Showing posts with label হত্যা. Show all posts
Showing posts with label হত্যা. Show all posts

Monday, August 24, 2026

রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যা: খুনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ

রংপুর শহরে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার নেপথ্য কারণ হিসেবে পুলিশ প্রথমে ধারণা করেছিল, এটা ডাকাতি। তবে গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা করা হয় তাঁদের। পুলিশের এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই শিক্ষকের স্বজনেরা।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা লাশ চারটি হলো রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩)।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গতকাল ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের ওই দুই তরুণের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে। এরপর গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন।

হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশের ভাষ্য

পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতির নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। দেখতে পেয়ে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়। গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে হত্যা করা হয় তাঁদেরও। এরপর ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আয়ুশকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

গণপতির পরিবারের সঙ্গে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের আগে থেকেই পরিচয় ছিল উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দুজন মিলে একে একে পরিবারটির চার সদস্যকেই হত্যা করেন।

মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান, হত্যার পরও ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা গোসল করেন, ফ্রিজ (রেফ্রিজারেটর) থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং আবার ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তাঁরা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। আর যাওয়ার আগে আলমারি-ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন।
গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে ইয়াবা সেবন করার সরঞ্জাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরও জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি গয়নার দোকানে প্রায় আট বছর কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।

‘পুলিশ যা বলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়’

তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।’

এ ঘটনায় গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। মামলার পর এর আগে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘পুলিশ যা বলছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা, তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে।’

দুই তরুণ যে হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না তাঁদের পরিবারও। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, ‘আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস বলেন, ‘ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।’

জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আজ (গতকাল) ভোরে আটক করা হয়। পরে তাঁরা হত্যায় জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ কারণে মামলায় তাঁদের দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’

একেক জায়গায় পড়ে ছিল লাশ

পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয় তাঁর। এরপর শনিবার ফোন দিলে বোন, জামাতা ও বোনের মেয়ে—সবার নম্বর বন্ধ পান। কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বামীকে নিয়ে রাত পৌনে ৯টার দিকে ওই বাসায় যান। কারও সাড়া না পেয়ে পাশের একটি ভবনে উঠে জানালার কাচ ভেঙে ঘরের জিনিসপত্র অগোছাল দেখতে পান। এরপরই খবর দেন পুলিশকে। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে রাত ১১টার দিকে। দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ লাশ চারটি উদ্ধার করে বাড়িটি থেকে নিয়ে যায়।

রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।

নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকত। প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ চলছে। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। গামছা প্যাঁচানো ছিল তাঁর গলায়।

হত্যার প্রতিবাদ, বিক্ষোভ

পরিবারসহ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে হত্যার ঘটনায় গতকাল দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে। মানববন্ধন থেকে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। পরে শিক্ষার্থীরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।

হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে রংপুর মহানগর জামায়াত। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রেসক্লাবের সামনে এসে হয় সমাবেশ।

সমাবেশে মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি পরিবারের চারজন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার এমন ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনায় নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র দুজন মাদকসেবী কীভাবে একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করলেন, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

‘কোথায় বাস করছি আমরা’

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণপতি আগে রংপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০১০ সালে কামালকাছনার মাছুয়াপাড়ায় ৬ শতাংশ জমি কেনেন। তিন বছর আগে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন সেখানে।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির পাশে লোকজনের ভিড়। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি তিনতলা ভবনেরও নির্মাণকাজ চলছে। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন হিমাংশু রায় নামের অবসরপ্রাপ্ত এক কলেজশিক্ষক। হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, কিছুই বুঝতে পারেননি।
বোন, জামাতা ও বোনের ছেলে–মেয়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পূজা চক্রবর্তী। বাড়িতেও একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেন নেই—সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের তো শত্রুও নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই!’

রংপুরে হত্যার শিকার একই পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি
রংপুরে হত্যার শিকার একই পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত

Saturday, August 15, 2026

অন্তরালের রহস্যও খুঁজছে নগর পুলিশ

সিলেটে ট্রিপল মার্ডারঃ সিলেটের ট্রিপল মার্ডারের ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা- সেটি খতিয়ে দেখছে নগর পুলিশ। শুধুমাত্র বাবুল মিয়ার প্রেমের ঘটনাই নয়, যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে সব বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এমনটি জানিয়েছেন, সিলেট নগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা। সেজন্য সিনিয়র কর্মকর্তারাও তদন্ত কাজ মনিটরিং করবেন। এদিকে, বাবুল মিয়ার বক্তব্যের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সিসিটিভি ফুটেজে বাবুল মিয়ার উপস্থিতি, ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া, কথা মতো ছুরি উদ্ধার হওয়া, ড্রয়ার থেকে নেয়া টাকা ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করা- সবই ঘটনার ধারাবাহিকতায় মিলে গেছে। সিলেট মেট্রোপলিন পুলিশের এডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার অনেক বিষয় রয়েছে। তার সঙ্গে জমি বিরোধে অনেকের মামলা চলমান ছিল বা হুমকি দেয়ার বিষয়টি আমাদের নলেজে রয়েছে। সেগুলো তদন্ত করে দেখবো।’ তিনি বলেন, ‘ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলের সিডিআরসহ অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে দেখেছি, বাসায় কিন্তু ওই সময় অন্য কেউ প্রবেশ করেনি।

আর আলমারি তছনছ করার বিষয়টি হচ্ছে, বাবুল যখন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে হাত ধুয়ে ড্রয়ারগুলো খোলা দেখেছে, সেখান থেকে সে কিছু টাকা নিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, ওই টাকাগুলো সে দীর্ঘদিনের জমানো বাসা ভাড়া পরিশোধ করেছে।’ বুধবার সকালে সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলায় গলা কেটে খুন করা হয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও কাজের মেয়ে তাহমিনাকে। ঘটনার পর বিকালে পুলিশ এ ঘটনায় বাবুল মিয়া নামের এক রংমিস্ত্রিকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাকালীন সিসিটিভি ফুটেজে তার উপস্থিতি ছিল। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানায়, কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সূত্র ধরে সে ওই বাসায় যায়। এরপর একেক করে তিনজনকে ধারালো ছুরি দিয়ে খুন করে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনায় ছুরিও উদ্ধার করেছে। আলোচিত এ ঘটনার লোমহর্ষক দৃশ্য উঠে এসেছে ময়নাতদন্তে। নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী ও কাজের মেয়েকে।

