Showing posts with label স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা. Show all posts
Showing posts with label স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা. Show all posts

Sunday, August 23, 2026

গাজায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি রোগীর জরুরি ওষুধ প্রয়োজন

গাজা উপত্যকায় ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি রোগীর জরুরি ওষুধ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন প্যালেস্টিনিয়ান মেডিকেল রিলিফ সোসাইটির পরিচালক মোহাম্মদ আবু আফাশ। শনিবার তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে আল জাজিরা।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ আবু আফাশ বলেন, গাজায় বিপুলসংখ্যক রোগীর প্রয়োজনীয় ওষুধের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে যে পরিমাণ চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশ করছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।

আবু আফাশ সতর্ক করে বলেন, গাজা উপত্যকায় পর্যাপ্ত চিকিৎসাসহায়তা প্রবেশ না করলে সেখানকার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ বাড়ানো না হলে রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। খোদ দখলদার বাহিনীও তা স্বীকার করে নিচ্ছে। যেমন, গাজার নুসেইরাত এলাকায় বুধবার (১৯ আগস্ট) চালানো এক হামলায় হামাসের এক সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

বাহিনীটি দাবি করে, নিহত ব্যক্তির নাম সাবাহি সামি মাহমুদ শাহাতা। তিনি হামাসের সামরিক শাখার একজন প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন।

ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযোগ, শাহাতা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে চালানো হামলায় অংশ নিয়েছিলেন এবং ইসরায়েলিদের আটক করে রাখার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

সেনাবাহিনী আরও দাবি করেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে বন্দিদের মুক্তি ও তাদের রেডক্রসের কাছে হস্তান্তরের সময় আয়োজিত হস্তান্তর অনুষ্ঠানেও শাহাতা অংশ নিয়েছিলেন।

সূত্র: আল জাজিরা

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার একটি এলাকা। পুরোনো ছবি
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার একটি এলাকা। পুরোনো ছবি

Saturday, August 22, 2026

নবজাতকের চোখে পুঁজ কেন হয়, কেন পানি পড়ে by ডা. গোলাম রাব্বানী

নবজাতকের চোখ থেকে নানা কারণে পানি বা পুঁজ পড়তে পারে। এ ধরনের সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ না করে। এমন দুটি রোগ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক, যা এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

আমাদের চোখে একটা বিশেষ নালি থাকে। এর নাম নেত্রনালি বা ন্যাসোলেক্রিমাল ডাক্ট। এই নালি দিয়ে চোখের পানি নাকের ভেতর দিয়ে নেমে যায় স্বাভাবিক নিয়মে। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে জন্মের সময় এই নালিপথ পুরোপুরি খোলা থাকে না। একে বলা হয় কনজেনিটাল ন্যাসোলেক্রিমাল ডাক্ট অবস্ট্রাকশন।

উপসর্গ

* চোখে বারবার পানি আসা

* চোখের কোনায় ঘন ঘন পুঁজ বা সাদা স্রাব জমা হওয়া

* চোখের পাপড়ি বারবার ভিজে যাওয়া

* চোখ লাল হয়ে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে

করণীয়

জন্মের সময় নেত্রনালির নিচের অংশে পাতলা পর্দা রয়ে গেলে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই সমস্যা সাধারণত এক বছরের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়।

তবে চিকিৎসা হিসেবে চোখের ভেতরের কোনায় (যেখানে নাকের পাশ দিয়ে পানি বের হয়) চিকিৎসকের পরামর্শমতো আঙুল দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে মালিশ করতে হয়।

মালিশের দিক হয় ওপর থেকে নিচে। রোজ ৮-১০ বার ম্যাসাজ করতে হয়। তবে তা করতে হয় খুব সাবধানে। নইলে নালির ভেতরের পর্দা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ ছাড়া ভেজা, পরিষ্কার, নরম কাপড় বা জীবাণুমুক্ত তুলা দিয়ে চোখ পরিষ্কার করতে হয়। চোখ লাল হলে বা সংক্রমণের অন্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দিতে পারেন।

এক বছর পরও যদি না সারে, সে ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রযুক্তির সহায়তায় নেত্রনালি ছিদ্র করার ব্যবস্থা করতে পারেন। তাতেও না সারলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

জন্মের পর চোখ ওঠা

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় নিওন্যাটাল কনজাংটিভাইটিস (অফথ্যালমিয়া নিওন্যাটোরাম)। শিশুর জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে চোখ লাল হওয়া, চোখ থেকে পুঁজ বা স্রাব বের হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে ধরে নেওয়া হয় এ রোগ হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে।

উপসর্গ

* চোখ লাল হওয়া

* চোখ ফুলে যাওয়া

* প্রচুর পানি ও ময়লা আসা

* গুরুতর ক্ষেত্রে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাতে দাগ পড়ে যায়, যাতে শিশু অন্ধও হয়ে যেতে পারে

করণীয়

* এটি জরুরি অবস্থা, অবহেলা করা যাবে না।

* যত দ্রুত সম্ভব চক্ষুবিশেষজ্ঞ/শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিতে হবে।

* চোখ সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে (চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ দিতে হ বে এবং ফুটানো ঠান্ডা করা পানি বা জীবাণুমুক্ত স্যালাইন দিয়ে মুছে দিতে হবে)।

নবজাতকের চোখ থেকে নানা কারণে পানি বা পুঁজ পড়তে পারে
নবজাতকের চোখ থেকে নানা কারণে পানি বা পুঁজ পড়তে পারে। ছবি: প্রথম আলো

Thursday, August 20, 2026

বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা–বাবার by শিশির মোড়ল

মাথাভর্তি চুল। মুখে কথা লেগে আছে। সারাক্ষণ কিছু না কিছু বলছে। বাবাকেও প্রশ্ন করে চলেছে। গান গাইছে একটার পর একটা। বাবার কোলে থাকা শিশুটি সবই করছে ঠিকঠাক। মনে প্রশ্ন জাগে, ও পারে না কী?

পারে না শুধু দাঁড়াতে, হাঁটতে। সোজা হয়ে বসতে পারে না। বসলে মাথা ঢলে পড়ে। এই বয়সী শিশুর পেশিতে যে শক্তি থাকা দরকার, তা ওর নেই। শিশুটি বংশগত রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগটির নাম স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (এসএমএ)।

শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির একমাত্র সন্তান এই শিশু। নাম অলিভিয়া সঞ্চারী নবনী, বয়স চার বছর দুই মাস। রাজধানীর মগবাজারে তাঁদের বাসা। সন্তানের এসএমএ আছে জানার মুহূর্ত থেকে এই দম্পতির কাছে দুনিয়ার সবকিছু যেন ধূসর হয়ে গেছে। তাঁদের মেয়ে বিরল রোগে ভুগছে। এমন রোগ কম দেখা যায়। এসএমএ একটি বিরল রোগ।

২৩ আগস্ট ওই দম্পতির বাসায় তাঁদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাসা ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে কথা হয় শিশুটির সঙ্গে। শিশুর মা শাহিন আক্তার বলেন, ২০২১ সালের ২০ জুন নবনীর জন্ম। ঠিক সময়ে জন্ম হয়েছিল, জন্মের সময় ওজন ৩ কিলোগ্রামের বেশি ছিল। হাত–পা নড়াচড়াতেও সমস্যা ছিল না। জন্মের ২৫–২৬ দিন পর প্রথম চোখে পড়ল, মেয়ের পা দুটোর নড়াচড়া কমে গেছে। স্বামী–স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে শিশু স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিজানুর রহমানের শরণাপন্ন হন। ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন, যে পরীক্ষার ব্যবস্থা দেশে ছিল না।

শিশুর বাবা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘তখন করোনা শেষ হয়নি, বিদেশ যাতায়াত কঠিন ছিল। আমরা অক্টোবরে (২০২১) ভারতের চেন্নাই গিয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে মেয়েকে দেখাই। চেন্নাই থেকে রক্তের নমুনা পাঠানো হয় বেঙ্গালুরুতে। নভেম্বরে আমাদের জানানো হয় মেয়ের এসএমএ।’

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে এসএমএ মানুষের জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। মা ও বাবা উভয়ই এসএমএর বাহক হলে তাঁদের সন্তানদের ২৫ শতাংশ ঝুঁকি থাকে এসএমএ রোগী হওয়ার। এসএমএ থাকলে পেশি নিয়ন্ত্রণের শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবানো ও গিলতে অসুবিধা হয়, মেরুদণ্ড বাকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। এসএমএর রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্মে একটি শিশুর এসএমএ দেখা যায়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসএমএ–কে আমরা বিরল রোগ বলছি। তবে দেশে আরও অনেক ধরনের বিরল রোগ আছে।’

বিরল রোগ সংক্রামক বা অসংক্রমাক হতে পারে। তবে বিরল রোগ কেন্দ্রে কেন্দ্রে রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো ধরনের কাজ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরল রোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথকভাবে কোনো শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কোনো কাজ নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন সেটার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।’

বিরল রোগ কী

জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে রোগের প্রাদুর্ভাব কম দেখা যায়, তা বিরল রোগ। এ বছর ফেব্রুয়ারির বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি দলিল বলছে, বিরল রোগ হচ্ছে একটি বিশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, যা প্রতি দুই হাজার মানুষের মধ্যে একজনে বা তার কমে দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় সাত হাজার বিরল রোগ আছে, ভুগছে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ। ৭০ শতাংশ বিরল রোগ শিশু বয়সে শুরু হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগ সাধারণত জটিল, একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এতে প্রভাবিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি সহ–অসুস্থতায় (কো–মরবিডিটি) ভোগে। রোগটি দ্রুত অবনতির দিকে যায়, প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করে ও অকালমৃত্যুর কারণ হয়।

