Showing posts with label রাজধানী. Show all posts
Showing posts with label রাজধানী. Show all posts

Monday, July 20, 2026

ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় রাজপথ, দুর্গন্ধে আটকে যায় নিঃশ্বাস by মাহমুদা ডলি

ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে ঢাকা মহানগর। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিকদের দায়িত্বহীনতা এবং দুই সিটি করপোরেশনের তদারকির ঘাটতিতে নগরজীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। খোলা ট্রাকে বর্জ্য পরিবহনের সময় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে আবর্জনা। এতে একদিকে যেমন দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

এর মধ্যে দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, ড্রেন ও খানাখন্দে জমে থাকা পানি ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে মিশে পুরো নগরকে আরো নোংরা ও দুর্গন্ধময় করে তুলেছে। কোথাও হাঁটার জায়গা নেই, কোথাও আবার তীব্র দুর্গন্ধে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

একদিকে টানা বৃষ্টি, অন্যদিকে ফুটপাতজুড়ে মলমূত্র, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ এবং জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ চরমে। শুধু পথচারী নন, রিকশা, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীরাও সমান ভোগান্তিতে পড়ছেন। খোলা ম্যানহোল জলাবদ্ধ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় প্রায়ই রিকশার চাকা আটকে যাচ্ছে। আবার বাস, ট্রাক, পিকআপ বা সিএনজি দ্রুতগতিতে চলাচলের সময় নোংরা পানি ছিটকে পথচারী ও যাত্রীদের গায়ে পড়ছে। এমন চিত্র রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটিতেই।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বছরের পর বছর ধরে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে মগবাজার ওয়্যারলেস গেট, মালিবাগ চৌরাস্তা, শান্তিনগরের বিভিন্ন অংশ, মালিবাগ রেলগেট থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইন এলাকা এবং কারওয়ান বাজার ও তার আশপাশ।

রেললাইন এখন বর্জ্যের ভাগাড়

সরেজমিনে দেখা যায়, কমলাপুর স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তা, টিটিপাড়া থেকে আর কে মিশন রোড পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে জমে আছে বর্জ্যের স্তূপ। দীর্ঘদিন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

এদিকে মালিবাগ রেলগেট থেকে কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পাশে পশু জবাইয়ের বর্জ্য, পশুর মাথা, কান ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব থেকেও ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভাসমান মানুষের বসতি এবং হকারদের দখলের কারণে নাজেহাল অবস্থা। মালিবাগ রেলগেট থেকে শুরু করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ মানিকনগর বিশ্বরোডের পুরোটা ময়লা-আর্বজনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি ও আশপাশের বাজারের বর্জ্য বছরের পর বছর রেললাইনের পাশে ফেলতে ফেলতে ছোট-বড় অসংখ্য ময়লার ভাগাড় তৈরি হয়েছে। ফুটপাতজুড়ে মলমূত্র, অন্যদিকে হকারদের দখল—পথচারীদের চলাচলের সুযোগই প্রায় নেই। খোলা জায়গায় জমে থাকা এসব বর্জ্য থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

মালিবাগ-শান্তিনগরেও একই চিত্র

মালিবাগ-শান্তিনগর মোড়ে রিকশার জন্য অপেক্ষমাণ এক কর্মজীবী নারী মুখে ওড়না চেপে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, চারপাশের ময়লা নোংরা দুর্গন্ধ আমি পাই আপনি পান না?

মালিবাগ চৌরাস্তার ফুটপাত, আইল্যান্ড ও ওভারব্রিজের নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বর্জ্য। মালিবাগ পাবলিক টয়লেটের সামনের পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। চামেলিবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও মৌচাকমুখী সড়কের দুই পাশজুড়েও একই অবস্থা। ফ্লাইওভারের নিচে টোকাই ও ভাঙারি ব্যবসায়ীদের দখলে তৈরি হয়েছে ময়লার স্তূপ।

রাজধানীর ভেতরে ও তার আশপাশের এলাকাতেও একই যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে বাতাসে ধুলাবালুর সঙ্গে উড়তে থাকে পলিথিনসহ ময়লা-আবর্জনা। যত্রতত্র বর্জ্যের স্তূপে চাপা পড়ে যাচ্ছে রাস্তার অর্ধেক অংশ। ফুটপাতের অধিকাংশই প্রস্রাবের কারণে হাঁটার অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপরও।

দক্ষিণ ঢাকায়ও ভয়াবহ অবস্থা

দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ডেমরা সড়কের কাজলারপাড় থেকে কোনাপাড়া পর্যন্ত ওয়াসার ড্রেন বর্জ্যে ভরে গেছে। টানা বৃষ্টিতে তা এখন খালের রূপ নিয়েছে। সায়েদাবাদ, ধলপুর, টিকাটুলি, গুলিস্তান, নাজিরাবাজার, শাখারীবাজার, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, জুরাইন ও দোলাইরপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র। বহু এলাকায় বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা ও বর্জ্যের কারণে দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

উত্তর ঢাকায়ও সংকট

উত্তর সিটির মেরাদিয়া থেকে রামপুরা পর্যন্ত কয়েকটি এসটিএস থাকলেও অনেক জায়গায় খোলা জায়গায় ভেজা ও শুকনা বর্জ্য আলাদা করার সময় ময়লা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে।

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা পরিমল বাবু প্রতিদিন মালিবাগ হয়ে কারওয়ান বাজারে অফিসে যান। তিনি বলেন, মালিবাগ রেলগেট এলাকায় রাস্তার ওপর পর্যন্ত ময়লা ছড়িয়ে আছে। তার ওপর উন্নয়ন কাজের জন্য বড় বড় গর্তে বৃষ্টির পানি জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে মিরপুর, শেওড়াপাড়া, উত্তরা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও বনানী এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় বাসাবাড়ি ও রেস্টুরেন্টের সামনেই বর্জ্য ফেলে রাখা হচ্ছে।

গত ১০ জুলাই মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ায় জলাবদ্ধতা পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম ড্রেনেজ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং দোকানদারদের যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানান। পরে মিরপুর-১২-এর ৬ নম্বর কাঁচাবাজার পরিদর্শন করে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি এবং দোকানদার, বাজার কমিটি ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে দ্রুত সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেন।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয়, তবুও নেই সমাধান

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, রাজধানীর ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ছয় হাজার ৮০০ থেকে সাড়ে সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর ৫৫ শতাংশই যথাযথভাবে সংগ্রহ করা যায় না।

জানা গেছে, গত সাত বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করেছে প্রায় তিন হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। তবু শহরজুড়ে রয়ে গেছে ২৫০টিরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত ভাগাড়। ফলে বিপুল বর্জ্য খাল, নদী ও উন্মুক্ত স্থানে জমে থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চারটি ধাপ রয়েছে— বাড়ি থেকে প্রাথমিক সংগ্রহ, এসটিএসে জমা, ট্রাকে করে ল্যান্ডফিলে পরিবহন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। কিন্তু এর প্রতিটি ধাপেই দুর্বলতা রয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ ধাপ অর্থাৎ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যত নেই। ফলে অধিকাংশ বর্জ্য শেষ পর্যন্ত খোলা জায়গায় ফেলা হয়।

কারওয়ান বাজারে কার্যত নেই নিয়ন্ত্রণ

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বাজারের ভেতরের ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দখল, অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্যের কারণে কোথাও কোথাও ছয় ফুটে নেমে এসেছে। কিচেন মার্কেটের সামনে মুরগি জবাই ও সবজির বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলায় পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে যায়।

ফুটপাত দখল, উন্মুক্ত ড্রেন, বর্জ্যের স্তূপ, জলাবদ্ধতা ও যানজট—সব মিলিয়ে কারওয়ান বাজারে নগরবাসীর দুর্ভোগ নিত্যদিনের ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পণ্য খালাসের পর ব্যবসায়ীরা যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে রেখে যান। নিয়ম অনুযায়ী কনটেইনারে ফেলার কথা থাকলেও তা মানা হয় না। ফলে পুরো বাজারই আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়।

বর্জ্য থেকে পলিথিন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহকারী সালাম মিয়া বলেন, পুরো বাজারের ময়লা এখানে ফেলা হয়। সিটি করপোরেশনের গাড়ি মাঝে মাঝে কিছু নিয়ে গেলেও অধিকাংশই পড়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞের মত

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এমনিতেই দুর্বল। এর সঙ্গে যদি সময়মতো এলাকা থেকে বর্জ্য অপসারণ না করা হয়, তাহলে রাস্তাজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হবে। সেখান থেকে মশা-মাছিসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়বে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনকে আরো কঠোর হতে হবে।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার আমার দেশকে বলেন, রেললাইন ও রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনা রেলওয়ের নিজস্ব সম্পত্তি। সেসব এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য তাদের নিজস্ব জনবল রয়েছে। তবে নগরীর অন্যান্য এলাকায় টেকসই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নতুন জনবল নিয়োগ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া স্মার্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন।

তিনি আরো বলেন, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কোথাও অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো, কোনো বর্জ্য যেন ২৪ ঘণ্টার বেশি খোলা জায়গায় পড়ে না থাকে।

ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় রাজপথ, দুর্গন্ধে আটকে যায় নিঃশ্বাস
রাজধানীতে ময়লা অপসারণের অব্যবস্থাপনায় ভুক্তভোগী নগরবাসী। শুক্রবার ফকিরাপুলের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম রোড থেকে তোলা। ছবি: জসীম উদ্দীন

Friday, April 10, 2026

নগরে নতুন রেস্তোরাঁ নোঙ্গর, গেছেন কি

মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর থেকে আরও জমজমাট মিরপুর এলাকা। বিপণিবিতান ছাড়াও চালু হয়েছে নানা রকম রেস্তোরাঁ। তেমনই একটি নতুন রেস্তোরাঁ ‘নোঙ্গর’। ঘুরে এসে লিখেছেন হুমায়রা মাহজাবিন