এর মধ্যে কাজের মেয়ে তাহমিনার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রায় ১৬-১৭টি ছুরিকাঘাত ছিল তার দেহে। আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়ার শরীরেও ছিল আঘাতের পর আঘাত। এসব আঘাতে রক্তক্ষরণে তারা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের আমেরিকান প্রবাসী ছেলে আসিফ ইফতেখারের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেয়া হয়। পিতা-মাতার মৃত্যু সংবাদ শুনে আসিফ ইফতেহার বৃহস্পতিবার বিকালেই সিলেট এসে পৌঁছান। সঙ্গে তার বোনরাও আসেন। গতকাল বিকালে সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে জানাজা শেষে তাদের মরদেহ মানিকপীর (র.) গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন- রাষ্ট্রদূত ও সিনিয়র সচিব মুশফিকুল ফজল আনসারী, সিলেট নগর প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, নগর বিএনপি’র সভাপতি নাসিম হোসাইনসহ সর্বস্তরের মানুষ। জানাজার নামাজের পূর্বে বক্তৃতায় সিটি প্রশাসক বলেন, এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে কিনা সেটি পুলিশ খতিয়ে দেখবে। এ ছাড়া তিনি মামলার দ্রুত বিচার কামনা করেন।

এর আগে গতকাল বাদ জুমা বৃহত্তর মিতালী, টিবি গেট এলাকাবাসীর উদ্যোগে টিবি গেট এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তব্যে মওদুদুল হক মওদুদ বলেন, বাবুলের প্রেমের ঘটনায় এ ঘটনা ঘটতে পারে- সেটি বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। সত্য উদ্‌ঘাটনে ভিন্নখাতে ডাইভার্ট করা হচ্ছে কিনা, তা দেখা দরকার। এলাকার মুরুব্বি আলিমুস সাদাত বলেন, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা- সে প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। ভালো করে বিষয়টি তদন্ত প্রয়োজন। তাঁতীদলের জেলার সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বেলাল বলেন, এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবো। আরেকজনের উপস্থিতি: সিলেটের ওই বাসায় ঘটনার সময় আরও এক ব্যক্তির উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকার মানুষ। ২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা গেছে, খুনের ঘটনার সময় এক ব্যক্তি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। তবে আদৌও ওই ভিডিওটি ঘটনার সময়ের কিনা, তা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ। নগর পুলিশের ডিসি (উত্তর) সাইফুল ইসলাম গতকালও বলেছেন, ঘটনার সময় ওই বাসায় বাবুল ছাড়া আর কারও উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মোবাইল ট্র্যাকিং করে তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।

ঘটনার পর বাগানে চলে যায় বাবুল: ঘটনার পর বাগানে চলে যায় বাবুল মিয়া। সেখানে গিয়ে মাদকসেবন করেন। তার বাসার কেয়ারটেকার রিয়াজ এ নিয়ে গণমাধ্যমকেও বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, বাবুলের কাছে টাকা পাবেন- এজন্য তাকে বার বার ফোন দেয়া হচ্ছে। প্রথমে জানায় শাহী ঈদগাহে যাবে। পরে বলে বাগানে। এরপর এসে টাকা দেয়। ওই সময় তার হাতের আঙ্গুলে ব্যান্ডেজ দেখেছেন বলে জানান তিনি। 

অন্তরালের রহস্যও খুঁজছে নগর পুলিশ

Thursday, June 25, 2026

দরজা খুলতে দেরি, বেডরুমে ঢুকে ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে অভিযান চালিয়ে এক নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি যুবককে নিজ শোবার ঘরে গুলি করে হত্যা করেছে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী। মঙ্গলবার সালফিত শহরের পশ্চিমে সারতা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।

নিহতের চাচা ইয়াসিন আল-খাতিবের মতে, দখলদার বাহিনীর অভিযান চলাকালে মুস্তফা তাহা মুস্তফা আল-খাতিবের বুকে, মাথায় ও হাতে বেশ কয়েকবার গুলি করা হয়।

ইয়াসিন আল-খাতিব বলেন, ঘুমিয়ে থাকায় মুস্তাফা দরজা খুলতে কিছুটা দেরি করেছিলেন। তিনি বলেন, ঘুম থেকে উঠে পোশাক পরার চেষ্টা করছিলেন তিনি। এ সময় ইসরাইলি সেনারা বাড়ির প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তার শোবার ঘরে প্রবেশ করে এবং তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ মুস্তাফাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের এগিয়ে যেতে বাধা দেয় ইসরাইলি বাহিনী। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মারা যান। সেনারা এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পর চিকিৎসাকর্মীরা সেখানে পৌঁছে তার মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে যান।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর এ ধরনের অভিযান প্রায়ই গভীর রাতে পরিচালিত হয় এবং এসব অভিযানে নিয়মিত প্রাণহানির পাশাপাশি বহু ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়।

ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরাইলের কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই কোনো অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই আটক রয়েছেন।

দরজা খুলতে দেরি, বেডরুমে ঢুকে ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যা
নিহত পশ্চিম তীরের অধিবাসী মুস্তাফা তাহা মুস্তাফা আল-খাতিব। ছবি: সংগৃহীত।

Wednesday, February 4, 2026

৯ বছর প্রেমের পর বিয়ে, দুই মাসের মধ্যেই মা-বাবার সহযোগিতায় স্বামীকে হত্যা করল স্ত্রী

নয় বছরের প্রেমের পর বিয়ে। কিন্তু বিয়ের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই সেই সংসার ভেঙে পড়ল স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যমে। উত্তরপ্রদেশের বেরেলি শহরের ইজ্জতনগর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে ৩৩ বছর বয়সী জিতেন্দ্র কুমার যাদবকে ঝুলন্ত অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। প্রথমে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে জানানো হয়। এর পরে বেরিয়ে আসতে থাকে লোমহর্ষক সব কাহিনী। প্রতিবেশীদেরও বলা হয়, জিতেন্দ্র আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বেরিয়ে আসে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল ‘শ্বাসরোধ’। সব প্রমাণ একত্র করে পুলিশ জানায়, জিতেন্দ্রকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তার স্ত্রী জ্যোতি। আর সে সময় তার শ্বশুর, শাশুড়ি ও শ্যালক তাকে চেপে ধরে রাখে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালাতে, একটি মাফলার দিয়ে দেহ জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিতেন্দ্রর শ্যালকের খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে। পুলিশ জানায়, জ্যোতি ও জিতেন্দ্র কুমার যাদব গত বছরের ২৫ নভেম্বর বিয়ে করেন। তাদের প্রেমের সম্পর্কের বয়স ছিল প্রায় নয় বছর, যা শুরু হয়েছিল ছাত্রজীবনে। হিন্দু রীতি অনুযায়ী এবং দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটি হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে মূলত টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, জ্যোতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ হাজার টাকা তুলে অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন জিতেন্দ্র। এই ক্ষতি থেকেই দাম্পত্য কলহ শুরু হয় এবং তা ক্রমেই তীব্র আকার নেয়।

