Showing posts with label নারী. Show all posts
Showing posts with label নারী. Show all posts

Tuesday, August 18, 2026

গাজায় অবরোধে বিপর্যস্ত নারীরা, চিকিৎসা সংকট চরমে

ইসরাইলের অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে গাজায় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে অনেক রোগীর রোগ শনাক্ত হচ্ছে দেরিতে। ফলে চিকিৎসকের কাছে আসার সময় অনেকের ক্যানসার উন্নত পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের চাপে প্রায় ভেঙে পড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং বিশেষায়িত রোগ নির্ণয় সেবার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। স্তন ক্যানসার শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ম্যামোগ্রাফি মেশিনও নিয়মিত অচল হয়ে পড়ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।

গাজার চিকিৎসক হালা আল-বুহাইসি জানান, এখন অনেক নারী হাসপাতালে আসছেন ক্যানসারের জটিল বা অগ্রসর পর্যায়ে। যুদ্ধের কারণে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবায় তাদের স্বাভাবিক প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, গাজায় বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার ক্যানসার রোগী রয়েছেন। প্রতিবছর সেখানে দুই হাজারের বেশি নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হন। স্তন ক্যানসার নারীদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ক্যানসার। দ্রুত রোগ শনাক্ত ও সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া এই রোগে সুস্থ হওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গাজায় সেই সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

রোগীদের দুর্ভোগ শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও হাসপাতাল সেবার ঘাটতিও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও চিকিৎসার অনিশ্চয়তা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গবেষণাতেও বলা হয়েছে, গাজার ক্যানসার রোগীরা প্রয়োজনীয় কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং চিকিৎসাকর্মীর ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

ফলে গাজায় যুদ্ধের প্রভাব শুধু আহত ও নিহত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত নারীরাও জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত প্রয়োজনীয় ওষুধ, সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

গাজায় অবরোধে বিপর্যস্ত নারীরা, চিকিৎসা সংকট চরমে

Thursday, August 13, 2026

গাজার তাঁবুগুলোতে হাজারো বিধবা নারী

একাকী জীবনের নির্মম লড়াইঃ উত্তর গাজার তীব্র তাপদাহের মধ্যে একটি অস্থায়ী জীর্ণ তাঁবুর ভেতরে বসে আছেন মোনা আল-মাসরি। প্রতিটি নতুন দিনে বেঁচে থাকার পরিকল্পনা করার চেষ্টা করছেন তিনি। মোনা চার সন্তানের জননী, যাদের বয়স দুই থেকে নয় বছরের মধ্যে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলি সামরিক হামলায় তার স্বামী মোহাম্মদ নিহত হন। কাপড়ের তৈরি একটি পাতলা দেয়ালের ভেতর পুরো পরিবারের জীবনের তীব্র অনিশ্চয়তা ও বোঝা এখন তার একার নাজুক কাঁধে। মোনা জানান, গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু মানবেতর জীবনযাপনই নয়, সবচেয়ে বড় মানসিক ও শারীরিক কষ্টের বিষয় হলো প্রতিদিনের বেঁচে থাকার প্রতিটি ক্ষুদ্র লড়াইয়ে তাকে সম্পূর্ণ একা মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সন্তানকে একবেলা খাবার দেয়া, পানের উপযুক্ত একটু পানির ব্যবস্থা করা এবং যেকোনো মুহূর্তে ওপর থেকে নেমে আসা বোমা হামলার আতঙ্ক থেকে ছোট ছোট সন্তানদের আগলে রাখার এই দীর্ঘ যুদ্ধ তিনি একা লড়ে যাচ্ছেন। আকুল কণ্ঠে মোনা বলেন, এই যুদ্ধ কেবল আমাদের মাথা গোঁজার ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে সমস্ত সুরক্ষা, সম্মান ও স্থিতিশীলতা। এখানে জীবন বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। প্রতিদিন সকালে উঠে একটাই চিন্তা থাকে, কীভাবে এই তীব্র কষ্ট ও ক্লান্তি এড়িয়ে সন্তানদের নিয়ে আরেকটা দিন বেঁচে থাকা সম্ভব হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

গাজায় মোনার মতো এমন হাজার হাজার অসহায় নারী রয়েছেন, যাদের মাথার ওপর থেকে উপার্জনের একমাত্র অভিভাবক ও জীবনের সঙ্গী হারিয়ে গেছেন। গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পুরো গাজা ভূখণ্ডে বর্তমানে মোট বিধবা নারীর সংখ্যা বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কেবল চলমান যুদ্ধে ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে ২৮,২২৪ জন নারী তাদের স্বামীকে হারিয়ে নতুন করে বিধবা হয়েছেন। এর বাইরে আরও ২২,৫০০ জন নারী যুদ্ধের আগেই নিবন্ধিত বিধবা হিসেবে বসবাস করছিলেন। তবে গাজার সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজিজা আল-কাহলৌত জানান, অবরুদ্ধ পরিবেশ, তীব্র যুদ্ধক্ষেত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণে এখনও বহু বিধবা নারীর তথ্য নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি বলে তারা ধারণা করছেন। মুখপাত্র আরও বলেন, উপার্জনের একমাত্র মানুষকে হারিয়ে এই নারীরা এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানবিক জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগটুকুও তাদের নেই। এদের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অভাব থেকে মুক্ত করতে হলে কেবল সাময়িক খাদ্য সাহায্য দিয়ে হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।

বাস্তুচ্যুত এসব নারীদের জীবনযুদ্ধের গল্প কেবল খাদ্য বা আশ্রয় সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবিক ও মানসিক ট্রমা। গাজার বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী আসিল আবু শাওয়িশ বিষয়টি নিয়ে বলেন, যুদ্ধের মাঝে হঠাৎ করে স্বামী হারানো এক চরম মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। এসব নারীকে একদিকে যেমন নিজের জীবনসঙ্গীকে হারানোর তীব্র কষ্ট চেপে রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরিবারের একমাত্র প্রধান হিসেবে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। গাজার বিধবা নারীদের এমন এক পরিবেশে বাস করতে হচ্ছে যেখানে প্রতিনিয়ত মৃত্যু ও আতঙ্কের ছায়া রয়েছে। অনেক নারী তাদের ভেতরের মানসিক কান্না ও ভেঙে পড়ার অনুভূতি সন্তানদের সামনে প্রকাশ করতে পারেন না, যাতে ছোট শিশুরা পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে। কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও শোকাচ্ছন্নতা তাদের মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

একই সাথে যেসব শিশু তাদের পিতাকে হারিয়েছে, তাদের মানসিক অবস্থা আরও সংকটজনক। বাবার অনুপস্থিতি এবং তার সাথে ক্রমাগত বাস্তুচ্যুতি ও মানবেতর পরিবেশ শিশুদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেক শিশুর মধ্যে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক, রাতে ঘুম না হওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ এবং মানসিক ট্রমার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলছেন, গাজার এই অসহায় নারীদের টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরি খাদ্য ও আর্থিক অনুদানের পাশাপাশি নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বাসন এবং আইনগত সহায়তা দেয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি এখন কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং মানবজাতির জন্য এক বিরাট দায়িত্ব।