ঢাকা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা মিরপুর–১২–তে একটু সামুদ্রিক আবহ নিয়ে হাজির হয়েছে নোঙ্গর। বন্ধু বা পরিবার–পরিজন নিয়ে খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি ছবি তোলা কিংবা নিরিবিলি বসে আড্ডা দেওয়ার চমৎকার একটি জায়গা। ‘নোঙ্গর’ শব্দটি শুনলেই মনে হয় সমুদ্র বা গভীর নদীর কথা। তাই হয়তো সামুদ্রিক আবহকে মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে নোঙ্গর। বিশাল জলরাশির বুকে দুলতে থাকা জাহাজ যেমন শেষমেশ নোঙর ফেলে শান্ত হয়, তেমনি নোঙ্গর রেস্তোরাঁটিও যেন ব্যস্ত নাগরিকদের কিছুটা সময়ের জন্য গেড়ে বসার জায়গা।

যেন জাহাজের ডেক

২০২৫ সালে উদ্বোধনের পর থেকে রেস্তোরাঁটি নিয়ে ফেসবুকে অনেক ভিডিও চোখে পড়েছে। সেসব থেকে একটা ধারণা মিললেও রেস্তোরাঁটিতে যাওয়ার পর আরও অভিনব মনে হয়েছে। পল্লবী মেট্রোস্টেশনের কাছেই একটি ভবনের ছাদে প্রায় ছয় হাজার বর্গফুট জায়গাকে নোঙ্গর হিসেবে গড়ে তুলেছেন স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার রাজাউল করিম। রেস্তোরাঁর প্রতিটি অংশকে সাজিয়েছেন ছবি তোলার উপযোগী করে। রেস্তোরাঁর যেদিকেই দাঁড়ান কিংবা বসেন, ছবি হবে ‘ফাটাফাটি’।

নোঙ্গরের জেনারেল ম্যানেজার মহিউদ্দীন ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সমুদ্রের সজীবতাকে প্রাধান্য দিয়ে নোঙ্গরকে সাজানো হয়েছে। তাই রোদ, বৃষ্টি—সবকিছু উপভোগের ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। এ ছাড়া রেস্তোরাঁর সজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে প্রচুর গাছ।

মার্বেল পাথরের সিঁড়ি আমাদের পৌঁছে দেয় ভবনের একদম ওপরে, যেখান থেকে ব্যস্ত শহরের পাশাপাশি মেট্রোরেল চলাচলের দৃশ্য সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়। নুড়িপাথর আর সবুজ কার্পেটের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছ।

রুফটপ রেস্তোরাঁটিকে দুই অংশে ভাগ করে সাজানো হয়েছে। এক পাশে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, অন্য পাশ পুরোপুরি খোলা। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অংশে পায়ের নিচে কাঠের মেঝে দেখে মনে হতেই পারে কোনো জাহাজের ডেক। এই কক্ষের সাজসজ্জা অবশ্য সেই চিন্তায় কিছুটা পরিবর্তন আনবে। উঁচু সিলিংয়ের নিচে প্রতিটি পাশে একেক ধরনের জিনিস। জাহাজের কলকবজা দিয়ে সাজানো একদিকের দেয়াল। কলকবজার সঙ্গে সময়ের মেলবন্ধন ঘটাতে রাখা হয়েছে বড় একটি ঘড়ি। আরেক পাশের দেয়ালে একটি এলইডি স্ক্রিনে নারকেলগাছের সারি। সমুদ্রতীরের আবহ আনতেই এমন দৃশ্যের আয়োজন। অন্দরসজ্জাকে আরও মনোমুগ্ধকর করতে বিভিন্ন ফুলের গাছ ও লাইটের ব্যবহার চোখে পড়ে।

খোলা অংশ

আকাশের নিচের খোলা অংশটিকে বলা যায় রুফটপ রেস্তোরাঁটির মূল আকর্ষণ। এখানে প্রবেশ করলেই প্রথমে চোখে পড়ে একটি পানির ফোয়ারা। সন্ধ্যার আগে আগে ফোয়ারাটি চালু করা হয়, বাহারি আলোর সঙ্গে মিশে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ। ফোয়ারাকে ঘিরে মার্বেল পাথরের সিঁড়ি। সিঁড়িগুলোকে যেন আঁকড়ে ধরে আছে আয়না। সিঁড়ি ও আয়না দিয়ে তৈরি কাঠামোটি যেন ফোয়ারাটিকে আগলে রেখেছে। সন্ধ্যার পর খেতে আসা অতিথিরা সিঁড়ি ও আয়নাকে কেন্দ্র করে ছবি তোলায় ব্যস্ত।

ফোয়ারার কাঠামোতে ইংরেজিতে লেখা ‘Water’, ‘Rain’, ‘Mud’, ‘Stone’, ‘Air’, ‘Cloud’, ‘Soil’, ‘Nongor’, ‘Clay’, ‘Life’, ‘Earth’, ‘Fountain’, ‘Tree’, ‘Grass’, ‘Sky’, ‘Plant’  ইত্যাদি শব্দ। প্রতিটি শব্দই প্রকৃতির একেকটি উপাদান, যার সঙ্গে আছে নোঙ্গর। ছাদের এক প্রান্তে সাগরপাড়ের ছাতাসমেত বসার জায়গার আদলে বসার ব্যবস্থা। নুড়ি বিছানো পথ যেন সমুদ্রের তীরে পৌঁছে দিচ্ছে। ছাতার নিচে এমন খোলা জায়গায় বসেও এক বেলা কাটিয়ে দেওয়া যায়।

রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতি শুক্র ও শনিবার এখানে বিশেষ আয়োজন থাকে। খেতে খেতে উপভোগ করা যায় লাইভ মিউজিক। আয়োজনটির জন্য রেস্তোরাঁর সামনের দিকেই আছে একটি মঞ্চ। যার ওপরে রাখা নোঙর বুঝিয়ে দেয় আপনি এখন কোথায় আছেন। মঞ্চের পাশে সাবেকি ঘরানার গাড়ি আর বাগানবিলাস ফুলের মিতালি তৈরি করেছে পুরোনো দিনের আবহ। দর্শনার্থীদের অনেকেই সে আবহ নিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত।

অন্দরসজ্জা নিয়ে তো অনেক কথাই হলো, এবার খাবারের মেনুটা একটু জানা যাক। এখানে একাধিকবার খেতে আসা অতিথিদের কাছ থেকে জানা গেল, খাবারও ভালো। খাবার ভালো বলার কারণ হলো, ঊর্ধ্বগতির বাজারে মোটামুটি সাশ্রয়ী মূল্যেই উপভোগ করা যাবে থাই, ইন্ডিয়ান বা কন্টিনেন্টাল খাবার। যেহেতু সমুদ্রকে মাথায় রেখে নোঙ্গরের যাত্রা, তাই মেনুর বড় অংশজুড়ে আছে সামুদ্রিক খাবারের পদ।

রেস্তোরাঁটির খোলা অংশে দিনের বেলা রোদ, আলো-বাতাস নিয়ে একধরনের আবহ থাকে, রাতের বেলা আবার কৃত্রিম আলোকসজ্জায় তৈরি হয় ভিন্ন আবহ।

সামুদ্রিক আবহকে মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে নোঙ্গর
সামুদ্রিক আবহকে মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে নোঙ্গর। ছবি: লেখক


Monday, March 23, 2026

খোলা আকাশের নিচে ইফতার ও সাহ্‌রি

সামাজিক মাধ্যম খুললেই দেখা যায়, খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টানিয়ে নিবু নিবু হলদে আলোয় ইফতার বা সাহ্রির ছবি। আগারগাঁওয়ের এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে চলছে এ আয়োজন। বন্ধুবান্ধব ও পরিবার–পরিজন নিয়ে মেট্রোরেলে করে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে এখানে আসা যায়।

রমজানে বেজক্যাম্পে

এই ইফতার আয়োজন দেখতে একদিন নিজেই গিয়ে এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে হাজির হই। ইফতারের কিছুটা আগে আগে বেজক্যাম্পে ঢুকেই দেখি গমগম করছে চারদিক। উন্মুক্ত পরিবেশে ইফতারে অংশ নিতে অনেকে পরিবারের ছোটদের নিয়ে এসেছেন। তাঁদের সামনেই তৈরি হচ্ছে জিলাপি, বেগুনি ও পেঁয়াজু।

এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামজিদ সিদ্দিক বলেন, ‘বেশ ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।’

পরিবার–পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে বা অফিসের করপোরেট মিটিং সারতে আসতে পারেন। একসঙ্গে ৩০০ থেকে ৩৫০ অতিথিকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। রমজান মাসে এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে ইফতারির বুফের মূল্য ১ হাজার ২৯৯ টাকা আর ১ হাজার ৩৯৯ টাকায় পেয়ে যাবেন সাহ্‌রি। করপোরেট ইফতারি বক্স ৯৯৯ টাকায় শুরু। এখানে রয়েছে পার্কিং সুবিধা এবং নামাজের জন্য আলাদা জায়গা। এখানে আসতে আগে থেকে বুকিং দিতে হবে।

রোজার সময় দুপুর ১২টা থেকেই খোলা থাকে ক্যাম্প। ইফতারের আগে বা পরে অতিথিরা উপভোগ করতে পারেন বিভিন্ন মজাদার কার্যক্রম। রয়েছে লুডু, দাবা, সাউন্ড হিলিং, কুশিকাটার কাজ ও অরিগ্যামির মতো মানসিক প্রশান্তিদায়ক কাজ।

উত্তরা থেকে সপরিবার ইফতার করতে এসেছেন তাওয়াফ। তাঁর সঙ্গে কথা হলো, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক দিন ধরেই দেখছি। আজ সুযোগ হলো। খোলা আকাশের নিচে ইফতারির সঙ্গে প্রকৃতিপাঠ ও বিনোদন। অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা পাচ্ছি।’

ঢাকাবাসীর নতুন গন্তব্য

তামজিদ সিদ্দিক বলেন, ‘এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পের মূল লক্ষ্য মানুষকে আবার প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারায় উদ্বুদ্ধ করা। এখানে মানুষ অন্যান্য রেস্টুরেন্টের মতো কেবল খাওয়াদাওয়া করতে আসেন না; বরং নানাধর্মী অ্যাডভেঞ্চার ও রোমাঞ্চকর কার্যক্রমে অংশ নেন, নতুন কিছু শেখেন, প্রিয়জনদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটান। আমাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে এক ছাদের নিচে নানা ধরনের কার্যক্রম আপনি করতে পারবেন। যেমন দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠা, জিপলাইন, তিরন্দাজি, কাদামাটির রাস্তায় ট্রেইল অথবা বিভিন্ন ধরনের বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