২৬ জানুয়ারি জ্যোতি স্বামীর কাছে ওই টাকার হিসাব চাইলে দু’জনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। যা একপর্যায়ে শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। তখন জ্যোতি তার মা-বাবা ও ভাইকে ফোন করে ভাড়া বাড়িতে ডেকে আনেন। এই দম্পতি বিয়ের পর থেকে ইজ্জতনগরের গির্জা শঙ্কর কলোনির ওই ভাড়া বাড়িতেই থাকতেন। জিতেন্দ্রের বাড়ি ছিল ইটাওয়া জেলার ভাবুপুরা গ্রামে।

পুলিশ জানায়, জ্যোতির বাবা কালিচরণ, মা চামেলি এবং ভাই দীপক ফোন পেয়ে ওই বাড়িতে আসেন। এরপর যে সংঘর্ষ হয়, তাতে পুলিশ দাবি করছে- বাবা, মা ও ভাই মিলে জিতেন্দ্রের হাত-পা চেপে ধরে রাখেন। সেই সুযোগে জ্যোতি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। জিতেন্দ্র নিস্তেজ হয়ে পড়ার পর, হত্যার আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পুলিশ বলছে, একটি মাফলার দিয়ে দেহ বেঁধে জানালা বা ভেন্টিলেটরের গ্রিলে ঝুলিয়ে দেয়া হয়, যেন ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হয়। এরপর প্রতিবেশীদের ডেকে বলা হয়, জামাই আত্মহত্যা করেছে।

২৬ জানুয়ারি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিষয়টি প্রথমে সন্দেহজনক আত্মহত্যা হিসেবেই দেখা হয়। ভাড়া বাড়ির ভেতরেই জিতেন্দ্রর ঝুলন্ত দেহ পাওয়া যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে আত্মহত্যার দাবি খণ্ডন করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে জিতেন্দ্রর ভাই অজয় কুমার পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ জ্যোতি ও আরও তিনজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করে এবং ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট হয় জিতেন্দ্রর মৃত্যু ঝুলে পড়ার কারণে নয়, শ্বাসরোধের কারণে হয়েছে। এর ফলে আত্মহত্যার সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায়।

এরপর পুলিশ মামলার ধারা পরিবর্তন করে হত্যা মামলা রুজু করে এবং তদন্ত জোরদার করে। জ্যোতির ভাই দীপককেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা জ্যোতি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি তদন্তকারীদের জানান, ছাত্রজীবন থেকেই তার ও জিতেন্দ্রর পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। পুলিশ জানায়, জিতেন্দ্র বেরেলিতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। জ্যোতি কাজ করতেন উত্তরপ্রদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক বাস কন্ডাক্টর হিসেবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই আর্থিক বিষয় নিয়ে ঘনঘন ঝগড়া হচ্ছিল, যা সম্পর্ককে তিক্ত করে তোলে। ঘটনার দিন সেই ঝগড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তিনি পরিবারকে ফোন করেন।

পুলিশের অভিযোগ এরপর যে সংঘর্ষ হয়, তাতে তার মা-বাবা ও ভাই জিতেন্দ্রকে ধরে রাখেন এবং রাগের বশে জ্যোতি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। মৃত্যুর পর সবাই মিলে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করে।

mzamin

Thursday, January 1, 2026

অপ্রকাশযোগ্য শোকের মৃত্যুগুলোর জন্য মেকি শোক by রাফসান গালিব

প্রকাশ ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ সব মানুষের রক্ত লাল—এই প্রবচনটার প্রচলন মূলত মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই সেটার প্রকাশ করতে। দুঃখজনক হচ্ছে, রক্ত বা রক্তের রংও আসলে সে ফয়সালা দেয় না। এর জন্য আমাদের দেখতে হয় অনুভূতির প্রকাশও। শুধু রক্তের রং না; সুখ, শান্তি, দুঃখ বা শোকের রং কেমন সেখানেই একজন মানুষ কতটা মানুষ হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে, সেটি খোলাসা হয়ে যায়। মানে এভাবেই হয়ে আসছে আদিকাল থেকে। যদিও আমরা সাম্যের জয়গান গেয়ে বিষয়টিতে স্বস্তির প্রলেপ লাগাতে চাই।

কোনো কোনো সমাজতাত্ত্বিকের মতে, সমাজ নির্দিষ্ট কিছু জীবনকে ‘শোকযোগ্য’ হিসেবে ফ্রেমিং করে থাকে এবং অন্যদের ‘অ-শোকযোগ্য’ হিসেবে। কার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া সমাজ কীভাবে প্রকাশ করছে, তাতেই শ্রেণি রাজনীতি বোঝাটা খুবই সহজ বলা যায়। সিয়াম মজুমদারের নামটা এখনো এ দেশের অধিকাংশ মানুষই জানে না। যে কয়জন জানে, তাদেরও এ কয় দিনে ভুলে যাওয়ার কথা বা অল্প কয়েক দিনেই ভুলে যাবে। সিয়াম মগবাজার এলাকায় একটি দোকানের কর্মচারী ছিলেন।

২৪ ডিসেম্বর চা আনতে গিয়ে উড়ালসড়কের ওপর থেকে ছোড়া ককটেলে প্রাণটা হারালেন। তাঁর শরীরের রক্ত-মাংস চায়ের দোকানের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েছিল। মানুষের মৃত্যু তো নিশ্চিত একটা ঘটনা। তাই বলে এতটা বীভৎস মৃত্যু, কল্পনা করা যায়! কারা ককটেল ছুড়ল, কারা একটা তরতাজা তরুণের প্রাণ কেড়ে নিল, তা হয়তো আমাদের কখনো জানা হবে না। ঘাতকেরা ঠিকই আরও মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকবে।

খুলনার গ্রাম থেকে সিয়ামের পরিবারটি ঋণগ্রস্ত হয়ে ঢাকায় এসেছিল। তাঁর বাবা রিকশা চালানো শুরু করেন। মা হয়ে যান আমাদের ভাষায় বাসাবাড়ির ‘কাজের বুয়া’।  সিয়াম হয়েছিলেন দোকানের কর্মচারী। পরিবারের সবাই মিলে চেষ্টা করছিলেন ঋণমুক্ত হওয়ার। ছেলেকে হারিয়ে মা সিজু বেগমের বিলাপ, ‘আমি আর ঢাকায় থাকমু না। ঢাকায় আইস্যা সব শেষ হইয়্যা গেল।’ এই ‘জাদুর শহর’ ঢাকায় কেনই–বা তাঁরা আর থাকবেন!