গাজার তাঁবুগুলোতে হাজারো বিধবা নারী

Monday, August 3, 2026

‘নারী হয়ে আরেক নারীকে তিনি ট্রল করছেন’ by মুজাহিদ সামিউল্লাহ

৮০ এবং ৯০ দশকের জনপ্রিয় নায়িকা নূতন। সম্প্রতি একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে নিজের পোশাক ও মেকআপ নিয়ে কথা বলে সামাজিক মাধ্যমে বেশ ট্রলের মুখে পড়েছেন তিনি। মেকআপের কথা বলতে গিয়ে নূতন বলেছিলেন, আমি সাধারণত মেকআপ খুব একটা ব্যবহার করি না। করলেও হালকা মেকআপ করি। তার এই কথা কোড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকমের হাস্যরসাত্মক পোস্ট ও ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন নূতন। যা তার নিজেরও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে নূতন বলেন, আমি শোবিজ অঙ্গনের মানুষ। অতীতে দর্শকরা আমাকে পর্দায় যেভাবে দেখেছেন, আমার ভক্ত হয়েছেন, তারা কিন্তু পর্দার বাইরেও আমাকে গ্ল্যামারাস একজন শিল্পী হিসেবেই কল্পনা করেন। এই বিষয়টা মাথায় রেখেই আমি সচেতনভাবে একটু পরিপাটিভাবে চলাফেলা করি ও সাজসজ্জা করি।

নূতন বলেন, প্রতিটি বয়সের আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। আমার একটি কথাকে কোড করে বিভিন্নজন মিমিক্রি তৈরি করছেন, কৌতুক করছেন। তাদের মধ্যে একজন অল্প বয়সের নারীও রয়েছেন। অবাক হয়েছি নারী হয়ে আরেক নারীকে তিনি ট্রল করছেন। রাষ্ট্র যেখানে আমাকে জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত করেছে, দেশ ও জাতি এত সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছেন, ওই ভদ্রমহিলা কি শুধু আমার মেকআপই দেখেছেন, আমার অর্জিত সম্মান সম্পর্কে কিছুই জানেন না! নূতন ক্ষোভের সুরে ট্রলকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, এসব করে সাময়িক বাহ্‌বা পাওয়া যায়। কিন্তু একজন অভিনেত্রী নূতন হতে হলে আপনাকে শতবার জন্ম নিতে হবে। কারও সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করার আগে নিজ যোগ্যতা সম্পর্কে ভাবা উচিত। এখন সোশ্যাল মিডিয়া হাতের মুঠোয়। যেকোনো বিষয় নিয়ে যে কেউই কথা বলতে পারছে। আমি অনুরোধ করবো, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার আগে চিন্তা করবেন কাকে নিয়ে মন্তব্য করছেন। আমি জানি না আমাকে নিয়ে যারা ট্রল করছেন, তারা কোন ধর্মে বিশ্বাসী। যদি মুসলিম হন তাহলে তো জানা দরকার যে, মৃত্যুর পর গিবতকারীর পরিণাম কী হবে। নূতন আরও জানান, ভবিষ্যতে কেউ যদি এমন করে তবে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতেও পিছপা হবেন না তিনি।

mzamin

Sunday, August 2, 2026

গত ২০২৪ সালে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী তাঁর ঘনিষ্ঠজনের হাতে খুন হয়েছেন

জাতিসংঘের প্রতিবেদনঃ গত ২০২৪ সালে বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী তাঁর ঘনিষ্ঠজনের হাতে খুন হয়েছেন। নিহত ৬০ শতাংশ নারী তাঁর সঙ্গী বা আত্মীয় যেমন বাবা, চাচা, মা ও ভাইদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন। এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে গত ২৫ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার জাতিসংঘের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে। সংস্থাটি নারী হত্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রগতি না হওয়ার নিন্দা জানিয়েছে।

নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূলে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এবং জাতিসংঘ নারী সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর প্রায় ৫০ হাজার নারী ও কন্যাশিশুকে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যরা হত্যা করেছেন। ১১৭টি দেশের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন নারী নিহত হয়েছেন।

এই সংখ্যা ২০২৩ সালে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে সামান্য কম। তবে এটি আসলে হত্যাকাণ্ড কমার বিষয়টি নির্দেশ করে না। কেননা, বিভিন্ন দেশে তথ্য সরবরাহের তারতম্যের কারণে এ পার্থক্য দেখা গেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড প্রতিবছর হাজার হাজার নারী ও মেয়ের জীবন কেড়ে নিচ্ছে এবং কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া হত্যার ঝুঁকির ক্ষেত্রে ঘরই নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়। তবে গত বছর আফ্রিকায় সর্বোচ্চসংখ্যক, প্রায় ২২ হাজার নারীকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

জাতিসংঘের নারীনীতি বিভাগের পরিচালক সারাহ হেন্ড্রিক্স বলেন, নারী হত্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি প্রায়ই ধারাবাহিক সহিংসতার একটি অংশ, যা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, হুমকি এবং অনলাইনসহ হয়রানি থেকে শুরু হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, July 28, 2026

‘পুরুষদের উচিত নারীর পোশাক, ওজন নিয়ে মন্তব্য করা বন্ধ করা’

হিন্দি চলচ্চিত্র ও ওয়েব ধারাবাহিকে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন অভিনেত্রী হুমা কুরেশি। সম্প্রতি অনলাইনের নারীদের হয়রানি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন অভিনেত্রী।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে হুমা বলেন, অনলাইনে অনেক সময় এমন মন্তব্য আসে, ‘বিকিনিতে ছবি পোস্ট করো। এগুলো খুবই নোংরা এবং দুঃখজনক ঘটনা।’
বাস্তবে আর অনলাইনে হয়রানির পার্থক্য নেই উল্লেখ করে হুমা আরও বলেন, ‘আমার মতে, রাস্তার ওপর একজন মেয়েকে হেনস্তা করা আর অনলাইনে হ্যারাসমেন্ট করা—দুই ক্ষেত্রের জন্যই শাস্তি একই হওয়া উচিত। কোনো পার্থক্য নেই।’

নিজের মন্তব্যের ব্যাখ্যাও দেন হুমা। তিনি বলেন, ‘যদি কেউ আমাকে অশ্লীল ছবি পাঠায় বা পোস্টে অশ্লীল মন্তব্য করে, তবে তারও শাস্তি ঠিক সেই একই হওয়া উচিত, যা রাস্তার ওপর হেনস্তা করার ক্ষেত্রে হয়। পুরুষদের উচিত নারীর পোশাক, মেকআপ, জীবনধারা বা ওজন নিয়ে মন্তব্য করা বন্ধ করা।’

২০১২ সালে ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’–এর মাধ্যমে আলোচনায় আসা হুমা ১৩ বছর ধরে বলিউডে কাজ করেছেন। ‘জলি এলএলবি’ ও ‘মহারানি’ ফ্র্যাঞ্চাইজির মতো জনপ্রিয় প্রকল্পে দেখা গেছে তাঁকে। তাঁর অবদান রয়েছে। সামনে তাঁকে দেখা যাবে যশের সঙ্গে ‘টক্সিক’ সিনেমায়।

সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে হুমা অভিনীত ‘জলি এলএলবি ৩’। তবে সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি খুব বেশি নেই। এ জন্যও সমালোচনার শিকার হচ্ছেন তিনি। হুমা বলেন, কখনো কখনো তাঁর সবচেয়ে ভালো দৃশ্যগুলো সিনেমা থেকে কেটে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমি খুবই বিরক্ত হতাম, যখন আমার চরিত্রের চিত্রায়ণ দেখানো হয়নি। কিন্তু কখনো কখনো সবকিছুতে নিয়ন্ত্রণ থাকে না।’

মাসালাডটকম অবলম্বনে

হুমা কুরেশি। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে
হুমা কুরেশি। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

Saturday, July 11, 2026

বিয়ে বিচ্ছেদ করে বিপুল সম্পদের মালিক পুতুল

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। দীর্ঘ ২৫ বছর সংসারে করে দাম্পত্য জীবনের ইতি টানেন তিনি। স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেনের সঙ্গে ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি আদালতে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। যদিও বিষয়টি সে সময় সামনে আসেনি, সম্প্রতি আদালতের নথি ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সম্পত্তির রেকর্ডে বিচ্ছেদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, বিচ্ছেদ চুক্তির অংশ হিসেবে খন্দকার মাশরুর হোসেন সায়মা ওয়াজেদকে নগদ আড়াই লাখ মার্কিন ডলার দিয়েছেন। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর মূল্য তিন কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে তাদের যৌথ মালিকানাধীন দুটি বাড়ির মালিকানাও তার কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাড়ি দুটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে নগদ অর্থ ও সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা সমান।

দুবাই আদালতের ফ্যামিলি গাইডেন্স অ্যান্ড রিফর্মেশন বিভাগে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে, ফ্লোরিডার সেন্ট জনস কাউন্টির ফ্রুট কোভ এলাকার ৪৫৬ বে পয়েন্ট ওয়ে এবং মেইটল্যান্ডের ৮৪৫ ইয়র্ক ওয়ে-এ অবস্থিত দুটি বাড়ি ‘নেভা ইনকরপোরেটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ওই প্রতিষ্ঠানের একমাত্র আইনি মালিক ও সুবিধাভোগী সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, বিয়ের সময় পাওয়া উপহার, ব্যক্তিগত আসবাবপত্র, পোশাক, অলঙ্কার ও অন্যান্য স্মারকও পুতুলকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি যেখানে নির্দেশ দেবেন, সেখানে এসব সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও থাকবে খন্দকার মাশরুরের।

সরকারি সম্পত্তি রেকর্ড অনুযায়ী, সেন্ট জনস কাউন্টির বাড়িটি ২০০৫ সালের ১ নভেম্বর যৌথ নামে ২ লাখ ৪৫ হাজার ডলারে কেনা হয়েছিল। বর্তমানে এর বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪০ ডলার। অন্যদিকে মেইটল্যান্ডের চার শয়নকক্ষ ও দুই বাথরুমবিশিষ্ট একতলা বাড়িটির বর্তমান মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৮৪ হাজার থেকে ৫ লাখ ডলারের মধ্যে।

পুতুল ও মাশরুরের চার সন্তান। বিচ্ছেদের চুক্তিতে, অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই সন্তানের আইনগত অভিভাবক থাকবেন খন্দকার মাশরুর, তবে তাদের কাস্টডি বা জিম্মায় থাকবেন সায়মা ওয়াজেদ। সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের সব ব্যয় বহন করবেন মাশরুর।

খন্দকার মাশরুর হোসেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় পুতুল ও মাশরুরের বিয়ে হয়। সে সময় শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধীদলীয় নেত্রী। দুজনই কানাডার নাগরিক ছিলেন।

পরিবারের এই সম্পর্কের পরই খন্দকার মোশাররফ হোসেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৯৬ সালে ফরিদপুর-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হতে পারেননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালে মন্ত্রিসভায় স্থান পান। প্রথমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পর থেকে পুতুল ও মাশরুরের দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন শুরু হয়। একই সময়ে খন্দকার মোশাররফের রাজনৈতিক প্রভাবও কমে আসতে শুরু করে। তিনি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদও হারান। ২০২১ সালে পুতুল ও মাশরুরের বিবাহবিচ্ছেদের পর খন্দকার মোশাররফের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ তুলে অভিযান শুরু হয়। ২০২২ সালে তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর গ্রেপ্তার হন। পরে খন্দকার মোশাররফ দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে চলে যান।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন এবং ভারতের দিল্লিতে দায়িত্ব পালন করেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আপত্তির মুখে তিনি অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে তিনি কানাডার পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাইয়ে সন্তানদের কাছে এবং দিল্লিতে মায়ের কাছে যাতায়াত করেন।

বিয়ে বিচ্ছেদ করে বিপুল সম্পদের মালিক পুতুল

Sunday, July 5, 2026

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ‘প্রজনন গণহত্যা’ : লক্ষ্য মা ও শিশু

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে অব্যাহতভাবে পরিকল্পিত ‘প্রজনন গণহত্যা’ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলিরা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, মা ও শিশুদের হত্যা এবং পরিবেশকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে যা ফিলিস্তিনিদের বন্ধ্যাত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফিলিস্তিনি নারীবাদী গোষ্ঠীর নতুন একটি প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইল এই বর্বরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য ফিলিস্তিন থেকে জীবনের চিহ্ন মুছে ফেলা।

জাতিসঙ্ঘের তদন্ত কমিটি নিশ্চিত করেছে, ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের টার্গেট করছে। স্নাইপার ও ড্রোন দিয়ে নিখুঁত নিশানা, বন্দিশালায় নির্যাতন, প্রজনন সহিংসতা এবং স্কুল-হাসপাতাল ধ্বংসের মাধ্যমে শিশুদের ওপর চরম আঘাত হানা হচ্ছে।

ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ২১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে এবং কমপক্ষে ১৫ হাজার শিশু তাদের মাকে হারিয়েছে। আল-নাসর শিশু হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ইসরাইল। পরে হাসপাতালটির ইনকিউবেটরে থাকা চার শিশুর পচাগলা লাশ উদ্ধার করা হয়।

ফিলিস্তিনি নারীবাদী গোষ্ঠী ১৮৮ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম ‘একটি শিকারী রাষ্ট্র : ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের পদ্ধতিগত যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি নারীদের ওপর পদ্ধতিগত যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা চালাচ্ছে ইসরাইল। পানি ও স্যানিটারি পণ্য আটকে দেয়ায় তীব্র সঙ্কটে পড়েছেন নারীরা। বোমাবর্ষণে ধ্বংস হওয়া হাসপাতালে জ্বালানি, বিদ্যুৎ বা চেতনানাশক কিছুই নেই।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়াই সেখানে সিজারিয়ান অপারেশন করতে হচ্ছে। প্রসূতি মায়েরা ডায়াপার, খাবার ও পানি পাচ্ছেন না। আইভিএফ ক্লিনিক ধ্বংস এবং সাদা ফসফরাসের মতো বিষাক্ত অস্ত্রের ব্যবহার ফিলিস্তিনিদের প্রজনন ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘ব্যাপক অনাহার, বাস্তুচ্যুতি ও মহামারীর মধ্যেও সন্তান জন্মদান এবং তাদের বাঁচিয়ে রাখার এক অসম্ভব লড়াই একা কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন ফিলিস্তিনি মায়েরা।’