শিশুদের জন্য আছে শিল্পচর্চার ক্লাস, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-গণিতভিত্তিক কার্যক্রম, আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ ও লেগো জোন।’ তাই পরিবার নিয়ে সময় ভালো কাটবে। শহুরে ব্যস্ততার মধ্যেও যে প্রকৃতির কাছে ফেরা যায়, এয়ারফোর্স বেজক্যাম্প সেটারই এক উদাহরণ। 

এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে করা যাবে ইফতার আর সাহ্‌রি
এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে করা যাবে ইফতার আর সাহ্‌রি। ছবি: সংগৃহীত

Saturday, March 14, 2026

সোনালি মুরগির কেজি ৩৫০ টাকা ছাড়িয়েছে

রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. সালাউদ্দিন গত সপ্তাহের শুরুতে বাজার থেকে ৩২০ টাকা কেজি দরে সোনালি মুরগি কিনেছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার আবার তিনি সোনালি মুরগি কিনেছেন; কেজিপ্রতি দাম দিয়েছেন ৩৫০ টাকা; অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ৩০ টাকা করে।

সোনালির পাশাপাশি দাম বেড়েছে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের মাছের দামও আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। আর বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তবে বাজারে স্থিতিশীল রয়েছে সবজির দাম।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ঈদুল ফিতরের আর মাত্র ৮–৯ দিন বাকি। ঈদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অনেকে এখন থেকেই মুরগি কিনে রাখছেন। এতে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় দাম বেড়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও টাউন হল বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা–বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

রোজার শুরুতে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়ে ২০০-২২০ টাকা কেজি হয়েছিল। এর কয়েক দিন পর দাম কমতে থাকে। দুই সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৬০ টাকায় কেনা গেছে। এরপর দাম আবার বাড়তে থাকে। গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির কেজি ২০০ টাকা ছাড়ায়। সর্বশেষ গত তিন দিনে সেই দাম আরও বেড়েছে। আজ ঢাকার তিনটি বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ২২০ টাকায়; অর্থাৎ দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ৬০ টাকা বেড়েছে। আর তিন দিনের মধ্যে কেজিতে ২০ টাকা দাম বেড়েছে।

এদিকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়েছে। আজ রাজধানীতে মানভেদে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩২০–৩৫০ টাকায়। কোনো কোনো বাজারে ৩৬০ টাকা দরেও সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি সোনালির দাম ছিল ২৭০-৩০০ টাকা।

বাজারে অনেক দিন ধরে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম স্থিতিশীল ছিল। এখন সেই দামও বেড়েছে। আজ এক ডজন ডিম বিক্রি হয়েছে ১১০–১২০ টাকায়। প্রতি ডজনে দাম বেড়েছে ১০ টাকা।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মুরগি বিক্রেতা মুরাদ হোসেন বলেন, ঈদের আগে আগে মুরগি কেনায় বাড়তি চাপ থাকে। এ কারণে দাম বাড়ছে।

মুরগির বাজার
মুরগির বাজার। ফাইল ছবি

Tuesday, February 24, 2026

জামায়াতের ‘ঢাকা দখল’ ও বড় উত্থান এবং কিছু ইঙ্গিতের ভোট by মনোজ দে

শীত বিদায়ের মিষ্টি রোদ আর মৃদুমন্দ বাতাসের দিন ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি। ঠিক দুই দিন পরই বসন্ত। প্রকৃতিতে সন্ধিক্ষণের এ দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি সন্ধিক্ষণ হয়ে থাকবে। ভোট যে মানুষের কাছে বড় উৎসব, ভোট যে মানুষের কাছে নাগরিক হিসেবে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগের পথ, সেটাই এ দেশের মানুষ ভুলে যেতে বসেছিল। সত্যিকার উৎসব করেই মানুষ এবার ভোট দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, এবার ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আওয়ামী লীগ–বিহীন নির্বাচনে এই ভোটের হার নিঃসন্দেহে আশাপ্রদ। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল প্রায় ৮৭ শতাংশ ভোটার। আর ২০০১ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটার।

গণ–অভ্যুত্থানে প্রশ্নহীন ম্যান্ডেটের মধ্য দিয়ে এলেও গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটা বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্বল শাসন হিসেবেই বিবেচিত হবে। মব সহিংসতার কাছে সরকারের অসহায় আত্মসমর্পণ এবং কোনো কোনো গোষ্ঠীর অতি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠায় মানুষের কাছে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, সরকার ঠিকমতো একটা নির্বাচন করতে পারবে তো? কিন্তু শেষবেলায় সরকার একটা ভালো নির্বাচন দিতে পেরেছে।

১৭ বছর ভোট দিতে না পারা নাগরিকদের ভোট দেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, প্রচারণার ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো এবং স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সংযত আচরণ; নির্বাচন কমিশনের নেওয়া কড়া নিরাপত্তা ও নজরদারির ফলেই একটা সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। মানুষ যে ভয়হীন পরিবেশে ভোট দিতে কেন্দ্রের দিকে গেছেন, সেই পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ও তৎপরতাকে আলাদাভাবে উল্লেখ করতেই হবে। এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করা হয়েছিল।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর জনতার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা জয়-পরাজয় নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সরকারের একটি দৃশ্যমান দূরত্ব দেখা গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের অনেকে এই দূরত্ব তৈরিকে এজেন্ডা হিসেবেই বেছে নেয়। গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী একটি সরকার যেখানে পুলিশি ব্যবস্থা নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিল, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার, অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শক্তিগুলো এবং সশস্ত্র বাহিনী—এই তিন পক্ষের ঐক্যটা ছিল ভীষণ রকম জরুরি।

কিন্তু সেটা না হওয়ায় একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করা শাসনের বদলে মবতন্ত্রের মতো ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে নাগরিকদের। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এই সত্যকেই সামনে এনেছে, রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সক্ষমতা আছে।

দুই.

৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থী মারা যাওয়ায় নির্বাচন হয়নি। বাকি দুটি আসনে আইনগত জটিলতায় ফলাফল আটকে আছে। ২৯৭টি আসনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে যাওয়া দলটির মিত্ররা আরও তিনটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এটি দলটির সবচেয়ে বড় বিজয়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে দলটি ২০৭টি আসনে জিতেছিল। নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরুর পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটি ১৪০টি আসন পেয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে এককভাবে ১৯৩টি এবং জোটগতভাবে ২১৬টি আসন পেয়েছিল। এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

তবে এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর বড় উত্থান হয়েছে। এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৬টি আসনে বিজয়ী হয়েছে দলটি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত হাইপ তুলতে সক্ষম হয় যে এবারের নির্বাচনে একানব্বইয়ের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ফলাফল ঘোষণার পরও সেই টান টান উত্তেজনা তারা জিইয়ে রাখতে পারে।

একানব্বইয়ের নির্বাচনে সব জরিপ ও বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল সেবার আওয়ামী লীগ জিততে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিএনপিই জিতেছিল। এর আগে বিএনপির সঙ্গে জোটগত নির্বাচন করে জামায়াত ২০০১ সালে ১৫টি ও ২০০৮ সালে ২টি আসন পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করেছিল জামায়াত, সেবারে দলটি আসন পেয়েছিল ৩টি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন পেয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে এই আলাপ আছে যে সেই নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে ভেতরে ভেতরে তাদের একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল।

তিন.

বাংলাদেশে যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির একটা উত্থান ঘটেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই তার পরিষ্কার বার্তা পাওয়া যাচ্ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে মাজার ভাঙা, বাউলদের ওপর আক্রমণ থেকে শুরু করে নারী, সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাগামছাড়া ঘৃণাচর্চা হয়েছে। তবে ২০০৮ সালের পর গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন না হওয়ায় দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রকৃত চিত্র জানা যাচ্ছিল না। যদিও নির্বাচন দিয়েই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝাটা কঠিন। কেননা, এর একটি অংশ প্রকাশ্যেই গণতন্ত্র ও নির্বাচনবিরোধী। বাস্তবে এই অতি দক্ষিণপন্থী অংশ সমাজে কতটা, সেই চিত্র অধরাই থেকে যাচ্ছে।

নির্বাচনের আগে থেকেই আসিফ মোহাম্মদ শাহানের মতো পর্যবেক্ষকেরা ধারণা দিয়েছিলেন, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে ভালো করবে জামায়াত। ফলাফলেও দেখা গেল খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে জামায়াত পরিষ্কারভাবে ভালো ফল করেছে। সবচেয়ে ভালো করেছে খুলনায়। ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টি জিতেছে তারা। রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসন জিতেছে। জামায়াতের জয় পাওয়া আসনগুলোর বেশির ভাগই ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই অঞ্চলগুলোতে সাতচল্লিশের দেশভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আসা জনগোষ্ঠীর ভোট এ ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।

উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে রংপুর বিভাগের ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে ঐতিহ্যগত জাতীয় পার্টির ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। এর একটা বড় কারণ হলো, জাতীয় পার্টি যে ডানপন্থার মিশেলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করে, তার সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতি অনেকটা মিলে যায়। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম জাতীয় পার্টি একটি আসনও পায়নি। রংপুরের আসনগুলোতেও তারা বড় ব্যবধানে হেরেছে এবং অনেক আসনে তৃতীয় হয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু এবং গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের বি–টিম হওয়ার রাজনীতি জাতীয় পার্টিকে রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

দক্ষিণবঙ্গ ও রাজশাহীর যেসব আসনে বিএনপি পরাজিত হয়েছে, তার অনেকগুলোই দলটির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এসব আসনে হারার পেছনে বড় একটি কারণ হতে পারে বিএনপি তার প্রথাগত সমর্থকদের একটি অংশকে হারিয়েছে। কিছু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরাও জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। কোথাও কোথাও দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় নেতাকে প্রার্থী করায় তারা হেরেছে। কিন্তু এটাই সবটা কারণ নয়। এখানকার অনেক আসনে প্রথাগত আওয়ামী লীগের যেসব ভোটার এবার ভোট দিয়েছেন, তাঁদের একটা অংশ জামায়াতকে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন।

এর পেছনে বিএনপির স্থানীয় নেতা–কর্মীদের চাঁদাবাজি ও মামলাবাজিও একটা ভূমিকা রেখেছে। দক্ষিণবঙ্গের অন্তত দুটি আসনের কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও পাড়া, কোথাও গ্রাম ধরে আওয়ামী লীগের প্রথাগত ভোটাররা জামায়াতের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। গ্রামগুলোতে যে গোত্রভিত্তিক বিরোধ থাকে, সেখানে বিভাজনটা অনেকটাই আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি। মোটাদাগে এই সূত্রই এখানে কাজ করেছে

চার.