এবার রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় আরেক হতভাগা ভ্যানচালক ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা করা যাক। চুরির অভিযোগে তাঁকে নির্যাতন করে মারা হয়েছে। শুনে নিশ্চয় ‘স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া’ কোনো গণপিটুনির মৃত্যুর কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এ হত্যার ঘটনা চরম নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়।

ভবানীগঞ্জের সিএনজি মালিক সমিতির সদস্যরা ওমর ফারুককে প্রথমে লোহার রড দিয়ে পেটাতে থাকেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে একটি প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে উভয় হাত ও পায়ে হাতুড়ি দিয়ে কয়েকটি লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তখনো মারধর চলতে থাকে। পানি পান করতে চাইলে নদীতে নিয়ে ওমর ফারুককে বিবস্ত্র করে চুবানো হয়। এরপর তাঁর পায়ুপথে শুকনা মরিচের গুঁড়া ঢেলে দেওয়া হয়।

নির্যাতনের একপর্যায়ে ওমর ফারুকের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে ওমর ফারুকের কাছ থেকে গাঁজা উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ওমর ফারুককে ১০০ টাকা অর্থদণ্ড ও ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।

এরপর ওমর ফারুককে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাজশাহী কারাগারে পাঠায় পুলিশ। সেখান থেকে তাঁকে পরদিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২০ ডিসেম্বর ওমর ফারুকের মৃত্যু হয়।

ডার্ক কমেডি হিসেবে একটি কৌতুক আমরা প্রায় সবাই শুনেছি। কৌতুকটি হলো: পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী কী? উত্তর: মানুষ। ওমর ফারুককে যেভাবে ধাপে ধাপে বিবিধ নির্যাতন করে মারা হলো, তাতে ডার্ক কমেডিটা নিশ্চয়ই নিছক কোনো কৌতুক থাকে না, চরম বাস্তব হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়।

ওমর ফারুকের মতো কত কত মানুষের গণপিটুনি, মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতায় বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে বীভৎস মৃত্যু ঘটেছে বা ঘটছে—তা ভদ্র শ্রেণির বিবেকের দরজায় সামান্য টোকাও দেয় না।

সিয়াম মজুমদার, ওমর ফারুকের মতো আরও অনেকের মৃত্যু—আমাদের শোকের ব্যাকরণে তাঁদের জন্য কোনো অধ্যায় তো দূরের কথা, একটা ছোট অনুচ্ছেদই নেই। যেহেতু তাঁরা সমাজের সুবিধাভোগী অংশের অন্তর্ভুক্ত নন, ফলে তাঁদের মৃত্যু ‘অশোকযোগ্যই’ থেকে যায় আমাদের কাছে। আর মৃত্যুর সঙ্গে যদি কোনো ‘রাজনীতি’ যুক্ত না থাকে, তাহলে আরও বেশিই ‘অশোকযোগ্য’।

এসব মানুষের জন্য রাষ্ট্র নেই, সরকার নেই, নাগরিক সমাজ নেই, বুদ্ধিজীবী নেই, মানবাধিকারকর্মী নেই, রাজনৈতিক মহল নেই—কেউ নেই। মার্ক্সীয় তত্ত্বের আলাপ থেকে বলতে হয়, একটি কারখানার যন্ত্র নষ্ট হলে যেমন সমাজ শোক প্রকাশ করে না, কেবল সেটি মেরামতের কথা ভাবে, শ্রমিক বা কর্মজীবী এসব মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সমাজ একই আচরণ করে। সিয়াম বা ওমর ফারুকদের মৃত্যুতে এমনটিই তো দেখতে পাই। ‘সব শেষ হইয়্যা গেল’ মানুষগুলোর জন্য ‘প্রকাশযোগ্য শোক’ করতে না পারার ব্যর্থতা আমরা কোথায় লুকাব?

* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- rafsangalib1990@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ককটেল বিস্ফোরণে নিহত যুবকের বাবা আলী আকবর মজুমদার ঘটনাস্থলে আহাজারি করছেন। গত বুধবার রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে
ককটেল বিস্ফোরণে নিহত যুবকের বাবা আলী আকবর মজুমদার ঘটনাস্থলে আহাজারি করছেন। গত বুধবার রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, December 31, 2025

এবার চীনের নাগরিক সন্দেহে উত্তরাখন্ডে ত্রিপুরার ছাত্রকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা আঞ্চলিক হিংসার পাশাপাশি ভারতের বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে জাতিগত হিংসাও কি যুক্ত হতে শুরু করেছে? প্রশ্নটি উঠেছে উত্তরাখন্ডের রাজধানী দেরাদুনে ‘চীনা’ সন্দেহে ত্রিপুরা রাজ্যের এক ছাত্রকে খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

এই ছাত্র খুনকে কেন্দ্র করে ভারতের ত্রিপুরায় সাধারণ মানুষ যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা গতকাল রোববার এই বিষয়ে কথা বলেন উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির সঙ্গে। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ধামি দোষীদের গ্রেপ্তার করে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
ত্রিপুরা ও উত্তরাখন্ড দুই রাজ্যই বিজেপিশাসিত।
ত্রিপুরার নিহত তরুণের নাম অ্যাঞ্জেল চাকমা। ত্রিপুরার ঊনকোটির বাসিন্দা অ্যাঞ্জেল দেরাদুনের এক প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় বর্ষের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

অভিযোগ, গত ৯ ডিসেম্বর অ্যাঞ্জেল ও তাঁর ছোট ভাই মাইকেল দেরাদুনের এক বাজারে গিয়েছিলেন দৈনন্দিন জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে। সেখানে স্থানীয় ছয় তরুণ তাঁদের ‘চীনা’ ও ‘মোমো’ বলে টিটকিরি দেয়। উত্ত্যক্ত করতে থাকে।

