Monday, April 13, 2026
রুশ দার্শনিকতা by অনীলা শহজাদ
রুশ দার্শনিকতা by অনীলা শহজাদ
পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আসে কঠোর মার্ক্সবাদ, সমাজতন্ত্র, সমতাবাদ, এবং লেনিন ও ট্রটস্কির বিপ্লবী চিন্তা। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, রাশিয়াকে তার রাজনৈতিক দর্শন পুনর্গঠনের পাশাপাশি নতুন এক একমেরু বিশ্বে নিজের পরিচয় খুঁজে নিতে হয়।
সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ের গোয়েন্দা প্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভগেনি প্রিমাকভ একমেরুতার বিপরীতে বহুমেরুতার পক্ষে যুক্তি দেন- সেই সময় যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের একমাত্র আধিপত্যশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছিল।
প্রিমাকভ মতবাদ বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্ব অস্থিতিশীল ও অন্যায্য; শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, মূলত অসম্ভব। তিনি রাশিয়া, চীন ও ভারতের মধ্যে একটি ‘কৌশলগত ত্রিভুজ’-এর স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে ভারসাম্যে রাখবে এবং ইউরেশিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। প্রিমাকভ স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ (সিআইএস) অঞ্চলকে রাশিয়ার কৌশলগত বলয় হিসেবে দেখতেন এবং পশ্চিমা হস্তক্ষেপবাদে দৃঢ়ভাবে আপত্তি করতেন। বিধ্বস্ত সোভিয়েত পরবর্তী বাস্তবতায় তিনি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার এবং বাস্তববাদী সহযোগিতা ও অনাক্রমণনীতিতে নির্ভর করার শিক্ষা নেন।
তার পরের প্রজন্মে আসেন আধুনিক রুশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার দুগিন, যাকে অনেকেই ‘পুতিনের মস্তিষ্ক’ বলে উল্লেখ করেন। দুগিন প্রিমাকভের বহুমেরুতার ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি রুশনেতৃত্বাধীন ইউরেশীয় সভ্যতার ধারণা দেন, যা পশ্চিমা আটলান্টিকতাবাদের বিপরীতে দাঁড়ায়। তার মতে, রাশিয়া ‘প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বহুমেরুতার’ ধারণার নেতৃত্ব দিচ্ছে- যেখানে ব্রিকস, এসসিও ও স্পিফ-এর মতো কাঠামো পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প হয়ে উঠেছে। দর্শনগতভাবে তিনি পশ্চিমা উদারনীতির ‘সর্বজনীনতার’ ধারণার পরিবর্তে ‘সভ্যতাগত বহুত্ববাদ’ স্থাপন করেন, যা প্রতিটি জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বীকার করে।
দুগিন পশ্চিমের পতন সম্পর্কেও এক থিসিস উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমের ‘অতিরিক্ত ব্যক্তিবাদ’ই তার ধ্বংসের কারণ। প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন ও নামমাত্রবাদী দর্শন, যা সার্বজনীন সত্যের পরিবর্তে কেবল ব্যক্তিগত বাস্তবতায় বিশ্বাস করেছিল, পশ্চিমকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পথে ঠেলে দেয়। ফলস্বরূপ একে একে সমষ্টিগত কাঠামোগুলি- ক্যাথলিক চার্চ, সাম্রাজ্য, জাতিরাষ্ট্র এবং পরিবার- অগ্রাহ্য হতে থাকে। উদারনীতি হয়ে ওঠে ‘সমস্ত সমষ্টিগত পরিচয় ও কর্তৃত্ব থেকে মুক্তির আন্দোলন’। ব্যক্তির সুখ, আনন্দ ও তৃপ্তিই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য। আর এই ব্যক্তির পূজাই, দুগিনের মতে, পশ্চিমা সভ্যতার আত্মবিনাশ ডেকে এনেছে।
এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার আগুন এখনো থামেনি। এর বিবর্তনে পশ্চিম এগিয়েছে খ্রিস্টধর্ম থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্রাজ্য থেকে জাতিরাষ্ট্র, জাতিরাষ্ট্র থেকে বৈশ্বিক নাগরিক সমাজ, এবং পরিবার থেকে যৌন ও লিঙ্গ স্বাতন্ত্র্যবাদে। কিন্তু এই আগুন থামতে চায় না। আগে এটি সব সমষ্টিগত বা অতীন্দ্রিয় পরিচয় থেকে মুক্তি চেয়েছিল; এখন এটি ‘লিঙ্গ’ পরিচয় থেকেও মুক্তি চাইছে।
দুগিন বলেন, পুরুষ/নারী ঐতিহ্যবাহী পরিচয় বিলুপ্ত করার পর, এই উন্মাদনা পরবর্তী ধাপে ‘মানব পরিচয়’-কেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে- মানুষ হওয়া কি প্রয়োজন? এই ‘ট্রান্সহিউম্যানিজম’ ব্যক্তিকে মানবতার ধারণা থেকে মুক্তি দেবে, আর ‘পোস্টহিউম্যানিজম’ হবে এমন এক যুগ, যেখানে মানুষ তার সার্বজনীনতাকে হারিয়ে ফেলবে এবং ‘বাস্তবতা’ থেকেও মুক্তি চাইবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ভার্চুয়াল বাস্তবতার আগমনের সঙ্গে এই মুক্তি আরও গভীর হবে- যেখানে মানুষ কোনো বাস্তব জগতেই আর বাঁচতে চাইবে না। দুগিন বলেন, এটি হবে মানব সভ্যতার শেষ ধাপ- ‘মানুষ হতে চাও বা না চাও- এই স্বাধীনতাই হবে উদারনীতির চূড়ান্ত পরিণতি।’
তিনি যুক্তি দেন, প্রাচীন উদারনীতি যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও যুক্তিনির্ভর ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে ছিল, সেখানে আধুনিক উদারনীতি- অর্থাৎ ‘ওয়োক প্রগ্রেসিভিজম’- সংখ্যালঘুর শাসন প্রতিষ্ঠা করছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর, যাকে এখন ‘পপুলিজম’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ বলে অপমান করা হয়। ফলে গণতন্ত্রের মূল আদর্শটাই উল্টে যাচ্ছে- যে সাধারণ মানুষের ভোটই স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই আজ প্রত্যাখ্যাত। ওয়োক সংস্কৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠের ঐকমত্যকে অবজ্ঞা করে নিজেই হয়ে উঠেছে নতুন এক ‘বুদ্ধিবাদী স্বৈরতন্ত্র’।
দুগিন বলেন, মানবজাতি এখন ব্যক্তিস্বাধীনতার ৫০০ বছরের যাত্রার ‘শেষ স্টেশনে’ পৌঁছেছে। এআই, সাইবারনেটিক উন্নয়ন, ডিজিটাল চেতনা- সবই মানুষকে মানব পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। এই পোস্টহিউম্যান ফিউচারিজম কোনো কল্পনা নয়, বরং এক রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রকল্প, যেখানে প্রগতিশীলতা কেবল পছন্দ নয়, বরং বাধ্যতামূলক।
পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা তাদের ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যেই লিখে ফেলেছেন- ‘এবং সেটি অন্ধকার।’
এখন প্রশ্ন হলো- পশ্চিমের সাধারণ মানুষ কি এই সমস্যাকে বুঝছে? তারা কি উপলব্ধি করছে যে তাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরের এই ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ কোনো রাজনৈতিক চাল নয়, বরং এক অস্তিত্বের যুদ্ধ- মানবতা টিকবে না বিলীন হবে তার লড়াই? এই আত্ম-অগ্নিসংযোগ, পরিচয়ের সন্ধানে পরিচয় হারানোর যাত্রা, শেষমেশ প্রত্যেক মানুষকে এক নিঃসঙ্গ, আত্মমগ্ন শূন্যতায় ঠেলে দেবে- যার তিক্ততা হয়তো তাকে ধ্বংস করবে, নয়তো ফিরিয়ে আনবে বিশুদ্ধ সম্পর্ক, বিশুদ্ধ নীতি ও বিশুদ্ধ মানবতা।
দুগিন মনে করেন, পশ্চিমের পুতিনবিদ্বেষের মূল কারণও এখানেই- পুতিনের প্রগতিশীল ও গ্লোবালিস্ট চিন্তা থেকে সরে গিয়ে তিনি ঐতিহ্য, খ্রিস্টান বিশ্বাস এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো পরিচয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। আধুনিক রাশিয়ান রাজনীতি পরিবার, দেশপ্রেম ও সভ্যতাগত স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়।
আজকের যুদ্ধ আর পুঁজিবাদ বনাম সাম্যবাদের নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষাকারী ঐতিহ্যবাদ বনাম মানব বিলুপ্তির প্রগতিবাদ। এই যুদ্ধ একসঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক সব ক্ষেত্রেই চলছে। আর মানবজাতির সামনে প্রশ্ন হলো- নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের কতটুকু আমরা ‘পরীক্ষার’ নামে ত্যাগ করতে পারি? ব্যক্তিস্বাধীনতা কি এতদূর যেতে পারে যে, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যার সব সীমারেখাই মুছে যায়? নাকি যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রোগ ও ক্ষুধায় ভরা এই বিশৃঙ্খল মানবসমাজ এখনো কিছুটা হলেও টিকে আছে- তার নিজের সামান্য, ত্রুটিপূর্ণ সততা, বিশ্বাস ও শৃঙ্খলার ওপর?
(অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন থেকে অনুবাদ)
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1595)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment