Wednesday, August 26, 2026
মুসলিম বিশ্বের এক প্রশ্নবিদ্ধ রাষ্ট্র আরব আমিরাত by মাহমুদুর রহমান
সেই সমস্যা কীভাবে সমাধান করেছিলাম, সেটা একেবারেই ব্যক্তিগত বিধায় সে প্রসঙ্গ আর বাড়াচ্ছি না। প্রিন্স মুবারক বাংলাদেশ সফরে এসে বেশ সন্তুষ্ট হয়েছিলেন, যার ফলে ওয়ারিদ টেলিকমের বাংলাদেশে আগমন ঘটেছিল। আমার সঙ্গে আলোচনায় টেলিকম ছাড়া অন্যান্য সম্ভাব্য লাভজনক সেক্টরেও মুবারক আল নাহিয়ানের ধাবি গ্রুপের বিনিয়োগের কথা থাকলেও ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে সেসব আর বাস্তবায়ন হয়নি। বরং পরবর্তীকালে ওয়ারিদ টেলিকম তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ভারতের এয়ারটেলের কাছে বিক্রি করে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। আমিও সরকারি দায়িত্ব ছেড়ে মিডিয়ায় প্রবেশ করলাম এবং সেই থেকে আমার বাঙালি মুসলমান আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আওয়ামী সুশীল ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে যথাসম্ভব লড়াই করাটাই বাকি জীবনের কর্তব্য ধরে নিয়েছি।
গত পঁচিশ বছরে মুসলিম বিশ্বে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মাত্রাটা কিছুটা বোঝানোর জন্য উপরের ঘটনা বর্ণনা করলাম। প্রসঙ্গক্রমে আমার আরো একটি পর্যবেক্ষণের কথা বলে রাখি। বিনিয়োগ বোর্ডে পাঁচ বছরের দায়িত্ব পালনকালে আমি তিনবার আরব আমিরাতে সরকারি সফরে গিয়েছিলাম। প্রথমবার আমার সঙ্গে একটি বিনিয়োগ প্রতিনিধি দল ছিল। দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম প্রিন্স মুবারক আল নাহিয়ানের বাংলাদেশ সফরের আগে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হতে। আর ২০০৬ সালের এপ্রিলে তৃতীয় ও শেষবার তারই আমন্ত্রণে নবনির্মিত আবুধাবি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার উদ্বোধনী একদিনের ক্রিকেট খেলা দেখতে।
আমিরাতের ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে তিনি সেই আয়োজনের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। আমার তিন সফরের অভিজ্ঞতায় একজন বাংলাদেশি এবং মুসলমান হিসেবে একটি বিষয় লক্ষ করে বেশ উদ্বিগ্ন বোধ করেছিলাম। আমার কাছে তখনই মনে হয়েছিল যে, আমিরাতের প্রধান দুই শহরের মধ্যে দুবাই ভারতীয়দের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এবং আবুধাবিতে পাকিস্তানের কিছুটা প্রভাব থাকলেও ভারতীয়করণ ক্রমেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ভারতের পাশাপাশি অন্তরালে যে ইসরাইল আমিরাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক হওয়ার পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, সেটা অবশ্য একেবারেই টের পাইনি। তবে ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে কথোপকথনে তাদের চিন্তাধারায় মুসলিম পরিচয়কে ছাপিয়ে পশ্চিমাদের প্রতি অন্ধ প্রীতি লক্ষ করেছিলাম। উম্মাহ নিয়ে আলোচনা উঠলে তাদের মধ্যে একধরনের দ্বিধাও যেন অনুভব করেছিলাম।
এবার বর্তমানে আসি। এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই যে, সারা বিশ্বে সবচেয়ে উগ্র মুসলমানবিদ্বেষী দুই দেশের নাম ইসরাইল ও ভারত। উভয় দেশে ইসলামোফোবিয়া রাজনৈতিক ময়দান ছাড়িয়ে জনগণের বৃহৎ অংশের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। কেউ যদি মনে করে থাকেন যে, নির্বাচনে হেরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে কট্টরপন্থি নেতানিয়াহু এবং নরেন্দ্র মোদি অপসারিত হলেই ইসরাইল ও ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর চলমান জুলুমের অবসান ঘটবে এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দেশ দুটির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরে আসবে, তাহলে তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আমি গণতন্ত্র প্রসঙ্গে বিভিন্ন লেখায় এবং বক্তব্যে একটি বিষয়ে সর্বদা জোর দিয়ে থাকি।
সেটা হলো, যেকোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে অবশ্যই সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চিন্তাচেতনার প্রতিফলন ঘটবে। অনেকেই হয়তো এই তর্ক তুলবেন যে, জনমতকে তো নেতাই প্রভাবিত করে থাকেন। আমি মনে করি এ কথাটি আংশিক সত্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতাকে নির্বাচনে জিততে হলে জনমত বুঝে চলতে হয়। সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় অভিমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো নেতার পক্ষে রাজনীতিতে সফল হওয়া কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। মানুষের মন অল্প সময়ে পরিবর্তিত হয় না। এই যে ভারতে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সব নির্বাচনের আগে মুসলমানদের ওপর নিগ্রহের মাত্রা বেড়ে যায়, এর পেছনে জনতুষ্টি এবং নির্বাচনি হিসাবনিকাশ কাজ করে। ইসরাইলে এই অক্টোবরে সংসদের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেখানে নেতানিয়াহুসহ সব সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর প্রচারের মূল বয়ান হলো, প্যালেস্টাইনের মুসলমান নারী, পুরুষ, শিশুকে কে কত সফল ও বর্বরভাবে নির্যাতন ও হত্যা করতে সক্ষম হবে। গণহত্যা চালিয়ে প্যালেস্টাইনকে নিশ্চিহ্ন করে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করতে যার পরিকল্পনা ইসরাইলি ভোটারদের কাছে সবচেয়ে কার্যকর মনে হবে, সেই আসন্ন নির্বাচনে জিতবে। সুতরাং, নেতানিয়াহু কিংবা মোদি অসুখ নয়, উপসর্গ মাত্র।
ভারত ও ইসরাইলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উন্মত্ত ধর্মান্ধতাই সেখানকার আসল রোগ। চরম বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এমন ভয়ংকর ইসলামবিদ্বেষী ভারত এবং ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতম মিত্র দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান কিন্তু ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় নয়। সেটা খোদ আরব ভূমিতেই। দেশটির নাম সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমি জেনেবুঝেই বলছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) প্রকৃতপক্ষে ইসরাইল ও ভারতের অধিক বিশ্বস্ত বন্ধু। গণতন্ত্রহীন ইউএই জনমতের তোয়াক্কা না করে যতটা অন্ধভাবে ভারত ও ইসরাইলের সব অন্যায় সমর্থন করতে পারবে, গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেটা সম্ভব নয়। গাজায় এই শতাব্দীর ভয়াবহতম গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে জায়নিস্ট ইসরাইলের প্রতি ‘ওয়াশিংটন এস্টাবলিশমেন্টের’ সমর্থন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে দেশটির তরুণ প্রজন্ম বর্ণবাদী জায়নিজমের বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছে। এমনকি ইসরাইলের কট্টর সমর্থক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পর্যন্ত এই পরিবর্তনকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। অথচ ইউএইতে ভিন্ন চিত্র।
ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের চলমান যুদ্ধে তেমন কোনো রাখঢাক না রেখেই আমিরাত ইসরাইলের পক্ষাবলম্বন করেছে। যুদ্ধের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ ইসরাইলের সামরিক কর্তারা আমিরাত সফর করে গেছেন। ইসরাইলি ‘আয়রন ডোম’ আমিরাতের আকাশ পাহারা দিচ্ছে। মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান আমিরাতের সব বিমান ঘাঁটি থেকে উড়ে গিয়ে ইরানের ওপর বোমা ফেলেছে, দেশটির সামরিক ঘাঁটি থেকে ইসরাইলি ও মার্কিন সৈন্যরা ইরান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ছে। বছরের শুরুতে ইরানের ওপর মার্কিন এবং ইসরাইলি অন্যায় আক্রমণ শুরু করতেও আরব আমিরাত ক্রমাগত উসকানি দিয়েছে। তারা মুসলিম রাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংসের জন্য ওয়াশিংটনে ওকালতি করেছে।
একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের আসালুয়ে পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ইসরাইল ও আমিরাত যৌথভাবে হামলা চালালে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরক্তি প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হঠকারী কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দেয়। হাজার বছরের শিয়া-সুন্নি বিভেদকে পুঁজি করে আরব দেশটির শাসক পরিবার মুসলিম উম্মাহ ধ্বংসের মরণ খেলায় মেতেছে। পাকিস্তান যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করায় চরম অসন্তুষ্ট হয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ দেশটিকে এক মাসের মধ্যে ফেরত দিতে বাধ্য করেছে তথাকথিত মুসলিম উম্মাহভুক্ত ইউএই সরকার। পাকিস্তান সৌদি আরবের কাছ থেকে ধার করে আমিরাতের সেই আকস্মিক দাবি মিটিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরেই এ-জাতীয় আত্মবিধ্বংসী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকলে বাইরে থেকে উম্মাহর আর কোনো শত্রুর প্রয়োজন দেখি না। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইসরাইল ইরানে আক্রমণ চালানোর মাত্র দুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তেল আবিব সফর করে ইসরাইলকে পিতৃভূমি এবং ভারতকে মাতৃভূমি ঘোষণা করে এসেছিলেন। ইসরাইল-ভারত-ইউএই ট্রয়কা সম্পর্কে মুসলিম বিশ্বের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা এখন আফ্রিকার দরিদ্র ও সংঘাতময় দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত আমাদের এখান থেকে জনশক্তি পাঠানো নিয়ে। বছরে গড়ে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স ইউএই থেকে বাংলাদেশ আয় করে যা মোট রেমিট্যান্সের ১০ শতাংশেরও কিছু বেশি। সে দেশে চাকরি এবং ব্যবসায় নিয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, যেটা বিদেশিদের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। দেশটিতে কর্মরত ভারতীয়দের সংখ্যা ৪০ লাখ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী পাকিস্তানিদের সংখ্যা ১৫ লাখ। আমার ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ইউএই সরকার পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশি কর্মীদের সে দেশ থেকে সরিয়ে ভারতীয়দের অধিক হারে নিয়োগ দেবে। সুতরাং জনশক্তি রপ্তানির জন্য আমাদের অন্য দেশের সন্ধান এখন থেকেই করা উচিত।
পাঠকদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জানেন না যে, কিছুদিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইউএই বাংলাদেশের পরিবর্তে ইসরাইলের মিত্র সাইপ্রাসের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ট্রয়কার অন্য সদস্য ভারত কেবল আমাদের বিপক্ষে ভোট দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, সাইপ্রাসকে জেতানোর জন্য সরাসরি প্রচারও চালিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনা এবং তার লুটেরা ও খুনি দোসররাও প্রধানত ভারত ও আমিরাতে আশ্রয় নিয়েছে। গণহত্যাকারী সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধকে আরব আমিরাত সরকার উপেক্ষা করেছে। আমার ধারণা, এ বিষয়ে ভারত এবং ইউএই যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে এই দুই দেশ সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান রেখে আজকের লেখা শেষ করছি।
![]() |
| মাহমুদুর রহমান |
Tuesday, August 25, 2026
আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম নেই!