এ অবস্থায় অ্যাঞ্জেল ও মাইকেল তাঁদের বলেন, তাঁরা আদৌ চীনের নাগরিক নন। পুরোপুরি ভারতীয়। ত্রিপুরার অধিবাসী। পড়াশোনার জন্য এসেছেন। ভারতীয় পরিচয় পর্যন্ত তাঁরা দিতে চান। বিষয়টি নিয়ে এক পর্বে তর্ক শুরু হলে অ্যাঞ্জেলকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তাঁকে মাথা ও পিঠে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।

টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত শুক্রবার অ্যাঞ্জেলের মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ ত্রিপুরায় নিয়ে যাওয়ার পর আগরতলায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। সেই চাপের মুখেই মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা ফোন করেন উত্তরাখন্ডের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামিকে।

অ্যাঞ্জেলের বাবা তরুণ প্রসাদ চাকমা বিএসএফের হেড কনস্টেবল। মণিপুরে পোস্টিং। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অ্যাঞ্জেল দেরাদুনে গিয়েছিলেন এমবিএ পড়তে। তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় বসার আগেই তিনি এক সংস্থায় চাকরিও পেয়েছিলেন। পরীক্ষা শুরুর আগের দিনই তিনি আক্রান্ত হলেন।

মানিক সাহা জানান, মুখ্যমন্ত্রী ধামি তাঁকে বলেছেন, ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি একজন অভিযুক্ত নেপালে পালিয়ে গেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী ধামি জানিয়েছেন, অভিযুক্তকে ধরতে পুলিশের একটি দল নেপালে গেছে।

এ খুনের ঘটনায় উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা। ত্রিপুরার তিপ্রা মথা পার্টির নেতা প্রদ্যোৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মার সঙ্গে কনরাড সাংমা সম্প্রতি ‘ওয়ান নর্থইস্ট পার্টি’ নামে একটি মঞ্চ গঠন করেছেন।

নিহত ব্যক্তির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে এই দুই নেতা বলেন, উত্তর–পূর্বাঞ্চলের মানুষও আর পাঁচজনের মতো ভারতীয়। এই আঘাত কোনো ব্যক্তিবিশেষকে নয়, গোটা অঞ্চলকে করা হয়েছে।

উত্তর–পূর্বাঞ্চলের যুব সম্প্রদায়কে দিল্লিসহ বিভিন্ন প্রদেশে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। ইদানীং সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছিল বলে মনে হচ্ছিল; কিন্তু অ্যাঞ্জেলের মৃত্যু সেই ধারণা ভুল প্রতিপন্ন করল।

সম্প্রতি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে ঘৃণা অপরাধের ঘটনা বেড়ে গেছে। চলতি মাসেই দুজন পরিযায়ী শ্রমিক ঘৃণা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে ওডিশার সম্বলপুরে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের জুয়েল রানাকে (১৯) বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর সঙ্গে যাওয়া দুই সহকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন।

ছত্তিশগড় থেকে কেরালার পালাক্কাড়ে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন ৩১ বছরের রামনারায়ণ বাঘেল। তাঁকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়। মারধরের সময় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল বাংলাদেশি কি না।

ওডিশাতেই ঝাড়সুগুদা জেলায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে যাওয়া চার শ্রমিক। গত বুধবার তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ দাগিয়ে মারধর করে আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে। ওই ঘটনার পর তাঁরা সবাই পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসেছেন।

চলতি বছর বড়দিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও আরএসএসের কর্মীরা তাণ্ডব চালিয়েছে। গোরক্ষকদের হাতে দলিত ও মুসলিমদের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে চলেছে; কিন্তু এবারই প্রথম ‘চীনা’ সন্দেহে কাউকে আক্রান্ত হতে দেখা গেল।

ওডিশায় জুয়েল রানাকে পিটিয়ে মারার পর জম্মু–কাশ্মীরের পিডিপি নেত্রী ইলতিজা মুফতি ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লেখেন, ‘ইন্ডিয়া, ভারত বা হিন্দুস্তান নয়, তোমার নাম এখন লিঞ্চিস্তান (গণপিটুনির দেশ)।’

ত্রিপুরাসহ উত্তর–পূর্ব ভারতে অ্যাঞ্জেল চাকমা হত্যার বিচারের দাবি উঠেছে
ত্রিপুরাসহ উত্তর–পূর্ব ভারতে অ্যাঞ্জেল চাকমা হত্যার বিচারের দাবি উঠেছে। ছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স থেকে নেওয়া

Friday, December 12, 2025

বিতণ্ডার মধ্যে মাকে ছুরিকাঘাত, চিৎকারে ঘুম থেকে উঠে এলে মেয়ের ঘাড়ে কোপ -গৃহকর্মীর বরাতে পুলিশ

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা–মেয়েকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, বাসাটি থেকে দুই হাজার টাকা চুরি হওয়া নিয়ে গৃহবধূ লায়লা আফরোজের সঙ্গে গৃহকর্মীর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এর জের ধরেই মা–মেয়ে খুনের এ ঘটনা ঘটে।

গত সোমবার মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি ভবনের সপ্তম তলার বাসায় লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার একমাত্র সন্তান নাফিসা নাওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) গলা কেটে হত্যা করা হয়। চার দিন আগে ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন আয়েশা (২০)। গতকাল বুধবার দুপুরে ঝালকাঠির নলছিটি থেকে আয়েশা ও তাঁর স্বামী রাব্বীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আয়েশা হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

কেন এই হত্যাকাণ্ড, সে বিষয়ে আয়েশার দেওয়া বক্তব্যের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত থেকে চুরি করার অভ্যাস তাঁর আগ থেকেই ছিল। এই বাসায় কাজে যোগ দেওয়ার দ্বিতীয় দিন আয়েশা গৃহকর্তার মানিব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করেন। এ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে গৃহকর্ত্রী লায়লা আফরোজের সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। গৃহকর্ত্রী আয়েশাকে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখান। এ নিয়ে কাজের তৃতীয় দিনেও দুজনের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।

