সৌদি আরব কেন তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে by বেতুল দোগান-আক্কাস

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সম্প্রতি সৌদি আরব সফর করেছেন। সফরটি এমন সময়ে হলো, যখন ইয়েমেন ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে বিরোধী স্বার্থের কারণে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান-সৌদি আরব সামরিক জোটে তুরস্ক যুক্ত হতে পারে, এমন গুঞ্জনও জোরালো হয়েছে। এসব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যু। তবে সৌদি আরব, যখন ইয়েমেনে আরও সক্রিয় হয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ফিরে আসছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের তথাকথিত ‘নতুন সৌদিয়ানা’ ধারণায় তুরস্কের অবস্থান কোথায়?

২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নীরব ছিলেন। তিনি অভ্যন্তরীণ রূপান্তরে মনোযোগী ছিলেন। এটি ছিল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ, ‘নতুন সৌদিয়ানা’ ধারণা শুধু সৌদি পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা। এটি আরব বিশ্বের দায়ভার নিতে আগ্রহী নয়। ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা এবং ফিলিস্তিনে কয়েক দশকব্যাপী সংঘাত এই শিক্ষাই দেয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর সৌদি পররাষ্ট্রনীতি আবার সক্রিয় হয়েছে। রিয়াদ এখন নতুন করে আঞ্চলিক অবস্থান ও কৌশল সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে।

নতুন সৌদিয়ানা ধারণা মূলত সৌদি আরবকেন্দ্রিক। প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে একাধিক বাস্তব কারণ। এক. সৌদি আরবের জনমিতিক পরিবর্তন—জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই ৩০ বছরের নিচে। দুই. তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে মুক্তি। তিন. মোহাম্মদ বিন সালমানের চেয়ারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। সর্বোপরি ‘সৌদিয়ানা’ ধারণার পুনর্নির্মাণ, যেখানে রাজতন্ত্র ও জাতীয় গৌরব গুরুত্ব পাচ্ছে আর ওয়াহাবি প্রভাব প্রান্তিক হচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সৌদি যুবরাজের মনোযোগ দেওয়ার ঘটনা কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং তা তাঁর কৌশলগত নীতির মূল ভিত্তি। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান জোরদার করতে হলে নির্ভরযোগ্য অংশীদার প্রয়োজন।

ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাত তার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় রিয়াদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও বর্তমানে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা অগ্রাধিকার পেয়েছে।

এই ‘নতুন সৌদিয়ানা’কে আগের সৌদি পররাষ্ট্রনীতি থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি, তা হলো রিয়াদ আর মধ্যপ্রাচ্যের সবার দায়িত্ব এককভাবে নিতে প্রস্তুত নয়। তবে ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে সৌদি আরবের মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীরাও বদলে গেছে।

এ বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বকে বিবেচনায় নিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে তাঁর কৌশল নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে। তাঁর শাসনকে নতুন আঞ্চলিক সক্রিয়তার পর্ব বলা যেতে পারে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য অংশীদার প্রয়োজন। তাহলেই সৌদি আরব আরও বহির্মুখী হতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে তুরস্কের আঞ্চলিক ভূমিকা (গাজায় সমঝোতা আলোচনায় সহায়তা, আফ্রিকা ও ইয়েমেনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা) রিয়াদ ও আঙ্কারাকে কাছাকাছি এনেছে। এটি মোহাম্মদ বিন সালমানকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আগ্রাসী নীতির বিপরীতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করেছে।

তুরস্কের সম্ভাব্য সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নতুন ক্ষমতার অক্ষের ইঙ্গিত দেয়। আঙ্কারার জন্য এটি একটি ভারসাম্যের খেলা। কেননা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে দেশটিকে।

গত সপ্তাহে এরদোয়ানের রিয়াদ সফর শেষে সৌদি ও তুর্কি নেতারা যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েল কর্তৃক ‘সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি’ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন দেন। সৌদি আরব ও তুরস্ক সুদানের অখণ্ডতা রক্ষা, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সিরিয়া থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার প্রশ্নেও যৌথ অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছে। সিরিয়া বিষয়ে এরদোয়ান বলেন, তুরস্কের মানদণ্ড হলো, ‘এমন একটি সিরিয়া, যা প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হবে না, সন্ত্রাসী সংগঠনকে আশ্রয় দেবে না এবং সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে সমাজের সব অংশকে অন্তর্ভুক্ত করবে।’

স্পষ্টতই সৌদি আরব আর অভ্যন্তরীণ কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্থবির নেই। তবে নতুন পরিচয় ও অংশীদারত্ব গড়ে তোলার এই প্রয়াস কতটা টেকসই ও সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বেতুল দোগান-আক্কাস, তুরস্কের এই গবেষকের গবেষণার ক্ষেত্র হলো আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-14%2Fzkwpvw8c%2FMotamot-1.jpg?rect=0%2C0%2C600%2C400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

No comments

Powered by Blogger.