Thursday, August 27, 2026
ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ইসলামের ওপর আঘাত’
মঙ্গলবার এআইএমআইএমের দারুস সালাম কার্যালয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত ‘জালসা-এ-রহমাতুল লিল আলামিন’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওয়াইসি এ মন্তব্য করেন।
ওয়াইসি বলেন, স্কুলে কোনো ছাত্রী হিজাব পরতে পারবে না—আদালতের এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। তিনি প্রশ্ন করেন, সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির বেঞ্চে সাবরিমালা-সংক্রান্ত বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় হাইকোর্ট কেন কোনো ধর্মীয় অনুশীলন ইসলামের জন্য অপরিহার্য কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিল।
তিনি বলেন, “আজকের রায় ভারতের সংবিধানের ২৫ ও ১৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। ইসলামের জন্য কোনটি অপরিহার্য, তা নির্ধারণ করার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে? মেয়েরা মাথায় হিজাব পরে, মনে নয়।”
এর আগে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছিল, বৈষম্যহীন ও সৎ উদ্দেশ্যে নির্ধারিত ইউনিফর্ম নীতিমালা স্কুল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। ওই ছাত্রী আগের বছরগুলোতে কোনো আপত্তি ছাড়াই মাথায় স্কার্ফ পরলেও এবার পোশাকবিধির কারণ দেখিয়ে তাঁকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি দেওয়া হয়নি।
এদিকে আসাম ও উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি প্রণয়নের উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন ওয়াইসি। তার দাবি, ইউসিসির নামে হিন্দু ব্যক্তিগত আইন, যেমন হিন্দু বিবাহ আইন, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আইন অনুসরণে মুসলমানদের বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মুসলমানদের কেন এসব আইন অনুসরণ করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, ধর্মীয় বিশ্বাসে অটল মুসলমানরা কোরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করেই চলবেন।
‘বন্দে মাতরম’ নিয়েও বক্তব্য দেন ওয়াইসি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষচন্দ্র বসু ও মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, গানটির প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁদের চেয়ে নিজেকে বেশি জ্ঞানী মনে করেন কি না—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ওয়াইসি বলেন, ভারত সবার এবং পরিণতি যা-ই হোক, তিনি কালেমা ঘোষণা করে যাবেন।
এ সময় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও বিজেপিরও সমালোচনা করেন এআইএমআইএম সভাপতি। তার দাবি, ভারতের সংবিধান গৃহীত হওয়ার কয়েকদিন পরই আরএসএসের মুখপত্র সংবিধানের পরিবর্তে মনুস্মৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
তিনি আন্দামান কারাগারে বিনায়ক দামোদর সাভারকারের আচরণের সঙ্গে মুসলিম স্বাধীনতাসংগ্রামীদের ভূমিকার তুলনা করেন এবং দাবি করেন, মুসলিম স্বাধীনতাসংগ্রামীরা কখনো ব্রিটিশদের অনুগ্রহ চাননি। স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস কোনো ত্যাগ স্বীকার করেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
সূত্র: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, মুসলিম মিরর
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি তাদেরই দেশ
এর মাধ্যমে মূলত তিনি একটি সতর্কবাণী দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সতর্কবার্তা ব্রিটেন শহর সম্পর্কে জানার চেয়ে বরং এই উক্তিটির পেছনের রাজনীতিকেই বের করে আনে।
মুসলিমদের দৃশ্যমানতা ও ‘ইসলামীকরণ’ বিতর্ক
ব্রিটেন একটি বৈচিত্র্যময় গণতন্ত্র, যেখানে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ছয় শতাংশ। রাজনীতি, সংস্কৃতি, পেশাগত ক্ষেত্র এবং জনজীবনে তাদের ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমানতা হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসতি স্থাপন, নাগরিকত্ব এবং অংশগ্রহণের এক স্বাভাবিক পরিণতি।
কিন্তু মুসলিম-বিরোধী আতঙ্কের রাজনীতিতে, দৃশ্যমানতাকে আধিপত্য, বৈচিত্র্যকে ‘ইসলামীকরণ’ এবং অংশগ্রহণকে অনুপ্রবেশ হিসেবে নতুন রূপ দেওয়া হয়। এর অন্তর্নিহিত প্রস্তাবনাটি বেশ অদ্ভুত: যখন একটি গণতন্ত্রে মুসলমানরা যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র নিজেই কোনোভাবে মুসলিম হয়ে যায়।
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাছাই করা আতঙ্ক
এই বাছাই প্রক্রিয়াটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটেনে সম্প্রতি ঋষি সুনাকের মতো একজন প্র্যাক্টিসিং হিন্দু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, নেতানিয়াহু এবং তার আদর্শগত মিত্ররা তখন ব্রিটেনের মধ্যে কেনো ‘হিন্দুকরণ’ আঁচ করতে পারেননি। এমনকি ওয়েস্টমিনস্টার যে একটি হিন্দু প্রজাতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সতর্কবার্তা ছিল না।
সুনাকের স্থলাভিষিক্ত হন কিয়ার স্টারমার, যার স্ত্রী ইহুদি এবং সন্তানরা ইহুদি ঐতিহ্য অনুসারে বেড়ে উঠেছে। এবারও ‘ব্রিটেনের ইহুদিকরণ’ নিয়ে কোনো কথা হয়নি, কিংবা টেমস নদীর তীরে একটি ইহুদি প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠার কোনো জল্পনাও শোনা যায়নি।
ব্রিটেনের বর্তমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, যিনি একজন ক্যাথলিক। এখন পর্যন্ত, ‘ব্রিটেনের ক্যাথলিকীকরণ’ দৃশ্যত নেতানিয়াহুরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
জাতিগত বৈচিত্র্য
কিন্তু মুসলিমরা রাজনীতি বা পেশাগত ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হলেই তাকে ‘ইসলামীকরণ’ বা ‘অনুপ্রবেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। মুসলিম মেয়র, এমপি, ডাক্তার, আইনজীবী এবং ভোটাররা কেবল অংশগ্রহণের প্রমাণ নয়, বরং ‘ইসলামীকরণের’ প্রমাণ হয়ে ওঠে। তাদের দৃশ্যমানতা হয়ে দাঁড়ায় জনসংখ্যাতাত্ত্বিক হুমকি; তাদের রাজনৈতিক প্রভাব হয়ে ওঠে অনুপ্রবেশ।
মনে হচ্ছে, ধর্মীয় বহুত্ববাদ বহুত্ববাদই থেকে যায়—যতক্ষণ না সেই ধর্মটি ইসলাম হয়।
ব্রিটেনে মুসলিমদের বাস্তব অবস্থান
বাস্তবতা ততটা চাঞ্চল্যকর নয়। ব্রিটেনে প্রায় চল্লিশ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু মাত্র। সেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য আন্দোলন নেই যা একটি ইসলামিক রাষ্ট্র বা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ব্রিটিশ রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আইন সম্পূর্ণ ব্রিটিশই রয়েছে; সংসদ কোনো শুরা কাউন্সিল দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়নি এবং ব্রিটিশ আইনও ইসলামিক আইন দ্বারা উচ্ছেদ করা হয়নি।
পরিবর্তনটি মূলত দৃশ্যমানতার ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী ইংল্যান্ডে প্রায় ১৩,০০০ মুসলিম ডাক্তার কর্মরত ছিলেন, যা মোট চিকিৎসকদের প্রায় ১০% (জনসংখ্যার অনুপাতের প্রায় দ্বিগুণ)। তারা নির্বাচনে ভোট দেন এবং তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা ইংরেজিকে প্রথম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে ব্রিটেনকেই তাদের নিজের বাড়ি মনে করে।
এটিকে ইসলামী দখলের প্রমাণ হিসেবে চিত্রিত করা মানে নাগরিকত্বকে বিজয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা—এবং এই বিভ্রান্তির একটি ইতিহাস রয়েছে।
ইউরোপের ইতিহাসে ইসলামের দীর্ঘ উপস্থিতি
ইউরোপের ইতিহাসে ইসলাম কোনো নতুন বিষয় নয়। সহস্রাধিক বছর ধরে যুদ্ধ, বাণিজ্য, পাণ্ডিত্য, অভিবাসন, কূটনীতি এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।
আল-আন্দালুসে বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। খ্রিস্টান ইউরোপের রাজনৈতিক কল্পনায় আরব ও অটোমানরা বারবার আবির্ভূত হয়েছিল। পোয়াতিয়ে থেকে ভিয়েনা পর্যন্ত, এই মুসলিম ‘অন্য’ সত্তাটি ইউরোপকে তার আত্মপরিচয় নির্ধারণে সহায়তা করেছিল।
সুতরাং ইসলাম কখনোই ইউরোপীয় ইতিহাসের বাইরে ছিল না। এটি ছিল সেই শক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম, যার বিরুদ্ধে এবং যার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরোপ নিজেকে গড়ে তুলেছিল।
যুদ্ধোত্তর অভিবাসন ও ইউরোপ পুনর্গঠন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই সম্পর্কটি মৌলিকভাবে বদলে যায়। বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনকারী ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের উপনিবেশ ও সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে শ্রমিক নিয়ে আসে। ব্রিটেন দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য স্থান থেকে অভিবাসী গ্রহণ করে; ফ্রান্স উত্তর আফ্রিকা থেকে; এবং অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব ঔপনিবেশিক প্রভাবাধীন অঞ্চল বা শ্রম সংগ্রহের এলাকা থেকে শ্রমিক নেয়।
এইসব পুরুষ ও মহিলা কারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা, হাসপাতাল এবং সরকারি পরিষেবাগুলিতে কাজ করতেন। তাঁরা প্রায়শই সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও ইউরোপ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছিলেন।
কিন্তু সেটাও গল্পের শুরু ছিল না।
যুদ্ধ, আত্মত্যাগ ও ব্রিটিশ ইতিহাসে মুসলিমদের ভূমিকা
যুদ্ধোত্তর অভিবাসন ব্রিটেনকে বদলে দেওয়ার অনেক আগেই, মুসলমানরা ব্রিটিশ ও মিত্রশক্তির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যায় যুদ্ধ করেছিল এবং প্রাণ দিয়েছিল। সংসদে উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের অবদান ছিল কমপক্ষে ২৫ লক্ষ সৈন্য ও শ্রমিক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৫৫ লক্ষ, এবং ধারণা করা হয় যে এই দুই সংঘাত জুড়ে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।
মুসলিম সৈন্যরা ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের পরিখায়, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এবং সুদূর প্রাচ্যের যুদ্ধাভিযানে লড়াই করেছিল। শুধুমাত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই ব্রিটিশ ভারত থেকে চার লক্ষেরও বেশি মুসলিম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।
তাদের এই আত্মত্যাগ এমন এক সমসাময়িক রাজনীতির পাশে বেমানান মনে হয়, যা খুব সহজেই মুসলমানদের নবাগত, বহিরাগত অথবা এমন এক জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে যাদের অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ ক্রমাগত দিতে হয়। মুসলমানরা ব্রিটিশ ইতিহাসে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত কোনো ভিনগ্রহী সত্তা নয়। তারা এর যুদ্ধগুলোতে লড়তে, এর স্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং এর ইতিহাস গঠনে সাহায্য করেছে।
অভিবাসী থেকে নাগরিক
তারা থিতু হলেন। তাদের সন্তান জন্মালো, তারপর নাতি-নাতনি। সেই ‘অভিবাসী’ নাগরিক হয়ে উঠলেন।
এই রূপান্তরটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আজকের অধিকাংশ কথাবার্তাই আগমনের পরিভাষায় আটকে আছে, যেন মুসলিম পটভূমির লক্ষ লক্ষ ইউরোপীয় এইমাত্র একটি নৌকা থেকে নেমেছেন এবং যেকোনো মুহূর্তে তাদের অন্য কোথাও ফিরে যেতে প্ররোচিত করা যেতে পারে।
কিন্তু চতুর্থ প্রজন্মের একজন লন্ডনবাসী ঠিক কোথায় “ফিরে” যাবে? ব্রিটেনই তো তার বাড়ি। এটাই সেই বাস্তবতা, যার সঙ্গে চিরস্থায়ী পরদেশীত্বের রাজনীতি লড়াই করতে হিমশিম খায়।
আধুনিক ব্রিটেন ও বহুত্ববাদ
আধুনিক ব্রিটেন কোনো অপরিবর্তনীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নয়, যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে অবিকৃতভাবে চলে আসে। এটি এমন একটি সমাজ যা এর অধিবাসীরাই ক্রমাগত রূপদান করে। খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলিম, হিন্দু, শিখ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং অধার্মিকদের জীবনযাত্রা এখন একই জাতীয় পরিসরে একে অপরের সাথে মিশে গেছে।
আর একীকরণ মানে কখনোই এই নয় যে সংখ্যালঘুরা অপরিবর্তিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির সাথে কেবল বিলীন হয়ে যাবে। এটি উভয় দিকেই কাজ করে।
নাগরিকত্ব, পরিচয় ও অন্তর্ভুক্তি
এই কারণেই “ইসলামিক রিপাবলিক অফ ব্রিটেন” কথাটি শুধু উপহাসের চেয়েও বেশি কিছু দাবি করে। এর অযৌক্তিকতার আড়ালে নাগরিকত্বের এক গভীর বর্জনমূলক ধারণা নিহিত রয়েছে: যে কিছু নাগরিক স্বাভাবিকভাবেই জাতির অন্তর্ভুক্ত, আর অন্যরা স্থায়ী অতিথি হয়ে থাকে, যাদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়।
একজন মুসলমান আপাতদৃষ্টিতে ব্রিটিশ হতে পারেন—যদি তার ব্রিটিশ পরিচয় যথেষ্ট পরিমাণে অস্পষ্ট থাকে।
কিন্তু নাগরিকত্ব এভাবে কাজ করে না। সংসদে একজন ব্রিটিশ মুসলিম নির্বাচিত হওয়াটা এই প্রমাণ দেয় না যে মুসলিমরা ব্রিটেন দখল করে নিয়েছে। বরং এটি প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ মুসলিমরা ভোট দেয় এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় একজন মুসলিম ডাক্তার থাকা ইসলামীকরণের প্রমাণ নয়। গির্জা, সিনাগগ বা মন্দিরের পাশে একটি মসজিদ থাকাও বিজয়ের প্রমাণ নয়।
কোনো মুসলিম পরিবার, যাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানি পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, সোমালিয়া বা মরক্কো থেকে এসেছিলেন, তারা তাদের জাতীয় উত্তরাধিকারের পাশাপাশি একটি ধর্মীয় উত্তরাধিকার ধরে রাখার কারণে কম ব্রিটিশ হয়ে যান না।
আধুনিক ব্রিটেন
বহুত্ববাদ মানে ব্রিটেনের বিলুপ্তি নয়। এটিই সমসাময়িক ব্রিটেন – এবং মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উপস্থিতিকেও সেইভাবেই বোঝা উচিত। বিভিন্ন সম্প্রদায় যখন প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। গণতান্ত্রিক সমাজজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ক্ষেত্রে এই একই প্রক্রিয়া বারবার ঘটেছে।
সূত্র:মিডল ইস্ট আই
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Wednesday, August 26, 2026
মুসলিম বিশ্বের এক প্রশ্নবিদ্ধ রাষ্ট্র আরব আমিরাত by মাহমুদুর রহমান
সেই সমস্যা কীভাবে সমাধান করেছিলাম, সেটা একেবারেই ব্যক্তিগত বিধায় সে প্রসঙ্গ আর বাড়াচ্ছি না। প্রিন্স মুবারক বাংলাদেশ সফরে এসে বেশ সন্তুষ্ট হয়েছিলেন, যার ফলে ওয়ারিদ টেলিকমের বাংলাদেশে আগমন ঘটেছিল। আমার সঙ্গে আলোচনায় টেলিকম ছাড়া অন্যান্য সম্ভাব্য লাভজনক সেক্টরেও মুবারক আল নাহিয়ানের ধাবি গ্রুপের বিনিয়োগের কথা থাকলেও ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে সেসব আর বাস্তবায়ন হয়নি। বরং পরবর্তীকালে ওয়ারিদ টেলিকম তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ভারতের এয়ারটেলের কাছে বিক্রি করে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। আমিও সরকারি দায়িত্ব ছেড়ে মিডিয়ায় প্রবেশ করলাম এবং সেই থেকে আমার বাঙালি মুসলমান আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আওয়ামী সুশীল ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে যথাসম্ভব লড়াই করাটাই বাকি জীবনের কর্তব্য ধরে নিয়েছি।
গত পঁচিশ বছরে মুসলিম বিশ্বে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মাত্রাটা কিছুটা বোঝানোর জন্য উপরের ঘটনা বর্ণনা করলাম। প্রসঙ্গক্রমে আমার আরো একটি পর্যবেক্ষণের কথা বলে রাখি। বিনিয়োগ বোর্ডে পাঁচ বছরের দায়িত্ব পালনকালে আমি তিনবার আরব আমিরাতে সরকারি সফরে গিয়েছিলাম। প্রথমবার আমার সঙ্গে একটি বিনিয়োগ প্রতিনিধি দল ছিল। দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম প্রিন্স মুবারক আল নাহিয়ানের বাংলাদেশ সফরের আগে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হতে। আর ২০০৬ সালের এপ্রিলে তৃতীয় ও শেষবার তারই আমন্ত্রণে নবনির্মিত আবুধাবি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার উদ্বোধনী একদিনের ক্রিকেট খেলা দেখতে।
আমিরাতের ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে তিনি সেই আয়োজনের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। আমার তিন সফরের অভিজ্ঞতায় একজন বাংলাদেশি এবং মুসলমান হিসেবে একটি বিষয় লক্ষ করে বেশ উদ্বিগ্ন বোধ করেছিলাম। আমার কাছে তখনই মনে হয়েছিল যে, আমিরাতের প্রধান দুই শহরের মধ্যে দুবাই ভারতীয়দের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এবং আবুধাবিতে পাকিস্তানের কিছুটা প্রভাব থাকলেও ভারতীয়করণ ক্রমেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ভারতের পাশাপাশি অন্তরালে যে ইসরাইল আমিরাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক হওয়ার পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, সেটা অবশ্য একেবারেই টের পাইনি। তবে ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে কথোপকথনে তাদের চিন্তাধারায় মুসলিম পরিচয়কে ছাপিয়ে পশ্চিমাদের প্রতি অন্ধ প্রীতি লক্ষ করেছিলাম। উম্মাহ নিয়ে আলোচনা উঠলে তাদের মধ্যে একধরনের দ্বিধাও যেন অনুভব করেছিলাম।
এবার বর্তমানে আসি। এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই যে, সারা বিশ্বে সবচেয়ে উগ্র মুসলমানবিদ্বেষী দুই দেশের নাম ইসরাইল ও ভারত। উভয় দেশে ইসলামোফোবিয়া রাজনৈতিক ময়দান ছাড়িয়ে জনগণের বৃহৎ অংশের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। কেউ যদি মনে করে থাকেন যে, নির্বাচনে হেরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে কট্টরপন্থি নেতানিয়াহু এবং নরেন্দ্র মোদি অপসারিত হলেই ইসরাইল ও ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর চলমান জুলুমের অবসান ঘটবে এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দেশ দুটির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরে আসবে, তাহলে তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আমি গণতন্ত্র প্রসঙ্গে বিভিন্ন লেখায় এবং বক্তব্যে একটি বিষয়ে সর্বদা জোর দিয়ে থাকি।
সেটা হলো, যেকোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে অবশ্যই সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চিন্তাচেতনার প্রতিফলন ঘটবে। অনেকেই হয়তো এই তর্ক তুলবেন যে, জনমতকে তো নেতাই প্রভাবিত করে থাকেন। আমি মনে করি এ কথাটি আংশিক সত্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতাকে নির্বাচনে জিততে হলে জনমত বুঝে চলতে হয়। সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় অভিমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো নেতার পক্ষে রাজনীতিতে সফল হওয়া কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। মানুষের মন অল্প সময়ে পরিবর্তিত হয় না। এই যে ভারতে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সব নির্বাচনের আগে মুসলমানদের ওপর নিগ্রহের মাত্রা বেড়ে যায়, এর পেছনে জনতুষ্টি এবং নির্বাচনি হিসাবনিকাশ কাজ করে। ইসরাইলে এই অক্টোবরে সংসদের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেখানে নেতানিয়াহুসহ সব সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর প্রচারের মূল বয়ান হলো, প্যালেস্টাইনের মুসলমান নারী, পুরুষ, শিশুকে কে কত সফল ও বর্বরভাবে নির্যাতন ও হত্যা করতে সক্ষম হবে। গণহত্যা চালিয়ে প্যালেস্টাইনকে নিশ্চিহ্ন করে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করতে যার পরিকল্পনা ইসরাইলি ভোটারদের কাছে সবচেয়ে কার্যকর মনে হবে, সেই আসন্ন নির্বাচনে জিতবে। সুতরাং, নেতানিয়াহু কিংবা মোদি অসুখ নয়, উপসর্গ মাত্র।
ভারত ও ইসরাইলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উন্মত্ত ধর্মান্ধতাই সেখানকার আসল রোগ। চরম বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এমন ভয়ংকর ইসলামবিদ্বেষী ভারত এবং ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতম মিত্র দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান কিন্তু ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় নয়। সেটা খোদ আরব ভূমিতেই। দেশটির নাম সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমি জেনেবুঝেই বলছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) প্রকৃতপক্ষে ইসরাইল ও ভারতের অধিক বিশ্বস্ত বন্ধু। গণতন্ত্রহীন ইউএই জনমতের তোয়াক্কা না করে যতটা অন্ধভাবে ভারত ও ইসরাইলের সব অন্যায় সমর্থন করতে পারবে, গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেটা সম্ভব নয়। গাজায় এই শতাব্দীর ভয়াবহতম গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে জায়নিস্ট ইসরাইলের প্রতি ‘ওয়াশিংটন এস্টাবলিশমেন্টের’ সমর্থন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে দেশটির তরুণ প্রজন্ম বর্ণবাদী জায়নিজমের বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছে। এমনকি ইসরাইলের কট্টর সমর্থক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পর্যন্ত এই পরিবর্তনকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। অথচ ইউএইতে ভিন্ন চিত্র।
ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের চলমান যুদ্ধে তেমন কোনো রাখঢাক না রেখেই আমিরাত ইসরাইলের পক্ষাবলম্বন করেছে। যুদ্ধের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ ইসরাইলের সামরিক কর্তারা আমিরাত সফর করে গেছেন। ইসরাইলি ‘আয়রন ডোম’ আমিরাতের আকাশ পাহারা দিচ্ছে। মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান আমিরাতের সব বিমান ঘাঁটি থেকে উড়ে গিয়ে ইরানের ওপর বোমা ফেলেছে, দেশটির সামরিক ঘাঁটি থেকে ইসরাইলি ও মার্কিন সৈন্যরা ইরান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ছে। বছরের শুরুতে ইরানের ওপর মার্কিন এবং ইসরাইলি অন্যায় আক্রমণ শুরু করতেও আরব আমিরাত ক্রমাগত উসকানি দিয়েছে। তারা মুসলিম রাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংসের জন্য ওয়াশিংটনে ওকালতি করেছে।
একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের আসালুয়ে পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ইসরাইল ও আমিরাত যৌথভাবে হামলা চালালে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরক্তি প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হঠকারী কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দেয়। হাজার বছরের শিয়া-সুন্নি বিভেদকে পুঁজি করে আরব দেশটির শাসক পরিবার মুসলিম উম্মাহ ধ্বংসের মরণ খেলায় মেতেছে। পাকিস্তান যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করায় চরম অসন্তুষ্ট হয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ দেশটিকে এক মাসের মধ্যে ফেরত দিতে বাধ্য করেছে তথাকথিত মুসলিম উম্মাহভুক্ত ইউএই সরকার। পাকিস্তান সৌদি আরবের কাছ থেকে ধার করে আমিরাতের সেই আকস্মিক দাবি মিটিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরেই এ-জাতীয় আত্মবিধ্বংসী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকলে বাইরে থেকে উম্মাহর আর কোনো শত্রুর প্রয়োজন দেখি না। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইসরাইল ইরানে আক্রমণ চালানোর মাত্র দুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তেল আবিব সফর করে ইসরাইলকে পিতৃভূমি এবং ভারতকে মাতৃভূমি ঘোষণা করে এসেছিলেন। ইসরাইল-ভারত-ইউএই ট্রয়কা সম্পর্কে মুসলিম বিশ্বের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা এখন আফ্রিকার দরিদ্র ও সংঘাতময় দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত আমাদের এখান থেকে জনশক্তি পাঠানো নিয়ে। বছরে গড়ে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স ইউএই থেকে বাংলাদেশ আয় করে যা মোট রেমিট্যান্সের ১০ শতাংশেরও কিছু বেশি। সে দেশে চাকরি এবং ব্যবসায় নিয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, যেটা বিদেশিদের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। দেশটিতে কর্মরত ভারতীয়দের সংখ্যা ৪০ লাখ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী পাকিস্তানিদের সংখ্যা ১৫ লাখ। আমার ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ইউএই সরকার পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশি কর্মীদের সে দেশ থেকে সরিয়ে ভারতীয়দের অধিক হারে নিয়োগ দেবে। সুতরাং জনশক্তি রপ্তানির জন্য আমাদের অন্য দেশের সন্ধান এখন থেকেই করা উচিত।
পাঠকদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জানেন না যে, কিছুদিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইউএই বাংলাদেশের পরিবর্তে ইসরাইলের মিত্র সাইপ্রাসের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ট্রয়কার অন্য সদস্য ভারত কেবল আমাদের বিপক্ষে ভোট দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, সাইপ্রাসকে জেতানোর জন্য সরাসরি প্রচারও চালিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনা এবং তার লুটেরা ও খুনি দোসররাও প্রধানত ভারত ও আমিরাতে আশ্রয় নিয়েছে। গণহত্যাকারী সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধকে আরব আমিরাত সরকার উপেক্ষা করেছে। আমার ধারণা, এ বিষয়ে ভারত এবং ইউএই যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে এই দুই দেশ সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান রেখে আজকের লেখা শেষ করছি।
![]() |
| মাহমুদুর রহমান |
Tuesday, August 25, 2026
হিজাব পরা ইসলামে অপরিহার্য আচার নয়: ভারতের হাইকোর্ট
প্রয়াগরাজের আটারসুইয়ার ‘টাগোর পাবলিক স্কুল’-এর একাদশ শ্রেণির নাবালিকা ছাত্রী সুকাইনা রিজভীর দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি জে জে মুনীর এবং বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ শুক্লার সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় দেন।
আবেদনকারী সুকাইনা রিজভী আদালতকে জানান, তিনি শৈশব থেকেই হিজাব পরেন। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ওই স্কুলে পড়ার সময়ও তিনি ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরার অনুমতি পেয়েছিলেন। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময়ও হিজাব পরার অধিকার বজায় রাখার দাবি জানান তিনি।
সুকাইনা রিজভীর দাবি ছিল, তাকে হিজাব পরতে না দেওয়া সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা এবং ১৯(১)(এ) নম্বর ধারার লঙ্ঘন। তবে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, শুধু মৌখিক দাবি বা বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারার অধীন সুরক্ষা দাবি করা যায় না।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারার ওপর নির্ভর করে করা কোনো দাবি পর্যাপ্ত তথ্য ও আইনি ভিত্তি ছাড়া কেবল মৌখিক সমর্থনের ভিত্তিতে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
দ্বৈত বেঞ্চ তাদের রায়ে বিদ্যালয়ের ড্রেস কোড এবং নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ড্রেস কোড যদি নিরপেক্ষ, সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন হয়, তাহলে শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিচয় বজায় রাখতে সেটি কার্যকর করার পূর্ণ অধিকার কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
আদালত আরও বলেন, ইউনিফর্ম শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতা এবং ধর্মীয় দিক থেকে নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করে। অতীতে স্কুল কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায়নি বলেই ভবিষ্যতেও ছাড় দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে না।
স্কুল কর্তৃপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয়, একজন শিক্ষার্থীকে ড্রেস কোডে ছাড় দেওয়া হলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে। তাছাড়া ওই স্কুলের অন্যান্য মুসলিম ছাত্রীরাও নির্ধারিত ড্রেস কোড মেনে চলছেন।
রায়ে কর্নাটক হাইকোর্টের ২০২২ সালের একটি রায়েরও উল্লেখ করেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বেঞ্চ। ওই রায়ে হিজাবকে ইসলামের অপরিহার্য অঙ্গ নয় বলে গণ্য করা হয়েছিল উল্লেখ করে বেঞ্চ বলেন, বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।
এভাবেই প্রয়াগরাজের টাগোর পাবলিক স্কুলে ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরার অনুমতি চেয়ে করা মুসলিম ছাত্রীর রিট আবেদন খারিজ করে দেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
![]() |
| প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত |
খলিফা ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা by নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস
বাজারের ভেতরে জনতার ভিড় ঠেলে হেঁটে যাচ্ছেন এক দীর্ঘদেহের প্রবীণ ব্যক্তি; হাতে তার চামড়ার চাবুক। তিনি অন্য কেউ নন, মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। হাঁটতে হাঁটতে তিনি তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করছেন পণ্যের মান, পরখ করছেন মাপের পাত্র এবং আড়চোখে খেয়াল করছেন কোনো ব্যবসায়ী গোপনে ভেজাল দিচ্ছে বা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কি না।
এই দৃশ্য-ইতিহাস কল্পনা করলে পাঠকের মতে একটা মৌলিক প্রশ্ন জাগবে, বাজার কি শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত লেনদেনের স্থান, নাকি সেখানে ন্যায়নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা এবং সততা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরও এক অনিবার্য দায়িত্ব?