নজরুল ইসলাম বলেন, চতুর্থ দিনে কাজে যাওয়ার সময় আয়েশা পরিকল্পনা করেন, তাঁর সঙ্গে আবার বিতণ্ডা হলে তিনি লায়লাকে ছুরিকাঘাত করবেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাসা থেকে সুইচ গিয়ার ছুরি সঙ্গে করে নিয়ে যান। সেদিন লায়লার সঙ্গে আয়েশার আবার কথা–কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে লায়লা তাঁর স্বামীকে মোবাইলে কল দিতে গেলে আয়েশা পেছন থেকে তাঁর ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করেন। তখন তাঁদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এরপর আয়েশা ছুরি দিয়ে লায়লাকে একের পর এক আঘাত করেন। তখন পাশের ঘুরে ঘুমিয়ে ছিল লায়লার মেয়ে নবম শ্রেণিপড়ুয়া নাফিসা। চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে এসে মাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে সে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীকে ফোন করতে যায়। তখন তার ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করেন গৃহকর্মী আয়েশা।

নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন আয়েশা নিজেও আহত হন। এরপর তিনি নিজের রক্তমাখা পোশাক পাল্টে নাফিসার স্কুলড্রেস পরে একটি ল্যাপটপ ও মোবাইল নিয়ে চলে যান।

মা–মেয়েকে হত্যার পর বাসা থেকে বেরিয়ে আয়েশা কীভাবে চলে যান, তার বর্ণনা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান ও অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা। তাঁরা জানান, আয়েশা ওই বাসা থেকে বেরিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে যান। সেখানে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করে সাভারের দিকে চলে যান। তাঁদের বাসা সাভারের হেমায়েতপুরে। স্বামী রাব্বীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তাঁরা ওই বাসা থেকে চুরি করে নেওয়া মোবাইল ও তাঁর নিজের রক্তমাখা কাপড় সিঙ্গাইর সেতু থেকে নদীতে ফেলে দেন। পরে তাঁরা আত্মগোপনে থাকার জন্য ঝালকাঠির নলছিটিতে রাব্বীর দাদাবাড়ি চলে যান।

চুরির এক জিডির সূত্র ধরে আয়েশাকে শনাক্ত

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, ওই বাসায় কাজে যোগ দেওয়ার সময় আয়েশার কোনো মোবাইল নম্বর, ঠিকানা রাখা হয়নি। গত জুলাইয়ে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের হওয়া চুরির ঘটনাসংক্রান্ত একটি জিডির সূত্র ধরে তাঁকে শনাক্ত করে পুলিশ। ওই জিডিতে বলা হয়, বাবর রোডের একটি বাসা থেকে আয়েশা আট হাজার টাকা ও একটি সোনার আংটি চুরি করেছিলেন।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ওই জিডির তদন্ত কর্মকর্তা আয়েশার কাছ থেকে চুরি হওয়া টাকা ও সোনার আংটি উদ্ধার করেছিলেন। মা–মেয়ে খুনের ঘটনা উদ্‌ঘাটনে বসা বৈঠকে ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, বাবর রোডের বাসা থেকে সোনার আংটি চুরি করা আয়েশার গলার একপাশে পোড়া দাগ রয়েছে। আয়েশার দেওয়া একটি মুঠোফোন নম্বর রয়েছে বলে জানান তিনি। মা–মেয়ে খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটনে এটাই ছিল একমাত্র ক্লু (সূত্র)। ওই মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে মহসিন নামের একজন ফোন ধরে জানান, একটি ঘটনায় তিনি জেলে গিয়েছিলেন। সেই সময় নম্বরটি তাঁর বন্ধু রাব্বী ব্যবহার করতেন। মোবাইলের ডিসপ্লে নষ্ট থাকায় তা ঠিক করতে কিছুদিন আগে রাব্বী সেটি তাঁকে দিয়েছিলেন। মহসিন জানান, রাব্বীর স্ত্রীর নাম আয়েশা, গৃহকর্মীর কাজ করেন এবং সাভারের হেমায়েতপুরে থাকেন। এভাবে রাব্বীকে শনাক্ত করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, আয়েশার খোঁজে হেমায়েতপুরে তাঁদের ভাড়া বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে রাব্বী ও তাঁর স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। ওই বাসায় আয়েশার সঙ্গে তাঁর শাশুড়ি ও মা থাকতেন। তাঁদের কাছ থেকে আয়েশা বরিশালে যেতে পারেন এমন ধারণা পেয়ে পুলিশ পটুয়াখালীর দুমকিতে এবং পরে বুধবার দুপুরে ঝালকাঠির নলছিটিতে রাব্বীর দাদার বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখান থেকে রাব্বী ও আয়েশাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে মা–মেয়েকে খুন করার পর ওই বাসা থেকে খোয়া যাওয়া একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে।

শুধু দুই হাজার টাকা চুরির জন্যই এ জোড়া খুন—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যদি দুই হাজার টাকার জন্য বিতণ্ডা না হতো, তাহলে সে কাজে না–ও আসতে পারত। কিন্তু পরদিন সে ওই বাসায় ছুরি নিয়ে ঢুকেছে, ক্রাইম করার জন্যই ঢুকছে। সে কোনো মোবাইল ব্যবহার করেনি। মুখ ঢেকে আসছে, কাজটা করার পরে কীভাবে সেফ এক্সিট হবে, মেয়ের স্কুলড্রেস পরে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেছে। তার ক্লিয়ার ক্রিমিনাল ইনটেনশন আছে। এর পাশাপাশি পুলিশে দেওয়ার ভয়, রাগারাগির ক্ষোভ কাজ করেছে আয়েশার।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো আরও তথ্য পাওয়া যাবে। তাঁর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না বা এর পেছনে কোনো সিন্ডিকেট আছে কি না, তা জানা যাবে।

রিমান্ড মঞ্জুর

মা–মেয়েকে হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সহিদুল ইসলাম আয়েশা ও তাঁর স্বামী রাব্বীকে আজ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন জানান। শুনানি শেষে আদালত আয়েশার ছয় দিন ও রাব্বির তিন দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়েকে হত্যায় গ্রেপ্তার গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার। আজ বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়েকে হত্যায় গ্রেপ্তার গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার। আজ বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে। ছবি: ডিএমপির সৌজন্যে

Tuesday, December 9, 2025

মা-মেয়ে হত্যার পর স্কুল ড্রেস পরে পালায় ঘাতক

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাসায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন এম জেড আজিজুল ইসলাম। চারদিন আগে আয়েশা নামের এক নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যোগদান করে। গতকাল সকালে আজিজুলের স্ত্রী মালাইলা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা বিনতে আজিজ (১৫)কে ছুরি দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় গৃহকর্মী আয়েশা। পালিয়ে যাওয়ার আগে ঘাতক আয়েশা বাথরুমে গোসল করে নিহত নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পালায়। শাহজাহান রোডের ৩২/২/এ বাসার সপ্তম তলার ৭/বি ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মালাইলা আফরোজ পেশায় গৃহিণী ও নাফিসা মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তবে কি কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জানা যায়নি এবং ঘাতক আয়েশাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