বিরল রোগ নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। এদের নিয়ে কাজও কম। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে থাকতে দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দুই লাখ মানুষের মধ্যে একজনের যে রোগটি হয়, তা বিরল রোগ। দেশটিতে প্রায় ছয় হাজার বিরল রোগ আছে। এসব রোগে আড়াই কোটি মানুষ ভুগছে।

দেশে কত বিরল রোগ

এই প্রতিবেদক গত মার্চ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনটি হাসপাতাল, বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও ৩০ জনের বেশি অভিভাববক ও রোগীর সঙ্গে কথা বলে দেশে বিরল রোগের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছেন। এই সময়ে এসএমএ, ডিএমডি, হিমোফিলিয়া, মোয়ামোয়া, সিফা সিনড্রোম, রেটস সিনড্রোম, প্রজেরিয়া, ট্রি ম্যান সিনড্রোম, এক্সপির মতো বিরল রোগের কথা জানা গেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

এসএমএ জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। এতে পেশির নিয়ন্ত্রণ শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবোতে ও গিলতে সমস্যা হয়, মেরুদণ্ড বাঁকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে ও সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্ম নিলে তাদের মধ্যে একজনের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দেশে এই রোগী আছে ২০০ থেকে ৩০০।

জিনের ত্রুটিজনিত আরেকটি রোগ ডুচেনি মাসকুলার ডিস্ট্রোফি (ডিএমডি)। এটি ছেলেদের বেশি হয়। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়। অনুমান করা হয়, দেশে ডিএমডি রোগী আছে দুই শর কাছাকাছি। ১০ হাজার জীবিত জন্মে একজনের এটি দেখা যায়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের চিকিৎসকেরা ‘রেটস সিনড্রোম’ নামের একটি বিরল রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন। এটিও জিনের ত্রুটিজনিত স্নায়ুর রোগ। জন্মের দেড়-দুই বছর পর্যন্ত শিশু ভালোই থাকে। তারপর থেকে শিশুর খিঁচুনি হতে দেখা যায়। শিশুর মাথা বড় হয় না। শিশু ভুলে যেতে থাকে। কত মানুষ এতে আক্রান্ত, তা জানা যায় না।

দেশের গণমাধ্যমগুলো ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজনদারকে নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। আবুল বাজনদারের হাত ও পায়ের আকৃতি ছিল গাছের শিকড়ের মতো। জিনের নির্দিষ্ট ত্রুটি থাকা মানুষ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগটি দেখা দেয়।

আবুল বাজনদার ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি আবার অস্ত্রোপচারের জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত তাঁর দুই হাত ও দুই পায়ে ৩০টি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে।

প্রায় একইভাবে গণমাধ্যমের দৃষ্টি পড়েছিল একজন ‘প্রজেরিয়া’ রোগীর ওপর। এতে শিশুর চেহারা প্রবীণের মতো হয়। জিনের রূপান্তরে এটা হয়। মানুষ অল্প সময়ে বুড়িয়ে যায়। হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি থাকে। এক কোটি মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি একজন দেখা যায়।

রক্তের একটি বিরল রোগ হিমোফিলিয়া। কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ হয় না। এই রোগ সাধারণত পুরুষের হয়, নারী এই রোগের বাহক। ১০ হাজার মানুষের মধ্যে এই রোগে একজনকে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।

২০১৬ সালের নভেম্বরে রাজধানীর উত্তরার একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে ৮ ও ১২ বছর বয়সী দুই ভাইবোনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। এরা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। দুই ভাইবোন জিনের ত্রুটিজনিত জেরোডার্মা পিগমেনটোসামের (এক্সপি) রোগী। এক্সপির রোগী আলোতে থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যে চামড়া শুকিয়ে যায়। তাদের স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়, শ্রবণশক্তি কমে যায়। তাদের এখনো চিকিৎসা চলছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের গবেষকেরা জানিয়েছেন, দেশে অন্তত ২০০ জন ‘মোয়ামোয়া’ রোগী আছে। এটি মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ। এতে মস্তিষ্কের ধমনিতে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। রোগীর সাময়িকভাবে তীব্র মাথাব্যথা, শরীরের একাংশে অবশ ভাব, খিঁচুনি, কথায় অস্পষ্টতা, চোখে ঝাপসা দেখা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া—এই রোগের লক্ষণ।  

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া জানান, তিনি ময়মনসিংহের একটি পরিবারে ‘সিফা সিনড্রোম’ (কনজেনিটাল ইনসেনসিভিটি টু পেইন উইথ অ্যানহিড্রোসিস)–এর দুজন রোগী পেয়েছেন। ঘর্মগ্রন্থি (সোয়েট গ্লান্ড) না থাকার কারণে এদের ঘাম হয় না। এদের গরম লাগে বেশি, হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। এরা ব্যথা অনুভব করে না।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক (শিশু নিউরোলজি বিভাগ) জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘দেশে স্নায়ুর বিরল রোগ আছে অন্তত ১৫টি। অন্য কতটি বিরল রোগের অস্তিত্ব আছে, তা জানা নেই। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, খোঁজা হয়নি।’

অবিরাম কষ্টের কাহিনি

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পারভেজের প্রথম সন্তান মুনতাসিরের জন্ম হয় ২০১৪ সালে। জন্মের পাঁচ বছর পর মুনতাসিরের অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, পা বেঁকে যায়, পায়ের পেশিতে ব্যথার কথা বলতে থাকে। ২০২২ সালে শনাক্ত হয় মুনতাসির ডিএমডির রোগী।

ডিএমডির রোগীর বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত–পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়, আঙুল বেঁকে যায়। আক্রান্ত শিশুর বয়স ১০–১২ হতেই নিজ থেকে আর চলাচল করতে পারে না। বাবা–মায়ের সামর্থ্য থাকলে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে পারে। মুনতাসিরের ক্ষেত্রে ঠিক এমনই হয়েছে।

১৫ এপ্রিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে মুনতাসিরের বাবা মোহাম্মদ পারভেজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘কিছুই করতে পারলাম না। আমার চোখের সামনে ছেলেটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে গেল। বয়স মাত্র ১১ বছর। কিছুই করতে পারলাম না।’ চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন শিশুরা বেশি দিন বাঁচে না।

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষ, তাদের বাবা–মা–অভিভাবসহ অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের সবাই মোহাম্মদ পারভেজের মতো অসহায়। সন্তানের গল্প বলতে গিয়ে মায়ের চোখ ভেসে যায় জলে। কারও কষ্ট চিকিৎসা করাতে না পারার। কেউ জানেন চিকিৎসা করিয়েও সন্তানকে বাঁচাতে পারবেন না। ‘আমি মারা গেলে আমার সন্তানের কী হবে’, এমন চিন্তায় দিন যায় কোনো কোনো মায়ের।

২০ মার্চ কথা হয় খুলনার লবণচরার নূরজাহান রজনী ও মেহেদি হাসান আমিরের সঙ্গে। নূরজাহান রজনী কৃষি ব্যাংকে চাকরি করেন, মেহেদি হাসান আমির এলাকায় ছোটখাটো ঠিকাদারির কাজ করেন। তাঁদের তৃতীয় সন্তান আমিরা এসএমএর রোগী। আমিরা প্রায়ই তার বাবা–মা ও দুই বোনের উদ্দেশে বলে, ‘রাগ কোরো না। আমি বসতে পারি না, আমি হাঁটতে পারি না, রাগ কোরো না।’ নূরজাহান রজনী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এতটুকু মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে বুক ফেটে কান্না আসে।’

এমন সন্তান নিয়ে মা–বাবার জীবন আমূল বদলে যায়। রাজধানীর মগবাজারের শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির ক্ষেত্রে তেমনই ঘটেছে। দুজন একসময় একটি বামপন্থী সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিয়মিত ওই দলের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন, অংশ নিতেন। এখন সব বন্ধ। শাহাদাৎ হোসেন চাকরির প্রয়োজনে কর্মস্থলে যান। আপনার সময় কাটে কীভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মা শাহিন আক্তার বলেন, ‘আমার নিজের বলে আর কোনো সময় নেই। সারাটা সময় মেয়ের সঙ্গে। মেয়ে যখন ঘুমায়, তখনই কিছুটা ছুটি।’ ঘরের বাইরে যাওয়া নেই, আত্মীয় বাড়ি যাওয়া নেই। সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ। শাহিন আক্তারের দুনিয়া আটকে গেছে মেয়েতে।

এমন সন্তান দুটো থাকলে সমস্যা কি বেড়ে যায়? দুঃখ কি দ্বিগুণ হয়? ব্যবসায়ী ওমর ফারুকের দুটি ছেলেই বিরল রোগে আক্রান্ত। ২৩–২৪ আগস্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে আয়োজিত একটি ওয়ার্কশপের প্রথম দিনের একটি অধিবেশনে ওমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের জীবন বদলে গেছে। আমাদের জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে গেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক বলেন, এমন বাবা–মাও আছেন, যাঁদের তিনটি সন্তানই বিরল রোগে ভুগছে। ঘরজুড়ে একটি খাট, তার ওপর তিন সন্তানকে নিয়ে স্বামী–স্ত্রী রাত কাটাতেন। ইতিমধ্যে একটি সন্তান মারা গেছে। এখন ওই খাটেই বাবা–মা রাত কাটান বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে।

সহজে রোগ শনাক্ত হয় না

পুরান ঢাকার সুজন সাহা ও রমা সাহার একমাত্র মেয়ে স্বস্তিকা সাহা। মেয়ের বয়স যখন ৯ মাস, বাবা–মা খেয়াল করলেন, মেয়ের বসতে ও দাঁড়াতে কষ্ট হয়। সুজন সাহা বলেন, ‘প্রথম মেয়েকে মিটফোর্ড হাসপাতালে দেখাই। পরে পিজি হাসপাতালে দেখাই। তারপর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। মেয়ে দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। আট মাস আগে ভারতের চেন্নাই গেলাম। পরীক্ষায় ধরা পড়ল মেয়ের এসএমএ। আগের তিনটি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসকই রোগ ধরতে পারেননি।’ একাধিক শিশুর মা-বাবার কাছ থেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন আফরিন আক্তার। তিনি এসএমএর রোগী। তিনি বলেন, প্রথমে একজন চিকিৎসক মায়োপ্যাথির চিকিৎসা দেন। পরে দেশে-বিদেশে পরীক্ষায় নিশ্চিত হন যে তার এসএমএ। আফরিন আক্তার বলেন, ‘তিন বছরের বেশি সময় আমি ভুল চিকিৎসার মধ্যে ছিলাম।’ তিনি এখন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।

প্রায় সব বিরল রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিই, যেন রোগী স্বস্তি বোধ করে, রোগটি যেন আর না বাড়ে।’

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওলী সরকার বলেন, ‘রোগনির্ণয় সঠিক না হলে ভুল চিকিৎসা হয়। এক রোগের লক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যায়, তখন ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো রোগের চিকিৎসাই হয়তো জানা নেই, তখন রোগটি যেন না বাড়ে, সে জন্য কিছু চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভালো রেফারেল পদ্ধতি না থাকার কারণে রোগীরা ভুল প্রতিষ্ঠান বা ভুল ব্যক্তির কাছে চলে যান, এতে সঠিক চিকিৎসা রোগীরা পান না।’

৯৫ শতাংশের চিকিৎসা নেই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগের চিকিৎসা–সম্পর্কিত ওষুধসহ অন্যান্য পণ্যের দাম অনেক বেশি। অনেক দেশে এসব পণ্য ও ওষুধের প্রবেশাধিকার সীমিত। এটি বড় চ্যালেঞ্জ।

যেমন স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফির (এসএমএ) কথা বলা যায়। চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এ রোগের চিকিৎসার ওষুধ তিনটি। প্রথমত জিনথেরাপি। ইনজেকশনের মাধ্যমে জীবনে তা একবারই দিতে হয়। এর দাম প্রায় ২২ কোটি টাকা। আরেকটি  ইনজেকশন আছে, প্রতি দুই মাস অন্তর রোগীর মেরুদণ্ডে দিতে হয়। একটি ইনজেকশনের দাম এক কোটি টাকা। আর আছে একটি সিরাপ। এর প্রতি বোতলের দাম ১০ লাখ টাকা। একজন রোগীর মাসে এক বোতল দরকার হয়।

জিনথেরাপি বাংলাদেশে দুটি শিশুকে দেওয়া হয়েছে। মেরুদণ্ডে দেওয়া ইনজেকশন কেউ পেয়েছে বলে জানা যায়নি। একটি বহুজাতিক কোম্পানি দেশের তিনটি শিশুকে বিনা মূল্যে সিরাপ দেওয়া শুরু করে। এখন শুধু মগবাজারের নবনী ওষুধটি বিনা মূল্যে পাচ্ছে।

বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে ওষুধ উদ্ভাবন করে তা সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে বিক্রি করা ওষুধ কোম্পানির জন্য লাভজনক নয়। যে দু–একটি ওষুধ তৈরি হয়, তার দাম বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওষুধ উদ্ভাবনে সমতাভিত্তিক বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রণোদনার অভাবের কারণে সারা বিশ্বের ৯৫ শতাংশ বিরল রোগের এখনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।

রাষ্ট্র কী করছে

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিরল রোগ নিয়ে তাদের কোনো ধরনের কাজ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর বলেন, ‘বিরল রোগ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কাজও নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’

ব্যতিক্রমী ভূমিকা নিয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, বিশেষ করে এই প্রতিষ্ঠানের শিশু নিউরো বিভাগ। এই বিভাগ বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রতি সপ্তাহে বিশেষ ক্লিনিক চালু করেছে। এ ছাড়া প্রতি মাসের মাঝামাঝি এক দিন বড় করে নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করে।  

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে একটি বিরল রোগের (এসএমএ) চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম কেনার জন্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের অনুকূলে ৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫ কোটি টাকার ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি টাকা খরচ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

আত্মশক্তির সন্ধান

বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তা বা পাশে দাঁড়ানোর জন্য কয়েকটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠন তথ্য সংগ্রহ করে, দেশে–বিদেশে কোথায় রোগ পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, তা জানার ও জানানোর চেষ্টা করে।

এমনই একটি সংগঠন কিওর এসএমএ বাংলাদেশ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন, ‘এসএমএ রোগী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে এই সংগঠন তৈরি হয়েছে। রোগটির ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রোগনির্ণয়ে জেনেটিক পরীক্ষা দেশে চালু করার জন্য আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি। ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি যেন কম দামে ওষুধ পাওয়া যায়।’

একইভাবে ডিএমডি রোগীদের জন্য গড়ে ওঠা সংগঠনের নাম ডিএমডি কেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। হিমোফিলিয়া রোগীদেরও আছে বাংলাদেশ হিমোফিলিয়া সোসাইটি। এই ধরনের সংগঠন বিদেশে আছে।

কী করা যায়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সার্বিক ও রোগীকেন্দ্রিক পন্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যক্তির সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া, সামাজিকভাবে তাদের সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানে প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিরল রোগের জন্য পৃথক শাখা খোলার দাবি করেছেন কেউ, কেউ সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও কেউ কেউ বলেন।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। রোগ শনাক্তে উপযুক্ত ল্যাবরেটরি স্থাপন করা জরুরি।’

[প্রথম আলো রোগী ও রোগীর অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে তাঁদের নাম এই প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে।]

বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা–বাবার

Wednesday, August 12, 2026

হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি: স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে রুটিন চেকআপ কেন জরুরি? by নাগিব বাহার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ মারা যায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ মারা যায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে। প্রশ্ন আসে - একজন মানুষের কোন সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা কীভাবে অনুমান করা সম্ভব।
আপাতদৃষ্টিতে এই প্রশ্নের উত্তরটা সহজ - নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করলেই মানুষের স্বাস্থ্যের সামগ্রিক চিত্রের একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু কোন সময় ঠিক কোন পরীক্ষাটি করা উচিত? - সেটি কীভাবে নির্ণয় করা সম্ভব?
বিবিসি বাংলা'র সাথে এ বিষয়ে কথা বলার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ শোয়েব মোমিন মজুমদার 'রুটিন চেকআপ' বা নিয়মমাফিক স্বাস্থ্যপরীক্ষার বিষয়ে কিছু খুঁটিনাটি তথ্য জানান।
মি. মজুমদারের মতে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা মূলত দুই ভাবে হয়ে থাকে। যথা - রোগের লক্ষণভেদে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা (বয়সভেদে শারীরিক পরিবর্তন বিচারে)।
বয়স ৪০ হওয়ার পর সাধারণত, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে মন্তব্য করেন মি. মজুমদার।
মি. মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের মত দেশে শহুরে জীবনে সাধারণত যথেষ্ট পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম করা হয়ে ওঠে না যার ফলে ডায়বেটিস, হার্টের রোগ, স্ট্রোক, প্যারালাইসিসের ঝুঁকি বাড়ে এবং শরীরে কোলস্টোরেলের মাত্রা বেড়ে যায়।
"এ কারণে চল্লিশোর্ধ প্রত্যেক ব্যক্তির নিয়মিত কিছু রুটিন স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা উচিত।"
এরকম ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে কয়েকটি বিশেষ ধরণের পরীক্ষা করা উচিত বলে জানান মি. মজুমদার।

প্রাথমিকভাবে সবার যেসব স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা উচিত

"চল্লিশোর্ধ সব ব্যক্তির নিয়মিত বিরতিতে কয়েকটি বিশেষ পরীক্ষা করা প্রয়োজন", বলেন মি. মজুমদার।
"যেগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো রক্তের সিবিসি পরীক্ষা।"
হিমোগ্লোবিনসহ রক্তের অন্যান্য কণিকাগুলো সঠিক অনুপাতে আছে কিনা - তা দেখা হয় এই পরীক্ষার মাধ্যমে।
বয়স চল্লিশ পার হওয়ার পর ক্যান্সার বা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে যার প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রায় তারতম্য দেখা দিতে পারে বলে জানান মি. মজুমদার।
এছাড়া রুটিন স্বাস্থ্যপরীক্ষার মধ্যে কিডনির 'ক্রিয়েটিনিন' পরীক্ষা এবং লিভারের 'এএলটি বা এসজিপিটি' পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
আর বয়স চল্লিশ পার হওয়ার পর সাবরই ডায়বেটিস এবং কোলস্টোরেলের মাত্রা পরীক্ষা করানো উচিত বলে মন্তব্য করেন মি. মজুমদার।

দূষণজনিত রোগের সতর্কতা

মি. মজুমদার বলেন, ক্রমবর্ধমান মাত্রায় দূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকম রোগের আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।
"অতিমাত্রায় শব্দ দূষণের কারণে বয়সের সাথে সাথে অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়ি মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।"
এছাড়া বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্টজনিত এবং ফুসফুসের রোগ বেড়ে যাওয়া, এমনকি ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন মি. মজুমদার।
মি. মজুমদার বলেন, এরকম ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে রোগের লক্ষণ অনুমান করে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেয়া উচিত।
ভেজালযুক্ত খাবার গ্রহণ করার কারণেও বিভিন্ন রকমের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বলে মন্তব্য করেন মি. মজুমদার। তাই সেবিষয়টিও বিবেচনায় রেখে নিয়মমাফিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন মি. মজুমদার।
"তবে প্রাথমিক কয়েকটি পরীক্ষা বাদে অন্যান্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে সবাইকেই রোগের লক্ষণ যাচাই করে স্বাস্হ্যপরীক্ষা করা উচিত।"