ফলে আজকের আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইসরাইলের বিষয়ে নীরব থাকা। কারণ ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কোনো মুসলমান ভিন্নমত পোষণ করলেই তার ওপর নেমে আসে অপবাদ, সন্দেহ ও একঘরে করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি। আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে ইসলাম ও আরব বিদ্বেষের কারণে বৈষম্য এবং হয়রানির অভিযোগ সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক প্রচারণায় ইসলামবিরোধী বক্তব্য এবং ভুল তথ্যের প্রচারণার কারণে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিমরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরলোকগত রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী বারাক ওবামার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সে সময় তাকে তার এমন কিছু সমর্থককে সামলাতে হয়েছিল, যারা ছিল নির্লজ্জ বর্ণবাদী ও কট্টর ইসলামবিদ্বেষী। ম্যাককেইনের নিজের মধ্যেও গোঁড়ামি ছিল এবং তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল কট্টরপন্থি, যার জন্য তার কিছুটা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার ভোটারদের একাংশের চরম ও ভারসাম্যহীন আচরণ তাকে হতবাক করেছিল।
ম্যাককেইনের নির্বাচনি প্রচারণার এক সভায় শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক নারী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি ওবামাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি তার সম্পর্কে পড়েছি এবং তিনি আসলে... তিনি একজন আরব।’ কথাটি বলার সময় তার কণ্ঠস্বর ধরে আসে। একজন ‘আরব’ ব্যক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন এই চিন্তাই তাকে প্রায় কান্নার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। তখন ম্যাককেইন ওই নারীকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ম্যাডাম, ওবামা একজন ভালো পারিবারিক মানুষ ও আমেরিকার নাগরিক। রাষ্ট্রীয় মৌলিক কিছু বিষয়ে তার সঙ্গে আমার মতপার্থক্য রয়েছে এবং এই নির্বাচনি প্রচারণার মূল বিষয়বস্তু সেটাই।’
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি প্রচারণায় মূলত সেসব বিষয়ই প্রাধান্য পায়, যা নিয়ে সেই নারী ২০০৮ সালেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মিশিগানে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদকে আক্রমণ করার জন্য রিপাবলিকান সিনেটররা শুধু তার নামের ওপরই বেশি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘মিশিগানের সমাজতন্ত্রী অবশেষে নিজের পুরো নাম প্রকাশ করলেন। তার নাম আবদুল রহমান মোহাম্মদ আল-সায়েদ।’ যদি একজন ‘আরব’ ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়া উদ্বেগের বিষয় হয়, তবে একজন ‘মোহাম্মদ’-এর প্রেসিডেন্ট হওয়া নিশ্চয়ই আরো ভয়াবহ কিছু হবে উগ্রপন্থি আমেরিকানদের কাছে।
নির্বাচনি প্রচারণাসহ সর্বক্ষেত্রেই আল-সায়েদের ওপর বিরোধীদের আক্রমণ এতটাই তীব্র ছিল যে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও তাকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিতে দ্বিধা করেননি। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স গর্ব করে বলেছিলেন, তিনি তার সারা জীবন ‘সন্ত্রাসীদের শিকার’ করেই কাটিয়েছেন। একই মনোভাব নিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ন্যান্সি মেস আল-সায়েদ ও নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা কি আমেরিকায় সরকারি পদে ‘সন্ত্রাসীদের’ নির্বাচিত করা বন্ধ করতে পারি না?’ এরপর তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় সরকারি পদে আসীন প্রতিটি মুসলিমই হলো এক একটি ‘ট্রোজান হর্স’ (ছদ্মবেশী শত্রু) এবং তারা জাতীয় নিরাপত্তা ও আমাদের প্রজাতন্ত্র উভয়ের জন্যই হুমকি।’
আজকের দিনে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামকে তীব্রভাবে ঘৃণা না করলে কেউ আধুনিক ও প্রগতিশীল হতে পারে না। সিআইএর সাবেক পরিচালক মাইক পম্পেও এর মতো একজন ব্যক্তি যখন খুব অনায়াসেই আল-সায়েদকে ‘হামাস সমর্থক’ বলে অভিহিত করেন, তখন বোঝা যায় যে, মুসলিমবিদ্বেষের পরিধি অনেক বিস্তৃত। এই বিদ্বেষ থেকে বাঁচতে হলে আমেরিকান মুসলিমদের বেশ কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে একটি হলো ইসরাইলের প্রতি আনুগত্য, যে শর্তটি পূরণ করতে আল-সায়েদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেনসের কোনো বেগ পেতে হয়নি। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি স্বপ্নেও ইসরাইল নিয়ে ভাবেন। এর বিপরীতে, গাজায় ইসরাইলের গণহত্যার কঠোর সমালোচনা করে এসেছেন আল-সায়েদ। ফলে তিনি যে উগ্রপন্থি ও ইসরাইল সমর্থক আমেরিকানদের শত্রু হবেন তা বলাই বাহুল্য।
আমেরিকান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার সংজ্ঞা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে শুধু ‘চরমপন্থা’ থেকে নিজেকে দূরে রাখলেই চলে না, বরং ইসরাইলের বিরোধিতা করা থেকেও বিরত থাকতে হয়। আমেরিকায় ভালো মুসলমান হওয়ার জন্য ইসরাইলের প্রতি আনুগত্যের এই যোগসূত্রটি মোটেও গোপন বিষয় নয়। দেশটির কট্টর নব্য-রক্ষণশীল (নিও-কনজারভেটিভ) চিন্তাবিদ রবার্ট কাগান সম্প্রতি বিষয়টি স্বীকার করেছেন, ‘আমেরিকা সামগ্রিকভাবে ইসলামবিদ্বেষী, তাই অনেক আমেরিকানের কাছে ইসলামের যেকোনো শত্রুই আমাদের বন্ধু। আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ একটি বাস্তবতা এবং ইসরাইলকে ইসলামের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে দেখা হয়।’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যুক্তি শুধু মুসলিমদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসরাইলের সমালোচনা করলে একজন ইহুদিও ‘খারাপ ইহুদি’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন।
ইসরাইলের পক্ষে সোচ্চার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্যতম অ্যালান ডারশোভিটজ সম্প্রতি সেসব ‘বাজে ইহুদি’র সমালোচনা করেছেন যারা আল-সায়েদ ও মামদানির মতো প্রার্থীদের সমর্থন করার সাহস দেখান। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আসল সমস্যাটা হলো ইহুদিরাই’ এবং ‘তারা আসলে কী করছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই।’
ডারশোভিটজের মতে, ‘যেকোনো ইহুদি যদি মামদানিকে ভোট দেন তবে তিনি আসলে নিজেকেই ঘৃণা করেন।’ তার এই অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও। একজন অ-ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওইসব ‘বাজে ইহুদি’র চেয়ে নিজেকে ‘অনেক বেশি কার্যকর ইহুদি নেতা’ হিসেবে দাবি করেন।’
এই প্রবণতাটি শুধু আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেহালাবাদক মাইকেল বারেনবোইম তার পর্যবেক্ষণ বলেছেন, ‘জার্মানিতে যেসব ইহুদি জায়নবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন তাদের আর প্রকৃত ইহুদি হিসেবে গণ্য করা হয় না।’ অন্যদিকে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘জুইশ ক্রনিকল’ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘এড মিলিব্যান্ড আসলে কতটা ইহুদি?’
পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে এই বার্তাটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, একজন ‘ভালো মুসলিম’ বা ‘ভালো ইহুদি’ হওয়ার জন্য শুধু ইসরাইলের প্রতি অবিচল আনুগত্যই যথেষ্ট নয়, বরং যারা ইসরাইলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে সেসব মুসলিমের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করাও ইহুদিদের জন্য জরুরি। ফলে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বে ‘ভালো’ মুসলিম হওয়ার সংজ্ঞা হচ্ছে তাকে অবশ্যই ইসরাইলের বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
* ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Saturday, August 22, 2026
ট্রাম্পের প্রস্তাবে নেতানিয়াহুর ভেটো by সাঈদ আরিকাত
ট্রাম্প মনে করতেন আমেরিকার শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা অতিরিক্ত সতর্কতা দেখিয়েছেন। তার মতে, মিত্র, প্রতিপক্ষ এবং আমলারা ওয়াশিংটনকে উপেক্ষা করতে শিখে গেছে, কারণ ওয়াশিংটন ভুলে গেছে কীভাবে অন্যদের বাধ্য করতে হয়। এজন্য গাজা প্রস্তাবের মাধ্যমে এর বিপরীত চিত্রই তুলে ধরার কথা ছিল, যেখানে ট্রাম্প একটি রূপরেখা চাপিয়ে দেবেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তা মেনে নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সেই অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে দাবি করে আসছে।
কিন্তু তার সেই রূপরেখাকে নেতানিয়াহুর দ্রুত প্রত্যাখ্যান শুধু আলোচনার একটি কৌশল ছিল না, বরং এটি ছিল মূলত একটি আগাম ভেটো। এর লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পের উদ্যোগটি গতি পাওয়ার আগেই সেটিকে দুর্বল করা। এই বিরোধকে একজন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে সাধারণ মতপার্থক্য হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু তাতে বিষয়টির বৃহত্তর তাৎপর্য আড়ালে পড়ে যায়। হামাসকে ‘প্রকৃত অর্থে’ নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার করা যাবে না—নেতানিয়াহুর এই অনড় অবস্থান ট্রাম্পের প্রস্তাবের মূল ভিত্তিতেই আঘাত করেছে। একই সঙ্গে এটি এমন একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, যা ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে এড়িয়ে চলেছে। সেই প্রশ্নটি হচ্ছে—যখন কোনো পরাশক্তি তার মিত্রকে নিজস্ব কূটনীতির শর্তাবলি নির্ধারণের সুযোগ দেয়, তখন বাস্তবে কী ঘটে?
ট্রাম্পের ১৫ দফা রূপরেখা পারস্পরিক পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর আওতায় একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রক্রিয়া ও ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে শুরু করবে এবং নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলি বাহিনী গাজা থেকে পর্যায়ক্রমে সরে যাবে। কিন্তু নেতানিয়াহু ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কার্যত সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছেন। তার যুক্তি হলো, হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত ইসরাইল কোনো অর্থবহ সেনা প্রত্যাহার করতে পারে না। কিন্তু ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ বলতে কী বোঝায়, তা কে নির্ধারণ করবে এবং কে তা যাচাই করবে? আর তখন কী হবে যখন ইসরাইল দাবি করবে যে, হামাস কোথাও অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে অথবা নতুন কোনো হুমকি দেখা দিয়েছে?
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যদি ইসরাইল সরকারের হাতেই থাকে, তবে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি এমন এক মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা শুধু ইসরাইলই নির্ধারণ ও পরিবর্তন করবে। এটি ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী ভেটো বা বাধার সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক ও ফিলিস্তিনি অন্তর্বর্তী কাঠামোর কাছে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর অবস্থান অনুযায়ী ইসরাইল কখন তাদের সামরিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটাবে, সেটি তারাই ঠিক করবে। হামাসের হুমকি কখন দূর হয়েছে, তা যদি ইসরাইল একাই নির্ধারণ করে, তবে উত্তরণ প্রক্রিয়া কখন শুরু হবে, তাও দেশটিই ঠিক করবে। এর ফলে নিরস্ত্রীকরণের মোড়কে গাজায় ইসরাইলের নিরাপত্তা উপস্থিতি অনির্দিষ্টকাল বজায় থাকবে।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই মতপার্থক্য সংঘাতকে আরো তীব্র করবে। ট্রাম্প চান গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে। তিনি এমন একটি কূটনৈতিক সাফল্য চান, যা তার নিজের অর্জন হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং প্রমাণ করবে যে, প্রচলিত কূটনীতি যেখানে ব্যর্থ, সেখানে মার্কিন শক্তি সফল হয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার কাছে, ইসরাইলি বিজয়ের সংজ্ঞার সঙ্গে যুদ্ধ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এমন কোনো সমঝোতা—যার মাধ্যমে লড়াইও থামল, হামাসের হাতে কিছু সক্ষমতাও রয়ে গেল অথবা ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক পক্ষের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা হস্তান্তরিত হলো, সে রকম কিছু মানবে ইসরাইল। এটিকে নেতানিয়াহুর সরকারের উগ্রপন্থি মিত্ররা যুদ্ধের মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসা বা পরাজয় হিসেবে তুলে ধরবে।
ট্রাম্প সাফল্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন লেনদেন বা বিনিময়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আর নেতানিয়াহু তা দেখেন সর্বোচ্চ অর্জনের দৃষ্টিকোণ থেকে। তারা মিত্র হলেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এক নয়। ফলে এমন এক সংঘাতের সৃষ্টি হয়, যেখানে একদিকে আছেন এমন এক প্রেসিডেন্ট, যিনি সমাধান চাইছেন, অন্যদিকে এমন এক প্রধানমন্ত্রী যার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকে আছে সেই সমাধানটি ঠেকিয়ে রাখার ওপর। ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সংঘাত ঠিক এখানেই।
নেতানিয়াহু একটি বিষয় ভালোভাবেই বোঝেন, যা ইসরাইলের আগের সরকারগুলো প্রয়োগ করেছে। আর তা হলো ইসরাইল যদি অনড় অবস্থান নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া ‘রেড লাইন’ বা কঠোর সীমারেখা আলোচনা সাপেক্ষে নমনীয় হয়। তাদের এই কৌশলটি হলো—সময়ক্ষেপণ করা, আপত্তি জানানো, নিরাপত্তার দোহাই দেওয়া, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের পিছু হটার জন্য অপেক্ষা করা। এভাবেই তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে যুগ যুগ ধরে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে। কিন্তু তারপরও ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সব কথা বা শর্ত কখনোই মেনে চলেনি। ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে তা আবার প্রমাণ হলো। সবসময়ই দেখা গেছে, সংঘাতের রাজনৈতিক মূল্য যখন বেড়ে গেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইসরাইল সরকারের কাছে নতি স্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক মিত্রকে অর্থায়ন করে চলেছে যে নিয়মিতভাবে মার্কিন নীতি অগ্রাহ্য করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এজন্য ইসরাইলের ওপর অর্থবহ চাপ সৃষ্টির পরিবর্তে শুধু গোপনে অনুরোধ করে থাকে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিনের এই ধারা অব্যাহত থাকার ওপরই ভরসা করছেন।
ট্রাম্প এ ধরনের রাজনৈতিক স্থবিরতা ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি করতে হলে শুধু নেতানিয়াহুকেই নয়, বরং দেশটির সেই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে, যা ইসরাইল সরকারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করাকে কঠিন করে রেখেছে। কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখতে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা নেতানিয়াহুকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের ঘোষিত লক্ষ্য অমান্য করলে কোনো মাশুল গুনতে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষ্ক্রিয়তা ইসরাইলের অনমনীয় মনোভাব বজায় রাখাকে বরাবরই উৎসাহিত করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। ইসরাইল যদি তার গাজা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করা অব্যাহত রাখে, তবে তিনি বা তার প্রশাসন কী করবে? এর উত্তর পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে সামরিক সহায়তার সঙ্গে শর্ত জুড়ে দেওয়া, অস্ত্র সরবরাহ ধীর করা অথবা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া যে, ইসরাইলি নীতি যখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘোষিত লক্ষ্যকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে, তখন সহায়তা আর সহজে পাওয়া যাবে না।
