Saturday, July 11, 2026
‘শেখ মুজিবের পাকিস্তান ভাঙার ইচ্ছা ছিল না, তাই স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি’ -স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ
শনিবার (১১ জুলাই) ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)’ আয়োজিত ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তাজউদ্দিন সাহেব শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা আক্রমণ করতে যাচ্ছে, মানুষ স্বাধীনতা চায়। কিন্তু শেখ সাহেব তখন বলেছিলেন, আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না, পাকিস্তান ভাঙতে আমার কোনো অবদান থাকুক এটি আমি চাই না। সুতরাং তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।’
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে যখন জাতি দিশেহারা ও অবদমিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখনই ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সাহসের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই সংকটময় মুহূর্তে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা জাতিকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি বলেন, এটিই হলো প্রকৃত সত্য। মেজর হাফিজ উদ্দিন জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল একটি জনতার যুদ্ধ। তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় এসে একটি বিশেষ গোষ্ঠী ইতিহাস বিকৃত করে শুধু ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতার কৃতিত্ব নিতে চেয়েছিল, যা ছিল চরম অন্যায়।
তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা সাধারণত অন্যের কৃতিত্ব হাইজ্যাক করেন এবং নিজের দলের নেতাকে ছাড়া কাউকে কৃতিত্ব দিতে চান না। আলোচনায় তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, তখন পূর্ব পাকিস্তানে রেজিমেন্টের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ছিল। একেকটি ক্যান্টনমেন্টে তারা কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা যোগাযোগ ছাড়াই পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে বিদ্রোহ করে এবং জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। এই প্রতিরোধ যুদ্ধই ছিল ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি।
সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি মূলত ফুটবল খেলার টানেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের অনুপ্রেরণাতেই তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি স্বাধীনতার মহান ঘোষক এদেশের মহান রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে, যিনি আমাকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।
এছাড়াও তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান সংগঠক মেজর আব্দুল গনি এবং ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের রেজিমেন্ট কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদারের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। পরিশেষে, তিনি সৈনিকদের সাথে অফিসারদের সম্পর্কের যে চিরাচরিত বন্ধন তা পুনরায় শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
আলোচনায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, তখন পূর্ব পাকিস্তানে রেজিমেন্টের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ছিল। একেকটি ক্যান্টনমেন্টে তারা কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে বিদ্রোহ করে এবং জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। এই প্রতিরোধ যুদ্ধই ছিল ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি।
![]() |
| জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত |
Monday, January 26, 2026
মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু, বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই
দ্য কাশ্মির মনিটরের এক খবরে বলা হয়, টালির কর্মজীবন দীর্ঘ সময়ের। বিশেষত তিনি বিবিসির দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রতিবেদক ও ভারতীয় ব্যুরো প্রধান হিসেবে সংবাদমাধ্যমটির সবচেয়ে বিশ্বস্ত কণ্ঠস্বর ছিলেন। তার সংবেদনশীল, নিরপেক্ষ এবং জটিল রাজনীতিকে সহজভাবে উপস্থাপনের ধরণ শ্রোতাদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছিল।
সাংবাদিকতার মান বুঝাতে পারদর্শী ছিলেন টালি। ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পগুলো সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। সাংবাদিক সমাজ, গবেষক ও সরকারের বাইরে থেকে বহু ব্যক্তি তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বস্ত তথ্যের প্রতীক হিসেবে। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক ও দক্ষিণ এশীয় গণমাধ্যম ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশাজীবীরা শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করছেন এবং তার কাজকে আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করছেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও মার্ক টালি
একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর হামলার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন খ্যাতনামা এই সাংবাদিক। বেশ কয়েক বছর আগে দিল্লি থেকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে টালি জানান, ২৫ মার্চ ঢাকার অবস্থা স্বাভাবিক বুঝাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাকে বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখায়।
