Showing posts with label বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি. Show all posts
Showing posts with label বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি. Show all posts

Wednesday, August 12, 2026

বিশ্বে হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯৭ ভাগ চীনের দখলে

চীনের অত্যাধুনিক শিল্পোন্নয়ন সোমবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এর মাধ্যমে হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তিতে চীনের পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক নেতৃত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে এবং দেশটির তথাকথিত ‘নিউ নিউ থ্রি’ কৌশলগত খাতÑ রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উদ্ভাবনী চিকিৎসা- আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বের মোট হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯৭ শতাংশেরও বেশি এসেছে চীনা নির্মাতাদের কাছ থেকে।

একই দিনে চীনা রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি রোবোটিক্স সাংহাইয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য শেয়ার সাবস্ক্রিপশন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি হিউম্যানয়েড রোবট খাতের প্রথম এ-শেয়ার তালিকাভুক্ত কোম্পানি হতে যাচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গ্লোবাল টাইমস।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বব্যাপী হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ প্রায় ১৯১০০ ইউনিটে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭২ শতাংশ বেশি। এ সময় বাজারে নেতৃত্বেরও পরিবর্তন হয়েছে। চীনা রোবোটিক্স কোম্পানি এজিবট ইউনিট্রিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ স্মার্ট অ্যানালিটিক্স গ্লোবাল (এসএজি) গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের হিউম্যানয়েড রোবটের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি চীন থেকে এসেছে।

২০২৫ সালে বার্ষিক ৫৫০০ ইউনিট সরবরাহ করে বিশ্বের শীর্ষ হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা হওয়া ইউনিট্রি রোবোটিক্স সোমবার তাদের আইপিওর শেয়ারপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করেছে ১৫০.৮ ইউয়ান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক আইপিও মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬.১ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহ করতে পারে। এতে কোম্পানিটির আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬১ বিলিয়ন ইউয়ান। ইউনিট্রি জানিয়েছে, অনলাইন সাবস্ক্রিপশনে চূড়ান্ত শেয়ার পাওয়ার সম্ভাব্য হার হবে মাত্র ০.০১৮১ শতাংশ।
হিউম্যানয়েড রোবোটিক্সে এই অগ্রগতি চীনের দ্রুত বিকাশমান ‘নিউ নিউ থ্রি’ শিল্পের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এসব খাত চীনের উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদনব্যবস্থা উন্নয়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল স্তম্ভ হিসেবে উঠে আসছে।

বিশ্বে হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯৭ ভাগ চীনের দখলে

Saturday, August 1, 2026

সেমিকন্ডাক্টরে চীনের বিস্ময়কর উত্থান, আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘদিন ধরে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর প্রাধান্য থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ধারাবাহিক অগ্রগতি বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত লিথোগ্রাফি মেশিনের উৎপাদন এবং চিপ নির্মাণে সাফল্য সেমিকন্ডাক্টর খাতে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, চীন প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইমার্শন ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি মেশিন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাংহাই আইশেংনা ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের বিভিন্ন লিথোগ্রাফি কোম্পানির প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি উন্নয়ন করেছে।

এদিকে, চীনের গবেষকরা দাবি করেছেন, তারা নিজস্ব এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট (ইইউভি) লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি উন্নয়নেরও দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। তদের এ দাবি সফল হলে এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ডিইউভি ও ইইউভি প্রযুক্তি

বর্তমানে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিইউভি প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষ প্রকৌশল কৌশলের মাধ্যমে ৭ ন্যানোমিটার পর্যন্ত চিপ তৈরি সম্ভব হলেও, ২, ৩ ও ৫ ন্যানোমিটারের অত্যাধুনিক প্রসেসর তৈরির জন্য ইইউভি প্রযুক্তি প্রায় অপরিহার্য।

এই উন্নত প্রযুক্তির বাণিজ্যিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান এএসএমএল-এর কার্যত একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। তাদের তৈরি ইইউভি মেশিন বিশ্বের সবচেয়ে জটিল শিল্পযন্ত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

নিষেধাজ্ঞার পরো থামেনি চীন

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলেও চীনের কাছে উন্নত চিপ, চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি এবং সফটওয়্যার রপ্তানিতে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে হুয়াওয়ে ও সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের (এসএমআইসি) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত বিদেশি প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার হারায়।

তবে এসব নিষেধাজ্ঞার পর চীন সেমিকন্ডাক্টর খাতকে জাতীয় কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। গবেষণা, উৎপাদন, যন্ত্রপাতি, উপকরণ এবং জনবল তৈরিতে দেশটি কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

হুয়াওয়ের ৭ ন্যানোমিটার চিপ ছিল বড় বার্তা

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডোর চীন সফরের সময় হুয়াওয়ে তাদের ‘মেট ৬০ প্রো’ স্মার্টফোন উন্মোচন করে। পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফোনটিতে ব্যবহৃত ৭ ন্যানোমিটার প্রসেসরটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এসএমআইসি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল এমন একটি সাফল্য, যা অনেকের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের পক্ষে এমন চিপ তৈরি করা সম্ভব হবে না বলেই ধারণা করা হয়েছিল।

পুরো সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে বেইজিং

চীনের লক্ষ্য শুধু একটি বা দুটি সফল চিপ কোম্পানি তৈরি করা নয়; বরং একটি সম্পূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। চিপ ডিজাইন, উৎপাদন যন্ত্রপাতি, উপকরণ, মেমোরি চিপ এবং ফ্যাব্রিকেশন সব খাতেই সমান্তরালভাবে বিনিয়োগ করছে দেশটি।

এরই মধ্যে চ্যাংজিন মেমরি টেকনোলজিস (সিএক্সএমটি) দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বড় ডিআরএএম মেমোরি চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ইয়াংজি মেমরি টেকনোলজিস (ওয়াইএমটিসি) উন্নত এনএএনডি ফ্ল্যাশ মেমোরি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।

পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

চীন যদি ভবিষ্যতে নিজস্ব লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, তবে বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে এএসএমএল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালস, ল্যাম রিসার্চ এবং কেএলএ-এর মতো চিপ উৎপাদন সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতে পারে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স-এর মতো মেমোরি চিপ নির্মাতারাও চীনের অগ্রগতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে বৈশ্বিক চিপ শিল্প

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দুটি পৃথক প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেমে বিভক্ত হতে পারে একটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে, অন্যটি চীনকে কেন্দ্র করে। তবে এখনও উন্নত চিপ ডিজাইনে যুক্তরাষ্ট্র, অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের টিএমএসসি এবং ইইউভি প্রযুক্তিতে এএসএমএল বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনো বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে শীর্ষে পৌঁছায়নি। তবে সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি দেশের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদে থামিয়ে রাখা কঠিন। ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবের পাশাপাশি এখন চীনের উত্থানও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি

সেমিকন্ডাক্টরে চীনের বিস্ময়কর উত্থান, আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

Sunday, July 12, 2026

রাতের তাপমাত্রা ব্যবহার করে তৈরি হবে বিদ্যুৎ by জাহিদ হোসাইন খান

রাতের আকাশ মানেই তারার ঝলক। রাত মানেই যেন পৃথিবীর বিশ্রাম। পরিষ্কার রাতে পৃথিবী নিঃশব্দে দিনের বেলা গ্রহণ করা সূর্যের তাপ মহাকাশে নির্গত করে। যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা পৃথিবীর স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে স্থিতিশীল শক্তি প্রবাহ তৈরি করার পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছেন। তাদের তৈরি করা একটি ছোট আউটডোর ইঞ্জিন রাতের আকাশকে একটি ঠান্ডা জলাধার হিসেবে ব্যবহার করে। যন্ত্রটি সারারাত ধরে উষ্ণ ও শীতল অংশের মধ্যে তাপমাত্রার একটি শক্তিশালী পার্থক্য বজায় রাখতে পারে। সেখান থেকে একটি ছোট পাখা চালানোর মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়।

