ইসরাইলকে যুদ্ধের বিদেশী অর্থের বৃহত্তম যোগানদাতা জার্মান-মার্কিন কোম্পানি

জার্মান বীমা প্রতিষ্ঠান আলিয়াঞ্জ এবং তাদের সহযোগী মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পিমকো ইসরাইলি সরকারি বন্ডে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে, যার ফলে তারা ইসরাইলের অন্যতম বৃহৎ বিদেশী বন্ডধারক হিসেবে উঠে এসেছে।

গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর সামরিক অভিযানের মধ্যে বিশ্বমঞ্চের এক করপোরেট জায়ান্ট ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বিদেশী অর্থদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই একটি কোম্পানি ইসরাইলি সরকারের কাছ থেকে যে পরিমাণ বন্ড বা ঋণপত্র কিনেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিশ্বের অন্য সব দেশের মোট কেনার চেয়েও বেশি।

এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটি জার্মানির বীমা ও আর্থিক পরিষেবা জায়ান্ট ‘আলিয়াঞ্জ’ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক এক সহযোগী বন্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ‘পিমকো’।

আমস্টারডাম-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা প্রফেন্দোর বরাতে জানা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ আলিয়াঞ্জ গ্রুপ ইসরাইলি সরকারের প্রায় ২৬৭ কোটি ডলারের বন্ড নিজেদের কবজায় নিয়েছে। সহজ ভাষায়, যুদ্ধকালীন ভয়াবহ মুহূর্তে ইসরাইলের মোট বিদেশী বন্ডের অর্ধেকের বেশি ছিল এই একটি মাত্র যৌথ কোম্পানির হাতে, যা বাকি গোটা বিশ্বের সম্মিলিত বিনিয়োগকেও হার মানায়।

একটি দেশের সরকার যখন আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসঙ্ঘের তদন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গণহত্যা চালায়, তখন সেই দেশের বন্ড কেনা আইনি ও নৈতিক ঝুঁকির বিষয়। কিন্তু রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধকে পুঁজি করে অধিক মুনাফার লোভ সামলাতে পারেনি এই পশ্চিমা কোম্পানি।

যুদ্ধের বাজারে নিজেদের বন্ডের সুদ এক লাফে ৫.৫৬ শতাংশে বাড়িয়ে দেয় ইসরাইল, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল মাত্র ১.৪ শতাংশ। এই বাড়তি মুনাফার লোভেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা।

মানবাধিকার সংস্থা ব্যাংকট্র্যাক-এর কর্মী ম্যাক্স হ্যামার বলছেন, গাজায় চলমান গণহত্যার মুখেও পিমকোর এই বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তারাও স্পষ্ট করেছেন, ইসরাইলকে অর্থ দেয়ার অর্থই হলো যুদ্ধাপরাধ ও ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরাসরি অংশ নেয়া।

তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ইসরাইলের যুদ্ধ চাঙ্গা করতে পশ্চিমা পুজির সরবরাহ বেড়েছে। এই সময়ে ইসরাইলি বন্ডে বিদেশী বিনিয়োগ ১১৬ কোটি ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪৯১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আর এই পুরো বিনিয়োগের ৯০.৭ শতাংশই এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পকেট থেকে। ২০২৪ সালে আলিয়াঞ্জের বিনিয়োগ যেখানে ছিল মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, এক বছরের মাথায় তা আকাশচুম্বী আকার নেয়। ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন কিংবা ইরানের ওপর আগ্রাসন চালাতে ইসরাইলের যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তার বড় জোগানদার এই মার্কিন-জার্মান অক্ষ।

যদিও এই যুদ্ধের তহবিল জোগানোর ক্ষেত্রে ইউরোপের অনেক দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আয়ারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ের বেশ কিছু বড় ফান্ড ইসরাইলি বন্ড ও ব্যাংক থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এমনকি মানবাধিকার কর্মীদের আন্দোলনের মুখে আলিয়াঞ্জ ব্রিটেনের মাটিতে ইসরাইলি অস্ত্র কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসের বীমা সুবিধা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু পর্দার আড়ালে তারা ইসরাইলি সরকারের হাতে ঠিকই তুলে দিয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।

প্রকৃতপক্ষে, আলিয়াঞ্জ-পিমকোর আসল বিনিয়োগ ২৬৭ কোটি ডলারের চেয়েও অনেক বেশি, কারণ তারা বিভিন্ন বিদেশী ক্লায়েন্ট ও পেনসন ফান্ডের হয়েও গোপনে বিপুল পরিমাণ ইসরাইলি বন্ড কিনেছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা এই নির্মম যুদ্ধের পেছনে মার্কিন ও পশ্চিমা পুজিই যে মূল চালিকাশক্তি, তা আরো একবার বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত হলো।

সূত্র : মিডলইস্ট আই
ইসরাইলি সৈনিক
ইসরাইলি সৈনিক। সংগৃহীত

No comments

Powered by Blogger.