মার্ক টালি বলেন, অনুমোদন পেয়ে ঢাকার শাঁখারীবাজারে যাই। সেখানে ব্যাপক গোলাগুলি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম। হঠাৎ এক পাঞ্জাবি পুলিশ এসে আমাকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমার চলাচলসংক্রান্ত ফাইল দেখে আমাকে আটক করায় ওই পুলিশকে ধমক দেন। ওসি সম্ভবত বাঙালি ছিলেন। ওসির সাহস দেখে আমি মুগ্ধ হই। ওই সময় এটি ছিল অনন্যসাধারণ এক কাজ। আমি তার জন্য গর্ববোধ করি।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মার্ক টালি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের আশার আলো। রেডিওতে কান পেতে সকাল-সন্ধ্যা বিবিসিতে মার্ক টালির কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত পুরো দেশ। তার কণ্ঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের বুকেও। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।
১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন টালি। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা হিসেবে ১৯৬৫ সালে ভারতে চলে আসেন। কর্মজীবনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষ্য হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অপারেশন ব্লু স্টার ও এর ফলশ্রুতিতে সংঘটিত ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, শিখবিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য।
বিবিসিতে এসব ঘটনার সংবাদ অত্যন্ত সহজ ও সাবলিলভাবে তুলে ধরেছেন।
১৯৯৪ সালের জুলাইয়ে মার্ক টালি বিবিসি থেকে পদত্যাগ করেন। জন বার্ট নামের এক সহকর্মীর সঙ্গে বাদানুবাদ হওয়ার ইস্তফা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বার্টকে ‘ভীত হয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো’ এবং ‘বিবিসির নিম্নমুখীতা ও সহকর্মীদের নৈতিকভাবে দুর্বল করার দায়ে অভিযুক্ত করেন। এরপর থেকেই তিনি স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা ও নয়া দিল্লিতে উপস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন।

Wednesday, December 31, 2025
আখতারুজ্জামান ও অলি আহমদকে ‘ধিক’ সোহেল রানার, জানালেন কারণ
![]() |
| সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের পাশে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। গতকাল রোববার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে ছবি: প্রথম আলো |
বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামানের বাড়ি জেলার কটিয়াদীতে। কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হন। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর জামায়াতে যোগদানের খবর ছড়িয়ে পড়ে। ফুল হাতে জামায়াতের আমিরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতরুজ্জামান বিএনপি থেকে সর্বশেষ বহিষ্কার হন ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। দলে না থাকলেও রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বিশেষ করে নানা ইস্যুতে টক শো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলে আলোচনায় ছিলেন।
![]() |
| জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যোগ দিয়েছেন আখতারুজ্জামান। ছবি: জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজ থেকে |
এদিকে এলডিপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পান তিনি। মুক্তিযুদ্ধে সাবসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করে আসা অলি আহমদ ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। বিএনপির ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের সরকারে যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন তিনি। বিএনপি ছেড়ে ২০০৬ সালে এলডিপি প্রতিষ্ঠা করেন অলি আহমদ।
প্রথম আলোকে সোহেল রানা বললেন, ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ তো একাত্তর সালের কর্মকাণ্ডের জন্য এখনো ক্ষমা চায়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। যতক্ষণ তারা ক্ষমা চাইবে না ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে মনে করতে হবে, ৩০ লাখ শহীদের, ২ লাখ মা–বোনের ইজ্জত যারা নিয়েছে—তারা তাদেরই উত্তরসূরি। এখনকার জামায়াত এই দোষ না করলেও তো ওদের মধ্যে সেই গন্ধ আছে। আমার কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইবে। একজন ক্ষমা চাইল, দুজন ক্ষমা চাইল, তিনজন চাইল তাতে তো হবে না। এটার একটা প্রক্রিয়া আছে। রাষ্ট্রের ক্ষমা চাওয়ার একটা প্রক্রিয়া আছে। দেশের স্বার্থের জন্য কেউ আমার ভাই কেন আরও অনেক কিছুই হতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থটা যে জায়গা আছে, সেখানে আমার বন্ধু হবে। এখন আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, যাদের ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে ‘রাজাকার’ ‘রাজাকার’ বলা হচ্ছে, সেই রাজাকার ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তাদের সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধার দল গিয়ে জোট বেঁধেছে! এ কারণে আমি আখতারুজ্জামান ও অলি আহমদকে ধিক জানিয়েছি। আজ জামায়াত যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়, তাহলে তাদের যারাই জোটবদ্ধ হোক কিংবা দলে যোগ দিক আমি কিছুই বলব না।’
![]() |
| মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা। ছবি: প্রথম আলো |
Thursday, December 18, 2025
তাজউদ্দীন আহমদের সতর্কবার্তা আজও প্রাসঙ্গিক by শারমিন আহমদ
ফারুক সাহেব তাজউদ্দীনের শরীরে একটি কম্বল জড়িয়ে দিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, আপনাকে অনেক চিন্তিত মনে হচ্ছে। কী ভাবছেন?’ তাজউদ্দীন উত্তর দিলেন, ‘দেশ তো স্বাধীন হলো, কিন্তু এই দেশ মানুষের বসবাসের যোগ্য হবে তো?’