এই যুগান্তকারী কাজের নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের বিজ্ঞানী জেরেমি ম্যান্ডে। সায়েন্স অ্যাডভান্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণভাবে রাতে বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের একটি স্বচ্ছ ব্যান্ড বরাবর তাপ মহাকাশে লিক হতে থাকে। এই ব্যান্ডটিকে প্রায়শই বায়ুমণ্ডলীয় জানালা বলা হয়। সেখানে বাতাস সবচেয়ে স্বচ্ছ থাকে। বিজ্ঞানীদের তৈরি যন্ত্রের নিচের প্লেটটি মাটির উষ্ণতাকে অনুসরণ করে।

যন্ত্রটিতে কয়েকটি প্লেট আছে। উষ্ণ ও শীতল প্লেটের মধ্যে প্রায় ১৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা মাইনাস ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটি স্থির তাপমাত্রার পার্থক্য দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকলে ইঞ্জিনটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় একবার ঘোরে। এতে উন্নত উপাদান ব্যবহার করে প্রতি বর্গমিটারে বেশ কয়েক ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, যন্ত্রটি সরাসরি একটি পাখা ঘোরাতে পারে। এ ছাড়া একটি ছোট মোটর যুক্ত করে পরিমিত বৈদ্যুতিক প্রবাহও তৈরি করতে পারে যন্ত্রটি। বিজ্ঞানী ম্যান্ডে বলেন, এই ইঞ্জিন খুব কার্যকর হয় যখন শুধু তাপমাত্রার পার্থক্য থাকে। যদি আপনি এটিকে কোন টেবিলের ওপর রাখেন, তবে এটি নিজে থেকে কোনো শক্তি উৎপাদন করবে না।

এই প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্টার্লিং ইঞ্জিন নামের একটি যন্ত্র। এটি বাহ্যিক তাপ ইঞ্জিন, যা আবদ্ধ গ্যাস ব্যবহার করে তাপমাত্রার পার্থক্যকে গতিতে রূপান্তরিত করে। দুটি পিস্টন ও একটি তাপ সঞ্চয়কারী রিজেনারেটর ব্যবহার করে উষ্ণ ও শীতল অঞ্চলের মধ্যে গ্যাস আদান-প্রদান করা হয় যন্ত্রটিতে। এর ফলে গ্যাস প্রসারিত হয়, তারপর সংকুচিত হয়। তখন ফ্লাইহুইল নামের বিশেষ চাকা ঘুরিয়ে শক্তি উৎপাদিত হয়। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি গ্রিনহাউস বা ভবনে রাতের বেলা স্থিতিশীল বায়ু চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা পূরণে ব্যবহার করতে আগ্রহী।

সূত্র: আর্থ

রাতের আকাশ
রাতের আকাশ। ছবি: আর্থ ডটকম

Saturday, June 6, 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ‘বিশ্বের প্রথম’ টিকা তৈরি হতে যাচ্ছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ‘নতুন’ ধরনের একটি টিকা তৈরি হতে যাচ্ছে। এটি অনেক ধরনের ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেবে এবং মহামারি প্রতিরোধ করবে বলে সম্প্রতি দাবি করেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই প্রথম কোনো টিকার মূল উপাদানগুলো পুরোপুরি এআই দিয়ে নকশা করা হয়েছে। এরই মধ্যে মানুষের ওপর এটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগও করা হয়েছে।

টিকাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা সব ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে। এর মধ্যে করোনার সব ধরনের পাশাপাশি পশুপাখির শরীরে থাকা সেসব ভাইরাসও রয়েছে, যা মানুষের মধ্যে ভবিষ্যতে মহামারি ছড়াতে পারে।

গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে কেমব্রিজের গবেষক দলটি এআইয়ের মাধ্যমে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলার জন্য আলাদা টিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে।

যেভাবে কাজ করে

টিকা মূলত আমাদের শরীরকে রোগজীবাণু চিনতে শেখায়। এর ফলে শরীর সহজে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে, তবে কিছু ভাইরাস দ্রুত তাদের রূপ বদলাতে পারে। একে মিউটেশন বা রূপান্তর বলা হয়। রূপ বদলানোর কারণে আগে টিকা দেওয়া থাকলেও তা দ্রুত কার্যকারিতা হারায়। এ কারণে করোনা ও শীতকালীন ফ্লুর টিকা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হয়।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় ভাইরাসের চেয়ে পিছিয়ে থাকি। আমাদের লক্ষ্য হলো ভাইরাসের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকা।’ তাঁরা এতটাই এগিয়ে থাকতে চান, যেন নতুন কোনো মহামারি আসার আগেই তা ঠেকানো যায়। সাধারণত প্রচলিত ভাইরাসের ধরন দেখে টিকা তৈরি করা হয়, কিন্তু কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন।

তাঁরা নজরদারি কর্মসূচির মাধ্যমে সংগ্রহ করা বিভিন্ন করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড বা বংশগতির সংকেত সংগ্রহ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে।

এরপর এআই একটি ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ তৈরি করে। এই অ্যান্টিজেন বা প্রোটিন মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করে, যা সংশ্লিষ্ট সব ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। ভাইরাস রূপ বদলালেও এই টিকা কাজ করবে। এমনকি পশু থেকে মানুষের শরীরে নতুন কোনো ভাইরাস ছড়ালেও এটি সুরক্ষা দেবে।

টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অ্যান্টিজেন। কারণ, এটি দেখেই আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শত্রু বা ভাইরাসকে আক্রমণ করতে শেখে।

অধ্যাপক হিনি বলেন, এই প্রথম এআইয়ের নকশা করা কোনো অ্যান্টিজেন মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা হলো। এই প্রযুক্তি সবাইকে চমকে দিচ্ছে। মানবজাতির কল্যাণে এটি দারুণ কাজ করবে।

কেমব্রিজের এই অধ্যাপক বিবিসি নিউজকে বলেন, ‘এই টিকার লক্ষ্য শুধু আজকের ভাইরাস থেকে সুরক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যতের মহামারি থেকে আমাদের বাঁচানো। মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিতে এটি এক বড় পরিবর্তন।’

মানুষের ওপর পরীক্ষা

টিকাটি নিরাপদ কি না, তা ট্রায়াল বা পরীক্ষা করে দেখতে ৩৯ জনের ওপর প্রথম পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এরপর প্রায় ২০০ জনের ওপর দ্বিতীয় আরেকটি পরীক্ষা চালানো হবে। এর মাধ্যমে এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করছে, তা বোঝা যাবে।

গবেষণাপত্রটি চিকিৎসাবিজ্ঞান–বিষয়ক নির্ভরযোগ্য সাময়িকী জার্নাল অব ইনফেকশনে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব এখনো ‘মাঝারি’ মাত্রার, তবে গবেষকেরা এটি নিয়ে বেশ আশাবাদী।

যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সল ফস্ট এই ট্রায়ালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, এআইয়ের এই নকশার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ নেই। এটি সত্যিই দারুণ বিষয়। ভাইরাস যখন দ্রুত রূপ বদলায়, তখন মহামারির টিকা তৈরিতে এই প্রযুক্তি অনেক ভালো কাজ করে।

কেমব্রিজের দলটি এখন সর্বজনীন ফ্লুর টিকার জন্য প্রাণীদের ওপর গবেষণা চালাচ্ছে। এই টিকা সফল হলে প্রতিবছর নতুন টিকা নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া তাঁরা এইচফাইভএনওয়ান বার্ড ফ্লুর টিকা নিয়েও কাজ করছেন।

পাশাপাশি গবেষক দলটি ভাইরাল হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী জ্বরের টিকা তৈরির চেষ্টা করছে, যার একটি রূপ হলো ইবোলা। আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে বর্তমানে এই জ্বরের যে বিশেষ ধরনটি ছড়িয়েছে, সেটার কোনো টিকা এখনো নেই।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক অধ্যাপক অ্যান্ডি পোলার্ড এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। এআই দিয়ে তৈরি এই টিকা সম্পর্কে তিনি বিবিসি নিউজকে বলেন, প্রাণীদের ওপর গবেষণায় এই প্রযুক্তির ভালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি চমৎকার একটি খবর।