রানিয়া আবু আনজা নামে এক নারী ১০ বছর চিকিৎসার পর যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসরাইলি বিমান হামলায় তার স্বামী ও দুই সন্তানই নিহত হয়। জোমানা আরাফা নামে আরেক মা যমজ সন্তান জন্ম দেন। এর ঠিক দু’দিন পর তথাকথিত নিরাপদ অঞ্চলেই তিনি এবং তার দুই শিশু ও মা নিহত হন। সন্তানদের জন্মনিবন্ধন আনতে বাইরে যাওয়ায় বেঁচে যান তার স্বামী।

ইসরাইল মূলত ফিলিস্তিনিদের বংশবৃদ্ধিকে ভয় পায়। এর আগে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার বলেছিলেন যে, তার দুঃস্বপ্ন শুরু হয় যখন তিনি ভাবেন ‘আরেকটি ফিলিস্তিনি শিশু জন্ম নেবে’।

জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ বলেছেন, ‘এটি এমন এক ব্যবস্থার কলঙ্কজনক দলিল যা ফিলিস্তিনিদের জীবন, শরীর ও পরিবারকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

মায়ের কোলে এক ফিলিস্তিনি শিশু
মায়ের কোলে এক ফিলিস্তিনি শিশু। সংগৃহীত

Friday, June 19, 2026

স্ত্রীর মাথা ন্যাড়া করে প্রস্রাব পান করানোর অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে

ভারতের ছত্তিশগড়ের কোরিয়া জেলায় এক নারীর ওপর স্বামীর চরম নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে, মাথা ন্যাড়া করে, মুখে কালি ও ইঞ্জিন অয়েল মেখে নির্মমভাবে মারধর করে এবং সন্তানদের সামনে তাকে জোরপূর্বক প্রস্রাব পান করাতে বাধ্য করে। এমনকি ওই ঘটনায় সন্তানদেরও অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী নারী জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে প্রেমের সম্পর্ক থেকে জিতেন্দ্র ঘাসিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের চার সন্তান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ, নির্যাতন ও আর্থিক সংকটের কারণে তিনি সন্তানদের নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন এবং সংসার চালাতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৪ জুন স্বামী জিতেন্দ্র তাকে খুঁজে বের করেন, যেখানে তিনি এক পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই ডেকে নিয়ে গিয়ে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় বলে তিনি দাবি করেন। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বাইরে ডেকে এনে গালাগাল ও চরিত্র নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের পর হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আমার চুল কেটে দেয়, মাথা ন্যাড়া করে, মুখে কালি ও তেল মেখে দেয়, মারধর করে এবং আমাকে প্রস্রাব পান করাতে বাধ্য করে। আমাকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।

নারীর দাবি, এই নির্মম ঘটনার সময় তাদের সন্তানদেরও ব্যবহার করা হয়েছে। সন্তানদের দিয়ে মাকে চড় মারানো হয় এবং এক সন্তানকে দিয়ে তাকে জোরপূর্বক অপমানজনক কাজ করানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভিডিও ফুটেজে অভিযুক্তকে স্ত্রীকে চরিত্র নিয়ে অভিযুক্ত করতে শোনা যায়। তার দাবি, স্ত্রী আগে তার আত্মীয়দের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং সংসার ছেড়ে অন্য সম্পর্কেও জড়িয়েছিলেন।

তবে ভুক্তভোগী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তাকে সন্দেহ করা হতো এবং নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই আমাকে সন্দেহ করা হতো। দাম্পত্য নির্যাতন চলছিল। আমি ন্যায়বিচার চাই এবং অভিযুক্তের কঠোর শাস্তি চাই।

প্রথমে নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) একাধিক ধারায় মামলা নথিভুক্ত করে, যার মধ্যে ছিল স্বামীর নির্যাতন, ইচ্ছাকৃত আঘাত, অশ্লীল আচরণ এবং ফৌজদারি হুমকি সংক্রান্ত ধারা। পরে ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর তদন্তে আরও গুরুতর অভিযোগ যুক্ত করার কথা জানায় পুলিশ।

কোরিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুরেশা চৌবে জানান, প্রাথমিক অভিযোগে শুধু নির্যাতন ও মদ্যপ অবস্থায় মারধরের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ভিডিও সামনে আসার পর ঘটনাটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখে অতিরিক্ত ধারা যুক্ত করা হচ্ছে এবং অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেওয়া হবে।

এই ঘটনার পর স্থানীয় এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে এবং সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ঘিরে ব্যাপক নিন্দা ও বিচার দাবি উঠেছে।

সূত্র: এনডিটিভি

স্ত্রীর মাথা ন্যাড়া করে প্রস্রাব পান করানোর অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে
ছবি সংগৃহীত।

Thursday, June 18, 2026

ভারতে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে কীভাবে এআইকে হাতিয়ার বানিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা

ভিডিওটি প্রথম দেখেই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সামরিন আইয়ুব। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এই ফ্রিল্যান্স মডেল গত বছর মোবাইলে স্ক্রল করছিলেন। এ সময় তাঁর এক বন্ধু ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পাঠান।

ভিডিওটিতে নয়াদিল্লিতে তাঁর জীবনকাহিনি তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। এতে বর্ণনাকারীর কণ্ঠস্বর, চলমান ক্যাপশন এবং টেলিভিশনের সংবাদ প্রতিবেদনের মতো শিরোনাম ছিল। কিন্তু পুরো ভিডিওটি ছিল মনগড়া।

২৪ বছর বয়সী আইয়ুব বলেন, ‘এটা একেবারে অনুসরণ করে তথ্য জোগাড় করার মতো ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম সেমিস্টার থেকে শেষ সেমিস্টার পর্যন্ত জীবনের খুঁটিনাটি তারা অনুসরণ করেছে।’

ভিডিওটিতে নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ের বিভিন্ন ছবি জোড়া লাগানো হয়েছিল। গ্রুপ প্রজেক্ট, বিদায় অনুষ্ঠান ও সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা সেলফির মতো ক্যাম্পাসজীবনের সাধারণ মুহূর্তের ছবি এতে ব্যবহার করা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভয়েসওভারে মিথ্যা তথ্য তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, তিনি একজন মুসলিম নারী, যিনি হিন্দু পুরুষদের কাছে ‘নিজের শরীর বিক্রি’ করেন। ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়ও ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি তাঁর নিজের ভাইকে তাঁর ‘দালাল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইয়ুব বলেন, ‘ভিডিওটি এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে আমার মা–বাবাও যদি এটি দেখতেন, তাহলে সেটিকে তাঁরা সত্যি বলে মনে করতেন।’

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইয়ুব এমন কয়েকজন মুসলিম নারীর একজন, যাঁরা ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠা একটি প্রবণতার শিকার হয়েছেন। এ প্রবণতায় এআই ব্যবহার করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি ও অপপ্রচারমূলক কনটেন্ট তৈরির ঝোঁক দেখা যাচ্ছে।