তাজউদ্দীনের এই আশঙ্কা স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই বাস্তবে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের জনগণের রাষ্ট্র গড়ার বদলে শুরু হয় ক্ষমতার লড়াই। শুরু হয় দুর্নীতি, অবিচার, সন্ত্রাস ও হত্যার মচ্ছব। সপরিবার নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জেলখানায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন তাজউদ্দীন আহমদসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা। দেশ স্বাধীন হলো বটে, কিন্তু জনগণের মুক্তি মিলল না অমানুষদের হাত থেকে।
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর, যেদিন ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, সেদিনও তাজউদ্দীন স্ত্রীর কাছে আশঙ্কাপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। সৈয়দা জোহরার সামনে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত পারিবারিক জীবন যাপন করবেন না। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই তিনি নিজেকে পরিবার থেকে দূরে রেখেছিলেন, যেন নেতৃত্বে থেকেও একই ত্যাগের উদাহরণ হতে পারেন।
স্বীকৃতির পর উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ফ্ল্যাটে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক শেষে ফেরার পথে তিনি আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছিলেন। খুব অল্প সময়ের জন্য। তখনো তাঁর মুখ ছিল মলিন এবং চোখ ছিল অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে মগ্ন।
আমাদের শোবার ঘরে গিয়ে তিনি জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সংযমের প্রতীক তাজউদ্দীনের চোখ দিয়ে সেদিন অঝোরে অশ্রু ঝরছিল। তিনি কাঁদছিলেন, অবিরাম। তাঁর সহধর্মিণী বুঝেছিলেন, তিনি প্রিয় মুজিব ভাইকে মনে করছেন, যিনি তখন পাকিস্তানে বন্দী। বাংলাদেশের জন্য এত বড় অর্জন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—অথচ মুজিব ভাই পাশে নেই।
তাজউদ্দীন কখনোই এই যাত্রা একা করতে চাননি। মুজিব ভাইকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুজিব ভাই সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধে না আসার, কোনো দিকনির্দেশনাও পাওয়া যায়নি। তবু তাজউদ্দীন আহমদ নিজের দায়িত্ব পালন করে যান। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে গঠন করেন কার্যকর মুজিবনগর সরকার। এই সরকারের নেতৃত্বেই অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়, অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
মাত্র ৯ মাসে যুদ্ধকালীন প্রশাসন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের দক্ষতার সঙ্গে সংগঠিত করে এই সরকার বিজয় নিশ্চিত করে। একটি সফল সরকারের নেতার আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা যুদ্ধকালে তাজউদ্দীন আহমদকে পর্যবেক্ষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়।
যুদ্ধ বিজয়ী তাজউদ্দীনের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। খন্দকার মোশতাক ও শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে স্বাধীনতাবিরোধী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক চক্র তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, সেই সময় তাজউদ্দীন আহমদ স্বগতোক্তি করেছিলেন, ‘মুজিব ভাই, আপনি আমাকে এত বড় বিপদের মধ্যে ফেলে গেলেন!’
তাজউদ্দীন জানতেন, তাঁর নিজের দল আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র চলছে। ষড়যন্ত্রকারীরা ছিল বাইরের শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর। তাজউদ্দীনকেও হত্যা করার পরিকল্পনা হচ্ছিল। তবে যুদ্ধের মতো বোমা বা বন্দুক দিয়ে নয়—তাজউদ্দীন আহমদ ওই সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিলেন নৈতিক দৃঢ়তার মাধ্যমে। তবে তাজউদ্দীনের সেই নৈতিক বিজয় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
দেশে ফেরার পর সেই অশুভ শক্তিই হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুর আস্থার লোক। তাঁদের প্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জনকল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের পথ থেকে সরে যায় সরকার। অনেকেই বলেন, দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তাজউদ্দীন আহমদ ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পরীক্ষিত সহযোদ্ধাদের কাছে ছেড়ে দিতেন, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতেও দীর্ঘ সময় লাগত না। কিন্তু তেমন হয়নি। স্বাধীনতার প্রারম্ভেই সেই ব্যর্থতার মাশুল আজও দিতে হচ্ছে।
তাজউদ্দীন আহমদ যেন মুক্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন। ৬ নভেম্বর ১৯৭১, ফ্ল্যাট থেকে বিদায়ের আগে হঠাৎ তিনি স্ত্রীকে পরপর দুবার জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি শ্রীমাভো বন্দরনায়েক হবে?’ এই প্রশ্ন শুনে জোহরা চমকে উঠেছিলেন। বাক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেদিনের স্বীকৃতির আনন্দঘন মুহূর্ত, প্রেক্ষিত ও ঘটনার বাইরের এমন এক অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে। আমার কাছে তাঁর সেদিনের প্রশ্নটি এক দূরদর্শী নেতার অন্তরাত্মার প্রতিধ্বনি—এক ট্র্যাজিক ইতিহাসের সংকেত মনে হতো।
তিনি যেন আগেই দেখে ফেলেছিলেন রাজনৈতিক দুর্যোগ, নিজের ও মুজিব ভাইয়ের মৃত্যুর ছায়া। হয়তো দেখে ফেলেছিলেন, তাঁদের অনুপস্থিতিতে স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন দুঃসময়ে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট বন্দরনায়েকের হত্যার পর যেমন তাঁর স্ত্রী দলের ও দেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
তাজউদ্দীন আহমদের সতর্কতা আজও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়, বরং ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণ হবে, যখন এই দেশ সত্যিই মানুষের বসবাসের যোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আর সেই রাষ্ট্র গড়তে বিজয়ের ৫৪ বছর পরেও আমরা তাজউদ্দীন আহমদের থেকে শিক্ষা নিতে পারি। যদি তাজউদ্দীনের ত্যাগ, বিনয়, দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও সততার উদাহরণকে অনুসরণ করি, তবে এখনো বাংলাদেশের ভাগ্যকে নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব।
* শারমিন আহমদ, লেখক, গবেষক ও তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত |
Tuesday, December 16, 2025
কুষ্টিয়ায় আমির হামজা: জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল ভারতের বিরুদ্ধে, এখন আমরা এটা জেনেছি
আজ মঙ্গলবার সকালে বিজয় দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ায় জামায়াত আয়োজিত বিজয় র্যালিতে অংশ নেওয়ার পর পৌরসভার বিজয় উল্লাস চত্বরে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন জামায়াতের এই প্রার্থী।
ইসলামি বক্তা হিসেবে পরিচিত আমির হামজা বলেন, ‘আজকের এই বিজয়ের র্যালি এই কারণে যে আমরা ১৯৭১ সালে এই দেশের স্বাধীনতার পক্ষে। ভারতের যে আগ্রাসন, এর বিরুদ্ধে ছিলাম। এ কারণে আমাদের এরা বিরোধী বানিয়ে রেখেছিল। আগামীর বাংলাদেশ আমরা ভারতের তাঁবেদারমুক্ত করে এ দেশে স্বাধীনচেতা হিসেবে আমরা চলতে চাই। আজকের এই র্যালির এটাই উদ্দেশ্য। আগামীতে দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকবে, ইনশা আল্লাহ।’
জামায়াতের প্রার্থী আরও বলেন, ‘আমরা মনে হয়, দল–মত–জাতি–বর্ণ–ধর্মনির্বিশেষে এ দেশে যারাই জন্ম নেবে, তারাই যেহেতু সম্মানিত নাগরিক, সুতরাং সবাইকে নিয়ে আমরা আবার এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমার মনে হয়, পেছনের ইতিহাস পেছন দিকে টানা ঠিক না। পেছনের সব ইতিহাস ভুলে আমরা নতুন ইতিহাস তৈরি করব। এখানে কোনো দল-মত না থাকাই ভালো। সবাই আমরা এক।’
এ সময় বিজয় র্যালিতে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সুজা উদ্দীন জোয়ার্দ্দার, সহকারী সেক্রেটারি মাজহারুল হক, শহর জামায়াতের আমির এনামুল হকসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
আমির হামজার বক্তব্যের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধের কুষ্টিয়া জেলা ইউনিট কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক বক্তব্য আমরা আমলে নিই না, আর এগুলো নিয়ে আমাদের সমালোচনা করারও প্রয়োজন পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চির সত্য, সেটা সবাই জানে। উনি নির্বাচনে জেতার জন্য অনেক কিছু বলেন, আবার ক্ষমাও চান।’
![]() |
| বিজয় দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ায় জামায়াত আয়োজিত বিজয় র্যালিতে অংশ নেওয়ার পর পৌরসভার বিজয় উল্লাস চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতের প্রার্থী আমির হামজা। ছবি: প্রথম আলো |
Saturday, August 16, 2025
শেখ মুজিব জাতির পিতা নন, তবে তার ত্যাগ স্বীকার করি
পোস্টে নাহিদ লেখেন, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভারতের একটি ঔপনিবেশ রাজ্যে পরিণত হয়। তার সময়েই ১৯৭২ সালে গণবিরোধী সংবিধান আরোপিত হয় এবং লুটপাট, রাজনৈতিক হত্যা ও একদলীয় বাকশাল একনায়কতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা হয়।
আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট রাজনীতির অন্তরালে মুজিব পূজা ও মুক্তিযুদ্ধ পূজা একটি রাজনৈতিক ভক্তি হিসেবে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। অত্যাচার, লুটপাট করার পাশাপাশি নাগরিককে প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। এটি গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে আধুনিক জমিদারি ছাড়া কম কিছুই ছিল না। তবুও মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমগ্র জাতির সংগ্রাম। কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে তার পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে জবাবদিহিতাহীন শাসন এবং মুজিবীয় নামের আড়ালে দুর্নীতি ও দমনপীড়নকে ন্যায্যতা দিয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের জনগণের বিদ্রোহ এই জমিদারিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কোনো ব্যক্তি, পরিবার, মতাদর্শকে আর কখনো নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নিতে বা বাংলাদেশের ওপর ফ্যাসিবাদ আরোপ করতে দেয়া হবে না। জাতির পিতা অভিধাটি ইতিহাসের কোনো অংশ নয়, বরং রাষ্ট্রকে সংকুচিত করে আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট বানানোর হাতিয়ার। বাংলাদেশে সব নাগরিকের অধিকার সমান, আর কোনো একক ব্যক্তি এটির মালিকানা দাবি করতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধ নামে মুজিববাদ একটি ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ। আমাদের সংগ্রাম কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, ফ্যাসিস্ট আদর্শের বিরুদ্ধে। মুজিববাদ ফ্যাসিবাদ ও বিভাজনের একটি আদর্শ। এর মানে হলো জোরপূর্বক গুম, হত্যা, ধর্ষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করা। মুজিববাদ মানে- ইসলামোফোবিয়া, সাম্প্রদায়িকতা এবং সংখ্যালঘুদের ভূমি দখল। এর মানে- বিদেশি শক্তির কাছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিক্রি করা। ষোলো বছর মুজিবকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল অস্ত্র হিসেবে। আর এই মতবাদের আড়ালে ছড়িয়েছিল গুম, খুন, লুটপাট ও গণহত্যা।
মুজিববাদ একটি আস্ত বিপদের নাম উল্লেখ করে এনসিপি’র এই নেতা বলেন, এটিকে পরাজিত করার জন্য রাজনৈতিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সকল নাগরিকদের জন্য আমাদের সংগ্রাম হলো একটি প্রজাতন্ত্র, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যেখানে কোনো দল, বংশ, নেতা জনগণের ওপরে দাঁড়াবে না। বাংলাদেশ কারও সম্পত্তি নয়, এটা গণপ্রজাতন্ত্র।

Friday, June 6, 2025
৫৪ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসা যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়: লেখক মহিউদ্দিন আহমদের ফেসবুক স্ট্যাটাস
এতে তিনি লিখেন, ‘অনেক সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। আমিও তাদের একজন। আমি একাত্তরের ৩১ জুলাই অস্ত্র নিয়ে দেশে ঢুকেছিলাম। অথচ ডিসেম্বরের ১৬ তারিখের পরে ভারত থেকে আসা লোকেরা রাইফেল হাতে পোজ নিয়ে ছবি তুলে দিব্বি ভাতা খেয়ে বেড়াচ্ছে। একটা সার্টিফিকেটের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হবে, এটা কখনো মাথায় আসেনি।’
মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বন্ধে কয়েকটি প্রস্তাব জানিয়ে তিনি ওই স্ট্যাটাসে আরও লিখেন, ‘অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বছরের পর বছর গরিবের ট্যাক্সের টাকায় পেনশন নিচ্ছে। কয়েক বছর পরপর সরকার বদল হয় আর দলীয় বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকা বদলায়। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।
আমার প্রস্তাব:
১. মুক্তিযোদ্ধা ভাতা অবিলম্বে বন্ধ করুন। কারণ এই ভাতার গন্ধেই ধান্দাবাজেরা জুটেছে।
২. জামুকা এবং মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করুন। এরা টাকা খেয়ে অনেককে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে।
৩. দুর্নীতির আখড়া মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ভেঙে দিন এবং এই সংস্থার আয়ত্বে থাকা সকল বাণিজ্যিক স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান নিলাম ডেকে বেচে দিন।
তিনি আরও লিখেন, ‘আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধ করেছি বিবেকের তাড়নায়। ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য নয়। যারা বেতন-ভাতা, পদ-পদোন্নতির জন্য যুদ্ধ করে, তাদের আমরা মার্সেনারি বা ভাড়াটে যোদ্ধা বলি। ৫৪ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায় যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়।’

Tuesday, May 20, 2025
অভ্যুত্থান শহর থেকে কেন গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল না by নাহিদ হাসান
প্যারি কমিউন যেসব কারণে ব্যর্থ হয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে:
১. কমিউন ছিল মূলত শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের নেতৃত্বাধীন, যাঁদের অনেকেই প্রশাসনিক ও সামরিক নেতৃত্বে অনভিজ্ঞ ছিলেন। বিপ্লবীদের একটি অংশ ছিল উদারপন্থী, আরেকটি ছিল রেডিক্যাল (যেমন ব্লাঙ্কিপন্থী ও প্রুধোঁপন্থী), ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
২. বিপ্লবীদের যতটা কঠোর হওয়ার দরকার ছিল, তাঁরা ততটা ছিলেন না। উল্টো ফ্রান্সের তৎকালীন থিয়ারের নেতৃত্বে ক্ষমতাচ্যুত সরকার ভেরসাইয়ে অবস্থান নিয়ে সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করে।
এই বাহিনী পরবর্তী সময় প্যারিস আক্রমণ করে এবং ‘রক্তাক্ত সপ্তাহ’–এ ৩০ হাজার কমিউনারকে হত্যা করে।
৩. গোটা ইউরোপ কমিউনারদের বিপক্ষে সশস্ত্রভাবেই দাঁড়ায়।
৪. শুরু থেকেই প্যারিসকে অবরুদ্ধ করে। শহরের শ্রমিকদের সঙ্গে গ্রামের কৃষকদের মৈত্রী গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ভেরসাই বাহিনী ও প্রুশিয়ানদের দ্বারা ঘেরাওয়ের কারণে ফ্রান্সের কৃষকেরা পাশে দাঁড়াতে পারেননি।
এ ছাড়া কমিউন ছিল পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতা। সমাজ তখনো পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, অপরিণত প্রলেতারীয় বিপ্লব। ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস ও কার্ল মাক্স প্যারি কমিউনের ব্যর্থতার মূলত দুটি কারণ লিখেছেন, একটি শহরের শ্রমিকদের সঙ্গে গ্রামের কৃষকদের মৈত্রী গড়ে তুলতে না পারা এবং বিপ্লবীদের আরও কঠোর হতে না পারা।
আবার লেনিনদের বলশেভিক পার্টি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সফল বিপ্লবের পর শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত করতে পেরেছিলেন। অথচ ১২টি দেশের সহযোগিতায় বড় কৃষকেরা বিপ্লবকে সশস্ত্রভাবে প্রতিরোধ করেছিলেন। তবু পেরেছিলেন। কেন?
কিন্তু চব্বিশের ছাত্র গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় প্যারি কমিউন ও অক্টোবর বিপ্লবের মতো প্রচণ্ড একটি বিরোধী শর্তও নেই। সামরিক বাহিনী বিপক্ষে নেই, আন্তর্জাতিক সমর্থন কম নেই, শহরের সঙ্গে সঙ্গে মফস্সলে ও গ্রামেও অভ্যুত্থানের পক্ষে জাগরণ দেখা গেছে। কোথাও অবরোধ নেই, দমন নেই, বাইরের রাষ্ট্র আক্রমণও করছে না। সঙ্গে আছে রাষ্ট্রের সব জনগণের সমর্থন। এমনকি নারীরাও গণ–অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলেন। তাহলে গণ–অভ্যুত্থান শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে না কেন?
বিপ্লব বা অভ্যুত্থান রক্ষা পায়, নেতৃত্বদানকারীদের মিত্রশক্তির ওপর। মিত্র জোটে কর্মসূচির ভিত্তিতে, শত্রুও জোটে একই কারণে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের প্রধান কর্মসূচি ছিল ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ। ফ্যাসিবাদ হলো হিংসা-বিদ্বেষমূলক, বৈচিত্র্যময় স্ব–ব্যক্তিস্বাধীনতাবিরোধী অসহিষ্ণু ভাবনাকে বৈধতা দানকারী এমন চেতনা। এই চেতনার পক্ষে সম্মতি আদায় করা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সন্ত্রাসের মিশেল ঘটিয়ে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইগুলোতে কারা মিত্র? অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রমাণ হয়ে গেছে, তাঁরা হলেন শ্রমিক-কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী-চাকরিজীবী, নারী ও সংখ্যালঘু জাতি-ধর্মের নাগরিকেরা। গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে যেসব ছাত্র, তারা তাঁদেরই সন্তান। তাই চাকরির অধিকার চাইতে গিয়ে ফ্যাসিবাদকেই অপসারণ করতে হয়।
মুসোলিনি ও হিটলার মনে করতেন, নারীর কাজ গৃহে। বড়জোর চিকিৎসক ও শিক্ষকতার পেশায়। নারীর মঙ্গল নারীর বদলে তাঁরাই নির্ধারণ করে দিতেন। তাঁদের তৈরি আদর্শ নারীর মডেলে নারীরা ফিরে যাবেন ঘরে; আর পুরুষ কাজ করবেন বাইরে। হিটলার মেয়েদের ঘরে ফেরাতে করলেন ‘বেকারত্ব প্রতিরোধ আইন’। যে মেয়েটি কাজ থেকে সরে এসে গৃহিণী হতে রাজি থাকতে, তাকে সুদহীন ঋণ দেওয়া হলো। প্রতিটি সন্তানের জন্য চার ভাগের এক ভাগ মকুব করা হলো। নারী-পুরুষের বিয়ের বয়স কমানো হলো। ইতালিতে মুসোলিনি চার্চের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিবাহবিচ্ছেদ নিষিদ্ধ করলেন।
১৮৮৬ সালে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকেরা জীবন দিয়েছেন। সেই থেকে মে দিবস পালিত হয়। শ্রমিকেরা যদি বিনোদনের সময় না পান, তাহলে তো তাঁকে মানুষ হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। আট ঘণ্টা কর্মদিবস গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য। আশুলিয়া আর যাত্রাবাড়ীতে শ্রমিকদের গড়ে তুলতে হয় প্রতিরোধের স্তালিনগ্রাদ আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক মর্যাদা তাঁরা পাবেন না। পাওনা মজুরি চাইতে হয় রাস্তায়।
কৃষক-জেলেদের ৩০০ বছরের হাট ও ঘাটের জমিদারি উচ্ছেদে উদ্যোগ নেই। উপকূলের লবণচাষির কথা নেই। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণ কীভাবে হবে, সেটা নিয়ে আলাপ নেই, কৃষি সংস্কার কমিশন নেই। জেলা-উপজেলার সংস্কৃতিকর্মীদের মহড়ার ঘর নেই, উপস্থাপনের মঞ্চ নেই। শহরাঞ্চলে প্রতি ৫৫০ জনে একজন চিকিৎসক আর গ্রামাঞ্চলে প্রতি ৯ হাজার ৯০ জনে একজন ডাক্তার। এই চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে কথা কোথায়?
ঢাকার পাশের জেলাবাসীরা যে ভাড়ায় ট্রেনে রাজধানীতে আসতে পারেন, কুড়িগ্রাম কিংবা রাঙামাটির বাসিন্দারা একই ভাড়ায় তা পারেন? হাসিনা সরকার গত বছরের ৪ মে দূরত্বভিত্তিক রেয়াত বাতিল করে, সেই রেয়াত আর পুনর্বহাল হলো কই? ৩০০ বছরের ঔপনিবেশিক শহর ও গ্রামের বৈষম্য বিলোপের আলাপ ছাড়া গণ–অভ্যুত্থান শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হবে কীভাবে?