তবে পোলার্ড মনে করেন, ‘মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ল্যাবরেটরির ইঁদুরের চেয়ে আলাদা। বছরের পর বছর নানা সংক্রমণের মধ্য দিয়ে আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি হয়। তাই মানুষের ওপর ট্রায়ালে কী ঘটে, সেটাই হবে আসল পরীক্ষা।’

পোলার্ড আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টিকা গবেষণার দৃশ্যপট বদলে দেবে। এর মাধ্যমে দ্রুত টিকা তৈরি করা যাবে এবং অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিচার্সের বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক মারিয়ান নাইট বলেন, এআইয়ের নকশা করা এই ট্রায়ালের সাফল্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।

যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী লর্ড ভ্যালেন্স বলেন, ‘এটি ব্রিটিশ বিজ্ঞানের আরেকটি সাফল্যের গল্প। নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনে আমরা কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করতে পারি, এটি তার বড় উদাহরণ। মানুষের ওপর প্রথম ট্রায়ালে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এই কাজ বিশ্বজুড়ে দ্রুত টিকা পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।’ -বিবিসি

মহামারি ঠেকাতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
মহামারি ঠেকাতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Tuesday, May 19, 2026

২০০ বছর ধরে প্রভাবশালী দেশগুলো আকাশপথে কীভাবে নজরদারি চালাচ্ছে by ফাহমিদা আক্তার

সম্প্রতি বেলজিয়ামের একটি বিমানঘাঁটি এলাকায় কয়েকটি সন্দেহজনক ড্রোন শনাক্ত হয়। ২ নভেম্বর দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, বেলজিয়ামের ‘সামরিক যুদ্ধবিমানের ওপর নজরদারি করতে’ ড্রোনগুলো সেখানে পাঠিয়েছে কেউ। এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো একে অপরের ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় মত্ত। আর তা করতে গিয়ে দেশগুলো অনেক সময় একে অপরের কর্মকাণ্ডের দিকে গোপনে নজর রাখে। এসব নজরদারির ঘটনা যখন সামনে আসে তখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা। একসঙ্গে বিস্তৃত এলাকাকে নজরদারির আওতায় রাখতে অনেক বছর আগে থেকেই আকাশপথকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে আকাশপথে নজরদারির মাধ্যমগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

২০২৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় শনাক্ত হয় একটি চীনা বেলুন। প্রায় ২০০ ফুট উঁচুতে ভেসে ছিল সেটি। এর নিচে ঝুলে ছিল অন্তত ৩০ ফুট চওড়া একটি ফ্রেম। দক্ষিণ ক্যারোলাইনা উপকূলে এফ-২২ যুদ্ধবিমানের সাহায্যে বেলুনটি ভূপাতিত করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় বেশ হইচই শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্র তখন অভিযোগ করেছিল, এটি চীনের নজরদারি বেলুন। এর সঙ্গে নজরদারির সামগ্রী যুক্ত ছিল বলে দাবি করে তারা। তবে চীন দাবি করে, এটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী বেলুন ছিল এবং বেসামরিক গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রবল বাতাসের কারণে বেলুনটি পথভ্রষ্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছিল।

বেলুন হলো আকাশপথে নজরদারির প্রাচীনতম মাধ্যমগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনারা যুক্তরাষ্ট্রে অগ্নিসংযোগকারী বোমা ফেলার জন্য এ ধরনের বেলুন ব্যবহার করতেন। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালেও যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাপকভাবে বেলুনের ব্যবহার করেছিল। তবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এ সময়ে এসেও ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে নজরদারির কাজে বেলুনের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে।

এক দেশ আরেক দেশের ওপর নজরদারি চালাতে আজকাল নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ঠিকই, তবে এ ক্ষেত্রে ওপর থেকে (আকাশ থেকে) নজরদারিকে সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচনা করা হয়।

আকাশ থেকে নজরদারির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের ইমেরিটাস কিউরেটর টম ডি ক্রাউচ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শত্রুরেখার পেছনের অংশে কী আছে, তা যতটা বেশি সম্ভব নজরে রাখার জন্য উঁচুতে উঠে পর্যবেক্ষণ করাটাই সব সময় কার্যকর।

২০০ বছরের বেশি সময় ধরে আকাশপথে বিভিন্ন মাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক দেশ আরেক দেশের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে। ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত বেলুন থেকে শুরু করে ঘুড়ি, ক্যামেরাবাহী কবুতর, গোয়েন্দা উড়োজাহাজ, ড্রোন, স্যাটেলাইটসহ নানা মাধ্যমের ব্যবহার দেখা গেছে।

গোয়েন্দা বেলুন

১৭৯০-এর দশকের শুরুর দিকে ফরাসিরা যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি চালাতে সর্বপ্রথম গোয়েন্দা বেলুনের ব্যবহার শুরু করেন। বেলুনগুলো হাইড্রোজেন গ্যাসে ভরা থাকত। এগুলো যে শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় গিয়ে ওড়াউড়ি করত, এমন নয়। এগুলোকে নিজেদের সীমান্ত এলাকায় একধরনের তারের সাহায্যে আটকে রাখা হতো।

বেলুনের সঙ্গে যুক্ত ঝুড়িতে দুজন সেনা বসতে পারতেন। তাঁদের একজন দুরবিন দিয়ে শত্রুপক্ষের অবস্থান দেখতেন। আর অন্যজন পতাকা ব্যবহার করে ভূমিতে থাকা কর্মকর্তাদের কাছে সংকেত পাঠাতেন।

ইতিহাসবিদ এবং ইন্টারন্যাশনাল স্পাই মিউজিয়ামের কিউরেটর অ্যান্ড্রু হ্যামন্ড বলেন, আকাশ পরিষ্কার থাকলে ওই ধরনের বেলুনে চড়ে ৫০ মাইল দূর পর্যন্ত দেখা যেত।

যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ চলার সময় উদ্ভাবক থ্যাডেউস লোও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সামনে একটি গোয়েন্দা বেলুন প্রদর্শন করেন। লিংকন তখন ওই বেলুনের কার্যকারিতা দেখে মুগ্ধ হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন আর্মি গোয়েন্দা বেলুনের ব্যবহার শুরু করে। সবচেয়ে বড় বেলুনটির নাম ছিল ইনট্রেপিড। এটিতে একজন টেলিগ্রাফ অপারেটরসহ পাঁচজন বসতে পারতেন।

ঘুড়ি ব্যবহার করে আকাশ থেকে ছবি তোলা

১৮৮০-এর দশকে ব্রিটিশ আবহাওয়াবিদ ডগলাস আর্চিবল্ড বড় ক্যানভাস ঘুড়ি দিয়ে বাতাসের গতিবেগ পরিমাপ করতেন। তিনি ঘুড়িতে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখতেন আর দূর থেকে একটি কেব্‌লের সাহায্যে ক্যামেরার শাটারটি চালাতেন।

আর্চিবল্ডের তোলা ছবিগুলো ওই সময় বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল। ছবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সেনা করপোরাল উইলিয়াম এড্ডির নজরে আসে। ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন যুদ্ধ চলাকালে এড্ডি নিজেই ঘুড়িতে ক্যামেরা লাগিয়ে শত্রুর অবস্থানের ছবি তুলেছিলেন।

গৃহযুদ্ধের সময় সাধারণ ফটোগ্রাফি চালু ছিল ঠিকই, তবে এড্ডির ঘুড়ি দিয়ে তোলা ছবিকেই সামরিক উড়োজাহাজ থেকে তোলা প্রথম নজরদারির ছবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