প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে রিদ্দা যুদ্ধ-পরবর্তী যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছিল, ওমর (রা.)-এর ১০ বছরের খেলাফতকালে (১৩-২৩ হিজরি/৬৩৪-৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) তা এক বিশাল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যেও রূপ নেয়। আজকের আলোচনা সেই রূপান্তর নিয়ে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র
ওমর (রা.)-এর শাসনকালে খেলাফত রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা অভূতপূর্ব গতিতে সম্প্রসারিত হয়। রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ এলাকা—সিরিয়া, ইরাক, ইরান ও মিসর মুসলিম রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তৎকালীন আরবের প্রথাগত মরু-অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র আঞ্চলিক বাজার ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে।
সিরিয়ার কৃষিপণ্য, মিসরের খাদ্যশস্য এবং পারস্যের ধাতু ও পোশাকশিল্প এখন একক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছাতার নিচে চলে আসে। এর ফলে খোলাফায়ে রাশেদিনের অধীনে একটি বৃহৎ ‘একীভূত অর্থনীতি’ (Unified Economy) গড়ে ওঠে, যেখানে বাণিজ্য শুল্কের জটিলতা কমে যায় এবং সীমান্তহীন বাণিজ্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
নববিজিত অঞ্চলগুলোতে সামরিক ও বেসামরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগর অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ ঘটে। সামরিক কেন্দ্র ও সেনানিবাস হিসেবে গড়ে ওঠা বসরা এবং কুফা অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনীতি ও বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। ওমর (রা.) এই নতুন নগরগুলোতে বাজার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিশেষ নকশা বাস্তবায়ন করেন। যেমন : কুফার বাজার পরিকল্পনা করার সময় তিনি নির্দেশ দেন যেন বাজারগুলো জামে মসজিদের কাছে এবং প্রশস্ত সড়কের পাশে উন্মুক্ত স্থানে গড়ে ওঠে, যাতে পণ্য পরিবহন ও তদারকি সহজ হয়।
একই সঙ্গে তিনি মুদ্রাব্যবস্থায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আনেন। প্রচলিত সাসনি ও বাইজেন্টাইন মুদ্রা সচল রেখে তিনি দিরহামের ওজন সুনির্দিষ্ট করেন, যেখানে ১০টি দিরহামের ওজন ৭টি স্বর্ণ-দিনারের (মিছকাল) সমান নির্ধারণ করা হয়। পারস্যের দিরহামে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মতো আরবি বাক্য খোদাই করে খেলাফত রাষ্ট্রের আর্থিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই মুদ্রানীতি বাণিজ্যিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা আনে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দূরবর্তী বাজারগুলোকে একীভূত লেনদেন সূত্রে গ্রথিত করে।
শরিয়ত জেনে আসতে হবে
একটি অতিদ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতিতে শুধু নৈতিক উপদেশ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ওমর (রা.) গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, ব্যবসায়ী যদি বাণিজ্য-সংক্রান্ত শরিয়তের বিধিবিধান না জানে, তবে অজ্ঞতাবশতই সে বিভিন্ন অন্যায্য ও হারাম লেনদেনে জড়িয়ে পড়বে।
মুসলিম আইন শাস্ত্রে ‘ইবাদত’-এর মতোই ‘মুয়ামালাত’ (অর্থনৈতিক লেনদেন) ঈমানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র। বাজারে ব্যবসা করা শুধু মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বও বটে। ওমর (রা.)-এর অর্থনৈতিক প্রশাসনে ব্যবসায়ীদের জন্য মোটাদাগে চার বিষয়ের জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল—
রিবা (সুদ) ও তার সূক্ষ্ম রূপ : ‘রিবা আলফজল’ (সমজাতীয় পণ্য বিনিময়ে কমবেশি করা) এবং ‘রিবা আননাসিআহ’ (মেয়াদের কারণে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা) বাণিজ্যের এই জটিল নিয়মগুলো না জানলে সাধারণ ব্যবসায়ী সহজেই সুদের খপ্পরে পড়তে পারে।
গিশ ও তাদলিস (প্রতারণা ও ত্রুটি লুকানো) : ভালো পণ্যের নিচে নিম্নমানের পণ্য লুকিয়ে রাখা বা পণ্যের অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি গোপন করে বিক্রি করা শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তাতফিফ (ওজনে কারচুপি) : মাপে বা ওজনে ক্রেতাকে ঠকানো, যা কোরআনে সরাসরি অভিশাপযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত।
মিথ্যা তথ্য ও কৃত্রিম অসততা : পণ্যের কৃত্রিম গুণগান গাওয়া, মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করা বা বাজারে কৃত্রিমভাবে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে ক্রেতা সেজে দাম হাঁকানো (নজশ)।
ওমর (রা.)-এর সুনির্দিষ্ট শাসননীতি ছিল—আইন না জেনে বাজারে নামলে ব্যবসায়ী অজান্তেই সুদে লিপ্ত হবে এবং ক্রেতার অধিকার হরণ করবে। ফলে প্রতিটি পেশাদার ব্যবসায়ীর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবসার আইনকানুন জানা ‘ফরজে আইন’ (বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব) হিসেবে গণ্য হতো।
আধুনিক অনেক আলোচনায় এই ঘটনাটিকে একটি ‘আমলাতান্ত্রিক বাণিজ্যিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা’ হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা দেখা যায়। বলা হয়, ওমর (রা.) নাকি বাজারে ঢোকার মুখে পরীক্ষা কেন্দ্র বসিয়েছিলেন এবং ফিকহ পরীক্ষায় পাস না করলে কাউকে ব্যবসা করতে দিতেন না। তবে প্রাথমিক ঐতিহাসিক গ্রন্থ অনুসন্ধান করলে এমন কোনো লিখিত সনদ প্রদান বা প্রশাসনিক প্রবেশ পরীক্ষার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার বিধিবিধান (ফিকহ) জানা বাধ্যতামূলক করেছিলেন, তবে তা বাস্তবায়ন হতো বাজারে সরেজমিনে তদারকি, শিক্ষা ও সংশোধনের মাধ্যমে। খলিফা নিজে এবং নিযুক্ত কর্মকর্তারা ভুল লেনদেন সংশোধন করতেন; আর বারবার প্রতারণা, সুদি বা অবৈধ লেনদেন করলে তাজিরস্বরূপ শাস্তি দিতেন এবং প্রয়োজনে বাজার থেকে বহিষ্কার করতেন। অর্থাৎ, এটি আধুনিক অর্থে কোনো লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নয়; বরং জ্ঞানভিত্তিক বাজার তদারকি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা ছিল।
বাজার মনিটরিং
পরবর্তীকালের সুসংগঠিত ‘মুহতাসিব’ (মার্কেট ইন্সপেক্টর) বা ‘হিসবাহ’ নামক যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক রূপ গড়ে উঠেছিল, তার প্রত্যক্ষ সূচনা ঘটেছিল ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে। ওমর (রা.) নিজে ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান নীতি-তদারককারী। তিনি নিয়মিত মদিনার বাজার পরিদর্শন করতেন। তবে রাষ্ট্রের আকার বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে বাজার তদারকির জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন।
এই প্রক্রিয়ায় ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজেই সমগ্র রাষ্ট্রের বাজার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি নিয়মিত বাজার পরিদর্শন, ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারণ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। পাশাপাশি মদিনার বাজার পরিচালনার জন্য তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উতবা ও সায়িব ইবনে ইয়াজিদকে দায়িত্ব প্রদান করেন, যারা যৌথভাবে বাজারের শৃঙ্খলা ও লেনদেন তদারকি করতেন। শিফা বিনতে আবদুল্লাহও বাজার তদারকির দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিশ্চিত করা, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে, সামরা বিনতে নুহাইক মক্কার বাজারে নিয়মিত পরিদর্শন করে অনিয়ম প্রতিরোধ, ওজন-পরিমাপ পরীক্ষা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার দায়িত্ব পালন করতেন।
মনিটরিংয়ের প্রধান পয়েন্টগুলো
তদারককারীদের মূল প্রশাসনিক নজরদারির বিষয় ছিল তিনটি—
ক. মাপ ও ওজন : বাজারের বাটখারা ও মাপের পাত্রগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা হতো, যাতে কোনো ব্যবসায়ী পরিমাপে কম দিতে না পারে।
খ. পণ্যের মান ও ভেজাল প্রতিরোধ : পচা, বাসি বা নিম্নমানের পণ্য ভালো পণ্যের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা রোধ করা হতো।
গ. মজুতদারি প্রতিরোধ : বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য আটকে রাখা খলিফা ওমর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত আছে, ওমর (রা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের বাজারে কোনো মজুতদারি চলবে না।’ যে ব্যক্তি দূর থেকে বাজারে খাদ্যশস্য আমদানি করত, তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা হতো আর যে ব্যক্তি কৃত্রিম সংকটের জন্য মজুত করত, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
সংকটকালে ওমরের নীতি
হিজরি ১৮ সালে আরবে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (আমুর রামাদাহ) দেখা দেয়, তখন ওমর (রা.) বাজার নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ব্যবসায়ীদের ওপর জোরপূর্বক দাম চাপিয়ে না দিয়ে, মিসর ও ইরাক থেকে সরকারি তহবিলে শস্য আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করেন। ফলে পণ্যের আকাশচুম্বী দাম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কমে আসে। এটি ছিল সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল করার আধুনিক অর্থনৈতিক কৌশল।
ব্যবসায় উৎসাহ প্রদান
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের শক্তির অন্যতম ভিত্তি মনে করতেন। তাই তিনি মানুষকে শ্রম, পেশা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বৈধ উপার্জনে উৎসাহিত করতেন। ব্যবসায় সফল হওয়ার জন্য তিনি মানুষকে অধ্যবসায়, দক্ষতা ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন, কোনো ব্যক্তি যদি একটি ব্যবসায় বারবার চেষ্টা করেও সফল না হয়, তবে তার উচিত অন্য কোনো ব্যবসা করা। একই সঙ্গে তিনি প্রত্যেককে অন্তত একটি পেশা বা কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দিতেন এবং সতর্ক করতেন, একদিন এর প্রয়োজন হবেই। তার মতে, ব্যবসা ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না থাকলে মানুষ অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। তাই তিনি বলতেন, মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে পরিশ্রমের মাধ্যমে সামান্য উপার্জনও অধিক মর্যাদাপূর্ণ। দরিদ্রদের উদ্দেশে তার আহ্বান ছিল, ‘মাথা উঁচু করে ব্যবসা করো; মানুষের বোঝা হয়ে থেকো না।’
ওমর (রা.) শুধু ব্যক্তিগত জীবিকার জন্য নয়, বরং মুসলিম সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্যও ব্যবসাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। একদিন তিনি মদিনার বাজারে এসে লক্ষ করলেন, অধিকাংশ ব্যবসায়ী নাবাতি (বিদেশি) জনগোষ্ঠীর। এতে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। লোকরা যখন বলল যে, ইসলামি বিজয়ের ফলে প্রাপ্ত সম্পদ তাদের বাজারমুখী হওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে দিয়েছে, তখন ওমর (রা.) দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি তোমরা এমন করো, তবে একদিন তোমাদের পুরুষরা তাদের পুরুষদের এবং তোমাদের নারীরা তাদের নারীদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে।’
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, কোনো জাতি যদি উৎপাদন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে একসময় তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। ওমর (রা.)-এর দৃষ্টিতে ব্যবসা শুধু ব্যক্তিগত আয়ের মাধ্যম নয়; বরং মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রশক্তি সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল।
ইসলামি বাজার ও আধুনিক বাজার
ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে উদ্দেশ্যগত মিল থাকলেও তাদের ভিত্তিগত দর্শনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক বাজার তদারকি প্রধানত রাষ্ট্রপ্রণীত আইন, প্রশাসনিক বিধান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এর অসংখ্য ফাঁকফোকর নিয়ে আলোচনা তো আছেই; পক্ষান্তরে ওমর (রা.)-এর নীতি প্রতিষ্ঠিত ছিল ওহির নির্দেশনা, নৈতিক জবাবদিহি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সমন্বয়ে। খেলাফতের লক্ষ্য শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ ছিল না, বরং এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে ব্যবসায়ী আল্লাহভীরু হবে, ভোক্তা নিরাপদ থাকবে এবং বাজার হবে ন্যায় ও আমানতের প্রতীক। তাই খেলাফতের এই তদারকি শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ছিল চরিত্র গঠনও।
অকথ্য বাস্তবতা হলো, আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো প্রতারণা, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট, ভেজাল ও একচেটিয়া বাণিজ্যের ওপর টিকে আছে। জনগণ এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করা কিছু সমাজচিন্তকরা এর প্রতিকার খুঁজে চলেছেন এর-ওর কাছে। অথচ চৌদ্দ শতাব্দী আগে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) যে নীতিমালা প্রয়োগ করেছিলেন, তা বাজারকে শুধু নিয়ন্ত্রিতই করেনি; বরং নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে একটি টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। এ কারণেই তাঁর বাজারনীতি শুধু একটি ঐতিহাসিক প্রশাসনিক মডেল নয়; বরং ইসলামের অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা, ন্যায়ভিত্তিক শাসন এবং মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তার এক উজ্জ্বল ও কালজয়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
![]() |
| মসজিদে নববির কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘সুক সুয়াইকা’ বা ‘সুক আল-কামাশাহ’ |
নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো by ড. ইসাম তালিমা
মুসলিম সভ্যতার প্রতিটি যুগেই মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা ও রচনাকর্ম হয়েছে। কখনো তার সমগ্র জীবনকে ধারাবাহিক ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে; কখনো বিভিন্ন বর্ণনার সত্যতা যাচাই, সনদ পরীক্ষা এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে; আবার কখনো তার জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনা, বৈশিষ্ট্য বা দিককে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হয়েছে। তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিরা যেমন তার জীবনচরিত রচনা করেছেন, তেমনি বিদ্বেষী এবং বিরোধীরাও তাকে নিয়ে লিখেছে। এমনকি নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ গবেষকরাও তার জীবন এবং কর্মকে তাদের গবেষণার বিষয় করেছেন। ফলে মহানবী (সা.)-এর সিরাত যুগে যুগে ভালোবাসা, বিরোধিতা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান—তিন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষেরই আগ্রহের বিষয় হয়ে থেকেছে।
সিরাতচর্চার দুটি ধারা
মহানবী (সা.)-এর সিরাত নিয়ে প্রচলিত চর্চাকে মূলগতভাবে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়। প্রথম ধারা হলো ‘ঐতিহাসিক বর্ণনাভিত্তিক সিরাতচর্চা’। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জন্ম, জন্মের পূর্ববর্তী সময় ও তৎকালীন পরিবেশ থেকে শুরু করে তার ইন্তেকাল এবং ইন্তেকাল-পরবর্তী ঘটনাবলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়।
এই ধারার মধ্যেও রয়েছে একাধিক গবেষণাপদ্ধতি। সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করেই কেউ আলোচিত সব তথ্য একত্র করেছেন। আবার কেউ তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সনদ নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করেছেন; যেসব বর্ণনা বিশুদ্ধ, সেগুলো গ্রহণ করেছেন এবং যেগুলো প্রমাণিত নয় বা দুর্বল, সেগুলোর ব্যাপারেও পাঠককে সতর্ক করেছেন। এই ধারার আরেকটি প্রবণতা হলো, সিরাতের ঘটনাবলি আলোচনা করে সেখান থেকে শিক্ষা, উপদেশ ও জীবনের নানা দিকনির্দেশনা আহরণ করা। কারো আলোচনায় সাধারণ শিক্ষাগুলো গুরুত্ব পেয়েছে, আবার কেউ বিশেষ কোনো শিক্ষা বা তাৎপর্যের ওপর জোর দিয়েছেন।
সিরাতচর্চার দ্বিতীয় ধারাটিও প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো একটি বিশেষ দিককে বেছে নিয়ে সেটিকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। মুসলিম ঐতিহ্যে এর প্রাথমিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মহানবী (সা.)-এর শামায়েল (বাহ্যিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য) এবং খাসায়েস (বিশেষ বৈশিষ্ট্য) নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোয়। কাজী ইয়াজ, মাকরিজি প্রমুখের রচনায় এ ধরনের চর্চার উদাহরণ রয়েছে।
আধুনিক যুগে মহানবী (সা.)-এর জীবনের বিশেষ কোনো দিক নিয়ে গবেষণার এই ধারা আরো বিকশিত হয়েছে। সিরাতের নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অনেক বইপত্র। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ, খালিদ মুহাম্মদ খালিদ, ইউসুফ আল-কারজাবি, মাহমুদ শিত খাত্তাব ও অন্যরা এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
পাশাপাশি পাশ্চাত্য লেখকদের মধ্যেও মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। এসব রচনার মধ্যে যেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।
সিরাতচর্চার তৃতীয় ও নতুন আরেকটি ধারা
সিরাতচর্চায় তৃতীয় একটি ধারা রয়েছে, যে ধারায় তেমন বিস্তৃত চর্চা হয়নি। বরং অল্প কয়েকজন লেখক এ পদ্ধতিতে কাজ করেছেন। এই ধারার বিষয় শুধু মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত নয়; বরং যারা লেখক ও গ্রন্থকার হিসেবে নবীজির সিরাত নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের নানা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সিরাতকে নতুন করে পাঠ করা।
এ পদ্ধতিকে আমরা বলতে পারি ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’—অর্থাৎ সিরাতের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন লেখক কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক আলোচনা করা। কারণ প্রত্যেক লেখক তার নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্যিক পরিমণ্ডল, ভাষাশৈলী এবং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার আলোকে সিরাতের ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। ফলে একই ঘটনা নিয়ে তাদের লেখায় বৈচিত্র্যময় চিন্তা, সৃজনশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটে।
ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন তুলনামূলক ফিকহ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ফকিহের মতামত ও ফিকহি সিদ্ধান্তের তুলনা করা হয়; এসব মতের পেছনের প্রেরণা, কারণ ও যুক্তি বিশ্লেষণ করা হয়; কোনো একটি মতের পেছনে থাকা ফিকহি দর্শন এবং তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিধানগুলোও পর্যালোচনা করা হয়। তাফসির শাস্ত্রেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়।
তাই সিরাতের ক্ষেত্রেও যদি এ ধরনের তুলনামূলক পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়, তাহলে মহানবী (সা.)-এর সিরাতচর্চায় নতুন ও স্বতন্ত্র একটি ধারা সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে সিরাতের অনেক দিক ও তাৎপর্য সামনে আসবে, বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করলে যা হয়তো আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়বে না। ফলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে বোঝার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি সিরাতচর্চাকে আরো সমৃদ্ধ এবং গভীর করে তুলতে পারে।
বিয়ুমির দৃষ্টান্ত
ড. মুহাম্মদ রজব আল-বায়ুমি ছাড়া এ ধরনের প্রচেষ্টা আর কারো মধ্যে আমার চোখে পড়েনি। তবে তিনি তুলনামূলক সিরাতচর্চার কোনো স্বতন্ত্র পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতিতে লেখেননি; বরং সিরাত রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন মাত্র। তার প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল من روائع السيرة النبوية: الرسول يبكي ولده إبراهيم (সিরাতের অনুপম সৌন্দর্য : সন্তান ইব্রাহিমের জন্য রাসুলের কান্না)। প্রবন্ধটি ‘ফি মিজানিল ইসলাম’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এতে তিনি মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া নবীজি (সা.)-এর ছেলে ইব্রাহিমের অল্প বয়সে ইন্তেকালের ঘটনা আলোচনা করেছেন।
বায়ুমি সমকালীন সাহিত্যিক ও চিন্তক আব্বাস আল-আক্কাদ, তাহা হুসাইন, আহমদ হাসান আল-জাইয়াত ও মুহাম্মদ হুসাইন হাইকলের সিরাতগ্রন্থে এ ঘটনাটির উপস্থাপন নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।
সিরাতের গ্রন্থগুলোতে ঘটনাটি বড়জোর আধা থেকে এক পৃষ্ঠার হলেও, এই চার সাহিত্যিকের কলমে তা অসাধারণ মূল্যবান হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। আক্কাদ প্রথমে যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন, এরপর আবেগের দিকে গেছেন; তাহা হুসাইন ঠিক বিপরীতভাবে আবেগ দিয়ে শুরু করে যুক্তিতে পৌঁছেছেন। যাইয়াত নিজের সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে এ ঘটনায় সান্ত্বনা ও শিক্ষা খুঁজে পেয়েছেন। আর হাইকল ঘটনাটিকে প্রবহমান সাহিত্যিক ভাষায় বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন।
এই ধারণার পক্ষে আরো কিছু দৃষ্টান্ত
বায়ুমি যে আঙ্গিকে আলোচনা করেছেন, সেটি ছাড়াও এ ধারার গবেষণা পদ্ধতির পক্ষে অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দেখা যায়, প্রত্যেক ফকিহ বা সাহিত্যিক মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো ঘটনা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। এসব দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে নবুয়তের আরো পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট চিত্র আমাদের সামনে বিকশিত হবে।