রাজনৈতিক এই ঝুঁকি নেওয়ার সদিচ্ছা ছাড়া মার্কিন নেতৃত্বের বুলি শুধু লোকদেখানো নাটক ছাড়া আর কিছু নয়। ‘ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে’—এই বয়ান সামনে রেখে হামাসকে ধ্বংস করা ও গাজা উপত্যকা চিরদিন দখলে রাখার জন্য ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া লাইসেন্সই বরং বহাল থাকবে। ট্রাম্প যদি ইসরাইলের পক্ষের এই বয়ানে পরিবর্তন আনতে না পারেন, তবে তা এটাই প্রমাণ করবে, ইসরাইলি নেতারা বড় কোনো শাস্তির ভয় ছাড়াই মার্কিন কূটনীতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—তাদের ক্ষমতার অভাব নয়, বরং সেই ক্ষমতা প্রয়োগের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। ক্ষমতা প্রয়োগের সদিচ্ছা ছাড়া ক্ষমতা শুধুই লোকদেখানো অভিনয়। গাজার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সেই অভিনয় ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে।
* আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী
![]() |
| মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু |
Friday, August 21, 2026
স্বৈরাচারের পরিণতি বড়ই নির্মম by জালাল উদ্দিন ওমর
পৃথিবীতে আমরা সবাই ক্ষণিকের অতিথি। নির্দিষ্ট সময় পর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পৃথিবী ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যায়। অর্থ, বিত্ত, আভিজাত্য, ক্ষমতা এবং প্রভাব প্রতিপত্তি কোনোটাই মানুষের সঙ্গে যায় না। খালি হাতেই পৃথিবীতে মানুষের আগমন এবং খালি হাতেই বিদায়। একজন ভিখারি এবং প্রেসিডেন্টের বিদায় ও একই রকম। তবু কিছু মানুষ এই চিরন্তন সত্যকে ভুলে যায়। পৃথিবীতে প্রভাব-পতিপ্রত্তি এবং ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যায়। এরা সত্যকে হত্যা করে, আইনকে মানে না এবং অন্যের অধিকার হরণ করে। নিজের স্বার্থকে হাসিল করতে মানুষের ওপর জুলুম করে। তারা মনে করে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী এবং কখনো পতন হবে না। দম্ভ এবং অহংকারে মানুষকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, যা ইচ্ছা তাই করে এবং শক্তির জোরে মানুষকে দমিয়ে রাখে। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি যে নিজেকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে চায় না। অবশেষে একদিন ধ্বংসের সময় এসে যায় এবং ধ্বংস হয়ে যায়। সব হারানোর পর তিনি ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু তখন শোধরানোর সময় থাকে না। ধ্বংসই হয় তার জীবনের অনিবার্য পরিণতি, যা তাকে ভোগ করতেই হয়।
সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষের মধ্যে সত্য-মিথ্যা লড়াই বিদ্যমান। কিছু মানুষ ন্যায় ও সত্যকে বর্জন করে অন্যায় এবং মিথ্যার পথে চলে। কিছু মানুষ অন্যায় ও মিথ্যাকে বর্জন করে ন্যায় ও সত্যের পথে চলে। ন্যায় ও সত্যপন্থিদের সঙ্গে অন্যায় ও মিথ্যাপান্থিদের দ্বন্দ্ব সংঘাত চলে। অন্যায় ও মিথ্যার অনুসারীরা প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে সবসময় ন্যায় ও সত্যের অনুসারীদের ওপর জুলুম নির্যাতন চালায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ন্যায় ও সত্যপন্থিদের বিজয় হয় এবং অন্যায় ও মিথ্যার অনুসারীদের পরাজয় হয়। অন্যায়ও মিথ্যার অনুসারীদের জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়, অপমান এবং লাঞ্ছনা। ইতিহাসের এই নিয়ম বহতা নদীর মতোই বয়ে চলছে। ফেরাউন সবসময় হজরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদের ওপর, নমরুদ সবসময় হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার অনুসারীদের ওপর এবং আবু জেহেল ও আবু লাহাবরা সবসময় হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার অনুসারীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফেরাউন, নমরুদ, আবু জেহেল এবং আবু লাহাবদের করুণ পরিণতি হয়েছে। ইতিহাসে অভিশপ্ত এবং ঘৃণিত হয়েছে। যুগে যুগে সব স্বৈরাচারেরই করুণ পরিণতি এবং সবাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এরা মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান অর্জন করতে পারেনি বরং ঘৃণা এবং অসম্মানই অর্জন করেছে।
কিছু মানুষ সবসময় বিজয়ী হতে চায়। বিজয়ী হতে আইনলঙ্ঘন করে এবং সত্যকে হত্যা করে। কিন্তু সব বিজয় বিজয় নয় এবং সব পরাজয় পরাজয় নয়। কিছু বিজয় আসলে পরাজয় এবং কিছু পরাজয় আসলে বিজয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে চলে পরাজিত হলেও তা আসলে বিজয় এবং মিথ্যা ও অন্যায়ের পথে চলে বিজয়ী হলেও তা আসলে পরাজয়। কারবালায় ইয়াজিদ এবং পলাশীতে মীরজাফর বিজয়ী হলেও, তারা আসলে পরাজিতই হয়েছে। এজন্য বিশ্বজুড়ে ইয়াজিদ এবং মীরজাফর অতি ঘৃণিত এবং বাবা-মায়েরা সন্তানের নাম ইয়াজিদ এবং মীরজাফর রাখে না। কিন্তু ইমাম হোসেন (রা.) এবং সিরাজউদ্দৌলা সেদিন পরাজিত এবং মৃত্যুবরণ করলেও, দুজনেই বিশ্বজুড়ে অতি সম্মানিত । ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে সবারই শিক্ষা নিতে হবে।
প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা কথা আছে। মানুষের ওপর জুলুম, নির্যাতন, অবিচার এবং তাদের অধিকার হরণ করলে এর পরিণতি ভোগ করতেই হবে। যেভাবেই হোক জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এর প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে। মানুষের ওপর জুলুম নির্যাতন করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এটি পৃথিবীর অতীত ইতিহাসের প্রমাণিত সত্য এবং আগামী দিনের অনিবার্য বাস্তবতা। জুলুম এবং অবিচার শুধু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এবং সমাজের ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাই করে তা নয়। সবাই কিন্তু নিজ নিজ অবস্থানে ক্ষমতাবান। কারো ক্ষমতা ছোট এবং কারো ক্ষমতা বড়। সবাইকে নিজস্ব পরিমণ্ডলে অধীনস্থ মানুষগুলোর প্রতি সদয় আচরণ করতে হবে। জনগণের শাসক না হয়ে সেবক এবং জনগণকে শোষণ না করে সাহায্য করতে হবে। জনগণ না চাইলে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু ভোটাধিকার হরণ করে, বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে স্বৈরাচার হয়ে মানুষের অধিকার হরণ করা যাবে না। প্রত্যেকেই নিজ অবস্থান থেকে মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করলে বং কারো প্রতি জুলুম না করলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বÑসর্বত্রই শান্তি বিরাজ করবে। জালিম এবং স্বৈরাচার হয়ে মানুষের প্রতি অবিচার করলে পরিণতি নিশ্চিতভাবেই নির্মম ও করুণ হবে। এ দ্রুব সত্যটি সবারই বোঝা দরকার।
* লেখক : জালাল উদ্দিন ওমর, প্রকৌশলী, ইমেইল : omar_ctg123@yahoo.com
![]() |
| এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি। |
মাওলানা সাঈদীর মৃত্যু: সেদিন হাসপাতালে যা হয়েছিল by মাসুদ সাঈদী
আব্বাকে ঠিক কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তা জানার জন্য আমি এরপর হন্যে হয়ে কারাগারের পরিচিত কর্মকর্তাদের একের পর এক ফোন করতে থাকলাম। কিন্তু কোথাও আব্বাকে আনার খবর পেলাম না। আমি, আমাদের পরিবারের লোকজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা মিলে সম্ভাব্য তিনটি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকলাম। এগুলো হলো জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, মিরপুর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও পিজি হাসপাতাল। কিন্তু কোথাও আব্বাকে নিয়ে আসার খবর পেলাম না। অবশেষে রাত ১০টারও কিছু সময় পর আমরা জানতে পারলাম আব্বাকে শাহবাগের পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছে আল্লামা সাঈদী অসুস্থ এবং তাকে পিজিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। আব্বাকে নিয়ে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের ভিড় জমতে থাকে হাসপাতালের সামনে। রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ ভেসে এলো পিজির মূল গেটের দিক থেকে। সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশাল বহর।
অ্যাম্বুলেন্স সোজা পিজি হাসপাতালের ডি ব্লকের ইমার্জেন্সির সামনে গিয়ে থামল। সবাই দৌড়ে সেখানে হাজির হওয়ার চেষ্টা করলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটকে দিল আমাদের সবাইকে।
গাড়ির দরজা খুলল। দুজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কাঁধে ভর করে আব্বা নামলেন। মেহেদি মাখানো লাল দাড়িতে আব্বার চেহারাটা খুব মায়াবি লাগছিল। দুজনের কাঁধে ভর করে নেমেই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কাউকে আগে সালাম দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি হাত নেড়ে সবার উদ্দেশে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’ মুহূর্তের মধ্যে একটা শোরগোল পড়ে গেল। গভীর রজনীতে হাসপাতাল কাঁপিয়ে জনতা সমস্বরে উত্তর দিল ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’। আব্বার মুখে তখন সেই ভুবনকাড়া হাসি।
১৩ বছর কারাগারে থাকা অবস্থায় বহুবার আব্বাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। কোনোবার এমন হয়নি যে, আব্বাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে অথচ আমি উপস্থিত নেই। আব্বাকে হাসপাতালে আনলে বরাবর আমি যেটা করতাম তা হলোÑআব্বাকে বহনকারী গাড়ি হাসপাতালের গেটে পৌঁছালে আমি গাড়ির দরজার কাছে এগিয়ে যেতাম। আব্বার হাত ধরে তাকে গাড়ি থেকে নামাতাম। এরপর পাশাপাশি হেঁটে আব্বার শারীরিক অবস্থা জানতে জানতে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে যেতাম। কিন্তু এই শেষবার ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আব্বাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই হাসপাতাল জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। হাসপাতাল জুড়েই ছিল তাদের সরব উপস্থিতি। আর আব্বার গাড়ি যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছাল, তখন পুরো গাড়িটাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘিরে ফেলল। তবু ওই অবস্থার মধ্যেই আমি আব্বার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়েই আব্বার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। ওদের আচরণে আব্বা ভীষণ কষ্ট পেলেন। ধমকের সুরে প্রতিবাদ করলেন। আমাকে কাছে আসতে দিতে বললেন। কিন্তু কোনো কথাই তারা শুনল না। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ভীষণ তাড়াহুড়া লক্ষ করলাম। ওদের রুক্ষ আচরণে আমি হতবাক হলাম। তবু ভাবলাম, যাক! হাসপাতালে যখন আব্বাকে এনেছে, আজকের রাতটা যাক। আগামীকাল ইনশাআল্লাহ আব্বার সঙ্গে দেখা করব, কথা বলব, আর আব্বার শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত জেনে নেব।
কিন্তু কে জানত, আব্বার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া বা আব্বার সঙ্গে দেখা করার ‘আগামীকাল’—আমার জীবনে আর কোনো দিনই আসবে না।
অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দ্রুত আব্বাকে নিয়ে যাওয়া হলো ইমার্জেন্সিতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু লোক ছাড়া আর কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হলো না। তারা ভেতরে ঢুকেই ডি-ব্লকের মূল গেট বন্ধ করে দিল। আমি পাগলের মতো পেছন পেছন ছুটছিলাম ইমার্জেন্সির দিকে, কিন্তু ঢুকতে পারলাম না। ইমার্জেন্সির চেকআপ প্রক্রিয়ায় সব মিলিয়ে সময় লেগেছে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মতো। এর ফাঁকে আব্বার সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ কিংবা খোঁজখবর নেওয়ার কোনো সুযোগই তারা আমাকে দিল না!
ইমার্জেন্সি রুমে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর সেখানে পিজি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ এলেন। তার সঙ্গে এলেন পিজি হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএম মোস্তফা জামান। তারা কেউই আমাদের পরিচিত নন। তারা ইমার্জেন্সি রুমের বন্ধ দরজার ভেতরে কী আলোচনা করলেন আর কী সিদ্ধান্ত নিলেন, তা আমি বা আমরা জানতেই পারলাম না। তাদের তো উচিত ছিল এই আলোচনা করার সময় রোগীর সন্তান হিসেবে আমাকে বা আমাদের পরিবারের কাউকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা করার, আমাদের বিস্তারিত জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কিন্তু তারা তা করেননি। শুধু তাই নয়, আব্বার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের কোনো কিছু না জানিয়েই ইমার্জেন্সি রুম থেকে তারা বেরিয়ে যান। বাইরে দেশের প্রায় সব ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাংবাদিকরা আব্বার শারীরিক অবস্থা জানার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তারা রুম থেকে বের হতেই সাংবাদিকরা ওই দুজন চিকিৎসককে ঘিরে ধরলেন। ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলে চলে গেলেন আর ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের ব্রিফ করা শুরু করলেন। তখন আমি জানতে পারলাম তারা চিকিৎসক এবং তাদের দুজনকে আব্বার চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের বললেন, “দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আমার অধীনে কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সিতে ভর্তি রয়েছেন। কিছুক্ষণ আগে আমি খবর পেয়ে এখানে এসেছি। বর্তমানে তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। প্রাথমিক ইসিজিতে ওনার হার্ট অ্যাটাক পাওয়া গেছে। এর আগেও ওনার হার্টে রিং পরানো হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছিল তার প্রাইমারি পিসিআই লাগবে। অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে এনজিওগ্রাম করে রিং বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে ‘বুকের ব্যথা কমে যাওয়ায়’ আপাতত পিসিআই লাগবে না বলে মনে হচ্ছে(!)। তবে তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তাকে আমরা কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখছি।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিং শেষ হলে ডা. এসএম মোস্তফা জামানের সামনে গিয়ে আমি দাঁড়ালাম। তাকে আমি আমার পরিচয় দিলাম। সোজাসাপ্টা জানতে চাইলাম, ‘আপনি বলছেন আমার আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে আপনারা এখনো তার এনজিওগ্রাম করছেন না কেন? কেন সময় নষ্ট করছেন?’
ডা. এসএম মোস্তফা জামান জবাবে বললেন, ‘ঠিক এই মুহূর্তে আপনার আব্বার বুকে ব্যথা নেই, তাই এনজিওগ্রাম না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।’
তখন না বুঝলেও এখন বেশ বুঝতে পারছি—তাদের রিপোর্ট(!) অনুযায়ী আব্বার হার্ট অ্যাটাক হলেও ডাক্তাররা আব্বার প্রাইমারি পিসিআই (Primary Percutaneous Coronary Intervention)Ñঅর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে এনজিওগ্রাম কেন করল না? কেন তার মতো বিশ্ববিখ্যাত একজন মানুষের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করল না? কেন হাসপাতালে এত কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? কেন একটিবারের জন্যও আমাকে আব্বার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি? কেন আব্বার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আমাকে একটুও জানতে দেওয়া হয়নি?—তা এখন বেশ বুঝতে পারছি।
পিজির চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নিলেন প্রাথমিক চেকআপের পর আব্বাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করবেন। আমরা রুমের সামনে অপেক্ষমাণ। হঠাৎ রুমের দরজা খুলে গেল। আব্বা হুইলচেয়ারে ঠিক দরজার দিকে মুখ করেই বসা ছিলেন। সামনেই আমরা কয়েকজন দাঁড়ানো। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আব্বা আমাকে আর আমার ছোট ভাই নাসীমকে দেখে এক অমায়িক হাসি দিলেন। আমাদের দেখে আব্বা কতটা তৃপ্ত হলেন তা আমি তার মিষ্টি হাসি দেখেই অনুমান করতে পেরেছিলাম। আব্বা ভরসা পেলেন তার সন্তানরা তার কাছেই আছে, তার পাশেই আছে!
সিসিইউ রুমের দরজা মিলিয়ে গেল। আব্বা আমাদের চোখের অন্তরালে চলে গেলেন। আব্বা দুনিয়ার অন্তরালে যাওয়ার আগ মুহূর্তে এভাবেই আমাদের চোখেরও অন্তরালে চলে গেলেন। এই যে যাওয়া এটাই শেষ যাওয়া, এটাই শেষ দেখা। এরপর হাসপাতালের সামনে সিঁড়িতে, ফ্লোরে রাত-দিন এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমিÑ কখন আব্বাকে একনজর দেখার ডাক পাব। চিকিৎসাধীন বাবাকে মৃত্যুর আগে একটিবারের জন্যও তার সন্তানদের দেখার সুযোগ দেওয়া হয় নাÑপৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম দ্বিতীয় কোনো ঘটনা আছে কি না আমার জানা নেই।
১৪ আগস্ট ২০২৩, সোমবার। আগের দিন সারারাত নির্ঘুম কাটানোর পর ভোর হতেই আমি সিসিইউতে আবার ঢোকার চেষ্টা করলাম। দোতলায় সিসিইউর সামনে গিয়ে দেখি পঞ্চাশের অধিক পুলিশ সেখানে অবস্থান নিয়েছে। শুধু তাই নয়, সিসিইউর প্রবেশ মুখে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম! এত কঠিন নিরাপত্তাবেষ্টনী কেন?—এমন আগে তো কখনো হয়নি! এখন কী এমন হলো যে এত কঠোর অবস্থানে পুলিশ!!
আব্বার খোঁজ নেওয়ার বা আব্বার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা বারবার করেও ব্যর্থ হলাম। কী করব? আমার কী করা উচিত?—ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। হঠাৎ মনে পড়ল ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদের কথা। গত রাতেই শুনেছিলাম তিনি পিজি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান এবং আব্বা তার অধীনেই ভর্তি আছেন। দৌড়ে গেলাম মেশকাত সাহেবের রুমে। কিন্তু তাকে পেলাম না, তিনি তখনো অফিসে আসেননি। কী আর করা! হাসপাতালের ডি-ব্লকের নিচে একটি সিঁড়ি আছে। আমি সেই সিঁড়িতে গিয়ে বসে পড়লাম, ডা. মেশকাত যখনই রুমে ঢুকবেন আমি যেন তাকে মিস না করি। সম্ভবত বেলা ১১টার দিকে ডা. মেশকাত তার অফিসে এলেন। তিনি অফিসে ঢোকার কিছু পরেই আমি তার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে গিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি! তার রুমের সামনেও অনেক পুলিশ। আমি ভেবে পেলাম না এই সাজসাজ রব কীসের জন্য। রুমে ঢুকতে গিয়েই পুলিশি বাধার মুখে পড়লাম। কোথায় যাব, কার কাছে যাব? কেন যাব?— এমন হাজারো প্রশ্ন তাদের! আমি আমার পরিচয় দিলাম, কার কাছে যাব তাও জানালাম। তারা শুনে বলল, অপেক্ষা করুন, সাক্ষাতের অনুমতি আনতে হবেÑএই বলে একজন পুলিশ সদস্য রুমের ভেতরে চলে গেলেন। আমি একা বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছিলামÑএকজন অসুস্থ মানুষের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার জন্য ডাক্তারের অফিসে ঢুকতেও পুলিশের অনুমতি লাগবে? ডা. মেশকাত তো সরকারের মন্ত্রী না, এমপিও না, কোনো সচিব না কিংবা ভিআইপি প্রোটোকল পাওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিও না! তাহলে? এই লোককে এত পাহারায় রাখার কারণ কী? কোথায় যেন একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলাম না রহস্যটা কী! অনেক সময় পর একজন রুম থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। আমি রুমে ঢুকে দেখি সেখানেও পুলিশে ভরা। ডা. মেশকাতের সঙ্গে দুজন লোককে বসা দেখলাম। আমাকে বসতে বলার পর একজন তার পরিচয় দিলেন যে তিনি পিজি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান আর অন্যজন গতরাতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করা সেই ডা. এসএম মোস্তফা জামান। আমি আব্বার শারীরিক অবস্থার কথা সরাসরি ডা. মেশকাত আহমেদের কাছে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, স্যার আগের থেকে সুস্থ আছেন। এবার আমি বললাম, ‘আমি আব্বার সঙ্গে দেখা করতে চাই এবং তা এখনই। আমি তার মুখ থেকেই শুনতে চাই তিনি কেমন আছেন এবং কেনই বা তাকে এখানে আনা হয়েছে।’ এ পর্যায়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান বললেন, ‘আমরা আপনাকে দেখা করার ব্যবস্থা করছি। আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন।’
সরল বিশ্বাসে আমি বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঘণ্টা পেরিয়ে গেল কিন্তু না ডা. মেশকাত আহমেদ আমাকে কোনো খবর দিলেন, না ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান আমাকে কোনো খবর দিলেন! আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না এখন আমার কি করণীয়।
এরপর আমি আইনজীবীদের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুটি আবেদন করলাম। প্রথম আবেদনটি হলো— আম্মাসহ আমাদের পরিবারের অন্যসব সদস্যের আব্বার সঙ্গে হাসপাতালে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন। আর দ্বিতীয় আবেদনটি হলোÑবয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় আব্বার সার্বক্ষণিক দেখভাল ও সার্বিক সহযোগিতার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে আমি অথবা যেকোনো একজন অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে থাকার অনুমতি চেয়ে আবেদন।
বেলা গড়িয়ে ঘড়িতে দুপুর ১টার মতো বাজে। তখনো তাদের দুজনের কেউই আমাকে কোনো মেসেজ না দেওয়ায় আমি আবার ডা. মেশকাত আহমেদের রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি রুমে নেই। অফিস একেবারেই ফাঁকা। সেখান থেকে নেমে আমি সোজা চলে এলাম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমানের অফিসে। এখানে এসে রেজাউর রহমানের পাশে বসা দেখলাম ডা. এসএম মোস্তফা জামানকে। এখানে গিয়ে রেজাউর রহমানকে পেলাম ঠিকই কিন্তু তিনি তখন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে সময় দেওয়ার মতো সময় তার কোথায়! তবু আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য নিয়ে দাঁতে দাঁত কামড়ে বসে আছি।
আব্বার কোনো খবর জানতে পারছি না, তাকে দেখতে পারছি নাÑএমনিতেই আমার মন খারাপ হয়ে আছে, তার মধ্যে দেখছি পরিচালক সাহেব তার রুমে থাকা লোকজনের সঙ্গে চা-নাশতা আর গল্পে সময় পার করছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল আমার।
ভর দুপুরবেলা। বাইরে তখন প্রচণ্ড রোদ। পরিচালকের রুম থেকে বেরিয়ে আমি একা উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছি। খুব অসহায় মনে হচ্ছিল নিজেকে। আব্বার সব মামলা সব জায়গায় (জজকোর্ট, সিএমএম কোর্ট, ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) আমি একা বছরের পর বছর পরিচালনা করেছি। দৌড়িয়েছি, সিনিয়র-জুনিয়র ল’ইয়ারদের চেম্বারে গিয়েছি, করোনার সময়ও আমি নিয়মিত কাসিমপুর কারাগারে গিয়েছি, অসম্ভব পরিশ্রম করেছি কিন্তু আজকের মতো এতটা অসহায় আর দুর্বল কখনোই মনে হয়নি। অজানা আতঙ্ক পেয়ে বসেছিল আমাকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার পর আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীক ফোন দিলাম। তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘তুমি কোনো চিন্তা করিও না। তোমার আবেদন এখন আমার হাতে। আমি সব ব্যবস্থা করছি । তার কথায় মনটা একটু হালকা হলো।’
আমি সিসিইউতে ওঠার সিঁড়িতে বসে রইলাম। উপরে ওঠার কোনো সুযোগ নেই, কারণ গোটা সিসিইউর এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একপ্রকার ঘিরে ফেলেছে। বিকাল ৫টার মতো বেজে গেল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমার আবেদন মঞ্জুরের কোনো খবর তখনো এলো না। এদিকে হঠাৎ করেই হাসপাতাল কম্পাউন্ডে প্রশাসনের বেশ কিছু গাড়ি ঢুকতে দেখলাম। অফিশিয়াল ড্রেসের ও সিভিল পোশাকের অনেক নতুন অফিসারকে দেখলাম। পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছিল ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাংবাদিকের সংখ্যা। সঙ্গে বাড়ছিল আল্লামা সাঈদীকে ভালোবাসার মানুষের সংখ্যাও। ঘড়ির কাঁটা যখন ৬টা ছুঁয়ে ফেলল এবং আব্বার সঙ্গে সাক্ষাতের তখনো কোনো সুযোগ আমরা পরিবারের সদস্যরা পেলাম না—তখন বুঝলাম আমাদের পরিকল্পিতভাবেই আব্বার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার সঙ্গে শুধু মিষ্টি কথার অভিনয় করেছেন আর আমি তার অভিনয়কে সহমর্মিতা ভেবেছিলাম!
মাগরিবের পরপরই আব্বার দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের খবর শুনি লোকমুখে। পাগলের মতো ছোটাছুটি করেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো খবর বের করতে পারলাম না। দায়িত্বরত প্রশাসনের লোকজনের কাছে গিয়ে বিষয়টির সত্যতা জানতে চাইলে তারা জানালেন, তিনি একেবারেই স্বাভাবিক আছেন। তারা দেখে এসেই নাকি আমাকে জানাচ্ছেন। কিন্তু তাদের চোখে চোখ রেখে আমি আশ্বস্ত হতে পারলাম না, তাদের চেহারায় বা অভিব্যক্তিতে তাদের কথার সত্যতা খুঁজে পেলাম না। এরই মধ্যে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরপরই সরকার এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়ি হাসপাতাল চত্বরে আসতে শুরু করল। হাসপাতালের চারদিকে বিপুল পরিমাণে পুলিশ মোতায়েন করা হলো। হাসপাতালের ডাক্তার আর প্রশাসনের লোকদের ছুটোছুটি দেখতে পেলাম।
আব্বাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে নিয়ে আব্বার দুনিয়ার সফর শেষ করা পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আব্বার চিকিৎসার বিষয়ে আমার বা আমাদের সঙ্গে একটিবারের জন্যও কোনো আলোচনা করেননি, আব্বার পুরোনো রোগ কিংবা চিকিৎসা সম্পর্কেও আমাদের কাছে কিছু জানতে চাননি, তারা আব্বার কী চিকিৎসা করছেন, সে সম্পর্কেও আমাদের পরিষ্কার করে কিছু বলেননি, তারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আব্বার শারীরিক অবস্থার আপডেটও আমাদের জানাননি। সন্ধ্যার পর থেকে আব্বার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিলÑসেই খবরটিও আমাদের জানাননি। দ্বিতীয়বার আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছেÑসেটিও তারা অফিশিয়ালি আমাদের কিছু জানাননি। শেষ পর্যন্ত আব্বাকে তারা লাইফ সাপোর্টে নিয়েছেনÑএ বিষয়েও আমাকে/আমাদের অবহিত করেননি। এমনকি লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে কোনো লিখিত বা মৌখিক অনুমতিও নেননি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আব্বার চিকিৎসা প্রক্রিয়াটাই ছিল রহস্যজনক, সন্দেহজনক।
হাজারো ভাবনা, অস্থিরতা আর ছুটোছুটির মধ্যেই এশার আজান হয়ে গেল। সব অস্থিরতা একদিকে রেখে মনের প্রশান্তি আর আব্বার দ্রুত সুস্থতা ও নেক হায়াত কামনায় মালিকের দরবারে সেজদা দেওয়ার জন্য ছোট ভাই নাসীম সাঈদীকে নিয়ে পিজি হাসপাতালের মসজিদের দিকে ছুটলাম। কাকতালীয় কি না জানি না, ইমাম সাহেব শাহাদতের আয়াত ধরলেন। তিনি সুরা আলে ইমরানের ১৬৭ নম্বর আয়াত থেকে তিলাওয়াত শুরু করলেন। যখন তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন—যার অর্থ হলো আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন, তাদের কখনোই মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের কাছ থেকে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। মনের অজান্তেই চোখ বেয়ে অনর্গল পানি গড়াতে লাগল নামাজের ভেতরেই। মনে হচ্ছিল ভেতরটা ধুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। নামাজের ভেতরেই চিৎকার দিতে ইচ্ছে করছিল। চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারছিলাম না, টপটপ করে দাড়ি ভিজে পাঞ্জাবিতে পড়ছিল। শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে চোখের পানিতে নামাজ শেষ করলাম। মোনাজাতরত অবস্থায়ই একজন পুলিশ অফিসার এসে আমাকে সালাম জানালেন। বললেন, রমনা জোনের এডিসি হারুন অর রশীদ ও শাহবাগ থানার ওসি নূর মোহাম্মাদ আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি কান্নাভেজা চোখ সামলে তাদের কাছে যাওয়ার পর তারা তাদের সঙ্গে আমাকে সিসিইউতে যেতে বললেন। আমি ধরেই নিলাম—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আব্বার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি বুঝি পাওয়া গেল! দীর্ঘক্ষণের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে আব্বার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা। বহুল প্রতীক্ষিত ডাক আমাদের জন্য।
কিন্তু ডেকে নিয়ে তারা যে সংবাদটি জানালেন, সেটি বইবার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিল না। পৃথিবী সমান ওজনদার এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ তারা দিলেন আমাদের। আমার পরম শ্রদ্ধেয় আব্বার ইন্তেকালের দুঃসংবাদ দিলেন তারা আমাদের। আব্বা এ দুনিয়াতে আর নেই। মাথা ঘুরতে লাগল। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। হাত-পা অকেজো হয়ে যেতে লাগল। এত ওজন, এই দুর্বিষহ সংবাদ বহন করার মতো শক্তি কি আমার আছে! চিৎকার করে বলে উঠলাম, কী বলছেন আপনারা এসব। ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার দিলাম। প্রশাসনিক লোকদের শোরগোলে আমার সেই চিৎকার হারিয়ে গেল।
মুক্ত আব্বাকে দেখার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না আমার।
ভারতের পোষ্য দল আওয়ামী লীগ ও তাদের গোলাম শেখ হাসিনা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে কথিত যুদ্ধাপরাধের সাজানো বিচারের নামে বিচারিক হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা না পেরে চিকিৎসার নামে হত্যার (Medical Killing) পথ বেছে নিয়েছিল।
জালিম শেখ হাসিনা আর তার চিকিৎসক নামের খুনিরা যে একটি মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে আল্লামা সাঈদীকে চিকিৎসার নামে হত্যা করেছে, তা এখন বুঝতে পারি।
আমার দৃষ্টিতে ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ, ডা. এসএম মোস্তফা জামান ও মো. রেজাউর রহমান ক্লিনিক্যাল নেগ্লিডজেন্সের (Clinical Negligence) মতো ক্ষমাহীন অপরাধজনিত কারণে আমার বাবা আল্লামা সাঈদীকে হত্যার জন্য দায়ী।
কারো হার্ট অ্যাটাক হলে অ্যাটাকের ১২ ঘণ্টার মধ্যে এনজিওগ্রাম করে হার্টে রিং পরানো (Primary Percutaneous Coronary Intervention-PCI) হয় বা রোগীর বুকে ব্যথা থাকলে বা হার্টের গতি এলোমেলো (Arrhythmia) বা পেশেন্ট শকে গেলে সময়ের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত এনজিওগ্রাম করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বুকে ব্যথা না থাকলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে Early PCI-এর মাধ্যমে রোগীকে স্ট্যাবল করা হয়। কিন্তু আল্লামা সাঈদীর ব্যাপারে এর ব্যতিক্রম হলো কেন?