ক্যামেরা বহনকারী কবুতর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কবুতর যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। কবুতরগুলো আটকে পড়া নাবিকদের সাহায্য চেয়ে পাঠানো বার্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দিত। গুপ্তচরদের পাঠানো সাংকেতিক বার্তাগুলোও যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দিত। কবুতরের মাধ্যমে আকাশ থেকে ছবি তোলারও চেষ্টা করা হতো।

১৯০৭ সালে জার্মান ফার্মাসিস্ট জুলিয়াস নিউব্রোনার কবুতরের গায়ে লাগিয়ে ব্যবহার উপযোগী একটি ক্যামেরা উদ্ভাবন করেন এবং এটির পেটেন্ট পান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনারা এভাবে কবুতর দিয়ে ছবি তোলা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদ হ্যামন্ড বলেন, তাঁরা আসলেই কবুতরের সঙ্গে ক্যামেরা বেঁধে ফ্রান্সের পরিখাগুলোতে পাঠাতেন; কিন্তু ছবি অস্পষ্ট হতো এবং বোঝা কঠিন হতো।

সিআইএও হালকা ওজনের কবুতরের ক্যামেরার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিল। তবে কবুতরগুলো নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।

প্রথম নজরদারি উড়োজাহাজ এবং কোডাক ক্যামেরা

সর্বপ্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে উড়োজাহাজের ব্যবহার শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। তবে শুরুতে এগুলোকে যুদ্ধবিমান বা বোমারু বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হতো না। তখন উড়োজাহাজের কাজ ছিল কেবল নজরদারি চালানো। দুই আসনের উড়োজাহাজে একজন পাইলট এবং একজন পর্যবেক্ষক থাকতেন। ওই পর্যবেক্ষক দুরবিন ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতেন।

এরপর উড়োজাহাজে ক্যামেরা বসানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোডাক কোম্পানি এ ধরনের ক্যামেরা তৈরি করে। কোডাকের রচেস্টার সদর দপ্তরে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু ছিল। সেখানে সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারির জন্য সহায়ক ছবি তোলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ নজরদারি বিমানগুলোতে অস্থায়ী ডার্করুম বসানো হয়। সেখানে যথাযথ সময়ে ছবিগুলো প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণ করা যেত। স্নায়ুযুদ্ধের সময় রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি স্থলভাগে গুপ্তচরবৃত্তি প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল। তাই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা তখন আকাশের দিকে মনোযোগ দিয়েছিল।

প্রথম গোয়েন্দা স্যাটেলাইট

যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যে শুধু কার আগে কে চাঁদে পৌঁছাবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করত, তা নয়। কে প্রথম কক্ষপথে গোয়েন্দা স্যাটেলাইট পাঠাবে, তা নিয়েও প্রতিযোগিতায় মেতেছিল তারা।

১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ডিসকোভারার নামের একটি কর্মসূচি চালু করে। আদতে এটি ছিল প্রজেক্ট করোনা নামের একটি গোপন গোয়েন্দা কর্মসূচি। এর মধ্য দিয়ে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হতো।

১৯৬০ সালে প্রথমবারের মতো গোয়েন্দা স্যাটেলাইটগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নে নজরদারির ছবি পাঠানো শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে হেক্সাগন কেএইচ-৯ নামের স্যাটেলাইটের ব্যবহার শুরু হয়। এ স্যাটেলাইট ১০০ মাইল উঁচু থেকে ২ ফুট আকারের ছোট বস্তুরও ছবি নিতে পারত।

সিআইএর ড্রাগনফ্লাই ড্রোন

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর জাদুঘরে থাকা সবচেয়ে আলোচিত যন্ত্রগুলোর একটি হলো ইনসেক্টোথোপটার। এটি একধরনের গোপন শোনার যন্ত্র, যা দেখতে একদমই ফড়িংয়ের মতো ছিল। সে জন্য এটিকে ড্রাগনফ্লাই ড্রোন বলা হতো। সিআইএ ১৯৭০-এর দশকে এটি তৈরি করে।

ইনসেক্টোথোপটারের স্বচ্ছ ডানায় ছোট একটি গ্যাসোলিন ইঞ্জিন লাগানো ছিল। ৬০ সেকেন্ডে দুটি ফুটবল মাঠের দূরত্ব অতিক্রম করার সক্ষমতা ছিল এটির।

ইনসেক্টোথোপটার এমনভাবে তৈরি হয়েছিল, যেন একজন অপারেটর লেজার বিম ব্যবহার করে এটির ওড়াউড়িকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং মাইক্রোফোনে ধারণ করা অডিও শুনতে পাওয়া যায়। তবে ইনসেক্টোথোপটার যন্ত্রটিকে কার্যকরভাবে চালানো যায়নি। কারণ, বাতাসের গতি ঘণ্টায় পাঁচ মাইলের বেশি হলেই এটি ভেঙে যেত।

প্রথম চালকবিহীন উড়োজাহাজ বা ড্রোন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ এরিয়াল টার্গেট নামের একটি রেডিও–কন্ট্রোলড উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়। ওই সময় ব্রিটিশ সেনাদের আকাশে নিশানা করার প্রশিক্ষণ দিতে এ ধরনের উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী চালকবিহীন এ উড়োজাহাজের নাম দেন কুইন বি। এটি ছিল পুনর্ব্যবহারযোগ্য। যুদ্ধবিমানের চালকেরা এটিকে নিশানা করার মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ চালাতেন। ব্রিটিশ উড়োজাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ডি হাভিল্যান্ড এই কুইন বি উড়োজাহাজ তৈরি করেছিল।

উড়োজাহাজটির রাডার ও এলিভেটর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোম্পানিটি একটি রেডিও-নিয়ন্ত্রিত সার্ভো ব্যবহার করেছিল। ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, এই মৌমাছি থিমযুক্ত চালকবিহীন বিমান থেকেই ‘ড্রোন’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নজরদারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে সর্বপ্রথম ভিয়েতনাম যুদ্ধে জেটচালিত নজরদারি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। এটির নাম ছিল একিউএম-৩৪ রায়ান ফায়ারবি।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৩৪ হাজারের বেশি নজরদারি মিশনে এ ড্রোন ব্যবহার করা হয়। রাডারকে ফাঁকি দিয়ে চলাচলের উপযোগী করে এটির রং করা হয়েছিল। এটি যেমন শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করত, পাশাপাশি শত্রুপক্ষের সীমানায় প্রচারপত্র ছড়াতেও এটিকে ব্যবহার করা হতো।

এ তো গেল পুরোনো ধাঁচের সব নজরদারি মাধ্যমের কথা। তবে প্রযুক্তিতে পুরোনো হলেও এগুলো নতুনরূপে এখনো ফিরে আসছে এবং এগুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করে পরীক্ষা–নিরীক্ষা চলছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ফিল্ড মার্শাল জোহানেস আরভিন রোমেল একবার বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে স্থলযুদ্ধের শুরুটা আকাশ থেকেই হবে। এর মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয়ে যাবে, কোন পক্ষ অভিযান পরিচালনায় ও কৌশলগতভাবে দুর্বল হবে এবং যুদ্ধ চলাকালে বারবার সমঝোতার পথে যেতে বাধ্য হবে।’

রোমেলের এ কথাটি আজকের দিনে আগের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রগুলো এখনো অন্য দেশে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য স্যাটেলাইট, ড্রোনসহ নানা অত্যাধুনিক মাধ্যম ব্যবহার করছে। হয়তো এটি যুদ্ধবিমানের মুখোমুখি লড়াইয়ের বিষয় নয়। তবু এটি আকাশে আধিপত্য বজায় রাখার এক লড়াই হিসেবে থেকে গেছে। নজরদারির মাধ্যমগুলোতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিও যুক্ত করা হচ্ছে।

এখন কথা হলো, আকাশপথে অন্য দেশের ওপর নজরদারির বিষয়টি কতটা হুমকির। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশকারী ওয়েবসাইট মডার্ন ডিপ্লোমেসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, নজরদারি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য হুমকি তৈরি করে, নাগরিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে। প্রতিপক্ষের সামরিক ও নাগরিক স্থাপনা তাদের অনুমতি ছাড়া পর্যবেক্ষণ করাটা নৈতিকভাবে অনুচিত।