এর একটি দৃষ্টান্ত ইউসুফ আল-কারজাবি ও খালিদ মুহাম্মদ খালিদের রচনায় পাওয়া যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতে একটি কাকলাস (টিকটিকি জাতীয় একধরনের সরীসৃপ) হত্যা করবে, তার জন্য একশ নেকি লেখা হবে। দ্বিতীয় আঘাতে এর চেয়ে কম এবং তৃতীয় আঘাতেও এর চেয়ে কম (নেকি পাবে)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৫৭৪০)
প্রথম আঘাতের জন্য ১০০ নেকি এবং পরবর্তী আঘাতের জন্য ক্রমহ্রাসমান নেকি কেন, এর ব্যাখ্যায় ইউসুফ কারজাবি একজন আইনজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছেন, এটা মূলত সঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ করার দক্ষতার পুরস্কার। শত্রুর মোকাবিলায় কাজে লাগাতে মুসলমানের এ ধরনের দক্ষতা থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে খালিদ মুহাম্মদ খালিদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, এখানে নেকির পুরস্কারের মধ্য দিয়ে মূলত দয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যদি কাকলাসকে হত্যা করতেই হয়, তবে যেন দ্রুত হত্যা করা হয়; কারণ বারবার আঘাত করলে প্রাণীটি অযথা কষ্ট পাবে।
আমরা যে পদ্ধতিকে ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’ নামে অভিহিত করছি, তা সিরাতের বিস্তৃত ভান্ডারে ছড়িয়ে থাকা অমূল্য রত্নগুলোকে পাঠকের সামনে তুলে আনার একটি কার্যকর পথ হতে পারে। বিশেষত সিরাতের এমন সব পার্শ্বঘটনা ও অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বিষয় রয়েছে, যেগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক সময় বৃহৎ বর্ণনার আড়ালে পড়ে যায়।
সিরাতের লেখক ও কবিরা সাধারণত মহানবী (সা.)-এর জীবনের বড় ঘটনাগুলোর প্রতিই বেশি মনোযোগ দেন। নবীজির জন্ম, নবুয়তপ্রাপ্তি, হিজরত ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো তাদের রচনায় প্রাধান্য পায়। অথচ তার জীবনের অনেক ছোট ও আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনার মধ্যেও নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য, মূল্যবান শিক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ঈমানি ও জাগতিক দিকনির্দেশনা। সেই বিস্মৃত বা আড়ালে থাকা রত্নগুলো খুঁজে বের করে বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে একত্র করা গেলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে আরো গভীর, পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
আরবি থেকে বাংলা : আহমাদ ফাহমি

খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার by কাজী যুবাইদা তোহফা
মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বড় সাম্রাজ্যের উত্থানের পেছনে থাকে সামরিক পরাক্রম। আর তার দীর্ঘস্থায়িত্বের আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর। সাত শতকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল ছিল বৈশ্বিক ইতিহাসে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অনন্য জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকাল। কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক দর্শন ও নীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি যে অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তা সমকালীন রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্য তো বটেই, আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তায়ও তার ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিমালা গভীর গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল সম্পদকে শুধু ধনীদের মধ্যে আবর্তিত হতে না দিয়ে সমাজের প্রান্তিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং রাষ্ট্রে কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
খলিফা উমর (রা.)-এর প্রবর্তিত এই বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তার পূর্ববর্তী শাসনকালের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনে কোনো স্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠেনি। তখন পর্যন্ত রাষ্ট্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কর কাঠামো, জাতীয় বাজেট কিংবা স্থায়ী অর্থনৈতিক নীতিমালার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, খেলাফতের ভৌগোলিক পরিধি তখন প্রধানত আরবের মরুভূমির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং রাজস্বের আকারও ছিল তুলনামূলক ছোট। কিন্তু উমর (রা.) যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ের মাধ্যমে খেলাফত রাষ্ট্রের সীমানা বিশাল রূপ ধারণ করে। কোটি কোটি দিরহামের রাজস্ব এবং লাখ লাখ নতুন অনারব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির ফলে আগের সেই অনানুষ্ঠানিক ও সাময়িক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দূরদর্শী খলিফা উমর (রা.) অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, একটি বিশাল আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রকে শুধু সামরিক পরাক্রমের জোরে টিকিয়ে রাখা যাবে না, যদি না তার পেছনে একটি সুশৃঙ্খল, স্থায়ী এবং সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো থাকে। ঠিক এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই তিনি প্রথাগত আরবীয় সাময়িক রাজস্ব বণ্টন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এসে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
বাইতুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন
ইসলামের শুরুর যুগে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ‘বাইতুল মালে’র কোনো স্থায়ী অবয়ব ছিল না; রাজস্ব এলে তাৎক্ষণিকভাবে বণ্টন করে দেওয়া হতো। বাহরাইন থেকে আসা ৮ লাখ দিরহামের বিশাল রাজস্বও মহানবী (সা.) এক বৈঠকে সর্বসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু খেলাফত রাষ্ট্রের পরিধি বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা উমর স্থায়ী ও সুসংহত কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। মদিনায় কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ কোষাগার ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিটি বিজিত প্রদেশে এর শাখা বিস্তৃত করা হয় এবং সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়। কর আদায়ের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে তিনি ‘সাহেবুল খারাজ’ বা কর সংগ্রাহক এবং কোষাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘সাহিবে বাইতুল মাল’ বা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের মতো সম্পূর্ণ নতুন প্রশাসনিক পদের সৃষ্টি করেন। বাহরাইন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসার পর উমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভায় বসেন এবং ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার প্রস্তাব অনুযায়ী পারস্য ও রোমানদের আদলে হিসাব সংরক্ষণের স্থায়ী দপ্তর চালু করেন। এই নতুন কেন্দ্রীয় কোষাগারের প্রধান কোষাধ্যক্ষ বা ‘সাহেবে বাইতুল মাল’ হিসেবে তিনি প্রখ্যাত আমানতদার সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।
দেওয়ান ব্যবস্থা ও নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারি
প্রশাসনিক দূরদর্শিতার আলোকেই খলিফা উমর (রা.) আরবে প্রথম সুশৃঙ্খল আমলাতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা হিসেবে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বিভাগ গঠন করেন। এই ব্যবস্থার নিখুঁত বাস্তবায়নে তিনি খেলাফত রাষ্ট্রে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারির ব্যবস্থা করেন। নাগরিকদের সংখ্যা ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তালিকাভুক্ত করার পর তিনি বীরত্ব ও ইসলামের ত্যাগের তারতম্য অনুযায়ী ভাতার বৈজ্ঞানিক স্তরবিন্যাস করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক ৫ হাজার দিরহাম, ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের পরিবার ও হাবশায় হিজরতকারীদের জন্য ৪ হাজার দিরহাম এবং তরুণদের জন্য ২ হাজার দিরহাম করে নিয়মিত বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে সাদের ‘আত-তবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থের ৩৬০৫ নম্বর বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমর ঘোষণা করেছিলেন, ‘(আমি প্রদান করি কিংবা না-ই বা করি) পৃথিবীর সব স্বাধীন মুসলিমের রাষ্ট্রীয় সম্পদে অধিকার রয়েছে। আর আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই ইয়েমেনের মেষপালকের কাছেও তার প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে যাবে তার মুখ লাল হওয়ার আগেই (নিজের হকের জন্য কষ্ট করে দাবি করার আগেই)।’ এই দেওয়ানব্যবস্থা ও ভাতা নির্ধারণের শুরুর সময়ে খলিফা উমর (রা.) আরবের বংশ তালিকা ও বীরত্ব অনুযায়ী নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করার জন্য আকিল ইবনে আবু তালেব, মাখরামাহ ইবনে নাওফাল এবং জুবাইর ইবনে মুতইমকে দায়িত্ব দেন। তালিকা প্রস্তুতের পর ভাতা বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি নিজের পরিবার বা গোত্রকে নয়, বরং ইসলামের প্রথম যুগের ত্যাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে সর্বপ্রথম মহানবী (সা.)-এর পরিবার এবং বদরি সাহাবিদের নাম রাষ্ট্রীয় খাতায় সবার ওপরে তালিকাভুক্ত করেন।
নিয়মিত সামরিক বাহিনী গঠন ও আর্থিক নিরাপত্তা
উমর (রা.)-এর আগে খেলাফতে নিয়মিত কোনো বেতনভুক্ত সামরিক বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না। তিনি খেলাফতের ইতিহাসে প্রথম নিয়মিত বেতনভুক্ত ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী গঠন করেন। পদাতিক, অশ্বারোহী ও তীরন্দাজদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের নাম রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বা দেওয়ানে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং বাইতুল মাল থেকে নিয়মিত বেতন ও উন্নতমানের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা হয়।
যুদ্ধের ময়দানে থাকা সেনাদের পরিবার-পরিজনের সার্বিক অর্থনৈতিক দায়িত্ব খলিফা নিজে তদারকি করতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বৈপ্লবিক ব্যবস্থা করেছিলেন। সৈন্যদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খলিফা উমরের এই নীতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক ঘটনা।