ডা. এসএম মোস্তফা জামান বলেছেন, তারা প্রথমেই আল্লামা সাঈদীকে PCI (Per Cutaneous Intervention) করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে রোগীর বুকে ব্যথা না থাকার কারণে তারা আর PCI না করে কনজারভেটিভ ট্রিটমেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। PCI না করার এটি কোনো কারণ হতে পারে? কার্ডিওলজির আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নীতিমালায় কোথাও লেখা নেই যে, বুকে ব্যথা না থাকলে বা কমে গেলে PCI করার প্রয়োজন নেই। PCI না করার অন্য কারণগুলো আল্লামা সাঈদীর ক্ষেত্রে তো প্রযোজ্য ছিল না। তাহলে আপনারা কেন PCI করলেন না? এটা স্পষ্ট Medical Negligence, যা সুস্পষ্ট অপরাধ।
ডা. এসএম মোস্তফা জামান বলছেন, আল্লামা সাঈদীকে ৭:১০ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার অনুমতি পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হলো না কেন?
হাসপাতালে সার্বক্ষণিক মিডিয়ায় কথা বলেছেন মেডিকেল টিমের সদস্য ডা. এসএম মোস্তফা জামান। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির সদস্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগিদের কথিত গণজাগরণ মঞ্চে আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে উগ্র স্লোগান দেওয়া ব্যক্তি। তার কাছে কি আল্লামা সাঈদী সুচিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ ছিল? যার ফাঁসির দাবিতে যে রাজপথে গলা ফাটিয়েছে, তিনি কি কখনো সুযোগ পেলে ওই লোকটিকে সুচিকিৎসা দিতে পারেন? তাহলে তাকে কেন আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো?
এমতাবস্থায় সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, আল্লামা সাঈদীকে হত্যার রহস্য উদঘাটনে অনতিবিলম্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আল্লামা সাঈদীকে হত্যার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
* লেখক : এমপি, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তৃতীয় সন্তান
![]() |
| মৃত্যুর একদিন আগে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর সময় প্রাণবন্ত মাওলানা সাঈদী। |
Tuesday, August 18, 2026
শাসকের পরামর্শকরা একালে ও সেকালে by এলাহী নেওয়াজ খান
বৈরাম খাঁর সাহচর্যে থেকে আকবর বুঝেছিলেন, হারানো রাজ্যগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং বিশাল মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন বৈরাম খাঁর মতো দক্ষ ও প্রতিভাবান একদল পরামর্শক। মূলত বৈরাম খাঁই সাম্রাজ্যের অভিভাবক হয়ে আকবরকে রাজ্য শাসনে অভিজ্ঞ করে তুলেছিলেন। তাই সম্রাট আকবর তার অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জন করে তার চারপাশে এমন একদল পরামর্শক জড়ো করেছিলেন, যারা ছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। এদের বলা হতো নবরত্ন। প্রকৃতপক্ষেই তারা রত্নই ছিলেন। ইতিহাসে তারা স্বীয় প্রতিভা ও দক্ষতা দিয়ে সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন প্রশাসনের দক্ষ, কেউ ছিলেন যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী, কেউ সংগীতজ্ঞ আবার কেউ ছিলেন সভাকবি ।
নবরত্ন হিসেবে পরিচিত সম্রাট আকবরের সেই ৯ জন পরামর্শক হলেন বীরবল : তিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপতি ও কৌতুকবিদ। আবুল ফজল : প্রধান সভাকবি এবং আইন-ই-আকবর ও আকবরনামার রচয়িতা। ফৈজি : প্রখ্যাত কবি ও রাজকুমারদের গৃহশিক্ষক। তানসেন : সুরসম্রাট ও বিশ্ববিখ্যাত সংগীতজ্ঞ । টোডরমল : আকবরের দক্ষ অর্থমন্ত্রী ও রাজস্ব সংস্কারক। রাজা মানসিংহ : মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। ফকির আজিম উদ্দিন : ধর্মীয় ও সুফিবিষয়ক উপদেষ্টা। আব্দুর রহিম খান-ই-খালান : সেনাপতি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও হিন্দি দোহার রচয়িতা । মোল্লা দো-পিয়াজা : চতুর ও হাস্যরসাত্মক সভাসদ।
এই উপদেষ্টাদের বা পরামর্শকদের বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যায় সম্রাট আকবর একজন মহান শাসক হিসেবে নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সাধারণত মানব ইতিহাসজুড়ে নিপীড়নমূলক শাসনের কাহিনি বেশি থাকালেও সম্রাট আকবরের মতো এমন অনেক শাসকের নজির ইতিহাসে আছেন, যার দক্ষ ও প্রতিভাবান পরামর্শকদের সহায়তায় মহান শাসক হিসেবে ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছেন। এটি সবাই জানে যে, সম্রাট আকবর নিরক্ষর ছিলেন। কিন্তু তার ছিল তীব্র জ্ঞানপিপাসা। সে কারণেই তিনি তার চারপাশে জড়ো করেছিলেন জ্ঞানীগুণী পরামর্শকরা। তারা তাকে বই পড়ে শোনাতেন এবং তাদের কাছ থেকে তিনি নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতেন। তাই এ ধরনের সুপরামর্শকদের কারণে একদিকে যেমন তিনি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে করতে সক্ষম হয়েছিলেন; তেমনি টানা ৫০ বছর শাসন করেছিলেন নির্বিঘ্নে। আর এ কারণেই ইতিহাসবিদরা তাকে ‘আকবর দ্য গ্রেট’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
সম্রাট আকবরকে নিয়ে এভাবে শুরু করার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, একজন শাসকের জন্য পরামর্শকরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানোর জন্য। কারণ একজন শাসক কেমন তা জানা যায়, তার চারপাশের পরামর্শকদের দেখে। এ ব্যাপারে চীনা একটি প্রবাদবাক্য আছে। তাতে বলা হয়েছে, পাখি নিজের পালক দেখে দল বাঁধে আর মানুষ চেনা যায় তার সঙ্গীদের দেখে। তাই চীনের বিখ্যাত দার্শনিক ও তাত্ত্বিক কনফুসিয়াস বলেছেন, যদি জানতে চাও কোন দেশের শাসনব্যবস্থা কেমন, তবে তার মন্ত্রীদের দিকে তাকাও।
মূলত একজন শাসক ঠিক তেমন লোকদের নিজের পাশে রাখেন, যাদের চিন্তাভাবনা তার নিজের সঙ্গে মেলে। এটাই আমরা সাধারণত চারপাশে দেখে থাকি। কারণ একই বৈশিষ্ট্যের মানুষ সবসময় এক জায়গায় সমবেত হয়। যাকে আমরা বলি সমমনা। যেমন ধরুন কেউ কোনো মজলিশে গেল। সেখানে প্রথম সে তার সমমনা কেউ আছে কি না খুঁজবে। তা না পেলে সে একাই এক জায়গায় বসে পড়বে। এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। তাই একজন শাসক যদি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে তিনি তার চারপাশে এ ধরনের লোকই খুঁজবেন। আর শাসকের জন্য তোষামোদকারীরা সবসময় বিপজ্জনক। তাই যেমন চীনা একজন দার্শনিক বলেছেন, হাজার তোষামোদকারীর হ্যাঁ-বাচক কথার চেয়ে একজন সৎ পরামর্শকের স্পষ্ট ও সত্য কথা অনেক বেশি মূল্যবান।
অন্যদিকে ইতালি ও রেনেসাঁ যুগের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলো মেকিয়াভেলি তার বিখ্যাত প্রিন্স গ্রন্থে লিখেছেন, ‘একজন শাসকের বুদ্ধিমত্তা অনুমান করার প্রথম পদ্ধতি হলো তার চারপাশে কেমন মানুষ রয়েছে, তা লক্ষ করা।’
এই প্রেক্ষাপটে এটা বলা যায়, আগেকার দিনে রাজতন্ত্র এবং একালের গণতন্ত্র কিংবা যেকোনো সরকারপদ্ধতিতে একজন শাসক কেমন সেটি বোঝার একমাত্র উপায় হচ্ছে, শাসকের পরামর্শকরা কেমন সেটি দেখে। এছাড়া একজন সৎ ও দক্ষ পরামর্শদাতা শাসকের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। ইতিহাসে এ ধরনের অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অনেক নজির আছে। যেমন : ইসলামের ইতিহাসে সত্যবাদিতা, নির্ভীক মনোভাব, দূরদর্শিতা ও নিঃস্বার্থ উপদেষ্টাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর কথায়ই ধরা যাক। তার তার খেলাফত পরিচালনায় প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। উমর (রা.) সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জোরালো মতামত দিতেন, যা খলিফাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করত। আবার একইভাবে হজরত উমর (রা.)-এর মূল পরামর্শক ছিলেন হজরত আলী (রা.)। তিনি আইন ও নীতিগত পরামর্শ দিতেন। জটিল রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক সমস্যায় আলী (রা.)-এর পরামর্শ ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ ।
ইসলাম ইতিহাসের ওইসব মহান দৃষ্টান্ত ছাড়াও বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের আরো অনেক দৃষ্টান্ত আছে। যেমন প্রাচীনকালের আলেকজান্ডারের কথা উল্লেখ করা যায়। তার শিক্ষক ও উপদেষ্টা ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল। রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে অ্যারিস্টটলের শিক্ষাই আলেকজান্ডারকে একজন বিশ্বজয়ী শাসক হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
অন্যদিকে বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কথা উল্লেখ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্চিলের প্রধান সামরিক পরামর্শক ছিলেন অ্যালেন ব্রুক। তিনি চার্চিলের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর সরাসরি বিরোধিতা করতেন। এই নির্ভীক ও যৌক্তিক বিরোধিতাই শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল।
যাই হোক, পরিশেষে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর ঘটনা উল্লেখ করে আমার এই লেখা শেষ করতে চাই। এ ঘটনাটি ‘নাহজুলবালাগা’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। এটিও তো অনেকের জানা আছে, হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিয়েছিল। তখন একজন সাহাবি তার কাছে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘হে আমিরুল মোমিনিন! হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.)-এর সময় তো শাসনব্যবস্থা শান্ত এবং শৃঙ্খল ছিল; কিন্তু আপনার সময় কেন এতটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে?
জবাবে হজরত আলী (রা.) বলেছিলেন, তখন আমি ও উসমান এবং অন্যান্য বিজ্ঞ সাহাবা ছিলাম তাদের পরামর্শক আর এখন তোমরা হচ্ছো আমার পরামর্শক। তিনি এ কথা বলে মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন, ভালো শাসন শুধু শাসকদের ওপর নির্ভর করে না; তার চারপাশের মানুষ এবং প্রজাকুল কেমন তার ওপরও নির্ভর করে।
![]() |
| এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি। |
Thursday, July 2, 2026
বিপ্লব অস্বীকার করলে ক্ষমতার ন্যায্যতা থাকবে না by মাহমুদুর রহমান
আমি তখন ইস্তান্বুলে নির্বাসিত জীবনযাপন করছি। আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে আমি ভেবেছিলাম আগের কোটা আন্দোলনের চেয়ে বেশি কিছু প্রাপ্তি এবারও ঘটবে না। কিন্তু অতিদ্রুত কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংকীর্ণ বয়ান বৃহত্তর বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষার দিকে ধাবিত হলে আশান্বিত হয়ে উঠলাম।
আন্দোলনকারীদের এক অংশ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের প্রথমে অবৈধ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও পুলিশের আইজির পদত্যাগ, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং পর্যায়ক্রমে সরকার পতনের এক দফা দাবির পরামর্শ দিয়েছিলাম। যেহেতু আমি দেশের বাইরে ছিলাম, কাজেই মাঠের প্রকৃত উত্তাল চিত্র আমার জানা ছিল না।
এ প্রজন্মের অসীম সাহসিকতার মাত্রাও দূরে থেকে উপলব্ধি করতে পারিনি। আন্দোলনের গতি আমার ধারণাকে ছাড়িয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তখন চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ১৬ জুলাই দুই হাত প্রসারিত করা আবু সাঈদের অবিস্মরণীয় শাহাদতের দৃশ্যে আমার মনে হয়েছিল এবার আর সম্ভবত শেখ হাসিনার শেষরক্ষা হবে না।
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে তুরস্কের প্রখ্যাত মিডিয়া ‘ইয়েনি শাফাক’-এর স্টুডিওতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে আমার একটি একক বক্তৃতা ছিল। সেখানে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলাম, শুধু ভারতের সমর্থনের জোরে জনবিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনার সরকার আর বেশিদিন টিকতে পারবে না। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ আপনাদের সবারই জানা।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ছয় বছরের নির্বাসন শেষে তরুণ বিপ্লবীদের প্রতি অগাধ স্নেহ আর অপরিসীম শ্রদ্ধার যুগপৎ অনুভূতি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আমার প্রত্যাশা ছিল বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে অন্যসব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে পাব। আমি রাজনীতিবিদ নই বলেই হয়তো বোকার মতো একেবারেই অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেশে ফিরে মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। দেখলাম, ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।
ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে তারা পরস্পরের ছিদ্রানুসন্ধানে ব্যস্ত। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার জরুরি দাবিটিও আমাকে উত্থাপন করতে হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের প্রায় সমাপ্তি পর্যন্ত দুই দফার বন্দিজীবনে যাদের দিনের পর দিন জেলখানায় এক পাতে খেতে দেখেছিলাম, ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েই তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে দিনরাত বিষোদ্গার করছেন। ১৫ বছর যারা একই ধরনের মজলুম ছিলেন, তারা একে অন্যকে যথাক্রমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী এবং রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী বলে গালমন্দ করছেন।
প্রসঙ্গক্রমে পুরোনো কথা বলছি। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী কৃষিমন্ত্রী এবং বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনরত আমি এবং তৎকালীন কৃষি প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিলে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের এক ব্যতিক্রমধর্মী মেলার আয়োজন করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই উদ্যোগে খুব আনন্দিত হয়েছিলেন এবং নিজে চীন মৈত্রী হলে মেলার উদ্বোধন করেছিলেন।
সেই সূত্র ধরেই বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল। বিনিয়োগ বোর্ডের অফিসেই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। এরপর তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের অনেক ঘটনাই আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমার মনে পড়ছে না তিনি ‘রাজাকার মন্ত্রীর’ অধীনে প্রতিমন্ত্রিত্ব নিয়ে কখনো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। চলমান সংসদেও তিনি নিজামীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু যখন সেই আলমগীর ভাইকে বাংলাদেশে মৌলবাদের কথিত উত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে একেবারে আওয়ামী বয়ানে বক্তব্য দিতে শুনি, তখন বড়ই আশ্চর্য হই। মুদ্রার অপর পিঠের কাহিনিও আছে।
আমার প্রায় পাঁচ বছরের জেল জীবনের অধিকাংশ সময় কাশিমপুর দুই নম্বর জেলে কেটেছে। সেই দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুস সালাম পিন্টু, রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মী একই জেলে বন্দি ছিলাম। জামায়াত নেতাদের মধ্যে মীর কাসেম আলী তিনতলায় আমার পাশের সেলে প্রায় দুবছর ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর ওই একই সেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার থেকেছেন। বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানও ওই সেলে বন্দি ছিলেন। জামায়াতের বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যন্ত প্রায় এক বছর একই বিল্ডিংয়ের দোতলার সেলে থাকতেন।
তিনি আমাকে বুড়ো বয়সে পবিত্র কোরআন শরিফ পড়তে শিখিয়েছিলেন। আর একজনের কথা না বললেই নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন আমাদের বিল্ডিংয়ের তিনতলায় আরেক প্রান্তের সেলে থাকতেন। মামুনের সেলেই আমরা জামাতে নামাজ পড়তাম। মীর কাসেম আলী নামাজে ইমামতি করতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমাদের নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
মামুনের সেলের সামনের বারান্দায় আমাদের তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সপ্তাহে এক দিন আমরা বাসা থেকে খাওয়া পেতাম। এছাড়া জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের আলাদা রান্নার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। একজন কারারক্ষী আমাদের টাকায় বাজার করে আনতেন। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এসব কিছু দেখাশোনা করতেন। জেলে রান্না করা এবং সবার বাসা থেকে আনা সাপ্তাহিক খাবার আমরা ভাগ করে খেতাম। তখন কিন্তু কোনো জামায়াত নেতাকে বলতে শুনিনি যে, আমরা কোনো চাঁদাবাজের বাসা থেকে আনা অথবা তার টাকায় কেনা খাবার গ্রহণ করব না। রাজাকার ও চাঁদাবাজরা যে একে অন্যের দৃষ্টিতে অস্পৃশ্যÑসেটি আজকের ক্ষমতাবান নেতাদের বোধ হয় ফ্যাসিস্ট আমলে কারাগারে স্মরণে ছিল না।
রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একে অন্যকে গালাগাল করবেন; আবার বিপদে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই গালাগালি ছেড়ে গলাগলি করবেনÑএতে আমাদের মতো আমজনতার কিছু যায়-আসে না। বরং এদের কাজকারবারে আমরা বেশ আমোদ অনুভব করি। কিন্তু তারা এত তাড়াতাড়ি যেভাবে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের রাস্তা নির্মাণ করছেন, সেটি বিপজ্জনক। ভাই, ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভালো কথা।
কিন্তু আপনাদের কর্মকাণ্ডে যদি কোনোভাবে জুলাই বিপ্লব নিয়ে বৈধতার সংকট তৈরি হয়, তাহলে আপনারা তো বিপদে পড়বেনই, সেই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকারও আবার হুমকির মুখে পড়বে। ৩৬ জুলাই না ঘটলে আজকের সরকারি কিংবা বিরোধী দল কোনোটাই সৃষ্টি হতো না। আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, আপনাদের বিভাজনের সুযোগে এদেশের চিহ্নিত ভারতপন্থিরা আবার ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে? দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা এ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরার হুমকি দেওয়ারও সাহস পাচ্ছে!
এদিকে সুশীলরা ফতোয়া দিচ্ছেন, স্বাধীনতার পর থেকে সব সন্ত্রাসের হোতা আওয়ামী লীগকে আর ‘সন্ত্রাসী’ বলা যাবে না। অথচ ব্যক্তিসন্ত্রাস থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, জনগণের ওপর যাবতীয় নির্যাতনের পন্থা আওয়ামী কারখানা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল যেমন আওয়ামী ‘প্রডাক্ট’ ছিল, একইভাবে এ শতাব্দীতে আওয়ামী ঘরানা থেকেই ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ জন্ম নিয়েছে। শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী দিয়ে যে গুমের জন্ম দিয়ে গিয়েছিলেন, তাকেই শেখ হাসিনা ডিজিএফআই এবং র্যাবকে ব্যবহার করে আরো ব্যাপক ও নির্মমভাবে প্রয়োগ করেছেন।
‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামী বয়ান তৈরির জন্য দুর্নীতির কথিত সূচককে আবার ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে সব আমলেই দুর্নীতি হয়েছে। ড. ইউনূসের আমলও দুর্নীতিমুক্ত ছিল না। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট জমানায় দুর্নীতি যে মাত্রায় উঠেছিল, তার সঙ্গে এ যাবৎ অন্য কোনো আমলের তুলনা হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ সে সময় ভয়ানক সব দুর্নীতি দেখেও না দেখার ভান করেছে।
একের পর এক ব্যাংক দখল হয়েছে এবং আমানতকারীদের লাখো-কোটি টাকা ডাকাতি হয়েছে; অথচ সুশীলরা নীরব থেকেছেন। তারা নাকি যুক্তি দিতেন, শেখ হাসিনা খারাপ হতে পারেন; তবে দেশের অন্য যেকোনো নেতার তুলনায় তিনি মন্দের ভালো। ফ্যাসিস্ট আমলে তারেক রহমান সম্পর্কে তারা কী বলতেন, সেটি লিখে বোধ হয় আজ আর কোনো লাভ নেই। ক্ষমতা প্রাপ্তির আনন্দে বিএনপি নেতারা সেগুলো শুনতে আগ্রহী নন। শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আপনাদের নতুন বন্ধুরাই ২০০১ থেকে টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশের ললাটে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্রের তিলক পরিয়ে দেওয়ার অনুঘটক ছিলেন। দুদিন আগে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দুর্নীতির অনুসন্ধান দুদক দিয়ে করানোর জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন।
অথচ আজ পর্যন্ত বিএনপির কোনো মন্ত্রীর মুখে আওয়ামী আমলের দুর্নীতির অনুসন্ধানের কথা শুনিনি। বরং শেখ পরিবার, অলিগার্ক ও আওয়ামী নেতাদের বিরুদ্ধে ড. ইউনূস আমলের সব অনুসন্ধান এখন দুদকে বাক্সবন্দি হয়ে আছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, সুশীলদের মতো বিএনপির শীর্ষ নেতারাও বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা অন্যদের, এমনকি তাদের চেয়েও ভালো ছিলেন? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কদিন আগেই বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মহানুভবতার সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুম জাতিকে ভুলে যেতে বলেছেন।
সব মজলুম তার মতো এতটা মহৎ নাও হতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দেখেও মনে হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের ‘মন্দের ভালো’ এবং ‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামীপন্থি সুশীল সমাজের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে অধিকতর আগ্রহী। যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী কোন রাজনীতিচর্চা করবেন কিংবা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন, সেসব একান্তই তার বিবেচনা। আমাদের মতো আদার ব্যাপারীর সেই জাহাজের খবর নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামে যৎকিঞ্চিৎ ভূমিকার কারণে হয়তো আজকের বিশেষ দিনে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কিছু কথা বলার অধিকার দাবি করতে পারি।
৩৬ জুলাইকে আমি প্রথমাবধি বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখায় ‘বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছি। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আমার অন্যতম নালিশ ছিল যে, তিনি বিপ্লবী সরকার গড়তে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার সুশীল সমর্থকরা জুলাইকে ‘মব সন্ত্রাস’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। বাংলাদেশের মিডিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী ভারতপন্থি বাম তাত্ত্বিকরাও জুলাইকে ভয়ানক অপছন্দ করেন। কারণ, তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী এটি একটি ইসলামপন্থি অভ্যুত্থান ছিল।
মব সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলামপন্থা জুড়ে দিয়ে এরা হাসিনার পতনের বিপক্ষে দেশ-বিদেশে বয়ান উৎপাদনের চেষ্টা করে চলেছেন। যে চিহ্নিত গোষ্ঠী একসময় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ আবিষ্কার করে হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করত, তারাই ড. ইউনূসের আমলে মৌলবাদ ও উগ্রবাদের উত্থান খুঁজে পেয়েছিল। এখন আবার নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। জুলাইকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারি দল বিএনপি বেশ সমস্যায় পড়ে যায়। কারণ, তারা বিপ্লবের প্রধান উপকারভোগী। হাসিনার পতনের পর দলে ‘গুপ্ত জামায়াতের’ বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব ‘গুপ্ত আওয়ামীদের’ জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন। এ কারণেই গত প্রায় দেড় বছরে বিএনপি নেতাদের বয়ানের মধ্যে উপরোক্ত বাম ও আওয়ামীকরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তারাও নাকি বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান দেখছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের পর বিএনপির আবেগাপ্লুত প্রভাবশালী নেতারা মিডিয়ায় যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, সেখান থেকে তারা গত দুবছরে অনেকটাই সরে এসেছেন। নিজেদের সেসব বক্তব্য আবার শুনলে পার্থক্যটা তারা নিশ্চয়ই ধরতে পারবেন। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আপত্তিকে সরকারে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি একেবারে অযৌক্তিক মনে করি না।
কাজেই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ অপ্রত্যাশিত নয়। তবে সনদ বাস্তবায়নের ভয়ে খোদ জুলাই বিপ্লবকে ছোট করে দেখার মনোভাব সরকারি দলের নেতাদের আপন স্বার্থেই পরিত্যাগ করা উচিত। বিএনপির জুলাই নিয়ে বয়ান আওয়ামী প্রোপাগান্ডা ও ভারতপন্থি বাম ঘরানার তাত্ত্বিক বয়ানের সঙ্গে মিলে গেলে শেখ হাসিনার পতনের প্রক্রিয়াই যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়— সেটি আশা করি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব উপলব্ধি করবেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন কি করেননি— এ বিতর্ক যারা তোলেন, তাদের উদ্দেশ্য সরকার বুঝতে না পারলে আখেরে তারাই পস্তাবেন। এক-এগারো থেকে কোনো শিক্ষা বিএনপি নিয়েছে কি না—সেটিও আমার জানা নেই।
মোট কথা, ৩৬ জুলাই ঘটিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতাপ্রাপ্তির যে সুযোগ আমাদের তরুণরা সৃষ্টি করেছে, তাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কেউ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে আর কেউ যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়াই করতে গিয়ে জুলাইয়ের মর্যাদাহানি করে উভয় গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের ও জনগণের জন্য বিপদ তৈরি করছে। ইতিহাস আপনাদের এই সুযোগসন্ধানী স্বার্থপরতাকে ক্ষমা করবে না।
![]() |
| মাহমুদুর রহমান |
Sunday, June 14, 2026
বাজেটে অবহেলিত কৃষি by ফরিদা-আখতার
কৃষির নামে বরাদ্দকৃত এই বাজেটে আরো দুটি ভাগীদার আছে। ভাগীদাররা হচ্ছে খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। অথচ কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তিনটি ভিন্ন ও স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়, কিন্তু এবারে সরকার কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গুচ্ছ করে একসঙ্গে করেছে। একজন পূর্ণ মন্ত্রী আছেন, যিনি কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় দেখছেন, আর একজন প্রতিমন্ত্রী দেখছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সরকারের বাজেট ঘোষণায় এখনো পরিষ্কার নয়, কৃষি আলাদাভাবে কত বরাদ্দ পাচ্ছে; তেমনি খাদ্য আলাদাভাবে এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কত পাচ্ছে, তা আমরা এখনো জানি না। তাদের কাজ আলাদা, অতএব তাদের বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় এই বরাদ্দ সব সময়ের মতো এবারও অপ্রতুল।
সরকার খাদ্য মজুত ও সংগ্রহের প্রতি নজর দেয় অনেক বেশি। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে এবং সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ৪১ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন।
এখানে তিনটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটা হচ্ছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ খাদ্যফসলসহ সব ধরনের কৃষি ফসলের উৎপাদন বাড়ানো। বড় দাগে এই মন্ত্রণালয়ের মূল দায়িত্ব হচ্ছে খাদ্যফসল বিশেষ করে ধান উৎপাদন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে তিনটি মৌসুমে বছরে প্রায় ৩.৯ কোটি মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে বার্ষিক ধানের চাহিদা হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি থেকে তিন কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। বন্যা, খরা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদনে ঘাটতি হলে খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখে। তাদের লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ খাদ্যফসল বিশেষ করে ধান উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য কৃষকদের সহায়তা করা এবং সেটা করা হয় বিদ্যমান কৃষিনীতি, যা আসলে কৃষির নীতি নয়, বরং ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফুড প্রোডাকশন’। এই কৃষি মূলত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ এবং ধান লাগানো থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত যন্ত্রের ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। এই বিকৃত কৃষিব্যবস্থার ত্রুটি এবারের বোরো মৌসুমে দেখা গেছে। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলের অবৈধ ও আগ্রাসী যুদ্ধের কারণে সারা দেশে জ্বালানি সংকটের সময়ে বোরো ফসলে ডিজেল সংকটের কারণে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি; এবং হাওরে অসময়ে বৃষ্টিতে প্রায় পাকা ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এই সময় দ্রুত ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় নি, এমনকি এতদিন কৃষকদের মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া সেই কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনও কাদায় নামতে পারেনি। হাওরের একটি মাত্র কৃষি ফসল বোরো ধান, কৃষকের চোখের সামনে পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, হাওরে এখন যে ধান উৎপাদিত হয়, তা অধিকাংশ উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের। বর্তমানে ধানের তিনটি মৌসুমের মধ্যে বোরো মৌসুম থেকে আসে ৫৫ শতাংশ এবং হাওরে মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয়।
এ বছর হাওরে বোরো ধানের ক্ষতির পরিমাণ পত্রপত্রিকা থেকে জানা গেছে দুই লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন এবং প্রায় দুই লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কৃষিতে কৃষকের বিপর্যয়সহ টিকে থাকার নানা চ্যালেঞ্জের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কোনো প্রণোদনা দিলেন না। আফসোস।
কৃষিতে বরাদ্দ মানে সার-কীটনাশকে ভর্তুকি দেওয়া, অর্থাৎ বিষ কোম্পানি ও সার কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের সম্প্রসারণ ও উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে সার ও কীটনাশকের ওপর বিদ্যমান সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট ও কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করছে সরকার। কিন্তু বুঝতে হবে এই সুবিধা কৃষকের জন্য আসছে না, আসছে সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের জন্য। যেখানে সার ও বিষনির্ভর কৃষিব্যবস্থা থেকে সরে আসা কৃষিনীতির প্রধান মেরুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল, সরকার তার উল্টোটা সবসময় করে আসছে। সার-কীটনাশকের খরচ আছে অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু অন্যান্য খরচও তো আছে। যেমন ধান লাগানো ও ধান কাটার জন্য কৃষিশ্রমিকের খরচ, সেচের পানির খরচ, উৎপাদন-পরবর্তী প্রক্রিয়ার খরচ প্রভৃতি। কিন্তু সেসব খরচের দায় সরকার নিচ্ছে না। তার চেয়েও জরুরি বিষয় হচ্ছে, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, যা বেশিরভাগ সময় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম থাকে এবং তাই কৃষকের দেনা কমে না। খাদ্য আমদানিসহ সরকারের বাণিজ্যনীতি সবসময়ই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সরাসরি কৃষকের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। অথচ বাজেটে এ বিষয়ে কোনো কথা নেই। ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ মওকুফ করা এবং কৃষক কার্ডের সুবিধা সব কৃষক পাবে, তার কোনো গ্যারান্টি কি আছে?
তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সমস্যাসহ কৃষির উৎপাদনশীলতা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেজন্য সার-কীটনাশকে ভর্তুকির চেয়েও বেশি দরকার কৃষিনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো। এই কৃষিব্যবস্থা ১৮ কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্য জোগান দিতে পারছে না। খাদ্যে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারে ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেই স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নত হবে না, যদি খাদ্য উৎপাদন নিরাপদ করা না হয়।
জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ক্রমেই কমে আসছে, এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০.৯ শতাংশে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল, যেখানে কৃষির অবদান ছিল ৬২ শতাংশ। কিন্তু দেশ ক্রমে শিল্পায়ন (৩৪ শতাংশ) এবং সেবা খাতের (৫১ শতাংশ) দিকে এগোচ্ছে। শিল্পায়ন বলতে তৈরি পোশাকশিল্পই মূলত বোঝায়, যা আমাদের অর্থনীতিতে স্বল্প মেয়াদে কিছু অর্থের জোগান দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীল খাত তৈরি করছে না। কৃষির প্রতি সরকারের মনোযোগের অভাবে জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে যাওয়া দ্রুত গতিতে ঘটছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এক দশকে কমেছে ১৭ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০ বছরে পাঁচ শতাংশ অবদান কমে গেছে। কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা। কৃষি থেকে উৎখাত হলে তাদের শহরে চলে আসতে হয়। তাদের মেয়েরা যায় গার্মেন্ট কারখানায় আর ছেলেরা যায় প্রবাসে শ্রমিক হয়ে। এই সুযোগও ক্রমে সীমিত হয়ে আসছে।
কৃষি বরাদ্দের মধ্যে আর এক ভাগীদার হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। এ খাতের মাধ্যমে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের মতো প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করা হয়। কৃষির মতোই এ খাতের সঙ্গে যুক্ত আছে বিশাল গোষ্ঠী; যেমন জেলে/মৎস্যজীবী, গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনকারী গরিব নারী এবং লাখ লাখ ছোট খামারি। তারা কী ধরনের বাজেট সুবিধা পাবে, তার কোনো উল্লেখ নেই।
জিডিপিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের অবদান একত্রে প্রায় ৪.৩ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শ্রমজীবী মানুষের ২৫ শতাংশ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। মৎস্য খাতে প্রায় ১৮ লাখ নিবন্ধিত মৎস্যজীবী আছে। প্রাণিসম্পদে যুক্ত আছে প্রায় ১৪ লাখ খামার, যেখানে প্রায় এক কোটি মহিলা গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনে নিয়োজিত আছে। এক বিশাল জনগোষ্ঠী এ খাতে যুক্ত হয়েও বাজেটের সময় উপেক্ষিত থাকছে।
এবার বাজেটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ভাগে কত বরাদ্দ হবে, তা জানা যায়নি, তবে গত বাজেটের ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকার মধ্যে কৃষিফসল খাতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা (৬৮ শতাংশ), আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ছিল মাত্র ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা, মাত্র ৮.৫ শতাংশ ।
সামগ্রিক বাজেটে কৃষিতে অবহেলা বিপজ্জনক। তার মধ্যে আরো বিশেষভাবে অবহেলিত হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। অথচ দুটো খাত মিলেই শুধু খাদ্যের জোগান দিচ্ছে না, পুষ্টি নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা ধারণ করে।
কৃষির অবহেলা জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা অনিশ্চিত করে তুলবে—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই অবহেলা দেশের অর্থনীতির জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে না।
লেখক : অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Friday, June 12, 2026
গলিত লাশ ও ফলিত শিক্ষা by ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
এ ঘটনাটি শহরের ফ্ল্যাট কালচারের এক কুৎসিত রূপ। ইটপাথরের এই খাঁচাগুলোয় মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক যে, পাশের ফ্ল্যাটে বা পাশের ঘরে কী হচ্ছে, তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা থাকে না। প্রতিবেশীরা গন্ধ পাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। শহর আমাদের আধুনিকতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি বা সমাজবদ্ধ মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা ছিল, তা কেড়ে নিয়েছে। চারপাশের এই দেয়ালগুলো শুধু সিমেন্টের নয়, এগুলো আসলে আমাদের বিবেকের দেয়াল। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগার মতো তথ্য হলো—নুরজাহান বেগম তার নিজের মেয়ের সঙ্গেই ওই বাসায় থাকতেন। অথচ বাসাটির বিবরণ বলছে তা ছিল ‘নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো’। এর অর্থ হলো, একই বাসায় থেকেও মা এবং মেয়ের মধ্যে কোনো আত্মিক বা শারীরিক যোগাযোগ ছিল না। মেয়ে হয়তো তার নিজের জীবন, চাকরি বা অন্য কোনো ঘোরের মধ্যে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, পাশের ঘরে তার বৃদ্ধ মা কী অবস্থায় আছেন, খেয়েছেন কি না—এমনকি বেঁচে আছেন কি না—সেই খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও তার লোপ পেয়েছিল। এটা অবশ্য সক্রিয় অবহেলা, যা এক ধরনের নীরব হত্যাকাণ্ড।
এ ঘটনার পর সরকার দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। গত ৩ জুন, বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন’ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তার বক্তব্যও খতিয়ে দেখা হবে। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রমাণ করে, সমাজ বা রাষ্ট্র এখন আর মা-বাবার প্রতি এ ধরনের নিষ্ঠুরতাকে শুধু ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে এড়িয়ে যেতে রাজি নয়। সন্তান যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, জন্মদাত্রীর প্রতি অবহেলার দায় তাকে চড়া মূল্যে চুকাতেই হবে।
আইনি চাকা ঘুরছে, প্রশাসনিক খড়গও নেমে এসেছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে যে বড় প্রশ্নটি আমাদের মগজে তীব্র চপেটাঘাত করে, তা হলো—আমাদের শিক্ষার ফলিত রূপটি আসলে কোথায়? যে যুগ্ম সচিবের স্বাক্ষরে বা কলমে রাষ্ট্রের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়, মোংলা বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কেপিআই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন যার হাত দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল, তার নিজের জন্মদাত্রী মায়ের জীবন কেন এমন পরিত্যক্ত, নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো ঘরে ধুঁকে ধুঁকে শেষ হলো? কেন মৃত্যুর পরও তার শরীর পোকায় কাটার আগে সন্তানরা তার খোঁজ পেল না?
পারিবারিক মনস্তত্ত্ব অবশ্য এই অন্ধকারের অন্য একটি দিকও আমাদের সামনে আনে। অপরাধবিজ্ঞান ও সম্পর্কের সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো সন্তানই হুট করে একদিনে জন্মদাত্রীর প্রতি এমন চরম নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে না। সমাজ আজ এই সন্তানদের ঢালাওভাবে ‘কুলাঙ্গার’ বলছে এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোনো পারিবারিক গোপন ইতিহাস কি এখানে কাজ করেছিল? এমন কি হতে পারে না যে, শৈশবের কোনো গভীর ট্রমা মায়ের কোনো অতীত আচরণ, কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মায়ের সম্পৃক্ততা, তীব্র রূঢ় সিদ্ধান্ত বা এমন কোনো ঘটনা সন্তানদের মনকে বিষিয়ে তুলেছিল, যা সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে আজ সন্তানরা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারছে না? আমাদের সমাজে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার চেয়ে সমাজ ও প্রতিবেশীর গালি নীরবে সয়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করেন, যদি সত্য প্রকাশ পেলে নিজেদের সামাজিক স্ট্যাটাস বা ক্যারিয়ার ধূলিসাৎ হওয়ার শঙ্কা থাকে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে ‘অ্যাভয়েডেন্ট ডিফেন্স মেকানিজম’ বলা যায়, যেখানে তীব্র ক্ষোভ বা মানসিক ক্ষত থেকে মানুষ সেই উৎসের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এটি আত্মরক্ষা কৌশল, যেখানে মানুষ তীব্র কষ্টের বা ক্ষোভের উৎস থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে নেয়। মিরপুরের ওই নোংরা ফ্ল্যাটের ঘটনাটি যদি এই প্রেক্ষাপটে দেখা হয়—হয়তো মা মানসিকভাবে এতটাই রূঢ় বা উগ্র আচরণ করতেন, যেমন তীব্র মানসিক ব্যাধি বা সিজোফ্রেনিয়া বা ডিমেনশিয়ার কারণে, যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সন্তানদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দিনের পর দিন চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে, সন্তানরা এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি থেকে হাল ছেড়ে দেয় এবং দূরে সরে যায়। অনেক সময় সন্তানদের এই নীরবতা ও সমালোচনা সহ্য করার পেছনে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোনো ‘পারিবারিক ট্র্যাজেডি’ বা মায়ের কোনো অগ্রহণযোগ্য অতীত লুকিয়ে থাকে, যা তারা কবরে যাওয়া পর্যন্ত গোপন রাখতে চায়। সব মা-ই স্নেহময়ী হন—এটি আমাদের সামাজিক মিথ বা চিরন্তন ধারণা। কিন্তু কিছু মানুষ গুরুতর ব্যক্তিত্বের বিকার নিয়ে মা হতে পারেন। মায়ের কারণে সন্তানের মনে তৈরি হওয়া স্থায়ী ক্ষত অবচেতনেই মায়ের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
কিন্তু পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ বা ক্ষত যতই জটিল হোক না কেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন ৭৫ বছরের সম্পূর্ণ অক্ষম, বৃদ্ধা মানুষকে এভাবে একটি ঘরের ভেতর পচনের দিকে ঠেলে দেওয়া—কোনো আইনি বা মানবিক মানদণ্ডেই বৈধতা পেতে পারে না। ক্ষোভ যদি থাকত, তবে এই সামর্থ্যবান সন্তানরা মাকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বা কোনো কেয়ার-টেকারের তত্ত্বাবধানে সম্মানের সঙ্গে রাখতে পারতেন। তা না করে একই ছাদের নিচে বা একই শহরে থেকে মায়ের এই দশা করা চরমতম অপরাধ।
এ ঘটনাটি ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ এবং পরে প্রণীত ২০২৩ সালের বিধিমালার কার্যকারিতাকে আবার আলোচনার টেবিলে এনেছে। এই আইনের ৩ ও ৪ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তান মা-বাবার এবং তাদের অনুপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণ-পোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনিভাবে বাধ্য। আইন লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু মিরপুরের এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু রাষ্ট্রীয় আইন বা জরিমানার ভয় দিয়ে পারিবারিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমরা এখন এক জিপিএ ৫ আর বড় বড় ডিগ্রির পেছনে চূড়ান্ত ‘ভোগবাদী’ সমাজ তৈরি করছি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাত্ত্বিক জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা বা কেরানি তৈরিতে সফল হলেও, শিক্ষার ব্যবহারিক বা ফলিত (Applied) রূপ, যা মানুষকে বিনয়ী, সংবেদনশীল এবং মা-বাবার প্রতি দায়বদ্ধ করতে শেখায়—তা অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।
মিরপুরের ঘটনাটি শুধু তার বীভৎসতা এবং সন্তানের উচ্চ সামাজিক পদমর্যাদার কারণে ‘ভাইরাল’ হয়েছে, তাই চারদিকে এত হইচই। নইলে এই ইটপাথরের শহরে প্রতিদিন কত শত মা-বাবা নিজের সন্তানের ঘরেই জীবন্ত লাশ হয়ে আছেন, কতজন নিঃশব্দে কাঁদছেন, তার খবর কজন রাখে? উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের দ্বারা মা-বাবার এভাবে বৃদ্ধাশ্রমে অবহেলায় দিন কাটানো—আমাদের সমাজের গভীর ও ক্যানসারসদৃশ কিছু লক্ষণকে নির্দেশ করে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘একটি ক্ষয়িষ্ণু ও পচনশীল সভ্যতার লক্ষণ’।
মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে ‘পরিবার’ ছিল সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ, প্রাচীন এবং মৌলিক প্রতিষ্ঠান। সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি, একে অন্যের প্রতি নিঃশর্ত দায়বদ্ধতা এবং যৌথভাবে টিকে থাকার লড়াই থেকেই জন্ম নিয়েছিল যৌথ পরিবার। একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ হলো তার শক্তিশালী পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। আমাদের সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে মা-বাবা ও প্রবীণরা ছিলেন পরিবারের বটবৃক্ষ, বরকত এবং সামাজিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।
কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেই সুদৃঢ় বন্ধনে ধরেছে মারাত্মক ফাটল। পুঁজিবাদ, শিল্পায়ন এবং এর হাত ধরে আসা ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ মানুষের হাজার বছরের চেনা পারিবারিক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা যখন মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়, তখন তা প্রমাণ করে যে আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক পুঁজি ধ্বংস হয়ে গেছে। সমাজ এখন পুরোপুরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আজকের ইউরোপে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ তার চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছেছে। এর ফলে সেখানে পরিবার প্রথার অবসান ঘটেছে এবং তৈরি হয়েছে এক চরম মানবিক সংকট। একাকিত্বের মহামারি ইউরোপের প্রধান শহরগুলোর প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন সম্পূর্ণ একা বাস করেন। যুক্তরাজ্য বা জার্মানির মতো দেশে লাখ লাখ প্রবীণ নাগরিক একা মরে পড়ে থাকেন, খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকে না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, রাষ্ট্রকে এখন একাকিত্ব মন্ত্রণালয় (Ministry of Loneliness) গঠন করতে হচ্ছে। ইউরোপীয় মনস্তত্ত্বে বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভালের দায়িত্ব সন্তানের নয়, রাষ্ট্রের। ফলে শেষ জীবনে মা-বাবারা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধাশ্রমে কাটান। অনেক সময় নিজের ফ্ল্যাটে মারা যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেলে পুলিশ এসে কঙ্কাল বা গলিত লাশ উদ্ধার করে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে যখন রেনেসাঁ এবং আলোকায়ন যুগের সূচনা হয়, তখন জন লক, ভলতেয়ার বা রুশোর মতো দার্শনিকরা মানুষের ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ ও ‘অধিকার’ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। চার্চ এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর পাশাপাশি ঐতিহ্যগত পারিবারিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধেও এক ধরনের নীরব বিদ্রোহ শুরু হয়। মানুষ বুঝতে শেখে, পরিবারের ইচ্ছার বাইরেও তার একটি নিজস্ব জীবন আছে। এটি ধীরে ধীরে যৌথ পরিবার প্রথাকে ভেঙে দেয়।
আমরা ইউরোপের এই ধ্বংসের ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে, অন্ধভাবে তাদের সেই লাইফস্টাইলকেই ‘আধুনিকতা’ বা ‘স্মার্টনেস’ মনে করে আপন করে নিচ্ছি। আমাদের দেশেও এখন দ্রুত যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হচ্ছে। ইউরোপে পরিবার ভাঙলেও সেখানে রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’ বা সামাজিক নিরাপত্তা বলয় আছে (যেমন : ওল্ড-এজ হোম বা রাষ্ট্রীয় ভাতা)। কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নেই। ফলে এ দেশের সন্তানরা যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে মা-বাবাকে ত্যাগ করে, তখন সেই মা-বাবাদের পরিণতি ইউরোপের চেয়েও শতগুণ বেশি অমানবিক ও করুণ হয়। ইউরোপের পরিবার প্রথার মৃত্যু আমাদের জন্য এক জীবন্ত সতর্কবার্তা।
আজকের যে তরুণ সমাজ বা যেসব ছেলের বউরা ভাবছেন শাশুড়ি বা বৃদ্ধ মা-বাবা সংসারের ‘বোঝা’, কিংবা যে সন্তানরা ক্ষমতার দাপটে মায়ের ঋণ ভুলে যাচ্ছেন, প্রকৃতির নিখুঁত বিচার কিন্তু তাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। এই পচন যদি আমরা এখনই না রুখতে পারি, তবে আগামী দিনে প্রতিটি উচ্চশিক্ষিত সন্তানের ফ্ল্যাটই একেকটি অন্ধকূপে পরিণত হবে। যে মা নিজের জীবনের সমস্ত আলো বিলিয়ে দিয়ে সন্তানকে বড় করেন, শেষ বয়সে এসে সেই সন্তানের ঘরেই তাকে কেন এমন অন্ধকার, নোংরা আর পরিত্যক্ত অবস্থায় মরতে হবে? এই আত্মকেন্দ্রিকতার অভিশাপ কিন্তু ঘুরেফিরে সেই সন্তানের ওপরই পড়বে। মিরপুরের এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের সেই তথাকথিত ‘উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিক’ সন্তানদের ভেতরের কুৎসিত ও পচে যাওয়া মনস্তত্ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। নুরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার হয়নি, উদ্ধার হয়েছে আমাদের মানবিকতার এক গলিত শবদেহ।
* ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার
- drkhalid09@gmail.com

Tuesday, June 9, 2026
হাদি হত্যা ও সাংস্কৃতিক লড়াই by কাকন রেজা
এখন অনেকে বলছেন, হাদি-ব্যবসার ইতি ঘটেছে। মানুষ এখন হাদির নামে রাস্তায় বের হচ্ছে না। এটাও সেই ফ্যাসিজমের বয়ান। ফ্যাসিজমকালে মানুষ যখন দেখত, বিচার হচ্ছে না, আটকে গেছে, তখন তারা চুপ করে থাকত; আর বিচার না হওয়ার ক্ষোভটা বুকের ভেতর পুষে রাখত। এখনো তাই। একই কারণে তারা চুপ। সেই চুপ থাকা ক্ষোভ থেকেই চব্বিশের জুলাই শেষ হয়েছিল ছত্রিশ দিনে।
কাল্টের প্রধান মন্ত্র হলো ভয়। মানুষকে ধর্মের নামে, মতবাদের নামে ও ক্ষমতার দম্ভে ভয় দেখানো, যা করেছিল ফ্যাসিজম। ফ্যাসিজমের ধর্ম ছিল ‘চেতনা’। চেতনা’র নামে মানুষকে ভীত করে রেখেছিল। ভয়টাকে দারুণভাবে অ্যামপিফ্লাই করেছিল ফ্যাসিস্টরা। সেই চেতনার খারাপ নাম ছিল ‘রাজাকার’। মানুষকে সেই নামে ডেকে তাকে হত্যাযোগ্য করে তোলা হতো এবং শারীরিক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিকভাবে তাকে হত্যা করা হতো।
বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমও খারাপ নাম দেওয়ার কাজটা করছে। এই কাজটা করছে তারা ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশে গণমাধ্যমে দুটি গ্রুপ রয়েছে; একটার নেতৃত্বে এক ব্যবসায়ী গ্রুপ, আরেকটার নেতৃত্বেও তাই—‘কেউ কারে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান।’ উল্টোদিকে দুটো কাল্টের মিল আবার ওই এক জায়গাতেই। তাদের কাল্টের তীর্থ সীমান্তের ওপারে। তাদের সব সাপোর্ট সেখান থেকেই। তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করলেও খারাপ নাম দেওয়ার বেলায় তারা এক গুরুর অনুসারী। একটা গ্রুপ একটু আর্টিস্টিক ওয়েতে তাদের কাজ-কারবার চালায়; আরেক গ্রুপ আর্টের ধারও ধারে না। ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ জাতীয় অবস্থা।
এদের ফ্রেমিংয়ের ধরনটা অনেকটা এ রকম—ধরেন, কেউ একজন এনজিও কিংবা এমএলএম, অর্থাৎ মাল্টি-লেভেল মার্কেটিংয়ের নামে অথবা বিদেশে পাঠানোর কথা বলে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করল। তাকে যখন পাওনাদাররা ধরবে, তখন হবে ফ্রেমিং। সেই বাটপাড় যদি চেতনাপন্থি কেউ হন, তাহলে খবরের শিরোনাম হবে—‘ব্যবসায়ীকে আটকে চাঁদা আদায়,’ কিংবা ‘সালিশের নামে ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মব’! এই হলো ফ্রেমিং। অর্থাৎ ভালো কাজকেও ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে বিতর্কিত করা যায়। যৌক্তিক সালিশকেও, কিংবা বিক্ষোভকেও মব বানিয়ে দেওয়া যায়। এমন উদাহরণ অসংখ্য রয়েছে।
একইভাবে কালচারাল ফ্রন্ট রয়েছে কাল্টের অনুসারীদের। তারা মানুষের মৃত্যুতে কাঁদেন না, কাঁদেন গাছের মৃত্যুতে। তারা মানুষ পোড়ানোর ব্যথায় কাতর হন না, হন ভবন পোড়ানোর ব্যথায়। এমন ইতরদের দেখা পাবেন অহরহ। কালচারাল এই ফ্রন্ট মূলত স্টেজ তৈরির কাজ করে কাল্ট প্রসারে। যারা ‘চেতনা’ ছড়ানোর কাজ করেন, তারাও গণমাধ্যমের মতন ফ্রেমিং করেন। যেমন মানুষ পোড়ানোর বিষয়টিকে আড়াল করতে তারা স্টেজে হাজির করেন ভবন পোড়ানোর শোকগাথা। তারা সেই ভবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তৈরি করেন। সেই গুরুত্বকে নানা নাটকের মাধ্যমে তারা স্টেজে প্রদর্শন করেন। এমন অসংখ্য নট-নটী দৃশ্যমান এখন। এরাও অসম্ভব নির্লজ্জ। হাদি হত্যার বিচার চাওয়ার ব্যাপারে বিরোধিতাপ্রবণ এই কালচারাল কাল্ট। হাদি যাদের বলতেন, কালচারাল ফ্যাসিস্ট, তারা অগ্রগামী। হাদি ছিলেন মূলত এই কালচারাল কাল্টের জন্য বিপজ্জনক। এই কালচারাল কাল্টটি চেতনার নামে বিষ-বটিকা খাওয়াচ্ছিল জাতিকে। হাদি তাতে বাদ সেধেছিলেন। এর ফলে তাদের ক্ষোভ গিয়ে পড়েছিল হাদির ওপর। ইনকিলাব মঞ্চের ওপর রাগ সে কারণেই। কারণ ইনকিলাব মঞ্চ হলো সেই বিষ তথা ভেনমের অ্যান্টি-ভেনম।
হাদি হত্যার বিচার চাওয়ার ধরন নিয়ে অনেকের আপত্তি রয়েছে। কেউ একে বাড়াবাড়ি কিংবা রাজনৈতিক চাল বলছেন। কিন্তু হাদি হত্যার বিচার চাওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আলাপে কোনো রাজনৈতিক চাল ধরা পড়েনি। খুব সীমিত ক্ষমতা নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ সীমাহীন কাজ করেছে। তারা শুধু হাদি হত্যার বিচার চায়নি, আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিকে মূলধারায় প্রতিস্থাপনের কাজ করেছে। ঈদ মিছিল, ঘুড়ি উৎসব—এসবেরই ধারাবাহিকতা। যারা হাদি হত্যার বিচার প্রার্থনাকে খারাপ নাম দিতে চান, তারা কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিকে মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার কোনো পদক্ষেপই নেননি। প্রকাশ্যে তো নয়ই। তারা প্রকারান্তরে সেই কালচারাল কাল্ট তথা ফ্যাসিস্টদের আলাপেই সায় দিয়ে গেছেন নিজেদের অজান্তে। কালচারাল কাল্ট সেজন্যই অন্যের ধর্মীয় কালচারকে আমাদের মূলধারার কালচার বলে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চালিয়েছে। সেই প্রয়াস এখনো চলমান।
ঈদুল আজহা গেল। কই গত বছরের মতন আনন্দপূর্ণ ঈদ মিছিল? কোথায় সেই ঈদ উৎসবের মুখরতা? বরং উল্টো ঈদের বিরোধিতা রয়েছে মৌনস্বরে। আগে যেমন পশুহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলা হতো। ঈদ এলেই একদল পশুপ্রেমীর দেখা মিলত। যারা বনের পশু নয়, মনের পশু কোরবানির কথা বলত বিফ কাবাব খেতে খেতে, বিফ কাবাবের সঙ্গে থাকত দামি কোনো মদিরা—সেই ছাগলগুলো এবারও একই কথা বলেছে, যা গত ঈদুল আজহায় বলতে সাহস পায়নি। এখানেই হাদি প্রাসঙ্গিক; হাদির কালচারাল ফাইট প্রাসঙ্গিক। জানি, কেউ কেউ হাদিকে ঈর্ষা করেন। ঈর্ষা করার কারণ, মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা একটা তরুণ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণের তরুণ তুর্কি হয়ে উঠবেন, এটা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ঈর্ষা সেখান থেকেই। একই কারণে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল তার সমসাময়িক অন্যদের ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন।
বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবীদের সেই একই ঈর্ষাজনিত কারণে মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না অনেকেরই। সব দলেই অনেক বৃদ্ধ আছেন, যারা তরুণদের কাছে সাহসে, যুক্তিতে ও বুদ্ধিতে হেরে গিয়েও জিতে যেতে চাইছেন রাজনৈতিক চালে। এটা যে ভুল চাল, যা তারা বুঝতে পারবেন কিছুদিন পরেই। পরবর্তী সময়ে জেনারেশন জেড এবং জেনারেশন আলফা যখন দেশের ভার হাতে তুলে নেবে, তখন এই বৃদ্ধরা এবং তাদের চিন্তা সত্যিকার অর্থেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। জানি, আমাকেও এখন কেউ কেউ খারাপ নাম দিতে চাইবেন সেই ফ্যাসিস্ট কাল্টের শেখানো মতে। তারপরেও বলে যাই, এর আগেও বলেছিলাম—একটুও ভুল হয়নি, ফ্যাসিস্টদের বিদায় নিতে হয়েছে। যেভাবে ধারণা করেছিলাম, বলেছিলাম, সেভাবেই নিতে হয়েছে। আবার বলছি, লিখে রাখতে পারেন, ভীতু বৃদ্ধরা আগামী ইতিহাসের কাছে নিশ্চিত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন; হয়ে উঠবেন এ সময়ের খলনায়ক।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1782)
-
▼
August
(329)
-
▼
Aug 30
(14)
- লেবাননে সমৃদ্ধ ইতিহাসের নতুন তথ্য, মিলছে হাজার বছর...
- আরব বিশ্বে বাড়ছে খাদ্য ও পানির সংকট, মরুকরণে ব্যাহ...
- তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে চাপে নেতানিয়াহু
- ইরান যুদ্ধে অস্ত্রের মজুত ‘সংকটজনক’, চীন-রাশিয়া মো...
- নিষেধাজ্ঞায় কি নত হবে ইরান, ট্রাম্পের সামনে বড় প্রশ্ন
- ব্যাগে ছয় দেশের পাসপোর্ট, বেনজীর এখন সেন্ট লুসিয়ায়...
- ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ এখন রড-সিমেন্টের কারবারি by নাজমু...
- ইরানের হুমকি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরলেন নে...
- পশ্চিম তীরের গ্রামের একমাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দিল...
- ইরান যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে...
- কেন লোকচক্ষুর আড়ালে ব্যারন ট্রাম্প
- ক্যানসারের চিকিৎসার মধ্যেই সিনেমার কাজ, কঠিন লড়াইয়...
- কিয়েভের কাছে গোলাবারুদের গুদামে রাশিয়ার হামলা, নিহ...
- কলকাতার মুসলিম কলোনিতে এক মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ...
-
▼
Aug 30
(14)
-
▼
August
(329)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