ধূমপানের ঝুঁকি

মি. মজুমদার বলেন, "ধূমপানের কারণে বিবিধ প্রকার রোগ হয়ে থাকে। তাই ধূমপায়ীদের অবশ্যই নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা উচিত।"
ধূমপানের কারণে খাদ্যনালী, জিহ্বা, ফুসফুস, বৃহদান্ত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকিসহ মস্তিষ্কের রক্তনালী ব্লক হয়ে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায় বলে জানান মি. মজুমদার।
"এছাড়াও ধূমপানের কারণে রক্তনালী ব্লক হতে পারে। হাত বা পায়ের রক্তনালী ব্লক হয়ে ঐ অঙ্গ অকেজো হওয়া থেকে শুরু করে অঙ্গহানিও হতে পারে।"
এসব কারণে স্বাস্থ্যপরীক্ষার বিষয়ে অধূমপায়ীদের চেয়ে ধূমপায়ীদের আরো বেশি নিয়মিত ও সচেতন হওয়া উচিত বলে মনে করেন মি. মজুমদার।
চিকিতসকদের মতে, চল্লিশোর্ধ ব্যক্তিদের নিয়মমাফিকভাবে কয়েকটি পরীক্ষা করা উচিত

Thursday, July 30, 2026

যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়ছে গাজার হাসপাতাল, চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

গাজার আল-শিফা হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটে প্রতিদিন একই দৃশ্য। এক মুহূর্তের জন্যও থামে না ডায়ালাইসিস মেশিন। সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা রোগীদের শরীরে সংযুক্ত থাকে চিকিৎসা-যন্ত্রের নল। সীমিত সময়ের জন্য হলেও এসব মেশিনই তাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখছে। সেই সারির এক কোণে বসে আছে উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার ১৪ বছর বয়সী রুওয়া মুনতাসির আবদুল করিম। ছোট্ট শরীরের মেয়েটি ভরা ওয়ার্ডেও আলাদা করে চোখে পড়ে। তার বাম হাত ডায়ালাইসিস মেশিনের সঙ্গে যুক্ত। চিকিৎসাকর্মীদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও পুরো সময়টায় একটি কথাও বলে না সে। দীর্ঘ চিকিৎসা আর অসুস্থতা তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। পাশেই বসে আছেন পিতা মুনতাসির। তিনি বলেন, অসুস্থ হওয়ার আগে আমার মেয়ে হাঁটত, খেলত। অস্ত্রোপচার আর ডায়ালাইসিস শুরু হওয়ার পর তার পুরো জীবন বদলে গেছে। প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেশনই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। একটি সেশন বাদ গেলেই সে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

রুওয়াকে বাঁচিয়ে রাখা হাসপাতালের এই বিভাগটিও এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছে। ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বারবার হামলা এবং গাজায় চিকিৎসা-সরঞ্জাম প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে চিকিৎসাসেবা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোডিয়াম বাইকার্বোনেটের তীব্র সংকটের কারণে গাজার ৫০ শতাংশ ডায়ালাইসিস মেশিন সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে কিডনি রোগীদের চিকিৎসার জন্য গাজায় সাতটি হাসপাতাল ছিল। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে চারটিতে।

নোরা আল-কাবি ডায়ালাইসিস সেন্টারের মতো কিছু কেন্দ্র যুদ্ধেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে কিডনি রোগীদের মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের আগে গাজায় কিডনি বিকল হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০। ফিলিস্তিন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ডায়ালাইসিস না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে ৪৭০ জনের বেশি রোগী মারা গেছেন। বর্তমানে বেঁচে আছেন প্রায় ৭০০ জন।
মধ্য গাজার আল-আকসা হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান ওসামা আবু রাহমা জানান, তাদের হাসপাতালে ৫১টি ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও ২৫টি সম্পূর্ণ বিকল। তিনি বলেন, ২৪০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালকে সপ্তাহে ডায়ালাইসিসের সংখ্যা এবং প্রতিটি সেশনের সময় দুটিই কমিয়ে দিতে হয়েছে। এর ফলে রোগীদের মধ্যে দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতা এবং রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় পটাশিয়াম বেড়ে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। আবু রাহমার ভাষায়, এই পরিস্থিতি শত শত রোগীর জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
আল-শিফা হাসপাতালে রুওয়া চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ওয়ার্ডের অনেক বয়স্ক রোগী ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার পিতা মুনতাসির চিকিৎসা যন্ত্রের মনিটরের দিকে তাকিয়ে মেয়ের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করেন। তিনি জানান, একসময় রুওয়ার ওজন ছিল ৬৫ কেজি। এখন তা কমে ৩৫ কেজিতে নেমে এসেছে। আগে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস হতো, এখন মাত্র দু’বার করা সম্ভব হচ্ছে। রুওয়ার স্থায়ী চিকিৎসা হলো কিডনি প্রতিস্থাপন। মুনতাসির বলেন, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। তার মা কিডনি দিতে রাজি। সব পরীক্ষাও মিলে গেছে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার অনুমতি এখনো দেয়নি ইসরাইল। ছয় মাস ধরে আবেদন ঝুলে আছে। গাজার বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়। তাই রুওয়াকে শুধু অপেক্ষা করেই থাকতে হচ্ছে।

ডায়ালাইসিসের সংকট গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার একমাত্র সমস্যা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, যুদ্ধে ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ এমনভাবে আহত হয়েছেন, যা তাদের জীবন স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে। এদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। চিকিৎসার পরও তাদের সামনে নতুন সংকট পুনর্বাসন এবং কৃত্রিম অঙ্গের অভাব। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট আয়া আল-শালতুনি বলেন, কৃত্রিম অঙ্গ, হুইলচেয়ার এবং ক্রাচের ঘাটতি এখন রোগীদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। তিনি বলেন, অনেক রোগী দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও কিছুই পান না। তার মতে, এটি শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, মানুষের পুরো জীবনই বদলে দিচ্ছে।

উত্তর গাজার ৬০ বছর বয়সী কৃষক জাকি জুমা সালেম আবু হারব ২০২৫ সালের মার্চে এক হামলায় একটি পা হারান। তিনি বলেন, এক মুহূর্তেই আমার পুরো জীবন বদলে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সম্প্রতি তিনি একটি কৃত্রিম পা পেয়েছেন। তবে তিনি জানান, হাজারো মানুষ এখনো সেই সুযোগ পাননি। ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধের কারণে ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন। জাকি বলেন, অনেকের হুইলচেয়ার নেই, ক্রাচও নেই। তারা গাছের গুঁড়ি বা কাঠের টুকরো ভর করে চলাফেরা করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, অনেক শিশু তাদের হাত-পা হারিয়েছে। তাদের ঠিকমতো হাঁটার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রও নেই। এটা দেখলে মনে হয়, তাদের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়েছে।

যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়ছে গাজার হাসপাতাল, চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

Saturday, July 25, 2026

মুখের ক্যানসার কেন বাড়ছে, প্রতিরোধে করণীয় by অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী

বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অনেক বেশি। নতুন রোগীও বাড়ছে। খাদ্যনালি বা মুখগহ্বরের কোনো অংশে ক্যানসার হলে এক পর্যায়ে রোগীর জন্য খাবার গ্রহণ কষ্টকর হয়ে পড়ে।

যেসব অভ্যাসের কারণে মুখগহ্বরের সরাসরি ক্ষতি হয়, সেগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক। যেমন তামাক মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির শত্রু। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের কারণে মুখগহ্বরের ও খাদ্যনালির কোষে ক্ষত সৃষ্টি হতে থাকে। এই ক্ষত থেকেই একসময় ক্যানসার হয়।

মুখে কেন ক্যানসার হয়

* সিগারেট, ই-সিগারেট, পান, সুপারি, চুন, জর্দা, গুল, খইনি—সবই মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যানসারের জন্য দায়ী।

* আমাদের দেশে যত মানুষ মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত, তাঁদের ৮০-৯০ শতাংশেরই তামাক বা তামাকজাত পণ্য সেবনের কারণ রয়েছে।

* কেউ কেউ মদপানও করেন। যাঁরা মুখগহ্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে যত্নশীল নন কিংবা যাঁদের দাঁতের অংশ অত্যধিক ধারালো, তাঁদের ঝুঁকি বেশি।

* প্রক্রিয়াজাত খাবারেও হতে পারে।

* ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে মুখের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে বেশি।

উপসর্গ ও শনাক্ত

যদি মুখে ঘা তৈরি হয় ও চিকিৎসার পরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই বায়োপসি বা মাংসের টিস্যু পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ, মুখের ঘা বা সাদা ক্ষতকে বলা হয় ক্যানসারপূর্ব ক্ষত।

ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, রিউমাটিক ডিজিজ, পরিপাকতন্ত্রের রোগ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ওষুধ খান, কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার করেন, ধূমপান করলে অবশ্যই দাঁত ও মুখে যেকোনো ঘা দেখা দেওয়ামাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

যদি দেখেন মুখগহ্বরের ক্ষত বা ঘা শুকাচ্ছে না, রক্তক্ষরণ বা গিলতে অসুবিধা হচ্ছে, সব সময় গলায় কোনো কিছুর উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মুখগহ্বরের কোষকলায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করুন।