ঢাকা মহানগরের আসনগুলোতে জামায়াতের উত্থান সবচেয়ে বিস্ময়ের। অতীতে কখনোই জামায়াত ঢাকার কোনো আসন পায়নি। ঢাকার ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতাও খুব বেশি দেখা যায়নি। এবারের নির্বাচনে ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতেই জামায়াত জোট জিতেছে। হেরে যাওয়া আসনগুলোর কয়েকটিতে ভোট ব্যবধান খুব সামান্য। এনসিপির সঙ্গে জোট করায় তরুণ ভোটারদের একটা বড় সমর্থন জামায়াত পেয়ে থাকতে পারে।

গত দেড় বছরে বিএনপির বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগও ভোটারদের একটা অংশকে জামায়াতের দিকে ঝুঁকিয়েছে। বলা হয়ে থাকে ঢাকা যার দখলে পুরো দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সেই দলের হাতে। ঢাকা দখলের জন্য জামায়াত যে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটা ফলাফলই বলে দিচ্ছে। কিছু আসনে ভোটার স্থানান্তরের কৌশল কাজ করেছে। ভোটের অনেক আগে থেকেই, রিকশাচালক, সিএনজিচালক, ফুটপাতের দোকানিদের একটা অংশ জামায়াতের পক্ষে সরব প্রচারণা চালিয়েছেন।

পাঁচ.

জাতীয় পার্টির অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়াসহ এই নির্বাচন আরও কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। একানব্বইয়ের নির্বাচনের পর আর কোনো নির্বাচনেই বামপন্থীরা এককভাবে নির্বাচন করে জিততে পারেনি। বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী ছাড়া বামপন্থীদের কোনো আলোচিত প্রার্থী ছিলেন না। নির্বাচনে তিনি ২২ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। তিনি ছাড়া উল্লেখ করার মতো কেউই ভোট পাননি। এবারের সংসদে বামপন্থীদের কোনো প্রতিনিধি থাকছে না।

নারী ও সংখ্যালঘু জনপ্রতিনিধিও এবারের সংসদে অনেক কম। বিএনপি থেকে ছয়জন ও স্বতন্ত্র হিসেবে রুমিন ফারহানা এবার জিতেছেন। জাতিগত সংখ্যালঘু ২ জন ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ২ জন প্রতিনিধি এবার এমপি হয়েছেন। এর পেছনেও সাম্প্রতিক বছরগুলো, বিশেষ করে গত ১৮ মাসের নারীবিদ্বেষী প্রচার ও ডানপন্থী জোয়ার কাজ করেছে। ফলে ৭ জন নারী আর ৪ জন সংখ্যালঘু সংসদ সদস্য নিয়ে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ হতে চলেছে, সেটা নিয়ে বড় প্রশ্নই থেকে যাবে।  

নির্বাচনে বিএনপি তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো ফলাফলে জিতলেও জামায়াতের বড় উত্থান ঘটেছে। ভোট দেওয়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ সমর্থন দিয়েছে জামায়াতকে। বিএনপি প্রতি সমর্থন দিয়েছে ৪৯ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোটার। নারীদের, বিশেষ করে শহর অঞ্চলের ও কর্মজীবী নারী ভোটার এবং গত দেড় বছরে নানাভাবে আক্রান্ত জাতিগত, ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত সংখ্যালঘুদের ভোট বিএনপিকে অনেক আসনে জিততে সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থার উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ প্রকল্প, ভারতের শাসক দল বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের দমনমূলক শাসনের প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সামাজিক মেরুকরণের দিক থেকেও সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একটি পরিচ্ছন্ন ভোট বাংলাদেশের মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে আপাতত বাঁচিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জের শুরুটা এখন থেকেই।

* মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

এবারের নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে জামায়াতে ইসলামি
এবারের নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে জামায়াতে ইসলামি। ছবি : প্রথম আলো

Sunday, February 8, 2026

সড়কে বিশৃঙ্খলা: জবাবদিহিমূলক নতুন সড়ক সংস্কৃতির সন্ধানে by সাজেদুল হক

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফলাফল। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন সাজেদুল হক। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।

রাস্তায় গর্ত, বাসরুটের বিশৃঙ্খলা, অবৈধ পার্কিং, ট্রাফিক সিগন্যালের বিকল অবস্থা এবং ঘন ঘন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মধ্যে একধরনের বিশেষ মিল আছে; এসবের দায়ভার সব সময়ই ‘অন্য কারও’।

বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার প্রতিটি অংশ—সড়ক নির্মাণ, আইন প্রয়োগ, চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, নগর-পরিকল্পনা, জরুরি সেবা, জনসচেতনতা—এই সবই বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া আছে। কিন্তু কোনো সংস্থা এককভাবে এই বহুমুখী সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা, অর্থায়ন বা সমন্বয়ের সুযোগ পায় না।

আমাদের পরিবহনসংকট এত জটিল ও ব্যাপক যে কোনো এক দপ্তরের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা এখন আর সম্ভব নয়। তবু আমরা যেন একাধিক অঙ্গের জটিল রোগবালাইকে বিচ্ছিন্ন সব চিকিৎসা দিয়ে সারানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। যদি আমরা সত্যিই আমাদের যোগাযোগব্যবস্থাকে সংস্কার করতে, নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে এবং রাস্তায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে প্রয়োজন সরকারের সর্বোচ্চ দপ্তরের নির্দেশনায় এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় একটি সম্মিলিত উদ্যোগ।

আজকের আলোচনার কেন্দ্রে রাখছি দুটি বিষয়। একটি হলো জবাবদিহি ও কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার। আরেকটি হলো আমাদের সড়ক ব্যবহারের সংস্কৃতির পরিবর্তন। এর কারণ হলো, কাঠামোগত ব্যর্থতা আর সংস্কৃতিগত বিশৃঙ্খলা একে অপরকে পুষ্ট করে আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় আমাদের বর্তমান নগর পরিবহনের সংকট।

সমন্বয়হীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা আর জবাবদিহির অভাব

বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো অকার্যকর দায়িত্বের বিভাজন। এর কিছুটা বিশ্লেষণ আমরা আগের পর্বে দেখেছি। বিআরটিএ ড্রাইভারদের লাইসেন্স দেয় এবং গাড়ি নিবন্ধন করে, কিন্তু তাঁরা রাস্তায় আইন প্রয়োগ করতে পারে না। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু সড়ক নকশা বা বাস রুট নির্ধারণে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই। সিটি করপোরেশন রাস্তা সংস্কার ও ফুটপাত মেরামতের কাজ করে, কিন্তু গণপরিবহন পরিকল্পনা থেকে তাঁরা প্রায়ই বাদ থাকে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা বা ট্রমা কেয়ার সিস্টেমের কোনো অংশ নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের সচেতনতা বা শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

এসবের ফলাফল হচ্ছে প্রশাসনিক ভাঙন। এক বিভাগের উদ্যোগ অন্য বিভাগের উদাসীনতায় থেমে যায়। যেমন সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন স্কুল বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছায় না, আইন প্রয়োগ হয় বিচ্ছিন্নভাবে আর পরিকল্পনা কাগজে আটকে থাকে।

এ অবস্থায় দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী মহল সহজেই প্রভাব বিস্তার করে। মালিক সমিতি বা শ্রমিক সংগঠনের চাপ, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় আর ঘুষের সংস্কৃতি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে বারবার বিফল বা স্তিমিত করে। এর ফলে জনগণের জীবন ঝুঁকিতে থেকেও কার্যকর কোনো জবাবদিহি নেই।

যে কারণে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ হয়

বাংলাদেশে ট্রাফিক ও পরিবহন সংস্কারের বিভিন্ন কার্যক্রম বারবার ঘোষিত হয়েছে, কিন্তু এসবের অধিকাংশই হয় ক্ষণস্থায়ী। কখনো এক সপ্তাহের হেলমেট অভিযান, কখনো হঠাৎ ফিটনেস চেক, আবার কখনো বাসরুট পুনর্গঠনের নির্দেশনা। এসব পদক্ষেপ কখনো স্থায়ী ফল আনে না।

কারণ, এগুলোতে থাকে না দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, কিংবা স্পষ্ট জবাবদিহি। ফলে কার্যক্রম ব্যর্থ হলে কেউ দায় নেয় না; সাফল্য পাওয়া গেলে হলে কেউ তা টিকিয়ে রাখতে চায় না এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক অগ্রগতি মাপার কোনো ব্যবস্থা হয় না। এভাবে এসব ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে একধরনের ‘প্রতিক্রিয়াশীল প্রশাসন’। অর্থাৎ যখন কোনো দুর্ঘটনা বা জনরোষ তৈরি হয় তখন শুরু হয় হঠাৎ অভিযান, তারপর আবার নীরবতা।

জাতীয় টাস্কফোর্স কেমন হওয়া উচিত


আমাদের পরিবহন অবকাঠামোর সংস্কার ও বিস্তারের জন্য প্রয়োজন একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের জাতীয় উদ্যোগ। একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা আবশ্যক, যা প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দপ্তরের অধীনে থাকবে এবং কাজ করবে।

এ রকম একটি জাতীয় পরিবহন সংস্কার ও সড়ক নিরাপত্তা টাস্কফোর্সের সভাপতি হিসেবে থাকতে হবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বা সচিবালয়ের প্রতিনিধিকে। সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ট্রাফিক পুলিশ), স্থানীয় সরকার বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ (ডিজিটাল মনিটরিং ও অটোমেশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় (সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (ট্রমা ও জরুরি সেবা সমন্বয়), সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটির প্রতিনিধি। এ ছাড়া সিভিল সোসাইটি ও একাডেমিক বিশেষজ্ঞদেরও (পরামর্শক) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশ সাধারণ পুলিশ ইউনিট থেকে বদল হয়, যা প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিকতার অভাব তৈরি করে। একটি বিশেষায়িত, স্থায়ী কর্মী ও আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ বাহিনী গঠন অপরিহার্য। এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এই টাস্কফোর্সের মধ্যে সমন্বয় রেখে কাজ করবে।