এক রাতে খলিফা উমর মদিনার অলিগলিতে সাধারণ প্রজাদের অবস্থা তদারকি করছিলেন। সে সময় একটি বাড়ি থেকে এক নারীর কণ্ঠে গভীর বিরহ ও আকুলতার কবিতা শুনতে পান, যার স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে খিলাফতের সীমান্ত রক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত ছিলেন। এ ঘটনা খলিফার মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। পরদিন সকালেই তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.)-এর কাছে গিয়ে জানতে চান, একজন বিবাহিত নারী তার স্বামী ছাড়া সর্বোচ্চ কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে? উত্তরে তিনি জানান, এই সময়সীমা সর্বোচ্চ চার মাস।
এ ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন—কোনো বিবাহিত সৈনিককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার মাসের বেশি সময় পরিবার থেকে দূরে যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি আইন করেন, যুদ্ধকালীন এই চার মাস সৈন্যদের পরিবারের যাবতীয় ভরণপোষণ ও অর্থনৈতিক ব্যয়ভার রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে সুনিশ্চিত করা হবে।
খলিফা নিজে রাতের আঁধারে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ পৌঁছে দিতেন এবং দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা সৈন্যদের চিঠিপত্র নিজে বহন করে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতেন।
এই নিয়মতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফলেই খেলাফত রাষ্ট্রে সৈন্যদের বীরত্ব এবং তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অভূতপূর্ব এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
নবজাতকের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা
উমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থায় ‘শাসক’ পদের চেয়ে নিজেকে জনগণের ‘পাহারাদার’ ভাবা খলিফা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ছিলেন আপসহীন। মদিনার এক অসহায় মায়ের কষ্ট দেখে তিনি নীতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের প্রতিটি নবজাতক শিশুর জন্যই মায়ের বুকের দুধপানের সময় থেকেই নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ভাতার নিয়ম চালু করেন। এই মানবিক রাষ্ট্রদর্শনের পেছনে মদিনার উপকণ্ঠে ঘটে যাওয়া এক স্পর্শকাতর বাস্তব চিত্র বিদ্যমান। এক গভীর রাতে খলিফা উমর এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ যখন মদিনার বাইরে তাঁবু খাটিয়ে থাকা এক কাফেলার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন, তখন দূর থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ঘরের দরজায় গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিতে বললেও দীর্ঘক্ষণ পর আবার কান্নার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা নিজে গিয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করেন। খলিফাকে চিনতে না পেরে সেই দুঃখী মা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, খলিফা শুধু দুধ ছাড়ানো শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন; তাই পেটের দায়ে তিনি জোরপূর্বক তার এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মায়ের বুক থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন, যাতে দ্রুত সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়।
অসহায় মায়ের এই নিদারুণ স্বীকারোক্তি খলিফার বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দেয় এবং অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে তিনি ফজরের নামাজে এতটাই কান্না করছিলেন যে মুসল্লিদের পক্ষে তার কিরাত বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মোনাজাত শেষে তিনি বিলাপ করে বলতে থাকেন যে উমরের ভুলের কারণে আজ কত নিষ্পাপ শিশু কষ্টের শিকার হয়েছে। এ ঘটনার পরদিনই খেলাফতে জরুরি ফরমান জারি করা হয়, এখন থেকে কোনো শিশুকে জোর করে দুধ ছাড়াতে হবে না, বরং প্রতিটি নবজাতক পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই বাইতুল মালের নিবন্ধিত নাগরিক হিসেবে স্থায়ী ভাতার অধিকার লাভ করবে।
স্বজনপ্রীতি রোধ ও মিতব্যয়িতার আদর্শ
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কোনো গভর্নর বা সরকারি কর্মকর্তা নিযুক্ত হওয়ার আগে সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হতো এবং দায়িত্ব ছাড়ার সময় অতিরিক্ত বা অবৈধ কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে বাজেয়াপ্ত করা হতো। আর এই জবাবদিহির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন খলিফা নিজে, যিনি বাইতুল মাল থেকে সাধারণ একজন নাগরিকের সমপরিমাণ সর্বনিম্ন ভাতা গ্রহণ করতেন। অগণিত তালি দেওয়া সাধারণ পোশাক পরে বিশ্ব কাঁপানো এই রাষ্ট্রনায়ক প্রমাণ করেছিলেন, শাসকের ভোগবিলাস নয়, বরং মিতব্যয়িতাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। এই কঠোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার নীতিটি খলিফা শুধু মুখে বলেননি, বরং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজের পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী সেনাপতিদের প্রতিও কোনো ছাড় দেননি। খেলাফতের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী গভর্নর আমর ইবনুল আস যখন মিসরের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত সম্পদে আকস্মিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করে খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ হিসাব তলব করেন। গভর্নর তার এই অতিরিক্ত সম্পদকে বৈধ ব্যবসা ও ব্যক্তিগত উপার্জনের ফসল বলে দাবি করলেও, খলিফা তার নীতিতে অটল থাকেন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত উপার্জনের আশঙ্কার কারণে গভর্নরের সেই বর্ধিত সম্পদের অর্ধেক অংশ রাষ্ট্রীয় ফরমান বলে বাইতুল মালে বাজেয়াপ্ত করেন। এমনকি নিজের প্রিয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় চারণভূমি ব্যবহার করে চড়া দামে উট বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করলে, খলিফা সরকারি চারণভূমির অনৈতিক সুবিধার কারণে পুত্রের সেই লভ্যাংশের পুরোটা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করে দেন। নিজের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রপ্রধানের এমন নজিরবিহীন ও আপসহীন অর্থনৈতিক জবাবদিহি সমগ্র খিলাফতে দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
![]() |
| মুসলিমদের বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব ময়দান’ |
Thursday, August 20, 2026
টেক্সাসে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা, তীব্র হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষও
বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
জুনের শুরুর দিকে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠেছিলেন গুলাম কেহার। টেক্সাসের আরভিংয়ে নিজের স্থানীয় মসজিদ ভ্যালি র্যাঞ্চ ইসলামিক সেন্টারে দিনের প্রথম নামাজ আদায় করে কয়েক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডে দায়িত্ব পালনে যাওয়ার কথা ছিল তার।
এর আগেও তিনি দায়িত্ব পালনে গিয়েছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে টেক্সাসে রেখে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
টেক্সাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং সেগুলোর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছিল। বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লি ও ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার সময় কিংবা পার্কে বসে থাকার সময় তাদের উদ্দেশে করা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিউস্টনের একটি বড় ইসলামিক সেন্টারে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কনরো শহরে এক নারী মুসলিম ক্রেতাদের বলেন, তারা ‘এই অঙ্গরাজ্য বা এই দেশে স্বাগত নয়’। ওই মন্তব্যের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নারীটি চাকরি হারান। পরে সমর্থকদের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পান তিনি।
ডালাসের উপশহর ম্যাককিনিতেও একটি মসজিদ সম্প্রসারণ নিয়ে উত্তপ্ত সিটি কাউন্সিলের শুনানির সময় এক নারী সাবেক মেয়রের জামার ভেতরে ইসলামবিরোধী বার্তা লেখা কাগজ ঢুকিয়ে দেন।
‘এমন পরিবেশে তাদের একা রেখে যাওয়া কিছুটা উদ্বেগের বিষয় ছিল,’ নিজের পরিবারের প্রসঙ্গে বলেন কেহার। ‘বাইরে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোই ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল।’
পরে দায়িত্ব পালনের এলাকায় তার পরিবারকে যত দ্রুত সম্ভব তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি।
কেহারের মতো গত কয়েক দশকে টেক্সাসে বসতি গড়া মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে। ডালাসের দক্ষিণে ‘ডিসোটো হাউস অব পিস’-এর মতো প্রতিষ্ঠানও মুসলিম সম্প্রদায়ের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।
‘আমেরিকান মুসলিমদের জন্য এটাই থাকার সবচেয়ে ভালো জায়গা,’ বলেন তাম্মাম আলওয়ান। ডেট্রয়েট থেকে আরভিংয়ে চলে আসা এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করেছিলাম—হে আল্লাহ, আমাকে আরভিংয়ে পাঠান।’
কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় যত বেড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও তত বেড়েছে।
‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’ মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকান রাজনীতির অংশ। জাতীয় পর্যায়েও এই বক্তব্য আরও তীব্র হয়েছে। মুসলিম রাজনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয় এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে টেক্সাসের রাজনীতিকরা শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা কিছু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতাও প্রয়োগ করেছেন।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। পূর্ব প্লানোর ইসলামিক সেন্টার বা এপিকের সদস্যরা ডালাসের পূর্বদিকে প্রায় ৪০০ একর জমিতে মসজিদকেন্দ্রিক একটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করলে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় এপিক সিটি । পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘দ্য মেডো’ রাখা হয়। প্রকল্পটিতে এক হাজারের বেশি বাড়ি, মসজিদ, স্কুল, দোকান, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদনমূলক স্থাপনা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি নিয়ে ইসলামবিরোধী প্রভাবক অ্যামি মেকেলবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, টেক্সাসের বারবিকিউ রেস্তোরাঁগুলোকে একটি সমন্বিত ‘দখল’-এর অংশ হিসেবে ‘আরব শপিং প্লাজা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এপিক সিটি নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের পতন হয়।’
তার প্রচারণা টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর অ্যাবট প্রস্তাবিত প্রকল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রাজ্যীয় তদন্ত শুরু করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও প্রকল্পটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।
প্রকল্পটির সমালোচকেরা এটিকে ‘শরিয়াহ-নিয়ন্ত্রিত’ বা মুসলিমদের জন্য আলাদা এলাকা হিসেবে তুলে ধরলেও প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, এটি সব ধর্ম ও পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত।
রিপাবলিকান কনভেনশনে শরিয়াহবিরোধী প্রপাগাণ্ডা
মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের বিস্তার টেক্সাসের রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জুনে অনুষ্ঠিত টেক্সাস স্টেট রিপাবলিকান কনভেনশনে ‘Don’t Sharia Our Texas’ বা টেক্সাসকে শরিয়াহমুক্ত রাখার বার্তা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। একাধিক প্যানেলে মুসলিম ‘আগ্রাসন’ নিয়ে সতর্ক করা হয় এবং শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করাকে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও সম্মেলনে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান।
সম্মেলনস্থলে টেক্সাস হাউসের নতুন ‘শরিয়াহ-মুক্ত ককাস’-এর একটি বুথও ছিল। সেখানে অ্যামি মেকেলবার্গের সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রচারণা চালানো হয়।
এক নারীর হাতে থাকা একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার টেক্সাসকে শরিয়াহ আইনে শাসিত করো না। স্বাধীনতা রক্ষা করো। টেক্সাস রক্ষা করো।’
এরই মধ্যে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রিপাবলিকান প্রার্থী বো ফ্রেঞ্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।’
২০১৫ থেকেই শরিয়াহবিরোধী রাজনীতি
টেক্সাসে মুসলিমদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে আরভিংয়ের তৎকালীন মেয়র বেথ ভ্যান ডুইন শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন। তিনি বর্তমানে কংগ্রেসের সদস্য।
এর দুই বছর পর, ওয়াশিংটনভিত্তিক কট্টর ডানপন্থী থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি-র উদ্যোগে আনা একাধিক বিলের অংশ হিসেবে টেক্সাসের রিপাবলিকানরা শরিয়াহবিরোধী আইন পাস করেন।
এরপর কিছু সময়ের জন্য কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিতে ইসলাম ইস্যুর গুরুত্ব কমে যায়। অভিবাসন, মহামারি ও লিঙ্গ রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়।
কিন্তু পরে কট্টর ডানপন্থীদের একটি অংশ নতুন করে এমন একটি বিতর্কিত ধারণা সামনে আনে—ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এপিক সিটি নিয়ে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ
রিপাবলিকান রাজনৈতিক পরামর্শক অ্যান্থনি হোমের মতে, ইসলাম নিয়ে রিপাবলিকান ভোটারদের উদ্বেগ মূলত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে তাদের ভীতিরই সম্প্রসারণ। গভর্নর অ্যাবটের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি যা কিছু করেন, তা জনমত জরিপ দ্বারা চালিত।’
এদিকে অ্যাবট মুসলিম যাত্রীদের ধর্মীয় অজুর জন্য ব্যবস্থা রাখা টেক্সাসের বিমানবন্দরগুলোর সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করার হুমকি দেন। মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত একটি ব্যক্তিগত ওয়াটার পার্ক অনুষ্ঠান বাতিলের নির্দেশও দেন তিনি।
একই সঙ্গে অ্যাবট জাতীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেন। সংগঠনটি আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, সিএআইআর-কে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামি প্রতিষ্ঠানকেও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মুসলিম নেতাদের অবস্থান
টেক্সাসের মুসলিম নেতারা কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগ ও জনসম্পৃক্ততার পক্ষে। আবার কেউ মনে করছেন, শুধু নিজেদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।
ভ্যালি র্যাঞ্চ মসজিদে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট মুসলিম স্কলার ড. ওমর সুলেইমান বলেন, ‘আমরা সবসময় আমাদের কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে আশা করেছি, আমাদের কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিকভাবে আমাদের পক্ষে কথা বলবে। আমরা সেটা চেষ্টা করেছি, কিন্তু এতে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।’
তার মতে, এখন পরিস্থিতির জন্য ‘শক্ত অবস্থান’ প্রয়োজন এবং মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।
‘আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলাকে এসব মানুষের জন্য আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে,’ বলেন তিনি। ‘আমাদের তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।’
তিনি এমন প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে মার্কিন সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষার কথা উল্লেখ করেন। তবে কট্টর রক্ষণশীলরা কীভাবে সেই সুরক্ষা সীমিত করা যায়, তার পথ খুঁজছেন।
টেক্সাসে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে কিছু ইসলামি সাংস্কৃতিক চর্চা—যেমন বিবাহ ও অন্যান্য বিষয়ে ধর্মীয় বিধানভিত্তিক সালিশি ব্যবস্থা—নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাজ্য আইন ব্যবহারের কথা আলোচনা হচ্ছে।
সান অ্যান্টোনিওর রিপাবলিকান স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালান স্কুলক্রাফট বলেন, ‘আমরা প্রথম যে বিষয়গুলো করার চেষ্টা করব, তার একটি হলো—ধর্ম বলতে কী বোঝায়, সেটি সংজ্ঞায়িত করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়। এটি একটি ধর্মের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।’
মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা, আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এবং সরকারি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েও এর প্রকাশ ঘটছে।
সিএআইআর-এর অস্টিন শাখার শাইমা জায়ান বলেন, ‘আমরা ইসলামোফোবিয়ার ঢেউয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। এটি সবচেয়ে ভয়াবহ ঢেউ।’
সব মিলিয়ে, টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তারের পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। মসজিদ ও মুসলিম অধ্যুষিত কমিউনিটি গড়ে ওঠা থেকে শুরু করে শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে অঙ্গরাজ্যটির মুসলিমদের ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হচ্ছে।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Wednesday, August 19, 2026
‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম’—রবার্তো কার্লোসকে কাবার ইমামের অভিনন্দন
বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে রবার্তো কার্লোসের অতীত এবং বর্তমান ছবি শেয়ার করে তাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম।’
সাবেক এই ব্রাজিলিয়ান তারকার জন্য দোয়া করে শায়খ ইয়াসির আদ-দোসারি পোস্টে আরও লেখেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন, তার অন্তরে হেদায়েত দান করুন, তার ইসলাম গ্রহণে বরকত দিন এবং তাকে দৃঢ় ও হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’
রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবরটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে মঙ্গলবার। তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির গাজিয়ানতেপের সংসদ সদস্য আলি শাহিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ দাবি করেন।
আলি শাহিন জানান, সম্প্রতি ব্রাজিল সফরের সময় দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সেখানেই ব্রাজিলের ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খ জিহাদ হাম্মাদের কাছ থেকে রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবর জানতে পারেন তিনি। পরে সাবেক এই ফুটবলারকে অভিনন্দনও জানান শাহিন।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবার্তো কার্লোসের সঙ্গে শায়খ জিহাদ হাম্মাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। প্রায় চার সপ্তাহ আগে সাও পাওলোতে তাদের সাক্ষাৎ হয়। ওই সময় রবার্তো কার্লোস শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
![]() |
| মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. ইয়াসির আদ-দোসারি (বামে) তার ফেসবুক পোস্টে শেয়ার করা রবার্তো কার্লোসের ছবি (ডানে)। |
পাঠ্যবই থেকে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাদ দিল সৌদি আরব
ইসরাইলভিত্তিক পাঠ্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইমপ্যাক্ট-সী -এর এক পর্যালোচনায় এসব পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের সৌদি পাঠ্যবই পর্যালোচনা করেছে।
একাদশ শ্রেণির আরবি ভাষার বইয়ের ২০২৩-২৪ সংস্করণে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাক্যটি ছিল। পরবর্তী সংস্করণে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে, বাক্যটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।
শুধু জেরুজালেমের প্রসঙ্গই নয়, সৌদি পাঠ্যবইয়ে ইসরায়েল ও ইহুদিদের নিয়ে ব্যবহৃত কিছু ভাষাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোথাও ‘জায়নবাদী শত্রু’ শব্দের পরিবর্তে ‘ইসরাইলি দখলদারত্ব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি মানচিত্র থেকেও ফিলিস্তিনের নাম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা কিছু এলাকা নামহীন রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সম্পর্কে আগের কিছু কঠোর ভাষাও বাদ বা পরিবর্তন করা হয়েছে। ইমপ্যাক্ট-সী-এর দাবি, এসব পরিবর্তনের ফলে সৌদি পাঠ্যক্রমে সহাবস্থান, সহনশীলতা ও মধ্যপন্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, কিছু বিতর্কিত বিষয় এখনো পাঠ্যবইয়ে রয়ে গেছে।
সৌদি আরবের এই পরিবর্তনকে ঘিরে ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাব্য উদ্যোগের সঙ্গে এসব পরিবর্তনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
তবে সৌদি আরব প্রকাশ্যে এখনো বলে আসছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করার নিশ্চয়তা ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না। ফলে পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তনকে সরাসরি সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ে জেরুজালেম ও ইসরাইল নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু কঠোর বক্তব্য পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাক্যটি বাদ দেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এর রাজনৈতিক প্রভাব কতটা হবে এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে সৌদি নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1767)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




-এর-বাজার-ব্যবস্থাপনা-2c4045.jpg)