আল–জাজিরা এ ধরনের হামলার শিকার কয়েকজন মুসলিম নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে তাঁরা লজ্জা ও পুরোনো মানসিক অভিঘাত আবারও ফিরে আসার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।

যৌন কল্পনাকে ছবিতে রূপান্তর

মুসলিম নারীদের ছবি ও ভিডিওকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণভাবে উপস্থাপনের এই প্রবণতা এমন এক সময়ে সামনে আসছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় ভারতের অংশগ্রহণ বাড়ছে। চলতি বছরের শুরুতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে’ উদ্ভাবন ও নিয়ন্ত্রককাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ) ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ২৯৭টি উন্মুক্ত অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজার ৩২৬টি এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখেছে।

এসব ভিডিওতে গবেষকেরা দেখতে পান, মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ উপস্থাপন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সাড়া লক্ষ করা গেছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব কনটেন্টে ৬৭ লাখের বেশি প্রতিক্রিয়া ও সম্পৃক্ততা (এনগেজমেন্ট) দেখা গেছে।

গবেষণার সহলেখক ও সিএসওএইচের ডিজিটাল গবেষণাবিশ্লেষক জেনিথ খান বলেন, জেনারেটিভ এআই যৌন কল্পনাকে দ্রুত ও বিনা খরচে দৃশ্যমান ছবিতে রূপ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ইমেজ জেনারেটর ও ডিপফেক প্রযুক্তি খুব কম কারিগরি দক্ষতা দিয়ে বিদ্বেষমূলক বয়ানকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃশ্য উপাদানে রূপান্তর করতে সাহায্য করছে।

নতুন এই প্রবণতার দিকে শুধু গবেষকেরা নন, অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও নজর রাখছেন।

মুম্বাইভিত্তিক রাটি ফাউন্ডেশন পরিচালিত অনলাইন নিরাপত্তা সহায়তাকেন্দ্র মেরি ট্রাস্টলাইনও মনে করে, এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। সংস্থাটির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক একটি চিত্র উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে সাধারণত তারকা বা রাজনীতিকদের নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও জনপরিসরে পরিচিত নন, এমন নারীরাও এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি–ভিডিওর শিকার হচ্ছেন। এসব ছবি কৃত্রিমভাবে তৈরি হলেও তা বাস্তব জীবনে গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সহায়তাকেন্দ্রটির সামনের সারির পরামর্শদাতাদের একজন সালমান মুজাওয়ার। তিনি জানান, তাঁরা এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধির প্রমাণ নথিভুক্ত করেছেন। বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংস্থাটি বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২০২২ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে মেরি ট্রাস্টলাইন ৪৮২টির বেশি মামলা নিয়ে কাজ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ঘটনায় ডিজিটালি বিকৃত বা পরিবর্তিত উপকরণ সম্পৃক্ত ছিল। এআই–ভিত্তিক সরঞ্জামের ব্যবহার সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ হার বাড়ছে।

মুজাওয়ার বলেন, ‘লজ্জা, ভয় ও মানসিক আঘাতের কারণে এসব (অধিকার) লঙ্ঘনের ঘটনা প্রায় সময় চাপা পড়ে যায়। বৃহত্তর জনপরিসরে আলোচনায় আসা তো দূরের কথা, পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের কাছেও অনেক সময় এসব ঘটনা বলা হয় না।’

‘রাজনীতির পর্নোগ্রাফিকরণ’

আইয়ুবকে নিয়ে তৈরি ভিডিওটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তাঁকে ঘিরে শুরু হয় আপত্তিকর মন্তব্য, হুমকিমূলক ফোনকল এবং তাঁর চরিত্র নিয়ে নানা অভিযোগ।

আইয়ুব বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, ডিজিটাল মাধ্যমে আমাকে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে। একটি নয়, এক ডজনের বেশি অ্যাকাউন্ট সব জায়গায় (প্ল্যাটফর্মে) ভিডিওটি পোস্ট করছিল। আর শত শত মানুষ তা আবার শেয়ার করছিল।’

সিএসওএইচের সংগৃহীত তথ্যভান্ডারে এমন অনেক এআই-নির্মিত মিম রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় পোশাক পরা মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেখানো হয়েছে। সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের লক্ষ্য করে ভুয়া পর্নোগ্রাফিক ছবিও তৈরি করা হয়েছে।

এসব ছবির অনেকগুলোতে গবেষকেরা একটি ধারা লক্ষ করেছেন। তা হলো—‘মুসলিম পরিচয়ের নারী’ এবং একজন ‘হিন্দু পরিচয়ের পুরুষ’–কে পাশাপাশি উপস্থাপন করা।

জেনিথ খান বলেন, এসব বর্ণনায় মুসলিম পুরুষদের প্রায় সময় সহিংস বা নৈতিকভাবে অধঃপতিত হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে মুসলিম নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তাঁরা বশ্যতাস্বীকারকারী অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের পুরুষদের মাধ্যমে ‘মুক্তি’ পেয়েছেন।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের চিত্রায়ণ রাজনৈতিক আলোচনার বাইরের কিছু নয়; বরং এটি রাজনৈতিক সংলাপের একটি অংশ।

জার্মানির মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদমাধ্যম নৃবিজ্ঞানী সাহানা উদুপা এই প্রবণতাকে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ‘রাজনীতির পর্নোগ্রাফিকরণ’–এর অংশ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, ডানপন্থী ডিজিটাল সংস্কৃতিতে রসিকতা, মিম ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি ব্যবহার করে অপব্যবহারকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়।

উদুপা বলেন, ‘এই অভ্যাসগুলো একটি বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) গড়ে তোলে।...এগুলো যৌথ উদ্‌যাপন ও সম্মিলিত আগ্রাসনের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে।’

গবেষকদের মতে, এই প্রবণতার শিকড় শুধু নারীবিদ্বেষে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে আরও গভীর আদর্শিক ভিত্তি রয়েছে। সাউথ এশিয়া মাল্টিডিসিপ্লিনারি একাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষক সোমা বসু বলেন, এখানে মূলত যৌনতাকেই রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে।

মুসলিম নারীদের শরীর সাম্প্রদায়িক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিল ‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’ বিতর্ক। এসব ভুয়া অনলাইন নিলাম প্ল্যাটফর্মে ভারতে মুসলিম নারীদের নিশানা করা হয়েছিল। সোমা বসুর মতে, এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন হিন্দত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু নেতার আনুষ্ঠানিক সমর্থন এবং দলটির ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবকদের অনানুষ্ঠানিক সমর্থন ছিল।

ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে জেনিথ খানের গবেষণাও একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক স্থানের সংস্কৃতিতে নারীদের পরিবারের সম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই মুসলিম নারীদের দৃশ্যগতভাবে আক্রমণ করা মুসলিমদের হীন বা নিম্নতর হিসেবে উপস্থাপনের একটি কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন মুসলিম নারী ও গবেষক হিসেবে এই প্রবণতা নিজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে জেনিথ খান বলেন, ‘মাথায় ওড়না পরা এক নারীকে যখন পর্নোগ্রাফির চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই ছবি দেখে আমি সত্যি আতঙ্কিত হয়েছিলাম। একজন নারী হিসেবে আপনাকে প্রতিদিন নারীবিদ্বেষী আচরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’