টাস্কফোর্সের কাজ

টাস্কফোর্সের কাজ হবে জাতীয় পরিবহন এবং সড়ক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও পৌরসভার মধ্যে নীতিমালাগত জোট এবং সমন্বয় বজায় রাখা; স্পষ্টভাবে লক্ষ্য, কর্মক্ষমতা সূচক এবং সময়সীমা নির্ধারণ, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও অগ্রগতি নিয়ে ত্রৈমাসিক রিপোর্ট প্রকাশ; স্বচ্ছ তহবিল সংগ্রহ, সুষ্ঠু ক্রয় প্রক্রিয়া নিশ্চিতকরণ, কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড তৈরি (যেখানে দুর্ঘটনা, আইন লঙ্ঘন, সচেতনতা কর্মসূচির তথ্য নাগরিকেরা দেখতে পাবেন); আইন প্রয়োগ, চালক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল টিকেটিং, তথ্য ব্যবস্থাপনা, বাস কিংবা গণপরিবহনের রুট ইত্যাদির জন্য জাতীয় মান নির্ধারণ।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এই টাস্কফোর্সের আইনগত ক্ষমতা থাকতে হবে, যাতে কেবল পরামর্শক নয়, বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।

সংস্কারের আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত

বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশ এ ধরনের সংস্কারের জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ এরই মধ্যে নিয়েছে এবং ফলে ভালো ফলও পেয়েছে। ভিয়েতনামের ট্রাফিক নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে, যার নেতৃত্বে থাকেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী এবং যা ভিয়েতনামের পরিবহনব্যবস্থার বার্ষিক ফলাফল পর্যালোচনা করে। উপরন্তু দেশটির প্রদেশগুলো সরাসরি এই কমিটিকে রিপোর্ট করে—যাতে তথ্যের বিচ্যুতি না হয়।

ইথিওপিয়া দাতাদের সমন্বয়ে ও আন্তমন্ত্রণালয় নেতৃত্বে একটি জাতীয় শহর পরিবহন নীতি গঠন করেছে, যা জমি ব্যবহার, দূষণ, সড়ক নিরাপত্তা এবং জনপরিবহন সংস্কার নিয়ে একত্রে কাজ করে।

ভারতের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ এমন একটি উদাহরণ, যার চেয়ারম্যান হিসেবে থাকেন দেশটির পরিবহনমন্ত্রী। এই পরিষদের রাজ্য প্রশাসন স্তরে অংশগ্রহণ ও বিচার বিভাগীয় নজরদারি রয়েছে। এই পরিষদ নতুন আইন প্রণয়ন, ডিজিটাল আইন প্রয়োগ এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে এখন পর্যন্ত সফলতা দেখিয়েছে।

এ উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র যখন সড়ক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে শাসনব্যবস্থায় অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে, তখন সত্যিকার অর্থে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।

প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো কেমন হতে পারে

জাতীয় নির্দেশিকা জারি: উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ট্রাফিক নিরাপত্তাকে জরুরি ঘোষণা করা। সরকারি গেজেট ব্যবহার করে ও রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বজায় রেখে ৯০ দিনের মধ্যে এই টাস্কফোর্স গঠন। নগর পরিবহনে জড়িত সব সংস্থা, প্রকল্প এবং তাদের বাজেটের একটি চিত্র তৈরি এবং এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দূরীকরণের প্রস্তুতি।

কেন্দ্রীয় সড়ক নিরাপত্তা ড্যাশবোর্ড চালু করা: স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে একটি রিয়েল টাইম ড্যাশবোর্ড তৈরি করতে হবে, যা সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে সড়ক অবস্থা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, দুর্ঘটনা, আইন প্রয়োগ কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা প্রচারের তথ্য থাকবে।

বিশেষ করে একটি সহজবোধ্য সামগ্রিক অগ্রগতি সূচক বা ‘পরিবহন স্বাস্থ্য সূচক’ থাকবে, যা সংস্কার কার্যক্রমের সামগ্রিক প্রভাব পরিমাপ করে জনগণকে জানাবে। এই ড্যাশবোর্ডকে নিয়মিত হালনাগাদ করা হলে এই প্ল্যাটফর–সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার জবাবদিহি বাড়বে এবং নাগরিকেরা জানতে পারবে কীভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ নিরাপদ ও কার্যকরভাবে রাস্তায় ভূমিকা রাখছে। যেসব মন্ত্রণালয় সমন্বিত কর্মক্ষমতা সূচকে ভালো করবে, তাদের বাজেটের মাধ্যমে সমন্বয়ের প্রণোদনা প্রদান করা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাদের প্রয়োজনমতো সংশ্লিষ্ট করা: পরিবহন শ্রমিক সমিতি, বেসরকারি বাসমালিকেরা, সিভিল সোসাইটি, করপোরেট লজিস্টিক কোম্পানি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকেও এই সংস্কার সম্পাদন এবং পর্যবেক্ষণের কাজে সাহায্য করতে হবে।

নাগরিক সংস্কৃতির সংস্কার

যত বড় কাঠামোই তৈরি করা হোক, তা সফল হবে না, যদি না আমাদের নাগরিক আচরণ বদলায়। বর্তমানে বাংলাদেশের রাস্তায় প্রভাবশালী মানেই জয়ী। লাল বাতি মানা হয় না, অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে, পথচারী হয় বিপন্ন। একটি নতুন সড়ক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পথচারীর অধিকার সংরক্ষিত হবে; অ্যাম্বুলেন্সকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; শিশুরা নিরাপদে বাইসাইকেল চালাতে পারবে; বয়স্করা নিশ্চিন্তে ফুটপাতে হাঁটতে পারবে; এসব শুধু দুর্ঘটনা কমাবে না, নাগরিক জীবনে সহমর্মিতা ও আস্থাও ফিরিয়ে আনবে।

সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন

এই পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়। প্রয়োজন বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ।

সরকার: সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্কুল পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা, স্থায়ী ট্রাফিক পুলিশ বাহিনী।

বেসরকারি খাত: রাইড শেয়ার ও করপোরেট যানবাহনে নিরাপদ চালনা নীতি, সঠিক পার্কিং ব্যবস্থাপনা।

গণমাধ্যম: ভিআইপি গাড়ির কীর্তন আর স্তুতি বন্ধ করা, আর মানবিক গল্প প্রচার।

তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠন: ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চেতনা দীর্ঘ মেয়াদে কাজে লাগানো, ট্রাফিক আইল্যান্ড এবং ফুটপাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
: সাপ্তাহিক খুতবা বা বক্তব্যে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বার্তা অন্তর্ভুক্ত করা।

প্রযুক্তি খাত: দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানের তথ্য, ড্রাইভার স্কোরকার্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকির পূর্বাভাস।

সংস্কারকে দৃশ্যমান করতে হবে

জনসাধারণের আস্থা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অগ্রগতিকে দৃশ্যমান করা। ওপরে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় সড়ক নিরাপত্তা ড্যাশবোর্ডে একটি সংস্কারের অগ্রগতির সূচক থাকতে পারে, যা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে এবং যা দেখাবে কার্যক্রমের অগ্রগতি। যেমন: প্রশিক্ষণ, আইন বাস্তবায়ন, সচেতনতামূলক প্রচারণা কীভাবে সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করছে এবং যানজট, দুর্ঘটনা কিংবা মানুষের হতাশা কমাচ্ছে। যখন মানুষ দেখবে, তখন বিশ্বাস গড়ে উঠবে; তারাও অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত হবে; আচরণ বদলাতে মনোযোগী হবে। দৃশ্যমানতা সংস্কারকে গ্রহণযোগ্য করবে আর গ্রহণযোগ্যতা সেই সংস্কারকে গতিশীল করবে।

শেষ কথা

রাষ্ট্রকে কখনো না কখনো ভাবতেই হয়, নগরের সড়ক এবং উন্মুক্ত স্থানগুলোয় নাগরিকদের কী দেওয়া উচিত অথবা সর্বসাধারণের এসব থেকে কি পাওয়ার কথা? আমরা তো আমাদের রাস্তাঘাটকে দৈনন্দিন অবিচার বা নৈরাজ্যের প্রতীক হয়ে থাকতে দিতে পারি না। এই লেখায় নীতি, অনুশীলন এবং জনমনের ভাবনাকে নতুনভাবে দেখার একটি উপায় তুলে ধরেছি।

কিন্তু এই সবই অর্থহীন হবে যদি আমরা বর্তমান বিশৃঙ্খলতার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকি। কারণ, দিন শেষে সড়ক ও যানজট আসল সমস্যা নয়—এসবের ব্যাপারে অবজ্ঞাই হলো মূল সমস্যা। এবং আমরা সবাই মিলে এর থেকে বেরিয়ে আসার পথ বেছে নিতে পারি। এটি শুধু যানজট কিংবা সড়কের প্রশ্ন নয়, বিশ্বায়নের এই যুগে এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত এখন আমাদের হাতে।

সাজেদুল হক, উন্নয়নবিশেষজ্ঞ ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ফোরাম
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সড়কে বিশৃঙ্খলা: জবাবদিহিমূলক নতুন সড়ক সংস্কৃতির সন্ধানে

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকটের কারণ কী by সাজেদুল হক

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফল। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন সাজেদুল হক। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

২৯ জুলাই ২০১৮, ঢাকার এয়ারপোর্ট রোড। জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস বেপরোয়া গতিতে আরেকটি বাসকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের ওপর উঠে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় রাজীব ও দিয়া নামে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী।

বাসটির রুট পারমিট ছিল না। চালকের বৈধ লাইসেন্স ছিল না। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার একটি উদাহরণ।

এরপর যা ঘটেছিল, তা ছিল আমাদের জন্য এক নির্ণায়ক সময়। হাজারো শিক্ষার্থী, অনেকেই ইউনিফর্ম পরে সড়কে নেমে এসেছিল। কিন্তু তারা সড়কে কোনো ভাঙচুর করেনি।

শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করল, জেব্রা ক্রসিং এঁকে দিল। তারা দলবদ্ধ হয়েছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে।

কিছু সময়ের জন্য তখন মনে হয়েছিল, বহুদিনের অবহেলিত বিষয়টি অবশেষে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে উঠে আসতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস, মন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক—সবই হলো। কিন্তু ছয় বছর পার করে বাস্তবিক অর্থে কিছুই বদলাল না।

আমাদের দেশের সড়ক ও যানজটের অবস্থা এখন আর কেবল যন্ত্রণাদায়ক নয়; এটি আজ দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় বিপর্যয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মারাত্মক ঝুঁকি আর কোটি মানুষের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার মান নষ্ট করার কারণ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যানজট প্রতিবছর অর্থনীতিতে ৩৭ হাজার কোটি থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা (৩ দশমিক ৫ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতি করে। এটি জিডিপির ৫ থেকে ১০% হারানোর সমান।

শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, যানজটের স্বাস্থ্যঝুঁকিও মারাত্মক। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পরিবেশদূষণ, বিশেষ করে যানবাহনজনিত বায়ুদূষণ বাংলাদেশে ৭৮ হাজার থেকে ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল, যা জিডিপির প্রায় ৪% ক্ষতির সমান।

গড় গতির কথা ভাবলে দেখা যায়, এক দশক আগে যেখানে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ২১ কিমি/ঘণ্টা, আজ তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫ কিমি/ঘণ্টায়।

আমাদের শহরের সড়কগুলো এখন বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ও বিশৃঙ্খল সড়কব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত হয়। ২০১৮ সালের ছাত্রদের
দাবি আর আন্দোলনের পর একই ফিটনেসবিহীন বাস, একই অদক্ষ ও প্রশিক্ষণহীন ড্রাইভার, একই ধরনের আইনভঙ্গকারী মানসিকতা—সব চলছে আগের মতোই।

যারা একদিন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাস্তায় নেমেছিল, তারা আজ শ্রেণিকক্ষে ফিরে গেছে। কিন্তু যে অবস্থা তাদের আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছিল, সেটি থেকে আমরা ন্যূনতম মুক্তিও পাইনি।

প্রতিদিনের দুর্ভোগ ও অর্থনীতির ক্ষয়

সাধারণ নাগরিকের জন্য ঢাকা শহরে যাতায়াত করা এখন এক অন্তহীন যন্ত্রণা। আট কিলোমিটার পথ যেতে লাগে দেড় ঘণ্টা, কখনো কখনো এমন অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। অফিসগামীদের ভোরে বেরোতে হয়, ফিরতে হয় গভীর রাতে। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে অভিভাবকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় যানজটে। প্রতিদিনের এই চাপ থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় হতাশা, ক্লান্তি আর একধরনের নীরব ক্ষোভ।

এসবের ভেতর আরেক উদ্বেগের বিষয় হলো, অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে কারও যেন আর কোনো আশা বা দাবির জায়গা নেই। এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি জেনেও নাগরিকদের মনে গেঁথে গেছে একধরনের আত্মসমর্পণের চিন্তা: ‘এটাই নাকি মেগাসিটিতে বাস করার মূল্য’।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের যানবাহনের চালকেরা যখন বিদেশে যান কিংবা দেশের ভেতরই সেনানিবাসের মতো নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁরা অনায়াসে সব নিয়ম মেনে চলেন। এ থেকে স্পষ্ট যে সড়কের বিশৃঙ্খলার পেছনে ব্যক্তিগত অসচেতনতা যেমন আছে, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

পরিবহনবিষয়ক দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা

সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ে আমাদের এই সংকট কেবল যানজটে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক গভীর প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলনও বটে। ঢাকার ভেতর সড়ক ব্যবস্থাপনায় জড়িত প্রধান তিনটি সংস্থা হলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)।

নিয়ম অনুযায়ী সংস্থাগুলোর সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান যার যার মতো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সড়ক নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু রোড ডিজাইন বা রুট পরিকল্পনায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই।

রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন দেয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আবার তাদের নেই।

ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি সমন্বয়কারী সংস্থা হলেও এর কার্যকর কর্তৃত্ব নেই বললেই চলে।

ঢাকার বাইরে গেলেও পরিস্থিতি একই রকম। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) হয়তো রাস্তা নির্মাণ করে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের। উপরন্তু এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারণী কর্তৃত্ব ছড়িয়ে রয়েছে সড়ক পরিবহন, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভেতর।

ফলাফল হলো প্রতিটি সংস্থা আলাদা আলাদা নীতি নিচ্ছে; একে অন্যের বিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আর নাগরিকেরা আটকে থাকছেন বিশৃঙ্খলার জালে।

যদি ঢাকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানের দিকে তাকাই, যেমন মিরপুরের কালশী ফ্লাইওভার, সেখানে দেখি রোড মার্কগুলো কেমন এলোমেলো। অনেক রাস্তায় ট্রাফিক সাইন ভুল কিংবা অদৃশ্য।

প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রকল্পে অংশ নেওয়া প্রকৌশলীদের এসব রাস্তার সাইন আর মার্কগুলো করার জন্য পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ছিল কি না? এমনকি বিমানবন্দর সড়কের মতো উচ্চনিরাপত্তাসম্পন্ন এলাকার কাছাকাছিও সঠিক রোডমার্ক নেই। এর ফলে অভিজ্ঞ চালকেরাও বিভ্রান্ত হন। এগুলো কেবল দৃষ্টিকটু নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগত দায়িত্বহীনতার প্রতিচ্ছবি।

দুর্নীতি ও অরাজকতা

প্রতিষ্ঠানগত বিশৃঙ্খলার পেছনে আরও একটি বিষয় কাজ করে; সেটা হলো দুর্নীতি। হাজার হাজার যানবাহনের চালক ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন; কেউ টাকা দিয়ে, কেউ রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়। ফিটনেসবিহীন বাস, অনিরাপদ মিনিবাস সবই চলে অবাধে।

পরিবহনমালিকদের লবি প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত। ফলে কোনো সংস্কার কার্যত তাঁদের ইচ্ছার বাইরে যেতে পারে না। এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতিই আমাদের ট্রাফিক–ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার মূল চালিকা শক্তি এবং জনগণের আস্থা ধ্বংসের ভিত্তি।

বিআরটিএ যেখানে পরিবহন খাতের একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তারাই দীর্ঘদিন ধরে ‘দুর্নীতির আখড়া’ হিসেবে পরিচিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেমন পুলিশ ও মোবাইল কোর্ট, তারাও পক্ষপাতদুষ্ট নজরদারি ও চাঁদাবাজিতে জড়িত, এমন অভিযোগ রয়েছে। গণপরিবহনব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার পেছনে কাজ করছে এক শক্তিশালী পরিবহন সিন্ডিকেট, যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

কিন্তু পরিস্থিতি সব সময় এমন ছিল না। মাত্র দুই-তিন দশক আগেও ঢাকার রাস্তায় নিয়মকানুনের কিছুটা হলেও ছোঁয়া ছিল। পুলিশের উপস্থিতি নিয়মিত দেখা যেত, লাইসেন্স বা ফিটনেস–সংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ছিল তুলনামূলক বেশি আর গণপরিবহনব্যবস্থাও কিছুটা হলেও নিয়মতান্ত্রিক ছিল।

এখনকার মতো এমন চরম বিশৃঙ্খলা ও আইনভঙ্গের দৃষ্টান্ত তখন এত ব্যাপক ছিল না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অব্যাহত দুর্নীতি ধীরে ধীরে নিয়মশৃঙ্খলার ভিত্তিগুলো ভেঙে দিয়েছে। আজ আমরা যা দেখছি, তা হঠাৎ ঘটে যাওয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবক্ষয়ের ফল। যত দিন না আমরা এই মুনাফাভিত্তিক দুষ্টচক্র ভেঙে ফেলতে পারব, তত দিন পর্যন্ত যেকোনো সংস্কার, তা যত ভালো পরিকল্পিত বা সদিচ্ছাসম্পন্নই হোক না কেন, ব্যর্থই হয়ে যাবে।

নীতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

এসবের মধ্যেও যখনই কোনো নীতি প্রণয়ন করা হয়, বাস্তব প্রেক্ষাপট থেকে তা হয় প্রায়ই বিচ্ছিন্ন। একদিকে শহরজুড়ে বাস রুট রেশনালাইজেশনের মতো পরিকল্পনা করা হলো, যার মাধ্যমে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামক ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল রুটগুলো একীভূত করা, শৃঙ্খলা আনা।

কিন্তু সেই উদ্যোগ আটকে গেল মালিকদের চাপে। সরকারকেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হলো। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের মতামত নিয়ে এ ধরনের পরিকল্পনায় তাঁদের ব্যবসায়িক বা স্বার্থের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে অগ্রসর হওয়া উচিত।

অন্যদিকে নীতিনির্ধারকেরা নিজেরা থাকেন সাধারণ নাগরিকের ভোগান্তি থেকে বিচ্ছিন্ন। ভিআইপি বহর নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে সড়ক খালি করে নীতিনির্ধারকেরা চলে যান, একজন সাধারণ নাগরিকের অ্যাম্বুলেন্স হয়তো তখন ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে থাকে।

বিলম্ব, ঝুঁকি অথবা অস্বস্তি—সাধারণ মানুষকে পরিবহনব্যবস্থার কারণে এসব যেভাবে পোহাতে হয়, নীতিনির্ধারকদের গাড়ির কাচ ভেদ করে তা ঢুকতে পারে না। ফলে তৈরি হয় এক বিশাল দূরত্ব, যা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবে নয়, বরং অভিজ্ঞতার বিচ্ছিন্নতার কারণেও গভীরতর হয়।

পরিবহন খাতের দায়িত্বে যাঁরা, তাঁদের বিবেচনায় অগ্রাধিকার পায় সেই সব কাজ, যেগুলো সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে সহজে বা খবরের শিরোনাম হয়। বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ পরিবহন প্রকল্পে ব্যবহারযোগ্যতার চেয়ে দৃশ্যমানতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।

সমস্যার মূলে অকার্যকর শাসনব্যবস্থা

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফলাফল।

২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল যে পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু এই বোঝা শিক্ষার্থীদের একার নয়। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই দায়িত্ব নিতে হবে। প্রশ্ন হলো, কে এই দায়িত্ব নেবে? ব্যর্থ হলে তাদের জবাবদিহি কে করবে?

