্লাহর রহমত? সঙ্গে সঙ্গে বিষ্টি নামল!'
'হ্যাঁ, তাই তো, বড় তাজ্জব ব্যাপার!' কথাটা শেষ করে ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে গেল জোহরা, তার অঙ্গভঙ্গি রহস্যময়।
হাজি হৈ হৈ করে উঠলেন, বললেন,_'আরে, আরে করছ কী? তুমি পাগল হলে নাকি? এত রাত্রে ভিজছ, সর্দি করবে যে।'
'না, সর্দি আমার কোনোকালেই করে না।' জোহরা বারান্দার কাছে এলো। চোখের ওপর থেকে একরাশ চুল ডান হাতে সরিয়ে ফোটা-ফুলের মতো উজ্জ্বল মুখটা তুলে মধুর হাসি-ওপচানো ঠোঁটে বলল_'আপনি জানেন না? বছরের পয়লা বিষ্টি, ভিজলে খুব ভালো। এতে যে ফসল ফলবে।'
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1331)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
-
▼
2012
(33842)
-
▼
November
(2002)
-
▼
Nov 02
(63)
- দিনশেষে সায়েদাবাদে বাড়ি ফেরত মানুষের জট by মুনিফ আ...
- প্রেসক্লাব এলাকায় আটক ৩৪- নাশকতার পরিকল্পনা ছিল জা...
- ‘ভারত তাদের নীতি পরিবর্তন করেছে’
- এবার হাতির মুখে কথা! আসিফ আজিজ
- ভিয়েতনামের সঙ্গে ২টি চুক্তি ও ২টি এমওইউ সই by শাম...
- শাঁখারীবাজারঃ হেরিটেজ তালিকা থেকে বাদ না দিলে কঠোর...
- ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন মোবাইল ব্যবহারকারীরা
- সেরা যৌন আবেদনময়ী তারকা মিরান্ডা
- বিনা মস্তিষ্কে ৩ বছরঃ শেষ রক্ষা হলো না
- ছয় বছর পর নিপুণের প্রথম ছবি!
- বৃষ্টি by আলাউদ্দিন আল আজাদ
- কালো নৌকা by আল মাহমুদ
- সাইকেলে চড়ে প্রযুক্তিঃ গ্রামে গ্রামে তথ্য কল্যাণী ...
- বিশ্বের সবচেয়ে আবেদনময়ী নারী মিরান্ডা
- স্রোতস্বিনী ব্র্রহ্মপুত্র মরে যাচ্ছে! by এম.আব্দুল...
- নিপুণের প্রথম ছবি!
- রিমু এবার যাত্রাপালার নায়িকা
- যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত রেজওয়ানের ১৭ বছর...
- এক কোটি রুপিতে নাচবেন নাথালিয়া
- বিয়ে করবেন আগামী বছর
- স্যান্ডির তাণ্ডবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯০
- চাকরি হারালেন নাফিসের বাবা!
- হুজুর কেবলা by আবুল মনসুর আহমদ
- ছিনতাই by আবু রুশদ
- রাজেন ঠাকুরের তীর্থযাত্রা by আবু জাফর শামসুদ্দীন
- সিসিমপুর- ইকরির জন্য রুমাল
- আমার গাঁ by শাহানার রশীদ
- মার ছক্কা by আহমেদ সাব্বির
- হ্যালো মিস্টার বিন by শিউল মনজুর
- অভিনন্দন by পবিত্র সরকার
- ভ্রমণ- ভ্যাটিকানের ভেনাস by লতিফুল ইসলাম
- দুই শিল্পীর যুগলবন্দী by আহমেদ মুনির
- চারুশিল্প- সমুদ্র-শহরে আর্টক্যাম্প by আবুল হাসনাত
- চাষির মুখে টপ্পা গাওয়ায় by আবদুশ শাকুর
- বীর মুক্তিযোদ্ধা- তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না
- মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার- আযাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ...
- চট্টগ্রামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়- নিয়ম না মেনেই চ...
- জোঁক by আবু ইসহাক
- অসুখ by আবদুশ শাকুর
- সত্যের মতো বদমাশ by আবদুল মান্নান সৈয়দ
- কেয়া আমি এবং জার্মান মেজর by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
- গন্তব্য by আনোয়ারা সৈয়দ হক
- হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিবৃতি- মালালার অবস্থার উন্নত...
- প্রশাসনের আপস প্রস্তাবে রাজি নয় লিমন
- প্রতিক্রিয়া- মেঘকে জিজ্ঞাসাবাদ যদি করতেই হয় তবে......
- তদন্ত চলাকালেই কাজে যোগ দিলেন মসিউর
- হাতিরঝিল প্রকল্প- খেজুর, পামে বিবর্ণ প্রকল্প by ...
- দুধভাতে উৎপাত by আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
- প্রসারিত হচ্ছে ইসলাম by জহির উদ্দিন বাবর
- শান্তির বিশ্ব গড়তে ঐক্যবদ্ধ হোন by মুফতি শায়খ আবদু...
- লোহার সেতু by মোঃ মোতাহের হোসেন
- সম্প্রীতি-বিভেদ নয়, ঐক্যই সব ধর্মের সারকথা by গওসল...
- রাজনীতিকরা কি সেলসম্যান? by জর্জ এফ. উইল
- সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ-রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক উদ্যো...
- গাছ কাটা অনুমোদন-উন্নয়নের স্বার্থে সামান্য ছাড়
- অপরাধকর্মে পুলিশ-শর্ষেতেই যখন ভূত
- দীপিতার ঘরে রাত্রি by অমিয়ভূষণ মজুমদার
- হাসপাতালের শয্যা ও ওষুধ-মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে...
- গুরুতর অপরাধে পুলিশ-অবিলম্বে এই প্রবণতা রোধ করতে হবে
- চরাচর-দ্বিতীয় জীবন দান by ফাহমিদা আক্তার রিম্পি
- নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও আমাদের রাজনীতি by দিল...
- স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, না কেন্দ্রীয় সরকার প...
- বহে কাল নিরবধি-ভারত-চীন যুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তিতে প্...
-
▼
Nov 02
(63)
-
▼
November
(2002)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
দুর্নীতি
শিশু
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
কালবেলা
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
ইউক্রেন
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
তরুণ প্রজন্ম
মানবাধিকার
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আলী যাকের
আইন ও বিচার
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
মালয়েশিয়া
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
স্বাস্থ্য
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
জ্যোতির্বিজ্ঞান
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
শিল্প ও সাহিত্য
সংবিধান ও রাষ্ট্র
বগুড়া
মিয়ানমার
ঢাকা
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
গবেষণা
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
জীবনযাপন
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
মেহেদী হাসান
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
মানসুরা হোসাইন
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
মসজিদ
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
ইয়েমেন
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
Exclusive
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
উচ্চশিক্ষা
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
বিজ্ঞান
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
জনস্বাস্থ্য
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
ফরিদপুর
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লাতিন আমেরিকা
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মহাকাশচারী
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
জোহরান মামদানি
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
ইহুদি
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
স্পেন
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
বিশ্বকাপ ফুটবল
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment