কে হবেন তত্ত্বাবধায়কের বিধায়ক by মোস্তফা কামাল

নতুন কোনো খুঁত না পাকলে, কেওয়াজ-ভেজাল না বাধলে আপিল বিভাগের রায় দৃষ্টে আগামী জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হবে। কে হবেন সেই সরকারের প্রধান?—এ প্রশ্নের কিন্তু নিষ্পত্তি হলো না। কিছু ফের-ফ্যারকা-ফাঁক এখনো রয়ে গেছে? সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের রায় বহাল রেখে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করলেও তা পরিষ্কার নয়। সেই বিধান পাকা করতে সরকার আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায় বলে আভাস দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। সেই আলোকে বিষয়টি নিষ্পত্তিহীন বলা যায়। এখানে সরকার ও বিরোধীপক্ষের বোঝাপড়ার বিষয় এখনো অবশিষ্ট। ভাব-নমুনায় স্পষ্ট, বহুল আলোচিত-চর্চিত ‘ঐকমত্য’ ধরনের কিছু আবারও সামনে আসার সমূহ সম্ভাবনা।

বিধায়ক শব্দের আভিধানিক অর্থ বিধানকারী। ফয়সালা, সুরাহা, নিষ্পত্তি বা বিধান দেওয়ার এখতিয়ার যার। প্রচলিত অর্থে তিনি কোনো রাজ্যের বা প্রদেশের আইনসভার প্রতিনিধি। ভারত বা অন্যান্য যেসব দেশে বিধানসভা থাকে সেখানে তিনি অনেক কিছুর ফয়সালা দেন। বাংলাদেশে এ ধারণা বা বিষয় নেই। তবে, তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি পাকাপোক্তভাবে চালুর প্রশ্নে রায় দৃষ্টে বিধানটা সংসদ থেকেই আসতে হবে। আদালত সেই বিধানের সিদ্ধান্ত সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। বলেছে, বাকি সুরাহার ভার সংসদের। কেবল তত্ত্বাবধায়ক নয়, এ রায়ের সঙ্গে বাড়তি যোগ হয়েছে গণভোটও। চলমান রাজনীতিতে এ গণভোটও বড় প্রাসঙ্গিক, বার্নিং ইস্যু। পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে ২০১৪, ১৮ ও ২৪-এর জাতীয় নির্বাচন আওয়ামী লীগের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচন বয়কট করে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। চব্বিশের ৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন। এ রিটের নিষ্পত্তি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করাসহ কয়েকটি বিষয়কে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে চারটি পক্ষ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় হুবহু বহাল রেখে আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। সংবিধানের পরিবর্তন, পরিমার্জন সংসদের উপর ছেড়ে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।

রিটকারী সংগঠন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এই রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর রিভিউ করা হবে। আর আইনজীবী জানান, আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকেই গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোটের বিধান, সংবিধান পরিবর্তনসহ চারটি বিধান বাতিল করায় জুলাই চার্টার অনুযায়ী সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে জানান জামায়াতের আইনজীবী। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়েছিল। আবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মধ্য দিয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে দেওয়া হলো। গণভোট যোগ হলো। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপ নির্ধারণ করবে জাতীয় সংসদ। গোটা বিষয়টি দেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন বাঁক এনে দিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ খুলেছে। সঙ্গে গণভোটের বিধানও। সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদও বাতিলই থাকছে। ফলে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যেসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তার কয়েকটি আর বহাল থাকল না। এটি অবশ্যই দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের অন্যতম সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রায়। কিছু প্রশ্নও যোগ হয়েছে? পরবর্তী নির্বাচনকালীন সরকারের নাম কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারই হবে? নির্বাচনটাও সত্যিই নিরপেক্ষ হবে? সব রাজনৈতিক দলের হবে? দীর্ঘদিনের নির্বাচন-সংকট আর হবে না? ১৯৯৬ সালে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্ম রাজনৈতিক সংকট থেকে। তীব্র আন্দোলনের মুখে তখন সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যবস্থাটির অভিযাত্রা। উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের সময় একটি নির্দলীয় সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে ভোট আয়োজনের সুযোগ দেবে। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তত্ত্বাবধায়কের অধীনে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে ওই তিনটি নির্বাচন তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় বাধে বিপত্তি। প্রায় দুই বছর দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

সেই ঘটনার ছুঁতায় প্রশ্নাক্রান্ত হয় ব্যবস্থাটি। কড়ায়-গন্ডায় সুযোগ নেয় আওয়ামী লীগ। ২০১১ সালে ক্ষমতার জোসে আদালতের ওপর ভর করে ব্যবস্থাটি বাতিল করে দেয় তারা। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে সংক্ষিপ্ত রায় দেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ওই বছর ১১ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান বাতিলসহ ৫৪টি বিষয়ে সংশোধন এনে সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে আওয়ামী লীগ সরকার। যুক্তি দেখায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এ ব্যবস্থা অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। তাই নির্বাচিত মানে তাদের সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। আর পায় কে? বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো আওয়ামী রীগ সরকারের কাছে পাত্তা পায়নি। কিন্তু, মানুষের আবেদন পেয়েছে। প্রায় এক যুগ দেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো। রাজনীতির ধারাপাতে যোগ হয় রাতের ভোট, বিনাভোট, আমি-ডামি ভোট। ক্রমেই গণধিক্কারের শিকার হতে থাকে আওয়ামী লীগ। এরপর করুণ পতন। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এ ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের দলগুলোরও একই পরিণতি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের বড় একটি অংশ নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা আবারও সামনে আনতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত বিধান অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়। সংবিধানের ৭(ক), ৭(খ) ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি আপিল হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি, নওগাঁর মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আপিল করেন। আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায়ে একদিকে সেই আপিলগুলো খারিজ, আরেক দিকে নতুন ইতিহাস।

রায়টি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গুরুত্বে ভরপুর। আদালত সরাসরি নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে নতুন বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে। নিরপেক্ষ-সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল আইনি পরিবর্তনে হবে না, রাজনৈতিক ঐকমত্য, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও প্রাসঙ্গিক। বহু বছর ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করা দল ক্ষমতাসীন বিএনপির ওপর পড়লো বাড়তি ভার। রূপ বা বিধান ঠিক করার বড় ভার সংসদের ওপর। এ ব্যবস্থার কাঠামো, সরকারের প্রধান, সরকারের মেয়াদ, ক্ষমতার সীমা, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কসহ আরও অনেক কিছুর স্পষ্ট বিধান ও বিহিত করতে হবে এ সংসদকে। বিধান তথা ফয়সালা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কেও। ত্রয়োদশ সংশোধনীর সংক্ষিপ্ত রায় পঞ্চদশ সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, একমাত্র গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা যায়। গণতন্ত্র হচ্ছে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। গণতন্ত্র বিকশিত হয় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মূল সংবিধানে না থাকলেও একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচনের অভিপ্রায়ে ১৯৯৬ সালে তা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল। ফলে এ ব্যবস্থাটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোরই অংশে পরিণত হয়েছে। কারণ, এই ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৫) জনগণের আস্থার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। এ তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার পাশাপাশি জনগণের আস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে সর্বশেষ সরকারকে জনগণের আন্দোলনের মুখে বিতাড়িত হতে হয়েছে। সরকারকে বিতাড়িত করতে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গণভোটের বিধান বাতিল করা নিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান বাদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া জনমত বা জনআকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ অসংশোধনযোগ্য ঘোষণা করা হয়, যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোবিরোধী এবং অসংগতিপূর্ণ। তাই পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১ এর ৪৭ ধারার মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাতিল করাকে বাতিল ঘোষণা করা হলো। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদে যুক্ত করা গণভোটের বিধান পুনরুদ্ধার হলো। সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা নিয়েও রায়টিতে কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন। অন্য সব আইনই সংবিধানের নিরিখে হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছে সংবিধানের অভিভাবক। যে কোনো আইনোর বৈধতা-অবৈধতা নিরূপণ করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে। সর্বসাকুল্যে একের মধ্যে অনেক কিছু বিধানের কথা চলে এসেছে সরকারের ওপরও, সংসদের ওপরও। গোটা রাজনীতির ওপর তো বটেই।

লেখক: কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন 

কে হবেন তত্ত্বাবধায়কের বিধায়ক