যদি আমরা সত্যিই সুষ্ঠু নাগরিক সড়কব্যবস্থা চাই, তবে প্রথমে আমাদের এই বিরাজমান শাসনব্যবস্থার ভাঙনকে স্বীকার করতে হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের সবার আগে রাস্তায় বিরাজমান এই দুর্নীতির সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, যানজট বা দুর্ঘটনা কেবল উপসর্গ; আসল রোগ হলো দুর্বল শাসন ও দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা।

* সাজেদুল হক, উন্নয়নবিশেষজ্ঞ ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ফোরাম
- মতামত লেখকের নিজস্ব

যানজটে স্থবির রাজধানীর বনানী এলাকার একটি সড়ক
যানজটে স্থবির রাজধানীর বনানী এলাকার একটি সড়ক। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

Saturday, January 17, 2026

‘ছেলেটা পরিবারসহ চলে গেল, কিছুই করতে পারিনি’ by আহমেদ উল্যা ইউসুফ

ছেলে, তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। ছেলে ও তাঁর স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী। ব্যস্ততার কারণে গ্রামের বাড়িতে খুব একটা যাওয়া হয় না। তাই গতকাল যখন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় বসবাসরত বাবার সঙ্গে মুঠোফোনের ছেলের কথা হচ্ছিল, তখন তাঁকে স্ত্রী–সন্তান নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য বাড়িতে যেতে বলেছিলেন বাবা। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য তাতে রাজি হননি ছেলে।

সেই ছেলে, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর খবর আজ শুক্রবার সকালে পেয়ে ঢাকায় ছুটে এসেছেন বাবা সত্তরোর্ধ্ব খোরশেদুল আলম। রাজধানীর উত্তরায় আবাসিক ভবনে আগুন লেগে যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের তিনজন একই পরিবারের। তাঁরা হলেন খোরশেদুল আলমের ছেলে ফজলে রাব্বি, তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তার ও তাঁদের আড়াই বছরের ছেলে মো. রিশান।

ফজলে রাব্বি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে কাজ করতেন। আর আফরোজা কাজ করতেন স্কয়ার গ্রুপে। আজ শুক্রবার সকাল পৌনে আটটার দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের যে বাড়িতে আগুন লাগে, সেই বাড়ির পঞ্চম তলায় থাকতেন ফজলে রাব্বি তাঁর স্ত্রী সন্তান নিয়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, প্রথমে আগুন লেগেছিল ভবনের দোতলায়। দ্রুত আগুন বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তৃতীয় তলাতেও আগুন জ্বলতে থাকে। এই দুই তলার বাসিন্দারা বেঁচে গেছেন। কিন্তু আগুনের ধোঁয়া ওপরের দিকে উঠে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ছয়জন প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য না জানা গেলেও পুলিশের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে।

আগুনে ছেলে, পুত্রবধূ ও একমাত্র নাতির মৃত্যুর খবর শুনে ঢাকায় এসেছেন বলে জানান খোরশেদুল আলম। বিকেলে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর বড় মসজিদে তিনজনের জানাজা হয়। এরপর তাঁদের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর পর নিজে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন খোরশেদুল আলম।

কাঁদতে কাঁদতে খোরশেদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেটা পরিবারসহ চলে গেল। আমি কিছুই করতে পারলাম না।’

খোরশেদুল আলম জানান, তাঁর একমাত্র ছেলে ফজলে রাব্বি। আর এক মেয়ে আছে, তাঁর বিয়ে হয়ে গেছে। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

ছেলে–নাতি দুজনই মারা যাওয়ায় খোরশেদুলের পরিবারে ‘আলো জ্বালানোর’ মতো আর কেউ রইল না। স্বজন হারানোর বেদনায় মুষড়ে পড়া প্রবীণ এই ব্যক্তি বলেন, গতকাল যখন ফজলে রাব্বির সঙ্গে কথা হয়, তখন বলেছিলেন এক সপ্তাহ কুমিল্লায় গিয়ে থেকে আসার জন্য। কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা থাকায় ছেলে যেতে রাজি হননি।

‘কুমিল্লায় গেলে হয়তো পরিবারসহ সন্তানের মৃত্যুর সংবাদটা শুনতে হতো না,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন তিনি।

এ সময় সেখানে উপস্থিত জিয়াদ নামে ফজলে রাব্বির এক আত্মীয় জানান, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ফজলে রাব্বির মা শোকে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে পরিবারের অন্যদেরও একই অবস্থা।

ফজলে রাব্বির স্ত্রী আফরোজার পরিবারও উত্তরা এলাকায় থাকে। এ ঘটনার পর আফরোজার বাবা ও মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাঁরা ঠিকমতো কথাও বলতে পারছেন না বলে আফরোজার বোন আফরিন জাহান জানিয়েছেন।

খোরশেদুল আলম জানান, নিহত ফজলে রাব্বি, তাঁর সন্তান ও স্ত্রীকে তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চিওড়ায় আগামীকাল দাফন করা হবে।

এই আগুনের ঘটনায় ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা অপর একটি পরিবারের আরও তিনজন মারা গেছেন। তাঁরা হলেন মো. হারিস (৫২), তাঁর ছেলে মো. রাহাব (১৭) ও ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৭)।

রাজধানীর উত্তরায় ভবনে আগুনে মৃতদের স্বজনের আহাজারি। আজ শুক্রবার বিকেলে উত্তরা ১১ সেক্টরে 
রাজধানীর উত্তরায় ভবনে আগুনে মৃতদের স্বজনের আহাজারি। শুক্রবার বিকেলে উত্তরা ১১ সেক্টরে। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

Monday, January 12, 2026

ঢাকা শহরে একজন ‘জোহরান মামদানি’ কোথায় পাব by কাজী আলিম-উজ-জামান

এ বছরের প্রথম দিনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র জোহরান কোয়ামে মামদানি শপথ নিয়েছেন। বৈচিত্র্যের কারণে নিউইয়র্ককে বলা হয় ‘বিশ্বের রাজধানী’। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই শহরটির নতুন মেয়রের বয়স মাত্র ৩৪ বছর। আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করা মামদানি নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও প্রথম দক্ষিণ এশীয় মেয়র, যিনি পবিত্র কোরআন হাতে শপথ নিয়েছেন।

২০২৫-এর নভেম্বরের নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় প্রমাণ করে, গ্রাসরুট ক্যাম্পেইন বা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের প্রচারণা বড় শক্তিকে রুখে দিতে পারে। মামদানি প্রমাণ করেছেন, সততা আর হাসিমুখ নিয়ে মানুষের কাছে গেলে মানুষ ফিরিয়ে দেয় না।

মামদানির প্রচারণা ছিল সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক। রেন্ট ফ্রিজ অর্থাৎ অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়ানো যাবে না। গণপরিবহন হবে ফ্রি। সরকারি মুদিদোকান থেকে মানুষ সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য থাকবে নিখরচায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র। শহর হবে সবুজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আনা হবে বিপ্লব। আর ‘খারাপ ল্যান্ডলর্ড’দের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কড়া ব্যবস্থা। বিশেষ করে এটা ছিল জোহরান মামদানির হাউজিং পলিসির মূল স্তম্ভ।

নিউইয়র্কে ‘খারাপ ল্যান্ডলর্ড’ বা ‘স্লামলর্ডস’ বলতে বোঝায়, যাঁরা ভাড়াটেদের অধিকার লঙ্ঘন করে বাড়ির জিনিসপত্র মেরামত করে না, হ্যাজার্ডাস পরিবেশ তৈরি করে রাখে, অবৈধ ফি আরোপ করে। মামদানি এদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ পলিসি নিয়েছেন।

শপথের পরপরই মামদানি ‘মেয়রস অফিস অব মাস এনগেজমেন্ট’ গঠন করেছেন, যাতে নাগরিকেরা সরাসরি শহর পরিচালনায় অংশ নিতে পারেন। নিউইয়র্কবাসীর জন্য এটা একেবারেই নতুন ধারণা। অর্থাৎ সব মিলে পরিবর্তন আসছে।

২.

জোহরান মামদানির মেয়র হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠান দেখছিলাম। ২৪ মিনিট ধরে বক্তৃতা দিলেন তিনি। বললেন বিস্তৃত ও সাহসিকতার সঙ্গে নিউইয়র্ক শাসন করার কথা।

নিশ্চয়ই মামদানির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তিনি যে বিনা পয়সায় অনেক কিছু দেওয়ার বা করার পরিকল্পনা করেছেন, এর জন্য চাই অর্থ। এই অর্থ তিনি আনবেন ধনীদের ওপর অতিরিক্ত করারোপ করে। কিন্তু সেটা করলে ধনীরা নিউইয়র্ক থেকে ব্যবসা অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিতে পারেন, এমন আলোচনাও আছে। আর যেকোনো কিছু করার জন্য তাঁর প্রয়োজন ‘বিরোধী পক্ষ’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা।

মুখোমুখি অবস্থান থেকে সাম্প্রতিক সময়ে দুজনই সরে এসেছেন। মামদানির সামনে নিশ্চয় আরও অনেক বাধাবিপত্তি আছে, যেগুলো গণমাধ্যমে খুব করে আসেনি। আর কাজ করতে গেলে বাধা, চ্যালেঞ্জ আসবেই। যিনি জনগণের কাজে নামবেন, তাঁর কিছু ভুলও হবে। যিনি কোনো কাজ করবেন না, তাঁর ভুলও হবে না।

প্রায় এক বছর ধরে জোহরান মামদানির কথাবার্তা, আচরণ, ভাষণ, চিন্তা-বিশ্বাস—প্রায় সবকিছু অনুসরণ করছি। কখনো কখনো তাঁকে মনে হয়েছে যেন তরুণ বারাক ওবামা। ২০০৮ সালে ওবামা যখন ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার জন্য লড়ছিলেন, পরে মনোনয়ন পেলেন এবং নির্বাচনে জয়লাভ করলেন, তাঁর তখনকার সেই ভাষণগুলোর কথা মনে পড়ছিল। মনে হলো, নিউইয়র্কে আরেকজন বারাক ওবামা উঠে এসেছেন।