নিহত নাফিসার বাবা উত্তরার সানবিমস স্কুলের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আজিজুল ইসলাম বলেন, বাসায় একজন কাজের মহিলা দরকার ছিল। সাধারণত গেটে অনেকে কাজের সন্ধানে আসেন। চারদিন আগে একটি মেয়ে আসে। বোরকা পরিহিত মেয়েটি বাসার দারোয়ান খালেকের কাছে কাজের সন্ধান করলে সে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর আমার স্ত্রী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে কাজে রেখে দেয়। পরে স্ত্রীর মুখে শুনেছি, মেয়েটার নাম আয়েশা। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর। জেনেভা ক্যাম্পে চাচা-চাচির সঙ্গে থাকে। বাবা-মা আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার শরীরেও আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েটা কাজ শুরুর পর প্রথম দু’দিন সময়মতো এসেছে। গতকাল সে সাড়ে ৯টার দিকে আসে। আজ কী হয়েছে, এটা তো আর বলার অবস্থায় নেই।

ভবনের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, নাফিসার বাবা স্কুলের উদ্দেশ্যে সকাল ৭টার দিকে বের হয়ে যান। সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরখা পরে ওই বাসার লিফটে ওঠে সাত তলায় যায় গৃহকর্মী আয়েশা। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে ড্রেস পরে মুখে মাস্ক লাগিয়ে বের হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নাফিসার বাবা বাসায় ফিরে স্ত্রী ও মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মাকে হত্যার পর ওই মেয়েটি দৌড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হয়তো ইন্টারকমে সিকিউরিটি গার্ডকে ফোন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইন্টারকমের লাইনটি খোলা পাওয়া যায়। মেয়েটি খুব সুন্দরভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে বাথরুমে গিয়ে গোসল করে শরীরের রক্ত পরিষ্কার করে নাফিসার স্কুলের ড্রেস পরে নির্দ্বিধায় গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফ্ল্যাটের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ। বাসার আলমারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা। পুলিশ জানায়, তল্লাশি করে বাথরুমে একটি সুইচ গিয়ার ও একটি ধারালো অস্ত্র পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছুরি দু’টি দিয়ে মা-মেয়েকে হত্যা করে গৃহকর্মী আয়েশা। এ ঘটনায় ওই বাসার দারোয়ান মালেককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে, মেঝেতে এবং দেয়ালে রক্তের দাগ রয়েছে। আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ তছনছ অবস্থায় রয়েছে। যা মনে করছি, প্রাথমিকভাবে কিছু খোয়া যেতে পারে। সিসি ক্যামেরা ফুটেজে আমরা একজনকেই দেখেছি, পরে দেখবো আশপাশে আরও কেউ ছিল কিনা।  পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান জানান, পুলিশ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে খবর পায়। মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে নেয়ার পর মারা যায়। পরে লাশ দু’টি সুরতহালের পর ময়নাতদন্তের জন্য সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি, সেসব যাচাই-বাছাই চলছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি, হত্যার আগে-পরে তার উপস্থিতি ও অ্যাকটিভিটিজ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবো।

https://mzamin.com/uploads/news/main/193252_le.webp

Saturday, September 27, 2025

চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ড: ট্রাম্প কি দাঙ্গা–ফ্যাসাদকেই নীতি হিসেবে নিয়েছেন by জ্যঁ ভার্নার ম্যুলার

যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দিন আগে কট্টর ডানপন্থী নেতা চার্লি কার্ককে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দেশের দুই রাজনৈতিক শিবির (ডানপন্থী ও বামপন্থী) শান্তভাবে প্রতিক্রিয়া দেখালেও এটি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভারসাম্য নেই। কারণ, ডানপন্থী অনেক নেতা, এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও খুনির পরিচয় বা উদ্দেশ্য না জেনেই সরাসরি বামপন্থীদের দোষারোপ করেছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ডাক দিয়েছেন।

ট্রাম্প প্রায় এক দশক ধরে ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন, তাঁর সমর্থকদের রাজনৈতিক সহিংসতা মেনে নেওয়া যায় এবং কখনো কখনো এমন সহিংসতা পুরস্কৃতও হতে পারে। এর অনেক উদাহরণ আছে।

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেস ভবনে হামলার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত বহু সহিংস অপরাধীকে ট্রাম্প ক্ষমা করে দিয়েছেন। শুধু তা–ই নয়, ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা এসব কর্মকাণ্ডকে সহিংসতা না বলে এগুলোকে বৈধ, এমনকি দেশপ্রেমিকদের আত্মরক্ষার কাজ হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের এমনভাবে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরে আসছেন, ঠিক যেমন অন্য ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদীরাও নিজেদের সব সময় ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেন।

চার্লি কার্ক হত্যার পর কিছু বামপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশোভন মন্তব্য করেছেন। তাঁরা বিদ্রূপ করে বলেছেন, কার্ক নিজেই বলেছিলেন, বন্দুক হামলায় মৃত্যু মানা যেতে পারে। কারণ, এটি অস্ত্র রাখার অধিকার নিশ্চিত করার মূল্য। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখা গেছে, উদারপন্থী লেখক ও সমালোচকেরা শুধু সহিংসতাকে নিন্দা করেননি; বরং কার্ককে একজন সৎ বিতর্ককারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিপরীতে ডানপন্থী অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি দমননীতির ডাক দিয়েছেন। কেউ কেউ সরাসরি ‘যুদ্ধের’ কথাও বলেছেন। এমনকি এফবিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা জে এডগার হুভারের বেআইনি কৌশল অনুসরণ করতে হবে, এমন বক্তব্যও দিয়েছেন।

আরও উদ্বেগজনক হলো ট্রাম্প নিজেই এ হত্যাকাণ্ডকে নিজের অপছন্দের সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোর ওপর আক্রমণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর প্রশাসনের কয়েকজন সদস্য আগেই ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ‘দেশীয় সন্ত্রাসী সংগঠন’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। ট্রাম্প আগেও দেখিয়েছেন, তিনি ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে যেতে দ্বিধা করেন না। তাই বিরোধীদের বিচারের হুমকি শুধুই ডেমোক্র্যাটদের জন্য নয়, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সবার জন্যই ভয়ংকর সংকেত।