এসব উদ্বেগের বিষয়ে বিজেপির রাজনীতিক আতিফ রশিদ বলেন, এআই ভালো ও খারাপ—উভয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর অপব্যবহার ঠেকাতে তিনি আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান। ডিপফেক বা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডি এবং যৌন উসকানিমূলক কনটেন্টকে তিনি ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেন। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তবে বিষয়টিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিরোধিতা করেন আতিফ। তাঁর ভাষ্যমতে, বিজেপি ‘সব ধর্মের নারীদের সম্মান করে’ এবং ‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো আইন অনুযায়ী মোকাবিলা করা হয়েছে।

পরিচিত প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এআই

‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’-এর ঘটনা ঘটেছিল ২০২১ ও ২০২২ সালে। সেসব ক্ষেত্রে সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই দুই ঘটনা ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

‘সুল্লি ডিলস’ অ্যাকাউন্ট তৈরির অভিযোগে অমকারেশ্বর ঠাকুর এবং ‘বুল্লি বাই’-এর স্রষ্টা হিসেবে শনাক্ত নিরাজ বিষ্ণয়কে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার করে। তবে দুই মাস পর নয়াদিল্লির একটি আদালত ‘মানবিক কারণে’ তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেন।

গবেষকদের মতে, জেনারেটিভ এআইয়ের বিস্তার মুসলিম নারীদের অনলাইনে হয়রানির পরিসর ও গতি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন নতুন অ্যাপ বা অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ছবি আপলোড করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি তৈরি করতে পারেন। এসব সরঞ্জাম অনলাইনে সহজে, অনেক ক্ষেত্রেই বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। এগুলো ব্যবহারের জন্য বিশেষ কোনো কারিগরি দক্ষতারও প্রয়োজন হয় না।

সিএসওএইচের গবেষণা ও জনসম্পৃক্ততা বিভাগের পরিচালক ইভিয়ান লেইডিগ বলেন, নারীদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারীদের নিশানা করে প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়রানি চালানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু নতুন বিষয় হলো—এআই সরঞ্জামের কারণে (অধিকার) লঙ্ঘনের মাত্রা ও ক্ষতির পরিসর বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির মধ্যে জীবন যাপন করছেন, তাঁদের জন্য এআই দিয়ে ছবি তৈরির সুযোগ ভয়ের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

২৭ বছর বয়সী গবেষক ও অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা ২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন বা সিএএ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার পর থেকে অনলাইনে নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছেন। সুল্লি ডিলসে যাঁদের ছবি আপলোড করে তথাকথিত ‘নিলামে’ তোলা হয়েছিল, তিনি তাঁদের একজন।

জাতিসংঘের মতে, ভারতের সিএএ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’। আইনটির মাধ্যমে ২০২৫ সালের আগে প্রতিবেশী মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে ভারতে আসা অমুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুততর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সুল্লি ডিলস বিতর্কের চার বছর পরও অনলাইনে নিপীড়ন খুব একটা কমেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি সীমিত হলেও সাধারণত হিন্দু নাম ব্যবহার করা বেনামি অ্যাকাউন্টগুলো এখনো তাঁকে খুঁজে বের করে আপত্তিকর বার্তা, ধর্ষণের হুমকি ও হয়রানি চালিয়ে যাচ্ছে। এ সবকিছু তাঁর কাজের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

আফরিন ফাতিমা বলেন, ‘কয়েক দিন পরপর কোনো না কোনো বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে ধর্ষণ বা হত্যার হুমকি আসে।’

এআই দিয়ে তৈরি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবির আশঙ্কা তাঁর সেই ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এসব ছবি সম্পর্কে যখন পড়ি, তখন বিষয়টি খুব ব্যক্তিগত মনে হয়। এগুলো মানুষের মধ্যে ভয়ের মানসিকতা তৈরি করছে।’

অনলাইনের বিদ্বেষ তাঁর বাস্তব জীবনের চলাফেরাতেও প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে ফাতিমা বলেন, ‘একা ভ্রমণ করতে অস্বস্তি লাগে। মুসলিম নারীদের নিয়ে এ ধরনের কল্পনা যখন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়তে দেখি, তখন মনে প্রশ্ন জাগে—বাস্তব জীবনেও কেউ কি আমাকে আক্রমণ করতে পারে?’

‘আমি আর নিরাপদ বোধ করি না’

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর আইয়ুবের পেশাগত সুযোগ একে একে কমতে শুরু করে।

এই ফ্রিল্যান্স মডেল বলেন, ‘একজন মডেল হিসেবে আপনার কাছে সুনাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার প্রোফাইলে নেতিবাচক মন্তব্য দেখা গেলে বিভিন্ন ব্র্যান্ড আপনার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে চায় না।’

চার থেকে পাঁচ মাস ধরে বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর প্রোফাইলে বিপুল পরিমাণে আপত্তিকর মন্তব্য করা হচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য গ্রাহকেরা দূরে সরে যেতে থাকেন। এই হয়রানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও বদলে দেয়।

আইয়ুব বলেন, ‘ইনস্টাগ্রাম একসময় আমার জন্য নিরাপদ জায়গা ছিল। এখন সেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে করি না। কী পোস্ট করব, কীভাবে পোস্ট করব—সেটাও কমিয়ে দিয়েছি।’

ঘটনার পর আইয়ুব নয়াদিল্লি পুলিশের সাইবার অপরাধ ইউনিটে লিখিত অভিযোগ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিছুই হয়নি।’

আইয়ুবের মতে, তাঁর বন্ধুরা একযোগে ওই অ্যাকাউন্টগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। শুধু এ কারণে বেশির ভাগ আপত্তিকর কনটেন্ট সরানো সম্ভব হয়েছিল।

আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের সঙ্গে তাল মেলাতে ভারতের বিদ্যমান আইনগুলো পেরে উঠছে না।

আইনজীবী ও ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অপার গুপ্ত বলেন, ‘কোনো ছবি মনগড়া হলেও এর ফলে যে ক্ষতি হয়, তা কিন্তু বাস্তব।’

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ‘৬৬ই ধারায়’ কারও সম্মতি ছাড়া তাঁর প্রাইভেট এরিয়া বা স্পর্শকাতর অঙ্গের ছবি ধারণ বা প্রকাশ করলে ফৌজদারি শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শরীরের কোনো বাস্তব ছবি ধারণই না করে যদি ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে ওই ধারা প্রযোজ্য না–ও হতে পারে।

অপার গুপ্ত বলেন, ‘ছবিটি ভুয়া হলেও এটি একজন নারীর জীবনে স্থায়ী কলঙ্কের দাগ তৈরি করে দিতে পারে।’

অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে সেফ হারবার বা আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়। অর্থাৎ, অবৈধ কনটেন্ট সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর তা সরিয়ে ফেললে তারা আইনি দায় থেকে সুরক্ষা পায়। তবে অপার গুপ্তের মতে, অনেক ভুক্তভোগীর জন্য অভিযোগ জানানো পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এই আইনজীবী বলেন, ‘প্ল্যাটফর্মগুলো এমন ব্যবস্থা রাখেনি, যাতে করে সহজে বলা যায়—এটি আমার ছবি, এটি একটি ডিপফেক, এটি সরিয়ে ফেলতে হবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা, অ্যালগরিদমভিত্তিক অগ্রাধিকার ও আইনি কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন না এলে আইনি ব্যবস্থা এআই–কেন্দ্রিক অপব্যবহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারবে না। কারণ, এআইয়ের বিকাশ ও এর দ্বারা তৈরি কনটেন্ট দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে।

এমন এক পরিস্থিতিতে ভারতে নিশানায় পরিণত হওয়া মুসলিম নারীদের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন পর্যন্ত অধরাই থেকে যাচ্ছে।

আইয়ুব বলেন, ‘ওই অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনের মানুষদের খুঁজে বের করা—এ বিষয়টি আমি খুব করে চেয়েছিলাম। তারা আমাকে চিনতও না। অথচ তারাই আমার সুনাম ধ্বংস করে দিয়েছে।’

ভারতের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে স্লোগান দিচ্ছেন গবেষক ও অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা
ভারতের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে স্লোগান দিচ্ছেন গবেষক ও অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা। ফাইল ছবি: আফরিন ফাতিমার ফেসবুক থেকে

Saturday, June 13, 2026

পরিচয় থাকার পরও ‘বেওয়ারিশ’ দুলালী, রেখে গেলেন অনেক প্রশ্ন by মানসুরা হোসাইন

মা জানতেন না, তাঁর হারিয়ে যাওয়া মেয়ে রাজধানীর কোনো এক ফুটপাতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। ভাই জানতেন না, শেষবিদায়ের আগেই বোনকে বেওয়ারিশ হিসেবে কবর দেওয়া হবে। আর যে নারী নাম ভুলে গিয়ে নিজেকে ‘দুলালী’ বলতেন, তিনি হয়তো জানতেন না—তাঁর চিকিৎসার জন্য এক যুবক এক এক করে আটটি হাসপাতাল ঘুরেছেন, প্ল্যাকার্ড হাতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পরিচয় মিললেও বাঁচানো যায়নি দুলালীকে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্বামীর ঘর ছেড়ে এসেছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখন থেকেই পরিবারের কাছে তিনি নিখোঁজ। মানসিক ভারসাম্যহীনতায় হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের আসল নাম—শামীমা নাসরিন জাহান। আর ঘর হারিয়ে ঠাঁই হয়েছিল রাজধানীর মিরপুরের একটি ফুটপাতে। অবহেলা, ক্ষুধা ও অসুস্থতায় মৃত্যু হয় তাঁর। পরে তাঁর লাশ দাফন করা হয় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুলালী রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়বদ্ধতা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে গেছেন। মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো বা নতুন করে ভাবার বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।

আট হাসপাতাল ঘুরে ঠাঁই হলো রাস্তার পাশে

গত ২২ মে সকালে মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের ৬০ ফিট সড়কের পাশে শামীমাকে দেখতে পান সমাজসেবামূলক সংগঠন হিরোজ ফর অলের ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মুছা করিম (রিপন)। হাড় জিরজিরে শামীমা কিছু খেতে পারছিলেন না।

চিকিৎসার জন্য দুজন নারী ভিক্ষুকের সহায়তায় শামীমাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান মুছা করিম। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ আটটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে ভর্তি করা হয়নি, কোথাও অভিভাবক চাওয়া হয়েছে, কোথাও বলা হয়েছে রোগী সামলানো কঠিন। এ কারণে তাঁর স্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি।

মুছা করিম প্রথম আলোকে বলেন, কেরানীগঞ্জ থেকে কাজীপাড়ার এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করার পরও দুলালীকে রাখা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রোগী রুমে থাকতে চাইছেন না এবং পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের নিরাময় ক্লিনিকে নেওয়া হলে এনআইডি ও আইনগত অভিভাবক না থাকায় ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন শেল্টার হোমেও চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ৮ নম্বর হাসপাতাল হিসেবে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের সুপারম্যাক্স হেলথকেয়ার লিমিটেডে চিকিৎসা শুরু হলেও সেখানেও তাঁকে রাখা হয়নি।

শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে ২৪ মে ধানমন্ডির একটি রাস্তার পাশে দুলালীকে রেখে আসতে বাধ্য হন মুছা করিম। একটি হোটেলে টাকা দিয়ে তাঁর জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে যান তিনি।

এক প্ল্যাকার্ডে বদলে গেল দৃশ্য

দুলালীদের মতো মানুষ কেন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা পাবেন না, তা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার উদ্যোগ নেন মুছা করিম। ২৭ মে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তিনি একাই দাঁড়ান একটি প্ল্যাকার্ড হাতে। তাতে ইংরেজিতে লেখা ছিল— ‘নো হেলথ উইথআউট মেন্টাল হেলথ।’ আর বাংলায় লেখা ছিল— ‘দুলালীকে বাঁচাতে চাই, দুলালী কেন চিকিৎসা পাচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাব চাই।’

এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারের সহায়তায় ২৯ মে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় দুলালীকে। জিয়া উদ্দিন হায়দার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে হাসপাতালে দুলালীকে দেখতেও গিয়েছিলেন।

কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে দুলালীর। পরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) নেওয়া হয়। ৩১ মে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।

মৃত্যুর পর মিলল পরিচয়, তবু দাফন ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে

জীবিত অবস্থায় কেউ জানতেন না তিনি কে। মৃত্যুর পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাঁর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে পরিচয়। তাঁর নাম দুলালী নয়, শামীমা নাসরিন জাহান। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠি গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। শামীমার বাবার বাড়ির ইউনিয়নের নাম মোল্লারহাট। বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব একদম কাছে না হলেও খুব দূরেও না। যশোরের কেশবপুরেও তাঁর আরেকটি ঠিকানা পাওয়া যায়।

নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে শামীমার স্বামীরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়েও কাউকে খুঁজে পায়নি। এ কারণে ৩ জুন রায়েরবাজার কবরস্থানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

এর দুদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর দেখে ৫ জুন ছুটে আসেন তাঁর ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা। ৭ জুন মেয়ের কবর দেখতে ঢাকায় আসেন মা।

‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পারলাম না’

শামীমার বড় ভাই মিজানুর রহমান ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে শামীমা ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি নলছিটি ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছিলেন। বাবা আবদুল খালেক ২০১৭ সালে মারা গেছেন।

মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে কারও কোনো ক্ষতি করতেন না। একা থাকতে পছন্দ করতেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। কখনো কোনো মাজারে পাওয়া যেত, আবার কখনো নিজেই চলে আসতেন। তাঁর স্বামী আলাদা বাসা ভাড়া করে তাঁকে রাখতেন।

তাঁর নাম দুলালী ছিল কি না জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, না; এমন কোনো নাম ছিল না। হয়তো তাঁর বোন নিজে থেকেই এ নাম বলেছিলেন।