একইভাবে নজরদারি তথ্যের ভুল বিশ্লেষণের কারণে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভুল–বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া নজরদারি তথ্যের অপব্যবহার বা ডিভাইস হ্যাক হলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে স্পর্শকাতর তথ্য চলে যেতে পারে। এতে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ ধরনের নজরদারির কাজগুলো নিয়মিত নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের উচিত যুদ্ধবিধি এবং মানবাধিকার আইন মেনে নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা।

সূত্র: হিস্ট্রি ডট কম, এনপিআর, বিবিসি, রয়টার্স

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-10%2Fam535c8z%2FThumn-04.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Sunday, May 17, 2026

এআই নিয়ে কেন বিশ্বজুড়ে এত আলোচনা, কেনই–বা এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা by মো. মিন্টু হোসেন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত। মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, এআই বাজারের আকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার ৩৪৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৩ সালে এআই বাজার ছিল মাত্র ১৫০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

শিল্প খাতে এআইয়ের দ্রুত বিস্তার ইতিমধ্যে চোখে পড়ছে। আইবিএমের ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের ৪২ শতাংশ বড় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রমে এআই যুক্ত করেছে, আর অতিরিক্ত ৪০ শতাংশ সংস্থা এই প্রযুক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনায় করছে।

এই প্রযুক্তি গ্রহণের ঢেউ এখন জেনারেটিভ এআইয়ের ক্ষেত্রেও প্রবাহিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, জেনারেটিভ এআই হলো একধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা কোনো নির্দেশ মেনে জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করে পাঠ্য, ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য ডেটা তৈরি করতে সক্ষম। বর্তমানে ৩৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের অংশ হিসেবে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট কর্মীর ৪৯ শতাংশের প্রায় অর্ধেক কাজেই কোনো না কোনোভাবে এআই জড়িত থাকবে, যা কর্মপরিবেশ ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন আমূল বদলে দেবে।

২০৩০ সালে এআইয়ের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস

এই দশকের শেষে এআইয়ের সক্ষমতা কোথায় পৌঁছাবে? প্রযুক্তিবিদদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন কিছু যুগান্তকারী উন্নয়নের মধ্য দিয়ে যাবে, যা বর্তমান ব্যবস্থার পরিধিকে ছাড়িয়ে যাবে। শুধু বিদ্যমান এআইকে আরও কার্যকর করা নয়—এই অগ্রগতি শিল্প খাতজুড়ে এক মৌলিক পরিবর্তন আনবে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং শতগুণ দ্রুত কর্মক্ষমতা অর্জন করবে

কোয়ান্টাম এআই হলো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক শক্তিশালী সমন্বয়। এই প্রযুক্তিতথ্য প্রক্রিয়াকরণের এমন গতি এনে দেয়, যা আজকের সর্বাধুনিক কম্পিউটারগুলোকেও প্রাচীন মনে হয়।

এর মূল রহস্য হলো কোয়ান্টাম বিট বা কিউবিট, যা একই সময়ে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে—এটিকে বলা হয় সুপারপজিশন। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিছু গণনা প্রচলিত সিস্টেমের তুলনায় বহু গুণ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে।

প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, কোয়ান্টাম এআইয়ের মাধ্যমে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ গুণ বেশি পারফরম্যান্স অর্জন সম্ভব। ইতিমধ্যে মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল ও আইবিএমের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং অ্যাজ–এ সার্ভিস হিসেবে এটি চালু করেছে।

কোয়ান্টাম এআই প্রযুক্তি ওষুধ উদ্ভাবন, বাজার বিশ্লেষণ আরও গভীরভাবে করে ঝুঁকি মূল্যায়ন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়ানোসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

কোয়ান্টাম সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ের কোয়ান্টাম ট্রান্সফরমার কাজ করলেও চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো সিস্টেমের সক্ষমতা অর্জনে কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের শত শত কিউবিট ব্যবহার করে নতুন কোড তৈরি করতে হবে।

বৃহৎ ভাষা মডেলের বিকল্প হবে ছোট এআই মডেল

বৃহৎ ভাষা মডেল বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) নিয়ে যত আকর্ষণই থাকুক না কেন, এখন শিল্প খাতে এক বিপরীত ধারা দেখা যাচ্ছে। আইবিএম, গুগল, মাইক্রোসফট এবং ওপেনএআই—সবাই সম্প্রতি এমন কিছু ছোট ভাষা মডেল (স্মল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এসএলএম) প্রকাশ করেছে, যেগুলো মাত্র কয়েক বিলিয়ন প্যারামিটারে চলে, বৃহৎ মডেলগুলোর তুলনায় অনেক ছোট আকারে।

এসব ক্ষুদ্র মডেল নির্দিষ্ট ও সীমিত কাজের ক্ষেত্রেই অসাধারণ ফল দেখাচ্ছে—যেমন কথোপকথন সংক্ষেপ করা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে হেলথকেয়ার চ্যাটবট হিসেবে কাজ করা কিংবা স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা। এগুলো ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনে সরাসরি চলতে পারে, বিশাল ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয় না। ফলে খরচ কমে, পরিবেশের ওপর প্রভাবও হ্রাস পায় এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আরও সুরক্ষিত থাকে।

গবেষকেরা এই ছোট মডেলগুলোকে আরও কার্যকর করতে নলেজ ডিস্টিলেশন ও প্রুনিংয়ের মতো কৌশল ব্যবহার করছেন। নলেজ ডিস্টিলেশনে বড় মডেল থেকে শেখা তথ্য ছোট মডেলে স্থানান্তর করা হয়, আর প্রুনিং প্রক্রিয়ায় নিউরাল নেটওয়ার্কের অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া হয়। ফলে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী এই ছোট মডেলগুলো সহজেই কাস্টমাইজ করা যায়।

মাল্টিমোডাল এআই টেক্সট ও ছবির সীমা পেরিয়ে যাবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ কেবল লেখা বা টেক্সট বোঝাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে মাল্টিমোডাল এআই সিস্টেম একসঙ্গে টেক্সট, ছবি, অডিও, ভিডিও ও ডকুমেন্ট প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে, যা প্রধান ধারার প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এগুলোর শক্তি কোথায়? বর্তমান এআই সাধারণত একধরনের তথ্য নিয়ে কাজ করে, কিন্তু মাল্টিমোডাল সিস্টেম একাধিক তথ্যধারা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে—মানুষের যোগাযোগের ধরনকে অনেক বেশি বাস্তবভাবে অনুকরণ করে।

এক শিল্পবিশেষজ্ঞের ভাষায়, ‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবে মাল্টিমোডাল যোগাযোগকারী, তাই এআই-ও এখন টেক্সটভিত্তিক সীমিত যোগাযোগ থেকে জটিল, বহুমাত্রিক যোগাযোগের দিকে এগোচ্ছে।’ এই পদ্ধতির ফলে এআই এখন দৃশ্য, শব্দ ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য মিলিয়ে আরও প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবসম্মত দ্বিমুখী কথোপকথন চালাতে পারবে, যা সত্যিকার অর্থে ‘মানুষসদৃশ’ যোগাযোগের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে।

শিল্পে আধিপত্য বিস্তার করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। বিশেষত স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন শিল্প ও আর্থিক খাত—এই তিন ক্ষেত্রের পরিবর্তন হবে সবচেয়ে গভীর ও বিস্তৃত।

২০২৮ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ রোগ নির্ণয়প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হবে। বর্তমানে ভুল রোগনির্ণয়ের কারণে প্রায় ১০ শতাংশ রোগীর মৃত্যু ও ১৭ শতাংশ জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্যসেবা খাত দ্রুত এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করছে।