ট্রাম্প শুধু আইন অমান্য করেননি, বারবার রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকিয়েছেন। ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে কাউকে গুলি করার কল্পনা করা, সমর্থকদের বিরোধীদের মারধর করানোর আহ্বান, ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে সহিংস শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের ‘ভালো মানুষ’ বলা, এমনকি ৬ জানুয়ারি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে ফাঁসিতে ঝোলানোর হুমকি দেখেও আপত্তি না করা—সবই এর প্রমাণ। এসব উসকানি দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকাই তাঁর লক্ষ্য ছিল।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ছিল নিষ্ঠুরতার বড় প্রদর্শনী। এবার তাঁর প্রশাসন সরাসরি সহিংসতার বন্দনা করছে। ভেনেজুয়েলার উপকূলে ১১ জনকে কোনো আইনি কারণ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে এবং সে খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনন্দের সঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি নিয়মিতভাবে এমন ছবি ছড়াচ্ছে, যেখানে প্রিয়জনদের জোর করে তুলে নেওয়ার পর তাঁদের পরিবারের মানুষদের কষ্ট দেখানো হচ্ছে। এক পোস্টে দেখা গেছে, আইসিইয়ের কর্মীরা নাৎসি হেলমেট পরে ছবি তুলছেন। ট্রাম্প হয়তো এবার তাঁর অনুসারীদের জন্য সব বাঁধন খুলে দিচ্ছেন। কারণ, তিনি নিজেই আইন ও নিয়মকে অগ্রাহ্য করে চলেছেন।

দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প নিজেকে অপরাধী না বলে ভুক্তভোগী হিসেবে দেখাচ্ছেন। তাঁর পেছনে পুরো এক ‘অভিযোগ ইন্ডাস্ট্রি’ কাজ করছে। ফক্স নিউজ থেকে শুরু করে টক-রেডিও—সব জায়গায় প্রচারকেরা বলছেন, ট্রাম্পপন্থীদের রাগ হওয়া স্বাভাবিক। এই ভুক্তভোগিতাকেই এখন সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে এর মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। কিছু লোক হয়তো তা চাইছে বা তার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু জরিপ দেখাচ্ছে, অধিকাংশ মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতার বিপক্ষে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্পের ওপর হামলার পরও সহিংসতার প্রতি সমর্থন কমেছে।

অনেকে আশা করেন, ট্রাম্প একদিন রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ঐক্যের পথ ধরবেন। কিন্তু কার্ক হত্যার রাতের ঘটনা দেখাচ্ছে, ট্রাম্পের বিভাজনমূলক কৌশল চলতে থাকবে। দুর্ভাগ্য হলো, এখন তাঁর প্রশাসন ‘মতবিরোধের স্বাদ’ নয়; বরং ‘নিষ্ঠুরতার স্বাদ’ প্রচলিত করছে। আর কিছু মানুষ সেটিকেই গ্রহণ করছে।

● জ্যঁ ভার্নার ম্যুলার, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত

২০২৪ সালে একটি নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চার্লি কার্ক
২০২৪ সালে একটি নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চার্লি কার্ক। ছবি: এএফপি

Thursday, July 17, 2025

গোপালগঞ্জে নিহত ইমনের মা: ‘আমার সংসার বাঁচাবার মতো আর কেউ নাই’

টিনের ছোট ঘর। সেই ঘরজুড়ে সংসারের অভাবের ছাপ। সামনের ছোট উঠান ভরে গেছে স্বজন–প্রতিবেশীতে। স্বজনেরা বিলাপ করছেন, প্রতিবেশীরা করছেন আফসোস। সেখানে বসে আছেন গোপালগঞ্জে গতকাল বুধবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশ ঘিরে হামলা–সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত ইমন তালুকদারের (১৭) মা রোকসানা বেগম।

নিহত ইমন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ভেড়ার বাজার গ্রামের আজাদ তালুকদারের ছেলে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলে হারানোর শোকে বাক্‌রুদ্ধ মা। কেউ তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কেউ সান্ত্বনা দিতে এসে নিজেই কাঁদছেন। তবুও ইমনের মা রোকসানার মুখে একটি শব্দও নেই।

নিহত ইমনের মামাতো ভাই রানা ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার ভাইডারে প্রাণে মাইরে ফ্যালতে হলো। ও তো প্রাণভিক্ষা চাইছেল। তার পরেও কেন মারতে হলো? কীভাবে মারল, আমরা তো ভিডিওতে দেখলাম। কীভাবে সহ্য করব? গুলি করে ফেলে পাড়ায় ধরে মাইরা ফেলল।’

প্রতিবেশী রাজু তালুকদার বলেন, ওরা দুই বোন ও তিন ভাই। বড় ভাই অসুস্থ। একটা বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন আর ভাইটা পড়াশোনা করে, সেই খরচ ইমনই চালাত। ওর বাবা অসুস্থ। এ নিয়েই কখনো কখনো ভ্যান চালান। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বাবা একদম পাগল হয়ে গেছেন। ছেলের জানাজায় পর্যন্ত থাকেননি। বাড়ি থেকে কোথায় যেন চলে গেছেন, কেউ জানে না।

একপর্যায়ে ইমনের মা রোকসানা বেগম বলে ওঠেন, ‘এখন আমার সংসার বাঁচাবার মতো আর কেউ নাই। ছাওয়াল মরসে শুইনা ওর বাপ পাগল হইয়া চইলা গেছে। আমার বাপে সংসারটা টানত। এখন আমার চারটে–পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকার কোনো পথ নাই, বাঁচার পথ নাই। আমার ছেলেরে যেমন পাড়ায় মারছে, গুলি করে মারছে, আমি এর বিচার চাই।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, নিহত ইমন তালুকদার গোপালগঞ্জ শহরে মুন্সি ক্রোকারিজ দোকানের কর্মচারী ছিল। গতকাল সকালে সে অন্য দিনের মতো দোকানে যায়। দোকানের মালিক তাকে দেড় শ টাকা দিয়ে বেলা ১১টার দিকে বাড়ি চলে যেতে বলেন। ইমন বাড়ি না গিয়ে সংঘর্ষস্থলে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ সকাল সাড়ে সাতটায় গোপালগঞ্জ গেটপাড়ার পৌর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

গোপালগঞ্জে গতকাল বুধবার এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা–সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত ইমন তালুকদার
গোপালগঞ্জে গতকাল বুধবার এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা–সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত ইমন তালুকদার। ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া