মাওলানা ভাসানী তাঁর ‘মাও সে-তুঙ এর দেশে’ বইতে লিখেছেন, ‘মাও সে-তুঙ–এর দেশে আমাকে সব থেকে মুগ্ধ করেছে কী—এ প্রশ্ন অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছেন।...অনেক ভেবে দেখেছি, প্রশ্নটির জবাব আমি এককথায় দিতে পারি। —হাসি। হ্যাঁ, হাসিই আমায় সব থেকে বেশি মুগ্ধ করেছে। চীনের মানুষ আজ হাসতে পারে।...আমরা কি হাসির উৎসের সন্ধান পাবো না?’ —একটা জাতি হাসবে কীভাবে? অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার জায়গাটা যখন নিশ্চিত, যখন তারা জানবে হঠাৎ অসুস্থ হলে রাষ্ট্র আছে, তখনই না হাসবে।
মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম বাঁচিয়েছে বাংলাদেশকে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ৫৪ বছরে একজন সরকারপ্রধানও কি রৌমারী, চিলমারী, ভূরুঙ্গামারীর যুদ্ধক্ষেত্রের গ্রামবাসীদের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন? মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতেও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কলার ভেলায় যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে গেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করতে।
আধুনিক ব্যবস্থা ও স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শক্তিকে কেন কৃষক-জেলেদের মাঝে পাওয়া গেল না।
* নাহিদ হাসান: লেখক ও সংগঠক
nahidknowledge1@gmail.com
| চব্বিশে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান নানা সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। ছবি : প্রথম আলো |
Saturday, April 26, 2025
৩ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে অভিযোগ by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা এক কর্মকর্তাকে বলছেন, আমরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দেখতে চাই না। যারা দেশের জন্য নিবেদিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তার সঠিক সংখ্যা দেখতে চাই। মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চাই। দ্রুত আইন সংশোধন করে যাচাই-বাছাই করে তালিকা চান ওই মুক্তিযোদ্ধা।
এদিকে মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের স্তূপ বাড়ছে। প্রতিদিনই মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন নাগরিকরা। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে ৩০০০-এর বেশি অভিযোগ পড়েছে। এ ছাড়াও কেউ কেউ জামুকাতেও অভিযোগ করছেন। আবেদন পাওয়ার পর এগুলো যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রকাশ করা হবে। সর্বোপরি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বসে তা ঠিক করবে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া ৯০ হাজারের উপরে কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা জমা পড়েছে। আছে নানা জাল-জালিয়াতির অভিযোগও। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সনদ ফেরত দিতে আবেদন করা ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু মন্ত্রণালয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা আবেদন করেছেন, নাম প্রকাশ করলে তারা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হবেন।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম গত ১১ই ডিসেম্বর নিজ দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও যারা সনদ নিয়েছেন, তাদের তা ফেরত দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও অনেকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লিখিয়েছেন, গেজেটভুক্ত হয়েছেন এবং সুবিধা নিয়েছেন। এটি জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এটি ছোটখাটো অপরাধ নয়, অনেক বড় অপরাধ। উপদেষ্টা আরও বলেন, আমরা একটি ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) দেবো, যারা অমুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে এসেছেন, তারা যাতে স্বেচ্ছায় এখান থেকে চলে যান। যদি যান, তারা তখন সাধারণ ক্ষমা পেতে পারেন। আর যদি সেটি না হয়, আমরা যেটি বলেছি, প্রতারণার দায়ে আমরা তাদের অভিযুক্ত করবো। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম গণমাধ্যমকে বলেন, যদি কেউ স্বেচ্ছায় সনদ ফেরত দিতে চান, সে জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে কেউ সনদ ফিরিয়ে দিলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। তিনি বলেন, যেহেতু তাদের পেছনে অর্থ খরচ হয়েছে, তাই আমার একার পক্ষে এ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। উপদেষ্টা পরিষদ থেকে এ প্রস্তাব পাস করাতে হবে। তারপর সময়সীমা বেঁধে দেয়া হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, একজন তার আবেদনে নিজের নাম-পরিচয় দিয়ে লিখেছেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও প্রলোভনে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সরকারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছি। এ অনৈতিক কাজের জন্য আমি লজ্জিত। আমি স্বেচ্ছায় এ সনদ ফেরত দেয়ার আবেদন করেছি।
অন্যদিকে, এর আগে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেয়ায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৫ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সনদ বাতিল করা হয়। তারা হলেন- সাবেক সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী, মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, এ কে এম আমির হোসেন ও যুগ্ম সচিব আবুল কাসেম তালুকদার। এই সনদ ব্যবহার করে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত ১৫ই সেপ্টেম্বর উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম ঘোষণা দেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যারা সরকারি চাকরি পেয়েছেন, তাদের তালিকা করা হবে। যাচাই-বাছাই করা হবে। পরে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি দেয় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। চিঠিতে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছেন তাদের বিস্তারিত তথ্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর, করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সাড়ে ১৪ লাখের বেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত আছেন। সে হিসাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৬ শতাংশ।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও এখনো পূর্ণতা পায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা। বিগত সব সরকারের আমলেই একের পর এক লম্বা হয়েছে এই তালিকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো অবদান না রেখেই অনেকে নানা কৌশলে হয়েছেন তালিকাভুক্ত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় শুদ্ধি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিপ্রাপ্তদের সত্যতা যাচাইসহ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই করার উদ্যোগ নেয়া হয়। একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন আনার কাজ করছে সরকার। এই সংজ্ঞা পরিবর্তন হলে, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা রণাঙ্গনে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন এবং যারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন শুধু তারাই ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার’ স্বীকৃতি পাবেন। এর বাইরে যারা দেশে-বিদেশে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন, বিশ্বজনমত তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তারা হবেন ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ১০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ও ১০ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টি বোর্ড ও নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করে। এই কমিটি পুনর্গঠনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে কাজ শুরু করা হয়। এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেন, মূলত যারা রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, কেবল তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। বাকি যারা নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন তারা হবেন মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী।
জামুকা সূত্র বলছে, যেসব মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে অভিযোগ আসছে তাদের তথ্য যাচাই করতে প্রাথমিকভাবে সরজমিন শুনানি হবে। যাচাই-বাছাইয়ে ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই তালিকা যাচাই করতে গিয়ে অনেকের খোঁজ পাওয়া গেছে যারা ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। তালিকা যাচাই চূড়ান্ত হলে এসব ভুয়া সনদে বা সনদ জালিয়াতি করে চাকরি নেয়াদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। সেই তালিকার আলোকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ মাধ্যমে এই সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে এই অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

Saturday, February 8, 2025
নিউ এজ’র সম্পাদকীয়: ইতিহাস মুছে ফেলে নতুন ইতিহাস লেখা যায় না
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অপ্রতিরোধ্য গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা তার দলের ছাত্র সংঘটন 'ছাত্রলীগ' কর্তৃক গোপনীয়ভাবে পরিচালিত একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দিল্লি থেকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার জন্য ৫ ফেব্রুয়ারি দিনটি বেছে নেন। হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে 'ছাত্রলীগ'ও বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়ে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী দিল্লি থেকে দেশে এবং বিদেশে তার দলের কর্মীদের কাছে ফোন করছিলেন যা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ফাঁস করা হয়েছিল এবং এইভাবে, তিনি জনগণের সহানুভূতি এবং সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। আশ্চর্যজনকভাবে প্রশ্নে, টেলিফোনিক কথোপকথনে, জুলাই আগস্টের আন্দোলনে প্রায় এক হাজার মানুষকে হত্যা করার জন্য (যাদের বেশিরভাগই যুবক) এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষকে নৃশংসভাবে আহত করার জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি।
আজকাল বিদেশ থেকে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা নিজেদের কোনো ভুল স্বীকার না করেই বক্তৃতা দিচ্ছেন। নিজেদের অপরাধের কথা না বলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর সমালোচনা করছেন। এই পরিস্থিতিতে, গোপনে থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য ছাত্রদের একটি বড় অংশকে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ করে তোলে । বিশেষ করে যারা আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম সারিতে ছিল। তারাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রধান প্রতীক মুজিবের বাড়ি ভেঙে দেয়ার কর্মসূচি নিয়েছিল।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি হিসেবে শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখেন এবং যথারীতি তিনি তার কোনো দোষ খুঁজে পাননি। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া, হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠানো , অনেক নাগরিককে অবৈধভাবে আটক করা এবং জোরপূর্বক গুম করা, ব্যাংক খালি করার পাশাপাশি লুণ্ঠন ও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত ও দলীয় লাভের জন্য ব্যবহার করা - বক্তব্যে কোনো কিছুই তুলে ধরেননি হাসিনা। তরুণ আন্দোলনকারীরা, তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, মুজিবের ধানমন্ডির বাসায় গিয়ে হামলা করে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যত নীরব ছিল, যা ব্যাপকভাবে জনগণের কাছে ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
মুজিবের বাসা ভেঙে দেয়া হয়তো আওয়ামী লীগ কর্মীদের কিছু সময়ের জন্য দমিয়ে রাখতে পারবে । কিন্তু বিদেশে বসবাসকারী দলের কর্মীরা এই ঘটনাটিকে সহানুভূতি অর্জনের জন্য কাজে লাগাবে । তবে যে যুবকরা রাজনৈতিকভাবে বাসাটিকে ভাঙার নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের বুঝতে হবে যে, ঐতিহাসিক এই বাড়িটি একটি ‘জাতীয় সম্পত্তি’ । স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের সূচনা করেছিলেন তা সত্য, তবে এটাও সত্য যে, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত করার জন্য তার মৌলিক অবদান ছিল। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় বেশিরভাগ মানুষ তার আহ্বানে যুদ্ধের ময়দানে নেমেছিল। শেষে বলতে হয় , 'ইতিহাস' মুছে ফেলার প্রচেষ্টা ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে না। বরং এটি জনগণকে তার ঐতিহাসিকভাবে বৈধ লক্ষ্য অর্জনে বিভ্রান্ত করতে পারে।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1782)
-
▼
August
(329)
-
▼
Aug 30
(14)
- লেবাননে সমৃদ্ধ ইতিহাসের নতুন তথ্য, মিলছে হাজার বছর...
- আরব বিশ্বে বাড়ছে খাদ্য ও পানির সংকট, মরুকরণে ব্যাহ...
- তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে চাপে নেতানিয়াহু
- ইরান যুদ্ধে অস্ত্রের মজুত ‘সংকটজনক’, চীন-রাশিয়া মো...
- নিষেধাজ্ঞায় কি নত হবে ইরান, ট্রাম্পের সামনে বড় প্রশ্ন
- ব্যাগে ছয় দেশের পাসপোর্ট, বেনজীর এখন সেন্ট লুসিয়ায়...
- ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ এখন রড-সিমেন্টের কারবারি by নাজমু...
- ইরানের হুমকি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরলেন নে...
- পশ্চিম তীরের গ্রামের একমাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দিল...
- ইরান যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে...
- কেন লোকচক্ষুর আড়ালে ব্যারন ট্রাম্প
- ক্যানসারের চিকিৎসার মধ্যেই সিনেমার কাজ, কঠিন লড়াইয়...
- কিয়েভের কাছে গোলাবারুদের গুদামে রাশিয়ার হামলা, নিহ...
- কলকাতার মুসলিম কলোনিতে এক মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ...
-
▼
Aug 30
(14)
-
▼
August
(329)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...