চিকিৎসায় রোগনির্ণয়ে এআইয়ের বৈশ্বিক বাজার ২০২৩ সালের ১৩০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২৮ সালে ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ২৩ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রথম দিকে এআই চিকিৎসকদের সহায়ক সরঞ্জাম হিসেবেই কাজ করবে, প্রতিস্থাপক নয়। তবে সময়ের সঙ্গে চিকিৎসক-এআই সহযোগিতা আরও নির্ভুলতা আনবে এবং শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় এআইয়ের প্রতি আস্থা তৈরি হবে।

উৎপাদন শিল্পে প্রভাব রাখবে

বিশ্ব অর্থনীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে এআই প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা বর্তমানে বৈশ্বিক জিডিপির তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে উৎপাদন খাত একাই পাবে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত মূল্য।

যেসব প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই এআইয়ে বিনিয়োগ করবে, তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, আগে এআই ব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানগুলো দশকের শেষে তাদের নগদ প্রবাহ দ্বিগুণ করতে পারে এবং বার্ষিক গড় ৬ শতাংশ অতিরিক্ত বৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

কর্মসংস্থানে এআইয়ের প্রভাব

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও শিল্পপ্রয়োগ ছাড়াও এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে এআই কীভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কাঠামো বদলে দেবে। নতুন গবেষণা বলছে, এতে যেমন বিশাল বদল আসবে, তেমনি নতুন সুযোগও তৈরি হবে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআই বৈশ্বিকভাবে ৪০ শতাংশের বেশি চাকরিকে প্রভাবিত করতে পারে, যাকে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন ‘ডিসরাপশন থ্রেশহোল্ড’। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০৩০ সালের মধ্যে মোট কর্মঘণ্টার ৩০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয় হতে পারে, বিশেষ করে জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে। এতে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ মানুষকে সম্পূর্ণ নতুন পেশায় যেতে হতে পারে। এই প্রভাব অবশ্য সবার জন্য সমান নয়।

নারীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে—তাঁদের ৩৬ শতাংশ এমন পেশায়, যেখানে জেনারেটিভ এআই কাজের সময় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৫ শতাংশ। কম আয়ের কর্মীরা (যাঁদের বার্ষিক আয় ৩৮ হাজার ২০০ ডলারের নিচে) সর্বোচ্চ আয়কারীদের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি হারে পেশা পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

নতুন পেশার উত্থান ঘটবে

যদিও কর্মক্ষেত্রে চাকরি হারানো নিয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে। তবে বাস্তবে এআই তৈরি করছে একদম নতুন পেশার দিগন্ত। ২০৩০ সালের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতভিত্তিক চাকরির চাহিদা ২৩ শতাংশ বাড়বে, আর এআই ও মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞদের চাহিদা ২০২৭ সাল পর্যন্ত ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

বেশি চাহিদা বাড়বে ডেটা অ্যানালিস্ট ও ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন বিশেষজ্ঞ (৩০-৩৫ শতাংশ), স্বাস্থ্যসেবা টেকনিশিয়ান ও পেশাজীবী (প্রায় ৩৫ লাখ ও ২০ লাখ নতুন চাকরি), এআই ট্রেইনার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার ও প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারের।

কর্মী প্রশিক্ষণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ৪২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এআইভিত্তিক প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেবে, আর ৩৬ শতাংশ সংস্থা বিদ্যমান কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে—এআইয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য।

লড়াই এশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্রের

বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের চিত্রে অঞ্চলভেদে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ও বিনিয়োগের ধারা দেখা যাচ্ছে, যা ২০৩০ সাল পর্যন্ত এআইয়ের গতিপথ নির্ধারণ করবে। প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকারের প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন অঞ্চলে সুস্পষ্ট নেতৃত্ব ও কৌশল গড়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০১৮ সালে চীনকে পেছনে ফেলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

এই নেতৃত্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় বেসরকারি বিনিয়োগে, যেখানে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭২০ কোটি ডলার, আর চীনে ছিল ৭৮০ কোটি ডলার। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্র ৬১টি গুরুত্বপূর্ণ মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি করেছে, যা চীনের ১৫টির তুলনায় অনেক বেশি।

তবু চীন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগামী। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটি ৪৪ হাজারের বেশি এআই পেটেন্ট অনুমোদন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ হাজারের প্রায় তিন গুণ।

বৃহত্তর আঞ্চলিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির হার অর্জন করবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কে কী বলছেন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এ খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা নতুন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, এই ভবিষ্যৎ এখনো বহু দূরে, আবার কারও কাছে তা যেন একেবারে দোরগোড়ায়। এআইয়ের সবচেয়ে পরিচিত নাম ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান সম্প্রতি বলেছেন, মানুষ এআইয়ের সঙ্গে ক্রমেই বেশি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলছে এবং এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে।

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং বলেন, ‘আমরা এখনো এআই বিপ্লবের শুরুতেই আছি।’ তাঁর মতে, এআই মানুষের কাজের ধরন পাল্টে দেবে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে এবং নতুন নতুন ধারণা অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

মেটার প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের মতে, সুপারইন্টেলিজেন্স এখন নাগালের মধ্যে বা দোরগোড়ায়। তাঁর ভাষায়, ‘এআই আমাদের বিদ্যমান প্রতিটি ব্যবস্থাকে উন্নত করবে এবং এমন সবকিছু তৈরি করবে, যা আজ কল্পনাতেও নেই।’

অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তিনি মনে করেন, এটি এমন এক যুগ নিয়ে আসবে, যেখানে মানুষ কম কাজ করবে, আর রোবট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ভার বহন করবে।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোডেই মনে করেন, হোয়াইট-কলার বা অফিসভিত্তিক চাকরিজীবীদের এখন থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এআই আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই প্রায় অর্ধেক এন্ট্রি-লেভেল চাকরি প্রতিস্থাপন করতে পারে এবং ১০-২০ শতাংশ বেকারত্ব তৈরি হতে পারে।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ভিন্নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বোঝা যায়, এটি একদিকে বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, কোয়ার্টজ ম্যাগাজিন, নেটগুরু, টেকনোলজি ম্যাগাজিন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। ছবি রয়টার্স

Monday, May 11, 2026

ধানের দানার চেয়ে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের ইমপ্ল্যান্ট উদ্ভাবন by আহসান হাবীব

নিউরো প্রযুক্তির অগ্রগতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন একদল গবেষক। ধানের দানার চেয়ে ছোট একটি মস্তিষ্কের ইমপ্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে। এটি মস্তিষ্কের ভেতরের বৈদ্যুতিক সংকেত পর্যবেক্ষণ ও তারহীন তথ্য পাঠাতে সক্ষম। মাইক্রোস্কেল অপটোইলেকট্রনিক টেথারলেস ইলেকট্রোড বা মোট নামের এই যন্ত্র আকারে ক্ষুদ্র। এর কার্যক্ষমতা ও নির্ভুলতা ভবিষ্যতের স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনা বলে বিবেচিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী অ্যালিওশা মলনার বলেন, ‘আমাদের জানামতে, এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ছোট স্নায়ু ইমপ্ল্যান্ট। এটি মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ মাপতে ও তথ্য তারহীন প্রেরণ করতে পারে। মানবচুলের প্রস্থের প্রায় সমান বা মাত্র ৩০০ মাইক্রোমিটার লম্বা ও ৭০ মাইক্রোমিটার চওড়া এই ইমপ্ল্যান্ট। এটি ইনফ্রারেড আলোর মাধ্যমে স্নায়ুসংকেত কোডে রূপান্তর করে। পরে সেই সংকেত মস্তিষ্কের টিস্যু ও হাড় ভেদ করে নির্দিষ্ট রিসিভারে পৌঁছায়।

বিজ্ঞানী মলনার ২০০১ সালে এই ধারণা প্রথম উপস্থাপন করেন। প্রায় দুই দশকের গবেষণা ও পরীক্ষার পর সেটি বাস্তব রূপ পেল। অ্যালুমিনিয়াম গ্যালিয়াম আর্সেনাইড নামের সেমিকন্ডাক্টর উপাদান দিয়ে তৈরি এই ডায়োডভিত্তিক যন্ত্রটি একই সঙ্গে আলো ব্যবহার করে শক্তি আহরণ ও তথ্য প্রেরণ করতে পারে।