প্রতিরোধে করণীয়

* তামাক ও তামাকজাত পণ্য সেবন বন্ধ করুন।

* দুবেলা ব্রাশ ও খাওয়ার পর ভালোভাবে কুলকুচি করুন।

* দাঁতের কোনো অংশ ধারালো থাকলে চিকিৎসা করান।

* প্রচুর ফল, শাকসবজি ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খান।

* ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।

* অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

* অতিরিক্ত ঝাল বা গরম খাবার ও পানীয় বর্জন করুন।

* সব ধরনের মাদক ও অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে।

* অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী, দন্তবিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অনেক বেশি, নতুন রোগীও বাড়ছে
বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অনেক বেশি, নতুন রোগীও বাড়ছে। ছবি: পেক্সেলস

যে কারণে কথায় কথায় অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না by ডা. কাকলী হালদার

১৮-২৪ নভেম্বর বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) সচেতনতা সপ্তাহ। ‘অ্যাক্ট নাউ: প্রোটেক্ট আওয়ার প্রেজেন্ট, সিকিউর আওয়ার ফিউচার’ বা ‘এখনই পদক্ষেপ নিন: বর্তমানকে রক্ষা করুন, সুরক্ষিত করুন ভবিষ্যৎ’—এই প্রতিপাদ্য আজকের বিশ্ব স্বাস্থ্য প্রেক্ষাপটে এক গভীর তাৎপর্য বহন করে।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স কী

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালস রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর এক নীরব মহামারি, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে হার মানাচ্ছে। এতে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসাশাস্ত্র উভয়ই হুমকির মুখে পড়ছে মারাত্মকভাবে।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্সের মানে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবীগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসকারী ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। ফলে একসময় যেসব সংক্রমণ সহজেই সারানো যেত, সেসবই আবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

মূল কারণ কী

এ সমস্যার মূলে বিশেষ করে আছে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গালের যথেচ্ছ ব্যবহার, যা অণুজীবদের বিবর্তনে সাহায্য করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল ড. টেড্রোস আধানম ঘেব্রেইসাসও বলেছেন, ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী পরিবারগুলোর স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।’

একটি সাধারণ সংক্রমণ যখন চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে ওঠে, তখন অস্ত্রোপচার, ক্যানসার থেরাপি বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাগুলোও খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

করণীয়

এ মুহূর্তে ‘অ্যাক্ট নাউ’ বা এখনই পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে কেবল বিজ্ঞানী বা চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করা নয়, বরং এ লড়াইয়ে আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে।

১. সচেতন ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রেই কার্যকর। ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়াটিক অকার্যকর।

২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: সংক্রমণ রোধের জন্য নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ও টিকা নেওয়া অপরিহার্য। এটি অণুজীবের বিস্তার রোধ করে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা কমায়।

৩. নতুন উদ্ভাবনে বিনিয়োগ: সরকার ও সংস্থাগুলোর উচিত নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ও রোগনির্ণয়ের উন্নত প্রযুক্তির গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করা।

শেষ কথা

‘প্রোটেক্ট আওয়ার প্রেজেন্ট’ মানে হলো আমাদের বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থা, যার ওপর আমরা নির্ভর করি, তাকে সচল ও সুরক্ষিত রাখা। আর ‘সিকিউর আওয়ার ফিউচার’ মানে হলো এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, যেখানে আমাদের শিশুরা যেন সাধারণ সংক্রমণে মারা না যায়।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যার জন্য প্রয়োজন একীভূত ও বহুক্ষেত্রীয় পদক্ষেপ। এখনই সম্মিলিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে আমরা এই নীরব হুমকি মোকাবিলা করতে পারি এবং মানবতার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি।

* ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাউক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-24%2F8ye2l7oh%2Fpexels-photo-3683088.jpg?rect=202%2C0%2C2178%2C1452&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। ছবি: পেক্সেলস

Thursday, July 2, 2026

শিশুর ভালো ঘুমের জন্য যেসব অভ্যাস করাবেন by রাফিয়া আলম

শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য ভালো ঘুমের বিকল্প নেই। কোনো কাজ শিশু কতটা মনোযোগ দিয়ে করতে পারবে, নির্ভর করবে শিশুর ঘুমের ওপর। সুস্থ থাকতে শিশুকে যেমন ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা শেখানো হয়, তেমনি তাদের নিদ্রা স্বাস্থ্যবিধিও অভ্যাস করানো উচিত। একেই বলে স্লিপ হাইজিন। এই নিদ্রা স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নিই চলুন।

সময় হোক নির্দিষ্ট

রোজ একটি নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে। তবে বিষয়টা যেন এমন না হয় যে শিশুকে জোর করে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিয়ে অভিভাবক রাত জেগে মুঠোফোন স্ক্রল করছেন। ছুটির দিনে দেরি করে ওঠার অভ্যাসটিও শিশুর জন্য ভালো নয়। তাতে বায়োলজিক্যাল ক্লক বা দেহঘড়ির সময় এলোমেলো হয়ে যায়। তাই ছুটির আগের দিনও রাত করে বাইরে ঘোরাঘুরি কিংবা রাত জেগে সিনেমা দেখা বা গল্প করা ভালো চর্চা নয়। তাতে সেদিন ঘুমাতে দেরি হবে, পরদিন ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হবে। এলোমেলো হবে দেহঘড়ির সময়। 

ঘুমের আয়োজন

  • বিছানায় পড়ালেখা, গেম খেলা, খাওয়া দাওয়া বা অন্য কোনো কাজ করা যাবে না। বিছানা কেবল ঘুমেরই জন্য ব্যবহার করতে হবে। তাহলে বিছানায় গেলে মস্তিষ্ক বুঝতে পারবে, এখন ঘুমের সময়।

  • ঘুমের আগে ছোট শিশুকে গল্প বা ছড়া বলা যেতে পারে। একটু বড় হলে ঘুমের আগে নিজেও বই পড়তে পারে শিশু। তবে উত্তেজনাপূর্ণ কোনো কিছুই ঘুমের আগে ভালো নয়। হোক তা গল্প, হোক তা বই। ঘুমের আগের সময়ে এমন বই বেছে নেওয়া উচিত নয়, যা গভীর চিন্তার খোরাক হয়ে দাঁড়ায়।

  • অন্ধকার ঘরে শিশু ভয় পেতে পারে। এ সমস্যা এড়াতে ঘুমের সময় ঘরে মৃদু আলোর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

  • ঘুমের আগে শিশুকে উষ্ণ পানিতে গোসল করানো যেতে পারে। তাঁকে প্রার্থনা করতে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। যোগব্যায়াম, শ্বাসের ব্যায়াম, শিথিলায়নের অভ্যাস করা যেতে পারে। শোনানো যেতে পারে আয়েশি কোনো অডিও।

  • ঘুমের আগমুহূর্তে যা করতে নেই

  • ঘুমের অন্তত এক-দুই ঘণ্টা আগেই পড়ালেখা শেষ করে ফেলতে হবে। রাতে পড়া শেষ না হলে ভোরে উঠে পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।

  • ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে ইলেকট্রনিক বা স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের পাট চুকিয়ে ফেলতে হবে।

  • খেলাধুলা বা শারীরিক শ্রম হয়, এমন কাজ ঘুমের অন্তত চার ঘণ্টা আগেই সেরে নিতে হবে। 

    খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ

    • ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দু-তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খেয়ে নিতে হবে। রাতের খাবারটা হতে হবে হালকা, সহজপাচ্য। রাতে ভারী খাবার, মসলাদার খাবার, মিষ্টি খাবার, চিপস প্রভৃতি খাওয়া উচিত নয়।

    • ঘুমের এক ঘণ্টা আগে দুধ, খেজুর বা কলা খাওয়া যেতে পারে। তাহলে রাতে হঠাৎ খিদে পাবে না। তবে এ সময় বাড়তি কোনো স্বাদ বা ঘ্রাণের দুধ (ফ্লেভারড মিল্ক) না খাওয়াই ভালো।

    • বেলা দুইটার পর চকোলেট বা চকোলেট মেশানো খাবার না খাওয়াই ভালো। কারণ, চকোলেটে ক্যাফেইন থাকে, যা ঘুমের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটু বড় হওয়ার পর চা-কফি খাওয়ার অভ্যাস হলে তখনো খেয়াল রাখতে হবে, বেলা দুইটার পর যেন এসব পানীয় খাওয়া না হয়।

    স্লিপ হাইজিন মেনে না চলায় শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে
    স্লিপ হাইজিন মেনে না চলায় শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। মডেল: পদ্মহেম পাবন। ছবি: কবির হোসেন


Friday, June 19, 2026

চিকিৎসা আছে, তবু রোগটি গোপন রেখে যন্ত্রণায় ভোগেন মায়েরা by মানসুরা হোসাইন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে নিজের শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মর্জিনা বেগম। বসতে রাজি নন তিনি। মুখে অস্বস্তির ছাপ। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘এখন বসন যাইব না, এই জায়গা তো ভিইজ্যা যাইব।’

মর্জিনার বয়স প্রায় ৬০। ২০ বছর ধরে তাঁর অনবরত প্রস্রাব ঝরছে। এ কারণে কোথাও যাওয়া, মানুষের পাশে বসা তিনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন।

বাড়িতে সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই এই স্বাস্থ্যগত জটিলতার মধ্যে পড়েন মর্জিনা। তখন তিনি তাঁর প্রথম সন্তান হারান। একই সঙ্গে হারান স্বাভাবিক জীবনও।

