Showing posts with label শ্রীলঙ্কা. Show all posts
Showing posts with label শ্রীলঙ্কা. Show all posts

Monday, December 1, 2025

পানির নীচে শ্রীলঙ্কা, মৃত প্রায় ২০০

এক দশকে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট বন্যায় রাজধানী কলোম্বসহ দেশটির বহু অঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।  ভয়াবহ এই বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২০০ এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে এই সংখ্যা আরও দীর্ঘ হবে। কারণ এখনও আরও দুই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে দেশটির সরকার। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।

আল জাজিরার এক খবরে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় এবারের বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৩ জন। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (ডিএমসি) জানিয়েছে, রাজধানী কলম্বোর বেশ কিছু অংশে পানি বেড়েই চলেছে। এখনও নিখোঁজ আছেন ২২০ জন। রোববার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর জানায়, নিখোঁজদের মধ্যে নৌবাহিনীর পাঁচ সদস্যও রয়েছেন। ডিএমসি জানিয়েছে, চরম আবহাওয়ার কারণে দেশজুড়ে প্রায় ১৫ হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ রাষ্ট্রীয় সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন।

আল জাজিরার প্রতিনিধি মিনেল ফার্নান্ডো জানান, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। তিনি বলেন, কিছু মহল্লা পুরোপুরিই কাদা-পানিতে চাপা পড়েছে। আর প্রতিটি ঘটনা নতুন হতাশা নিয়ে আসছে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বেশ কয়েকটি এলাকা এখনো হালনাগাদ তথ্য দিতে পারেনি। অবিরাম বৃষ্টিতে নতুন করে রোপণ করা ধানক্ষেতও ডুবে গেছে বলে জানান তিনি।

ডিএমসি জানায়, কলম্বোর উত্তরাংশেও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, কারণ কেলানি নদীর পানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, ঘূর্ণিঝড় সরে গেলেও উজানে ভারী বর্ষণে নদীর তীরবর্তী নিচু অঞ্চলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে শনিবার জরুরি অবস্থা জারি করে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানান। সাড়া দিয়ে প্রথমেই ভারত ত্রাণসামগ্রী ও উদ্ধার অভিযানের জন্য দুটি হেলিকপ্টার পাঠায়। জাপান জরুরি সহায়তার প্রাথমিক মূল্যায়নের জন্য একটি দল পাঠানোর ঘোষণা দেয়। যদিও অনেক এলাকায় বৃষ্টি কমেছে, কিন্তু মধ্যাঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বহু সড়ক এখনো অগম্য অবস্থায় রয়েছে।
ডিএমসি-এর হালনাগাদ তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড়-বন্যায় ২০ হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ। বিভিন্নভাবে সহায়তার প্রয়োজনীয় তালিকায় রয়েছেন ৮ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মিলে উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের লাইন ধসে পড়া এবং পানি শোধনাগার প্লাবিত হওয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টারনেট যোগাযোগও ভেঙে পড়েছে নানা স্থানে। ২০১৭ সালের পর এবারই এমন ভয়াবহ দুর্যোগের সম্মুখীন হলো শ্রীলঙ্কা। তখনকার বন্যা ও ভূমিধসে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। শতাব্দীর শুরু থেকে সবচেয়ে বড় বন্যা দেখা যায় ২০০৩ সালের জুনে। তখন প্রাণহানি হয়েছিল ২৫৪ জনের।  

mzamin

Tuesday, September 30, 2025

নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা: এরপর দক্ষিণ এশিয়ায় কোথায় আগুন জ্বলবে!

লোহার ফটকের কাঁপন যেন ঢাকের শব্দে রূপ নিল, জনতা এগিয়ে এলো ঢেউয়ের মতো। দেহের সমুদ্র ভেঙে ফেলল ব্যারিকেড- যা মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও ক্ষমতার প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দেশের নেতার বাড়ির করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো কাদামাখা পায়ের গর্জন। কেউ ভাঙল জানালা ও শিল্পকর্ম, কেউ তুলে নিল বিলাসবহুল বিছানার চাদর কিংবা জুতো। যে অট্টালিকা এতদিন কর্তৃত্বের প্রতীক হয়ে ছিল, অস্পৃশ্য, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে- তা হঠাৎ করেই কয়েক ঘণ্টার জন্য জনগণের হাতে চলে এলো। এ দৃশ্য নেপালের, গত সপ্তাহের। তবে এটি একইসাথে শ্রীলঙ্কার (২০২২) এবং বাংলাদেশের (২০২৪) ছবিও। অনলাইন আল জাজিরায় প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত ৩ কোটি মানুষের দেশ নেপাল এখন এমন এক পথে হাঁটছে যা প্রচলিত নির্বাচনী গণতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। একের পর এক যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে দক্ষিণ এশিয়ায় সরকার পতন ঘটছে। তাই প্রশ্ন উঠছে- বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চল কি জেনারেশন জেড বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে?

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, এটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। এক ধরনের নতুন অস্থিরতার রাজনীতি তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রায় ১০ হাজার নেপালি তরুণ- যাদের মধ্যে প্রবাসীরাও ছিলেন, তারা একজন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করল না শারীরিক ভোটে, না নির্বাচনী ব্যালটে, বরং গেমারদের প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ডে অনলাইন জরিপের মাধ্যমে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে তিন দিনের আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে, নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে ৭০ জনেরও বেশি নিহত হন। পরে নেপাল সরকার মার্চে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি যখন আন্দোলনকারীদের ‘জেন জেড উৎস’ নিয়ে ঠাট্টা করলেন, তার অল্প কিছুদিন পরেই তাকে পদত্যাগ করতে হলো। বার্তা স্পষ্ট- রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আস্থাহীন তরুণরা নিজেদের ক্ষমতাসীন ঘোষণা করছে যখন তারা প্রতারিত মনে করছে। স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রতিবাদের ইতিহাস আছে। কিন্তু শাসক পতনের ঘটনা বিরল। এটি সামরিক অভ্যুত্থান বা প্রচলিত রাজনৈতিক সংঘাতের ধারা নয়, বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রূপ।

তিন ভিন্ন প্রেক্ষাপট, এক অভিন্ন দৃশ্য

শ্রীলঙ্কা (২০২২): অর্থনৈতিক ধস, ঋণ খেলাপি, জ্বালানি ও খাদ্য ঘাটতি, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। জন্ম নিল ‘আরাগালায়া’ (সংগ্রাম) আন্দোলন। যুবকরা ‘গোটা গো ভিলেজ’ বানালো কলম্বো প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের সামনে। জুলাইতে প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ (২০২৪): বৈষম্যমূলক চাকরির কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। পুলিশি দমনপীড়নে শত শত নিহত হন। পরে আন্দোলন রূপ নেয় শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান দাবিতে। আগস্টে হাসিনা পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে ভারতে পালান।
নেপাল (২০২৫): সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ, তীব্র বৈষম্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন ৭০ জনের বেশি। পার্লামেন্ট ও মিডিয়া হাউসেও আগুন জ্বলে ওঠে। অবশেষে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী ওলি।

সাধারণ সূত্র: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে জেন জেড
মানবাধিকার সংস্থার মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, এই দেশগুলোতে যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মূল কারণ একই- অমীমাংসিত বৈষম্য, দুর্নীতি, প্রবীণ রাজনীতিকদের প্রজন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন শাসন। জেন জেড তাদের জীবনে দুটি বড় মন্দা দেখেছে- ২০০৮-০৯ সময়ে এবং কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধস। এ প্রজন্ম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের শাসন করেছেন দাদা-দাদীর বয়সী নেতারা।  তার মধ্যে নেপালে ওলি (৭৩), বাংলাদেশে হাসিনা (৭৬), শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে (৭৪)। তরুণদের নৈতিক ক্ষোভ প্রবল হয়েছে স্বজনপ্রীতি, বৈষম্যমূলক বিলাসিতার প্রদর্শনী এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের জীবনযাত্রা দেখে।

ডিজিটাল প্রজন্মের শক্তি
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রুমেলা সেন বলেন, রাগান্বিত দৃশ্যের বাইরে দেখলে বোঝা যায়, এই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা হলো ‘গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’ ডিজিটাল দক্ষতার কারণে তারা অনায়াসে অনলাইনে সংগঠন, প্রচার ও প্রতিবাদের নতুন কৌশল তৈরি করছে। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করলে বা প্ল্যাটফর্ম ব্লক করলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। তিনি বলেন, এ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যৎ চুরি হয়ে যেতে দেখছে। তাদের ক্ষোভ একেবারেই সত্যিকারের।

একে অপরের কাছ থেকে শিক্ষা
রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী জীবন শর্মা বলেন, নেপালি তরুণরা শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের আন্দোলন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এসব বিদ্রোহ আলাদা নয়, বরং গভীর হতাশা থেকে জন্ম নেয়া। স্ট্যানিল্যান্ডও বলেন, এরা একে অপরকে দেখছে, শিখছে এবং অনুপ্রাণিত হচ্ছে।
অবশেষে প্রশ্ন রয়ে যায়-এরপর কোথায় আগুন জ্বলবে?
https://mzamin.com/uploads/news/main/180299_Untitled-10.webp

Tuesday, April 1, 2025

কলম্বোর দিন-রাত by জাকারিয়া মণ্ডল

মহাসাগরের ঢেউ ছুঁয়ে নারিকেল গাছের সারি। এপাশে রেললাইন। তার এপাশে মহাসড়ক। বেরুয়ালা থেকে রওনা হওয়া বাসটা কলম্বো অভিমুখে ছুটছে। কলম্বো ছেড়ে আসা একটা ট্রেন দ্রুতগতিতে বিপরীত দিকে চলে গেল।

রাজধানী শহরে ঢুকতে ঢুকতে দুপুর গড়িয়ে গেল। পার্লামেন্ট ভবনকে ডানে রেখে আর একটু এগিয়ে বাঁয়ে কলম্বো বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনাল। বিপরীতে শহরের ভেতর খানিক এগিয়ে ওল্ড ডাচ্ হসপিটাল।  
টালি ছাওয়া দোচালা কাঠামোর নিচে সারিবদ্ধ ঘর। কোনোটা ফ্যাশন, কোনোটা সুভ্যেনির, কোনোটা বা খাবারের দোকান। এমন চারটি ঘরের বাহু পুরো স্থাপনাটাকে আয়তক্ষেত্রের রূপ দিয়েছে। ভেতর দিক টানা বারান্দার বেড়ে খোলা উঠোন। পাশ দিয়ে সারিবদ্ধ বাঁধানো টেবিল চেয়ার।
সিলন কারি ক্লাবে মুরগি ও মাছের কারি, পাঁপড় ভাজি, মিশ্র সবজি, বেগুনের টক ঝোল আর ঘন ডালে উদরপূর্তি নেহায়েত মন্দ হলো না। রেস্তরাঁটার অনতিদূরেই বিখ্যাত কাঁকড়া মন্ত্রণালয়। মানে ‘মিনিস্ট্রি অব ক্র্যাব’। শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত দুই ক্রিকেটার কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে মিলে রেস্তরাঁটা জমিয়েছেন বেশ। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের সেরা ৫০ এশীয় রেস্তরাঁর তালিকায় এটা ২৯ নম্বরে ছিল। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে এখানে ভূরিভোজ সারতে এসেছিলেন কোহলি ও তার দল। কিন্তু খাবারের ছবি পোস্ট করে পড়েছিলেন ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তোপের মুখে। যদিও যতই তোপ দাগা হোক, যে দেশেরই ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কায় খেলতে আসুক না কেন, কাঁকড়া মন্ত্রণালয়ে খেতে আসা ঠেকানো যায় না।  
দুপুর গড়িয়েছে বলে কাঁকড়া মন্ত্রণালয়ে এখন ভিড় নেই। তবে বিকাল থেকে সরগরম হয়ে উঠবে রেস্তরাঁটা। সেইসঙ্গে ভোজ আর কেনাকাটার উৎসবে জমে উঠবে এই ওল্ড ডাচ্ হসপিটাল চত্বর। মূলত ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হসপিটাল ছিল এখানে। সতেরো শতকের মাঝামাঝিতে। পরবর্তীতে ইতিহাসের আরও অনেকগুলো যুগ পাড়ি দিলেও ডাচ্ হসপিটাল নামেই এখনো পরিচিত এই ভবন ও চত্বরটা।
যদিও এখন আর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। হাসপাতাল ঘিরে থাকা ডাচ্ দুর্গের চিহ্নও খুঁজে নেয়া ভার। সামনের দিকটায় রাস্তার ওপাশে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া টাওয়ার। মাথা উঁচু করে আকাশ ছুঁতে চাইছে। কলম্বোর তিন রাতের ঠিকানা হোটেল রামাদায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ৪টা বেজে গেল। শ্রীলঙ্কার প্রখ্যাত রত্ন ব্যবসায়ী তারিক আলীওয়াফা এসেছেন হোটেল লবিতে। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন সভাপতি ও এই ট্যুরের লিডার আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলের পূর্ব পরিচিত তিনি। তার শ্বশুর শ্রীলঙ্কান পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। গাড়িতে করে বেয়ারফুটের সামনে নামিয়ে দিলেন।
বারবারা সানসোনি নামে এক শিল্পী ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বেয়ারফুট প্রতিষ্ঠা করেন। এখন এটি পরিচালনা করছেন তারই উত্তরসূরি ডমিনিক। বড়ই অমায়িক মানুষ। সঙ্গে করে ঘুরিয়ে দেখালেন সবকিছু। রঙ আর নকশার রাজ্য চোখ ধাঁধিয়ে দিল। কাপড়ে কাপড়ে বৈচিত্র্যের সমাহার। রকমারি কারুপণ্য। চা ও ভেষজ। বইয়ের গ্যালারি। সবখানে চারু আর কারুশিল্পের অভূতপূর্ব সমন্বয়।
মূল ভবনের একপাশে আর্ট গ্যালারি। পেছনের উঠোন জুড়ে ক্যাফে। খোলা চত্বরে বহু দেশের মানুষের আড্ডা।
এরইমধ্যে গোধূলি নেমেছে কলম্বোর আকাশে। সেই আলোয় মূল সড়কের পাশে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে রিফর্মড ডাচ্ চার্চের শ্বেতভবন। যানজটহীন সড়কে সাই সাই ছুটে চলেছে গাড়ি। রাস্তার ওপাশে একটা তামিল মন্দির। প্রবেশপথের ওপরে কয়েকতলা গোপুরামে দেবদেবীর মেলা। এ জাতীয় মন্দিরের প্রবেশপথের ওপরে বিভিন্ন দেবদেবী খচিত যে বহুতল কাঠামোটা থাকে, তারই তামিল নাম গোপুরাম। এই গোপুরামের মাথায় সাঁঝবাতি জ¦লে উঠলো হুট করে। এরইমধ্যে সূর্যটা ডুবে গেছে ভারত মহাসাগরের বুকে। কলম্বোর রাস্তা আলোকিত ল্যাম্প পোস্টের আলোয়। সুপারশপ ম্যাজেস্টিক সিটিতে উপচে পড়া ভিড়। রাত ৮টার আগেই বন্ধ হয়ে গেল কলম্বো শহরের দোকানপাট।
হোটেল রামাদার সুইমিং পুল ঘিরে সবুজ বাগান। ফাঁকে ফাঁকে টেবিল-চেয়ার। ডিনারের পর মাঝরাত অবধি চললো অলস আড্ডা। ঘুমিয়ে যাওয়া শহরের কাছেই কোথাও নাইট পার্টি চলছে। ড্রামের বিট আর হৈ-হুল্লোড় শোনা গেল রাতভর।
সকালে হোটেল রুমের জানালা থেকেই মহাসাগরের শান্ত জলরাশি চোখে পড়লো। প্রাতরাশের পর শুরু হলো লোটাস টাওয়ার অভিযান। সুউচ্চ সবুজ দণ্ডের মাথায় গোলাপি পদ্মটা যেন আকাশের গায়ে বসে আছে। শ্রীলঙ্কার সংস্কৃতিতে পদ্ম হলো বিশুদ্ধতা ও উন্নয়নের প্রতীক। তাই পদ্মের আদলেই এই টাওয়ার। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ এই টাওয়ারের উচ্চতা ১১৬৮ ফুট। আছে রেস্তরাঁ, অডিটোরিয়াম, টেলিকমিউনিকেশন জাদুঘর, পরিদর্শন গ্যালারি।  
উন্নয়ন কাজ চলমান বলে এখন লোটাস টাওয়ারে প্রবেশ নিষেধ। তবে এয়ারফোর্সের তত্ত্বাবধানে পরিদর্শনের বিশেষ অনুমতি মিলেছে। অতিকায় দ্রুতগামীর লিফটে পরিদর্শন প্ল্যাটফরমে পৌঁছাতে সময় লাগলো না। তত্ত্বাবধায়কদের বিশেষ অনুমতি ও সহযোগিতায় মই বেয়ে ছাদের ফোকর গলে উপরের খোলা চত্বরেও ওঠা গেল। তারপর আরও খাড়া মই বেয়ে একেবারে শীর্ষে ওঠার সুযোগও করে দিলেন তারা।
টাওয়ারের চূড়া থেকে নিচের মানুষগুলোকে মনে হলো লিলিপুট। গোড়াতেই বেইরা লেক। সরু ক্যানাল হয়ে পশ্চিমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। মহাসাগরের ওপরে জমে থাকা কুয়াশায় খুব বেশি দূর দৃষ্টি চলে না। এপাশে কুয়াশামাখা শহর। ছবির মতো সুন্দর। স্কুল, খেলার মাঠ। ছুটে চলা গাড়ি আর ট্রেনকে মনে হচ্ছে খেলনা। মার্চের শুরুতে কলম্বো শহরের অসাধারণ টপ ভিউ ধরা দিল চোখের সামনে।
মধ্যাহ্নভোজের পর বিটুবি সেশন শুরু হলো হোটেল রামাদায়। বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস এসোসিয়েশন (টোয়াব) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কান ট্যুর অপারেটরদের বিজনেস বৈঠক। তারপর সবার হাতে সুভ্যেনির তুলে দিলেন শ্রীলঙ্কার পর্যটন সচিব।
বিকালে হোটেল থেকে বেরুতেই হাজির তারিক আলী। তার ড্যাজলজিম অ্যান্ড জুয়েলারি শপটা বেয়ারফুটের কাছেই। লম্বাটে দোকানটায় বিদ্যুতের আলো ছাপিয়ে রত্নের ঝিলিক। নানা রঙের দ্যুতি। রুবি, নীলকান্তমণি। নীল একটা রত্ন দেখিয়ে জানালেন, ওটার দাম ৩৫ হাজার ডলার। বিভিন্ন দেশ থেকে রত্নপ্রেমীরা ছুটে আসেন তার দোকানে। আর তিনি রত্ন সংগ্রহ করেন রত্নপুরা থেকে। যার অবস্থান কলম্বো থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বদিকে।

রত্নপুরা মানে রত্ননগরী বা রত্নের শহর। ওখানকার নদীর কাদাবালি চালনিতে নিয়ে চাললে একসময় রত্ন পাওয়া যেতো। এখন নিচু ধানের জমিতে ৩৩ ফুট থেকে ১৬০ ফুট পর্যন্ত গভীরে বেশ কিছু রত্নের খনি। এসব খনির কারণেই পৃথিবীর কোথাও রত্নদ্বীপ, কোথাওবা রত্নের ভাণ্ডার নামে শ্রীলঙ্কা পরিচিতি। এ নিয়ে আছে ঢের গল্প, কিংবদন্তি। শ্রীলঙ্কা থেকে রত্ন সংগ্রহের ইতিহাসও শত সহস্র বছরের প্রাচীন। অতি রূপবতী বিলকিসকে বিয়ে করার পর বাদশাহ সোলায়মান দু’টি জাহাজ পাঠান রত্নের দেশ শ্রীলঙ্কায়। জাহাজভর্তি রত্ন এনে নববধূকে খুশি করবেন বলে। এদেশে এখনো ভুরি ভুরি ব্লু শেফায়ার বা নীলা পাথর পাওয়া যায়। নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে প্রদর্শিত ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ নামে অতি মূল্যবান রত্নটি আসলে এই শ্রীলঙ্কারই রত্ন। বৃটিশ রাজমুকুটে শোভিত ৪০০ ক্যারেটের নীলা পাথরটিও এই শ্রীলঙ্কার। এটাই পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে কমলা ও গোলাপি মিশ্রিত পদ্মরাগ মণি মেলে। আরও আছে রুবি। চীনা পর্যটক ফা হিয়েন এদেশে মানুষের হাতের মতো লম্বা ও বিঘত খানেক চওড়া রুবি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। ইবনে বতুতা তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে মুরগির ডিমের সমান রুবি দিয়ে হাতির মাথা সাজানো হতো বলে লিখে গেছেন। এখানকার রুবির প্রেমে পড়েছিলেন মার্কোপেলোর মতো পর্যটকও। আরও আছে ক্যাটস আই, টোপাজ, আরও যে কতো রত্ন!   
শ্রীলঙ্কার রত্ন ব্যবসায়ে মুসলমানদের আধিপত্য রয়েছে বলে গর্বিত তারিক আলী। ১১ শতাংশ মুসলমান জনসংখ্যার শ্রীলঙ্কায় রত্নপুরার মুসলমান জনসংখ্যা ৩৩ শতাংশের বেশি, আর রাজধানী কলম্বোতে প্রায় ৪২ শতাংশ। সন্ধ্যায় ড্যাজল থেকে বেরিয়ে কয়েক মিনিটেই ফের বেয়ারফুট। খোলা ক্যাফেতে গাছের নিচে আড্ডা জমে জয়ন্তির সঙ্গে। জয়ন্তি কুরু-উতুমপালা। শ্রীলঙ্কার প্রথম এভারেস্টজয়ী। পুরুষ-নারী বৈষম্য করে না পর্বত। হয় তাকে জয় করো, নয়ত পরাজিত থাকো। এ আপ্তবাক্যকে মূল সূত্র ধরেই শ্রীলঙ্কার প্রথম এভারেস্টজয়ী হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম পোক্ত করে নিয়েছেন জয়ন্তি। নারী হিসেবে তো বটেই, প্রথম শ্রীলঙ্কান হিসেবেই এই অনন্য গৌরব অর্জন করে নিয়েছেন তিনি। যে গৌরবে এ দেশের পুরুষরাও তার থেকে পিছিয়ে।
জয়ন্তির সঙ্গে কথায় কথায় সন্ধ্যা গড়ায়। কলম্বোতে আর একটা রাত গভীর হয়। তারপর সকাল। দুই আলোকচিত্রী আবির আবদুল্লাহ ও আজিম খান রনি ছুটে যান ফটোগ্রাফিক এসোসিয়েশনে। সেখানে বাংলাদেশ নিয়ে একটা ফটো প্রেজেন্টেশন দেবেন তারা। পাটের কাপড় ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন ছুটলেন তার ব্যবসার কাজে। এসোসিয়েশন সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল ও শাকিল বিন মুশতাকসহ তিনজনের দল ছুটলো সিলন টুডে অফিসে।
শ্রীলঙ্কার অন্যতম ডেইলি নিউজপেপার সিলন টুডের অফিসটা ছিমছাম, পরিপাটি। প্রথমে সাংবাদিক সঞ্জু, তারপর জেনারেল ম্যানেজার-এডভারটাইজিং সঞ্জিব ওটেউয়ি, সবশেষে ফিচার এডিটর খুবই আন্তরিক সবাই।
পত্রিকা অফিস থেকে বেরিয়ে পেরেরা হুসেইন পাবলিশিং হাউজ। বিখ্যাত লেখক আমেনা হুসেইন আগে থেকেই আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলকে চিনতেন। তার অফিসে জমে উঠলো আড্ডা। স্বামী সাম পেরেরার সঙ্গে মিলে প্রকাশনা সংস্থাটাকে জমিয়ে তুলেছেন তিনি।
মনোযোগ দিয়ে সুনেলা জয়াবর্ধনের ‘লাইন অব লঙ্কা: মিথ অ্যান্ড মেমোরিজ অব অ্যান আইল্যান্ড’ গ্রন্থটির পৃষ্ঠা উল্টাতে দেখে সেটা উপহারই দিয়ে বসলেন আমেনা হোসেন। এ ছাড়া আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলকে দিলেন মাইকেল রোহান সূরিয়া রচিত ‘মোটর সাইক্লিং এডভেঞ্চারস ইন শ্রীলঙ্কা’ গ্রন্থটি। আর নিজের অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ ‘ইবনে বতুতা ইন শ্রীলঙ্কা’ গ্রন্থটি তিনি দিলেন শাকিল বিন মুশতাককে। যে পথ ধরে ইবনে বতুতা শ্রীলঙ্কা ঘুরে বেড়িয়েছেন, সে পথ ধরে নিজেও ঘুরেছেন আমেনা হোসেন। সেই অভিজ্ঞতাই তিনি প্রকাশ করেছেন গ্রন্থটিতে। তার কাছ থেকে বিদায় নিতে নিতে দুপুর।
ফুডকোর্টে মধ্যাহ্নভোজ সারতে নিয়ে গেলেন তারিক আলী। বাংলাদেশের ফুডকোর্টের মতোই গিজগিজে ভিড়। খাবারের পর কলম্বোর পুরনো শহর ও স্থাপনা ঘুরিয়ে দেখালেন তারিক আলী। তারপর বিদায় নিলেন। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে ডিনারের দাওয়াত। হাইকমিশনার তারেক মো. আরিফুর রহমানের সঙ্গে জমে উঠলো শ্রীলঙ্কা সফরের শেষ আড্ডা।
শ্রীলঙ্কান ট্যুরিজম থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে বলে অকপটে মত প্রকাশ করলেন বাংলাদেশ হাইকমিশনার। নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি মেলে তিনি বললেন, শ্রীলঙ্কান ট্যুরিজমের অতিথিসেবা অনেক নিখুঁত। অবকাঠামো থেকে শুরু করে ভাষা, ট্যুর প্ল্যান সবকিছুতেই তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাদের উন্নতির ধারা এখনো অব্যাহত। আমরা তাদের কাছে অনেক কিছুই শিখতে পারি।
ভারত মহাসাগরের পাড়ে কলম্বোর অবস্থান শ্রীলঙ্কার পশ্চিম উপকূলে। কালানী নদীর মোহনায়। অতীতে এ শহরের নাম ছিল কালান তোতা, যার অর্থ কালানী নদীর ফেরিঘাট। আরব বণিকরা যার নাম দেয় কালাম্বু। ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে পতুর্গিজরা এ শহর দখলের পর ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নামে নাম রাখে কলম্বো। ১৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এ শহরের দখল নেয় ওলন্দাজরা। ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজরা হয় এ শহরের নিয়ন্ত্রক। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে বৃট্রিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়া শ্রীলঙ্কার কলম্বো এখন প্রধান সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক রাজধানী।
ঐতিহাসিক এ শহরে এখন মাঝরাত। ট্যুরিস্ট বাস ছুটে চলেছে ৩৫ কিলোমিটার দূরের বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের দিকে। Í
লেখক: নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা
(সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০২৫)

Saturday, February 22, 2025

শ্রীলঙ্কায় হাতিদের প্রথম ‘অনাথ আশ্রমের’ সুবর্ণজয়ন্তীতে ফলের বড় ভোজ

শ্রীলঙ্কায় হাতিদের প্রধান ‘অনাথ আশ্রমের’ ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত রোববার এদের জন্য ফলের এক বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। আশ্রমটি বিশ্বে এ ধরনের প্রাণীদের প্রথম সেবাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

‘অনাথ আশ্রম’টির নাম পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজ। পর্যটকদের কাছে এটি অন্যতম একটি আকর্ষণের জায়গা। গত রোববার এ আশ্রম প্রাঙ্গণ কলা, তরমুজ ও শসায় ভরে গিয়েছিল।

প্রতিদিন এ আশ্রমের হাতিগুলোকে নদীতে নিয়ে গোসল করানো হয়। রোববারও এদের গোসলের জন্য নদীতে নেওয়া হয়। আশ্রমে থাকা চার প্রজন্মের হাতি নিকটবর্তী মহা ওয়া নদীতে গোসল করে। সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপনে আমন্ত্রিত কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পর্যটককে দুধভাত ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পরিবেশন করা হয়।

আশ্রমটির প্রধান কিউরেটর সঞ্জয়া রত্নানায়েকে বলেন, ‘১৯৮৪ সালে এ অনাথ আশ্রমে প্রথম হস্তীশাবকের জন্ম হয়। তখন থেকে এ পর্যন্ত মোট ৭৬টি হাতির জন্ম হয়েছে।’ তিনি এ উদ্যোগকে একটি সফল প্রজনন কর্মসূচি বলেও উল্লেখ করেন।

সঞ্জয়া রত্নানায়েকে আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের এখানে চার প্রজন্মের হাতি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ১৮ মাস ও বড়টির বয়স ৭০ বছর।’

২০২১ সালের আগস্টে আশ্রমটিতে প্রথমবারের মতো যমজ হস্তীশাবক জন্ম নেয়। এশীয় হাতির ক্ষেত্রে যমজ শাবক জন্মানোর ঘটনা বিরল। দুটো হস্তীশাবকই ভালো আছে।

১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাতির ‘অনাথ আশ্রম’টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর দুই বছর আগে থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বেনটোটার একটি ছোট সেবাকেন্দ্রে পাঁচটি অনাথ হাতিকে লালন–পালন করা হচ্ছিল।

রত্নানায়েকে বলেন, ‘১৯৭৫ সালে পিন্নাওয়ালায় একটি নারকেলবাগানে আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই প্রাণীরা বিচরণের জন্য আরও বেশি জায়গা ও ভালো পরিবেশে পায়। আশপাশের এলাকায় তখন প্রচুর খাবারও পাওয়া যেত।’

হাতিদের ক্ষুধা মেটাতে এ আশ্রমে ১৪ হাজার ৫০০ কেজি নারকেল, পাম ও অন্যান্য গাছের পাতার প্রয়োজন হয়।

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল) পূর্বে আশ্রমটির অবস্থান। সেখানকার কর্তৃপক্ষ হস্তীশাবকদের জন্য টন টন ফল ও দুধও কিনে রাখে। বিদেশি ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের কাছে হস্তীশাবকগুলো খুব পছন্দের।

এ আশ্রম শ্রীলঙ্কার রাজস্ব আয়েরও অন্যতম বড় উৎস। সেখান থেকে প্রতিবছর প্রবেশ ফি হিসেবে লাখ লাখ ডলার আয় হয়। দর্শনার্থীরা দূর থেকে হাতিদের দেখতে পারেন, কাছেও আসতে পারেন। স্নানের সময় হাতিদের গা ঘষতে সাহায্য করতে পারেন তাঁরা।

সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আশ্রমে উপস্থিত হয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মাহুত কে জি সুমানাবন্দ। এএফপিকে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার সময় এ আশ্রমে পানি ও বিদ্যুতের অভাব ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

হাতি লালন–পালনকারী হিসেবে তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন সুমানাবন্দ। ৬০ জনের বেশি মাহুতকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। এখনো বিভিন্ন মন্দির ও অন্যান্য জায়গার হাতি লালন–পালনকারীরা তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে থাকেন।

২০ বছর আগে শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষ দেশের দক্ষিণে আরেকটি হাতির আশ্রম খোলেন। সেখানে অনাথ, পরিত্যক্ত বা আহত হাতিদের যত্ন নেওয়া হয় এবং পরে এদের বনে ফেরত পাঠানো হয়।

পিন্নাওয়ালা আশ্রমটিকে অনেকে সফল এক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। এরপরও শ্রীলঙ্কায় বন্য প্রাণীদের ঐতিহ্যবাহী অভয়ারণ্যগুলোর সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে।

পরিবেশ উপমন্ত্রী আন্তন জয়াকোড়ি রোববার এএফপিকে বলেন, ২০২৩ সালে এমন সংঘাতে ৪৫০টি হাতি মারা যায়। এ ছাড়া ১৫০ জন নিহত হন। আগের বছর ৪৩৩টি হাতি ও ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

শ্রীলঙ্কায় হাতি হত্যা বা হাতির ক্ষতি করা ফৌজদারি অপরাধ বলে বিবেচিত। দেশটিতে আনুমানিক সাত হাজার বন্য হাতি রয়েছে এবং সেখানে হাতিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে হাতির গুরুত্ব থাকা এর একটি কারণ বলে মনে করা হয়।

তবে হাতি হত্যা থামছেই না। হাতি ফসলের খেত নষ্ট করে দেওয়ায় কৃষকেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। উপমন্ত্রী আন্তন জয়াকোড়ির দৃঢ় বিশ্বাস, নতুন সরকার গ্রামে হাতিদের প্রবেশ বন্ধ করে সমস্যাটি মোকাবিলা করতে পারবে।

আন্তন জয়াকোড়ি এএফপিকে বলেন, বন্য হাতিদের গ্রামে প্রবেশ করা কঠিন করে তুলতে তাঁরা বৈদ্যুতিক বেড়া, পরিখাসহ একাধিক বেষ্টনি তৈরির পরিকল্পনা করছেন।

পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজ নামের আশ্রমটিতে হাতিকে ফল খাওয়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা
পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজ নামের আশ্রমটিতে হাতিকে ফল খাওয়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা। ছবি: এএফপি

Monday, February 3, 2025

গাড়ি আমদানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল শ্রীলঙ্কানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসের পতনের পর শ্রীলঙ্কায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে। এ কারণে শ্রীলঙ্কাকে অনেক দেশ আদর্শ হিসেবে মনে করে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে অনেক দেশ। এবার বলা হচ্ছে, কিছু যানবাহন আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে দেশটি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- গাড়ি আমদানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেই কি দেশটির জনগণ একটি নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখেন? অনলাইন বিবিসিতে এ প্রশ্নটির বিশ্লেষণ করেছেন সাংবাদিক আনবারাসান ইথিরাজন। তিনি লিখেছেন, ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে বাস, ট্রাক ও বিভিন্ন ব্যবহার্য গাড়ি আমদানি শুরু করার কথা দেশটির। অন্য যানবাহন আমদানিতে বিধিনিষেধ আস্তে আস্তে তুলে নেয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশটির বহু নাগরিক অপেক্ষা করছেন কখন প্রাইভেটকার আমদানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে স্পোর্টসে ব্যবহৃত গাড়ি এবং তিন চাকার গাড়ি। তিন চাকার গাড়ি ব্যাপকভাবে ট্যাক্সি হিসেবে ব্যবহার করা হয় সেখানে। কিন্তু নতুন গাড়ির দাম বেড়ে যাবে। তার সঙ্গে আছে দুর্বল মুদ্রা মান এবং উচ্চহারে শুল্ক। ফলে এ অবস্থায় খুব কম মানুষেরই একটি নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য থাকবে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ভয়াবহভাবে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে। এর ফলে দেশটির ইতিহাসে ঋণদাতাদের কাছে তারা স্বীকার করে যে, তারা দেউলিয়া হয়ে গেছে। ঋণদাতাদেরকে যে অর্থ ফেরত দিতে হয়, তা দিতে অক্ষম তারা। দেশটিতে বসবাস করেন প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ মানুষ। সেখানে আর্থিক এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেখা দেয় জ্বালানি, খাদ্য এবং ওষুধের অস্বাভাবিক সংকট। এতে দেশ টালমাটাল হয়ে পড়ে। ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। তার স্রোতের কাছে টিকে থাকতে পারেননি তখনকার প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে। তাকে কয়েক মাসের মধ্যেই সব গুটিয়ে বিদায় নিতে হয়। সাংবাদিক ইথিরাজন আরও লিখেছেন, রাজাপাকসের উত্তরসূরিরা উচ্চ শুল্ক, জ্বালানিতে ভর্তুকি দেয়া বন্ধ সহ বিভিন্ন রকম কৃচ্ছ্রসাধন করতে থাকে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আইএমএফ’র কাছ থেকে ২৯০ কোটি ডলার বেইলআউট নিয়ে সমঝোতা শুরু করে কলম্বো। তখন থেকে দেশটির অর্থনীতি উন্নত হতে শুরু করে। অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপ থেকে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। তাই বলে দেশবাসীর হাতে যে একেবারে অঢেল কাঁচা টাকা এসে পড়েছে এমন নয়। গাড়ি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা শ্রীলঙ্কানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা একটি নতুন গাড়ি বা একটি ভ্যান কেনার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করছিলেন। কলম্বোভিত্তিক অর্থনৈতিক থিঙ্কট্যাংক এডভোকেটা’র চেয়ারম্যান মুর্তাজা জাফিরজি বলেছেন, তিনি মনে করেন সরকারের এই পদক্ষেপ ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত। তিনি আরও বলেন, গাড়ি আমদানিতে সরকারের শুধু রাজস্ব বাড়াবে এমন নয়। একই সঙ্গে এতে অর্থনৈতিক অন্যান্য কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে। যেমন গাড়ির খাতে অর্থায়ন হবে, ডিলাররা রাজস্ব পাবেন, কার  সার্ভিসিং খাতে যারা আছেন তারা সুবিধা পাবেন। অন্যরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মকাণ্ডে জড়িত হবেন। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কিন্তু মঙ্গলবার দেশটির তথ্যমন্ত্রী নালিন্দা জয়াতিসা মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলেছেন, দেশ খুব সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। আমরা ব্যাপক হারে আমদানি চাই না। কারণ, তাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবে।

উল্লেখ্য, জাপান ও ভারতসহ অনেক দেশের মতো কার ও ট্রাক প্রস্তুতের কোনো রকম বড় কারখানা নেই শ্রীলঙ্কায়। সবরকম গাড়ি তারা আমদানি করে। এখন চীনা গাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় ব্যবহৃত গাড়ির দাম অনেক বেড়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আগে যে দাম ছিল, এখন কিছু মডেলের ব্যবহৃত গাড়ির দাম দুই থেকে তিনগুণ। গায়ানা ইন্ডিকা’র মতো মানুষদের জন্য এই বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রভাব অনেক কঠিন। কারণ, তারা বিয়েতে গাড়ি সবরাহ করতেন। গায়ানা ইন্ডিকা একজন পার্টটাইম ক্যাবচালক।  তিনি বলেন, আমি একটি নতুন গাড়ি কিনতে চাই যাতে আমার কাজ করতে পারি। আমার প্রাইভেট ক্যাব ভাড়া দেয়ার কাজটা শুরু করতে পারি। একটি গাড়ি ছাড়া, চলাচল করা ছাড়া আমিতো রাজস্ব হারাচ্ছি। ক্যান্ডি শহরের একজন সফ্‌টওয়্যারের পেশায় যুক্ত শশীকুমার বলেন, দেশে গণপরিবহন নাজুক। এক্ষেত্রে একটি গাড়ি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আমাদের ভালো গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই, দেশের অন্য স্থানগুলোতে সফর করার জন্য একটি গাড়ি অত্যাবশ্যক। হয়তো সরকারকে গাড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, না হয় তাদেরকে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।

নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগের বছরে শ্রীলঙ্কা প্রায় ১৪০ কোটি ডলারের যানবাহন আমদানি করেছিল। এ বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা যানবাহন আমদানির জন্য একশ’ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু এই অর্থ ছাড় দেয়া হবে আস্তে আস্তে।  ভেহিক্যাল ইমপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব শ্রীলঙ্কার আরোশা রড্রিগো বলেন, কমপক্ষে চার দশক ধরে গাড়ির ডিলারশিপ পরিচালনা করেন তিনি ও তার পরিবার। নিষেধাজ্ঞার আগে

মাসে প্রায় ১০০ যানবাহন আমদানি করেছে তার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ার পর তারা একটি গাড়িও আমদানি করতে সক্ষম হননি। তিনি বলেন, যদি এই নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল করা হয়, যদি যাত্রীবাহী গাড়ি  এবং অন্য যানবাহন আমদানি অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে বহু মানুষ এগুলো কিনতে সমর্থ হবেন না। কারণ, ট্যাক্স বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রীলঙ্কান মুদ্রা দুর্বল হয়েছে। সরকার আমদানি করা গাড়ির ওপর এক্সসাইজ ডিউটি বা শুল্ক নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে। ইঞ্জিনের আকারের ওপর নির্ভর করে নতুন এবং সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়িতে এই শুল্ক হার যথাক্রমে শতকরা ২০০ ভাগ এবং ৩০০ ভাগ। অর্থাৎ যদি ধরা হয় একটি নতুন গাড়ির দাম ১০০ ডলার। কিন্তু তাতে শতকরা ২০০ ভাগ শুল্ক আরোপ করায় মূল্য দাঁড়াবে ৩০০ ডলার। এখানেই শেষ নয়। এক্সসাইজ ডিউটির শীর্ষে আছে শতকরা ১৮ ভাগ ভ্যাট। বিদেশ থেকে আনা যেকোনো গাড়ির জন্য এই ভ্যাট প্রযোজ্য। বিশ্বের বড় সব মুদ্রার, যেমন ডলার, বিপরীতে শ্রীলঙ্কার রুপি মারাত্মক দুর্বল। এর ফলে আমদানি করা গাড়ির দামে বড় রকম প্রভাব ফেলবে। এর ফলে আর যশোদার মতো স্কুল শিক্ষকদের মতো মানুষদের গাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়বে। যশোদা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা একটি গাড়ি কেনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু যদি ট্যাক্স এবং মূল্য হিসাব করি, তাহলে একটি গড় মাপের গাড়ির মূল্য ২৫ লাখ রুপি থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৫০ লাখ রুপি হয়েছে। এটা আমাদের জন্য কোনো সুযোগ এনে দেয়নি।

mzamin

Saturday, January 11, 2025

ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করায় শ্রীলঙ্কার এক সন্ন্যাসীর জেল

ইসলামকে অবমাননা করায় রাজনৈতিক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে কারাদণ্ড দিয়েছে শ্রীলঙ্কার আদালত। ধর্মীয় বিদ্বেষ উস্কে দেয়ার অভিযোগে দ্বিতীয়বারের মতো ওই সন্ন্যাসীকে কারাগারে পাঠিয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রটি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ। এতে বলা হয়, সাজাপ্রাপ্ত ওই সন্ন্যাসীর নাম গ্যালাগোডাত্তে জ্ঞানাসরা। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে এর আগে ২০১৬ সালেও একবার কারাগারে গিয়েছিলেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় বারের মতো আদালত তাকে নয় মাসের সাজা দিয়েছে। ২২ মিলিয়ন জনসংখ্যার  দেশটিতে ১০ শতাংশের বেশি মুসলমান। তার বিরুদ্ধে চার বছরের কারাদণ্ডের আপিল করেছিলেন আইনজীবীরা। সেসময় তিনি জামিনে মুক্ত ছিলেন। এই সন্নাসী শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ে রাজাপাকসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ২০২১ সালে ওই সন্ন্যাসীকে ধর্মীয় সম্প্রীতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশটির আইনি সংস্কারের জন্য গঠিত একটি প্যানেলের প্রধান নিযুক্ত করেছিলেন রাজাপাকসে। তখন বিরোধী আইনপ্রণেতা শানাকিয়ান রাসামানিকম জ্ঞানাসরার নিয়োগকে ‘তামাশা’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

২০১৮ সালে, নিখোঁজ কার্টুনিস্টের স্ত্রীকে ভয় দেখানো এবং আদালত অবমাননার অভিযোগে জ্ঞানাসরাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু মাত্র নয় মাস পরেই তাকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনা। ২০২২ সালে দেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে চলা বিক্ষোভের পর তার প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ওই সন্ন্যাসী আবারো ক্ষমতাচ্যুত এবং বিচারের মুখোমুখি হন।

mzamin

Saturday, November 16, 2024

শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিরাট জয় পেলো অনুরার বামপন্থি জোট

শ্রীলঙ্কার আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে দেশটির বামপন্থি  জোট। শুক্রবার শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, দেশটির প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকের ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। পার্লামেন্টের মোট আসনের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটই পেয়েছে অনুরার নেতৃত্বাধীন এই জোট। ২২৫ আসনের মধ্যে ১৫৯ আসনে জয় পেয়েছে এনপিপি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়,  সেপ্টেম্বরে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন অনুরা। কিন্তু তখন পার্লামেন্টে তার নির্বাচনী জোট এনপিপি’র আসন ছিল মাত্র তিনটি। পার্লামেন্টে নিজ জোটের আসন সংখ্যা বাড়াতে তিনি আগাম নির্বাচন দেন। যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলো তার জোট। বিবিসি বলছে, দ্বীপ রাষ্ট্রটির দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতি এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে সার্বিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া অনুরার জন্য বেশ জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যা তিনি আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে নিশ্চিত করলেন। ভোটারদের জীবনযাপনের উচ্চ ব্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করাই এখন অনুরার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে এনপিপি জোট বেশ ভালো অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে তা আগাম অনুমান করেছিলেন বিশ্লেষকরা। তবে তাদের সংশয় ছিল এনপিপি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কিনা। তবে সে সংশয়ও দূর করলেন অনুরা। বৃহস্পতিবার শ্রীলঙ্কায় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়। পার্লামেন্টের আসন সংখ্যা ২২৫। এর মধ্যে ১৯৬ আসনে সরাসরি ভোট হয়। বাকি ২৯টি জাতীয়ভিত্তিক আসন। এগুলো রাজনৈতিক দলগুলো পাবে ১৯৬ আসনে প্রাপ্ত ভোটের হিস্যা অনুযায়ী। এনপিপি জোটের নেতৃত্বে রয়েছে অনুরা কুমারা দিশানায়েকের জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) পার্টি। বৃহস্পতিবার ভোট দেয়ার পর সাংবাদিকদের ৫৫ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কার এই নেতা বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন এই নির্বাচন শ্রীলঙ্কার জন্য গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে। জনগণ তাদেরকেই ম্যান্ডেট দেবে বলেও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

বিরোধীদের জোট নেতা সজিথ প্রেমাদাসাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত করেন দিশানায়েকে। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের সীমাহীন দুর্নীতির ফলে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দ্বীপরাষ্ট্রটি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে দেশটির জনগণ। যার তোপে ২০২২ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যান রাজাপাকসে। এর প্রায় দুই বছর পর সেপ্টেম্বরে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। এতে জয়ী হন বামপন্থি রাজনীতিক অনুরা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। ১৪ই নভেম্বর আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করলো তার জোট এনপিপি। চীনপন্থি সমাজতান্ত্রিক নেতা হিসেবে পরিচিত অনুরা কুমারা দিশানায়েকে।

mzamin


Sunday, October 6, 2024

শ্রীলঙ্কার চীনপন্থি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জয়শঙ্করের যে আলোচনা হলো

রাজধানী কলম্বোতে শ্রীলঙ্কার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। দিশানায়েকে ক্ষমতায় আসার পর এটাই প্রথম কোনো বিদেশি উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তার শ্রীলঙ্কা সফর এবং তার সঙ্গে সাক্ষাৎ। দিশানায়েকে বাম ধারার। তিনি চীনপন্থি। কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং প্রবৃদ্ধিতে ভারতের পূর্ণাঙ্গ সমর্থনের অঙ্গীকার করেছেন এস জয়শঙ্কর। শুক্রবার তাদের মধ্যে এই সাক্ষাৎ হয়। এতে ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ, মৎস্য আহরণ নিয়ে বিদ্যমান বিরোধ, স্থগিত হয়ে থাকা শ্রীলঙ্কার তামিলদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন সহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন জয়শঙ্কর। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে উপযুক্ত সময়ে দিশানায়েকেকে ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন জয়শঙ্কর। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য হিন্দু।

২১শে সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকট ও গণরোষে সরকারের পতনের পর এটাই প্রথম নির্বাচন সেখানে। এতে চীনপন্থি অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার এক পক্ষের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীলঙ্কা সফরে গেলেন। দিশানায়েকের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মধ্যে বিরোধী দলীয় একজন এমপি হিসেবে এ বছর ফেব্রুয়ারিতে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। সেখানে প্রথমবার জয়শঙ্করের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। আর শুক্রবার দ্বিতীয় দফা তাদের বৈঠক হলো। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাতের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি।   

বৈঠকের পর প্রেসিডেন্সিয়াল মিডিয়া ডিভিশন থেকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শ্রীলংকার অর্থনৈতিক পুনর্বাসন, পর্যটন, বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সেবা এবং ডেইরি শিল্পে ভারতের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ড. জয়শঙ্কর। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা দেবে ভারতের বিশাল বাজার। এ সময় প্রায় ৪০০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে প্রশঙ্কা করেন প্রেসিডেন্ট দিশানায়েকে। তার সঙ্গে বৈঠকের পর জয়শঙ্কর ভারত সমর্থিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিচালন, জ্বালানি ও এলএনজি সরবরাহ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌর বিদ্যুতায়ন, সরকারি অবকাঠামোকে ডিজিটাল করা, স্বাস্থ্য ও ডেইরি প্রকল্পের কথা জোর দিয়ে তুলে ধরেন জয়শঙ্কর।
কিন্তু কোনো পক্ষই শ্রীলঙ্কার নর্দার্ন প্রদেশে বিতর্কিত আদানি পাওয়ার প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেনি। স্থানীয় জনতা ও পরিবেশবাদীদের ঘোর বিরোধিতায় আদালতের রায়ে এই প্রকল্পটি বর্তমানে বাধাগ্রস্ত।

mzamin

Tuesday, September 24, 2024

কে এই অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে!

শ্রীলঙ্কার এ যাবৎকালের ইতিহাস পাল্টে ফেললেন চীনপন্থি অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। তিনি ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাত্র শতকরা ৩ ভাগ ভোট পেয়েছিলেন। সেই দিশানায়েকেই এবার দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। বিষয়টি বাইরের দেশগুলোর লোকজনকে চমকে দিলেও শ্রীলঙ্কানরা বিস্মিত হননি। কারণ, দিশানায়েকে ঋণের ফাঁদে জর্জরিত দেশটিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। গরিববান্ধব নীতি গ্রহণ করেছেন। ফলে ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয়। ওই সময়ের সরকার প্রধান পালিয়ে যান। তারপর শনিবারই প্রথম সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। এতে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিথ প্রেমাদাসাকে পরাজিত করে বিজয়ী হন ৫৫ বছর বয়সী অনূঢ়া কুমারা প্রেমাদাসা। অন্তর্বর্তী সময়ের প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে চলে যান তিন নম্বরে। ২০১৯ সালের তুলনায় বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন দিশানায়েকে। তাকে এখন এমন একটি সরকারের ক্ষমতা উত্তরাধিকারী হিসেবে হাতে নিতে হবে, যা সংকটের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার লড়াই করছে।

অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের জন্ম ১৯৬৮ সালে গালেওয়েলাতে ২৪শে নভেম্বর। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হন। সরকারি স্কুলে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানে আছে তার ডিগ্রি। ১৯৮৭ সালে যখন ইন্দো-শ্রীলঙ্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় প্রায় সে সময়ে তিনি ছাত্র হিসেবে প্রথম রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত জনতা বিমুক্ত পেরামুনা (জেভিপি) মার্কসবাদী রাজনৈতিক দলটি শ্রীলঙ্কা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। এই দলের সঙ্গে পরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে দিশানায়েকের। গ্রামীণ নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ থেকে এই বিদ্রোহের প্রচারণা শুরু হয়। এর ফলে রাজনৈতিক বিরোধী এবং নাগরিক উভয়ের বিরুদ্ধে তল্লাশি, হত্যা ও হামলা শুরু হয়। এতে হাজারো মানুষ প্রাণ হারান। ১৯৯৭ সালে জেভিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন দিশানায়েকে। ২০০৮ সালে এ দলের নেতা নির্বাচিত হন তিনি। তখন থেকেই তিনি তার দলের কথিত ‘সন্ত্রাসের সময়ের’ বিষয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। ২০১৪ সালে বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওই সশস্ত্র লড়াইয়ে ব্যাপক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটা উচিত ছিল না। আমাদের হাতে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার জন্য এখনো আমরা হতাশ। হতাশা প্রকাশ করি। এর জন্য আমরা সবসময় গভীর বেদনা ও শোক প্রকাশ করি। উল্লেখ্য, দিশানায়েকে বর্তমানে এনপিপি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এতে তার দল জেভিপি’র আছে মাত্র তিনটি আসন।  এবার নির্বাচনী প্রচারণার সময় দিশানায়েকে শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসের আরেকটি সহিংসতাকে সামনে আনেন। তাহলো ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে বোমা হামলা। ওই বছর ২১শে এপ্রিল রাজধানী কলম্বোতে কতোগুলো চার্চে এবং আন্তর্জাতিক হোটেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কমপক্ষে ২৯০ জন নিহত হন। আহত হন কয়েক শত মানুষ। এটা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা ছিল। কীভাবে এই হামলা হয়েছিল এবং নিরাপত্তার ব্যর্থতা নিয়ে তদন্তের জবাব ৫ বছর পরেও মেলেনি। তদন্তে বাধা দেয়ার জন্য অনেকে সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসের সরকারকে দায়ী করেছেন। সম্প্রতি বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে দিশানায়েকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, নির্বাচিত হলে এই তদন্ত তিনি করাবেন। কর্তৃপক্ষ এটা করানো এড়িয়ে গেছে। কারণ, এতে তাদের নিজেদের দায় প্রকাশিত হয়ে পড়ার ভীতি ছিল তাদের মধ্যে। তিনি আরও বলেন, শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অভিজাতদের কাছ থেকে এটা ছিল অন্যতম অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিকরা দুর্নীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেরাই দুর্নীতিতে যুক্ত হয়েছেন। শ্রীলঙ্কাকে ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ঋণের বোঝা আরও বেড়ে পরিাস্থিতির অবনতি হয়েছে। যারা আইনকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারাই আইন ভেঙেছেন। এ জন্যই এ দেশের মানুষ ভিন্ন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে। আমরাই সেই দল, যারা এসব সেবা দিতে পারবো।
শনিবার শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। এর আগেই শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে উঠে আসেন দিশানায়েকে। দেশ জুড়ে তীব্র অসন্তোষ থাকার ভেতর দিয়ে তিনি নিজেকে পরিবর্তনের জন্য একজন প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়ার কারণে ২০২২ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপাকসে সহ তার সরকারের কর্মকর্তারা। এর আগে বছরের পর বছর ট্যাক্সনীতি, দুর্বল রপ্তানি, পলিসিগত বড় ভুলের সঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারি মিলিত হয়ে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শুকিয়ে ফেলে। সরকারি ঋণের পরিমাণ কমপক্ষে ৮৩০০ কোটি ডলারের বেশি হয়। মুদ্রাস্ফীতি শতকরা ৭০ ভাগের উপরে উঠে যায়। এর জন্য রাজাপাকসে ও তার সরকারকে দায়ী করা হয়। যদিও তার উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করেন, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনেন। শক্তিশালী করেন শ্রীলঙ্কান রুপি। ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট ও তার প্রেক্ষিতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাতে দেশে ভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবি উঠতে থাকে। সেই দাবি পূরণে এগিয়ে আসেন দিশানায়েকে। তিনি বার বার বলেন, ক্ষমতায় এসে পার্লামেন্ট ভেঙে দেবেন। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, নির্বাচিত হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে তিনি এটা করতে চান। দিশানায়েকে যেসব নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বৃহত্তর কল্যাণমূলক স্কিম এবং ট্যাক্স কমানো।

mzamin

শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে যত চ্যালেঞ্জ

শ্রীলঙ্কার প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজ সোমবার শপথ নিয়েছেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। শপথ নিয়ে রাজনীতিকদের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছেন তিনি। দেশে গণতন্ত্র সুরক্ষা ও সংহত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। অনূঢ়া বলেছেন, ‘আমাদের রাজনীতি হতে হবে স্বচ্ছ। মানুষ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন চায়। সেই আকঙ্ক্ষা পূরণ করতে চাই।’

ঋণে জর্জরিত দ্বীপরাষ্ট্রটির নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য কাজটি সহজ হবে না। সরকার পরিচালনায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে তাঁকে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে টেনে তুলতে হলে অনূঢ়া যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা করা হলো।

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের চরম সংকট দেখা দেয়। এতে কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ে দেশটির অর্থনীতি। এর পর থেকে কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সেই সংকট কিছুটা কাটলেও সংকট থেকে উত্তরণে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে নতুন প্রেসিডেন্টকে।

রিজার্ভ–সংকটে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। অবশ্য চলতি বছর তা কমে দশমিক ৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে। কিন্তু ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতির আকার কমেছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। গত বছর সেই হার অবশ্য কমে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে।

অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানোই হবে অনূঢ়া কুমারার প্রধান চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ফেরাতে হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে দেশটির দুই কোটির বেশি দরিদ্র্য মানুষের জীবনমানের উন্নতি হবে আরেকটি চ্যালেঞ্জ।

বৈদেশিক ঋণের বোঝা

গত বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ২৯০ কোটি ডলারের ঋণ পায় শ্রীলঙ্কা। এই ঋণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেমন বেড়েছে, তেমনি মুদ্রার মান কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা গেছে। এদিকে ঋণ পুনর্গঠন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত জুনে চীনসহ অন্য ঋণদাতা দেশগুলোর সঙ্গে এক হাজার কোটি ডলারের ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে চুক্তি করেছে কলম্বো। এ ছাড়া গত সপ্তাহে ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক বন্ড পুনর্গঠন নিয়েও একটি খসড়া চুক্তি হয়েছে। আইএমএফের দেওয়া শর্ত পূরণ করতে হলে ঋণ পুনর্গঠন করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক ঋণের যে বিশাল বোঝা, তা কমানোর দায়িত্ব থাকবে নতুন প্রেসিডেন্টের।
জনগণের ওপর করের বোঝা

আইএমএফের ঋণের কারণে কর বাড়ানোসহ নানা পদক্ষেপের কারণে দেশটির অনেক মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। এই করের বোঝা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অনূঢ়া। কিন্তু তাঁর জন্য কাজটা হবে খুব কঠিন। কেননা, শ্রীলঙ্কার ২২৫ সদস্যের পার্লামেন্টে মাত্র তিনটি আসন আছে অনূঢ়ার দলের। এই পার্লামেন্টের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে হবে তাঁকে।

অনূঢ়া কুমারা অবশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শপথ নেওয়ার দেড় মাসের মধ্যে পার্লামেন্টে বিলুপ্ত করে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেবেন। নতুন পার্লামেন্টের ওপর নির্ভর করবে তাঁর সরকার নীতি প্রণয়নে কতটা সফল হবে।

অনূঢ়া কুমারা জানিয়েছেন, ঋণ ও এর শর্ত পুনরায় বিবেচনার জন্য আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। পাশাপাশি কর কমানোর বিষয়টি নিয়েও কথা বলবেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খাদ্যসামগ্রীর মতো কিছু বিষয়ে মূল্য সংযোজন কর কমাবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
চাকরি ও জনকল্যাণ

ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোকে আরও লাভজনক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অনূঢ়া কুমারা। জানিয়েছেন, শিক্ষা খাতে নতুন করে ২০ হাজার চাকরির ব্যবস্থা করবেন। পাশাপাশি পর্যটনের মতো দেশটির অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোতে আরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। একই সঙ্গে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন সরকারি সেবার আওতা ও পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

অর্থায়নে ভুল পদক্ষেপ, লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের সংকটের কারণে অনূঢ়া কুমারা শিগগিরই এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না বলে মত অর্থনীতিবিদদের।

ভূরাজনীতি

শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভূরাজনীতি। বিশেষ করে ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপে থাকতে হবে তাঁকে। কারণ, শ্রীলঙ্কাকে সবচেয়ে বেশি ঋণ দেওয়া দেশ দুটি হলো ভারত ও চীন। এ ছাড়া ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির ওপর দুই দেশই প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তাই প্রতিবেশী এই দুই দেশের সঙ্গেই ভারসাম্যের নীতিতে চলতে হবে শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টকে।

শ্রীলঙ্কার যে ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে, তার বেশির ভাগই জাপান, ভারত ও চীনের দেওয়া। অনূঢ়া কুমারা অবশ্য জানিয়েছেন, এসব দেশের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক অব্যাহত রেখে প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক মিত্রতার সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চান তিনি।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজ সোমবার শপথ নিয়েছেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজ সোমবার শপথ নিয়েছেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকেছবি: এপি