গবেষকেরা জানান, ইমপ্ল্যান্টে ব্যবহৃত প্রযুক্তি আধুনিক মাইক্রোচিপের নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। অপটিক্যাল এনকোডার ও লো নয়েজ অ্যামপ্লিফায়ারের মাধ্যমে এটি সংকেতকে আরও পরিষ্কারভাবে প্রেরণ করতে পারে। ডেটা পাঠাতে ব্যবহৃত হয়েছে পালস পজিশন মড্যুলেশন। বিজ্ঞানী মলনার বলেন, এই ইমপ্ল্যান্ট অত্যন্ত অল্প বিদ্যুৎ ব্যবহার করেই নির্ভুলভাবে তথ্য পাঠাতে পারে।

গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে যন্ত্রটি ল্যাবরেটরিতে প্রস্তুত সেল কালচারে পরীক্ষা করা হয়েছে। ইঁদুরের মস্তিষ্কের ব্যারেল কর্টেক্সে প্রতিস্থাপন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ইমপ্ল্যান্টটি এক বছরের বেশি সময় ধরে ইঁদুরের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ও স্নায়ুসংযোগের ধরন স্থিতিশীলভাবে ধারণ (রেকর্ড) করেছে। বিজ্ঞানী মলনার আরও বলেন, ‘প্রচলিত ইলেকট্রোড ও ফাইবার অনেক সময় মস্তিষ্কে জ্বালা বা প্রদাহ সৃষ্টি করে। টিস্যু ক্রমাগত নড়াচড়া করে বলে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমরা এমন এক ইমপ্ল্যান্ট তৈরি করতে চেয়েছি, যা বেশ ক্ষুদ্র হলেও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন না ঘটিয়ে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে। অন্যান্য সংবেদনশীল অঙ্গে, যেমন মেরুদণ্ডে এটি ব্যবহারের সুযোগ আছে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

ধানের দানার চেয়ে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের ইমপ্ল্যান্ট উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা
ধানের দানার চেয়ে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের ইমপ্ল্যান্ট উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

Monday, April 6, 2026

চীন কি যুদ্ধের জন্য রোবট সৈন্য তৈরি করছে, আসলে কী

মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবটরা হাতে অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, চীনের সামরিক বাহিনী রোবট সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওর পোস্টে লেখা হয়েছে, চীন আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক পরিষেবার প্রস্তুতির জন্য রোবটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। চীনের রোবট ‘ইউনিট্রি’–এর (ইউশু) সরাসরি গুলি চালানোর পরীক্ষাটি দেখে মনে হচ্ছে, যেন এটি এআই দিয়ে তৈরি। এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ভবিষ্যতে যুদ্ধের জন্য হয়তো আর মানুষের প্রয়োজন হবে না।

    🚨 ⚡️ BREAKING NEWS
    China officially begins training robots in preparation for military service.
    The live-fire testing of the Chinese robot "Unitree" (Yushu) looks as if it were generated by AI.
    This is fascinating; in the future, wars may no longer require humans. 🫠 pic.twitter.com/aCzRZ7QI9R
    — RussiaNews 🇷🇺 (@mog_russEN) February 18, 2026

তবে ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এআই গ্রোক–এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভিডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে।

গ্রোকের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ‘না, এ ভিডিওটি এআই জেনারেটেড বা বানোয়াট বলে মনে হচ্ছে। ২০২৬ সালে চীনের সামরিক বাহিনীর লাইভ ফায়ার পরীক্ষায় ইউনিট্রি হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের যাচাই করা কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।’

গ্রোকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউনিট্রি রোবটের আসল প্রদর্শনীগুলো মূলত সাধারণ কাজের জন্য ছিল, যেমন বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। অতীতের সামরিক পরীক্ষাগুলোয় চার পায়ের রোবট ব্যবহার করা হয়েছিল, মানুষের মতো রোবট সৈন্য নয়।
অনলাইনে এ ধরনের দাবি এবারই প্রথম নয়।

এর আগেও ভাইরাল হওয়া পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) কাছাকাছি এলাকায় টহলের জন্য এআই–চালিত রোবট মোতায়েন করেছে।
চীন আলাদাভাবে ঘোষণা দিয়েছে, তারা প্রধান প্রধান সীমান্ত পারাপার এলাকায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সহায়তার মতো অ–সামরিক কাজের জন্য হিউম্যানয়েড রোবটের পরীক্ষা চালাচ্ছে। শেনজেনভিত্তিক ইউবিটেক রোবোটিকস একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় ভিয়েতনাম সীমান্তে হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের চুক্তি সই করেছে।

এই পরীক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে ‘ওয়াকার এস২’, যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উন্মোচন করা উন্নত মানের হিউম্যানয়েড রোবট। এটিকে বিশ্বের প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যে রোবট নিজেই নিজের ব্যাটারি পরিবর্তন করতে পারে।

এর ফলে এই রোবট দীর্ঘ সময় ধরে নিজে থেকেই কাজ করতে সক্ষম, যা লজিস্টিক, কাস্টমস ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক বৈশিষ্ট্য।

হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে চিনের বিশেষ চেষ্টা

সর্বশেষ ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন চীন হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির চেষ্টা আরও জোরদার করছে। চীনের কোম্পানি ইউনিট্রি রোবোটিকস সম্প্রতি একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে মানুষের সঙ্গে হিউম্যানয়েড রোবটদের মার্শাল আর্ট প্রদর্শন করে দেখিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছে।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ‘ম্যাজিকল্যাব’ একই অনুষ্ঠানে রোবটদের নাচের প্রদর্শন করেছে। আবার ‘নোয়েটিক্স রোবোটিকস’ অবিকল মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড প্রদর্শন করেছে। বেইজিংভিত্তিক ‘গ্যালবট’ এমন রোবট দেখিয়েছে, যেগুলো আখরোট ভাঙা, সসেজ বানানো ও কাপড় ভাঁজ করার মতো দৈনন্দিন কাজ করতে সক্ষম।

সিএনএনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান শ্রম খরচ ও কমতে থাকা কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যেও বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চীন রোবোটিকস খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের তথ্যমতে, চীন বিশ্বের বৃহত্তম ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট বাজার হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী যত রোবট বসানো হয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি হয়েছে চীনে।

অবশ্য বর্তমানে হিউম্যানয়েড রোবট মূলত বিনোদন ও প্রদর্শনীতে বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে চীন সরকারের বিপুল ভর্তুকিতে কয়েক ডজন কোম্পানি এগুলোকে বর্তমানে কারখানা, লজিস্টিক সেন্টার ও গবেষণাগারে পরীক্ষা করছে।

ছবিটি এক্সে দেওয়া ভিডিও থেকে নেওয়া
ছবিটি এক্সে দেওয়া ভিডিও থেকে নেওয়া

Thursday, December 11, 2025

চীনের ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্রের’ ভবিষ্যৎ কী by লুদোভিক সুবরাঁ

চীনে এখন আরেকটি বড় রূপান্তর চলছে। বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন দ্রুত একটি ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্রে’ পরিণত হচ্ছে। এর অর্থনীতি দিন দিন কার্বনমুক্ত জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এই নতুন মডেলে অনেক সম্ভাবনা আছে। তবে বড় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

কার্বনমুক্ত প্রযুক্তির উৎপাদনে চীন এখন বিশ্বের একক নেতা। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও ব্যাটারির যন্ত্রপাতি উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। শুধু সৌর প্যানেলের ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক উৎপাদনের ৮০ শতাংশের বেশি চীনেই হয়। এ বিশাল উৎপাদনের কারণে খরচ অনেক কমে গেছে। যেমন গত ১০ বছরে সৌর প্যানেলের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।