আক্ষেপ নিয়ে শামীমার বড় ভাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পেলাম না, দাফন করতে পারলাম না। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হলো। এ কষ্ট সারা জীবন থাকবে। আমরা মুছা ভাই ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁরা না থাকলে আমাদের বোনটা ফুটপাতেই মরে পরে থাকত।’

স্বামীর নীরবতা

শামীমার স্বামী শহিদুল ইসলাম হাওলাদার নিজেও একজন পুলিশ সদস্য। বর্তমানে তিনি বরগুনার আমতলি থানায় পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শামীমা নিখোঁজ হওয়ার পর স্ত্রীকে খুঁজে পেতে তিনি থানায় জিডি করা বা অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ করছেন শামীমার বাবার বাড়ির সদস্যরা।

স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় জিডি না করার বিষয়টি স্বীকার করে শহিদুল ইসলাম হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে শামীমার তথ্য জানতে জানতে তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়ে গেছে।’

শামীমার কখনো চিকিৎসা করিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে শহীদুল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ও আমাকে সহ্য করতে পারত না। তাই চিকিৎসা করানোর জন্য শাশুড়িকে বলেছিলাম। তবে সন্তান না হওয়ার সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেছি।’

স্ত্রীর মরদেহ আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত নেবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে শহিদুল বলেন, ‘এত দিনে মরদেহ নষ্ট হয়ে গেছে। আবার কবর খোঁড়াখুঁড়ি করতে গেলে লাশ থেকে গন্ধ বের হবে, সবাই বিরক্ত হবে। অনেক ঝামেলাও করতে হবে।’

প্রশ্নের মুখে পুলিশি অনুসন্ধান

৩১ মে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি যশোরের কেশবপুর ও ঝালকাঠির নলছিটি থানায় বেতার বার্তা পাঠিয়ে দুলালী ওরফে শামীমা নাসরিন জাহানের তথ্য জানাতে বলেন। তবে ১ জুন নলছিটি থানা জানায়, স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে শামীমা নাসরিন জাহান নামে কাউকে খুঁজে পাননি এএসআই আনিসুর রহমান।

কেশবপুর থানা থেকেও একই বার্তা আসে বলে জানিয়েছেন মুছা করিম।

তবে পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর নলছিটি থানায় শামীমাকে নিখোঁজ দেখিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তাঁর মা মোসা. মনোয়ারা বেগম। ৪৫ বছর বয়সী নাসরীন জাহানের (শামীমা বাদ ছিল) স্বামী শহিদুল ইসলাম বাবুলসহ অন্যান্য তথ্য উল্লেখ করা ছিল।

এই দম্পতি আনুমানিক ২৪ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন, বিবাহিত জীবনে সন্তান হয়নি। শামীমা মাঝেমধ্যেই স্বামীর বাড়ি থেকে মায়ের বাড়ি চলে আসতেন, কারও সঙ্গে মিশতেন না, মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না—এসব তথ্যও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জিডির আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শামীমা ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কেনাকাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। এলাকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, দীর্ঘদিন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর থানায় জিডি করা হলো। শ্যামলা, লম্বায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, কালো বোরকা গায়ে শামীমা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তা–ও উল্লেখ ছিল।

নলছিটি থানার তৎকালীন ওসি মো. আ. সালাম এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এএসআই সনজীব কুমার পাহলানকে দায়িত্বও দিয়েছিলেন।

কিন্তু শামীমার মৃত্যুর পর পুলিশ পরিচয় শনাক্ত করলেও সেই জিডির সূত্র ধরে পরিবারকে খুঁজে বের করা যায়নি।

শামীমার ভাই মিজানুর বলেন, তাঁর মা আর ভাই নলছিটি থানার একদম কাছেই একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। পুলিশ ভালোভাবে চেষ্টা করলে তাঁদের খুঁজে পেতেন।

নলছিটি থানার বর্তমান ওসি আরিফুল আলম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দুজন কর্মকর্তা সারাদিন এলাকায় গিয়ে পরিবারটিকে খুঁজেছেন, কিন্তু কেউ তাঁদের চিনতে পারেননি। থানার অনলাইন জিডির তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না।

শামীমার মৃত্যুর পর থেকে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফনসহ বিষয়টি দেখভাল করেছেন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিডি থাকার পরও পরিবারকে খুঁজে না পাওয়া দুঃখজনক এবং এ দায় নলছিটি থানা এড়াতে পারে না।’

এসআই সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, পরিবারের সদস্যরা এখনো চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় কবর থেকে লাশ তুলে আবার দাফন করতে পারেন। শামীমার মৃত্যুসনদে ‘দুলালী’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সনদ শামীমার মা এবং তাঁর স্বামী দুজনই চাচ্ছেন। কাকে দেওয়া হবে, তা সুরাহা হয়নি। তাই সনদটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।

দুলালী বা শামীমা যে প্রশ্ন রেখে গেলেন


জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) বলছে, দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ১৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এসব ব্যক্তির ৯২ শতাংশ চিকিৎসা নেন না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি, বাংলাদেশ ২০২২ বলছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগেন। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ।

২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইনে মানসিক রোগী ভর্তির জন্য এনআইডির বাধ্যবাধকতা নেই। বরং অভিভাবক, আত্মীয় বা ঠিকানাবিহীন মানসিক রোগীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির মাধ্যমে নিকটস্থ সরকারি মানসিক হাসপাতালের প্রধানের কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে শুরুতে শামীমাকে হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে।

তবে পাবনা মানসিক হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে রোগী ভর্তিতে এনআইডি, নাগরিকত্ব সনদ, জন্মনিবন্ধন, ছবি, রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের উপস্থিতি ও অভিভাবকের এনআইডিসহ বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়। অভিভাবকহীন রোগীদের আদালতের নির্দেশে ভর্তি করা হয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক রোগী হারিয়ে গেলে, পালিয়ে গেলে, আত্মহত্যা বা সহিংসতার চেষ্টা করলে কিংবা অভিভাবক রোগীকে নিতে অস্বীকৃতি জানালে আইনগত প্রক্রিয়ায় এনআইডি ও ছবি প্রয়োজন হয়। এ কারণে ভর্তির সময় রোগীর ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়। তবে অভিভাবকহীন গুরুতর মানসিক রোগীরা জরুরি বিভাগ বা আউটডোরে এলে তাঁদের পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তির সময় মা–বাবা বা অভিভাবকের ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়।

তবে এ বিষয়ে বিকল্প আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ মনোচিকিৎসকদের নিয়ে সভা করার পরিকল্পনা আছে জানিয়েছেন সাইফুন নাহার।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিন্নমূল মানুষ হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাবেন না—এটা হতে পারে না। এটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি ত্রুটি। দুলালীর মৃত্যু রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারব্যবস্থার অনেকগুলো দিক সামনে এনেছে।

জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও বলেন, এই নারী কেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন, পরিবারের সদস্যরা তখন কোন দায়িত্ব পালন করলেন, তা দেখতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সব মিলে আইনের কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন করতে হবে, তা দেখতে হবে।

মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখনো জানা যায়নি তিনি শামীমা নাসরিন জাহান
মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখনো জানা যায়নি তিনি শামীমা নাসরিন জাহান। ছবি: মুছা করিমের সৌজন্যে