লজ্জা, অপমান আর একাকিত্ব নিয়ে বছরের পর বছর মর্জিনার মতো প্রায় ঘরবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন দেশের অসংখ্য নারী। তাঁদের এই নীরব যন্ত্রণার নাম—প্রসবজনিত ফিস্টুলা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে গত ১৩ মে কথা হয় খাগড়াছড়ির মর্জিনার সঙ্গে। তিনি বলেন, সব সময় ন্যাকড়া পরা ঝামেলার। অনেক চুলকায়। আবার বারবার কাপড় ধুতে হয়। এই সমস্যার কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার ভয়ে মানুষের বাড়িতে যান না। কারও পাশে বসেন না।

ফিস্টুলা সেন্টারে আসার পর ডায়াপার পেয়েছেন মর্জিনা। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে তাঁর। তবে দীর্ঘক্ষণ ডায়াপার না পাল্টানোয় সেটিও ভিজে গিয়েছিল। এখন তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন।

ফিস্টুলা সেন্টারে ভোলার ৩৫ বছর বয়সী কুলসুম বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে। তৃতীয় সন্তানের জন্মের পর থেকে তিনি মল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। মূত্রনালি দিয়ে মল চলে আসে। গত সাড়ে ছয় বছর ধরে তিনি এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

কুলসুম বলেন, ‘কারও সঙ্গে মিশতে পারি না। পায়খানা ধরলে দৌড়ে যেতে হয়।’

তবে এই কঠিন সময়েও স্বামী ছেড়ে যাননি—এ কথা বলতে গিয়ে কুলসুমের চোখ ভিজে ওঠে।

সিরাজগঞ্জের বিলকিস বেগম বাড়িতে প্রসব করতে জটিলতায় পড়েন। তাঁর সন্তানটি মারা যায়। তখন থেকে তিনি প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন। তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক না দিলেও আরেকটি বিয়ে করেছেন। এখন এক ছেলে তাঁর দেখাশোনা করেন।

মর্জিনা, কুলসুম, বিলকিস—সবার জীবনই কাটছে এই প্রসবজনিত ফিস্টুলার ভয়াবহ যন্ত্রণা নিয়ে। নিরাপদ প্রসবসেবা না পাওয়ার খেসারত দিচ্ছেন তাঁরা বছরের পর বছর।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা কী?

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও ফিস্টুলা সার্জন বিলকিস বেগম চৌধুরী বলেন, তলপেট ও কোমরের নিচের হাড়গুলোকে একত্রে শ্রোণিচক্র বা পেলভিস বলে। প্রসূতির শ্রোণিচক্র তুলনামূলক ছোট হলে বা গর্ভের শিশুর মাথা বড় হলে প্রসবপথে শিশুর বের হতে বাধা সৃষ্টি হয়, যাকে বাধাগ্রস্ত প্রসব বলা হয়। বাধাগ্রস্ত প্রসবের কারণে দীর্ঘ সময় শিশুর মাথা প্রসবপথে আটকে থাকলে আশপাশের নরম টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে সেই অংশে পচন ধরে। কয়েক দিনের মধ্যে টিস্যু খসে পড়ে। যোনিপথের সঙ্গে মূত্রাশয় বা মলদ্বারের অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়। এতে অনবরত মল বা মূত্র বা উভয়ই বের হতে থাকে। এ অবস্থাই হলো প্রসবজনিত ফিস্টুলা।

চিকিৎসকেরা বলছেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসার আওতায় এলে প্রসবজনিত ফিস্টুলা পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু নিরাপদ প্রসবসেবা না পাওয়ার কারণে এখনো বহু নারী ফিস্টুলার ভুক্তভোগী।

হাজারো নারী যন্ত্রণায়

দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নিয়ে কোনো স্বতন্ত্র জাতীয় জরিপ হয়নি। তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশসহ ৫৫টি দেশে একটি বৈশ্বিক গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৩৫ জন প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত। এ হিসাবে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৩৩।

২০২২ সালে ‘বাংলাদেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা: ক্লিনিক্যাল যাচাইকরণভিত্তিক সংশোধনসহ একটি জাতীয় জরিপের প্রাক্কলন’শীর্ষক গবেষণা ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’–এ প্রকাশিত হয়। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ১৭ হাজার ৪৫৭ জন নারী প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত।

গবেষণাগুলো বলছে, ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীদের একটি বড় অংশ বহু বছর চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থাকে। অনেকের বয়স ৫০ বা ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা এখনো এই যন্ত্রণা বহন করে চলেছেন। ভুক্তভোগী নারীর প্রায় ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে নবজাতক মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়।

ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক মুনা সালিমা জাহান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীর সংখ্যাটা হয়তো কম। তবে আক্রান্ত কোনো কোনো নারী ৩০ বছর ধরে যন্ত্রণা ভোগ করছেন। কাপড় বা ন্যাকড়া পরতে পরতে সংক্রমণ হচ্ছে। মূত্রপথে ঘায়ের মতো হয়ে যাচ্ছে।

মুনা সালিমা জাহান আরও বলেন, আক্রান্ত নারীর শরীর থেকে সারাক্ষণ মলমূত্রের গন্ধ, স্বামীর পরিত্যাগ, পরিবারের অবহেলা, প্রসবের সময় সন্তান হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে এই সব নারী এক কঠিন ও দুর্বিষহ জীবন পার করছেন।

লজ্জা ও গোপনীয়তার দেয়াল

প্রসবজনিত ফিস্টুলাকে বৈশ্বিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীকে সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো, রোগটি লুকিয়ে রাখা।

খাগড়াছড়ির মর্জিনার ছেলে আবদুল হালিম বলেন, তাঁর মা এই স্বাস্থ্য সমস্যার বিষয়টি সব সময় গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন। এ কারণে এত দিন তাঁর চিকিৎসা হয়নি। সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী তাঁর মাকে খুঁজে বের করেন। এখন তাঁকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।

ইউএনএফপিএর মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট চিকিৎসক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ফিস্টুলা রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে রোগের নিরাময় সম্ভব।

এই চিকিৎসক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ও ইউএনএফপিএর সহায়তায় বাংলাদেশের ৩৫টি জেলা হাসপাতালে ‘ফিস্টুলা কর্নার’ চালু আছে। ফিস্টুলার উপসর্গ থাকা রোগীদের সেখানে বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা। রোগ নিশ্চিত হলে উন্নত চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারসহ সরকারি-বেসরকারি ২০টি ফিস্টুলা সেন্টারে পাঠানো হয়। রোগীদের যাতায়াত, পুনর্বাসনেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১৬টি শয্যা নির্ধারিত আছে বলে জানান অনিমেষ বিশ্বাস। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১১৬ জন মিডওয়াইফ নিয়োগ দিয়েছে ইউএনএফপিএ।

বাল্যবিবাহ ও বাড়িতে প্রসবের খেসারত

চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধে বাড়িতে প্রসব কমিয়ে নিরাপদ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু দেশে এখনো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রসব বাড়িতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন না।

২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’ অনুযায়ী, এখনো বাড়িতে প্রসবের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। বড় একটা অংশের প্রসব অদক্ষ দাইয়ের হাতে হয়ে থাকে। চার বা ততোধিক প্রসবপূর্ব সেবা নেওয়ার হার মাত্র ৩৯ শতাংশ। প্রতি এক হাজার জীবিত নবজাতকের মধ্যে ২০ জন মারা যায়। প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৩৬ জন মা মারা যান।

একই বছরে পিএলওএস গ্লোবাল পাবলিক হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ৫৩ দশমিক ১৮ শতাংশ প্রসব কোনো দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধান ছাড়াই বাড়িতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহেরও দায় রয়েছে।

দেশে প্রতি দুজন মেয়ের মধ্যে একজন বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫–শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদন বলছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে ৪৭ শতাংশের। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৫৬ শতাংশ। কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে।

জাতীয় প্রসূতি ফিস্টুলা বার্ষিক প্রতিবেদনের (২০১৯-২০২৪) তথ্য বলছে, এই সময়ে শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৮৫ শতাংশই বাল্যবিবাহের শিকার ছিল। ৮৮ শতাংশের প্রথম সন্তান জন্ম হয়েছিল কিশোরী বয়সে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় অর্ধেকের শেষ প্রসব হয়েছিল বাড়িতে। আর ৪৮ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবে সহায়তা করেছিলেন অদক্ষ দাই বা স্বজনেরা। ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কুসংস্কার বা সনাতন বিশ্বাস হাসপাতালে না যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল। ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবের সঙ্গে সঙ্গেই ফিস্টুলা হয়েছে। আক্রান্ত নারীদের অধিকাংশই দীর্ঘ সময় চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় এই যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। ২৩ শতাংশ নারী ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিস্টুলায় ভুগছিলেন।

চিকিৎসায় সাফল্য ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূলের বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্ত হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ফিস্টুলামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউএনএফপিএ, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও সুইডিশ সিডার সহায়তায় সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।

সরকারের তৃতীয় জাতীয় কৌশলপত্রে (২০২৩-২০৩০) প্রসবজনিত ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং সব আক্রান্তকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার, তৃণমূল পর্যায়ে মিডওয়াইফ নিয়োগ, জেলা হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি ও অস্ত্রোপচার সেবা নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ৩ হাজার ৮০৭ জন ফিস্টুলা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এই সময় ৩ হাজার ২৭ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৭৯৫ জন সুস্থ হয়েছেন। অস্ত্রোপচারে সাফল্যের হার ৯২ শতাংশের বেশি।

অন্যদিকে জাতীয় ফিস্টুলা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এখানে (সেন্টার) ৩৬৬টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। এর মধ্যে ৩০৭ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। ১৬ জন আংশিক সুস্থ হয়েছেন। রোগীদের হাসপাতালে অবস্থানের গড় সময় ছিল ৫০ দিন।

‘কোনো মা যেন এই ভুল না করে’

চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবন পেয়েছেন শেরপুরের জুলেখা বেগম। গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় শেরপুরে জুলেখার বাড়িতে বসে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বাড়িতে প্রসব করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন তিনি। অদক্ষ দাইয়ের টানাহেঁচড়ায় নবজাতকের মাথা আটকে গিয়েছিল। এরপর শুরু হয় অনবরত মলমূত্র ঝরার যন্ত্রণা।

সন্তান জন্মের পর সাত মাসের বেশি সময় ফিস্টুলার যন্ত্রণা সহ্য করেন ২৬ বছর বয়সী জুলেখা। মলমূত্র ধরে রাখতে না পারায় দিনে কয়েকবার তাঁকে গোসল করতে হতো। এই সমস্যার কারণে কখনো কখনো গভীর রাতেও গোসল করতে বাধ্য হতেন তিনি। মানুষ ভয় দেখাত, স্বামী তাঁকে তালাক দেবেন বা দ্বিতীয় বিয়ে করবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি।

জুলেখা বলেন, তাঁর মেয়ের জন্ম হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবেই হয়েছিল। ছেলের জন্মের সময় ভেবেছিলেন, বাড়িতে প্রসবে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এই ভুলের খেসারত তাঁকে দিতে হয়। তিনি ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন।

জুলেখা আরও বলেন, ‘লজ্জায় কারও বাড়িতেও যেতাম না। শুধু কাঁদতাম। আমি যে ভোগা ভুগছি, আর কোনো মা যেন এই ভুল না করে।’

স্থানীয় এক স্বাস্থ্যকর্মীর (‘শারমীনা আপা’) মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিস্টুলা সেন্টারের খোঁজ পান জুলেখা। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর এক মাস চিকিৎসা নিয়ে এখন তিনি সুস্থ। পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় তিনি একটি ছাগল পেয়েছেন।

ইউএনএফপিএর সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) গত বছর থেকে শেরপুরে ফিস্টুলা প্রতিরোধ ও রোগী শনাক্তকরণে কাজ করছে।

শেরপুরের সিভিল সার্জন মুহাম্মদ শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, গত এক বছরে জেলার নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতি উপজেলায় ৩১ জন ফিস্টুলা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২২ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। ১৭ জনকে সেলাই মেশিন ও ছাগল দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে নালিতাবাড়ীকে ফিস্টুলামুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি মাসের সভার আলোচ্যসূচিতে ফিস্টুলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অনেকটা সুস্থ জামেনা-জোমেলা

শেরপুরের দুই বোন জামেনা ও জোমেলা দীর্ঘদিন ফিস্টুলায় আক্রান্ত ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর এখন তাঁরা উভয়ে অনেকটা সুস্থ।

জামেনা বলেন, প্রস্রাব আটকে রাখতে পারতেন না বলে একসময় তাঁকে সবাই বিদ্রূপ করত। তবে এখন প্রায় স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন।

জোমেলা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিস্টুলার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। তিনি বলেন, সারাক্ষণ প্রস্রাব ঝরার কারণে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ পেলেও বারবার চাকরি হারাতে হয়েছে। তাঁর প্রথম সন্তান মৃত জন্ম নেয়। পরে যমজসহ আট সন্তানের জন্ম দিলেও বেঁচে আছে দুজন।

জুলেখার মতো এই দুই বোনও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ‘শারমীনা আপা’–কে। তিনি সিআইপিআরবির জেলা সমন্বয়কারী (ফিস্টুলা) শারমীনা পারভীন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীদের খুঁজে বের করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, হাসপাতালে পাঠানোর কাজ চলছে।

বাড়ছে সচেতনতা

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে দেখা হয় ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মেহের বানুর সঙ্গে। ভাতিজা সাইফুল ইসলামের বাড়িতে তিনি থাকেন।

সাইফুল বলেন, তাঁর ফুফুর বিয়ে হয়েছিল ছোটবেলায়। প্রথম সন্তানের জন্মের পর থেকেই তিনি ফিস্টুলায় ভুগছেন। ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি।

ফিস্টুলা নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে বলে মনে করেন সাইফুল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম বাড়িতে হয়। জন্মের পর নবজাতক মারা যায়। এর পরে তাঁর দুই সন্তান হয়। উভয় ক্ষেত্রে প্রসবের জন্য তিনি তাঁর স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

খাগড়াছড়ির মর্জিনার ছেলে আবদুল হালিমও বলেন, মায়ের দীর্ঘদিনের কষ্ট দেখে তিনি সচেতন হয়ে যান। এই সচেতনতা থেকেই তিনি তাঁর স্ত্রী ও বোনকে প্রসবের সময় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

জুলেখা, জামেনা, জোমেলা, মেহের বানুরা জানালেন, অনিরাপদ প্রসবের কারণে নিজেদের দুর্বিষহ ভোগান্তির কথা তাঁরা নিজেদের চেনা-জানা প্রসূতিদের বলছেন। সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

Sunday, June 14, 2026

ফুরিয়ে যাচ্ছে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক, এখন উপায় কী by মুনীরউদ্দিন আহমদ

গত ১৩ অক্টোবর ২০২৫ যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা ‘শার্প গ্লোবাল রেইজ ইন অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট ইনফেকশন ইন হসপিটালস, ডব্লিউএইচও ফাইন্ডস’ (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক অনুসন্ধানে দেখতে পেয়েছে, বিশ্বব্যাপী হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক রোগ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে) শীর্ষক এক উদ্বেগজনক সংবাদ প্রচার করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী যেসব সাধারণ সংক্রামক রোগ প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকে সহজে সারানো যেত, তা এখন আর সারানো যাচ্ছে না। চিকিৎসকেরা আতঙ্কের সঙ্গে বলছেন, সামনের দিনগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির ফলে সাধারণ সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

২০২৩ সালের এক জরিপে বলা হয়, পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ছয়টির মধ্যে একটি সংক্রামক রোগ অ্যান্টিবায়োটিকে সারানো যাচ্ছে না। রক্ত, অন্ত্র, মূত্রনালি এবং যৌন সংক্রমণের মতো সাধারণ সংক্রামক রোগে ৪০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা দেখাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৫০ সাল নাগাদ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ৭০ শতাংশে পৌঁছাবে।

২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একইভাবে উদ্বেগজনক সংবাদ প্রচার করেছিল। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ রানিং আউট অব অ্যান্টিবায়োটিকস’ শিরোনামের খবরে বলা হয়, অতি দ্রুত পৃথিবী থেকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নিঃশেষ হচ্ছে। ‘অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্টস ইন ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট পাইপলাইন ইনক্লুডিং টিউবারকিউলোসিস’ শীর্ষক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয়, বাজারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আসা স্থবির হয়ে গেছে।

বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রচলিত আছে, তার বেশির ভাগই এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যে হারে জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে, সে হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হচ্ছে না। যে গতিতে পৃথিবী থেকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নিঃশেষ হচ্ছে, তাতে অচিরেই চিকিৎসকদের সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে।

রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু সংক্রমণের ভয়ে অতি ছোট সার্জারি করতেও চিকিৎসকেরা সাহস পাবেন না। বর্তমানে বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে, তা পুরোনো বা প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের সংক্ষিপ্ত রাসায়নিক রূপান্তরমাত্র। এসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে না বা পারবে না।

বর্তমান বিশ্বে কয়েকটি জীবাণু ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এসব জীবাণুর মধ্যে রয়েছে ই. কোলাই ও মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস। মূত্রনালি সংক্রমণ ও যক্ষ্মার জন্য এই দুটো জীবাণু দায়ী। মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিউবারকিউলোসিসের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১২ প্রজাতির জীবাণু শনাক্ত করেছে। এর কয়েকটি অতি সাধারণ নিউমোনিয়া ও মূত্রনালি সংক্রমণের জন্য দায়ী। এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে ইদানীং কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিশ্বব্যাপী এক মহাসংকট সৃষ্টি করেছে, যা আধুনিক ওষুধ ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক জানান, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ঠেকানোর জন্য নতুন নতুন কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারে পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। নয়তো নতুন নতুন জীবাণু সংক্রমণ থেকে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৫১টি পরীক্ষাধীন অ্যান্টিবায়োটিক চিহ্নিত করেছে, যা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে কার্যকর হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র আটটি সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস, গ্রাম নেগেটিভ প্যাথেজেন ক্লেবসিলা ও ই. কোলাই চিকিৎসায় কার্যকর কোনো অপশন চিকিৎসকদের হাতে নেই।

এসব জীবাণু সংক্রমণ অনেক সময় হাসপাতাল ও নার্সিং হোমগুলোতে মানুষের মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। পাইপলাইনে খুব বেশি ওরাল বা মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক নেই। ওষুধ কোম্পানি ও গবেষকদের প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বিভাগের পরিচালক ড. সুজান হিল। তিনি বলেন, ‘এসব ভয়াবহ সংক্রামক রোগের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার মতো আমাদের তেমন কোনো প্রতিরক্ষাব্যূহ নেই।’

যক্ষ্মার গবেষণায় খুব বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে না। ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মার চিকিৎসায় গত ৭০ বছরে মাত্র দুটো ওষুধ বাজারে এসেছে। যক্ষ্মাকে সমূল বিনাশ করার জন্য এবং যক্ষ্মার চিকিৎসার ওষুধ উদ্ভাবনে অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট মোকাবিলায় নতুন ওষুধ বা চিকিৎসা এককভাবে কার্যকর হবে না। চিকিৎসার সঙ্গে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। তারপর রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিকের যুক্তিসংগত ব্যবহার। যুক্তিসংগত ব্যবহার শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, এটি পশু ও কৃষিক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বখ্যাত ল্যানসেট জার্নালে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স—নিড ফর গ্লোবাল সলিউশন’ শীর্ষক একটি বিশ্লেষণধর্মী দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ছাপা হয় কিছুদিন আগে। বিশ্বের ২৬ জন বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও ওষুধবিশেষজ্ঞ প্রবন্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স যে হারে বাড়ছে, তাতে হয়তো দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে মানুষ সংক্রামক রোগে অসহায় মৃত্যুবরণ করবে।

ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণজনিত মৃত্যুহার বিংশ শতাব্দীর পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সে সময় কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না। কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে অতি সাধারণ অস্ত্রোপচার অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর বিশ্বব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ঠেকানোর ব্যাপারে বিশ্বে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

কিছুদিন আগে আমার হাতে একটি নামকরা হাসপাতালের জীবাণু কালচারের একটি রিপোর্ট আসে। এক বছরের এক শিশুর ঘায়ের পুঁজ কালচার করে ই. কোলাইয়ের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জীবাণু কালচারে দেখা গেছে, ই. কোলাইয়ের বিরুদ্ধে বহুল ব্যবহৃত সব অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট। যার মধ্যে রয়েছে অ্যামোক্সিসিলিন, সেপ্টাজিডিম, জেন্টামাইসিন, কোট্রাইমোক্সাজল, অ্যামিকাসিন, ন্যালিডিক্সিক অ্যাসিড, সেফুরক্সিম, সেফোটেক্সামিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, অ্যাজট্রিওনাম, নেটিলমাইসিন ও সেফট্রিয়াক্সন।

শুধু একটিমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর বলে পরীক্ষায় দেখা গেছে আর তা হলো মেরোপেনেম। আমি রিপোর্টটি দেখে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেছি। ১৩টি অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে শুধু একটি অ্যান্টিবায়োটিক ই. কোলাই জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর, বাকি সব রেজিস্ট্যান্ট। এই রিপোর্ট থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা বিপদে আছি, যে বিপদের ভয়াবহতা কল্পনাশক্তিরও বাইরে।

প্রথমত, বিশেষ কোনো এনজাইম অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেতে এমন কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে, যার কারণে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় জীবাণু এমন সব এনজাইম তৈরি করে, যা অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেতকে ভেঙে দিতে সক্ষম। এই গাঠনিক সংকেত ভেঙে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, কোনো কোনো জীবাণু আছে, যেগুলো জন্মগতভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীল নয়। যেমন গ্রাম নেগেটিভ জীবাণুগুলোর কোষপ্রাচীর এমন জটিলভাবে তৈরি, যার প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে অসংখ্য অ্যান্টিবায়োটিক কোনোভাবেই কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে না।

চতুর্থত, জেনেটিক মিউটেশনের (জিনের রাসায়নিক পরিবর্তন) মাধ্যমে অনেক জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। কোটি কোটি জীবাণুর মধ্যে যেকোনো একটি যদি মিউটেশনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে যায়, সেই জীবাণু পরে বংশবৃদ্ধি ও বিস্তারের মাধ্যমে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এসব জীবাণু পরিবর্তিত জিনকে অন্য জীবাণুতে ট্রান্সফার করার মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। এসব জীবাণুতে আক্রান্ত রোগী তখন কোনো অ্যান্টিবায়োটিকে সংক্রমণমুক্ত হতে পারে না। ফলে রোগীর ভোগান্তি বাড়ে কিংবা কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করে।

জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন বিভাগের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ড. পাউল আউওয়েটার প্রতিদিন এই সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রোগীরা দিন দিন আরও বেশি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এ কারণে আমাদের ব্যাপকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে জীবাণু নিজেদের কাঠামো পরিবর্তন করছে। অন্যদিকে আমরা এসব জীবাণু মোকাবিলায় নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলছি।

সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া বা দুশ্চিন্তা নেই। তারা মনে করে, অতীতের মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা পর্যাপ্ত কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করে সংকট মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেবেন। ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের স্বার্থে এ ধরনের আবিষ্কারে এগিয়ে আসবে, যেমনটা অতীতে এসেছে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছি না অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে এই পটভূমি ভিন্ন।’

গ্রেফেন স্কুল অব মেডিসিনের জেনারেল ইন্টারনাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক স্পেনবার্গ বলেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিকের এমন কতগুলো অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অন্যান্য ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আজ যে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা প্রদর্শন করছে, তা ১০-১৫ বছর পর অকার্যকর হতে পারে, অন্য ওষুধের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। তাই জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার অব্যাহত রাখতে হবে।

অর্থনৈতিক মন্দা আর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে পরিস্থিতি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে ওষুধ কোম্পানিগুলো নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে আগ্রহ হারাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা প্রায় সব অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার উৎপত্তি লক্ষ করছি। কিন্তু সে হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আসছে না।

রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক ব্যাধির সংখ্যা আগামী পাঁচ বছরে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে। আমরা যে একদম অ্যান্টিবায়োটিক পাচ্ছি না, তা নয়; কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে আসছে। কিন্তু সেসব অ্যান্টিবায়োটিক গ্রাম নেগেটিভ সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। আমাদের অভাব হলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের।’

নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনীহার কারণও রয়েছে। একটি অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু সে তুলনায় মুনাফা করা যায় না। কোম্পানিগুলোর মতে, মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে অল্প কয়েক দিনের জন্য। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের ক্ষেত্রে যেমন রোগীকে আজীবন ওষুধ গ্রহণ করতে হয়, অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে তেমন হয় না। দ্বিতীয়ত, একটি অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হওয়ার পর অল্প কয়েক বছরে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেলে মুনাফা তো দূর, পুঁজিও ফেরত আসে না। উদ্ভাবনের পর অ্যান্টিবায়োটিকের অনুমোদন পেতেও অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনও পাওয়া যায় না। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে বিনিয়োগে আজকাল আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগী, জয়ী হচ্ছে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এই অশনিসংকেত বারবার উচ্চারিত হলেও সবাই নির্বিকার। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কথা বাদই দিলাম, ওষুধ কোম্পানির মালিকেরা কি জানেন, কোনো না কোনো সময় তাঁরাও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার শিকার হতে পারেন এবং কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে তাঁদেরও করুণ পরিণতি হতে পারে!

২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর ১১৪টি দেশে পরিচালিত গবেষণার ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উদ্বেগের সঙ্গে বলা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স থেকে সৃষ্ট মহাবিপর্যয় এখন ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ব্যাপার নয়।

এখনই বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সব বয়সের সব মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের শিকার হওয়ার প্রবল হুমকির মধ্যে রয়েছে। ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: গ্লোবাল রিপোর্ট অন সার্ভেইলেন্স’ (জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন: কড়া নজরদারির ওপর বিশ্ব প্রতিবেদন) শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী অসংখ্য জীবাণু বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে।

প্রতিবেদনে ডায়রিয়া, কলেরা, নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, গনোরিয়া, সেপসিসের (রক্তের সংক্রমণ) মতো সাধারণ থেকে শুরু করে খুব মারাত্মক সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর ওপর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যা খুব উদ্বেগজনক। কারণ, প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনকারী বহু জীবাণুর বিরুদ্ধে শেষ অবলম্বন হিসেবে বিবেচিত খুব কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকগুলোও এখন কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। কার্বাপেনেমকে এত দিন একমাত্র নন-রেজিস্ট্যান্ট শতভাগ কার্যকর শেষ অবলম্বন অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে গণ্য করা হতো।

জীবন বিপন্নকারী অন্ত্রের জীবাণু ক্লেবসিলা নিউমোনি কার্বাপেনেমের কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্লেবসিলা নিউমোনি হাসপাতালে নিউমোনিয়া, সেপসিস, নবজাতকের সংক্রমণ এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসারত বিপন্ন রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু দেশে রেজিস্ট্যান্সের কারণে কার্বাপেনেম ক্লেবসিলা নিউমোনিতে আক্রান্ত ৫০ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। মূত্রনালির সংক্রমণের জন্য দায়ী গ্রাম নেগেটিভ জীবাণু ই. কোলাইয়ের বিরুদ্ধে বহুল পরিচিত সিপ্রোগ্রুপের (ফ্লোরোকুনোলন) অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন আর কাজ করছে না।

১৯৮০ সালে বাজারে আসা সিপ্রোগ্রুপের ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের পরিমাণ ছিল শূন্য। এখন পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় সিপ্রোগ্রুপের ওষুধগুলোর কার্যকারিতা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। গনোরিয়া চিকিৎসায় শেষ অবলম্বন হিসেবে পরিচিত তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন গ্রুপের ওষুধগুলো এখন অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, নরওয়ে, স্লোভেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের গনোরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সারা বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়।

অ্যান্টিবায়োটিক-সম্পর্কিত সংকট নিয়ে মানুষ এখনো পুরোপুরি অবহিত ও সচেতন হচ্ছে না। যখন অবহিত হবে, তখন সম্ভবত অনেক দেরি হয়ে যাবে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক রোগ মানবসভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে যাচ্ছে। এই বিপর্যয়ের মাত্রা অনিশ্চিত, ভেদাভেদ অনির্ধারিত, ধনী-গরিব, শিশু-বয়স্ক, সুস্থ, প্রতিরোধক্ষমতাবিহীন রোগী—কেউই এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে না। তখন বুক চাপড়ানো ছাড়া আমাদের আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।

* ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক, সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
- drmuniruddin@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-16%2Fk2k05ivp%2Fsuperbugkk.JPG?rect=62%2C0%2C674%2C449&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রচলিত আছে, তার বেশির ভাগই এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ছবি : রয়টার্স