চীন বিরল মৃত্তিকা খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’-এর দখলও অনেকটা নিজের হাতে নিয়েছে। এসব খনিজ বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ু টারবাইন ও এআই সেন্সর তৈরিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বের রেয়ার আর্থ মজুতের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং উৎপাদন ও পরিশোধনের প্রায় ৭০ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে।

এদিকে গবেষণা ও উদ্ভাবনে, বিশেষ করে এআই খাতে চীনের বিনিয়োগও বড় ফল দিচ্ছে। এখন বিশ্বের মোট এআই গবেষকদের অর্ধেকের বেশি চীনে কাজ করেন। বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত এআই পেটেন্টের প্রায় ৭০ শতাংশ চীনের। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থার উদ্ভাবন সূচকেও চীন এখন শীর্ষ দশে। এই সবকিছু মিলিয়ে ওপর নির্ভরশীল।

কাঁচামাল, উচ্চ প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন, নতুন শিল্প ও জ্বালানিব্যবস্থার নকশা এবং অর্থায়ন—সবকিছুতেই চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি রেয়ার আর্থ চায় বা কোনো উন্নয়নশীল দেশের যদি পরিষ্কার জ্বালানি অবকাঠামো দরকার হয়, তাকেও চীনের দিকে তাকাতে হচ্ছে। কিন্তু এখানেই একটি বড় ঝুঁকি আছে। চীন যতই শক্তিশালী রপ্তানিকারক হোক, তবু তার অর্থনীতি এখনো বাইরের চাহিদার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। অথচ চীন সেই নির্ভরতা কমাতে চাইছে। বিশ্বে যখন সুরক্ষাবাদ বাড়ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে সরবরাহব্যবস্থা চীন থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তখন এ নির্ভরতা চীনের জন্য দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যাগত সংকট। চীনের শ্রমক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জন্মহার কমে গেছে প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে। ফলে শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আয় ও ভোগ কম বাড়তে পারে। এতে ভোগনির্ভর অর্থনীতিতে যাওয়ার যে পরিকল্পনা, তা বাধাগ্রস্ত হবে। আবাসন খাতও বড় সমস্যা তৈরি করছে।

এ অবস্থায় চীন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা একটি উদ্ভাবনী, কম কার্বননির্ভর শিল্প অর্থনীতির কাঠামো তৈরি করেছে। এ অর্থনীতি বিশ্বকে নেট জিরো এবং এআই বিপ্লবের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই ‘ইলেকট্রো-রাষ্ট্র’ টেকসই করতে হলে চীনকে তিনটি বিষয়ে অগ্রগতি আনতে হবে।

প্রথমত, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। শুধু আরও রোবট বা কারখানা দিয়ে নয়; বরং উদ্ভাবন, দক্ষতা বৃদ্ধি, ভালো ব্যবস্থাপনা এবং সেবা খাত উন্নয়নের মাধ্যমে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপির তুলনায় গবেষণায় ১০ শতাংশ বেশি ব্যয় করলে উৎপাদনশীলতা ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় চাহিদা বাড়াতে হবে। মানুষের আয় ও সম্পদ বাড়াতে হবে। ভোক্তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সেবা খাত, যেমন প্রবীণদের যত্ন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি শিল্প ও আবাসন খাত থেকে শ্রমিক সরিয়ে ভোক্তানির্ভর খাতে আনতে হবে।

তৃতীয়ত, বাইরের নির্ভরতা সামলাতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। আত্মনির্ভরশীলতা জরুরি। তবে পাশাপাশি কৌশলগত অংশীদার, স্থিতিশীল বাণিজ্য সম্পর্ক ও স্বচ্ছ সহযোগিতার কাঠামোও দরকার।

* লুদোভিক সুবরাঁ, জার্মানিভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আলিয়াঞ্জের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা (সিআইও) ও প্রধান অর্থনীতিবিদ
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

চীনের অর্থনীতি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে
চীনের অর্থনীতি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এএফপি

Saturday, November 8, 2025

ইলন মাস্ক মঞ্চে নাচলেন, সঙ্গী হলো রোবট

বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক গতকাল বৃহস্পতিবার কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা চলাকালে রোবটের সঙ্গে নেচেছেন। এক ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা ইলন মাস্কের জন্য প্রায় এক লাখ কোটি ডলারে বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করার পর তিনি নেচে নেচে উদ্‌যাপন করেন।

টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা গতকাল টেক্সাসের অস্টিনে বার্ষিক সাধারণ সভায় অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ইলন মাস্কের জন্য একটি বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করেন। এ বেতন প্যাকেজের আওতায় আগামী এক দশকে ধাপে ধাপে তাঁকে শেয়ার আকারে প্রায় এক লাখ কোটি ডলার অর্থ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নতুন বেতন প্যাকেজ অনুমোদনের পর মুহূর্তের মধ্যেই মাস্ক মঞ্চে উঠে আসেন। সেখানে উপস্থিত থাকা মানুষেরা তখন উল্লাসে মেতে ওঠেন। মাস্ক মঞ্চে নাচতে শুরু করেন। তখন মঞ্চে থাকা রোবটও তাঁর নাচের ভঙ্গি অনুকরণ করে নাচতে থাকে।

মাস্ক দর্শকদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডারদের অন্য সভাগুলো একঘেয়ে, কিন্তু আমাদের সভাগুলো দারুণ। দেখুন না, এটা কত চমৎকার।’

এরপর মাস্ক ঘোষণা করেন যে টেসলা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তিনি বলেছেন, এ নতুন যুগ শুধু গাড়িতে নয়, রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতেও শুরু হচ্ছে। তিনি তখন ইশারায় পাশে থাকা মানবসদৃশ রোবটকে দেখান।

গতকাল টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা প্রায় ১ লাখ কোটি ডলারের বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করেন। এটিকে মাস্কের জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মাস্কের টেসলাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যকে সমর্থন জানিয়েছেন।

কিছু বড় বিনিয়োগকারীর বিরোধিতার পরও গতকাল বেতন প্যাকেজের প্রস্তাবটি অনুমোদন পেয়েছে। তবে টেসলা কর্তৃপক্ষের ধারণা, প্রস্তাবটি অনুমোদন না পেলে মাস্ক হয়তো কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদত্যাগ করতেন।

টেসলা কর্তৃপক্ষ ও নতুন বেতন প্যাকেজ অনুমোদনকারী বিনিয়োগকারীরা বলেছেন, প্রায় ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের এই বেতন প্যাকেজ দীর্ঘ মেয়াদে শেয়ারহোল্ডারদের জন্যই লাভজনক। কারণ, মাস্ককে বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে টেসলার জন্য নির্ধারিত কিছু যুগান্তকারী লক্ষ্য পূরণ করতে হবে।

মাস্ককে আগামী ১০ বছরের জন্য যে লক্ষ্যগুলো বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—২ কোটি গাড়ি সরবরাহ করা, ১০ লাখ রোবোট্যাক্সি চালু করা, ১০ লাখ রোবট বিক্রি করা।

মাস্ককে পুরো বেতন প্যাকেজ পেতে হলে, টেসলার বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পেতে হবে। প্রথমে কোম্পানির বর্তমান বাজারমূল্য ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারকে ২ লাখ কোটি ডলারে উন্নীত করতে হবে। এর পরে বাজারমূল্যের পরিমাণ ৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে হবে।

নতুন পরিকল্পনার আওতায়, মাস্ক টেসলার শেয়ার হিসেবে ১০ বছরের মধ্যে ৮৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার আয় করতে পারেন। আদতে মাস্ককে ১ লাখ কোটি ডলার দেওয়া হতে পারে, তবে তাঁকে কিছু অর্থ টেসলাকে ফেরত দিতে হবে। এ জন্য তা ৮৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ধরা হয়েছে।

মঞ্চে রোবটের সঙ্গে নাচছেন ইলন মাস্ক
মঞ্চে রোবটের সঙ্গে নাচছেন ইলন মাস্ক। ছবি: এসএমএক্স নামের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া ভিডিওর স্ক্রিনশট