বিষয়টি আলাপ করছিলাম সহকর্মী তাসনিম আলমের সঙ্গে। তাসনিম মত দিলেন, দুজনের ভাষণের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ওবামা বক্তৃতাটা ভালো দিতেন নিঃসন্দেহে। তবে মামদানির বক্তৃতায় বাড়তি যেটা পাওয়া যায়, সেটা হলো বিশ্বাস। মনে হয় তিনি বিশ্বাস থেকেই কথা বলছেন।

এটা অবশ্য সারা দুনিয়ায় রাজনীতিবিদদের সমস্যা। ভোট বা জনসমর্থনের জন্য বক্তৃতা দিয়ে ফাটিয়ে দেন অনেকেই; কিন্তু সে কথা বিশ্বাস করেন কতজন? রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গল্প অহরহ দেখি বিশ্বজুড়ে। যার বিশ্বাস ও কথার মধ্যে মিল থেকে, তিনিই সঠিক মানুষ, সঠিক রাজনীতিবিদ। জোহরান মামদানিকে এখন পর্যন্ত এ রকম মানুষই মনে হচ্ছে।

শুধু রাজনীতিবিদদের দোষ দিই কেন। আমাদের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী কী করছেন? অপরের মুখে ঝাল খাওয়া বুদ্ধিজীবী অন্তত আমাদের সমাজে কম নেই। আমরা যাঁরা সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট তাঁরাই–বা কতটা বিশ্বাসের সঙ্গে লিখি? যাঁরা টক–শো করি, কতটা বিশ্বাসের সঙ্গে বলি? কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য লেখার মানুষ, বলার মানুষ কম নেই এই সমাজে।

৩.

আমাদের এই ঢাকা শহরে একজন মামদানির মতো সোচ্চার মানুষ দরকার। কারণ, এই শহরটা নির্জীব হয়ে পড়েছে। এতটা হতশ্রী ঢাকা শহর আমরা কোনো দিন দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এমনিতে কোনো ধরনের উন্নয়নকাজ এই শহরে নেই বা হচ্ছে না। প্রধান সড়ক থেকে একটু সরু সড়ক, গলির মধ্যে ঢুকলে দেখা যায় এই শহরের প্রকৃত চেহারা। ভাঙা সড়ক, ব্যস্ত সড়কের ওপর দোকান, হাজার রকম অন্যায় দেখেও নাগরিকেরা কোনো কথা বলে না। কারণ, এটা এখন ভয়ের শহর। নিজের গা বাঁচিয়ে চলাই এখন নিরাপদ পন্থা।

ধোঁয়া, ধুলাদূষণ, শব্দদূষণ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা আর কী বলব?

কিন্তু এভাবে তো একটা শহর দীর্ঘদিন চলতে পারে না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই নির্বাচিত মেয়র নেই। আছেন দুজন প্রশাসক। এর মধ্যে উত্তরে যিনি আছেন, কখনো কখনো তাঁর উপস্থিতি কিছুটা টের পাওয়া যায়। কাজে যতটা, তার চেয়ে কথায় কিছুটা উপস্থিতি তাঁর আছে। কিন্তু দক্ষিণে যিনি প্রশাসক আছেন, তিনি কী কাজ করেন, নাগরিকেরা জানতে পারেন বলে মনে হয় না।

জনপ্রতিনিধি যদি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, তার কিছুটা হলেও জবাবদিহি থাকে। তিনি জানেন, তাঁকে আবার জনগণের দরজায় দাঁড়াতে হবে। আর যিনি নির্বাচিত নন, তিনি দায়বদ্ধ থাকেন, তাঁকে যিনি বা যাঁরা নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁদের কাছে। অনির্বাচিত মেয়র বা প্রশাসক খুশি থাকেন তাঁর নিয়োগকর্তার ইচ্ছার দাস হয়ে। জনগণ বা মানুষের প্রতি তাঁর কোনো জবাবদিহি নেই।

ঢাকায় প্রতিদিন ৬,৪৬৫ থেকে ৭,৫০০ টন ময়লা উৎপন্ন হয়, কিন্তু কালেকশন রেট মাত্র ৩৭-৫০ শতাংশ। মোট বর্জ্যের ১০ শতাংশ প্লাস্টিক হলেও এর মাত্র ৩৭ শতাংশ রিসাইকেল হয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের বাকি অংশ যায় ল্যান্ডফিলে, নদীতে, খালে। মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল দুটোই ক্যাপাসিটি ছাড়িয়ে গেছে, ফলে রাস্তায় ময়লার স্তূপ, নালা বন্ধ, সামান্য বৃষ্টিতে জলজট—এসব আমাদের নিত্যসঙ্গী।

ঢাকায় বছরে বছরে বাড়িভাড়া বাড়ছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা রেন্ট কন্ট্রোল আইন চালু হলে লাখ লাখ ভাড়াটের জীবনযাত্রা সহজ হতো। ঢাকায় দৈনিক ৩-৪ ঘণ্টা জ্যামে নষ্ট হয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলার। কমিউনিটি এনগেজমেন্ট দিয়ে রুট অপটিমাইজ করলে শহরটা চলমান হতো। ফুটপাত দখলমুক্ত হলে মানুষ একটু হাঁটতে পারত, আরেকটু সবুজায়ন হলে মানুষ বড় করে শ্বাস নিতে পারত।

৪.

এই শহরে আমরা চাই একজন জোহরান মামদানির মতো মেয়র, যিনি হবেন তরুণ, সাহসী, প্রোগ্রেসিভ। যিনি বলবেন, ঢাকাকে নোংরা শহর থেকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, বাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করব। কিন্তু তিনি কোথা থেকে আসবেন? তিনি তো দূর কোনো আসমান থেকে আসবেন না। আমাদের ভেতর থেকে একজন মামদানিকে বের করে আনতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণদের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন ফিরিয়ে আনতে হবে। আর আমরা যাঁরা সাংবাদিক, নাগরিক কিংবা তরুণ, তাঁদের চাপ সৃষ্টি করতে হবে জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য। কোনোভাবেই মাথানত করা যাবে না।

ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রস্তুত তাঁকে খুঁজে বের করতে বা তাঁর মতো নেতৃত্ব গড়ে তুলতে?

* কাজী আলিম-উজ-জামান, প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক।
- ই–মেইল: alim.zaman@prothomalo.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

‘ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার।’
‘ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার।’কোলাজ: প্রথম আলো

Thursday, January 8, 2026

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী দিলেন তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা, সুরভী জানালেন কারা অভিজ্ঞতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আজ বুধবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ‘জুলাই যোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী ও সংগঠনটির হবিগঞ্জ জেলার সদস্যসচিব মাহদী হাসান।

সেখানে মাহদী হাসান সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে ব্যাখ্যা দেন। অন্যদিকে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

চাঁদাবাজির একটি মামলায় গত ২৫ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গী পূর্ব থানার গোপালপুরের টেকপাড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে তাহরিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ জানুয়ারি তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেওয়া  হয়েছিল। এর দুই ঘণ্টা পর তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়।

আজ নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তাহরিমা বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক দলের না। আমি একদমই অরাজনৈতিক, আমি অরাজনৈতিকভাবেই সব সময় আন্দোলন করেছি। দেশের জন্য এতটুকু করার পরও আমাকে এই ১১ দিন যে পরিমাণ নির্যাতন করা হইছে…আমার ফ্যামিলির (পরিবার) সঙ্গে আমি একটা মিনিটের জন্য কথা বলতে পারতাম না। আমার সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া হইছে। আমি বাইরে কী হইতেছে, আমার মা কার কাছে যাইতেছে, কিচ্ছু জানি না।’
একজনকে অনেক অনুরোধ করে মায়ের দেখা পেয়েছিলেন জানিয়ে তাহরিমা বলেন, ‘ওইখানে একজন স্যার আছে, উনার পায়েটায়ে ধরে আমার মার সাথে আমি এক দিন দেখা করতে পারছি। সেদিন আমার মাকে আমি একটা কথা বলছিলাম, “আম্মু, এটা দুনিয়ার জাহান্নাম।”’

‘আমরা’ মানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব অংশীজন

সুরভীর অভিজ্ঞতা শোনে মাহদী হাসান এ ঘটনার কুশীলবদের জাতির কাছে উন্মোচন করার আহ্বান জানান। তিনি সুরভীর কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৭ বছরের মেয়েকে ২১ বছর বানিয়ে নিকৃষ্টতম অন্যায় করা হয়েছে। সুরভীকে মুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু তার পেছনে যারা এই ১৭ বছরকে ২১ বছর বানিয়েছিল, যারা ৫০ হাজারকে ৫০ কোটি বানিয়েছিল, এই কুশীলবদের বাংলাদেশের জাতির কাছে উন্মোচন করতে হবে।

হবিগঞ্জে ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম’ বলে আলোচনায় আসেন মাহদী হাসান। ৩ জানুয়ারি তাঁকে আটক করা হয়েছিল। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক এবং হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র। তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাদৈ এলাকায়। ৪ জানুয়ারি তিনি জামিন পান।

মাহদী নিজের আলোচিত বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ৫ আগস্ট সারা দেশে যে বিধ্বস্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাঁরা নিহত বা শহীদ হয়েছিলেন, সেই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে মানুষ ১৭ বছরের নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। সেই ক্ষোভই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি থানা ও জেলায় আমরা তার স্ফুলিঙ্গ ও বিস্ফোরণ দেখতে পাই।’

মাহদী আরও বলেন, ‘ওই জায়গা থেকে আমি একটা কথা বারবার বলেছি, একবারও আমি বলি নাই যে আমি করেছি। এই কথার মাধ্যমে আমি “আমরা” দ্বারা সমস্ত আন্দোলনকারী সত্তাকে বুঝিয়েছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই আমাদের অস্তিত্ব। এখানে আমি মাহদী কিংবা আমাদের ব্যক্তিগত কোনো পারপাস (উদ্দেশ্য) ছিল না। “আমরা” মানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব অংশীজন, সব জুলাই যোদ্ধা যাঁরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁরা আমাদের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।’  
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামসহ অন্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ৭ জানুয়ারি
সংবাদ সম্মেলনে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ৭ জানুয়ারি। ছবি: প্রথম আলো